Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২২

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২২

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২২
ফারহানা নিঝুম

চঞ্চল মাশাকে কাঁদিয়ে আপন মনে সুর তুলল শয্য!
••পেহলে শর্মাকে মার ডালা
ফির সামনে আক্যে মার ডালা
আঁখ হি নহি মিলায়ি তুনে আখির
তরসা তরসা ক্যে মার ডালা
পর চেহরা মিলা তো ফকত আদা সে
তরপা তরপা ক্যে মার ডালা••
গুনগুন করতে করতে বলল,
“তোকে কাঁদাতে আমার দারুন লাগে বেটার হাফ!”
ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠলো শয্য। তারপর ল্যাপটপে ওই বিছানায় কাঁদতে থাকা কন্যার দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বলল,
“কাল চোখের জলের হিসেব পুষিয়ে দেব।”

বাদশাহ বাড়িতে ঝুমঝুমের জন্মদিন কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্‌যাপিত হয় না। এর একমাত্র কারণ তারা বাদশাহ। জন্মদিন পালনের বিষয়টি তার একেবারেই অপছন্দ। তাই পরিবারের কেউও কখনো তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস দেখায় না। আশ্চর্যের বিষয়, ঝুমঝুম নিজেও কোনোদিন অভিমান করে বসেনি, বায়না ধরেনি কিংবা জন্মদিন নিয়ে সামান্য অভিযোগও তোলেনি। যেন নিজের প্রাপ্যটুকু না পাওয়ার অভ্যাস বহু আগেই রপ্ত করে ফেলেছে সে।
তবুও কিছু সম্পর্ক তো আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে আটকে থাকে না। প্রতিবছর এই দিনটিতে জেসমিন বাদশাহ সবার অগোচরে ভোরবেলায় রান্নাঘরে নেমে পড়তেন। ঝুমঝুমের প্রিয় পায়েস রান্না করতেন নিজের হাতে। তারপর সুযোগ বুঝে মেয়েটিকে ডেকে এনে এক চামচ মুখে তুলে দিয়ে মৃদু হেসে বলতেন,
“শুভ জন্মদিন, বাচ্চা।”
সঙ্গে থাকত তার পছন্দের একটি নতুন পোশাক।
অন্যদিকে আব্রাহাম সে যেন ছোট বোনের শৈশবটুকু আঁকড়ে ধরে রাখার নেশায় বুঁদ ছিল। বাজার চষে যত রকম “মাশা অ্যান্ড দ্য বেয়ার”-এর পুতুল পাওয়া যেত, প্রায় সবই কিনে আনত। তারপর শিশুসুলভ গর্ব নিয়ে বলত,

“দেখ তো, এবার কোনটা নেই?”
বিকেলের দিকে ঝুমঝুম যদি মেহরিমার “মাশা অ্যান্ড দ্য বেয়ার” ক্যাফেতে যেত, তবে রাকিব আর মেহরিমা চুপিসারে একটি ছোট্ট কেক এনে তাকে দিয়ে কাটাত। না থাকত শত মানুষের কোলাহল, না থাকত বর্ণাঢ্য আয়োজন।থাকত শুধু মুঠোভর্তি কিছু ভালোবাসা।
এটুকুই ছিল ঝুমঝুমের জন্মদিন। এটুকুতেই সে পরিপূর্ণ সুখ খুঁজে নিত। তার বিশ্বাস ছিল জন্মদিনের আনন্দ আয়োজনের বিশালত্বে নয়, বরং পাশে থাকা মানুষগুলোর ভালোবাসাতেই লুকিয়ে থাকে।
কিন্তু এবারের দিনটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই প্রথম জন্মদিনে জেসমিন বাদশাহ বাড়িতে নেই। গতরাতে আব্রাহাম ও জুঁইকে নিয়ে একটি অভিজাত পার্টিতে গিয়েছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই সবার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, এ বাড়ির বড় ছেলের স্ত্রী হিসেবে জুঁইকে। কিন্তু গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া মুষলধারে বর্ষণে শহরের অধিকাংশ সড়ক জলমগ্ন হয়ে পড়ে। দুর্যোগের কারণে আর বাড়ি ফেরা সম্ভব হয়নি তাদের। বাড়িতে রয়েছেন শুধু তারা বাদশাহ।
রিমঝিম সে বরাবরই মায়ের অনুগত কন্যা। অবাধ্যতা যেন তার স্বভাবের অভিধানে নেই। তবু ছোট বোনের জন্মদিন বলে কথা। কোনো আয়োজন না হোক, অন্তত একটি উপহার তো প্রাপ্য। সেই ভাবনা থেকেই ভোরের আলো ফোটার আগেই নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়েছে সে।
যদিও রাতভর বৃষ্টির জল এখনো শহরের পথঘাট জুড়ে থইথই করছে। মনের ভেতর একটাই সংশয় এই ভোরবেলায় আদৌ কোনো শপ খোলা থাকবে তো?

