Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২১

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২১

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২১
ফারহানা নিঝুম

বিছানার শুভ্র চাদরখানি সুচারুভাবে গুছিয়ে নিচ্ছিল জুঁই। রজনীর দীর্ঘ অবসানের পূর্বপ্রস্তুতি যেন নিঃশব্দে সম্পন্ন করছিল সে। চারপাশে নিস্তব্ধতার আবরণ, কেবল জানালার ফাঁক গলে প্রবেশ করা শীতল বাতাসে পর্দাগুলো কেঁপে উঠছিল ক্ষীণ ছন্দে। ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষের ভারী দরজাটি ধীর লয়ে খুলে গেল।
ভেতরে প্রবেশ করল আব্রাহাম। তার দীর্ঘদেহী অবয়বটায় এক অদ্ভুত প্রশান্তির ছায়া, অথচ হাতে ধরা খাবারের প্লেটটি যেন সমস্ত কঠোরতার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা কোমলতার প্রমাণ বহন করছিল। প্রথমে সে স্থির করেছিল জুঁই না খেলে সেও আহার করবে না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে। একরোখা মেয়েটা হয়তো সত্যিই সারারাত ক্ষুধা পেটে কাটিয়ে দেবে। আর সেই চিন্তাই পুরুষটির হৃদয়ে এক অজ্ঞাত দায়িত্ববোধের সঞ্চার করেছিল। তাই নিজেই রান্নাঘর অবধি গিয়ে খাবার নিয়ে এসেছে।
গভীর পুরুষালি কণ্ঠে সে ডাকল,

“জুঁই?”
আচমকা কণ্ঠস্বর শুনে জুঁই কিঞ্চিৎ চমকে উঠল। ঘাড় বাঁকিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই আব্রাহামকে দেখতে পেল। প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়ে কন্যার দৃষ্টি কেমন থমকে গেল।
“জ্বি।”
আব্রাহাম ধীরস্থির ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো। টেবিলের উপর প্লেটটি নামিয়ে রাখল অত্যন্ত যত্নে। অতঃপর এক অপ্রত্যাশিত কোমলতায় জুঁইয়ের হাতদ্বয় নিজের করতলে আবদ্ধ করল।
স্পর্শটুকুতেই কেঁপে উঠল জুঁই। সংশয়ঘন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে?”
আব্রাহাম তাৎক্ষণিক উত্তর দিল না। বরং নীরবে তাকে বিছানায় বসিয়ে দিল। তারপর তার দু’হাত মুঠোয় পুরে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সেই দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত এক মমতা, যেন বহুদিনের অব্যক্ত অনুভূতির সঞ্চিত ভাষা।
অতঃপর নিম্নস্বরে বলল,
“মন খারাপ কেন, বোকা জুঁইয়ের?”

এই প্রশ্নটাই যেন জুঁইয়ের সমগ্র অস্তিত্বকে আলোড়িত করে দিল। জীবনে কখনো কেউ এত নিবিড়ভাবে তার মনের অস্থিরতা পড়তে চায়নি। আব্রাহামের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যত্নগুলোই তাকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত করে তোলে। লোকটা তো তাকে ভালোবাসে না তবে কেন এই মায়ার অভিনয়? কেন এত টান?
চোখদুটি ক্রমশ অশ্রুসজল হয়ে উঠল কন্যার।
আব্রাহাম ধীর ভঙ্গিতে তার গালে হাত রাখল। আঙুলের স্পর্শে যেন প্রশান্তির পরশ।
“বলবে না আমাকে?”
জুঁইয়ের অভিমান হঠাৎই শব্দের রূপ নিল। ভাঙা গলায় অভিযোগ করল,
“আপনি কেন জানতে চান? আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না! তাহলে আমি কেন আপনাকে বলব?”
প্রশ্নটি শুনে আব্রাহামের ওষ্ঠে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে পাল্টা প্রশ্ন করল,

