Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৯

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৯

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৯
ফারহানা নিঝুম

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিস্তীর্ণ নীলাভ জলরাশির পাশে প্রথমবারের মতো আব্রাহামের পরিচয় হয় এক কিশোরের সঙ্গে। বয়স আনুমানিক পনেরো। অস্বাভাবিক রকম শান্ত, নিঃসঙ্গ, আর অন্তর্মুখী।
আব্রাহাম তখন নিজের কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে সমুদ্রভ্রমণে এসেছে। কয়েকদিন পরই তার জন্মদিন সেই উপলক্ষে পুরো ব্যাচ মিলে এই সফরের আয়োজন।
তাদেরই হোটেলে একই সময়ে আরেকটি পরিবার অবস্থান করছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, তারা আনন্দে ভাসছে। কিন্তু সেই পরিবারের ভেতরে একটি ছেলের চোখে ছিল গভীর বিষণ্নতা যেন সে ভিড়ের মাঝেও সম্পূর্ণ একা।
আব্রাহাম কৌতূহলবশত এগিয়ে গিয়ে বলল,

“হাই!”
কিশোরটি, অর্থাৎ শয্য, কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে রইল। দৃষ্টি যেন ভেদ করে যাচ্ছিল অপরিচিত মানুষটিকে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ ফিরিয়ে নিল সমুদ্রের দিকে।
আব্রাহাম তার পাশে এসে দাঁড়াল। গভীর, অনুসন্ধিৎসু কণ্ঠে বলল,
“তুমি এখানে ঘুরতে এসেছ?”
শয্যের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের রেখা ফুটে উঠল। বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে জবাব দিল,
“দেখতেই তো পাচ্ছেন আমি দাঁড়িয়ে আছি। তার মানে ঘুরতেই এসেছি।”
এই কর্কশ উত্তরে আব্রাহামের ঠোঁট বাঁকা হাসিতে ভরে উঠল। ছেলেটার আচরণ রূঢ় হলেও তার ভেতরে এক অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করল সে।অচিরেই আব্রাহাম জানতে পারল, এই সফর আসলে শয্যের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত। তার মা তাকে নিয়ে এসেছেন একটু আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যে।
তখনই তাদের নজরে আসে সেই নারী জেসমিন বাদশাহ।
তার নাম শুনে আব্রাহাম কিছুটা বিস্মিত হয়। আব্রাহাম নিজেও পরিচয় দেন,

“আমি আব্রাহাম বাদশাহ।”
এই পরিচয় বিনিময়ের মাঝেই আরও একটি ঘটনা তাকে চমকে দেয়।জেসমিন বাদশাহ তার স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গিয়ে হঠাৎই উচ্চস্বরে বলে উঠলেন “রাজিব!”
এই নামটি শুনেই আব্রাহামের চোখে অদ্ভুত এক চমক খেলে গেল। কারণ তার বাবার নামও ঠিক একই রাজিব বাদশাহ।
এক মুহূর্তেই তার মনে প্রশ্নের ঢেউ আছড়ে পড়ল।
এত মিল কীভাবে সম্ভব? একই নাম, একই পদবি নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো অজানা সম্পর্ক, যা এতদিন তার দৃষ্টির আড়ালে ছিল?

“তুমি বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী, মা?”
আব্রাহামের প্রশ্নটি সুনন্দার বক্ষস্থলে যেন বিদ্যুৎগতিতে আঘাত হানল। তিনি মুহূর্তেই থমকে গেলেন চোখের দৃষ্টি এদিক-ওদিক সরে যায়, কণ্ঠে জড়তা নেমে আসে। বিস্ময়, আতঙ্ক এবং একধরনের অপরাধবোধ মিশে তাঁর মুখাবয়ব পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওঠে।
তিনি অস্পষ্ট স্বরে বললেন,
এ… এসব কী বলছিস তুই, আব্রাহাম?”
নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর ব্যর্থ প্রয়াসে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে সরে যাওয়ার ভান করলেন তিনি। কিন্তু আব্রাহামের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়ল না। সে আরও কঠোর কণ্ঠে বলে উঠল,
“তাহলে জেসমিন বাদশাহ কে, মা? আর জুনেদ শয্য বাদশাহ ওরা কারা?”
সুনন্দা নিস্তব্ধ। যেন বাকশক্তি হরণ হয়ে গেছে তাঁর। ঠোঁট নড়ে, কিন্তু শব্দ বের হয় না। ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির দরজা খুলে প্রবেশ করলেন রাজিব বাদশাহ। ছেলেকে বহুদিন পর দেখে তাঁর মুখে আনন্দের ঝলক ফুটে উঠল। স্নেহভরা স্বরে এগিয়ে এসে বললেন,

