Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ১৭

রুহ এ ইশক পর্ব ১৭

রুহ এ ইশক পর্ব ১৭
আনান রোজ

উযাইনের গলাটা ভয়ে আর আতঙ্কে এক নিমেষে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল সে খেয়াল করল, পুরো বাড়ির কোথাও একটা আলোর বিন্দুও জ্বলছে না, ভেতরটা একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার! মেয়েটা কি তবে কোনো বিপদে পড়ল? উযাইন মেইন দরজা ধাক্কা দিয়ে ব্যর্থ হয়ে দ্রুত বাড়ির পেছনের দিকে ছুটে গেল।
হঠাৎ সে দেখতে পেল, বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডের দরজা টা! উযাইন আর কোনো উপায় না পেয়ে নিজের শরীরের পুরো শক্তি দিয়ে দরজায় কয়েকটা জোরালো ধাক্কা দিল। দু-তিনটে ধাক্কা দিতেই বিকট শব্দে দরজাটা খুলে গেল।
উযাইন দ্রুত অন্ধকারের বুক চিরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল এবং অনবরত ডাকতে লাগল—

—”ইনশিরা! তুমি কোথায়?”
পুরো বাড়িটা এক ভৌতিক নীরবতায় থমথম করছে। উযাইন দেয়ালের মেইন লাইটের সুইচটা পাগলের মতো বারবার চাপতে লাগল, কিন্তু না… কোনো আলো জ্বলল না! সম্ভবত মেইন পাওয়ার ট্রিপ করেছে বা শর্ট সার্কিট হয়েছে।
উযাইন আর নিচে অপেক্ষা করল না। সে অন্ধকারের মধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত ওপরে ইনশিরার বেডরুমের দিকে ছুটে গেল। ইনশিরার রুমের সামনে গিয়ে সে উচ্চস্বরে ডাকল—
—”ইনশিরা! ভেতর থেকে সাড়া দাও!”
কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সে দ্রুত রুমের ভেতর ঢুকে নিজের ফোনের ফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা অন করল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অন্ধকারের মাঝে হঠাৎ —ইনশিরা তীব্র ভয়ে বুক ফাটানো একটা চিৎকার দিয়ে উঠল!
ইনশিরার সেই ভয়ার্ত চিৎকার শুনে উযাইনের বুকের ভেতরটা ছিটকে বের হয়ে আসার উপক্রম হলো। কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝল চিৎকারটা ওপরের রুম থেকে আসেনি, বরং নিচ তলা থেকে এসেছে!
উযাইন এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে সিঁড়ি দিয়ে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে লিভিং রুমের দিকে ছুটে গেল। সে অন্ধকারের মাঝে ফ্ল্যাশের আলো চারিদিকে ঘোরাতে ঘোরাতে পাগলের মতো আর্তনাদ করে ডাকল—
—”লিটল বার্ট! প্লিজ কিছু বলো! তুমি কোথায়? আই অ্যাম হেয়ার!”
ঠিক তখনই লিভিং রুমের অন্ধকার কোণ থেকে ইনশিরা আবার তীব্র ভয়ে কেঁদে উঠে চিৎকার দিল—

—”উযাইন…!”
উযাইন ফ্ল্যাশের আলোটা ঝট করে লিভিং রুমের সিঁড়ির পেছনের ফাঁকা জায়গাটায় ফেলল। আলোর বৃত্তে যা ধরা পড়ল, তা দেখে উযাইনের কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে দেখল—ইনশিরা সিঁড়ির নিচে একদম গুটিশুটি মেরে দুই হাঁটু বুকের সাথে চেপে ধরে থরথর করে কাঁপছে! ভয়ে ওর পুরো মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে এবং চোখ দিয়ে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে একা আটকে থেকে মেয়েটা প্রায় আধমরা হয়ে গেছে।
উযাইনকে সামনে দেখামাত্রই ইনশিরা দুনিয়ার সব দেয়াল এক সেকেন্ডে ভেঙে চুরমার করে দিল। সে দ্রুত এগিয়ে গেল, ইনশিরা সিঁড়ির নিচ থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে তীব্র গতিতে ছুটে এসে উযাইনের শক্ত চওড়া বুকের ওপর আছড়ে পড়ল!
সে উযাইনের গলা দুটো হাত দিয়ে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল ইনশিরা উযাইনের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কাঁপতে লাগল, যেন এই পুরুষটার বুকের ওম ছাড়া এই মুহূর্তে পৃথিবীর আর কোনো কিছুতেই সে নিরাপদ নয়। উযাইনও এই প্রথম ইনশিরার সেই কাঁপতে থাকা শরীরটাকে নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তার নিজের হৃদস্পন্দনও তখন ইনশিরার ভয়ার্ত কান্নার সাথে তাল মিলিয়ে জোরে জোরে কাঁপছিল।
সে ইনশিরার পিঠে আর মাথায় আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে অত্যন্ত নরম ও গভীর পুরুষালী গলায় বলতে লাগল—