“তুমি চাও আমি তোমাকে ভালোবাসি?”
এহেন প্রশ্নে স্তব্ধ হয়ে গেল জুঁই। হৃদস্পন্দন যেন আচমকাই বিশৃঙ্খল ছন্দে ধুকপুক করতে শুরু করল। কন্যার মনে হলো অসাবধানতাবশত সে কি নিজের গোপন অনুভূতিই প্রকাশ করে ফেলল?
ভীতসন্ত্রস্ত মুখখানা দেখে আব্রাহাম মৃদু হেসে উঠল। তার গাল ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“যদি আমি বলি, আমি তোমাকে ভালোবাসি?”
জুঁইয়ের সমগ্র দৃষ্টি বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। নিজের কর্ণকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে। আব্রাহাম… তাকে ভালোবাসে?
আব্রাহাম ধীর কণ্ঠে আবারও বলল,
“যদি বলি, কবুল বলার পর যে মেয়েটা কান্নাভেজা চোখে বলছিল ‘আমি যাবো না’ ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম?”
কথাগুলো যেন জুঁইয়ের হৃদয়ের গভীরে তীব্র আলোড়ন তুলল। বুকের ভেতর ধ্বনিত হতে লাগল অস্থির স্পন্দন।

“কি… কি বলছেন আপনি?”
আব্রাহাম মৃদু হাসল। তারপর স্নেহভরা ভঙ্গিতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে চুলগুলো এলোমেলো করে দিল।
“চলো, আগে খেতে হবে তারপর বলব।”
জুঁই এখনো হতচকিত। মূর্তির ন্যায় স্থির হয়ে বসে আছে। আব্রাহাম প্লেটটা হাতে তুলে নিয়ে তার পাশে বসল। তারপর আলতো করে গাল টেনে বলল,
“খিদে পেয়েছে। স্বামীকে অভুক্ত রাখছো, তোমার লজ্জা করে না মেয়ে?”
লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল জুঁইয়ের মুখশ্রী। সত্যিই তো সে কখনো ভাবেইনি আব্রাহাম না খেয়ে আছে।
কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত স্বরে বলল,
“আমি কি বলেছি আপনাকে না খেতে?”
আব্রাহাম কৌতুকমিশ্রিত ভঙ্গিতে হাসল।
“মাঝে মাঝে এসব করতে হয়, ম্যাডাম। মেয়েদের মন জয় করতে পুরুষদের নানান কৌশল অবলম্বন করতে হয়।”

তার অদ্ভুত মুখভঙ্গি দেখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফিক করে হেসে ফেলল জুঁই। সেই হাসিটুকু দেখেই যেন আব্রাহামের দৃষ্টিতে প্রশান্তির ছায়া নেমে এলো।
পরক্ষণেই সে নিজ হাতে জুঁইকে খাইয়ে দিতে শুরু করল।
জুঁই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল মানুষটার দিকে।
কেউ তাকে এতখানি স্নেহ, এতখানি মমতা আর এতখানি নিঃশব্দ ভালোবাসায় আগলে রাখবে এমন কল্পনা কোনোদিনও করেনি সে। সেই মুহূর্তে কন্যার মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত সুখ তার পদতলে কেউ সমর্পণ করেছে।

রজনীর গভীর প্রহরে প্রণয়ের আকস্মিক কল বেজে উঠতেই যেন অন্তঃস্থলে সঞ্চিত সুপ্ত অনুভূতির বিস্ফোরণ ঘটল ঝুমঝুমের! হৃদস্পন্দন আচমকাই বিশৃঙ্খল ছন্দে দুলে উঠল, যেন অদৃশ্য কোনো সুরের মূর্ছনায় নেচে উঠেছে তার সমগ্র সত্তা।
তবুও নিজেকে প্রবল কষ্টে সংযত করে, অধীর কম্পমান আঙুলে কলটি রিসিভ করল সে। মৃদু স্বরে বলল,
“হ্যাঁ প্রণয়, বলো। কেমন আছো?”
সদ্য স্নাত প্রণয়কে আজ অদ্ভুতরকম ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। ভেজা কেশগুচ্ছ এলোমেলোভাবে কপাল ছুঁয়ে আছে, অথচ সেই ক্লান্তির আবরণ ভেদ করেও তার কণ্ঠস্বর ছিল আশ্চর্য কোমল, প্রায় মোহাবিষ্ট করার মতো। সে ধীর স্বরে উচ্চারণ করল,