“হেই চ্যাম্পিয়ন, হোয়াটস আপ?”
তিনি আলিঙ্গন করতে এগিয়ে গেলে আব্রাহাম হঠাৎই এক পা পিছিয়ে গেল চোখে তীব্র বিতৃষ্ণা।
“দূরে থাকো। তুমি আমার বাবা না।”
ঘরে নেমে এলো শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা।সুনন্দা তৎক্ষণাৎ ধমকের স্বরে বললেন,
“আব্রাহাম! বাবার সাথে কীভাবে কথা বলছিস?”
আব্রাহাম ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ আর অবিশ্বাস স্পষ্ট।
“বাবা? উনি আমার বাবা? ছি,,আমার তো নিজেকেই ঘৃণা হচ্ছে এটা বলতে।”
এই কথার পরপরই হঠাৎই বিকট শব্দে রাজিব বাদশাহ তাঁর গালে চড় বসালেন। আব্রাহাম এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল এটাই প্রথমবার, যখন সে তার বাবার হাতে আঘাত পেল। চোখে বিস্ময়, বুকে অপমান। তবুও সে ভাঙল না; বরং আরও কঠিন কণ্ঠে বলল,
“নিজের পরিবারকে প্রতারণা করে অন্য নারীর সাথে ঘর বাঁধা এটাই কি আপনার বাবার পরিচয়? তবে এমন বাবা আমার চাইনা!”
সুনন্দা তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে ছেলেকে থামালেন। কণ্ঠে আতঙ্ক মেশানো কঠোরতা,
“চুপ কর, আব্রাহাম! বড়দের মতো কথা বল। এখনই ঘরে যাও!”
সেদিনের পর থেকে আব্রাহাম আর আগের মতো চঞ্চল নেই! তার চঞ্চলতা অকস্মাৎ মিলিয়ে গেছে নিজের বাবার চরম সত্যির নিচে!

“আব্রাহাম? আব্রাহাম, আপনি এভাবে ঘামছেন কেন? কী হয়েছে আপনার?”
জুঁইয়ের কণ্ঠে ছিল উদ্বেগের কোমলতা, কিন্তু আব্রাহামের ভেতরের অস্থিরতা তখন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। সে যেন নিজের মধ্যেই আটকে থাকা কোনো অতল গহ্বরে দাঁড়িয়ে আছে।ডাক শুনেই সে বাস্তবতায় ফিরে এলো।
চমকে উঠল।দৃষ্টি সরে গেল ধীরে ধীরে সামনে থেকে জুঁইয়ের দিকে। মেয়েটা তার হাত শক্ত করে ধরে আছে যেন ছেড়ে দিলেই সে ভেঙে পড়বে।
ল্যাপটপের পর্দায় তখনও জ্বলজ্বল করছে একটি ছবি। অস্পষ্ট আলোয় ধরা পড়া সেই ফ্রেম যেখানে আব্রাহাম আর শয্য একসাথে। একমাত্র সেই ছবিটাই সে এতদিন ধরে লুকিয়ে রেখেছিল, আঁকড়ে ধরেছিল নিজের পরিচয়ের শেষ অবলম্বন হিসেবে।