ঘুমের আবরণ ধীরে ধীরে সরে যেতেই চমকে জেগে উঠল ঝুমঝুম।মেরুদণ্ড জুড়ে যেন কেউ অগণিত সূক্ষ্ম কাঁটা বিঁধিয়ে রেখেছে। তীব্র ব্যথার ঢেউ একবারেই কোমর বেয়ে ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র শরীরে। ব্যথাটুকু নীরবে গলাধঃকরণ করে ভ্রূ কুঁচকে নিল সে।
নরম, মেঘের মতো কোমল বিছানাটি আজ অদ্ভুত রকম কঠিন মনে হচ্ছে।কী যেন একটা অস্বাভাবিকতা ব্যথার কারণ অনুসন্ধানে ধীরে ধীরে উঠে বসল কন্যা। ঠিক তখনই অনুভব করল সে কোনো গদির ওপর নয়, বরং অসংখ্য শক্ত, সমতল কিছুর ওপর বসে আছে।
ঘুমজড়ানো চোখ দুটো হাতের পিঠ দিয়ে মুছে চারপাশে তাকাতেই মুহূর্তেই নিথর হয়ে গেল সে।এ যেন কোনো শয়নকক্ষ নয় এ যেন বইয়ের রাজ্য। সম্পূর্ণ বিছানাজুড়ে স্তরে স্তরে সাজানো উপন্যাস। একটি বইয়ের ওপর আরেকটি, তার ওপর আরও একটি এভাবে গোটা শয্যাটি যেন বইয়ের ইট গেঁথে নির্মিত এক বিস্ময়কর স্তূপে পরিণত হয়েছে।

একটুকু ফাঁকা জায়গাও নেই।যেদিকে চোখ যায়, শুধু বই,বই আর বই। স্তব্ধ, নির্বাক ঝুমঝুম ব্যথা ভুলে তড়িঘড়ি বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল।
বিস্ফারিত নয়নে একবার ডানদিকে, একবার বাঁদিকে তাকাচ্ছে সে। এতক্ষন যাবত সে বইয়ের ঘুমোচ্ছিল?
এতগুলো বই!কত হতে পারে?বইয়ের স্তূপগুলো এমনভাবে সাজানো যে, দূর থেকে দেখলে মনে হয় শয্যার ওপর ছোটখাটো একটি দ্বিতল মিনার দাঁড়িয়ে আছে। গুনে শেষ করা অসম্ভব। তবু আনুমানিক পাঁচ হাজারের কম হবে না এটা বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগল না। হঠাৎই দৃষ্টি আটকে গেল ওপরের দিকের একটি উপন্যাসের গায়ে রাখা ছোট্ট ভাঁজ করা কাগজে।
কৌতূহলভরে সেটি তুলে খুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল পরিচিত, উদ্ধত অথচ অদ্ভুত সুন্দর হস্তাক্ষর,
“জন্মদিনে তোর জন্য উপহার রইল পাঁচ হাজার বই। শুভ জন্মদিন, ইডিয়ট।”
(On your birthday, a gift of five thousand books awaits you , happy birthday, idiot.)