—”ভয় পেয়ো না ইনশিরা… শান্ত হও। আমি আছি তো। আই অ্যাম রাইট হিয়ার…”
—”উযা…উযাইন”!
—”আমি আছি ভয় পেয়ো না লিটল বার্ড”
ইনশিরা ধীরে ধীরে কান্না থামাল। সে উযাইনের বুক থেকে আস্তে করে মুখ তুলে ওপরের দিকে তাকাল। ফ্ল্যাশের আবছা আলোয় ইনশিরার ভেজা চোখ, ফ্যাকাশে ঠোঁট আর দ্রুত ওঠানামা করা বুকের কাঁপন উযাইনের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। ইনশিরা তখনো খুব দ্রুত আর ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছিল
ইনশিরার এই মায়াবী, ভয়ার্ত রূপ উযাইনের ভেতরের সব সামাজিক নিয়ম আর বয়সের দেয়াল এক সেকেন্ডে ধুলোয় মিশে গেল। সে সম্পূর্ণ আনমনে, এক অদ্ভুত ঘোর আর ভালোবাসার টানে ঝুঁকে এসে ইনশিরার ফর্সা কপালে নিজের ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দিল। ইনশিরার কপালে গভীর একটা চুমু দিয়ে সে আলতো করে ওর গালের ওপর ছড়িয়ে থাকা ভেজা চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিল। সে এক কদম এগিয়ে যেতে চাইল।
ঠিক তখনই অন্ধকারের মাঝে ভারসাম্য সামলাতে না পেরে উযাইন ইনশিরাকে জড়িয়ে ধরেই পাশেই থাকা লিভিং রুমের সোফাটার ওপর ধপাস করে পড়ে গেল! উযাইনের ভারী চওড়া শরীরটা সরাসরি গিয়ে পড়ল ইনশিরার ওপর। আর ঠিক সেই পতনের মুহূর্তে…সকালের মতোই আবার ওদের ঠোঁট জোড়া একদম নিখুঁতভাবে একে অপরের সাথে মিলে গেল!
ঠোঁটের সেই চেনা তপ্ত ছোঁয়া লাগামাত্রই উযাইনের ভেতরের গম্ভীর সত্ত্বাটা তাকে টেনে ধরল। সে তীব্র অপরাধবোধে ইনশিরার থেকে সরে যেতে চাইল।
কিন্তু ইনশিরা আজ আর ওকে কোনো সুযোগ দিতে চাইল না। সে হাত বাড়িয়ে উযাইনের চুল শক্ত করে খামছে ধরল।

ইনশিরা উযাইনকে নিজের আরও কিছু টা কাছে টেনে ওর ঠোঁটে তীব্র ও গভীর এক চু*মু দিল।
ইনশিরা তার পুরো অস্তিত্ব দিয়ে উযাইনকে বুঝিয়ে দিল যে এই পুরুষটার ওপর শুধু তারই অধিকার।
উযাইন প্রথমে নিজেকে সরানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ইনশিরার সেই বুনো ফুলের সুবাস আর তীব্র আকুলতার কাছে সে আর বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। তিন বছরের অবদমিত বাঁধ এক সেকেন্ডে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল, তিন বছর আগের মাঝ রাতে বারান্দার সেই মুহূর্তের কথা!!
উযাইন নিজেই এবার পুরোপুরি বেসামাল হয়ে উঠল। সে ইনশিরার ঠোঁটে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করল। ইনশিরা উযাইনের এই অতর্কিত ও তীব্র ভালোবাসার ঝড়ে এক সময় হাঁপিয়ে উঠল।
সে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে উযাইনের চুলগুলো আরও শক্ত করে খামচে ধরল। উযাইনের তখন আর কোনো দুনিয়াবি খেয়াল নেই। সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ডুবে গেছে….
দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা এই উন্মাদনার পর, উযাইন যখন ইনশিরার নিচের ঠোঁটটায় তীব্র কা*মড়ে মায়াবী একটা চু*মু দিল—ঠিক তখনই ইনশিরা যন্ত্রণায় ও এক অপার্থিব সুখে হালকা কেঁকিয়ে উঠল—

