Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ২০

রুহ এ ইশক পর্ব ২০

রুহ এ ইশক পর্ব ২০
আনান রোজ

ইনশিরা উযাইনের নিথর, স্তব্ধ চাউনি দেখে ধীর পায়ে ওখানেই ঘাসের ওপর হাঁটু গেড়ে উযাইনের একদম পাশে বসে পড়ল। উযাইন কোনো কথা না বলে বেশ কিছুক্ষণ ইনশিরার ওই মায়াবী, উৎকণ্ঠিত চোখ দুটোর দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। তার ভেতরের সমস্ত দেয়াল যেন এই এক সেকেন্ডে ধুলোয় মিশে গেল।
ইনশিরা কিছু একটা বলতে যাবে—কিন্তু তার আগেই উযাইন ওকে কোনো সুযোগ দিল না। এতদিনের সেই গম্ভীর, পাথুরে প্রফেসর নিজের সমস্ত ইগো আর বাঁধ এক সেকেন্ডে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে এক ঝটকায় ইনশিরার বুকে মুখ গুঁজে তীব্রভাবে ডুকরে কেঁদে উঠল।
ইনশিরা উযাইনের এই অতর্কিত আকুলতায় নিজের পুরো শরীরে তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। সে ভেবেছিল উযাইন হয়তো প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ওর ওপর ক্ষোভ ঝাড়বে! কিন্তু না… উযাইন আজ এক্কেবারে এক নিষ্পাপ বাচ্চার মতো ইনশিরার বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। উযাইনের চোখের তপ্ত জল ইনশিরার গলার ফর্সা চামড়ার ওপর ফোঁটায় ফোঁটায় আছড়ে পড়ছিল, আর তার ক্লিন সেভ করা ফর্সা গালটা ইনশিরার গলার খাঁজে অনবরত ঘষা লাগছিল —যা ইনশিরার পুরো অস্তিত্বে এক অদ্ভুত শিহরণ আর মায়ার ঝড় তুলে দিল।
ইনশিরা নিজের কাঁপতে থাকা নরম হাতটা বাড়িয়ে আলতো করে উযাইনের ওল্ফ কাট চুলের ভেতর আঙুল গলিয়ে বিলি কেটে দিতে দিতে খুব নিচু ও শান্ত গলায় বলল—

—”উযাইন সাহেব… প্লিজ শান্ত হোন। আপনি যদি সত্যটা বলতে না চান, আমি আপনাকে বিন্দুমাত্র ফোর্স করব না…”
উযাইন ইনশিরার কোমরটা নিজের দুই হাত দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল, বুক ভাঙা হাহাকার নিয়ে কান্নাভেজা গলায় বলল—
—”ইনশিরা… কেন? কেন আমার লাইফটা বাকি পাঁচটা মানুষের মতো স্বাভাবিক হলো না? কেন আমাদের ছেড়ে আমাইরা এত তাড়াতাড়ি চলে গেল? জানো ইনশিরা…? আম্মু সবসময় বলে, পুরো সাতটা বছর হয়ে গেল আমাইরা তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ করে না! আম্মু কাঁদছিল আর বলছিল… আমি যেন আমাইরাকে বলি যে আম্মু-আব্বু এখন ওদের সম্পর্ক এক্সেপ্ট করে নিয়েছে, ও যেন অন্তত একবার এসে ওদের মুখটা দেখে যায়! আমি… আমি আম্মুকে কোনো সত্যি কথা বলতে পারি না
ইনশিরা উযাইনের এই বুক ফাটানো কষ্ট দেখে নিজের চোখের জল আর ধরে রাখতে পারল না। সে উযাইনের পিঠে পরম মমতায় নিজের হাত রেখে পিঠ চাপড়ে দিতে দিতে নিচু স্বরে শান্ত্বনা দিল—