“আমি তো ভালোই আছি। তবে আমার মাশা কেমন আছে?”
‘আমার মাশা’ মাত্র দুটি শব্দেই যেন কিশোরীর অন্তঃকরণে ঝড় নেমে এলো। লজ্জায় অধর কেঁপে উঠল ঝুমঝুমের। কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল ক্ষীণ, স্নিগ্ধ, প্রায় অস্ফুট।
“মাশাও ভালো আছে।”
প্রণয়ের অধরে ধরা দিল এক অপার্থিব স্নিগ্ধ হাসি। সেই হাসিতে ছিল প্রশান্ত সন্ধ্যার মাদকতা, ছিল অদ্ভুত এক আবেশ, যা নিমেষেই ঝুমঝুমের সমস্ত স্থিরতা ভেঙেচুরে দিল।
লাজুক কণ্ঠে সে পুনরায় শুধোল,
“তা, হঠাৎ ফোন করলে? কিছু হয়েছে নাকি?”
প্রণয় ভ্রু নাচিয়ে কিঞ্চিৎ রসিকতার সুরে বলল,
“আমি বুঝি ফোন করতে পারি না?”
ঝুমঝুম প্রায় হকচকিয়ে গেল। দ্রুত অস্থির স্বরে বলল,

“না না, অবশ্যই পারো! কিন্তু রাতে তো কখনো ফোন করোনি। তাই ভাবলাম হয়তো বিশেষ কিছু হয়েছে!”
প্রণয় পাশের টেবিল থেকে এক গ্লাস জল তুলে নিল। ধীরে ধীরে গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে বলল,
“আসলে ভাবছিলাম তুমি কি কাল ইউনিভার্সিটিতে আসবে? তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল।”
‘কিছু কথা’ বাক্যযুগল যেন বজ্রাঘাতের মতো আছড়ে পড়ল ঝুমঝুমের বুকে।
মুহূর্তেই তার অন্তরে জন্ম নিল হাজারো অলীক সম্ভাবনা। তবে কি অবশেষে প্রণয় নিজের মনের গোপন অনুরাগ স্বীকার করবে? তবে কি এতদিনের অব্যক্ত অনুভূতির অবসান ঘটবে আগামীকাল?
তার বুকের ভেতর যেন সহস্র প্রজাপতির উন্মত্ত উড়াউড়ি শুরু হলো।কণ্ঠস্বর পুনরায় জড়িয়ে এলো।
“হ্যাঁ, কাল আমি ইউনিভার্সিটিতে আসছি।”
প্রণয় হালকা হাসল।
“ওকে, দেন সি ইউ টুমরো। বাই।”
“বাই।”

কল বিচ্ছিন্ন হতেই যেন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারল না ঝুমঝুম। হঠাৎ করেই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে উঠল সে। প্রিয় কাঠবিড়ালী পিউনিওকে কোলে তুলে ঘুরতে ঘুরতে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠল,
“পিউনিও বেবি রে! ফাইনালি,প্রণয় আমাকে নিজের মনের কথা বলতে চলেছে! আই অ্যাম সো হ্যাপি!”
তার হাসি, উচ্ছ্বাস আর চিৎকারে সমগ্র কক্ষ যেন প্রাণ ফিরে পেল। কিন্তু অবুঝ পিউনিও কিছুই বুঝল না। নিষ্পাপ প্রাণীটি কেবল বিস্মিত চোখে তার মালকিনের উচ্ছ্বাস দেখতেই থাকল। অথচ অদূরবর্তী ফেইরি ল্যান্ডের অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষে বসে থাকা আরেকজন পুরুষ সমস্তটাই প্রত্যক্ষ করছিল। ল্যাপটপের স্ক্রিনজুড়ে স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল ঝুমঝুমের কক্ষের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দৃশ্য।
হ্যাঁ, ঝুমঝুমের অজ্ঞাতসারেই তার কক্ষে হিডেন ক্যামেরা লাগিয়েছে শয্য। জুনেদ শয্য বাদশাহ।
কন্যাটি ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, তার ব্যক্তিগত জগতের প্রতিটি স্পন্দন কারও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অন্তরালে বন্দি হয়ে আছে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ধরল শয্য। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, শিরাগুলো স্পষ্ট ফুলে উঠল ক্রোধে। তার দৃষ্টিতে তখন উন্মত্ত অধিকারের বিষাক্ত দীপ্তি।
রূঢ়, কর্কশ কণ্ঠে সে উচ্চারণ করল,
“দিস ইজ নট ফেয়ার, ঝুম আমি ভীষণ উন্মাদ। এত সহজে তোমাকে ছাড়ছি না।”
তার তপ্ত নিঃশ্বাস কক্ষের ভারী নীরবতায় মিশে গেল।
পরক্ষণেই ফোনটি হাতে তুলে নিল সে। চোখেমুখে তখন বিপজ্জনক এক পরিকল্পনার ছায়া।
অতঃপর একটি নাম্বারে কল করল।

