Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ১৮

রুহ এ ইশক পর্ব ১৮

রুহ এ ইশক পর্ব ১৮
আনান রোজ

উযাইনের মনে তখনো সেই তপ্ত মুহূর্তের রেশ, চোখ জোড়া নেশায় বুদ হয়ে আছে। সে যেন আবারও তার পিচ্চি বউয়ের ভালবাসায় মন আর মস্তিষ্কের কাছে হেরে গেছে। কিন্তু এবার কোনো অপরাধবোধ নেই, আছে আত্মসমর্পন। এই আকস্মিক চিৎকারে উযাইন ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো তার বুকটা ছিটকে উঠল। কোনো বিপদ হলো না তো, এই ভেবে সে আর এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে সিঁড়ি দিয়ে প্রায় লাফিয়ে নিচে ডাইনিং এরিয়ার দিকে ছুটে গেল। কিন্তু ডাইনিং স্পেসে পা রাখামাত্রই উযাইন বিস্ময়ে এক জায়গায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল! তার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল।

সে দেখল—বিশাল সুদৃশ্য ডাইনিং টেবিলের ওপর সাজানো রয়েছে ইনশিরার নিজের হাতে রাঁধা ধোঁয়া ওঠা গরম গরম চমৎকার সব খাবার। আর টেবিলের মেইন লাইটগুলো বন্ধ করে চারপাশ জুড়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি সুগন্ধি মোমবাতি। মোমের সেই কাঁপতে থাকা মায়াবী আলোর মাঝে পুরো টেবিল এবং তার চারপাশের মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাজা লাল গোলাপের পাপড়ি! ঘুটঘুটে অন্ধকারের পর এই মায়াবী ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের চমৎকার পরিবেশ উযাইনের মনের ভেতরের সব ক্লান্তি আর কঠোরতাকে এক সেকেন্ডে গলিয়ে দিল। টেবিলের একপাশে উমায়ের আর অন্যপাশে ইনশিরা—দুজনেই উযাইনের মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিল।
উমায়ের চেয়ার থেকে উঠে এসে উযাইনের হাতটা শক্ত করে ধরল। সে টেনে নিয়ে উযাইনকে ডাইনিং চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বড় বড় চোখ করে বলল

—”পাপা… আমরা তোমার জন্য কত কষ্ট করে রান্না করেছি! আমার খুব খিদে পেয়েছে, এবার বসো প্লিজ?”
উযাইন ধীর পায়ে চেয়ারে বসল। সে ইনশিরার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারছিল না। তার বুকের ভেতর আবার সেই চিরচেনা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হলো—
“মেয়েটা বারবার আমাদের এভাবে আপন করে নিচ্ছে। পিচ্ছি টা তো নিজের সমবয়সী কারো সাথে একটা সুন্দর লাইফ ডিজার্ভ করে। ও নিজের লাইফটা আমার মতো একজনের পেছনে নষ্ট করছে?”
ঠিক তখনই ইনশিরা মুচকি হেসে চেয়ার থেকে উঠে এলো। সে খুব যত্নে উযাইন আর উমাইরের প্লেটে নিজের রান্না করা ধোঁয়া ওঠা গরম গরম বিরিয়ানি আর কাবাব তুলে দিতে লাগল। ইনশিরা যখন খাবার দিচ্ছিল, উমায়ের হঠাৎ ইনশিরার জামার কোণাটা ধরে টেনে খুব করুণ ও নিষ্পাপ গলায় বলল—
—”ইনশিরা… আমাকে একটু খাইয়ে দিবে? আমার ফ্রেন্ডরা বলে, ওদের মায়েরা নাকি রোজ ওদের খাইয়ে দেয়। কিন্তু আমার তো…”