—”কান্না থামান প্রিয়… আর কাঁদবেন না প্লিজ। সব ঠিক হ…”
ইনশিরার কথা শেষ হওয়ার আগেই উযাইন এক ঝটকায় ওর বুক থেকে নিজের মুখটা ওপরে তুলল। তার সেই বিরল, মায়াবী আইস ব্লু চোখ দুটো তখন কান্নায় লাল হয়ে একদম একাকার হয়ে আছে। সে ইনশিরার চোখের দিকে এক চরম অসহায় ও তীব্র ব্যাকুল চাউনি ছুড়ে দিয়ে ডুকরে উঠল—
উযাইন খুব নিচু, গভীর এবং তোতলামির স্বরে বলল—
—”ইনশিরা… আমিও তো একটু বাঁচতে চেয়েছিলাম! আমারও তো একটা সুন্দর জীবন পাওয়ার অধিকার ছিল! কিন্তু ড্যাডের একটা ভুল আর জোরপূর্বক নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে আমার নিজের লাইফের অনেকগুলো বছর এক নিমেষে নষ্ট হয়ে যায়! আর তার পরপরই চিরকালের জন্য চলে গেল… আমার সাজানো সুন্দর দুনিয়াটা যেন পলকেই তছনছ হয়ে গেল!”

কথাগুলো একটানা বলতে গিয়ে উযাইন নিশ্বাস আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে প্রচণ্ডভাবে হাঁপাতে লাগল তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছিল—যেন সে মুক্ত বাতাসে একটু দম নেওয়ার জন্য চরম ছটফট করছে!
ইনশিরার চোখ জোড়া তখন নোনা জলে পুরোপুরি ছলছল করছে। নিজের এই সাধের, স্বপ্নের শখের পুরুষের এমন বিধ্বস্ত ও নিষ্পাপ রূপ সে আজ পর্যন্ত কোনোদিন দেখেনি। সে এক বুক ভালোবাসা আর আত্মসমর্পণ নিয়ে আর এক ইঞ্চি দূরত্ব রাখল না। সে ঝুঁকে এসে খুব সাবধানে, পরম মায়ায় উযাইনের কপালে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো একহাতে সরিয়ে দিল। তারপর নিজের নরম ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দিয়ে উযাইনের কপালে গভীর, শান্ত ও ওম ছড়ানো একটি চুমু খেল।
চুমু খেয়ে সে উযাইনের কপালে নিজের কপালটা শক্ত করে ঠেকিয়ে রাখল। আবছা আলো আর কুয়াশার মাঝে ইনশিরা উযাইনের চোখ বরাবর চোখ রেখে এক মরণজয়ী, অমোঘ কণ্ঠে ভরসা দিল—
ইনশিরা উযাইনের গাল দুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে বলল—

—”আমরা সব ঠিক করে দিব উযাইন… একদম ভয় পাবেন না… আমি আপনার কাছেই আছি!”
ওর কথা গুলো শুনে, উযাইন আরেকটু নরেচরে উঠে ইনশিরাকে জরিয়ে নিল। কনকনে ঠাণ্ডা আর কুয়াশার মাঝে ইনশিরার বুকে মুখ গুঁজে উযাইন যখন বাচ্চার মতো কাঁদছিল, ইনশিরা পরম মায়ায় ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে খুব দৃঢ় অথচ নরম গলায় বলল—
—”উযাইন…উমায়েরকে সত্যিটা জানানো প্রয়োজন…
উযাইন আবরার তীব্রভাবে চমকে উঠে ঝট করে মুখ তুলে তাকাল! তার চোখের মণি দুটো আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। সে কাঁপা গলায় বলল—
—”কী বলছ এসব ইনশিরা? নো! ও এখনো অনেক ছোট…!”
কিন্তু উযাইনকে কথা শেষ করার কোনো সুযোগই দিল না ইনশিরা। সে এক ঝটকায় ঘাসের ওপর থেকে উঠে দাঁড়াল এবং কোনো কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল। উযাইন চরম অবাক ও আতঙ্কিত হয়ে ইনশিরাকে থামানোর জন্য ওর পেছন পেছন প্রায় দৌড়ে গেল। কিন্তু ইনশিরা ততক্ষণে বেশ গতিতে এগিয়ে গেছে।
লন্ডনের আকাশে তখন ঝমঝম করে তীব্র তুষার পড়া শুরু হয়ে গেছে। চারপাশের পরিবেশ সাদা বরফে ঢেকে যাচ্ছে। উমায়ের তখন জ্যাকেট পরে ব্যাকইয়ার্ডের বাগানে এক কোণে বরফ নিয়ে খেলছিল । ইনশিরা কুয়াশা আর তুষার ভেদ করে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে উমায়েরকে পেছন থেকে পরম মমতায় নিজের দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরল।
ইনশিরা উমাইরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে, আদুরে গলায় বলল—