“কী হয়েছে আপনার, আব্রাহাম?”
জুঁই আবার জিজ্ঞেস করল।আব্রাহাম দ্রুত হাত বাড়িয়ে ল্যাপটপের ঢাকনা বন্ধ করে দিল।
এক ঝটকায়। তার কণ্ঠ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, “কিছু না, জুঁই।”
কিন্তু সেই “কিছু না” শব্দটার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল হাজারটা না বলা সত্য, ভাঙা স্মৃতি আর অস্থিরতা।
জুঁই এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল তার দিকে। তার মনে হলো এটা কোনো সাধারণ অস্বস্তি নয়। এটা এমন কিছু, যেটা মানুষ লুকায় তখনই যখন সে একা হয়ে যেতে চায়।
আব্রাহাম ধীরে ধীরে উঠে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
ঠিক তখনই জুঁই আবার বলল,
“আপনি কি কোনো বিষয়ে চিন্তিত, আব্রাহাম?”
এই প্রশ্নটা যেন তার চলার গতি থামিয়ে দিল না, কিন্তু ভেতরের সব ভার আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।
তার বুকের ভেতরটা মুহূর্তে দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো।
কিঞ্চিৎ বিপরীত নিয়ে বলল,

“জুঁই?”
জুঁই ওই ব্যথাতুর কন্ঠস্বর শুনে জবাব দিলো,
“জ্বি?”
আব্রাহাম অদ্ভুত হেসে বলল,
“চলুন সংসার করি!”
জুঁই নিশ্চুপ, বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আব্রাহামের দিকে। লোকটা ভেতরের অশান্তি লুকোতে এভাবে দুষ্টুমি করছে!
আব্রাহামের ভেতরের কণ্ঠ চিৎকার করতে চাইছিল, বলতে চাইছিল,
“জুঁই, আমি এমন এক মায়ের সন্তান, যে অন্য এক নারীর ঘর ভেঙে নিজের সংসার সাজিয়েছে। আর আমি সেই ভাঙা সংসারেরই অনিচ্ছাকৃত পরিণতি।”
কিন্তু সেই শব্দগুলো গলায় আটকে গেল।বের হলো না।
কারণ সে জানে এই সত্য উচ্চারণ করা মানে শুধু নিজের নয়, জুঁইয়ের শান্ত দুনিয়াটাকেও এক মুহূর্তে ভেঙে ফেলা।

গাড়িটি মন্থর ছন্দে অগ্রসরমান। গন্তব্য আর্ট ইউনিভার্সিটি। এই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হওয়াটা শয্যের জন্য কেবল প্রয়োজন নয়, প্রায় অনিবার্য এক তাড়না।
আজ তবে ঝুমঝুম দ্যা গ্রেট মাশাকে বিস্ময়ের অতল এক অনুভবে নিমজ্জিত করা যাক!
শয্য অদ্ভুত রকমের অস্থিরতায় আক্রান্ত। ভেতরের সুদৃঢ় সংযম যেন ক্রমশ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়ছে। সেই কন্যা তার ধৈর্যের বহুযত্নে নির্মিত প্রাচীর ভেঙে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে সযত্নে রক্ষিত হৃদয়ের প্রতিরোধ আজ তারই কারণে বিপর্যস্ত।
পিয়ার্সিং করা ডান ভ্রু সামান্য উর্ধ্বে তুলে শয্য কর্কশ-মাদকতাময় স্বরে উচ্চারণ করল,
“বিলিম মি ঝুম, পৃথিবীর সমগ্র সুখ আমি এই কয়েক ইঞ্চি বুকে সঞ্চিত করে রেখেছি শুধু তোর জন্য। একবার নিঃস্বার্থ ভালোবেসে দেখ, সমগ্র পৃথিবী তোমার পদতলে সমর্পণ করে দেবো।”
নিজের কথাতেই মৃদু হাসল শয্য। কী নির্মম পরিহাস! যে কন্যা তাকে ভ্রাতৃসম মনে করে, সেই কন্যার প্রেমের অতলান্তিক গভীরে সে বহু আগেই নিমজ্জিত হয়েছে।
বহু বছরের বিচ্ছিন্নতা অতিক্রম করে যখন কন্যা পুনরায় তার সন্নিকটে এলো, তখন শয্য নিজ হাতেই দূরত্বের প্রাচীর তুলে দিল।
তিনটি বছর যেন নিমেষেই বিলীন হয়ে গেল, অথচ কন্যাটি যুগের পর যুগ তাকে অস্থিরতার বিষে দগ্ধ করে চলেছে।
বারো বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা কি তবে এতটাই তুচ্ছ ছিল?