একটা নিষ্পাপ বাচ্চার মুখে এই মায়ের অভাবের কথা শোনামাত্রই ইনশিরার বুকের ভেতরটা তীব্র এক কষ্টে খামচে ধরল। তার চোখ দুটো মায়ায় ছলছল করে উঠল। সে এক মুহূর্তও দেরি না করে উমাইরের পাশে বসে পড়ল। ওর চিবুকটা ছুঁয়ে অত্যন্ত আদরমাখা গলায় বলল—
—”কে বলেছে তোমার মা নেই, সোনা? কেন খাইয়ে দেব না বলো? আজ থেকে আমি তোমাকে সবসময় খাইয়ে দেব, একদম মন খারাপ করবে না…”
বলেই ইনশিরা প্লেট লোকমা উমাইরের মুখে খাবার তুলে দিতে লাগল। উযাইন নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে না থেকে মুগ্ধ হয়ে ইনশিরার এই অপরূপ মাতৃত্বের রূপের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনের ভেতরের সব শক্ত পাথর যেন গলে জল হয়ে যাচ্ছিল।
উমায়ের মুখের খাবার চিবোতে চিবোতে চোখ বন্ধ করে তৃপ্তির স্বরে বলল—
—”আহ! ইনশিরা… তোমার হাতে যাদু আছে! রান্নাটা অনেক টেস্ট হয়েছে, তাই না পাপা?”
উমাইরের মুখে এই “যাদু আছে” এবং “অনেক টেস্ট” শোনামাত্রই উযাইনের চোখের সামনে এক সেকেন্ডে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ভেসে উঠল একটু আগের অন্ধকারের সেই সোফার দৃশ্য!
ইনশিরার সেই মায়াবী নরম ঠোঁটের তপ্ত ছোঁয়া, ঠোঁটে কামড়ে দেওয়ার তীব্র উন্মাদনা আর ইনশিরার সেই কাঁপতে থাকা শরীর—সবকিছু তার মাথায় এক ধাক্কায় ভর করল। সে সম্পূর্ণ আনমনে, এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ডুবে গিয়ে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলে উঠল—

—”হুম… অনেক…!”
উযাইনের মুখ থেকে এই গভীর এবং রহস্যময় জবাব শুনে ইনশিরা এক পলক উযাইনের দিকে তাকাল। কারণ টা বুঝতে পারল না ইনশিরা।
উমায়ের খেতে খেতে হঠাৎ ইনশিরার দিকে তাকিয়ে বেশ পাকা মানুষের মতো বলল—
—”ইনশিরা… তুমি শুধু আমাকেই খাইয়ে দিচ্ছ কেন? পাপা কেউ খাইয়ে দিচ্ছ না!”
ছেলের মুখ থেকে এই মারাত্মক আবদার শোনামাত্রই উযাইনের গলায় বিরিয়ানির চাল আটকে গেল! সে তীব্রভাবে কাশি দিতে লাগল। সে তাড়াতাড়ি পানির গ্লাসটা মুখে তুলে নিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল—
—”না! লাগবে না! আই ক্যান ইট মাইসেলফ!”
ইনশিরা উযাইনের এই ভড়কে যাওয়া ফেসটা দেখে মনে মনে খুব হাসল।
—”আরেহ উমায়ের সোনা, তোমার পাপাকে খাইয়ে দিতে হবে না। পাপা তো বুড়ো হয়ে গেছে! বুড়ো মানুষরা নিজের খাবার নিজেই খেতে পারে। তুমি তো আমার একমাত্র ছোট্ট বেবি, তাই তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছি!”
সে উযাইনকে আরও একটু ক্ষ্যাপানোর জন্য উমাইরের চুলে বিলি কেটে দিয়ে দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল। এদিকে, ইনশিরার মুখে নিজেকে “বুড়ো হয়ে গেছে” শুনে প্রফেসর উযাইন আবরারের পুরুষালী ইগোতে চরম ধাক্কা লাগল! সে হাতের চামচটা প্লেটে রেখে ইনশিরার দিকে অত্যন্ত কটমট চোখে তাকাল। তার চোখের মণি যেন বলছিল—