চিরকুটের লেখাটুকু পড়তেই ঝুমঝুমের অধরে অজান্তেই মৃদু হাসি ফুটে উঠল।এই সম্বোধন এই দুষ্টুমিভরা ভাষা এভাবে তাকে “ইডিয়ট” বলে খোঁচা দেওয়ার সাহস পৃথিবীতে একজনেরই আছে।
শয্য। পরক্ষণেই স্মৃতির পর্দা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে লাগল।
গত রাত…..
প্রণয়ের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ ফোনে গল্প করার পর ঝুমঝুম নিজের সবচেয়ে প্রিয় হ্যারি পটার সিরিজের একটি উপন্যাস হাতে নিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে পড়তে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ফোনের পর্দা আলোকিত হয়ে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা,
“এখুনি আমার ফেইরি ল্যান্ডে আয়।”
বার্তাটি পড়ে থমকে গেল ঝুমঝুম।কপাল কুঁচকে বিড়বিড় করে উঠল,

“আমাকে?”
অবিশ্বাসে আবারও বার্তাটি পড়ল।
শয্য!সে-ই ডেকেছে?অসম্ভব!ওই রগচটা, অহংকারী মানুষটা স্বেচ্ছায় তাকে কোনোদিন ডাকে না। নিশ্চয়ই ভুল করে পাঠিয়েছে।এই ভেবে বার্তাটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আবার বইয়ের পাতায় মনোযোগ দিল সে।
ঠিক তখনই কর্কশ রিংটোনের শব্দে নীরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
ফোন কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল বিরক্ত, কর্কশ অথচ চিরচেনা পুরুষালি নিঃশ্বাসের শব্দ। ঝুমঝুম মিনমিনে গলায় বলল,,

“হ্যালো?”
পরক্ষণেই বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠল শয্য,
“হোলি ফাক! ডিডন্ট আই টেক্সট ইউ? গেট হিয়ার। নাউ।”
কথাগুলো কর্ণগোচর হওয়া মাত্রই আঁতকে উঠল ঝুমঝুম।তার মানে. বার্তাটি ভুল ছিল না!সত্যিই তাকে ডেকেছে শয্য। আর এক মুহূর্তও দেরি করল না সে।
তড়িঘড়ি মাথায় একটি হালকা স্কার্ফ জড়িয়ে নিল। বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরল নিজের প্রিয় বইটি।
তারপর দরজার কপাট আস্তে খুলে, পা টিপে টিপে।
কিন্তু বিধিবাম!কলিংবেলের ধ্বনি কর্ণগোচর হতেই মুহূর্তের ব্যবধানে সপাটে দরজাটি খুলে দিল শয্য। চোয়াল শক্ত, হ্যাজেলবর্ণ চক্ষুদ্বয়ে দাউদাউ ক্রোধের শিখা। হিসহিসে স্বরে বলে উঠল,
“হোয়েন ডিড আই কল ইউ? হোয়াই দ্য হেল ডিড ইউ টেক সো লং?”
ওই কর্কশ কণ্ঠস্বর শুনেই জমে গেল ঝুমঝুম। সংকুচিত স্বরে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“আ… আসলে… আমি বই পড়ছিলাম…

শয্যের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নেমে এল তার বুকে আঁকড়ে ধরা বইটির ওপর।একটি বই তার ডাকার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে! চোখেমুখে জমাট বাঁধল ক্রোধ। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই শয্য এক ঝটকায় বইটি কেড়ে নিল। পরমুহূর্তেই নির্মম শক্তিতে ছিঁড়ে ফেলল প্রিয় হ্যারি পটার উপন্যাসটি। কাগজের ছিন্নাংশ দুমড়ে-মুচড়ে ঝুমঝুমের মুখের ওপর ছুড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করল,
“গেট আউট অব মাই সাইট। রাইট নাউ! অর আই সয়্যার, আই’ল কিল ইউ!”
বাক্যশেষে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না সে।
প্রচণ্ড ধাক্কায় ঝুমঝুমকে দোরগোড়া থেকে সরিয়ে মুখের ওপরই সজোরে দরজাটি বন্ধ করে দিল।
দড়াম!বিকট শব্দটি যেন ঝুমঝুমের বুকের ভেতর গিয়েই আঘাত করল।পরক্ষণেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল কন্যা।সে কী এমন অপরাধ করেছিল?কাঁপা হাতে মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ছিন্নভিন্ন পাতাগুলো একে একে কুড়িয়ে বুকে চেপে ধরল। মনে হলো বইটির সঙ্গে সঙ্গে তার শিশুসুলভ আনন্দটুকুও যেন টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। বুকের ভেতর জমাট বাঁধা হাহাকার আর সামলাতে পারল না। ছুটে নিজের কক্ষে ফিরে এল।
দরজা ভেজিয়েই বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ল। বুকের সঙ্গে ছেঁড়া বইটি জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সে। অশ্রুতে ভিজে যেতে লাগল ছিন্ন পাতাগুলোও।
প্রিয়া তাকে কি বলেছিল?
“এই পুরুষটি তাকে ভালোবাসে। ভালোবাসে নাকি ছাই? অসভ্য পুরুষ কিভাবে তাকে অপমান করল!সে কি করেছিল?”