“চলো, আজ তোমাকে আমি নিজেই পৌঁছে দিই!”
প্রণয়ের কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হতেই অনুভূতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হতে লাগল ঝুমঝুম। হৃদস্পন্দন যেন অকারণে দ্রুততর হয়ে উঠল। সত্যিই কি প্রণয় তাকে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে? অন্তর্লোকে লজ্জা, মোহ আর অপার্থিব এক প্রশান্তি একসাথে জট বেঁধে বসেছে।
মাশা অ্যান্ড দ্য বেয়ারের পুচকি মাশার মতো হুড,ফ্রক করে আছে রমণী। কি মায়া লাগছে কন্যাকে! এই আদর আদর কন্যা যেন এক জীবন্ত পুতুল।
এই একমাত্র পুরুষ, যাকে ঝুমঝুম নিঃশব্দে হৃদয়ের সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রণয়ের অবস্থাও ভিন্ন নয়। উভয়ের হৃদয়ে পরস্পরের জন্য অনুচ্চারিত অনুরাগ সঞ্চিত থাকলেও, কেউই কখনও সাহস করে মনের গোপন অধ্যায় উচ্চারণ করতে পারেনি।
প্রণয়ের প্রস্তাবে সামান্য ইতস্তত করে ঝুমঝুম মৃদুস্বরে বলল,
“কিন্তু প্রণয়, তাহলে তো তোমাকে অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হবে। আমাদের বাড়ি তো উল্টো দিকে।”
প্রণয় মিহি হাসল। সেই হাসিতে ছিল প্রশ্রয়ময় কোমলতা। অতঃপর ধীর স্বরে বলল,
“সো হোয়্যাট? একদিন না হয় তোমার জন্য একটু পথবিচ্যুত হলাম!”

সামান্য কয়েকটি শব্দই ঝুমঝুমের অন্তর্জগৎ জুড়ে অদ্ভুত এক ভালো লাগার আবেশ বিস্তার করল। মনে হলো, বহুদিনের সুপ্ত অনুভূতিগুলো যেন হঠাৎই সজীব হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে প্রিয়া তড়িঘড়ি করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। আজ তার বড় বোন শ্বশুরালয় থেকে আসবেন, তাই দ্রুত ফিরে যাওয়াটা ছিল অপরিহার্য। ঝুমঝুম তাকে নিবৃত্ত করেনি।
প্রিয়া প্রস্থান করতেই যেন অদৃশ্য নিয়তির নিয়মে সেখানে আবির্ভূত হলো প্রণয়। নিজের প্রিয় মার্সিডিজটি নিয়ে এসেছে সে। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে গাড়িটি একপ্রকার ঈর্ষণীয় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। অসংখ্য শিক্ষার্থীর বিস্ময়ভরা দৃষ্টি প্রতিদিন গাড়িটির উপর স্থির থাকে। ঝুমঝুম গাড়িতে আরোহন করতে উদ্যত হতেই আচমকা চারপাশে উৎকণ্ঠিত কোলাহল ছড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ স্টুডেন্টদের মধ্যে উত্তেজিত হৈচৈ শুনে প্রণয় এবং ঝুমঝুম উভয়েই স্তব্ধ হয়ে গেল।
ইউনিভার্সিটির মূল ফটক থেকে কিছুটা দূরে একটি কৃষ্ণবর্ণ রোলস-রয়েস স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটি চোখে পড়তেই ঝুমঝুমের বক্ষগহ্বরে তীব্র ধুকপুকানি শুরু হলো। এই গাড়িটি তার ভীষণ পরিচিত।
অতিমাত্রায় পরিচিত। এতটাই পরিচিত যে, খুব কাছ থেকে বহুবার স্পর্শ করা স্মৃতিগুলো পর্যন্ত মুহূর্তে জেগে উঠল।

