Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ১৯

রুহ এ ইশক পর্ব ১৯

রুহ এ ইশক পর্ব ১৯
আনান রোজ

ইনশিরার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, মায়াবী ও দুষ্টুমি ভরা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। উযাইনের শার্টের গলার কলারটা খুব আলতো করে একপাশে সরিয়ে দিল। তারপর উযাইনের ফরসা, চওড়া গলার চামড়ার ওপর নিজের নরম ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দিয়ে—খুব মায়া করে, মিষ্টি করে, কয়েকখানা গভীর বাইট বসিয়ে দিল! ঘুমের ঘোরেই উযাইনের গলার এডামস অ্যাপলটা তীব্রভাবে ওপর-নিচে ওঠানামা করে উঠল। উযাইনের শরীরের প্রতিটা স্নায়ু ইনশিরার এই মায়াবী স্পর্শে অবচেতনভাবেই কেমন তীব্রভাবে সাড়া দিয়ে উঠেছিল! কিন্তু সে জাগল না। ইনশিরা উমায়েরকে নিজের বুকের সাথে টেনে নিয়ে উযাইনের খুব কাছাকাছি পরম শান্তিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তিনটা দিন সে একদম স্বপ্নের মতো কাটাতে চায়।

পরদিন সকাল, মিষ্টি রোদ ঘরের ভেতর এসে পড়ার আগেই ইনশিরা বিছানা ছেড়ে উঠে সোজা কিচেনের দিকে চলে গেল সকালের ব্রেকফাস্ট তৈরি করার জন্য। সে চলে যাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর, উযাইন ঘুম ভাঙল। সে চোখ ডলতে ডলতে বিছানা থেকে উঠে সোজা ওয়াশরুমে গেল ফ্রেশ হওয়ার জন্য।
বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে সে আয়নার দিকে তাকাতেই— হাতের তোয়ালে হাত থেকে খসে ফ্লোরে পড়ে গেল! তার চোখের মণি চড়কগাছ হয়ে গেল। সে আয়নার একদম কাছে মুখ নিয়ে দেখল, তার ফরসা গলার একপাশে লাল হয়ে স্পষ্ট কয়েকটা কাম*ড়ের দাগ বসে আছে! সে অগ্নুৎপাতের মতো ফেটে পড়ল। সে ঝড়ের বেগে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে সোজা ইনশিরার রুমের দিকে ছুটে গেল!
ইনশিরা তখন কিচেন থেকে নিজের রুমে এসে আয়নার সামনে চুল বাঁধছিল। ঠিক তখনই দরজায় কোনো নক না করে ঝড়ের বেগে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল উযাইন। ইনশিরা ঝট করে ঘুরে তাকাতেই দেখল উযাইনের ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে, তার বুকের নিশ্বাস চড়া গতিতে ওঠানামা করছে। ইনশিরা বুঝতে পারল যে সে এতক্ষণে ধরা পড়ে গেছে!
উযাইন লম্বা লম্বা পা ফেলে এক সেকেন্ডে ইনশিরার একদম গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াল। তাদের মাঝখানের দূরত্ব তখন মাত্র এক ইঞ্চি, উযাইনের শরীরের তীব্র তাপ আর রাগ ইনশিরাকে গ্রাস করে নিল।
উযাইন তীব্র গভীর, নেশাতুর এবং বরফ শীতল গলায় ইনশিরার চোখের দিকে চেয়ে বলল—