—”উমম… আ… আস্তে… উযাইন…”
ইনশিরার মুখ থেকে নিজের নাম এবং এই ব্যথাতুর কোমল আর্তনাদটা শোনতেই প্রফেসর উযাইন আবরারের ভেতরের সেই মোহময় ঘোরটা এক ধাক্কায় কেটে গেল! সে তীব্রভাবে চমকে উঠে ঝট করে ইনশিরার ওপর থেকে সোফায় উঠে দাঁড়াল।
অন্ধকার ঘরের মাঝে তখন শুধু দুজনের অনিয়ন্ত্রিত ও তীব্র শ্বাসের ওঠানামার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। উযাইন নিজের কপালে হাত দিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে হাপাচ্ছিল, তার পুরো শরীর তখনো কাঁপছে।
আর সোফায় শুয়ে থাকা ইনশিরা নিজের ঠোঁটে হাত দিয়ে এক অদ্ভুত লজ্জা ও তৃপ্তির আবেশে ডুবে গেল।
উযাইনের পুরো শরীর তখনো কাঁপছে, আর বুকের ভেতরটা তীব্র এক অপরাধবোধে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। সে কিছুতেই মাথায় মেলাতে পারছে না।
সে এটা কীভাবে করল? ইনশিরা না হয় ছোট, অবুঝ, আবেগের বশে এমনটা করে ফেলেছে—কিন্তু সে? সে তো একজন ম্যাচিউরড পুরুষ, একজন সম্মানিত প্রফেসর! সে কেন নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এতখানি বেসামাল হয়ে গেল? মেয়েটা কেন বারবার তার সামনে এসে এমন মায়ার জাল বুনে তাকে পঙ্গু করে দেয়?
উযাইনের যেন দম আটকে আসছিল, তার স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, যা তার প্রতি বারই হয় ইনশিরার সান্নিধ্যে এলে।

সে বুঝতে পারছে এই মেয়েকে ছাড়া বেচে থাকা অসম্ভব, সে আর কত নিজেকে মিথ্যায় ডুবিয়ে রাখবে? যে সে এসব মানে না। তার জীবনে তো ইনশিরা ছাড়া আর কোন নারীর অস্তিত্ব নেই। সে আর পারছে না। সে ইনশিরাকে বাচাতে গিয়ে এই মেয়েটাকেই কষ্ট দিচ্ছে, নিজের থেকে দূরে সরিয়ে। অনেক হয়েছে, ইনশিরার অভিমান পাগলামি আর সইছে না। তার বউটা যে কষ্ট পাচ্ছে…
কিন্তু জাহির? জাহির কে কি বলবে? কিভাবে বলবে? যে তোর মেয়ে আমার বউ হয় আমি তার প্রতি উন্মাদ!!
উযাইন এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সে এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে চাইল না। বের হয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াল।
কিন্তু মাত্র চার-পাঁচ কদম যাওয়ার পর উযাইনের পা দুটো যেন মাটিতে জমে বরফ হয়ে গেল। সে অন্ধকার ঘরের দিকে আবার ফিরে তাকাল।

তার ভেতরের বিবেক আর ভালোবাসা তাকে তীব্রভাবে ধাক্কা দিল—না! এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে, পাওয়ার চলে যাওয়া একটা ফাঁকা বাড়িতে সে এই ভীতু মেয়েটাকে একা ফেলে রেখে যেতে পারে না! জাহির ওকে ইনশিরার খেয়াল রাখতে বলেছে।
উযাইন একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার সোফার দিকে ফিরে এলো। সে ইনশিরার সাথে কোনো রকম কথা না বলে, এক ঝটকায় ইনশিরাকে নিজের দুই বলিষ্ঠ বাহুর পেচিয়ে কোলে তুলে নিল। ইনশিরা কিছুটা চমকে গেলেও কোনো বাধা দিল না। উযাইন ওকে কোলে নিয়েই হনহনিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করল।
উযাইনের চওড়া বুকে জড়িয়ে ওর কোলে মাথা রেখে ইনশিরার ঠোঁটের কোণে তখন এক স্বর্গীয়, লাজুক হাসি ফুটে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে উযাইনের গলার চেনা পারফিউমের সুবাস নিচ্ছিল আর মনে মনে ভাবছিল—

