Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ১৬

রুহ এ ইশক পর্ব ১৬

রুহ এ ইশক পর্ব ১৬
আনান রোজ

“উযাইন সাহেব! এত অবহেলা আর সহ্য হয় না। একদিন আমি সত্যিই আপনাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব। যেখান থেকে মানুষ চাইলেও আর কোনোদিন ফিরে আসতে পারে না!”
সে উযাইনের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত কিন্তু এক ভয়ানক মরণজয়ী স্বরে এই কথা গুলো একনাগাড়ে বলে ফেলল এই পিচ্চি মেয়েটা।
ইনশিরার মুখের এই চরম আত্মহননকারী বা হারিয়ে যাওয়ার কথাগুলো শুনে উযাইনের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য যেন কেঁপে উঠল। সে তীব্র অস্বস্তি নিয়ে ইনশিরার দিকে ঘুরে কিছু একটা বলতে যাবে— ঠিক তখনই পুরো গাড়ির নীরবতা ভেঙে ইনশিরার ফোনটা তীব্র আওয়াজে বেজে উঠল।
উযাইন আর ইনশিরা, দুজনেই এক সাথে ড্যাশবোর্ডের পাশে রাখা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। সেখানে বড় বড় অক্ষরে একটা নাম ভাসছে।

— “আবির”
যা উযাইনের চোয়ালকে এক সেকেন্ডে শক্ত করে দিল। তার চোখের মণি ঈর্ষা আর সন্দেহে ছোট হয়ে এলো। ফোনের স্ক্রিনে ‘আবির’ নামটা দেখে এক মুহূর্ত ইনশিরা উযাইনের দিকে তাকাল। উযাইনের চোয়াল তখন শক্ত হয়ে আছে। ইনশিরা ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে নিল।
কিছুটা লাউডস্পিকারে ছিল হয়তো ফোনটা, হালকা আওয়াজে ওপাশ থেকে এক উচ্ছ্বসিত তরুণের কণ্ঠস্বর গাড়ির ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল—
—”Hey, hey baby girl! Where are you, darling? কতক্ষণ ধরে তোর জন্য ওয়েট করছি!”
প্রথম এই দুটো লাইন—”Baby girl” আর “Darling” শোনা মাত্রই উযাইনের পুরো শরীর যেন এক সেকেন্ডে জ্বলে খাক হয়ে গেল! তার হাত দুটো স্টিয়ারিং হুইলকে এতটাই জোরে চেপে ধরল যে ওর হাতের রগগুলো স্পষ্ট ভেসে উঠল। উযাইনের চোখ দিয়ে যেন আক্ষরিক অর্থেই আগুন ঝরছিল।
ইনশিরা উযাইনের এই অবস্থা দেখে মনে মনে একটু হাসল। সে দ্রুত ফোনের ভলিউমটা কমিয়ে দিতে দিতে অত্যন্ত নরম আর মিষ্টি গলায় বলল—

—”হ্যাঁ…আমি আসছি। একদম কাছাকাছিই আছি। আর কিছুক্ষণ লাগবে।”
কিছুক্ষন পর ওপাশে থাকা আবির হয়ত কিছু বলল যার প্রতুত্তরে ইনশিরা মুচকি হেসে বলে—
—”হ্যা রে বাবা ব্রেকফাস্ট করেই এসেছি তোর চিন্তা করতে হবে না।”
এসব শুনে উযাইন আর এই দুনিয়ায় নেই, ইনশিরা আরও কিছু সময় ফোনের ওপাশে থাকা আবিরের সাথে নিচু স্বরে মায়াবী হাসিমুখে কথা বলতে লাগল। উযাইন কোনো কথা বলল না, কিন্তু সে অজানা এক রাগে ভেতরে ভেতরে গজগজ করতে লাগল। তার ইচ্ছা করছিল ফোনটা কেড়ে নিয়ে জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিতে, ওর বউ কেন ওই ছেলের সাথে কথা বলছে? কিন্তু তার তীব্র ইগো তাকে আটকে রাখল। ল’ ফার্মে যাওয়ার কথা ভুলে সে গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে সোজা ইউনিভার্সিটির দিকে রওনা দিল।
আজ ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছাতে ওদের কিছুটা লেইট হয়ে গিয়েছিল। উযাইনের গাড়ি থেকে যখন প্রফেসর উযাইন আর রূপসী ইনশিরা একসাথে নামল, তখন ক্যাম্পাসের অনেক স্টুডেন্টই ওদের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। ওদের দুজনকে একসাথে এক গাড়িতে দেখে চারিদিকে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। আজ পর্যন্ত তারা উযাইনকে কোনো মেয়ের আশে পাশে দেখেনি, অফিসিয়াল কাজ ছাড়া।
উযাইন গম্ভীর মুখে লম্বা পা ফেলে নিজের ডিপার্টমেন্টের দিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর ক্লাস শুরু হবে। উযাইন একটু আগেই ক্লাসে আসলো। ইনশিরা যখন ক্লাসরুমে ঢুকলো, তখনই করিডোরের দূর থেকে হ্যান্ডসাম একটা ছেলে চড়া গলায় ডেকে উঠল—