—”আমি বুড়ো?! একটু আগেই তো এই বুড়ো পুরুষের বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছিলে, তখন তো বুড়ো মনে হয়নি!”
কিন্তু, পিচ্ছি উমায়ের বড়দের এই চোখের যুদ্ধ কিছুই বুঝল না। সে ইনশিরার হাতটা ধরে জেদ ধরল—
—”না! তুমি পাপাকেও দেবে! পাপা, তুমি হা করো! ইনশিরা, দাও না পাপাকে…”
ইনশিরা এবার চরম অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কারণ সে বুঝতে পারছে উযাইন এখন রাগে ফুঁসছে, আর উমাইরের সামনে সে এই আবদার এড়াতেও পারছে না। ইনশিরা কাপতে থাকা হাতে চামচে করে একটু খাবার নিয়ে উযাইনের মুখের সামনে ধরল।
উমায়ের খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল—

— “দাও? পাপা, এবার এদিকে ফোরো! হা করো!”
উযাইন গম্ভীর মুখে ইনশিরার ওই কাঁপতে থাকা হাত আর চামচের দিকে তাকিয়ে রইল। মোমের আবছা আলোয় ইনশিরা আর উযাইনের চোখ এক হয়ে গেল, পুরো ডাইনিং স্পেসে এক তীব্র রোমান্টিক অথচ দমবন্ধ অস্বস্তি নেমে এলো।
ইনশিরার কাঁপতে থাকা হাতের চামচটার দিকে তাকিয়ে উযাইন ভেতরের সমস্ত কঠোরতা যেন এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। ইনশিরা আড়চোখে খেয়াল করল, উযাইন আর আগের মতো রাগ করছে না বা চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে না। তার মুখাবয়ব একদম শান্ত। ইনশিরা মনে মনে ভাবল—হয়তো উযাইনও অবচেতন মনে এটাই চাইছেন!
সে নিজের কাঁপতে থাকা হাতটাকে একটু শক্ত করে চামচটা সরাসরি উযাইনের ঠোঁটের কাছে ধরল। এবার উযাইন কোনো নাটক করল না, কোনো রকম দ্বিধা বা ইগো ছাড়াই খুব স্বাভাবিকভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে ইনশিরার হাত থেকে সেই লোকমাটা মুখে তুলে নিল। চামচের সেই ছোঁয়ায় পুরো ডাইনিং টেবিলের মোমের আলোটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল।
উমায়ের নিজের সিটে বসে খুশিতে হাততালি দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল—

—”ওয়াও পাপা! আই নিউ ইট! তুমি ইনশিরার হাতের খাবার ঠিকই খাবে!”
ইনশিরা নিজেও উযাইনের এই আকস্মিক ও সহজ আত্মসমর্পণ দেখে চরম অবাক হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। সে ভাবতেই পারেনি এই জেদি পুরুষটা এত সহজে মেনে নেবে। কিন্তু উযাইন খাবারটা চিবোতে চিবোতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে নিজের চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে একদম স্বাভাবিক গলায় বলল—

—”তোমরা ডিনার কন্টিনিউ করো। কিছু জরুরি অফিশিয়াল কাজ বাকি আছে, আমাকে যেতে হবে।”
বলেই উযাইন আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে গম্ভীর পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। উযাইনের এই হুট করে চলে দেখে ইনশিরার মনটা এক নিমেষে খারাপ হয়ে গেল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার উমায়েরকে খাওয়াতে মনোযোগ দিল। তবে উযাইন ব্যস্ততা দেখানোটা নিতান্তই বাহানা সে রুমে না গিয়ে, গেল ব্যাক ইয়ারডে ওখানে গ্যারেজের পাশের রুম টায় তালা খুলে প্রবেশ করল, রুমটা বেশ অন্ধকার সে পরিচিত যায়গা থেকে চুইচ চাপলো, আর মুহূর্তেই আবছা আলো জ্বলছে উঠে উযাইন কিছু এগিয়ে গেল তার সামনে একটা দেওয়াল! তবে এটা কোনো সাধারণ দেওয়াল না, সেখানে ঝুলে আছে কারো অসংখ্য ছবি। উযাইন একটা ছবির সামনে এগোলো, ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটা কিশোরী মেয়ে পড়নে শুভ্র সাদা রঙের একটা গাউন জামা বুকে ওরনা ভাজ করা আর তার কবজি জোড়াতে লাল গোলাপের মালা পেচানো। হাত গুলো কাম্পন রত ছিল বোধহয়, মাথা টকটকে লাল রঙের একটা ওরনার মতন যা মেঝে অব্দি ছরিয়ে আছে, ঘোমটার আরালের মুখ টা স্পষ্ট দেখা না গেলেও উযাইন তা অনুভব করছে সে নেশালো গলায় বলে উঠে—