ডাইনিং টেবিল সাজাতে ব্যস্ত ছিল মেহরিমা। থালাবাসনের মৃদু শব্দে মুখরিত পরিবেশে হঠাৎ ফোনে আসা একটি বার্তা তাকে বিস্মিত করে তুলল। ঠিক তখনই ফ্রেশ হয়ে ডাইনিংয়ে প্রবেশ করল রাকিব।
মেহরিমাকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে কপাল কুঁচকে বলল,
“কি হয়েছে মেহু? এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
মেহরিমা এখনও বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
ধীর স্বরে বলল,
“শয্য ভাইয়া ম্যাসেজ করেছেন।”
রাকিব যেন তার থেকেও অধিক বিস্মিত হয়ে উঠল।
“সত্যি?”
মেহরিমা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।
রাকিব তৎক্ষণাৎ তার নিকটে এসে উৎকণ্ঠিত স্বরে শুধোল,
“কি লিখেছে?”

মেহরিমা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর ভাবুক কণ্ঠে বলল,
“লিখেছে, কাল সকাল সকাল যে করেই হোক মাশাকে যেন আমি আমার কাছে নিয়ে আসি। আর পুরো দিন ওকে আমার কাছেই রাখি।”
রাকিবের কপালে মুহূর্তেই উৎকণ্ঠার গাঢ় রেখা ফুটে উঠল।
তার স্বর হয়ে উঠল সংশয়াচ্ছন্ন।
“কিন্তু কেন?”
মেহরিমার কাছেও কোনো উত্তর নেই। সে নিজেও বুঝতে পারছে না হঠাৎ করে শয্যের এমন অদ্ভুত নির্দেশের অন্তর্নিহিত কারণ কী। উগ্র, একরোখা, বেপরোয়া সেই পুরুষটি হঠাৎ কেন মাশাকে নিজের নিকট চাইল?
নাকি এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস!

রাজিব বাদশাহর হৃদয়ে কোনোদিনই জেসমিন বাদশাহর জন্য ভালোবাসা কিংবা অনুরাগের জন্ম হয়নি। তিনি বিয়েটা করেছিলেন নিছক মাতৃ-আদেশ রক্ষার্থে।
হেনা বাদশাহ জীবদ্দশায় জেসমিন বাদশাহকে ভীষণ পছন্দ করতেন। তিনি বহু বছর আগেই জেসমিন বাদশাকে ছেলের বউ হিসেবে মনোনীত করে রেখেছিলেন। সেই ইচ্ছের পরিপূর্ণতাতেই একদিন ঘটা করে জেসমিনের সঙ্গে রাজিব বাদশাহর বিবাহ সম্পন্ন হয়।
কিন্তু সেই বিয়ে রাজিব বাদশাহর কাছে ছিল নিছক এক বন্ধন, যার প্রতি তার কোনো আবেগ ছিল না।
বরং তার অন্তরে জমেছিল এক নীরব ক্ষোভ। জেসমিন বাদশাহ ছিলেন সৌন্দর্য, শিক্ষাদীক্ষা, আচার-ব্যবহার সবদিক থেকেই পরিপূর্ণ। শৈশব থেকে পুতুলের মতো আগলে বড় করা হয়েছে তাকে। এমন একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে অনেক পুরুষ নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করত।
তবুও রাজিব বাদশাহর মন জয় করতে পারেননি তিনি।
কারণ তার হৃদয়ে তখন অন্য কারও বসবাস।
সুনন্দা।