—”খুব শখ, তাই না? দিন দিন বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছ তুমি! কিন্তু একটা কথা বলো তো… সইতে পারবে?”
ইনশিরা বুকের ভেতর তীব্র ধড়ফড়ানি শুরু হলেও, বাইরে নিজেকে শান্ত রেখে আমতা আমতা করে বলল—
—”কী… কী বলছেন আপনি? আমি তো বুঝতে পারছি না কীসের কথা বলছেন উযাইন…”
উযাইন এবার আরও এক ইঞ্চি এগিয়ে এসে ইনশিরাকে সরাসরি ড্রেসিং টেবিলের দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে আটকে দিল। সে ইনশিরার কানের লতির খুব কাছে নিজের মুখ এনে চড়া এবং কাঁপানো গলায় বলল—
—” কেন বারবার আমার সামনে এসে এভাবে আগুন নিয়ে খেলছ তুমি? পারবে…? পারবে এই আটত্রিশ বছরের অতৃপ্ত মানুষটাকে সামলাতে? এই ছোট্ট শরীরে…এই তীব্রতা নিতে পারবে?!”
উযাইনের এই চরম বোল্ড এবং প্রাপ্ত*বয়স্কদের মতো তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ডায়ালগ শোনা মাত্রই ইনশিরার পুরো শরীর এক সেকেন্ডে তীব্রভাবে কেঁপে উঠল! তার ফর্সা গাল, কান, ঘাড় লজ্জায় আর এক অদ্ভুত আদিম শিহরণে লাল টমেটো হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে রইল। উযাইন এক ঝটকায় ইনশিরার থেকে দুই পা পিছিয়ে গেল নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য।
ইনশিরা নিজের ওড়না কোনটা শক্ত করে ধরে, অভিমানী কান্নাভেজা গলায় বলল—

—”আমি কি কোনো পাপ করছি? নিজের বরকে ভালোবেসে একটু আদর করে…?”
উযাইন চোখ বড় বড় করে, নিজের গলার সেই লাল দাগটার ওপর আঙুল তাক করে বলল—
—”শাট দ্য ফা*ক আপ! তোমাকে বলে দিচ্ছি…আর একবার যদি তুমি কা*মড় বা স্পর্শের দাগ বসানোর চেষ্টা করেছ, তবে আমার থেকে বিন্দুমাত্র কোনো ছাড় পাবে না!”
উযাইন বেডের দিকে ইশারা করে ইনশিরার চোখের দিকে এক চরম তপ্ত, গভীর এবং সোজা-সাপটা চাউনি ছুড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
—”ইনশিরা… নেক্সট টাইম কিছু করলে, ওইখানে এমন কিছু ঘটবে যে পরবর্তী ২ দিন তুমি ঠিক মতো হাঁটার অবস্থায় থাকবে না!”
বলেই উযাইন আর এক সেকেন্ডও সেই ঘরে দাঁড়াল না। সে নিজের শার্টের কলারটা টানতে টানতে, ঘর থেকে হনহনিয়ে বেরিয়ে ধড়াস করে দরজা বন্ধ করে চলে গেল। ইনশিরা ঘরের মাঝখানে আয়নার সামনে আক্ষরিক অর্থেই পুরো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর তখন যেন একটা পুরো সুনামি বয়ে যাচ্ছে। সে নিজের গালে হাত দিয়ে চরম বিস্ময় আর লজ্জায় বিড়বিড় করে বলে উঠল—

—”লোকটা… লোকটা শেষপর্যন্ত কী ভয়ংকর কথা বলে গেল?! একটা মানুষ এত সোজাসুজি ঠাস করে এমন লজ্জা দেওয়া কথা মুখে বলে চলে যেতে পারে?! বেহায়া, জংলী প্রফেসর…!”
ইনশিরা নিজের লাল হয়ে যাওয়া মুখটা বিছানার বালিশে চেপে ধরে লজ্জায় আর এক অদ্ভুত শিহরণের আবেশে হেসে উঠল। সে ভাবছে, উযাইন তাকে অপমান করছে না, এমন কি আগের মত রাগও করছে না। কেমন জানি বদলে গেছে
ইনশিরা বুঝতে পারছে, তার প্রফেসর সাহেবের ভেতরের সেই শক্ত ইগোর দেয়ালটা এবার শেষ হতে চলল।
কিন্তু এই সুখের মাঝেই ইনশিরার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। উযাইনের কয়েক টা কথা ওর মাথায় অনবরত হাতুড়ি মারতে লাগল। ইনশিরা ভাবতে লাগে —
—” উনি আটত্রিশ বছরের অতৃপ্ত মানুষ” বলে দাবি করল ? উযাইন তো বিবাহিত ছিল, এমন কি উনার সন্তানও আছে, তবে উনি নিজেকে এমন বলল কেন?
কিন্তু ইনশিরা মাথায় কিছু মিলল না। আর ওইদিকে উযাইন ইনশিরার রুম থেকে বেরিয়ে সোজা ছাদের দিকে যাচ্ছিল আর বিরবির করছিল—
—দুষ্টু কোথাকার! জামাই এমনিতেই উতলা হয়ে আছে, আর উনি? বারবার এসে কাম*ড় দিয়ে চলে যায়। সেই পুচকে বয়স থেকেই আমার সাথে এমন অত্যাচার করে আসছে। হুম…..যেদিন ধরব ওইদিন বুঝবে!! একেবারে এক কাম*ড়ের প্রতিশোধ একশো কাম*ড়ে নিব।”