কল্পনার ঘোর ভাঙতেই কন্যার আঁখিপল্লব অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে দৃষ্টি নত করল সে, আর তখনই উপলব্ধি করল এই অসংখ্য গ্রন্থ, এই অমূল্য উপহার, সবই এক মানুষের নিঃশব্দ স্নেহের বহিঃপ্রকাশ। শয্য!
হৃদয়ের অন্তঃস্থলে যেন এক অদৃশ্য কম্পন জেগে উঠল। অধরের কোণে অনায়াসে ফুটে উঠল স্নিগ্ধ এক হাস্যরেখা। পরম যত্নে চিরকুটটি বক্ষের কাছে চেপে ধরে আবারও তাকাল বইগুলোর দিকে। সারি সারি উপন্যাস, প্রতিটি যেন তার বহুদিনের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ। এত বই! নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠল,

“আমার তো আরেকটা বুকশেলফ লাগবে!”
ঘরের একমাত্র বুকশেলফটি বহু আগেই বইয়ের ভারে নুয়ে পড়েছে। এখন নতুন আরেকটি না হলে এদের স্থান দেওয়াই অসম্ভব। ভাবনাটুকু মনে আসতেই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল তার সমগ্র সত্তা।
ঠিক সেই মুহূর্তেই টিং টং! বাড়ির কলিংবেলের কর্কশ ধ্বনি নিস্তব্ধ সকালটাকে চিরে দিল। ঝুমঝুম দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। দরজার লক খুলে বাইরে উঁকি দিতেই বিস্ময়ে স্থবির হয়ে গেল।
কেউ নেই। চারপাশ সম্পূর্ণ নির্জন। কিন্তু দোরগোড়ায় সুসজ্জিত অবস্থায় রাখা রয়েছে এক বিশাল রোজ বুকে। বাইরের আবরণে অল্প কয়েকটি রক্তিম গোলাপ, আর সেই গোলাপের আবেষ্টনের অন্তঃস্থলে শৈল্পিক বিন্যাসে সাজানো রয়েছে হ্যারি পটার সিরিজের সম্পূর্ণ কালেকশন। মুহূর্তের জন্য কন্যার নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল। বই দিয়েও যে ফুলের তোড়া নির্মাণ করা যায় এ দৃশ্য সে শুধু কল্পনাতেই দেখেছিল।
ধীর হাতে তোড়াটি তুলে নিতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল মাঝখানে গুঁজে রাখা একটি ছোট্ট কার্ডে।
সেখানে সুদৃশ্য হস্তাক্ষরে লেখা,

“Mi Amor, Happy Birthday!”
কন্যার চোখদুটি বিস্ময়ে আরও প্রসারিত হয়ে উঠল।
“মি আমোর” শব্দদুটো নিঃশব্দে উচ্চারণ করল সে।
অর্থটা তার জানা “আমার ভালোবাসা।”
এক মুহূর্তেই তার মনে ভেসে উঠল একমাত্র মানুষের মুখ প্রণয়। হৃদয় আপনাআপনিই যুক্তি দাঁড় করিয়ে ফেলল।
“হয়তো প্রণয়ই পাঠিয়েছে, কারণ শয্য তো কোনোদিন আমাকে ‘মি আমোর’ বলবে না! তাছাড়া যেখানে শয্য বাদশাহ তাকে দুচোখে শয্য করতে পারেনা,বোন বলেই ভাবতে চায়না সেখানে অন্য কিছু ভাবাটা বোকামি নয়কি?”