তৎক্ষণাৎ রোলস রয়েসের অভ্যন্তর থেকে এক পুরুষ অবতীর্ণ হলো। মুখাবয়ব মাস্ক ও ক্যাপ দ্বারা আচ্ছাদিত থাকলেও, তার উপস্থিতির ভঙ্গি ও দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত পরিচিত এক অদ্ভুত চৌম্বকীয় আকর্ষণময়তা যেন চারপাশের সবাইকে অস্থির করে তুলেছে।
জনসমাগমের মধ্যে উপস্থিত কেউ তার প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে না পারলেও, হ্যাজেল বর্ণের সেই তীক্ষ্ণ নয়নযুগল দেখে ঝুমঝুম যেন মুহূর্তে স্থবির হয়ে গেল।
অবচেতনেই তার ওষ্ঠদ্বয় কেঁপে উঠল,
“শয্য ভাইয়া?”
প্রণয় তখনও পুরো পরিস্থিতি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়নি। বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সে শুধু তাকিয়ে আছে সেই বিলাসবহুল কৃষ্ণবর্ণ রোলস রয়েসের দিকে। চারপাশে উপস্থিত জনতার মনে ক্ষণিকের জন্য বিভ্রান্তি জন্মাল কারও কারও ধারণা, এটি হয়তো তাদের আইডল “জুনেদ শয্য বাদশাহ”।
কিন্তু নিশ্চিতভাবে কেউই কিছু নির্ণয় করতে পারল না। তবু কেউ কেউ গোপনে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

শয্য আঙুলের সূক্ষ্ম ইশারায় ঝুমঝুমকে কাছে আসার নির্দেশ দিল। সেই নির্দেশেই যেন ঝুমঝুমের অন্তর্জগৎ কেঁপে উঠল। মাস্কের আড়ালে থাকা শয্যের চোয়াল আরও দৃঢ় হয়ে উঠল, যখন তার দৃষ্টি প্রণয়ের উপর গিয়ে স্থির হলো এক নিঃশব্দ তীক্ষ্ণতা, যা শব্দের চেয়েও বেশি আ’ঘাত হানতে সক্ষম।
শয্য ক্যাম্পাসের সকলকে অবাক করে দিয়ে বলে ওঠে,
“এইযে কাঠবিড়ালীর মা, এদিকে আসুন।”
নতুন এক সম্বোধনে অন্তঃস্থল কেঁপে উঠলো কন্যার,অতঃপর সে ঘাড় সামান্য কাত করল। মুহূর্তের মধ্যে দ্বিধাগ্রস্ত পদক্ষেপে ঝুমঝুম এগিয়ে গেল।
প্রণয় বিস্ময়ে নির্বাক, কেবল ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ঝুমঝুম নিকটে পৌঁছাতেই শয্য কঠোর, গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করল,
“গেট ইন দ্য কার।”
ঝুমঝুম যেন নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কে বিশ্বাস করতে পারল না। সন্দিগ্ধ মনটা ফের শুধোয়,
“হুঁ?”

শয্য চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘ, তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর পুনরায় একই কঠোরতায় বলল,
“আই সেইড, গেট ইন দ্য কার।”
ঝুমঝুম স্তব্ধ হয়ে গেল। একদিকে প্রণয়, অন্যদিকে শয্যের এই আকস্মিক আধিপত্য মনে দ্বিধা ও সংকোচের ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হলো। সে একবার শয্যের দিকে, পরক্ষণেই প্রণয়ের দিকে তাকাল। পরিস্থিতি যেন অদৃশ্য এক চাপ সৃষ্টি করছিল। শেষ পর্যন্ত সে দ্রুত স্বরে বলল,
“এখনই আসছি।”
বলেই সে দৌড়ে গিয়ে প্রণয়ের সামনে দাঁড়াল। কণ্ঠে অনুতাপ নিপীড়িত হয়ে বলল,
“প্রণয়, তুমি প্লিজ রাগ করো না। আমাকে উনার সঙ্গে যেতে হবে।”
প্রণয় কিছুটা হতভম্ব।
“বাট উনি কে? আব্রাহাম ভাই তো মনে হচ্ছে না!”
ঝুমঝুম ঠোঁটের কোণে এক ক্ষীণ, জটিল হাসি ফুটিয়ে বলল
“এটা আব্রাহাম ভাই না। শয্য ভাইয়া।”
নামটি উচ্চারিত হতেই প্রণয়ের মুখাবয়বে বিস্ময় আরও গভীর হলো। সে জানত ঝুমঝুম কেপপ আইডল জুনেদ শয্য বাদশাহর বোন তবুও তাদের পারিবারিক সম্পর্ক কার্যত বিচ্ছিন্ন বলেই সে জানত। অথচ আজকের এই দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

