রুহ এ ইশক পর্ব ১৫
আনান রোজ
উযাইনের ‘পারফেক্ট ফ্যামিলি’ বলা এই ফিসফিসানি শুনতে পেয়ে চমকে উঠল। তার চোখের কোণে এক অদ্ভুত খুশির ছোঁয়া খেলে গেল। উযাইন নিজেকে চট করে সামলে নিয়ে উমায়েরকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। ও উমাইরের কপালে আর গলায় হাত দিয়ে তাপমাত্রা চেক করল।উযাইন একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নরম গলায়—
—”জ্বর একদম কমে গেছে সোনা! You are completely fine now. তুমি তো পাপাকে কাল রাতে একদম ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে!”
—”পাপা…ইনশিরার কাছে একটা ম্যাজিক আছে, ও একটা যাদুকরী পরী! ও কাল রাতে মাথায় হাত দিতেই আমার সব কষ্ট ভ্যানিশ হয়ে গেছে!”
উমায়ের ইনশিরার হাত ধরে এক টানে নিজের দিকে এনে, কথা গুলো বলে। বলেই উমায়ের এক লাফে গিয়ে ইনশিরার গলা জড়িয়ে ধরে ওর গালে একটা বড় করে চুমু খেল। উযাইন ইনশিরার সেই লজ্জাবনত আর হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে মনে গভীর এক আকুলতা নিয়ে বলল—
“হ্যাঁ উমায়ের…আমার পিচ্চি বউটা সত্যিই এক মায়াবী যাদুকরী! ও না থাকলে আমার এই অন্ধকার জীবনে এত আলো আসত না।”
এরপর বিছানা জুড়ে শুরু হলো তিনজনের মিষ্টি এক খুনসুটি। উমায়ের ইনশিরার ওড়না ধরে টানছিল, আর ইনশিরা বিছানার বালিশ উযাইনের দিকে ছুড়ে মারার নাটক করছিল। উযাইনও হাসতে হাসতে বালিশটা হাত দিয়ে আটকে দিচ্ছিল। পুরো ঘরে তখন শুধুই হাসির রোল।
ঠিক তখনই ঘটল সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ধামাকা! উমায়ের হঠাৎ ইনশিরাকে পেছন থেকে জাপটে ধরতেই ইনশিরা নিজের ভারসাম্য সামলাতে পারল না। সে সোজা সামনের দিকে পড়ে যেতে নিল….
তার ঠিক সামনেই বিছানায় উঠে বসে ছিল উযাইন। ইনশিরা নিজেকে বাঁচানোর জন্য দুই হাত বাড়িয়ে সরাসরি উযাইনের চওড়া বুকের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ল। আর ঠিক সেই পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে…
ইনশিরার মায়াবী নরম ঠোঁট জোড়া সরাসরি গিয়ে মিলে গেল উযাইনের তপ্ত ঠোঁটের সাথে! একদম নিখুঁত এক লি*প-কি*স!
অন্ধকার বারান্দার সেই রাতের পর ৩ বছর কেটে গেছে, কিন্তু আজকের এই সকালের আচমকা ছোঁয়াটা যেন এক সেকেন্ডে পুরো ঘরের বাতাসকে তপ্ত করে তুলল। উযাইনের শিরদাঁড়া বেয়ে এক তীব্র নিষিদ্ধ বৈদ্যুতিক শকের মতো শিহরণ বয়ে গেল।
উমায়ের এই দৃশ্য দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল এবং দুই হাত দিয়ে নিজের চোখ বন্ধ করে নিল—
—”Oh my God!”
উমাইরের আওয়াজে এক সেকেন্ডের মধ্যে দুই জনেরই মোহভঙ্গ হলো। ইনশিরা ধড়ফড় করে উযাইনের ওপর থেকে উঠে বসল। উযাইন এবং ইনশিরা—দুজনেই চরম থতমত খেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। উযাইনের কানের দুপাশ দিয়ে তখন যেন লাভা ছুটছে, তার নিজের জোরে জোরে চলা নিশ্বাস সে কিছুতেই সামলাতে পারছিল না। সে চট করে বিছানা থেকে নেমে নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করল। জাহির বা ইরা ঘুম থেকে উঠে এই ঘরে আসার আগেই তাকে এখান থেকে সরতে হবে, এই ভেবে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। অত্যন্ত দ্রুত শ্বাস নিতে নিতে সে ঘর থেকে সোজা গেস্ট রুমের দিকে পালিয়ে গেল।
ইনশিরা বিছানায় বসে নিজের ঠোঁট কামড়ে লজ্জায় আর এক অদ্ভুত শিহরণে একদম লাল হয়ে মাথা নিচু করে রইল। তার বুকের ভেতর তখন যেন একটা পুরো ব্যান্ডপার্টি বাজছে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে এক তীব্র আফসোস জাগল। সে নিজের মনে মনে ডুকরে উঠে ভাবল—
“উফফ! কেন… কেন বারবার আমাদের এই সুন্দর মুহূর্তগুলোর মাঝে কোনো না কোনো বাধা চলে আসে? লোকটা কেন একটুও নিজের অধিকার প্রকাশ করে না?”