সকাল নয়টা বিশ বাজে, আজ উইকেন্ড তাই আর কারো ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার তারা ছিল না। তবে ব্রেকফাস্টের টেবিলে এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতা বিরাজ করছিল। ইনশিরা ডাইনিং টেবিলে বসে উমায়েরকে ব্রেকফাস্ট খাইয়ে দিচ্ছিল। উযাইনও টেবিলে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল, কিন্তু তার চোখ ছিল নিজের ফোনের স্ক্রিনে। ইনশিরা একবার পুরো ডাইনিং স্পেস আর উযাইনের দিকে চোখ বুলাল। তার বুকের ভেতর এক অপার্থিব সুখের হাওয়া বয়ে গেল। সবকিছু তার কাছে একদম স্বপ্নের মতো লাগছিল—যেন এই পুরুষটার সাথে সংসার করার, তার বাচ্চার মা হওয়ার যে আজন্ম ইচ্ছা সে বুকে লালন করে এসেছে, তা এই ৩ দিনের জন্য হলেও আজ পূরণ হয়ে গেছে!
তখন উমায়ের মুখের ব্রেকফাস্ট চিবোতে চিবোতে হঠাৎ ইনশিরার হাত ধরে আবুরে গলায় বলল—

—”আই উইশ তুমি যদি প্রতিদিন আমাদের সাথে এই বাড়িতে থাকতে! আমরা তিনজন একসাথে ব্রেকফাস্ট করতাম, একসাথে ঘুমাতাম… উফ! কত মজা হতো!”
এই নিষ্পাপ কথা গুলো শুনে, ইনশিরার ঠোঁটের কোণে মায়াবী হাসি ফুটলেও উযাইন নিজের কফির কাপটা টেবিলে একটু শব্দ করে রাখল। সে নিজের ভেতরের অস্বস্তি লুকাতে উমাইরের দিকে কড়া চোখে তাকাল।
—”উমায়ের! স্কুলের হোমওয়ার্ক কমপ্লিট করেছ? যাও, এখনই গিয়ে নিজের রুমে গিয়ে ওটা শেষ করো!”
উমায়ের পাপার এই কড়া ধমক শুনে মুখটা এক সেকেন্ডে বাংলা পাঁচের মতো করে, ঠোঁট উলটে চেয়ার ছেড়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। ইনশিরা উমাইরের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল—

— “তুমি যাও সোনা, আমি একটু পরেই তোমার রুমে আসছি।”
—আচ্ছা
উমায়ের ডাইনিং এরিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর পুরো স্পেসে শুধু উযাইন আর ইনশিরা একা রয়ে গেল। ইনশিরা টেবিল থেকে প্লেটগুলো একপাশে সরিয়ে ধীর পায়ে, গুটিগুটি পায়ে উযাইনের চেয়ারের একদম কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। তার গায়ের বুনো ফুলের সুবাস উযাইনের কানের কাছে এসে আছড়ে পড়ল।ইনশিরা খুব নিচু, শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় ডাকল—
—”উযাইন সাহেব…?”
উযাইন ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ঠান্ডা ও আদুরে গলায় বলল—
—”হুম?”
—”আচ্ছা… উমায়ের দেখতে পুরোপুরি তার মা… মানে সেরিন আন্টির মতো হয়েছে?”
উযাইন কোনো কথা বলল না।ইনশিরা উযাইনের মুখের আরও একটু কাছে ঝুঁকে এসে, ওর চোখের দিকে ইশারা করে বলল—