নিজের পছন্দের মানুষটিকেই তিনি গোপনে বিয়ে করে আরেকটি সংসার গড়ে তুলেছিলেন।আর সেই গোপন সংসারেরই সন্তান আব্রাহাম।সত্যিটা জানার পর যেন আব্রাহামের পৃথিবীটাই বদলে গিয়েছিল।
যে মানুষটিকে সে এতদিন আদর্শ বাবা বলে জেনেছে, সেই মানুষটাই দুটি নারীর জীবনকে সমান্তরালভাবে ভেঙে চুরমার করেছে এই সত্য তাকে ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করে তুলেছিল।
রাজিব বাদশাহকে সে সহ্য করতে পারত না।একটা অদ্ভুত বিতৃষ্ণা, এক গভীর অভিমান তাকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খেতে লাগল।মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিল সে।
তবে সুনন্দা সহজে ছেলেকে নিজের থেকে দূরে যেতে দেননি। কখনও কান্নাকাটি, কখনও অসহায়ত্বের অভিনয়, কখনও মায়ের দোহাই দিয়ে নানা কৌশলে তিনি আব্রাহামকে নিজের কাছেই বেঁধে রেখেছিলেন।
সময় গড়াতে লাগল।আর সেই সময়ের সঙ্গেই আব্রাহাম জানতে পারল শয্যের কথা।জানল, ছেলেটা কেমন চুপচাপ।

কেমন নিজেকে গুটিয়ে রাখতে ভালোবাসে।জানল, খুব ছোট বয়স থেকেই সে হোস্টেলে মানুষ হয়েছে।আরও জানল, তার সেই নিশ্চুপ, রুক্ষ, জেদি ছেলেটাই আসলে তার আপন ছোট ভাই।তার চেয়ে মাত্র দুই বছরের ছোট।
প্রতিবার এই কথাটা ভাবলেই আব্রাহামের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠত।
তাহলে সেই কারণেই কি কক্সবাজারে প্রথম দেখাতেই ছেলেটাকে এত আপন লেগেছিল?তাই কি তার রাগ, অভিমান, নির্লিপ্ততাও এত পরিচিত মনে হয়েছিল?
হয়তো র’ক্তের টান বলে সত্যিই কিছু আছে।তখনও শয্য হোস্টেলেই থাকত।ছুটি শেষ হতেই আবার ফিরে গিয়েছিল সেখানে।একদিন হঠাৎ জেসমিন বাদশাহ ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। দুদিনের জন্য ছেলেকে বাড়ি নিয়ে আসবেন বলে।
সেদিন আব্রাহামও গিয়েছিল তার সঙ্গে।জেসমিন বাদশাহ প্রতিবার ছেলের সঙ্গে দেখা করতে এসে যে পার্কটিতে বসতেন, সেদিনও সেখানেই গিয়েছিলেন।আব্রাহাম ইচ্ছা করেই গিয়েছিল।সে চেয়েছিল, ওরা তাকে দেখুক।
চেয়েছিল, অন্তত একবার ছোট ভাইটাকে একটু কাছ থেকে দেখতে।
পার্কে পৌঁছাতেই জেসমিন বাদশাহ বিস্মিত হয়ে বললেন,

“আরে তুমি? তুমি এখানে কী করছো?”
আব্রাহাম মৃদু হেসে ফেলল।কক্সবাজারেই মানুষটাকে দেখেই তার ভেতরটা চিনে ফেলেছিল সে।কী অদ্ভুত নির্মল এই নারী!মুখজুড়ে সবসময় কোমল এক স্নেহের আভা।
তার উপস্থিতিই যেন আশেপাশের মানুষকে শান্ত করে দেয়।
আব্রাহাম হালকা হাসি টেনে বলল,
“এমনি এসেছি বন্ধুদের নিয়ে। আপনি বুঝি শয্যের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?”
জেসমিন বাদশাহ স্নেহভরা হাসলেন।অতঃপর এগিয়ে এসে আব্রাহামের গালে আলতো করে হাত রেখে বললেন,

“হ্যাঁ, বাচ্চা।”
‘বাচ্চা’ শব্দটা শুনে বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল আব্রাহামের।কত সহজে, কত আপন করে ডাকলেন মানুষটা! সে ধীরে ধীরে দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকাল শয্যের দিকে।
ছেলেটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।মুখভর্তি গম্ভীরতা।
দুটি হাত পকেটে গুঁজে ভোঁতা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। দৃশ্যটা দেখে আব্রাহামের অকারণেই হাসি পেয়ে গেল। অদ্ভুত এক মায়া জন্মাল তার।
প্রচণ্ড ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে বলতে,
“শোন, আমি তোমার বড় ভাই। তোমার আপন না হলেও তো বড় ভাই!”
কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না।
জেসমিন বাদশাহ ব্যাগ থেকে নানা রকম খাবার বের করতে লাগলেন।
“দেখো বাবু, তোমার পছন্দের কেক এনেছি।”
শয্যের নিস্তেজ চোখ দুটো মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
কিশোরটি ছোট্ট একটা হাসি দিল।সেই হাসিটুকু দেখে আব্রাহামের বুকের ভেতর যেন কেমন করে উঠল।
আশ্চর্য!একটু আগে পর্যন্ত ছেলেটাকে নির্জীব লাগছিল, আর এখন তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ মনে হচ্ছে!
সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ শয্য তার দিকে কেকের বাক্স বাড়িয়ে দিল।