সে নিজের বিছানার চাদরটা শক্ত করে খামচে ধরল এবং নিজের এই অদ্ভুত কামনার কথা ভেবে নিজেই নিজেকে মনে মনে বকে উঠল—
—”ছিঃ ইনশিরা ছিঃ! তুই একটা আস্ত বেহায়া মেয়ে! লোকটা তোকে তাড়িয়ে দেয়, আর তুই ওর ঠোঁটের ছোঁয়ায় এভাবে গলে যাচ্ছিস?!”
কিন্তু মুখের এই বকুনি সত্ত্বেও তার ব্যাকুল মন উযাইনের সেই তপ্ত ছোঁয়ার নেশা থেকে কিছুতেই বের হতে পারল না।
গেস্ট রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে উযাইন যখন ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্টের জন্য এলো, তখনো তার কানের দুপাশ দিয়ে গরম হাওয়া বইছে। ইনশিরা টেবিলে চা এগিয়ে দেওয়ার সময় দুুজনের চোখাচোখি হতেই উযাইন চট করে চোখ সরিয়ে নিল। সকালের সেই আচমকা চুমুর রেশ টেবিলে এক অদ্ভুত নীরবতা তৈরি করেছিল।
ব্রেকফাস্ট শেষ হতেই জাহির আর ইরা অফিসের কাজের জন্য তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে জাহির উযাইনকে বলল,—
—”উযাইন, তুই ইনশিরাকেও সাথে নিয়ে যা ইউনিতেই তো যাবি।”
—না, জাহির আমার কিছু কা…
উযাইন প্রথমে একটু ইতস্তত করে রাজি হতে চাইল না, কারণ সে ইনশিরার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাচ্ছিল। কিন্তু উমায়ের ইনশিরার হাত শক্ত করে ধরে বায়না ধরল—
—না! ইনশিরা আমাদের সাথেই যাবে!”
ছেলের জেদের কাছে হার মেনে উযাইন অবশেষে রাজি হলো। উযাইনের গাড়িটা এসে যখন লন্ডনের সেই নামকরা প্রাইমারি স্কুলের সামনে থামল, উমায়ের তখন খুশিতে ডগমগ। সে ইনশিরার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে স্কুলের ভেতরে ঢুকল। উযাইনও পকেটে হাত গুঁজে গম্ভীর মুখে ওদের পেছন পেছন আসছিল।
উমায়ের আজ খুব গর্বের সাথে ইনশিরাকে ওর পুরো ক্লাসরুম ঘুরিয়ে দেখাল, ওর স্কুলের বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। ইনশিরা উমাইরের এই চপলতা দেখে মায়ায় মজে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই ক্লাসরুমের এক কোণ থেকে তিন-চারটে দুষ্টু বাচ্চা উমাইরের দিকে এগিয়ে এলো। ওরা উমায়েরকে একা পেলেই সবসময় ডিস্টার্ব করত এবং উমাইরের মা নেই বলে ওকে নিয়ে হাসাহাসি করত। আজকেও ওরা উমাইরের কাছে এসে মুখ বাঁকিয়ে টিটকারি মারার চেষ্টা করল।
কিন্তু আজ উমায়ের বিন্দুমাত্র মন খারাপ করল না। সে বুক ফুলিয়ে, অত্যন্ত গর্বের সাথে ইনশিরার হাতটা নিজের ছোট্ট হাতের মুঠোয় টেনে নিল। তারপর ওই দুষ্টু বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট ও চড়া গলায় বলে উঠল—
—”এই দেখ! ও আমার আম্মু! আমার আম্মু এত দিন বিডিতে ছিল, তাই তোমাদের দেখাতে পারিনি! দেখেছ আমার আম্মু কত বিউটিফুল?”