—”না মানে…উমাইরের চোখ জোড়া তো একদম কুচকুচে কালো। কিন্তু আপনার চোখের আইস ব্লু। উমায়েরকে আপনার চেহারার সাথে একদমই মেলানো যায় না…”
ইনশিরার এই নিখুঁত পর্যবেক্ষণ শোনামাত্রই উযাইন
ভাবে ইনশিরা তার জীবনের অংশ তার অর্ধাংগিনি, ওর অধিকার আছে তার জীবনে। কিন্তু….
উযাইন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং ইনশিরার একদম চোখের দিকে নিজের সেই তীক্ষ্ণ, জ্বলন্ত চোখ দুটো নিবদ্ধ করল।
—ইনশিরা! আমার ব্যক্তিগত বিষয়…
সে উযাইনের সেই জ্বলন্ত চোখের একদম কাছাকাছি এগিয়ে গেল। তারপর নিজের হাতের তালু দুটো বাড়িয়ে এক ঝটকায় প্রফেসর উযাইন আবরারের দুই ফরসা গাল শক্ত করে ধরে ফেলল। উযাইন ইনশিরার হাতের স্পর্শে এক সেকেন্ডে বরফের মতো গলে জল হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে ইনশিরার মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে নিজের মনে মনে এক বুক আকুলতা নিয়ে ভাবল— “এই মেয়েটা এত মায়াবী কেন? কেন ওর একটা ছোঁয়াতেই আমার সমস্ত পুরুষালী অহংকার এক নিমিষে গুঁড়িয়ে যায়?”
ইনশিরা উযাইনের গাল দুটো ধরে পরম মায়ায়, খুব নিচু ও মিষ্টি গলায় বলল—

—”রাগ করবেন না প্রিয়। উমায়ের আমার সন্তান! আমি ওকে নিজের গর্ভজাত সন্তানের মতোই আজীবন ভালোবেসে আগলে রাখব!”
ইনশিরার মুখে নিজেকে “প্রিয়” সম্বোধন এবং উমায়েরকে নিজের সন্তান বলে এই নিঃস্বার্থ মাতৃত্বের ঘোষণাটি শোনামাত্রই উযাইনের বুকের ভেতরের লুকানো সব ক্ষত এক সেকেন্ডে জুড়িয়ে গেল। সে বিস্ময়ে হা করে ইনশিরার দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই ইনশিরা নিজের একটা হাত উযাইনের গাল থেকে নামিয়ে ওর শার্টের কলারের দিকে নিয়ে গেল। সে নিজের কোমল আঙুলের ডগা দিয়ে উযাইনের ফরসা গলার একপাশের সেই লাল হয়ে ফুলে থাকা লাভ বাইট বা কামড়ের দাগগুলো আলতো করে স্পর্শ করল। আবছা আলোয় উযাইনের চোখের দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী, নেশাতুর মুচকি হাসি দিয়ে ফিসফিস করে বলল—

—”দেখুন তো… আপনার গলার দাগগুলো দেখলে মনে হয়, যেন চাঁদে দাগ লেগেছে! চাঁদের কলঙ্কও তো দেখতে ভারী চমৎকার লাগে।
ইনশিরার এই চরম কাব্যিক ছোঁয়া আর ঠোঁটের কাছাকাছি এসে যাওয়া তপ্ত নিশ্বাসে উযাইনের বুকের ভেতরটা ওলটপালট হয়ে গেল। তার আক্ষরিক অর্থেই দম আটকে আসছিল, সে নিজের হাত দুটো মুঠো করে কোনোমতে নিজেকে ঠিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।
ইনশিরা উযাইনের সেই কাঁপতে থাকা ঠোঁটের আরও একটু কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেল। তাদের মাঝখানের দূরত্ব তখন মাত্র এক ইঞ্চি, একজনের ওম অন্যজনকে জ্বালিয়ে খাক করে দিচ্ছিল।
ইনশিরা উযাইনের চোখের মণির দিকে নিজের চোখ জোড়া ডুবিয়ে দিয়ে, পরম আকুলতায় বলল—
—”উযাইন সাহেব… আমি আপনাকে খুব… খুব বেশি ভালোবাসি। এই ১৯ বছরের জীবনে আপনাকে ছাড়া অন্য পুরুষকে ভাবার ক্ষমতা আমার নেই।”
উযাইনের ভেতরের সমস্ত সামাজিক নিয়ম আর বয়সের দেয়াল এবার, সেকেন্ডে ধুলোয় মিশে গেল। তার চোখ জোড়া ছলছল করে উঠল, সে নিজের সমস্ত গাম্ভীর্য ভুলে, ইনশিরার চোখের দিকে তাকিয়ে এক চরম অসহায় ও তীব্র মায়াবী গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল—