—”আমার এই পাথর-হৃদয় প্রেমিক পুরুষটা কি তবে অবশেষে আমার ভালোবাসার কাছে হার মেনে নিল? সে মুখে যতই ডিভোর্সের ভয় দেখাক, তার এই বুক ফাটানো নিঃশ্বাসই বলে দিচ্ছে সে আমাকে কতটা চায়!”
ইনশিরা তখন পুরোপুরি দুষ্টুমির মেজাজে চলে এলো। সে উযাইনের শক্ত চোয়ালের দিকে তাকাল। তারপর নিজের ডান হাতের কোমল আঙুলগুলো বাড়িয়ে আলতো করে উযাইনের গলার ওঠানামা করা এডামস অ্যাপলটা স্পর্শ করল। আঙুলের ডগা দিয়ে সে ওটাকে বৃত্তাকারে ছুঁয়ে দিতে লাগল।
ইনশিরার এই ছোট্ট, কোমল অথচ মারাত্মক ছোঁয়াটা লাগামাত্রই উযাইনের পুরো শরীর জমে গেল। তার এডামস অ্যাপলটা তীব্রভাবে ওপর-নিচে ওঠানামা করতে লাগল। এই মায়াবী অত্যাচার সহ্য করা উযাইনের সহ্যের সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। সে অন্ধকারেও ইনশিরার দিকে অত্যন্ত কড়া ও কটমট চোখে তাকাল। তার চোখের মণি তখন এক নিষিদ্ধ অন্ধকার ও রাগে জ্বলজ্বল করছে। সে নিজের চোয়াল শক্ত করে মনে মনে এক চরম ভয়ার্ত হাহাকার নিয়ে ভাবল—

—”এই মেয়েটা কি একটুও বোঝে না ও কীসের সাথে খেলছে? জানে না ওর এই ছেলেমানুষি একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের কাছে কতটা ভয়ানক রূপ নিতে পারে? যদি আমি সত্যিই আজ নিজের সব বাঁধ ভেঙে ওর ওপর অধিকার জাহির করি ও কি সেই ভালোবাসার তীব্রতা সইতে পারবে?পারবে আমার তৃষ্ণা সহ্য করতে?”
উযাইন নিজের ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর রাক্ষসটাকে কোনোমতে চেপে রেখে ইনশিরার দিকে কটমট করে তাকাল। উযাইনের গলার এডামস অ্যাপলে ইনশিরার ওই কোমল আঙুলের ছোঁয়া তার সমস্ত স্নায়ুকে অবশ করে দিচ্ছিল। সে নিজের বাড়ির করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় আর সহ্য করতে না পেরে দাঁতে দাঁত চেপে চাপা, কঠোর গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল—

—”হাত সরাও, ইনশিরা!”
—”কেন সরাব? সরাব না! নিজের বরের গলা ছুঁয়েছি, তাতে আপনার এত কীসের সমস্যা?”
ইনশিরা উযাইনের শার্ট টা আরও শক্ত করে চেপে ধরে, চোখ টিপে বলে।
উযাইনের চোখের মণি রাগে ও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে ছোট হয়ে এলো। সে ইনশিরার মুখের একদম কাছাকাছি নিজের মুখটা এনে বরফ শীতল, ভয়ংকর গলায় থ্রেট দেওয়ার বলে—
—”হাত সরাও… নয়তো তোমার হাত-পা ভেঙে, বস্তায় ভরে সোজা টেমস নদীতে ফেলে দিয়ে আসব! জাহির আর ইরা এখানে নেই। তাই আমি চাইলে সত্যিই এমনটা করে দিতে পারি, কেউ টেরও পাবে না!”
উযাইনের এই আচমকা ভয়ংকর হুমকিটা শুনে ইনশিরার ভেতরের সব আবেগ বুদবুদ এক সেকেন্ডে উরে গেল। সে এক বুক অসহায়ত্ব আর অভিমান নিয়ে উযাইনের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো ম্লান হয়ে গেল এবং সে নিজেকে উযাইনের কোল থেকে একদম গুটিশুটি মেরে, ওর গলা থেকে হাত সলিয়ে নিজের বুকের কাছে জড়ো করল,আর ভাবলো—