সবার সামনে উমাইরের মুখে এই স্পষ্ট “আম্মু” ডাকটা শোনামাত্রই ইনশিরার বুকের ভেতরটা যেন এক অপার্থিব সুখে কেঁপে উঠল! তার চোখ দুটো খুশিতে টলমল করে উঠল। তার মনে পরল রাতে উমায়ের জ্বরের ঘোরে কিভাবে আবদার করেছিল।
উমায়ের ইনশিরার কোমর জড়িয়ে ধরে, কান্নাভেজা আদুরে গলায় বলল—
—”জানো আম্মু… তুমি ছিলে না বলে এরা আমাকে রোজ বুলি করত। বলত আমার মা নেই…”
উমায়েরের চোখের জল আর এই কষ্টের কথা শুনতেই ইনশিরার ভেতরের মা রূপী বাঘিনীটা এক সেকেন্ডে জেগে উঠল! তার ফর্সা মুখটা রাগে থমথম করে উঠল। সে এক পা এগিয়ে গিয়ে ওই দুষ্টু বাচ্চাদের দিকে অত্যন্ত কড়া আর ধারালো চোখে তাকাল।
ইনশিরা খুব গম্ভীর ও কড়া ভাবে বাচ্চাদের ধমকে উঠে বলল—
—”Listen carefully, boys! আজ থেকে যদি আর কোনোদিন আমার ছেলেকে কিছু বলেছ বা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করেছ, তবে আমি কিন্তু সরাসরি তোমাদের প্রিন্সিপালের কাছে গিয়ে অ্যাকশন নেব! Don’t you dare touch my son again!”
এক অনিন্দ্যসুন্দরী তরুণীর এই বাঘিনীর মতো রুদ্রমূর্তি আর ধমক দেখে ওই দুষ্টু বাচ্চারা ভয়ে এক নিমিষেই গুটিয়ে গেল। ওরা তাড়াতাড়ি মাথা হাল্কা নিচু করে ইনশিরারকে বলল—
—”We are sorry, ma’am! আমরা আর এমন করব না।”
বলেই ওরা ক্লাসরুমের পেছনের দিকে দৌড়ে পালিয়ে গেল। ইনশিরা উমায়েরকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে ওর কপালে একটা পরম স্নেহের চুমু খেল। উমায়ের এতদিনে নিজের মা-কে সবার সামনে পেয়ে, সে যেন এক স্বর্গীয় শান্তি পেল।
তখন ক্লাসরুমের দরজার পাশ থেকে এক ভদ্র মহিলার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। উমাইরের ক্লাস টিচার এতক্ষণ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ইনশিরার এই প্রটেক্টিভ মাতৃত্বের রূপটা খুব মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন। তিনি মুচকি হেসে ইনশিরার দিকে এগিয়ে এলেন।
ক্লাস টিচার ইনশিরার দিকে হাত বাড়িয়ে, খুব মার্জিত গলায় ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন—
—”Hello! I am Umayer’s class teacher. Are you Mrs. Abrar? ”
‘মিসেস আবরার’ শব্দটা ক্লাসরুমের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হওয়ামাত্রই ইনশিরা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার নিজের বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন যেন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই করিডোর দিয়ে উমায়েরকে ক্লাসে রেখে বিদায় নেওয়ার জন্য উযাইনও হেটে ওই দিকেই আসছিল। ক্লাস টিচারের মুখ থেকে ইনশিরাকে উদ্দেশ্য করে এই “মিসেস আবরার” প্রশ্নটা উযাইনের কানে পৌঁছানো মাত্রই প্রফেসর সাহেবের
পায়ের নিচের মাটি যেন এক সেকেন্ডে সরে গেল! সে দরজার সামনে এসে একদম পাথর হয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে ইনশিরার ফেস টার দিকে আটকে গেল।
উমায়েরের ক্লাস টিচারের সেই মোক্ষম প্রশ্ন শোনা মাত্রই দরজায় দাঁড়িয়ে প্রফেসর উযাইন আবরার দ্রুত পায়ে ক্লাসরুমের ভেতরে এগিয়ে এলো। সে যেকোনো মূল্যে এই ‘মিসেস আবরার’ পরিচয়টা অস্বীকার করতে চাইল। উযাইন খুব দ্রুত আর গম্ভীর গলায় বলতে নেয়—
—”No, she is not…”
কিন্তু উযাইনকে কথা শেষ করার কোনো সুযোগই দিল না ইনশিরা। সে উযাইনের দিকে এক পলক তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে ক্লাস টিচারের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। আর অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে স্পষ্ট স্বরে বলে—
—”Yes ma’am. I am his mother, Mrs. Abrar.
উযাইন চরম বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে আবার টিচারের দিকে তাকিয়ে বলল—
—”No! Listen to me ma’am, she is…”
উমায়ের উযাইনের কথা মাঝপথেই কেটে দিয়ে টিচারের হাত ধরে—
—”No ma’am! Papa is lying! এটাই আমার আম্মু!”
