Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২০

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২০

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২০
ফারহানা নিঝুম

জিয়ানের উচ্চারিত বাক্যসমূহ মুহূর্তেই উপস্থিত সকলের কর্ণকুহরে তীব্র অভিঘাতের ন্যায় প্রতিধ্বনিত হলো। পরিবেশজুড়ে নেমে এলো স্তব্ধ বিস্ময়ের আবরণ। মেহবুব ও হিউন জে দু’জনেই অবিশ্বাসে বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে রইল জিয়ানের মুখপানে।
হঠাৎই মেহবুব প্রবলভাবে কেশে উঠল। হিউন জে তৎক্ষণাৎ পাশের টেবিল হতে পানির গ্লাস তুলে এনে তার দিকে বাড়িয়ে দিল। কয়েক ঢোক পানি পান করে মেহবুব এখনও কিংকর্তব্যবিমূঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,
“ওয়েট, ওয়েট! জিয়ান, তুই কি বলছিস বুঝতে পারছিস? মানে… মাশা আর শয্য?”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট বিস্ময়ের কম্পন। যেন সমস্ত হিসাব-নিকাশ মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে গেছে। থতমত খেয়ে পুনরায় বলল,

“শয্য মাশাকে পছন্দ করে? সিরিয়াসলি? ব্রাদার, মাশা তো শয্যের বোন! কি বলিস হিউন জে?”
হিউন জে কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় নিমগ্ন রইল। অতঃপর ধীরস্বরে বলল,
“ঝুমঝুম কিন্তু শয্যের আপন বোন নয়। সেদিন নিজেই তো বলল, ও শয্যের চাচার মেয়ে। সেই হিসেবে অনুভূতি জন্মানো অস্বাভাবিক কিছু না।”
মেহবুব যেন ভাষাহীন হয়ে পড়ল। বিস্ময়ের চরম সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে সে। অন্যদিকে জিয়ান স্বভাবসিদ্ধ নির্লিপ্ততায় ঠোঁট সামান্য নাড়িয়ে বলল,
“আমি নিজ চোখে ওর ফোনে মাশার ছবি দেখেছি। একটা-দুটো না পুরো একটা ফোল্ডার জুড়ে প্রায় পাঁচ হাজার ছবি। ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত মাশার প্রতিটা মুহূর্ত জমিয়ে রেখেছে।”
বাক্যটি শুনে মেহবুবের অন্তর্দৃষ্টি যেন আচমকা সজাগ হয়ে উঠল। সন্দেহমিশ্রিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে শয্য সবসময় মাশাকে এভাবে ধমকায় কেন?”
জিয়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে একই নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিল,

“আই থিংক ও নিজের অনুভূতিটা স্বীকার করতে চাইছে না।‌ শয্য ভীষণ একরোখা। নিজের হৃদয়ের সত্যিটা ও সহজে মেনে নেবে বলে মনে হয় না।”
মুহূর্তকাল নীরব থেকে হঠাৎই মেহবুবের ওষ্ঠে কৌতুকমিশ্রিত বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ভ্রুযুগল নাচিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল,
“তাহলে সবার আগে শয্যের মুখ দিয়েই স্বীকার করাতে হবে, মাশার জন্য ওর ভেতরে আসলে কী অনুভূতি লুকিয়ে আছে।”
জিয়ান কিঞ্চিৎ সংশয়ভরা কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“আর সেটা করবি কীভাবে সম্ভব?”
মেহবুবের হাসি আরও প্রশস্ত হলো। দৃষ্টিতে ফুটে উঠল দুষ্টুমিভরা আত্মবিশ্বাস।
“দেখ এবার এই মেহবুব নিজের ‘মেহবুবা’ কিভাবে বানায় মাশাকে!”