—”এই ইনশি! এখানে আয়! তোর সিট আমি রেখে দিয়েছি!”
উযাইন তখন পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে, ল্যাপটপ টা খুলছিল। “ইনশি” ডাকটা শোনা মাত্রই সে ঝট করে ওই দিকে তাকাল। সে তীক্ষ্ণ চোখে ছেলেটাকে খেয়াল করল— ফর্সা, লম্বা, স্টাইলিশ চুল আর চোখ জোড়া ছলছল করছে খুশিতে। বুক পকেটে একখানা সানগ্লাস গোঁজা….তাহলে এই সেই ‘আবির’!
পুরো ক্লাস চলাকালীন সময়ে প্রফেসর উযাইন আবরারের মনোযোগ লেকচারে কম, আর ইনশিরা আর ওই আবিরের দিকেই বেশি ছিল। সে লক্ষ্য করল আবির কীভাবে বারবার ইনশিরার কানের কাছে মুখ এনে কথা বলছে, আর ইনশিরা খিলখিল করে হাসছে। আর ওদের খুনসুটি, খাতা কলম নিয়ে কারাকারি। লেকচার দেওয়ার সময় প্রতিবার ইনশিরার সেই মিষ্টি হাসি দেখলেই উযাইনের বুকের ভেতরটা ঈর্ষায় পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। সে মারকার টা খামচে ধরে নিজের মনে মনে চরম ক্ষোভ নিয়ে বলল—
“শয়তান বউ কোথাকার! আমার সামনে অন্য একটা ছেলের সাথে এভাবে হাসাহাসি করা হচ্ছে? ওয়েট, তোমার এই হাসির আমি আজই বাছাচ্ছি!”

উযাইন কোনোমতে নিজের রাগ সামলে ক্লাস শেষ করল। সে টেবিল থেকে ল্যাপটপ, বই গুলো গুছিয়ে নেওয়ার সময় পুরো ক্লাসের দিকে অত্যন্ত কঠোর ও গম্ভীর চোখে তাকাল—বিশেষ করে ইনশিরার দিকে সোজা চেয়ে। উযাইন খুব কড়া আর গম্ভীর গলায়, একদম ব্রিটিশ এক্সেন্টে বলল—
—”অ্যাটেনশন প্লিজ এভরিওয়ান! আগামীক্লাসে এই টপিক গুলোর ওপর একটা সারপ্রাইজ এক্সাম নেওয়া হবে। অ্যান্ড আই ওয়ান্ট ফুল প্রিপারেশন ফ্রম এভরিওয়ান। ক্লাসে যারা বেশি গল্প করে, তারা যেন ফেইল না করে, দ্যাটস অল!”
বলেই উযাইন ইনশিরার দিকে একটা জ্বলন্ত চাউনি দিয়ে ক্লাসরুম থেকে হন্ হন্ করে বেরিয়ে গেল…

ক্লাস শেষ হওয়ার পর ইনশিরা আর আবির ক্যাম্পাসের খোলা মাঠে একটা বেঞ্চে বসে গল্প করছিল। আবিরের কোনো একটা জোকস শুনে ইনশিরা খিলখিল করে হাসছিল আর এক্সাম নিয়ে কথা বলছিল। আর কিছুটা দূর থেকে নিজের অফিসের জানলা দিয়ে এই দৃশ্যটা তীক্ষ্ণ চোখে দেখছিল প্রফেসর উযাইন আবরার। তার ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তখন চরমে। সে একবার অবচেতন মনে ভাবল—
“ওরা দুজন সমবয়সী…! সুন্দর ভাবে মানাচ্ছে ওদের একসাথে। ইনশিরার তো এমন জীবনই পাওয়ার কথা ছিল”