—”উমায়ের সোনা…? তুমি কি আজ থেকে আমাকে একটা নতুন নামে ডাকবে? আমাকে ‘আম্মু’ বলে ডাকবে?”
উযাইনও হন্তদন্ত হয়ে ওখানে এসে হাজির হলো। প্রথমে উযাইন ভেবেছিল, ইনশিরা হয়তো আমাইরার কথা বলবে, কিন্তু এসব শুনে উযাইন আর কিছু বলল না। কারণ ইনশিরা না বললে সেই বলত উমায়েরকে, তাদের বিয়ের কথা। উমায়ের ইনশিরার মুখে এই হুট করে আম্মু ডাকের কথা শুনে একদম চুপ হয়ে গেল। ইনশিরা উমাইরের ফর্সা গোলগাল গাল দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় পরম মায়ায় আগলে ধরে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
—”আমি তোমার আম্মুই হই সোনা। তোমার পাপা আর আমি…আমরা মেরিড !”
উমায়ের যেন পুরো টাসকি খেয়ে গেল। সে বড় বড় চোখ করে একবার তার উযাইনের দিকে তাকাল, আর পরমুহূর্তেই ইনশিরার কান্নাভেজা চোখের দিকে তাকাল। ইনশিরা উমাইরের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে আকুতি জানাল—

—”তুমি কি আমাকে তোমার নিজের আম্মু হিসেবে এক্সেপ্ট করবে সোনা?”
উমায়ের মুখে কোনো কথা বলল না, ওর নিষ্পাপ ফেসটা একদম গম্ভীর হয়ে রইল। উযাইনের বুকের ভেতর তখন ভয়ের তীব্র একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল—ছেলে যদি এই সত্যটা মেনে না নেয়! হাজার হলেও সে ছোট মানুষ। উমায়ের কোনো জবাব না দিয়ে হুট করেই এক দৌড়ে ওখান থেকে অন্য দিকে চলে গেল।
উমায়ের চলে যেতেই উযাইনের ভয়টা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল ইনশিরার ওপর। সে এক কদম এগিয়ে এসে ইনশিরার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে তীব্র কিছুটা কঠোর গলায়—
—”হোয়াট ওয়াজ দ্যাট, ইনশিরা?! তুমি এত চাইল্ডিশ বিহেভিয়ার কেন করো সবসময়? এসব থেকে দূরে থাকবে বলেছিলাম না?
কথা গুলো শুনে ইনশিরার বুকের ভেতরটা এক নিমেষে হাজার টুকরো হয়ে ভেঙে গেল! এই লোকটা প্রতিবার কাছাকাছি আসার পর, একটু মায়া দেখানোর পরেই হুট করে এমন একটা পশুর মতো আচরণ করে ওকে এক সেকেন্ডে পর করে দেয়!
ইনশিরার চোখের সব জল এক নিমেষে শুকিয়ে তীব্র এক অভিমানে রূপ নিল। তার এই ৩ বছরের অবদমিত কষ্ট আর দীর্ঘদিনের অবহেলা আর সহ্য হলো না। সে নিজের হাত দিয়ে উযাইনের হাতটা এক ঝটকায় নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিল। সে উযাইনের দিকে এক তীব্র ঘৃণা ও অবহেলার চাউনি ছুড়ে দিয়ে নিজের মনে মনে এক চরম বৈরাগ্যের সুরে ভাবল—