বাড়ির প্রাঙ্গণের সম্মুখে গাড়িটি থামাতেই শয্য ইঞ্জিন নিস্তব্ধ করল। নামার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই অনভিপ্রেত বিপর্যয় ঘটল ঝুমঝুমের উঁচু জুতোর বক্রতায় ভারসাম্যচ্যুত হয়ে মচকে গেল তার পা। তীব্র যন্ত্রণায় ক্ষীণ আর্তনাদ বেরিয়ে এলো ওষ্ঠফাঁক গলে।
“আহ্…
শব্দটি শ্রবণমাত্রই শয্যের সমগ্র অবয়বে শঙ্কার কম্পন বয়ে গেল। তড়িঘড়ি অপর পার্শ্বের দরজা ঠেলে নেমে প্রায় ব্যগ্র পদক্ষেপে ছুটে এলো সে। উৎকণ্ঠা মিশ্রিত কণ্ঠে জিজ্ঞাস করল,
“কোথায় ব্যথা পেয়েছিস? দেখি।”
বেদনায় ঝুমঝুমের নয়নযুগল সংকুচিত হয়ে এলো। শয্য তার সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বসে অতীব সতর্কতায় ডান পা-খানি নিজের করতলে তুলে নিল। পা দুটি অপসারণ করে নিবিড় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল আঘাতপ্রা’প্ত স্থান।
অপ্রত্যাশিত সেই স্পর্শে যেন সমগ্র অস্তিত্বে অনির্বচনীয় এক সঞ্চরণ জেগে উঠল ঝুমঝুমের। শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ল অজ্ঞেয় এক শিহরণ, যেন সুপ্ত অনুভূতিরা আচমকা জাগরণে উন্মুখ হয়েছে। বক্ষগহ্বরে হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক ছন্দে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল; কণ্ঠনালী শুষ্ক, নিঃশ্বাস অসংলগ্ন। শয্যের আঙুল যেখানে স্পর্শ রেখেছে, সেই স্থান যেন অবশ মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে আছে।
এ কেমন অনুভূতি? অন্তর্গত প্রশ্নে বিচলিত হয়ে ওঠে সে। পূর্বে কখনো এমন অনভিজ্ঞ আবেগের সম্মুখীন হয়নি ঝুমঝুম। গোলাপাভ অধর কেঁপে ওঠে, প্রশ্বাস-প্রশ্বাসে জন্ম নেয় অকারণ অস্থিরতা। ঠিক সেই সময় কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হয় শয্যের কণ্ঠ সামান্য ব্যতিব্যস্ত, তবু আশ্বাসস্নিগ্ধ।
“ঠিক আছিস তুই?”

শব্দগুলো যেন সুদূর কোনো আবেশময় স্থান থেকে ভেসে আসে। অথচ তার অর্থ উপলব্ধির পূর্বেই ঝুমঝুমের দৃষ্টি আটকে যায় শয্যের মুখাবয়বে। কী বিস্ময়কর সুদর্শন সে! নির্মিতির সূক্ষ্মতায় যেন ভাস্কর্যের ন্যায় নিখুঁত অবয়ব; শুভ্র আভাময় বর্ণ, চাহনিতে দুর্বোধ্য আকর্ষণ, ঘাড়সমান দীর্ঘ চুলগুলো বাতাসে আন্দোলিত হয়ে তাকে দিয়েছে দুর্লভ এক ব্যক্তিত্ব।
অবচেতনেই নিজের সঙ্গে তুলনা টানে ঝুমঝুম। কোথাও যেন সামঞ্জস্য খুঁজে পায় না। শয্য সুদর্শন আর সে? তার পাশে যেন বিবর্ণ, অনুজ্জ্বল এক ছায়ামাত্র।
ঝুমঝুমের নীরবতা দীর্ঘায়িত হতে দেখে শয্যের কণ্ঠে বিরক্তির সূক্ষ্ম রেখা ফুটে উঠল। ক্ষুব্ধ কন্ঠে শুধোয়,
“তোকে কিছু জিজ্ঞেস করছি আমি।”
চমকে উঠল ঝুমঝুম। থতমত খেয়ে উচ্চারণ করল,
“কি… শয্য ভাই?”
শয্যের নয়নে বিরক্তির ছায়া গাঢ় হলো। তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

“এক থাপ্পড়ে সব মনে করিয়ে দেব! এই পায়ে এগুলো পরেছিস কেন? কলেজে যাওয়ার উপযোগী জুতো এগুলো? এগুলো পড়ে কেউ?”
মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে গেল ঝুমঝুম। অকারণ ভর্ৎসনায় বুকে জমাট বাঁধল ক্ষীণ অভিমান। সে তো কোনো প্রতিবাদই করেনি, তবু তিরস্কার যেন তারই নিয়তি।
শয্যের দৃষ্টি নেমে এলো তার পায়ে। সোনালি নূপুরটি বাতাসে মৃদু দোল খাচ্ছে, সূর্যালোকে ঝলসে উঠছে তার ক্ষুদ্র অলংকার। রক্তাভ নেইলপলিশে রঞ্জিত নখগুলো অদ্ভুতভাবে আকর্ষণ করল তাকে। ক্ষণিকের জন্য মনোযোগ স্থির হয়ে রইল সেখানে। শুকনো ঢোক গিলে মুখখানি আলতো ঘষে নিয়ে সে নরম স্বরে বলল,
“এখন কেমন লাগছে?”