কিন্তু পরক্ষণেই তার ভেতরের পজেসিভ পুরুষটা গর্জে উঠল। সে চোয়াল শক্ত করে ভাবল—
“কিসের সমবয়সী? আমার বউ হয়ে অন্য কারোর দিকে কেন এত মায়াবী দৃষ্টিতে তাকাবে? কেন অন্য কারো সাথে হাসবে?! বউদের সবকিছু হাজবেন্ড থেকে বিলোং করে। সো শি ইজ বিলোং টু মি!”
উযাইন আর নিজের রাগ আর ঈর্ষা নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সে সোজা ক্যাম্পাসের মাঠে ওদের দিকে এগিয়ে গেল। উযাইনকে গম্ভীর মুখে আসতে দেখে ইনশিরা আর আবির দুজনেই চুপ হয়ে গেল। উযাইন খুব কড়া আর প্রফেশনাল গলায়, ইনশিরার দিকে তাকিয়ে—
—”ইনশিরা! চল বাসায় যাব।”
আবির বিনয়ের সাথে উঠে দাঁড়িয়ে উযাইনকে। হাসি মুখে বলে—
—”হেলো স্যার! আপনি ব্যস্ত থাকলে কষ্ট করে ওকে ড্রপ করতে হবে না। আমিই ইনশিকে বাসায় দিয়ে আসব নে।”

আবিরের এই কথা শোনা মাত্রই উযাইনের পুরো যেন শরীর রাগে জ্বলে উঠল। এত বড় সাহস! সে ইনশিরাকে একটা মানসিক চোট দিতে এবং নিজের ইগো ধরে রাখতে ইনশিরার দিকে সোজা তাকিয়ে বলল—
—”আচ্ছা! তাহলে ইনশিরা শোন… আমি কাল ল’ ফার্ম থেকে পেপারস গুলো নিয়ে আসব, তুমি সাই…”
উযাইন তার বাক্য শেষ করার আগেই ইনশিরা চট করে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। সে খুব ভালো করেই জানে উযাইন এখানে কোন পেপারসের কথা বলছে এবং কেন ওকে আবিরের সামনে ছোট করার জন্য এই হুমকি দিচ্ছে। ইনশিরা উযাইনের কথা কেটে দিয়ে, চোখে রাগ নিয়ে চটপট বলল—
—”না, না প্রফেসর! তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আসছি!”
বলেই ইনশিরা উযাইনকে পেছনে ফেলে দ্রুত পায়ে পার্কিং লটের গাড়ির দিকে চলে গেল। আবির ওদের এই কথার পিঠের কথা কিছুই বুঝতে না পেরে চরম অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। উযাইনও গম্ভীর মুখে ইনশিরার পেছন পেছন গাড়ির দিকে হেঁটে গেল।
কিছুক্ষন পর
উযাইনের গাড়িটা এখন লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে চলছে। গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা একদম থমথমে। দুজনেই সম্পূর্ণ চুপচাপ। উযাইন ড্রাইভ করতে করতে আড়চোখে ইনশিরার ওই অভিমানী ও লাল হয়ে থাকা ফেসটার দিকে তাকাল। তার ভেতরের রাগটা ততক্ষণে একটু থিতিয়ে এসেছে, বরং সকালের সেই মিষ্টি রেশটা আবার তার মনে উঁকি দিল। সে পরিস্থিতি কিছুটা হালকা করার জন্য নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—

—”কিছু খাবে?”
ইনশিরা জানলার বাইরে তাকিয়ে, খুব গম্ভীর মুখ নিয়ে বলে—
—”হুম।”
ইনশিরার কথা শুনা মাত্রই উযাইন গাড়ির স্পিড একটু কমিয়ে আবার বলে—
—”কী খাবে বলো? নিয়ে আসি”
ইনশিরা নিজের ক্ষোভ আর অভিমানের চোটে মুখ ফসকে হুট করে বলে উঠল—
—”আপনাকে…! …আই মিন, না! মানে… আমি…কি…কিছু খাব না!”
নিজের মুখের এই চরম সাহসী আর লজ্জাজনক কথা বের হওয়া মাত্রই ইনশিরা নিজের জিভ কামড়ে ধরল। সে চরম অস্বস্তিতে এক সেকেন্ডে জানলার দিকে পুরো মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় আর অপমানে একদম টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল।
প্রকেরসর উযাইন আবরার ইনশিরার মুখে এই, বাক্য গুলো শোনা মাত্রই চরম থতমত খেয়ে গেল! গাড়ির ব্রেক কষতে কষতে তার হাত কেঁপে উঠল। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে এক মায়াবী, দুষ্টুমি ভরা চতুর হাসি ফুটে উঠল। সে স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভ করতে করতে খুব নিচু, গভীর এবং নেশাতুর গলায় বলল—