“রিয়েলি? বাট তুমি তো বলেছিলে,,,
ঝুমঝুম তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিল।
“পরে কথা বলব। বাই।”
প্রণয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সে দ্রুত ফিরে গেল রোলস রয়েসের দিকে।
শয্য দরজা খুলে দিল। সেই মুহূর্তে ঝুমঝুম আরেকবার বিস্মিত হলো। ধীর পায়ে সে গাড়িতে প্রবেশ করল। কিন্তু বসার আগেই তার মনে প্রিয়ার বলা কথাটি প্রতিধ্বনিত হলো,
“মানে,,,তোকে শুধু বোন হিসেবে দেখে না, অন্য কিছু হিসেবে।”
এই বাক্যটি মনে পড়তেই ঝুমঝুমের বক্ষগহ্বরে তীব্র ধুকপুকানি শুরু হলো। তার মনে প্রশ্নের ঝড় উঠল এটা কি আদৌ সম্ভব?
শয্য তো তাকে এখনও বোন হিসেবেও পুরোপুরি গ্রহণ করেনি, সেখানে অন্য কোনো সম্পর্কের ইঙ্গিত তা যেন বাস্তবতার সীমাকেও অতিক্রম করছে।
বাহিরে দরজা বন্ধ করে শয্য একবার ঘুরে তাকাল। দৃষ্টিতে ছিল তীক্ষ্ণ, শীতল ও অধিকারবোধে ভরা এক আ’গুন যা প্রণয়ের দিকে নির্দেশিত। তার চোখে স্পষ্ট লেখা এই মুহূর্তে যদি সুযোগ পেত, সে যেন প্রণয়ের অস্তিত্বকেই মুছে ফেলতে পারত। ঝুমঝুম নীরবে গাড়ির ভেতরে বসে রইল আর বাইরের পৃথিবী ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল সেই কৃষ্ণবর্ণ রোলস রয়েসের আড়ালে।

গাড়ি গতি মন্থর!। ঝুমঝুম উশখুশ করছে কিছু একটা বলবে বলে! শয্য যে তাকে নিতে এসেছে তা সত্যি বিশ্বাস হচ্ছে না! কাল রাতেও তো তাকে যা তা বলে অপমান করেছে! আচ্ছা এই মূহুর্তে যদি অপমান করে? উনি যখন তখন অপমান করতে পারে তার কোনো ইয়ত্তা নেই!
পার্শ্ব দৃষ্টিতে তাকালো ঝুমঝুম! জিজ্ঞেস করবে? মন যে দ্বিধাদ্বন্দ্বে জর্জরিত!
শয্যের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। সে নিজেই আগবাড়িয়ে শুধোয়,
“তোর পাশে দাঁড়ানো ছেলেটাই প্রণয় চৌধুরী,তাই তো?”
আঁতকে উঠে ঝুমঝুম, অস্ফুট স্বরে শুধোয়।
“কিন্তু আপনি? আপনি কিভাবে জানলেন?”
রূঢ় মানবের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। বিরক্ত হলো কন্যার পাল্টা প্রশ্নবানে! ভ্রুদ্বয় কুঞ্চিত করে তার দিকে একপল তাকালো! ডান হাতটি দিয়ে স্টিয়ারিংয়ে রেখে বা হাতে টান দিয়ে মুখের মাস্ক খুলে ফেলল!
ওমনি রক্তাক্ত মুখমণ্ডল সম্মুখে উন্মোচিত হয়!
ঘর্মাক্ত মুখমণ্ডল জুড়ে কি মায়া! অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রয় মানবী!
ততক্ষণে হাত বাড়িয়ে গাড়ির এসি অন করে দিলো!
অতঃপর সম্পূর্ণ মনোযোগ ড্রাইভিংয়ে বজায় রেখে এগিয়ে চলেছে!
ফাঁকা একটা ঢোক গিলল মানবী! রূঢ় মানবের এহেন আচরণের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন না করতে পেরে হতাশ ঝুমঝুম!