—”উফফ আল্লাহ! আমার আর এই পাষাণ পুরুষটার ব্যবহার সহ্য হয় না! লাগবে না আমার কাউকে… আমি একাই থাকতে পারব। এই দুনিয়ায় সবাই তো আর ভালোবাসার পূর্ণতা পায় না! কিছু কিছু বিচ্ছেদেও তো সুখ থাকে!”
ইনশিরা মুখে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করল না, উযাইনের কোনো কথার জবাব দিল না। সে নিজের চোখের জল মুছে একদম চুপচাপ ঘুরে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির মেইন গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। উযাইন তুষারপাতের মাঝে বাগানের মাঝখানে একদম ঠাঁই পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার নিজের হাত দুটো তখনো কাঁপছে।
ইনশিরা যখন মেইন গেটের একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, উযাইন দ্রুত আসতে লাগলো, সে বুঝতে পারছে পিচ্ছিটা হয়তো তাকে ভুল বুঝে বসে আছে। ঠিক তখনই পেছনের তুষারঝড় ভেদ করে এক ফুটফুটে বাচ্চার চিৎকার পুরো নিস্তব্ধ এলাকা কাঁপিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল—

—”আম্মু…!! আম্মু…!!”
ইনশিরা তীব্রভাবে চমকে উঠে ঝট করে পেছনের দিকে ফিরে তাকাল। সে দেখল—উমায়ের ঘরের ভেতর থেকে এক দৌড়ে বাইরে তুষারপাতের মাঝে ছুটে আসছে! আর ওর ছোট্ট ডান হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা আছে বাগান থেকে কুড়িয়ে আনা একটি তাজা, লাল টকটকে তুষার মাখানো গোলাপ! উমায়ের দৌড়ে এসে এক লাফে ইনশিরার কোমরটা নিজের দুই ছোট হাত দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সে ইনশিরার বুকে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে চড়া, কান্নাভেজা ও পরম ভালোবাসার নিষ্পাপ গলায় চিৎকার করে বলে উঠল—
—”আম্মু… আই লাভ ইউ সো মাচ !! তোমার জন্য বাগান থেকে এই সুন্দর আইসি-রোজটা আনতে গিয়েছিলাম!…আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি আম্মু!”
“আম্মু” ডাক আর হাতের সেই মায়াবী তুষার মাখানো গোলাপ দেখা মাত্রই ইনশিরা সে হাটু গেড়ে বসে উমায়েরকে নিজের বুকের ভেতর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওদিকে উযাইনের চোখ দুটোও ‘আম্মু’ ডাক শুনে খুশির নোনা জলে পুরোপুরি ছলছল করে উঠল। সে ভাবলো এবার সব গুছিয়ে নিবে আর দূরত্ব রাখবে না…..