উযাইন এবার পুরোপুরি রেগে গিয়ে আবার ‘না’ বলতে গেল, কিন্তু তার আগেই ইনশিরা এক ধাপ এগিয়ে এসে উযাইনের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। সে টিচারের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার নাটক শুরু করল সে খুব বিনয়ী গলায়—
—”I am so sorry, ma’am! আসলে আজ আমাদের মধ্যে একটা হালকা কাপল ফাইট হয়েছিল, তাই উনি এখনো আমার ওপর রাগ করে আছেন। আর তাছাড়া আমার হাজবেন্ডের ইদানীং কাজের এত প্রেশার যে উনি মাঝে মাঝেই একটু আবলতাবল বকেন! প্লিজ ওর কথা মাইন্ড করবেন না।”
ইনশিরার মুখে নিজেকে নিয়ে এমন শুনতেই উযাইন যেন আকাশ থেকে সে চোখ বড় বড় করে ইনশিরার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না এই পিচ্ছি মেয়েটা সবার সামনে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীনের মতো বানিয়ে দিল!
উমায়ের ইনশিরার কথায় সায় দিয়ে মাথা নেড়ে বলে উঠে
—”হ্যাঁ মিস! পাপা মাঝে মাঝেই এমন করে!”
ক্লাস টিচার এবার পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন ভেবে মুচকি হাসলেন। তবে পরক্ষণেই তার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। ক্লাস টিচার ইনশিরার দিকে তাকিয়ে বলেন
—”মিস্টার আন্ড মিসেস আবরার, আপনাদের দুজনকে একটু আমার অফিস রুমে আসতে হবে। উমায়েরকে নিয়ে কিছু জরুরি কথা আছে।”
বলেই টিচার নিজের অফিসের দিকে চলে গেলেন। টিচার চলে যেতেই উযাইন চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ইনশিরার ওপর চড়াও হতে গেল,
—”ইনশিরা! হোয়াট ওয়াজ দ্যাট?! তুমি…”।
কিন্তু ইনশিরা উযাইনের কোনো কথাই শুনল না। সে মুচকি হেসে উমাইরের হাত ধরে টিচারের অফিসের দিকে হাঁটা দিল। উযাইনও রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ওদের পেছন পেছন প্রিন্সিপালের করিডোর দিয়ে এগিয়ে গেল।
টিচারের অফিস রুমে ঢোকার পর টিচার ওদের বসতে বললেন। উমায়ের ইনশিরার কোল ঘেঁষে বসল, আর উযাইন এক পাশে শক্ত হয়ে বসল।
ক্লাস টিচার ইনশিরার দিকে সোজা তাকিয়ে আবার বলে উঠেন
—”তাহলে… আপনিই উমাইরের মা?”
—”ইয়েস ম্যাম।”
উযাইনও তখন রুমে এসে সোফায় বসেছিল। সে মুখ খুলতে চাইল কিন্তু টিচার তাকে থামিয়ে দিয়ে সরাসরি ইনশিরাকে টার্গেট করে নালিশ দেওয়া শুরু করলেন। একজন দায়িত্বশীল শিক্ষিকার মতো তার কণ্ঠস্বর এবার বেশ কড়া হয়ে উঠল।ক্লাস টিচার তীব্র তিরস্কারের সুরে একদমে বলতে শুরু করেন
—”মিসেস আবরার, আপনি কেমন মা? এত দিন ধরে আপনি বিডিতে পড়েছিলেন? সাত বছরের বাচ্চার প্রতি আপনার কি কোনো দায়িত্ব নেই? বাচ্চার স্টাডি, হেলথ কেয়ার ম্যানার্স কিংবা ডিসিপ্লিন শেখানো —এসবের কোনো খোঁজ আপনি রেখেছেন? এই বয়সে একটা বাচ্চার মায়ের মায়া সবচেয়ে বেশি দরকার হয়।”
টিচারের এই কড়া কথাগুলো ইনশিরার বুকে তীরের মতো গিয়ে বিঁধল। তার মুখটা এক নিমেষে ছোট হয়ে গেল। ক্লাস টিচার উযাইন এবং ইনশিরা দুজনের দিকে তাকিয়ে
—”আর একটা কথা পরিষ্কার শুনে রাখুন। আপনাদের ফ্যামিলি ম্যাটার বা পার্সোনাল লাইফে যাই চলুক না কেন, বাচ্চাকে ওসব থেকে দূরে রাখবেন!