—”কে…কেন বারবার আমার সামনে এসে এমন করো, ইনশিরা? কেন আমাকে নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করো তুমি? আমারও কষ্ট হয়”
উযাইনের এই একটা লাইনের আকুলতা আর ভাঙা কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই ইনশিরার ঠোঁটের কোণে এক স্বর্গীয়, লাজুক বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে এক নিমিষেই বুঝতে পারল—তার এই সাধের, স্বপ্নের শখের পুরুষটাও তাকে তার নিজের চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসে! উযাইন মুখে যতই ডিভোর্সের নাটক করুক না কেন, মনে মনে সে ইনশিরার মায়ায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে, শুধু সমাজের ভয়ে মুখ ফুটে তা স্বীকার করতে পারছে না।
ইনশিরা চোখ বন্ধ করে, উযাইনের বুকের ওপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে নিচু স্বরে আকুতি জানাল—

—”প্লিজ… উযাইন! আর দূরত্ব বাড়াবেন না…”
উযাইন নিজের আত্মসমর্পণ দেখে, নিজেই থমকে গেল, বুঝতে পারল আর এক সেকেন্ড এখানে দাঁড়ালে সে আর নিজেকে সামলাতে পাবে না। নিজেকে ইনশিরার হাত থেকে মুক্ত করে দুই পা পিছিয়ে গেল। তারপর কোনো কথা না বলে, বাহিরের দিকে চলে গেল।
ইনশিরা উযাইনের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসল। সে চোখের জল মুছে এক পরম শান্তিতে ধীর পায়ে ওপরে উমাইরের রুমের দিকে হেঁটে গেল।
আর উযাইন সোজা বাইরে বেরিয়ে গেল গাড়ি নিয়ে, গাড়িটা নিয়ে থামালো টেমস নদীর এখানে। চুপচাপ বেরিয়ে গেল আর নদী পাড়ে দাড়ালো, হাল্কা বাতাস বইছে, আসেপাশে তুষার জমে স্তুপ হয়ে আছে। উযাইনের এলোমেলো চুল গুলো উরছে, তার চোখ জোড়াতে অতৃপ্তি। উযাইন নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, তাদের প্রথম দেখার কথা সেই কাদায় মাখামাখি কিশোরী মেয়েটা। যে তার মনে নিষিদ্ধ ঝড় তুলেছিল। তাদের বিয়ে টা হয়তো অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল
আর উযাইনের মনে, তখন ছিল অপরাধবোধ সামাজিক ও বন্ধুত্বের দ্বিধা বাধ্যবাধকতা। কিন্তু এই পিচ্চি মেয়ে টার এত জেদ আর তার বাঘীনিরুপ উযাইনকে বরাবরই মুগ্ধ করত। যদিও সে ভেবেছিল এই সম্পর্ক পরিনয় পেলে হয়তো ইনশিরার জন্য কষ্টকর হবে, চারপাশের মানুষ আর রিলেটিভ রা ইনশিরাকেই অপমান করত ভুল বুঝত কারন এই সমাজে সবসময় মেয়েদেরকে ছোট করা হয়, মানুসিক ভাবে অত্যাচারিত হতে হয়, তাদেরকেই দোষারুপ করা হয়…আরও অনেক। এই দুনিয়াটা পুরুষ জাতির থেকে নারী জাতির জন্য বেশ কঠিন।