আজ শয্যের আচরণ ছিল একেবারেই অস্বাভাবিক; হঠাৎ করেই এফএফ রেডিও চালু করে দিল সে। সৌভাগ্যক্রমে তখন টিম আলফার একটি গান সম্প্রচারিত হচ্ছিল।
ঝুমঝুম বিস্ময়ে চেয়ে রইল। মুহূর্তেই সে অচেতন স্বরে গুনগুনিয়ে উঠল, আর শয্য স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে তাল মিলিয়ে ছন্দ তুলতে লাগল। ঝুমঝুম দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আচ্ছন্ন এ কেমন আচরণ জুনেদ শয্য বাদশাহর?
হঠাৎ অন্যমনস্ক দৃষ্টি সামনের দিকে ফিরাতেই সে চমকে উঠে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল,
“ভাইয়া, আমি নামব!”
ভাইয়া সম্বোধনটি যেন শয্যের সমস্ত অনুভূতিতে একপ্রকার তিক্ততার সঞ্চার করল। বিরক্ত স্বরে সে বলল,
“প্রবলেম কী তোর? সবসময় ভাইয়া, ভাইয়া করিস কেন? হোয়াই? ডোন্ট ইউ লাইক সিইং মি কাম?”
ঝুমঝুম আতঙ্কে কেঁপে উঠল। আকস্মিক ধমকের মুখে তার হ্যাজেল বর্ণের দৃষ্টির দিকে অপলক তাকিয়ে সে মাথা নিচু করল। প্রতি কথায় কথায় এভাবে ইংরেজি ধমকে খেয়ে খেয়ে ক্লান্ত কন্যা। তবুও সে অনুনয় করল।
“সরি, আমি একটু নামব।”
শয্য দৃঢ় কণ্ঠে জানাল,

“এখনই গ্রিন সিগন্যাল হবে। অসম্ভব! অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করিস না, নাহলে গুনে গুনে দশটা থাপ্পড় দেব।”
কিন্তু ঝুমঝুমের অস্থিরতা আরও তীব্র হয়ে উঠল। শয্যের শাসন উপেক্ষা করেই সে ব্যাগ নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। শয্যের রাগ মুহূর্তেই সপ্তম আকাশ ছুঁয়ে ফেলল।সে উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল।
“মাশা! স্টপ। আই সেইড স্টপ!”
তবুও ঝুমঝুম থামল না। গ্রিন সিগন্যাল ইতোমধ্যেই জ্বলে উঠেছে; আশেপাশের যানবাহন চলতে শুরু করলেও সে জেব্রা ক্রসিং ধরে ধীরপদে অগ্রসর হতে লাগল। হাতে ফোন, চোখে অদ্ভুত নির্লিপ্ততা যেন চারপাশের কোনো কিছুর অস্তিত্বই তার কাছে অর্থহীন।

গাড়ির ভেতর থেকে শয্য মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার দৃষ্টি পড়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধা নারীর ওপর, যিনি দুই সন্তানসহ রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু যানবাহনের চাপের কারণে এগোতে পারছিলেন না। তার উপর তার কমলা লেবুর ব্যাগ ছিঁড়ে মূহুর্তের মধ্যে সবগুলো লেবু ছড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। কেউ এগিয়ে এলো না। তখনই শয্য উপলব্ধি করল ঝুমঝুমের এই ধীর পদক্ষেপের অন্তর্নিহিত কারণ।
অবচেতনেই তার ঠোঁটে এক ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠল। তৎক্ষণাৎ সে নেমে গিয়ে বৃদ্ধাকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করতে লেবু গুলো কুড়িয়ে ঝুড়িতে তুলে দিল। ঠিক সেই মূহূর্তে গ্রিন সিগন্যাল হয়ে গেল। কুন্ঠিত ঝুমঝুম দ্রুত ফোন বের করে ধীর কদমে এগুচ্ছে। যতক্ষন না সেই বৃদ্ধা বাচ্চাগুলোকে নিয়ে রাস্তা বের হতে পারছে। তারপর দ্রুত ফিরে এসে গাড়িতে উঠল।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৮

গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই ঝুমঝুমের গালে অতি মৃদু এক টোকা পড়ল না, তেমন জোরালো নয়, যেন শুধুই একটি নীরব অনুযোগ। শয্য চাপা স্বরে বলল,
“শেষ হলো তোর সমাজসেবা?”
লজ্জা পেলো ঝুমঝুম! ফের আনত হলো শির! সে কি ভুল কিছু করেছে? আশ্চর্য লোক একটা!

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২০