নিজের কাছেই লজ্জা পেলো ঝুমঝুম। প্রিয়ার কথায় কি সব ভাবছে! ছিহ্!”
ভাবনাটুকুর সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ আরও উথলে উঠল। আজকের দিনটা যেন সত্যিই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জন্মদিন।
একজন ভাই নিঃশব্দে তার স্বপ্নভর্তি হাজারো বই উপহার দিয়েছে।
আর তার ভালোবাসার মানুষ পাঠিয়েছে বই দিয়ে গড়া এক অনন্য রোজ বুকে। বুকের সঙ্গে রয়েছে একটা ক্যালেন্ডার কার্ড কাঁচ দিয়ে বাঁধাই করা। যেখানে ঝুমঝুমের জন্মদিনের তারিখ (জানুয়ারি ০১) সুন্দর করে মার্ক করা। ঝুমঝুম বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল উপহারটি। আনন্দাশ্রু চিকচিক করে উঠল তার নয়নে। আজ মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত সুখ বুঝি একসঙ্গে এসে ধরা দিয়েছে তার দু’হাতে।
অথচ কন্যা জানতেই পারলো না এই সবগুলো উপহার দেওয়া পাগলে পুরুষটি হচ্ছে বেপরোয়া উগ্র পুরুষটি!

“কে এসেছে, মাশা?”
তারা বাদশাহর কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হওয়া মাত্রই সম্বিত ফিরে পেল ঝুমঝুম। চমকে উঠে তড়িঘড়ি বইয়ের তোড়া আর গোলাপগুলো দরজার পাশের আড়ালে সরিয়ে রাখল। বুকের ধুকপুকানি তখনও থামেনি। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে হাতে শুধু বাঁধাই করা জন্মদিনের ছোট্ট শুভেচ্ছা-কার্ডটি নিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল।
তারা বাদশাহ সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে ভ্রুকুঞ্চিত দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“কে এসেছিল?”
ঝুমঝুম কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করে মৃদুস্বরে বলল,
“একটা পার্সেল এসেছিল, মা। বোধহয় প্রিয়া পাঠিয়েছে।”
তারা বাদশাহর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি একবার ঝুমঝুমের মুখে, একবার তার হাতে ধরা কার্ডটির ওপর স্থির হলো। যেন তিনি মেয়ের চোখের ভাষা পড়ে নিতে চাইছেন। কয়েক মুহূর্ত নীরবে পর্যবেক্ষণ করলেও শেষ পর্যন্ত আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
শুধু গম্ভীর স্বরে বললেন,

“দরজাটা বন্ধ করে দিও। রিমঝিমকে দেখলাম বাইরে গেছে। ফিরলে যেন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে না হয়।”
ঝুমঝুম বাধ্য কন্যার মতো মৃদুস্বরে উত্তর দিল,
“আচ্ছা, মা।”
তারা বাদশাহ ধীর পদক্ষেপে সরে যেতেই ঝুমঝুম দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে বুকের ভেতর জমে থাকা চাপা উত্তেজনাটুকু নামিয়ে রাখল।
“উফ… অল্পের জন্য!”

নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল সে।পরক্ষণেই আর নিজেকে সামলাতে পারল না। প্রায় দৌড়ে আবার দোরগোড়ায় গিয়ে আড়ালে লুকিয়ে রাখা বইয়ের তোড়াটি দু’হাতে তুলে নিল।
অধরের কোণে আবারও প্রস্ফুটিত হলো এক নির্মল হাস্যরেখা। আজ তার হৃদয়ের ভেতর যে আনন্দের প্লাবন বইছে, সেটাকে ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
একদিনেই,এতগুলো বই। এতগুলো ভালোবাসা।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২১

মনে হচ্ছিল, আজকের সকালটা বুঝি শুধুই তার জন্য একটু বেশি সুন্দর হয়ে ফুটে উঠেছে। কিন্তু সবার আগে তো শয্যের সঙ্গে দেখা করতে হবে। এতগুলো থ্যাংক ইয়্যু দিতে হবে। এমন একটা বইয়ের বদলে যদি পাঁচ হাজার বই পাওয়া যায় তাহলে ঝুমঝুম প্রতিদিন লোকটাকে রাগিয়ে দিয়ে বই হাসিল করে নেবে।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২২ (২)