আর এগুলো তিতকুটে হলেও চরম বাস্তবতা।
আর উযাইন এসব ভেবেই বিচ্ছেদ চেয়েছিল, কিন্তু মেয়ে টা যে তার চেয়েও বেশি আসক্ত তার প্রতি। তা বুঝার পর, উযাইনের সব দ্বিধা উরে যায়। আর সেও উরে আসে ইউকে, তার পিচ্চি পাখিটাকে সময় দেওয়ার জন্য। কিন্তু ইনশিরার যে, তার এই আসক্তির টানে ইউকে পর্যন্ত ছুটে আসবে তা ওর ধারণার বাইরে ছিল। তবে যদি আজ ইনশিরা না আসত বা এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়েটা ভুলে যেত তাহলে কি তার প্রফেসর সাহেব তাকে ভুলে যেত? কখনোই না! হয়তো তখন পরিস্থিতি ভিন্ন হতো, এত কোমলতা থাকত না। এই উন্মাদ পুরুষটা তার শখের নারীকে তুলে নিয়ে এসে তার খাচায় বন্দী করত…হ্যা উযাইনের ধারণা এমনই ছিল। সে খুব শীগ্রই বিডিতে ব্যাক করত, আর এমন টাই করত।
কিন্তু এখানে তো তার পিচ্চি পাখিটাও তার প্রতি আসক্ত যা তাকে আরও বেসামাল করে তুলে, আর সে জন্যই উযাইনের ভালবাসায় কোনো হিংস্র*তা নেই। আছে বেসামাল উন্মাদনা আর পাগলামি যা এখন থেকে তার লিটল বার্টকে সইতে হবে…
আর এই ভাবনা গুলো শেষেই তার ঠোঁটের কোনে এক হাহাকারময় আর অতৃপ্তি মাখানো হাসি নিয়ে গুনগুন করে এগোতে লাগলো—
আলতো ছোঁয়ায় চোখের চাওয়ায়
পাওয়া না পাওয়ার কি যে নেশা
সেই স্মৃতিটাই আজও হাতরাই
হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা

সময় গড়িয়ে দুপুর পার হয়ে এখন মিষ্টি বিকেল নেমে এসেছে লন্ডনের বুকে।
ইনশিরা সারাদিন ধরে উমাইরের দেখাশোনা করলেও তার মনটা পড়ে ছিল উযাইনের ওপর। সে বারবার উযাইনের স্টাডি রুম আর গেটের দিকে তাকাচ্ছিল। বিকেল ৫টায়
ইনশিরা যখন দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিল, তখন সে দূর থেকে দেখতে পেল উযাইনের পরিচিত সেই কালো গাড়িটা এসে বাড়ির মেইন গেটের সামনে থামল। ইনশিরার বুকের ভেতরটা খুশিতে এক নিমেষে নেচে উঠল—প্রফেসর সাহেব তবে অবশেষে ফিরেছেন!
কিন্তু ঘটনার মোড় ঘুরল অন্য দিকে। প্রায় আধা ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও উযাইন যখন দোতলায় বা লিভিং রুমে এলো না, তখন ইনশিরা কৌতূহল নিয়ে নিচে নেমে এলো। সে পুরো ড্রয়িংরুম, কিচ্ছন এবং উযাইনের স্টাডি রুম খুঁজে দেখল—কিন্তু কোথাও উযাইন নেই! ইনশিরা চরম অবাক হয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। গাড়িটা ঠিক ওভাবেই পার্কিং লটে লক করা অবস্থায় বাইরে পড়ে আছে, কিন্তু মানুষটা এক নিমেষে যেন বাতাস হয়ে গেছে!
দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে লন্ডনের আকাশে এখন সন্ধ্যার ধূসর অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। বাড়ির সাইড লাইটগুলো একা একাই জ্বলে উঠল। ইনশিরা লিভিং রুমে এসে দেখল উমায়ের কার্পেটের ওপর বসে মন দিয়ে লেগো ব্লক দিয়ে খেলছে। ইনশিরা উমাইরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল এবং ওর মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করল—