—বউ…..
এই ছবিটায় ইনশিরা! এটা তাদের বিয়ের আগ মুহূর্তের ছবি। সুমি যখন তার এনগেজমেন্ট এর লাল ভেইল টা ইনশিরার মাথায় পড়িয়ে দিচ্ছিল তখনকার ছবি এটা। ওই দেয়ালে শুধু একটা না ইনশিরার জন্মের পর থেকে উনিশ বছরের অনেক মুহূর্ত ফ্রেমে বন্ধী।
উযাইন ছবি গুলো স্পর্শ করতে করতে, বেশ আওয়াজ করেই বলে—
— “তুমি যা ভাবছ তা সত্য নয়! তোমাকে দূরে রেখেছিলাম কারন আমি বড্ড বেসামাল হয়ে উঠেছিলাম। শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম সোনা! তাই তোমাকে মুক্ত রেখেছিলাম। কিন্তু আবির বোধহয় দখলদারি চাইছে?আর তোমার পাগলামীও বেড়েছে। তাই এবার বন্ধী হওয়ার পালা….

ডিনার শেষ করে উমায়ের বেডরুমে চলে যাওয়ার পর, ইনশিরা নিজের রুমে এলো ফ্রেশ হতে। সে ব্যাগ থেকে একটা জামা বের করে নিজের গায়ের কুর্তিটা চট করে চেঞ্জ করতে লাগল। আর এই মুহূর্তেই ঘরের দরজায় কোনো রকম নক না করেই হুট করে ভেতরে প্রবেশ করল উযাইন !
ইনশিরা নিজের গায়ের কাপড় অর্ধেক খোলা অবস্থায় উযাইনকে ওভাবে ঢুকতে দেখে চরম থতমত খেয়ে গেল! সে তীব্র লজ্জায় আর অস্বস্তিতে ওড়না টা নিয়ে, নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। তার গাল দুটো, কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল।
উযাইন ঘরে ঢুকে ইনশিরার এই হাঁপাতে থাকা আর আড়াল হওয়ার ছটফটানি দেখে বিন্দুমাত্র লজ্জিত হলো না। যদিও কিছু দেখেনি সে। সে দরজার পাশে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে এক চতুর, পুরুষালী ও গম্ভীর হাসি এনে সরাসরি ইনশিরার চোখের দিকে তাকাল।
উযাইন খুব ঠান্ডা, শান্ত এবং বোল্ড গলায় বলল—