ঝুমঝুম নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। লজ্জা, সংকোচ আর অজ্ঞেয় কম্পনের মিশ্রণে তার চাহনি অনির্দেশ্য হয়ে উঠেছে। স্পর্শের স্মৃতি যেন এখনও ত্বকের গভীরে অনুরণিত। নিজের ওপরই বিরক্তি জন্মায় তার। প্রিয়ার বলা কথাগুলো শোনার পর থেকেই এ ধরনের অসংলগ্ন ভাবনা তাকে আচ্ছন্ন করছে।
তার ভাই মানে ভাই সমস্ত সম্পর্কের সীমানা তো অভিন্ন হওয়ার কথা।
কী অশোভন ভাবনা! যদি শয্য জানতে পারে, নিশ্চয়ই তীব্র ঘৃণা করবে। আর সেটাই স্বাভাবিক। ভাই মানুষটিকে এভাবে নিরীক্ষণ করা কি শোভন?
নিজেকে সংযত করে দাঁড়িয়ে পড়ল ঝুমঝুম। অতিশয় মৃদু স্বরে বলল,
“থ্যাংক ইউ।”
বাক্যশেষে আচমকাই থমকে গেল সে। আজ ‘ভাইয়া’ শব্দটি কেন উচ্চারিত হলো না? শয্য তখনও অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার হ্যাজেলবর্ণ চক্ষুদ্বয়ে যেন অস্পষ্ট কোনো প্রশ্ন স্থির হয়ে আছে। ঝুমঝুমের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য সেখানে আবদ্ধ রইল, অতঃপর আকস্মিক অস্বস্তিতে দৃষ্টি সরিয়ে দ্রুত পদক্ষেপে ভিতরের দিকে চলে গেল।
শয্য হালকা হাসলো। এলোমেলো চুলগুলোতে আঙ্গুল বুলিয়ে বলল,
“যে আমি কারও কথা শুনি না, কারও সামনে মাথা নত করি না, সেই আমাকেই আজ তুই নিজের পায়ের কাছে ঝুঁকে বসতে বাধ্য করলি, ঝুম।”
অদূরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জুঁই সমগ্র দৃশ্যটি গভীর ভ্রুকুঞ্চনে পর্যবেক্ষণ করছিল। তার অন্তর্দৃষ্টি বলছে বিষয়টি নিতান্তই স্বাভাবিক নয়; কোথাও যেন অদৃশ্য কোনো সংশয়ের সূচনা রচিত হচ্ছে।

“নেক্সট উইকে আমাদের বাংলাদেশের ফ্লাইট।”
জেসমিন বাদশাহর কণ্ঠস্বর ডাইনিং স্পেসজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতেই আব্রাহাম এক পলকের জন্য দৃষ্টি স্থির করল জুঁইয়ের ওপর। মেয়েটি নৈঃশব্দ্যের আবরণে নিজেকে ঢেকে সকলের প্লেটে খাবার পরিবেশন করে চলেছে; মুখাবয়বে প্রশান্তির আবরণ থাকলেও অন্তর্লীন ক্লান্তি স্পষ্ট।
অন্যদিকে ঝুমঝুম উৎসুক দৃষ্টিতে সকলের মুখ পর্যবেক্ষণ করছে। তার চোখেমুখে লুকোনো উচ্ছ্বাস স্পষ্ট। সেও যেতে চায় বাংলাদেশে। দীর্ঘ তিন বছর হয়ে গেছে মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করেনি সে। স্মৃতির টানে হৃদয়ের ভেতর হাহাকার জমেছে বহুদিন।
ঠিক তখনই রাজিব বাদশাহ গম্ভীর ভঙ্গিতে স্ত্রীর উদ্দেশে বললেন,

“তাহলে আর কি! এবারে গিয়ে না হয় আজগর চৌধুরীর সঙ্গে বিজনেস ডিলটা ফাইনাল করে ফেলব।”
বাক্যটি শ্রবণমাত্রই জুঁইয়ের অন্তর যেন হঠাৎ কেঁপে উঠল। ক্ষণিকের জন্য ভড়কে গেল সে। বিজনেস ডিল। শব্দদ্বয় কর্ণকুহরে অদ্ভুত তীক্ষ্ণতায় বিঁধল। হ্যাঁ, ডিলই তো! তাকে কি আদৌ কন্যা হিসেবে দেখা হয়েছে কখনও? নাকি নিছক পারিবারিক স্বার্থসিদ্ধির এক সমঝোতা মাত্র?
চোখের কোণে অদৃশ্য বিষণ্নতার ছায়া জমল। মুহূর্তেই খাবারের প্রতি সমস্ত রুচি বিলীন হয়ে গেল তার।
নীরবে সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হতেই জেসমিন বাদশাহ বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“একি জুঁই! তুমি চলে যাচ্ছো কেন? খাবে না?”

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৯

আচমকা প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল জুঁই। ওষ্ঠপ্রান্তে জোরপূর্বক এক ক্ষীণ হাসির রেখা টেনে মৃদুস্বরে বলল,
“আসলে,, আমার খিদে নেই। মাথাটা খুব ব্যথা করছে। একটু বিশ্রাম নেব।”
জেসমিন বাদশাহ আর কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই দ্রুত পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল সে।
জুঁইয়ের মনের অবস্থাটা সম্ভবত একমাত্র আব্রাহামই অনুধাবন করতে সক্ষম হলো। গভীর দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ সিঁড়িপানে তাকিয়ে থেকে সেও নীরবে খাবার অসমাপ্ত রেখেই উঠে গেল।
ছেলে মেয়ে দু’জনের এমন আচরণে বিস্মিত হয়ে রইলেন বাকিরা। আর তারা বাদশাহ বিরক্তিতে নাক কুঞ্চিত করে কেবল একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন,
“যত্তসব!”

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২১