—”এই লোকটা কেন আমার সাথে সবসময় এমন করে? একটু আগেই তো সে আমাকে ওভাবে চুমু খেল… আর এখন হুট করে এত পর করে দিল? সে কি আমাকে একটুও ভালোবাসে না?”
ইনশিরার এই অসহায় মুখটার দিকে চেয়ে উযাইনের বুকের ভেতরটা খামচে ধরলেও সে বাইরে নিজের কঠোর ভাব বজায় রাখল। সে হনহনিয়ে নিজের লিভিং রুমে ঢুকে ইনশিরাকে খুব সাবধানে সোফার ওপর নামিয়ে দিল।
সোফায় নামিয়ে সোজা হতেই উযাইন আর ইনশিরা—দুজনেই খেয়াল করল, সোফার ঠিক উল্টো পাশে দাঁড়িয়ে উমায়ের দুই হাত গালে দিয়ে, চোখ গোল গোল করে হা করে ওদের দিক তাকিয়ে আছে!
উমাইরের এই প্রকাণ্ড চাউনি দেখে উযাইন এক সেকেন্ডে থতমত খেয়ে গেল। কিন্তু উমায়ের ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খুশিতে এক লাফে দুই হাত ওপরে তুলে লাফাতে শুরু করল!
উমায়ের উচ্ছ্বসিত হয়ে খিলখিল করে হেসে চড়া গলায় বলল—
—”Wow, Papa! I knew it! তুমি কি ইনশিরাকে আদর করছিলে? তার মানে তুমিও আমার মতো ইনশিরাকে অনেক অনেক লাইক করো!

— “উমায়ের কি বল…”
— “ও কিন্তু এখন থেকে আমাদের বাসায় আমাদের সাথেই থাকবে। তুমি আর আমি মিলে ওকে খুব আদর করব। আর পাপা… তুমি তো সকালেও ইনশিরাকে চুমু দিয়েছিলে…”
উযাইন আর ইনশিরা একদম স্তব্ধ হয়ে গেল! উযাইনের পায়ের নিচের মাটি যেন এক সেকেন্ডে সরে গেল। উযাইনের ফর্সা মুখটা চরম লজ্জায়, অপমানে আর অপ্রস্তুত ভাবনায় এক নিমেষে লাল থেকে বেগুনি হয়ে উঠল।
উমায়ের যখন বাবার এই অবস্থা দেখে আরও কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই সেকেন্ডে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। তার চোখ দুটো রাগে ও লজ্জায় বড় বড় হয়ে উঠল। সে অত্যন্ত কঠোর ও কড়া গলায় উমাইরের দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠল—

—”Umayer! Don’t forget you are just a little boy! Stay in your limits!
আকস্মিক রুদ্রমূর্তি আর সিংহের মতো গর্জন শুনে উমায়ের এক সেকেন্ডে একদম চুপ হয়ে গেল। ওর ফুটফুটে মুখটা ভয়ে আর অভিমানে কালো হয়ে গেল। উযাইন নিজের রাগ আর লজ্জা সামলাতে না পেরে নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে লিভিং রুম থেকে বের হয়ে সোজা মেইন দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
উযাইন বেরিয়ে যাওয়ার পর পুরো লিভিং রুমে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। উমায়েরের চোখ দুটো তখন কান্নায় টলমল করছে। পাপা তাকে এভাবে বকবে, তা সে ভাবতেই পারেনি।
সে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে রইল না। সে চোখের জল মুছতে মুছতে সোজা সোফার দিকে ছুটে গেল। সোফায় লজ্জায় মুখ লুকিয়ে থাকা ইনশিরাকে সে দুই হাতে শক্ত করে জাপটে ধরল। ইনশিরার বুকে নিজের ছোট মুখটা গুঁজে দিয়ে উমায়ের ডুকরে কেঁদে উঠল।
উমায়ের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কান্নাভেজা আদুরে গলায় বলল—

—”ইনশিরা… পাপা আমাকে একদম ভালোবাসে না! পাপা বড্ড পঁচা! তুমি আমার কাছেই থেকো। আমাকে ছেড়ে কখনো কোথাও যেয়ো না, প্লিজ…!”
উমাইরের এই বুক ভাঙা কান্না আর নিষ্পাপ আকুলতা ইনশিরার মনের ভেতরের সব লজ্জা এক সেকেন্ডে উড়িয়ে দিল। তার নিজের চোখ দুটোও মায়ায় আর ভালোবাসায় ছলছল করে উঠল। সে উমায়েরকে সোফা থেকে টেনে নিজের কোলের মধ্যে তুলে নিল। নিজের দুই হাত দিয়ে উমায়েরকে জড়িয়ে ধরে ওর মাথায় আর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে নিকু স্বরে বলল—
—”না সোনা… একদম কাঁদবে না। তোমার পাপা তোমাকে অনেক ভালোবাসে। ইনশিরা তোমার কাছেই আছে। আমি তোমাকে ছেড়ে কোনোদিন, কোথাও যাব না। বাবা আমার…”
ইনশিরার বুকের ওমে আর চুলে বিলি কেটে দেওয়া হাতের ছোঁয়ায় উমায়েরের ভেতরের সব ভয় আর অভিমান ধীরে ধীরে শান্ত হতে লাগল। ওদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা উযাইন জানলার কাচ দিয়ে ভেতরের এই দৃশ্যটা দেখে নিজের অজান্তেই এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ইনশিরা উমায়েরের চোখের জল আলতো করে মুছে দিল। সে উমাইরের চিবুকটা ছুঁয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল—