—”তাই?…..ওই দিন কিন্তু কোনো ছাড় পাবে না!”
উযাইনের এই গভীর, পুরুষালী কণ্ঠের ডাবল মিনিং থ্রেটটা শোনা মাত্রই ইনশিরার পুরো শরীরে যেন একটা তীব্র বৈদ্যুতিক কারেন্ট বয়ে গেল! সে লজ্জায়, শিহরণে আর এক অদ্ভুত সুখে একদম লাল হয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে, জানালার দিকে ফিরে গাড়ির সিটের সাথে মিশে রইল।
উযাইন মুচকি হাসল, সে সামনের দিকে তাকিয়ে আবার ইনশিরার উদ্দেশ্য, ভারী কন্ঠে বলে—
—” বাই দ্য ওয়ে, আবির….ছেলে টা কে?”
—”আপনার সতীন…!!!”
ইনশিরা উযাইনের কথার প্রতুত্তর করল। সে তখনও বাহিরের তাকিয়ে আছে। কিন্তু উযাইন কথা টা শোনার সাথে সাথে ওর দিকে তাকাল চোখ মুখ যেন ঈর্ষা ফেটে পড়ছে। সে স্টেয়ারিং টা শক্ত করে ধরে বলে—

—”ওয়েট…হোয়াইট? হোয়াইট দ্য ফা* আর ইউ সে…
—”হু…! তবে সে এখন আপনার শালা বাবু। কিন্তু বেশি ভাব নিলে সতীন হয়ে যাবে!”
ইনশিরা উযাইনের দিকে ফিরল না, ওদিক ফিরেই কথা গুলো বলল। তবে তার কথা গুলো অন্য রকম শুনালো উযাইনের কাছে, মেয়েটা বোধহয় খুব কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু উযাইনের যেন সহ্য হলো না—
—”আর ইউ আউট অফ ইউর মাইন্ড? লিসেন গার্ল…
— “অত শুনতে হবে না!!”
উযাইন আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ ড্রাইভ করতে লাগলো। কিছুক্ষন পর, গাড়িটা এসে যখন উযাইনের নিজের বাড়ির গেটের সামনে থামল, তখন ইনশিরা জানলা দিয়ে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে ফেলল। কারণ সে চাচ্ছিল গাড়িটা যেন ওদের নিজেদের বাড়ির সামনে গিয়ে থামে। ইনশিরা অভিমানী গলায়, মুখ কুঁচকে—

—”এখানে থামালেন কেন? গাড়িটা আরেকটু ওদিকে আগান, আমাদের বাসার সামনে নিয়ে যান।”
উযাইন কোনো কথা না বলে গাড়ি থেকে নেমে দরজা লক করতে করতে ঠান্ডা গলায় বলল—
—”ওখানে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। এখানে নামো।”
ইনশিরা অবাক হয়ে গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলে —
—”কেন? আমি বাসায় যাব না কেন?”
—”জাহির একটু আগে কল দিয়েছিল। ওরা একটা ইমার্জেন্সি কাজে আউট অফ সিটি যাচ্ছে। তাই ওরা না ফেরা পর্যন্ত তুমি এখানে থাকবে।”
উযাইনের মুখ থেকে এই কথা শোনামাত্রই ইনশিরার চোখেমুখে খুশির এক ঝলক আলো খেলে গেল! তার সকালের সব অভিমান যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে উযাইনের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে অত্যন্ত দুষ্টুমি ভরা মিষ্টি গলায় বলল—