উমায়ের ইনশিরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। রাত তখন প্রায় ১০ টা। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরের মাঝে বিছানায় শুয়ে ইনশিরা ঘুমন্ত উমাইরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু আজ আর তার নিজের চোখে কোনো ঘুম ছিল না। বিগত ৩ বছরের প্রতিটি অবহেলার কথাগুলো ওর মাথায় অনবরত ঘুরছিল। সে এক বুক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনে মনে ভাবল—
—”আমি আর পারছি না…দিন শেষে আমিও তো একটা মানুষ, রক্ত-মাংসের একটা শরীর আমার। আমারও তো একটা মন আছে। এই লোকটা প্রতিবার আমাকে ওমন পর করে দেয়! লাগবে না আমার কাউকে… এই জীবনটা আমি একা একাই কাটিয়ে দিতে পারব!”
কথা গুলো ভাবতে ভাবতে ইনশিরা বিছানা থেকে নেমে ধীর পায়ে নিজের রুমের দরজা ঠেলে নিচে লিভিং রুমের দিকে নেমে এলো। পুরো লিভিং রুমটা তখন এক অদ্ভুত মায়াবী অন্ধকারে ডুবে ছিল। উযাইন সোফায় নিজের মাথাটা পেছনের দিকে এলিয়ে দিয়ে, চোখ দুটো বন্ধ করে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। তার নিজের মনের ভেতর তখন তীব্র এক অনুশোচনার ঝড় বইছিল—সে কেন পিচ্চিটাকে ওভাবে কড়া কথায় বারবার কষ্ট দেয়? সে হয়তো পিচ্চি নিষ্পাপ বুনো ফুলটার বিন্দুমাত্র যোগ্যই নয়!
তখন ইনশিরা অন্ধকারের মাঝে সোফার থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে, খুব শান্ত কিন্তু ভাঙা গলায় ডাকল—

—”উযাইন সাহেব…?”
উযাইন চমকে উঠে নিজের চোখ মেলে অন্ধকারের মাঝে ইনশিরার ফ্যাকাশে ফেসটার দিকে তাকাল।
ইনশিরা চোখের কোণের এক ফোঁটা জল মুছে, অত্যন্ত অভিমানী ও ম্লান হেসে বলল—
—”আ…আমি হয়তো আপনার পাথুরে মনে কখনোই নিজের জন্য একটুখানি ঠাঁই পাব না, তাই না? আসলে আমি বড্ড বেশি একটা বেহায়া মেয়ে, উযাইন সাহেব! এতগুলো বছর ধরে একটা পুরুষ আমাকে অনবরত তাড়িয়ে দিচ্ছে, পর করে দিচ্ছে… তাও আমি একটা পাগলের মতো তার পেছনে পড়ে রয়েছি! আ…আমার কোনো আত্মসম্মান নেই, কোনো ব্যক্তিত্ব নেই? আমি অনেক চাইল্ডিশ আরও কত কি…। সত্যিই বলতে দুনিয়ার কাছে পরিবার ফ্রেন্ডদের কাছে আমি বাস্তববাদী হলেও কেন জানি আপনার প্রতি কোঠর হতে পারলাম না।
এতটুকু বলে সে টলমল পায়ে কিছু পিছিয়ে গেল আর হাল্কা আওয়াজ করে হাসল, উযাইন তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ইনশিরা এক্টুক্ষন থেমে আবার বলে—

—”ভালবাসার ক্ষেত্রে সবসময়ই শুনে এসেছি ছেলেদের পাগলামির কথা, দেখেওছি। তবে এসব আমার কাছে বরাবরই বিরক্তি লাগত। কিন্তু আমিও যে এমনই তা হয়তো আপনি না আসলে জানা হত না। আমি দেখেছি মেয়েদের অভিমান, রাগ, অভিযোগ তাদের প্রিয় মানুষের প্রতি। কিন্তু আমি এসব করিনি, কারণ আমার মনে হয় এসবে সময় নষ্ট হবে। আমাদের মাঝে এমনিতেই দুরত্ব, এত বছরের তফাৎ। অহেতুক সময় চলে যাবে, কতদিন আর এক সাথে কাটিয়েছি?? আপনি বিডিতে ৬মাস ছিলেন, এর মধ্যে বিয়ের পর একমাস আর এখন ইউকে তে এখানে, ১০-১৫ দিন।
এমন যদি আমি হটাৎ মারা যায়? তাহলে? আফসোস থাকবে, কেন এসব রাগ অভিমান করেছিলাম…আরেকটু সময় একসাথে থাকা যেত। কিন্তু আপনি হয়তো….”
কথাটা শেষ করার আগেই একটানে ইনশিরার একটা নরম ফর্সা হাত নিজের শক্ত মুঠোয় জড়িয়ে ধরে নিজের একদম কাছাকাছি টেনে নিয়ে এলো।