—”চলো সোনা, অনেক অভিমান হয়েছে। এবার আমরা দুজন মিলে তোমার পাপার জন্য কিছু রান্না করি, কেমন? ডিনারের সময় হয়ে এসেছে তো।”
উমায়ের ইনশিরার কথা শুনে বেশ অবাক হয়ে গেল। কারণ সে ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে তাদের ঘরের যাবতীয় কাজ, রান্নাবান্না সার্ভেন্টরাই করে। ইনশিরা যে নিজের হাতে রান্না করবে, এটা ওর কাছে বেশ নতুন লাগল। সে কৌতূহল নিয়ে ইনশিরার পেছন পেছন কিচেনের দিকে হেঁটে গেল।
কিচেনে গিয়ে ইনশিরা দেখল উযাইনের বিদেশি সার্ভেন্ট রান্না করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইনশিরা মুচকি হেসে সার্ভেন্টকে বলল—
—”আজ আর আপনার রান্না করতে হবে না। আপনি ৩ দিনের জন্য ছুটি নিতে পারেন, ডিনারটা আমি নিজেই তৈরি করব।”

—”But ma’am… স্যার তো আমাকে এই ব্যাপারে কিছু বলেননি। উনি যদি রেগে যান!”
সার্ভেন্ট যখন ইনশিরার কথা মানতে চাচ্ছিল না, ঠিক তখনই উমায়ের কিচেনের দরজার সামনে বুক ফুলিয়ে, দুই হাত কোমরে রেখে একদম প্রফেশনাল স্টাইলে দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখেমুখে তখন প্রফেসর উযাইন আবরারের সেই পরিচিত গম্ভীর এটিটিউড
উমায়ের বেশ চড়া ও গম্ভীর গলায় সার্ভেন্টকে বলল—
—”লিসেন! তোমাকে আমি ছুটি দিচ্ছে… উমায়ের আবরার! পাপার মতোন, এই বাড়িতে আমার কথাও শেষ কথা! সো ইউ ক্যান গো নাও!”
বাচ্চার মুখে নিজের পুরো নাম ব্যবহার করে এই রাজকীয় ধমক আর এটিটিউড দেখে ইনশিরা নিজের মুখে হাত দিয়ে হেসে উঠল। সে মনে মনে ভাবল— “বাপের বেটা বটে! পুরো প্রফেসরের রক্ত মজ্জায় মজ্জায় বইছে!”

সার্ভেন্ট আর কোনো কথা না বলে উমাইরের এই রূপ দেখে গুটিগুটি পায়ে কিচেন থেকে বিদায় নিল। এরপর ইনশিরা আর উমায়ের—দুজন মিলে বেশ আনন্দ আর খুনসুটি করতে করতে ডিনারের স্পেশাল আইটেমগুলো রাঁধতে লেগে গেল।
সময় গড়িয়ে রাত ১০টা বাজল।

রুহ এ ইশক পর্ব ১৬

উযাইন তার মানসিক ঝড় কিছুটা শান্ত করে ধীর পায়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। পুরো বাড়িটা এক অদ্ভুত নীরবতায় থমথম করছে, লিভিং রুমের মেইন লাইটগুলো সব নেভানো। উযাইন ভাবল হয়তো ইনশিরা আর উমায়ের এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে ক্লান্ত শরীরে কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা নিজের বেডরুমের দিকে ওপরে চলে যেতে নিল।
ঠিক তখনই নিচ তলার ডাইনিং স্পেস থেকে উমাইরের চড়া কণ্ঠস্বর পুরো নিস্তব্ধ বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল—
—”Papa… Come to the dining area! Come fast!

রুহ এ ইশক পর্ব ১৮