—”ওহ আচ্ছা! তার মানে আমরা একসাথে থাকব? গ্রেট!”
বলেই ইনশিরা উযাইনের কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে খুশিতে প্রায় নাচতে নাচতে দৌড়ে উযাইনের বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। উযাইন শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই উযাইনের পকেটে থাকা ফোনটা আবার কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে জাহিরের নাম দেখে উযাইন ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে নিল। জাহির ওপাশ থেকে খুব ব্যস্ত গলায়—
—” উযাইন! কাজটা অনেক বড়, ফিরতে ফিরতে হয়তো ২/৩ দিন লেগেই যাবে। তুই একটু…”
” শ্বশুর রে! তুই মেয়েকে কার জিম্মায় একা ছেড়ে দিলি? তুই জানিস তোর এই মেয়ে এই ৩ দিন আমার কী হাল করবে?
উযাইন মনে মনে এক বুক হাহাকার নিয়ে, কপালে হাত দিয়ে ভাবল, নিজেকে স্বাভাবিক রেখে শান্ত গলায় বলল—
—”আচ্ছা জাহির, তুই একদম চিন্তা করিস না। আমি ইনশিরাকে দেখে রাখব। তুই তোর কাজ শেষ কর।”
—”হ্যাঁ শুন উযাইন, আরেকটা কথা। ইনশিরা কিন্তু ছোটবেলা থেকেই অন্ধকার বড্ড ভয় পায়। রাতে ঘুমানোর সময় একটু খেয়াল রাখিস। আর ওকে একা ছাড়িস না কিন্তু।”
উযাইন ছোট করে “আচ্ছা” বলে ফোনটা রেখে দিল। সে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল—

—উযাইন… তোর কপালে আগামী ৩ দিন কী চরম পরীক্ষা আছে, আল্লাহই ভালো জানেন!”
এই ভেবে সে একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
উযাইন ড্রয়িংরুমে পা রাখামাত্রই ইনশিরা ভেতর থেকে প্রায় ছুটে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। ইনশিরার এই হুট করে সামনে চলে আসায় উযাইন আবরার হালকা কেঁপে উঠল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে চশমাটা ঠিক করল। ইনশিরা উৎফুল্ল গলায় বলে
—”আচ্ছা, উমায়ের কখন আসবে? ও তো স্কুল থেকে এখনো ফেরেনি।”
উযাইন ইনশিরার থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে শান্ত গলায় বলে—
“উমাইরের ফিরতে আজকে একটু লেইট হবে। ওর এক্সট্রা ক্লাস আছে। ও একবারে বিকেলের দিকে বাসায় ফিরবে।”

বলেই উযাইন আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াতে গেল। সে চাচ্ছিল ইনশিরার এই চপলতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে। কিন্তু ইনশিরা আবার পেছন থেকে চড়া গলায় ডেকে উঠল—
—”আচ্ছা শুনুন! উমায়ের যেহেতু দেরিতে আসবে, আর আব্বু-আম্মু কখন আসবে তারও কোনো ঠিক নেই… আমি তাহলে আমাদের বাসা থেকে শাওয়ার নিয়ে আসি? আমার কিছু জামাকাপড় আর কিছু জিনিস নিয়ে আসি?”
কথা গুলো শোনা মাত্রই উযাইনের চোখের সামনে ওইদিনের মুহূর্ত গুলোর দৃশ্যটা ভেসে উঠল। যেদিন ইনশিরা উমায়েরের জন্য কেক নিয়ে এসেছিল।
সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, ইনশিরা যখন নিজেদের বাসা থেকে নিজের জিনিসপত্র আনার জন্য ব্যাগটা হাতে নিল, তখন উযাইন ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে বেশ কড়া গলায় বলল—
—”দ্রুত ফিরবে কিন্তু। আগামীক্লাসের এক্সামের প্রিপারেশন নিতে হবে।”
ইনশিরা উযাইনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উলটে, বেশ আদুরে গলায়—
—”আচ্ছা আচ্ছা…আসছি।”
ইনশিরা দরজার দিকে দু-পা বাড়াতেই উযাইন আবার পেছন থেকে ওকে ডেকে উঠল—

—”এহেম… এই শোনো!”
উযাইনের গলার আওয়াজে এক অদ্ভুত জড়তা আর আমতা আমতা করার ভাব। ইনশিরা ব্যাগ হাতে নিয়ে ঝট করে ঘুরে তাকাল।উযাইন চোখ দুটো এদিক-ওদিক সরিয়ে, নিজের চশমাটা ঠিক করতে করতে—
—”তুমি… মানে… জামাকাপড়ে ঠিকঠাক করে পরে এসো।”
ইনশিরা পুরোপুরি থতমত খেয়ে, নিজের ড্রেসের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়, কিন্তু সে কিছু বুঝতে পারছে না—
—”মানে? কী বলতে চাচ্ছেন আপনি? কেন, আমি কি ভালো জামাকাপড় পরি না?”
উযাইনের ফর্সা মুখটা এবার লজ্জায় আর চরম অস্বস্তিতে এক সেকেন্ডে লাল হয়ে উঠল। সে নিজের গলা খাঁকারি দিল, ওইদিনের লাফালাফি চোখে ভেসে উঠে, প্রফেসরের চোয়াল এবার থরথর করে কাঁপতে লাগল। উযাইন চরম আমতা আমতা করে— তোতলামির স্বরে—