উযাইন নিজের দুই হাত বাড়িয়ে এক ঝটকায় ইনশিরার কোমরটা আষ্টেপৃষ্ঠে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। তারপর নিজের মুখটা ইনশিরার পেটে গুঁজে দিয়ে এক নিষ্পাপ বাচ্চার মতো তীব্রভাবে ডুকরে কেঁদে উঠল।
ইনশিরা উযাইনের এই আচমকা ও তীব্র শারীরিক স্পর্শে সম্পূর্ণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। এতগুলো বছর যে লোকটা তাকে নিজের শরীর তো দূর, নিজের মায়ার সীমানাতেও ঘেঁষতে দেয়নি, সে আজ ওভাবে ওর পেটে মুখ গুঁজে কাঁদছে দেখে ইনশিরার বুকের ভেতর তীব্র ধড়ফড়ানি শুরু হলো। সে নিজেকে উযাইনের শক্ত বাঁধন থেকে ছাড়ানোর জন্য একটু মোচড়ামুচড়ি করতে লাগল। কিন্তু উযাইন আজ নিজের দুই বাহুর শক্তি আরও বাড়িয়ে দিয়ে ইনশিরাকে নিজের শরীরের সাথে আরও জোরে লেপ্টে ধরল।

উযাইন ইনশিরার পেটের কাপড়ে নিজের মুখ লুকিয়ে, তীব্র কান্নাভেজা ও ভাঙা গলায় আর্তনাদ করে বলল—
—”ইনশিরা… আমি ভিক্ষা চাইছি পাখি! আমি আজ তোমাকে তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি, সোনা! আমি তোমাকে বিগত দিনগুলোতে অনেক… অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছি? বিশ্বাস করো পাখি… আমি শুধু তোমার ওই সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবেই নিজের বুকে পাথর চেপে এই দূরত্বের দেয়াল তুলেছিলাম। কিন্তু আমি আর পারছি না… আই জাস্ট কান্ট টেক দিস অ্যানিমোর! এই নরকীয় দুনিয়া, সমাজ, সামাজিক নিয়ম—আমার… আমার কিচ্ছু যায় আসে না! আমি আমার এই জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত তোমাকে নিজের বুকের ভেতর আগলে রাখব । প্লিজ… প্লিজ আমাকে ছেড়ে কোথাও যেয়ো না !”
উযাইনের চোখের তপ্ত নোনা জল ইনশিরার জামাটা পুরোপুরি ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সে ইনশিরার জামাটা শক্ত করে খামচে ধরে নিজের মুখ তুলে ওপরের দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় উযাইনের সেই বিরল মায়াবী আইস ব্লু চোখ দুটো তখন কান্নায় একাকার হয়ে অন্ধকারের মাঝে জ্বলজ্বল করছিল।
উযাইন চরম আকুলতা ও ভালোবাসার হাহাকার নিয়ে ফিসফিস করে বলল—

—”এই জীবনে আর কত বছরই বা বাঁচব বলো, ইনশিরা? এই ৩৮ টা বছর ধরে এক একাকীত্বের মরুভূমিতে ডুবে আছি ! প্লিজ… আমি আজীবন তোমার পায়ের দাস হয়ে থাকব, আমাকে পর করে দিও না!”
ইনশিরা একদম নিথর, নিস্তব্ধ পাথরের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের কোনো আবেগ প্রকাশ করল না। সে উযাইনের ওই আকুল চোখের দিকে এক পলক তাকিয়ে নিজের পুরো শরীরটা মোচড় দিয়ে খুব শান্তভাবে উযাইনের সেই শক্ত আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে একপাশে সরিয়ে নিল।
উযাইন কার্পেটের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে ঘরের অন্ধকারের মাঝে একদম অবুঝ বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ইনশিরা উযাইনের এই বিধ্বস্ত রূপের দিকে অপলক চেয়ে মনে মনে এক তীব্র আক্ষেপ নিয়ে ভাবল—