—”আচ্ছা উমায়ের সোনা… তোমার পাপা তো একটু আগে গাড়ি নিয়ে বাসায় এসেছিল, কিন্তু আমি পুরো ঘর খুঁজলাম, ওনাকে তো কোথাও পেলাম না।
উমায়ের খেলা থেকে চোখ না সরিয়েই, খুব ক্যাজুয়াল কিউট গলায় বলল—
—”ওহ! পাপা বোধ হয় ব্যাকইয়ার্ডে গেছে আবার…”
—”ব্যাকইয়ার্ডে? এতক্ষণ পেছনের বাগানে একা একা কী করছে?”
উমায়ের এবার ইনশিরার দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখ করে নিষ্পাপ গলায় বলল—
—”আরেহ না, শুধু ব্যাকইয়ার্ড না। ব্যাকইয়ার্ড পার হয়ে লেফট সাইডের রাস্তার পরে যে একটা সুন্দর গ্রেভইয়ার্ড আছে না? পাপা সবসময় ওখানেই যায়…”
‘কবরস্থান’ শব্দটা ইনশিরার বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক অজানা আতঙ্কে ধক করে উঠল! সে স্তব্ধ হয়ে উমাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। উযাইন কেন এতক্ষণ ধরে একটা কবরস্থানে একা বসে থাকবে?
ইনশিরা নিজের কাঁপানো গলাটা সামলে নিয়ে—

—”উমায়ের… ওটা কি তোমাদের নিজেদের জায়গা?”
—”হ্যাঁ! ওটা আমাদের ফ্যামিলি গ্রেভইয়ার্ড। ওখানে আমাদের অনেক চেনা মানুষ ঘুমিয়ে আছে। পাপা মন খারাপ হলেই ওখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে।”
উমাইরের এই ছোট্ট কথার আড়ালে যে আছে, তা ইনশিরা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। ইনশিরা ভাবলো এখানে ওদের ফেমিলি গ্রেভইয়ার্ড মানে? উনার ফেমিলির সবাই তো জীবিত
ইনশিরা উমাইরের গালে একটা আলতো ওম ছড়ানো চুমু দিয়ে নিজের ভয় লুকাতে বলল—
—”আচ্ছা সোনা… তুমি খেলা করো। আমি চট করে কিচেনে যাই।
বলেই ইনশিরা কিচেনে যাওয়ার বাহানা করলেও তার পা দুটো কিচেনের দিকে গেল না। সে অত্যন্ত চিন্তিত, ব্যাকুল আর উৎকণ্ঠিত মুখে লম্বা লম্বা পা ফেলে সোজা পেছনের সেই অন্ধকার ব্যাকইয়ার্ডের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সন্ধ্যার সেই কুয়াশা আর ঠাণ্ডা হাওয়ার বুক চিরে সে উযাইনের সেই লুকানো অতীত আর তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যের মুখোমুখি হওয়ার জন্য কবরস্থানের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করল।

সন্ধ্যার ধূসর অন্ধকার আর কনকনে ঠান্ডা কুয়াশা তখন চারিদিকের পাইন গাছগুলোকে ঢেকে ফেলেছে। এক কোণে, সবুজ ঘাসের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে ছিল উযাইন। তার সেই চিরচেনা গম্ভীর ও প্রফেশনাল রূপটা আজ কোথাও নেই; সে একবারে ভেঙে পড়া এক বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল । তার ঠিক সামনেই পাশাপাশি দুটো কবর ঘুমিয়ে আছে—তার আদরের ছোট বোন আর তার হাজবেন্ড।
উযাইন কোটের পকেট থেকে উমাইরের একটা মিষ্টি হাসিমুখের ছবি বের করল। সে কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে ছবির উমাইরের ফেসটা ছুঁয়ে, কান্নাভেজা ভাঙা গলায় কবরের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল—
—”দেখ তো… তোর ছোট্ট উমায়ের আজ কত বড় হয়ে গেছে! ও দেখতে ঠিক তোর মতোই মায়াবী হয়েছে। আমি ওকে আমার নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসি। তুই চলে যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত ওকে আমি এভাবেই নিজের বুকের ভেতর আগলে রেখেছি। ও-ই আমার লাইফের সব… ওর ওই নিষ্পাপ চোখের মাঝে আমি প্রতিটা মুহূর্ত তোকেই খুঁজে পাই। কিন্তু তুই… তুই কেন তোর ভাইটাকে একা ফেলে চলে গেলি?”
উযাইন এক হাত দিয়ে নিজের চোখ জোড়া মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে কবরের ভেজা মাটিটা আলতো করে ছুঁয়ে আবার বুক ফাটানো হাহাকার নিয়ে বলল—