“খাবেন?”
আব্রাহাম বিস্মিত হয়ে বলল,
“আমাকে দিচ্ছ?”
“হুঁ।”
“কেন?”
শয্য ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল,
“খেতে ইচ্ছে করছে না নাকি?”
আব্রাহাম আর নিজেকে সামলাতে পারল না। অকারণে তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো। সে কেকটা নিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“থ্যাংক ইউ, বাডি।”
শয্য কিছুই বুঝল না। শুধু মাথা নাড়ল। আব্রাহাম?
সে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল কিশোরটির দিকে। মনে মনে শুধু একটাই কথা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল,
“তুই জানিস না শয্য, আমি তোর থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অপরিচিত মানুষ নই। আমি তোর বড় ভাই। তোর নিজের মানুষ!”

পার্কের পশ্চিম প্রান্তের বেঞ্চটাতে পাশাপাশি বসে আছে তিনজন। বিকেলের সোনালি রোদ গাছের পত্রপল্লব ভেদ করে এসে পড়ছে তাদের গায়ে। চারিদিকে শিশুরা দৌড়ঝাঁপ করছে, কেউ বেলুন হাতে ছুটছে, কেউবা আইসক্রিম নিয়ে ব্যস্ত। অথচ এই কোলাহলের মাঝেও শয্য যেন সম্পূর্ণ আলাদা এক জগতের বাসিন্দা। সে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে, হাতে ধরা কেকের ছোট্ট টুকরোটা ধীরেসুস্থে খাচ্ছে।
জেসমিন বাদশাহ ছেলের চুলগুলো আলতো করে ঠিক করে দিয়ে মমতাভরা গলায় বললেন,
“হোস্টেলে খুব কষ্ট হয় বাবু?”
শয্য কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু স্বরে বলল,

“না।”
“মিথ্যে বলছিস?”
ছেলেটা এবার মায়ের দিকে তাকালো। ওই চোখ দুটোতে কেমন যেন ক্লান্তির ছাপ।
“আপনি কষ্ট পাবেন বলে বলি না।”
কথাটা শুনেই জেসমিন বাদশাহর বুকটা হুহু করে উঠল। চোখ জোড়া ছলছল করে উঠল তার।
“আমার ছেলে এত বড় হয়ে গেছে যে মায়ের কষ্টের কথাও ভাবতে শেখে!”
শয্য বিব্রত হয়ে গেল। মায়ের চোখে জল সে একদমই সহ্য করতে পারে না।
“আপনি কাঁদবেন না, প্লিজ!”
আব্রাহাম স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।একটা পনেরো বছরের ছেলে, যার বয়সে দুষ্টুমি করার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে হৈচৈ করার কথা, সে কিনা নিজের কষ্ট গোপন করে শুধু মাকে হাসানোর চেষ্টা করছে!তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
জেসমিন বাদশাহ নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,

“ঠিক আছে, কাঁদব না। এবার বল তো, পড়াশোনা কেমন চলছে?”
“ভালো।”
আব্রাহাম এবার শব্দ করে হেসে উঠল।ছেলেটার প্রতিটা কথা যেন তাকে আরও বেশি টেনে নিচ্ছে।
সে একটু ঝুঁকে এসে বলল,
“তোমার কোনো বন্ধু নেই?”
“নেই।”
“কেন?”
“ভালো লাগে না।”
“একাই থাকো?”
“হুঁ।”

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২০

আব্রাহামের হঠাৎ খুব কষ্ট হলো।এত অল্প বয়সে কেউ এতটা একা কিভাবে হয়? সে মৃদু গলায় বলল,
“তাহলে আজ থেকে আমি তোমার বন্ধু?”
শয্য কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। আব্রাহাম থমকে গেল ওই চাহনিতে!

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২২