—”এই কঠোর পুরুষটা কি তবে আজ সত্যিই আমার ভালোবাসার কাছে নিজের সর্বস্ব সঁপে দিয়ে আত্মসমর্পণ করল? উনি তো সত্যিই বলছেন ভাগ্য আমাদের মিলাতে বড্ড বেশি দেরি করেছে।বিশ বছরের অন্তর আর তিন বছরের দুরত্ব!
ইনশিরার কে চুপ দেখে উযাইনের বুকের ভেতরটা এক মরণ যন্ত্রণায় খামচে ধরল । সে আর এক মুহূর্তও নিজেকে দূরে রাখতে পারল না। সে পেছন থেকে ইনশিরার সরু কোমরটা আবার নিজের দুই হাত দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরল। আর ইনশিরার কাঁধের ওপর নিজের মুখটা সঁপে দিয়ে, তীব্র কাঁপা ও কান্নাভেজা গলায় অনবরত ফিসফিস করতে লাগল—

—”আমাকে শাস্তি দাও, চাবুক মারো, অপমান করো! কিন্তু প্লিজ… কোনোদিন বিচ্ছেদের কথা বলো না, বউ…! আ… আমি সত্যিই মরে যাব! আমি কখনোই নিজের মন থেকে তোমার থেকে দূরত্ব চাইনি লিটল বার্ড। কিন্তু আমি সমাজকে ভয় পেতাম… দুনিয়ার মানুষজন তোমাকে চরিত্রহীন বলবে, কটু কথা শোনাবে, সেই অপবাদের হাত থেকে তোমাকে বাঁচাতে আমি নিজের বুকে পাথর চেপে দূরে ছিলাম! তিনটা বছর ধরে আমিও প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা সেকেন্ড ভেতরে ভেতরে ছটফট করেছি! আমাকে ক্ষমা করে দিও না… কিন্তু প্লিজ, তোমার গায়ের এই বুনো ফুলের গন্ধটা থেকে আমাকে তাড়িয়ে দিও না, আমার যে শ্বাস আটকে আসে!”
উযাইনের মুখ থেকে এই তীব্র, অবাধ্য এবং সত্য স্বীকারোক্তি শুনে ইনশিরা নিজের জায়গায় একদম জমে বরফ হয়ে গেল! তার মাথার ভেতর যেন এক বিশাল আলোকপাত হলো। সে স্তব্ধ হয়ে মনে মনে ভাবল—

—” লোকটা… লোকটা কি তবে প্রথম থেকেই আমাকে নিজের মনের গহীনে ভালোবেসে এসেছে? আর আমি ভাবতাম উনি পাষাণ…উনি আমার অপবাদের হাত থেকে বাঁচাতে নিজেকেই একটা জলন্ত ছাই বানিয়ে রেখেছেন!”
ইনশিরা নিজের চোখের জল মুছে খুব ধীর ও নিচু স্বরে বলল—

রুহ এ ইশক পর্ব ১৯

—”সরুন প্লিজ, উযাইন সাহেব…”
উযাইন ইনশিরার কোমর ছেড়ে দিয়ে ওর চোখের দিকে এক চরম তৃষ্ণার্ত চাউনি নিয়ে তাকাল। ইনশিরা উযাইনের সেই কান্নায় লাল হয়ে থাকা আইস ব্লু চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক বুক অভিমান নিয়ে বলল—
—”আপনি… আপনি আমাকে বিগত দিনে বড্ড বেশি কষ্ট দিয়েছেন, উযাই…!”

রুহ এ ইশক পর্ব ২১