—”জানিস আম্মু আর ডেড যখনই ফোন করে মন খারাপ করে বলে—তুই বোধ হয় আমাদের ভুলে গেছিস… তখন আমার কলিজাটা যেন ছিঁড়ে যায়! তোর শেষ কথা আর অনুরোধটা রাখতে গিয়ে আজ পর্যন্ত আমি কাউকেই কিছু বলতে পারলাম না, তুই একদম চিন্তা করিস না… উমায়ের এই দুনিয়ায় একা নয়। ও আমার নিজের অংশ! আমি ওকে এই জীবনে কোনোদিন কোনো কিছুর অভাব বুঝতে দেব না। আমরা দুজন দুজনের পরম আশ্রয়… আমার কোনো আফসোস নেই, শুধু কষ্ট একটাই যে আজ তুই আমার পাশে নেই!”
উযাইন নিজের পকেট থেকে উমাইরের আঁকা আরেকটা কিউট ছবি বের করে মায়াবী গলায় হেসে বলল—
—”জানিস… তোর ছেলের শখ ও বড় হয়ে নাকি পাইলট হবে! যদিও এ নিয়ে আমি ভীষণ ভয় পাই, কিন্তু ও আমার গলা জড়িয়ে ধরে পরম মায়ায় বলে—

—’পাপা… আমি আকাশে উড়তে চাই”
তখন আমি আর কিছু বলতে পারি না। উমায়েরই তোর একমাত্র চিহ্ন। আমাইরা! আজ কতগুলো বছর হয়ে গেলো তুই আদুরে গলায় ভাইয়া ডাকিস না, কোনো বায়না ধরিস না?
সন্ধ্যার এই নিস্তব্ধতায় উযাইনের প্রতিটি ভাঙা কণ্ঠস্বর ইনশিরার কানে তীরের মতো এসে বিঁধেছে। সে প্রথমে কিছুই মাথায় মেলাতে পারছিল না—এটা কাদের কবর? উযাইন এখানে দাঁড়িয়ে কার সাথে কথা বলছে?
কিন্তু উযাইনের মুখ থেকে যখন একে একে বের হওয়া কথা গুলো ইনশিরার মগজে এক বিশাল বজ্রপাত হলো! সকালের সেই উমাইরের কালো চোখ আর উযাইনের আইস ব্লু চোখের অমিলের ধাঁধাটা এক সেকেন্ডে তার চোখের সামনে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল!
ইনশিরা আর নিজের ভেতরের ব্যাকুলতা চেপে রাখতে পারল না। সে ধীর পায়ে, কুয়াশার বুক চিরে উযাইনের একদম পেছনের দিকে এগিয়ে গেল। উযাইনের সেই কাঁপতে থাকা চওড়া কাঁধটার ওপর নিজের নরম কোমল হাতটা আলতো করে রাখল।
ইনশিরা খুব নিচু, কাঁপা এবং চরম ব্যাকুল কণ্ঠে সরাসরি জিজ্ঞেস করল—

রুহ এ ইশক পর্ব ১৮

—”আপনি উমাইরের বায়োলজিক্যাল বাবা নন?! উমায়ের আপনার নিজের সন্তান নয়?!”
ইনশিরার এই আচমকা কণ্ঠস্বর আর নিজের কাঁধে তার হাতের স্পর্শ লাগামাত্রই উযাইনের পুরো শরীর যেন এক সেকেন্ডে বরফের মতো জমে গেল! তার বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দন এক লাফে থমকে দাঁড়াল। সে তীব্রভাবে চমকে উঠে। বড় বড় চোখ করে ঝট করে পেছনের দিকে ফিরে তাকাল। চাঁদের আবছা আলোয় সে দেখল—ইনশিরা চোখ ছলছল করছে তার দিকেই তাকিয়ে আছে! উযাইনের মুখের সমস্ত রঙ এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।

রুহ এ ইশক পর্ব ২০