—”এত ঢং করছ কেন? নতুন করে দেখার তো কিছু বাকি নেই! আগে যা ছিল, এখনো ঠিক তা-ই আছে।”
উযাইনের থেকে এমন কথা শোনামাত্রই ইনশিরার চোখের মণি চড়কগাছ হয়ে গেল, তার চোয়াল ঝুলে পড়ল! সে নিজের ওড়না টা আরেকটু চেপে ধরে তীব্র অবাক হয়ে কাঁপা গলায় বলল—
—”মানে?! কী বলতে চাচ্ছেন আপনি? আগে মানে কখন…আপনি কখন দেখ…?”
উযাইন নিজের পকেট থেকে হাত বের করে দরজার হাতলটা ধরল। সে ইনশিরার ওই লাল হয়ে থাকা ফেসটার দিকে তাকিয়ে এক গভীর ও রহস্যময়ী গলায় জবাব দিল—
—”আজ থেকে ঠিক ১৯ বছর আগে… জুনের ২৮ তারিখ!”
বলেই উযাইন ইনশিরাকে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দিল না। সে চট করে বলল—
—”উমায়ের তোমাকে ডাকছে, ওর রুমে যাও।”
কথা শেষ করেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে ধড়াস করে দরজা বন্ধ করে চলে গেল।
ইনশিরা ঘরের মাঝখানে আধখোলা জামা নিয়ে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মগজে উযাইনের কথা গুলো অনবরত ঘুরতে লাগল—

“আজ থেকে ১৯ বছর আগে জুনের ২৮ তারিখ…”।
ইনশিরা নিজের মনে মনে দিনটার হিসাব মেলাতে মেলাতে হঠাৎ ওর চোখ দুটো চরম লজ্জায় বড় বড় হয়ে উঠল! সে নিজের গালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল—
“জুনের ২৮ তারিখ মানে…! হ্যাঁ! আমার বার্থডেট তো জুনের ২৭ তারিখ! তার মানে আমার জন্মের পরদিন হসপিটালে এই লোকটা আমাকে প্রথম দেখেছিল।
পুরো সত্যটা মাথায় আসতেই ইনশিরা লজ্জায়, শিহরণে আর এক অদ্ভুত আবেশে বিছানার ওপর বসে পড়ল। সে নিজের ফর্সা মুখটা দুই হাত দিয়ে ঢেকে নিয়ে লাল টমেটো হয়ে ডিল মেলাতে মেলাতে রাগী আদুরে গলায় বলে উঠল—

“উফফ! বেহায়া লোক একটা! এত বছর আগের ওই দিনের কথা তুলে আমাকে এভাবে লজ্জা দিল?!”
ইনশিরা কথা গুলো বলার পর সোজা বাড়ান্দায় গেল। তার চোখে মুখে চিন্তার ছাপ, তবে তা কৌতুহল মেশানো। সে রেলিং ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে বাহিরে স্নো ফল হচ্ছে সেই সাথে হাড়কাপানো ঠান্ডা বাতাস। ইনশিরা মুচকি হাসলো, যা হয় ভালোর জন্যই হয় তার প্রমাণ আজ সে পেল। সকালের কথা গুলোর আর বিকেলের ওই ঘটনার পর উযাইন অনেকটা বদলেছে তা সে অনুভব করতে পারছে। বিকেলে কফি বানাতে না গেলে হয়তো শর্ট সার্কিট হত না আর সে উযাইনের চোখে তার জন্য ভয় দেখতে পেত না। ওই সময় ইনশিরা স্পষ্ট দেখেছিল উযাইনের চোখে তাকে হারানোর ভয়।
ইনশিরা শুন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠে
—”উযাইন এত দ্রুত হবে জানতাম না। হয়তো তিন বছর অনেক লম্বা সময়, কিন্তু ইউকে তে আসার পর সবকিছু যেন স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর হচ্ছে। আপনি আমার অনেক শখের…আমি জানি খুব শীগ্রই আত্মসম্পন ঘটবে….”
ইনশিরার ভাবনার মাঝেই উমায়েরের ডাক শুনা গেল।

রাত প্রায় সারে ১১টা বাজে
উযাইন শাওয়ার নিয়ে এলো, বাহিরে এত ঠান্ডা তাও তার গরম লাগছে কেন সে বুঝতে পারছে না।
সেও বারান্দায় গেলো বাহিরের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে মনে মনে ভাবলো—
—অনেক হয়েছে আর না বউ! বি প্রিপেয়ার্ড ওয়াইফি…
উযাইন তার চুল গুলো, ঠেলে কপাল থেকে পিছনে সরালো। ভেজা চুল গুলো থেকে টুপটাপ পানির ফোঁটা পড়ছে, এডামস অ্যাপলটা তীব্র ভাবে ওঠানামা করছে। তার নীলচে চোখ জোড়াতে অন্ধআসক্তি স্পষ্ট।
সে আবার সামনের দিকে তাকালো তার বাড়ির এককোন থেকে দূরে থাকা লন্ডন আই টা আবছা ভেসে উঠে, উযাইন ওইদিকেই তাকিয়ে আছে—