বাবা-মা দুজনেই বেঁচে থাকা সত্ত্বেও এই বাচ্চাটা স্কুলে একদম একা একা সব হ্যান্ডেল করে! ওর মেন্টাল গ্রোথের জন্য এটা কতটা ক্ষতিকর, তা কি আপনারা আন্দাজ করতে পারেন?”
টিচারের এই প্রতিটি কথা যেন উযাইনের বুকেও হাতুড়ির মতো আঘাত করল। সে অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে রইল। আর ইনশিরা উমাইরের দিকে তাকিয়ে এক তীব্র অপরাধবোধে গিল্ট এ ভুগতে লাগল, কারণ সে আসলেই বিগত ৩ বছর উমাইরের পাশে থাকতে পারেনি—যদিও এর পেছনে কারণ ছিল উযাইনের জেদ।
টিচারের অফিস রুম থেকে বেরিয়ে আসার পর করিডোরটা কিছুটা ফাঁকা ছিল। উমায়ের ইনশিরার ফ্যাকাশে আর বিষণ্ণ মুখটার দিকে তাকাল। সে এক লাফে এসে ইনশিরার কোমর জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মাথা রাখল। উমায়ের খুব মায়াবী আর গলায়—
—”থ্যাকং ইউ ইনশিরা হেল্প করার জন্য। আর ম্যাম তো ওইসব কথা সবসময় বলে, তুমি ওসব একদম মনে নিও না, আই এম পারফেক্টলি ফাইন।”
একটা ৭ বছরের বাচ্চার মুখে এই বয়সেই এত পরিপক্ব আর সান্ত্বনার কথা শুনে ইনশিরার বুকের ভেতরটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে গেল। টিচারের তিরস্কারের চেয়েও উমাইরের এই সান্ত্বনা তাকে বেশি অপরাধী বোধ করাল। ইনশিরা হাঁটু গেড়ে উমাইরের সামনে বসল এবং ওর দুই হাত ধরে কান্নাভেজা
গলায় বলল—
—”না সোনা… তুমি ওমন কথা বোলো না। আমি সত্যিই তোমার আম…”
কিন্তু উযাইন পাশ থেকে খুব গম্ভীর আর কড়া গলায় কথা কেটে দিয়ে
—”ইনশিরা, চলো! আমাদের ইউনিভার্সিটি যাওয়ার লেইট হচ্ছে। আর উমায়ের, তুমি চুপচাপ নিজের ক্লাসে যাও।”
উমায়ের আর কোনো কথা না বলে বাধ্য ছেলের মতো ক্লাসের দিকে হেঁটে গেল। উযাইন এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে ইনশিরার হাতটা শক্ত করে ধরে প্রায় টেনে হিঁচড়ে স্কুলের বাইরে নিয়ে এলো এবং ওকে গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে নিজে ড্রাইভ করতে শুরু করল।
গাড়ির ভেতরে এক দমবন্ধ করা নীরবতা। জানলা দিয়ে লন্ডনের রাস্তা দেখতে দেখতে ইনশিরার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। সে আর নিজের ভেতরের কান্না চেপে রাখতে পারল না। সে, উযাইনের দিকে চেয়ে অভিমানী গলায় বলল—
—”আপনি এত নিষ্ঠুর কেন উযাইন? কেন আপনি আমাকে মেনে নিচ্ছেন না? আমরা তো বিবাহিত…তাও কেন এই দূরত্ব? আব্বু নাহয় এখন কিছুদিন রেগে থাকবে। পরে কি রাজি হবে না? আর সমাজ নিয়ে এত কেন চিন্তা?”
উযাইন ইনশিরার কান্নার দিকে তাকাল না, তার শক্ত হাত দুটো গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল আরও জোরে চেপে ধরল। উযাইন খুব শীতল আর চড়া গলায় বলে—
—”চলো, আজ এই নাটকের স্থায়ী সমাধান করা দরকার।”
ইনশিরা চোখের জল মুছে, অবাক হয়ে উযাইনের দিকে তাকিয়ে বলে
—”কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
উযাইন সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভ করছে। সে যেন নিজের সাথেই লড়াই করছে। তারপর আচমকাই বলে উঠে—
রুহ এ ইশক পর্ব ১৪
—”ল’ ফার্মে! আমাদের এই জোর করে টিকে থাকা বিয়ের কাগজপত্রের ফাইনাল ডিভোর্সের জন্য!”
ডিভোর্সের কথা শোনামাত্রই ইনশিরার ভেতরের সব মায়া যেন এক সেকেন্ডে অপমান আর তীব্র অভিমানে রূপ নিল। সে আর অনুনয় করল না……
“When the Rooh forms the bond, age loses its meaning.”