—”মানে… আসলে”
—কি? আসলে?
— না, মানে… আসলে কি… মানে… ইনা… ইনার পরে আসবে!”
বলেই উযাইন আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে নিজের মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরে দ্রুত পা ফেলে প্রায় এক প্রকার দৌড়েই নিজের বেডরুমের দিকে পালিয়ে গেল!
ইনশিরা ড্রয়িংরুমের দরজার সামনে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটো চড়কগাছ! সে নিজের মনেই ধাক্কা খেয়ে বিড়বিড় করল—
—”কী… কী বলে গেল লোকটা?! ইনার পরে আসতে বলল?!”
কিন্তু ইনশিরার ওইদিনের বিষয়ে কোনো ধারণা নেই, তবে তার ফর্সা ফেসটা কান পর্যন্ত লাল টমেটো হয়ে গেল। সে নিজের ব্যাগটা বুকে চেপে ধরে লজ্জায় এক দৌড়ে নিজেদের বাড়ির দিকে ছুটে গেল।

সময় গড়িয়ে এবার সন্ধ্যা নেমে এলো।
লন্ডনের বাইরে তখন হালকা অন্ধকার জমতে শুরু করেছে। উমায়ের একটু আগেই স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছে। উযাইন স্টাডি রুমে সারপ্রাইজ এক্সামের জন্য ল্যাপটপে কঠিন কঠিন প্রশ্ন বানাচ্ছিল। কিন্তু প্রশ্ন বানানোর ফাঁকে ফাঁকে তার মনটা বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই উমায়ের বইয়ের ব্যাগটা সোফায় রেখে এসে জড়িয়ে ধরল উযাইন কে
—”পাপা… আমি একটু ইনশিরার কাছে যাব। কাল রাতে ও আমার খুব টেক কেয়ার করেছে, ওকে থ্যাংক ইউ বলব।”
উমায়ের ক্লান্ত কিন্তু মায়াবী গলায় বায়না ধরার মতো করে বলল। উযাইন ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই, খুব স্বাভাবিক আর অবচেতন মনেই বলে উঠল—

—”ওখানে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। ইনশিরা আমাদের বাসাতেই আছে।”
উযাইনের বলা কথা গুলো শুনতেই উমায়ের এক লাফে খুশিতে ডগমগ হয়ে, চোখ বড় বড় করে—
—”ইনশিরা আমাদের বাসায়? কই, আমি তো ড্রয়িং রুমে বা কিচেনে ওকে দেখিনি! ও কি আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে? ও কোথায় লুকিয়ে আছে, পাপা?”
উমায়েরের এই প্রশ্ন শোনা মাত্রই উযাইনের হাতের আঙুলগুলো ল্যাপটপের কীবোর্ডের ওপর স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ঝট করে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা পার হয়ে রাত ছুঁইছুঁই!
উযাইনের এবার আচমকা খেয়াল হলো—ইনশিরা তো দুপুরবেলায় নিজেদের বাসায় গিয়েছিল! সেই দুপুরের পর থেকে এখন প্রায় কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছে, কিন্তু ইনশিরা এখনো ফিরে আসেনি!
উযাইনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল। জাহিরের সেই ফোন কলের কথা ওর মনে পড়ে গেল— “ইনশিরা কিন্তু অন্ধকার বড্ড ভয় পায়…”

উযাইন ল্যাপটপটা বন্ধ করে চিন্তিত মুখে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। মেয়েটা এতক্ষণ ধরে নিজেদের ফাঁকা বাসায় একা একা কী করছে?
উযাইন আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। সে এক দৌড়ে পাশের ইনশিরাদের বাড়ির সামনে এসে হাজির হলো। বাইরে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার পুরোপুরি গ্রাস করেছে, আর তার সাথে যোগ হয়েছে লন্ডনের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া।
উযাইন ইনশিরাদের মেইন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল বাজাতে লাগল। সে চড়া গলায় ডাকতে লাগল—

রুহ এ ইশক পর্ব ১৫

—”ইনশিরা! ইনশিরা! দরজা খোলো! ইনশিরা…!”
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না।

রুহ এ ইশক পর্ব ১৭