এই তিন বছরের দুরত্বটা জরুরি ছিল লিটল বাড! তোমার বড় হওয়ার জন্য, আমাকে সামলানোর জন্য আর…আরো অনেক। তোমার থেকে কষ্ট এ আমি ছিলাম প্রতি মুহূর্ত ছটফট করছি, হ্যাঁ এটা বেমানান পয়ত্রিশ বছর একজন পুরুষ ষোলো বছর বয়সী কিশোরীর প্রেমে উন্মাদ। কিন্তু আমার তাতে কিছু যায় আসে না। আমি তোমাকে কখনোই ছেড়ে দিতাম না তুমি চাইলেও না। প্রয়োজনে তোমাকে শেকল বেধে রাখতাম। গার্ল আইম অবসেস্ট! ইউ আর দ্য ফা*কিং অবসেশন মাই লিটল বার্ড!
তখন উযাইনের রুমের দরজায় নক পড়ল। উমায়ের আর ইনশিরা গুটিগুটি পায়ে এসে হাজির হলো, উযাইনের রুমে….

রাত ১২ টা বাজল ঘরিতে, উমায়ের কিছুতেই একা ঘুমাতে চাইল না, সে ইনশিরার হাত ধরে সোজা টেনে নিয়ে এলো উযাইনের বেডরুমে। উমায়ের বিছানার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে জেদ ধরল— আজ রাতে সে পাপা আর ইনশিরা… দুজনকে একসাথে নিয়েই ঘুমাবে!
ইনশিরার এতে বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা বা আপত্তি ছিল না, কারণ তারা তো মেরিড। কিন্তু উযাইন এই আবদার কিছুতেই মানতে পারছিল না। সকাল থেকে যা হয়েছে, সব মিলিয়ে উযাইনের ভেতরের সত্ত্বাটা ইনশিরার প্রতি চরমভাবে ডেসপারেট হয়ে আছে। এই অবস্থায় এক সাথে মানে নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারানো!

উযাইন উমায়েরকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, ধমক দেওয়ার নাটক করল— উমায়ের আজ নাছোড়বান্দা। সে কান্নাভেজা মুখে বলল, সে অসুস্থ এবং পাপা-ইনশিরা দুজনকে ছাড়া ঘুমাবেই না। ছেলের এই কান্নার কাছে অবশেষে হার মেনে উযাইন নিজের সব প্রতিরোধ ভেঙে এক পাশে এসে শুয়ে পড়ল। বিছানার ঠিক মাঝখানে শুয়ে রইল উমায়ের, আর তার দুই পাশে উযাইন ও ইনশিরা। জানলা গলে লন্ডনের রাতের আবছা চাঁদের আলো এসে পড়েছে বিশাল বিছানাটায়, ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকার নয়। ইনশিরা উমাইরের চুলে বিলি কাটতে কাটতে খুব নিচু স্বরে ওকে একটা মিষ্টি রূপকথার গল্প শোনাতে লাগল।
ওদিকে বিছানার অন্য পাশে দেয়ালের দিকে ফিরে শুয়ে থাকা উযাইনের চোখে এক ফোঁটাও ঘুম ছিল না। সে জানালার দিকে তাকিয়ে নিজের মনে মনে তীব্র এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে পুড়ছিল আর ভাবছিল—
“আজ সকাল থেকে আমার জীবনে কত বড় বড় ঝড় হয়ে গেল! আমি প্রতিটা মুহূর্তে এই মেয়েটার থেকে দূরত্ব বাড়াতে গিয়ে দিনশেষে আমি ওর প্রতি আরও বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছি? কেন নিজের ওপর থেকে আমার সমস্ত কন্ট্রোল হারিয়ে যাচ্ছে?”

ভাবতে ভাবতে দুজনেই ঘুমিয়ে গেল দুপাশ ফিরেই।
সময় গড়িয়ে রাত তখন প্রায় ৩টা। পুরো লন্ডনের বুক জুড়ে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা। ইনশিরার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে বিছানার দিকে তাকাল উমায়ের ঘুমের ঘোরে নড়াচড়া করতে করতে কখন যেন মাঝখান থেকে পুরোপুরি সরে গিয়ে ওদের দুজনের পায়ের কাছে একদম উল্টো হয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে!
আর উমায়ের মাঝখান থেকে সরে যাওয়ার কারণে বিছানায় এখন ইনশিরা আর উযাইনের মধ্যকার দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চির! উযাইনও এতক্ষণে ক্লান্তিতে একদম ঘুমে কাদা হয়ে ওরপাশে ফিরে শুয়ে আছে।
ইনশিরা বিছানায় আলতো করে উঠে বসল। সে প্রথমে উমায়েরকে টেনে আবার মাঝখানে নিয়ে আসতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ঠিক সামনে ঘুমিয়ে থাকা উযাইনের সুদর্শন ফেসটার দিকে তাকাতেই তার হাত দুটো মাঝপথেই থমকে গেল। চাঁদের মায়াবী আলো এসে পড়েছে উযাইনের ফর্সা, তীক্ষ্ণ চেহারার ওপর। চশমা ছাড়া ঘুমের ঘোরে এই গম্ভীর প্রফেসরকে আক্ষরিক অর্থেই এক নিষ্পাপ, শান্ত আর অসম্ভব সুদর্শন এক রাজপুত্রের মতো লাগছিল।

উযাইনের এই শান্ত রূপ দেখে ইনশিরার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ল। ৩ বছরের দীর্ঘ একাকীত্ব আর ভালোবাসার তীব্র কষ্ট তার বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠল। সে খুব সাবধানে, একটু ঝুঁকে এসে নিজের কোমল আঙুলগুলো দিয়ে উযাইনের কপালে ছড়িয়ে থাকা ওল্ফ কাট চুলগুলো আলতো করে একপাশে সরিয়ে দিল। তার চোখ জোড়া তখন জলে পুরোপুরি ছলছল করছে।
ইনশিরা খুব নিচু, ভাঙা এবং কান্নাভেজা কণ্ঠে ফিসফিস করে উযাইনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—
—”উযাইন…আর কত দিন আমাকে দূরে সরানোর ভান করবেন? এবার প্লিজ জলদি বলে ফেলুন না?
সে নিজের একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে উযাইনের একদম কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে এলো। তার নিজের নিশ্বাস উযাইনের গালে এসে আছড়ে পড়ছে। সে এক পরম আকুলতা নিয়ে মনে মনে বলল—

—”আপনাকে ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে আমি আজ পর্যন্ত স্বপ্নেও কল্পনা করিনি, আর এই জীবনে অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবও না। প্রিয় আমার…!”
বলেই ইনশিরা তার কাঁপতে থাকা নরম হাতের তালুটা বাড়িয়ে খুব আলতো করে, পরম মমতায় উযাইনের ফর্সা সুদর্শন গাল আর চোয়ালটা স্পর্শ করল।

রুহ এ ইশক পর্ব ১৭

ইনশিরার ভালোবাসা যেন উথলে উঠল। সে উযাইনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আরও একটু ঝুঁকে এলো। চাঁদের আলোয় উযাইনের তপ্ত ঠোঁট জোড়া দেখে ইনশিরা প্রথমে একটা গভীর চুমু দিতে চাইল, কিন্তু ঠিক ঠোঁটের কাছে গিয়ে সে হঠাৎ থেমে গেল…..

রুহ এ ইশক পর্ব ১৯