Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ১৪

রুহ এ ইশক পর্ব ১৪

রুহ এ ইশক পর্ব ১৪
আনান রোজ

‘বিয়ে দিয়ে দিতাম’—কথাটা শোনামাত্রই উযাইনের মনের ভেতর যেন এক ডজন বোমা একসাথে ফাটল! সে নিজের মনে মনে চরম ক্ষোভ আর অধিকারবোধ নিয়ে জাহিরকে একেবারে ধুয়ে দিল—”আস্ত একটা শয়তান শ্বশুর কোথাকার! তোর জামাই তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আর তুই আরেক ছেলের সাথে তোর মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন দেখছিস?! যেমন পাগল বাপ, তেমন একগুঁয়ে ডাইনি মেয়ে! উফফ!”
কিন্তু মুখে সে নিজের রাগটা কোনোমতে হজম করে, শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে অত্যন্ত রুক্ষ গলায় বলল—

—”হুম, হয়েছে! তোর আর অত খোয়াব দেখতে হবে না জাহির!”
বলেই উযাইন উমায়েরকে কোলে তুলে হনহন করে পাশের বাড়ির দিকে রওনা দিল। আর জাহির দরজায় দাঁড়িয়ে বন্ধুর এই হঠাৎ রেগে যাওয়ার কারণ কিছুতেই বুঝতে না পেরে মাথা চুলকাতে লাগল।
বাসায় ফিরেই উযাইন উমায়েরকে সোফায় বসিয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় শাসন করল।
—”লিসেন উমায়ের, আজ থেকে তুমি আর কখনো ইনশিরার নাম মুখে আনবে না! আর ওসব বিয়ের ফালতু কথা তো একদমই না। ইটস এন অর্ডার!”
বাবার এই আচমকা রুক্ষতা উমায়েরও রেগে ফুঁসে উঠল। সে চিৎকার করে কেঁদে দিল,
—”নো! আই উইল নট লিসেন টু ইউ! ইনশিরা আমাদের, আমি ওর কাছে যাবই !”
উযাইন প্রথমে রাগ দেখালেও ছেলের কান্না দেখে তার মনটা নরম হয়ে গেল। সে উমায়েরকে কোলে নিয়ে অনেক ভালোবাসায় বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু উমায়ের কোনো কথাই মানল না। সে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল।

পরদিন সকালে
ইনশিরা এক বুক আশা নিয়ে উযাইনদের বাসায় এলো। কিন্তু দরজায় থাকা সার্ভেন্ট খুব ঠান্ডা গলায় বলল,
—”দুঃখিত মিস, স্যার এবং ছোট বাবা বাসায় নেই।”
ইনশিরা মন খারাপ করে চলে গেল। সে ভাবলো, বাহ! হটাৎ ওরা কোথায় গেল? আর উমায়ের কিছু জানাল না কেন।
দেখতে দেখতে আরও একটি দিন পার হয়ে গেল। পরের দিন সে আবারও গেল, কিন্তু সার্ভেন্ট একই যান্ত্রিক জবাব দিল—”ওরা কেউ বাসায় নেই।”
ইনশিরা বুঝতে পারল না যে এটি উযাইনেরই দেওয়া কঠোর নির্দেশ। সে বিষণ্ণ মনে ইউনিভার্সিটিতে গেল, কিন্তু আজ ইউনিতে উযাইনের কোনো ক্লাস ছিল না। আর এদিকে ইনশিরার সাথে দেখা করতে না পেরে উমায়ের জেদ ধরে খাওয়া-দাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল। আর এই অনাহার ও মানসিক কষ্টে অবুঝ বাচ্চাটার শরীর পুড়ে তীব্র জ্বর এসে গেল।
রাত তখন প্রায় ১০টা।
ইনশিরাদের বাসায় সবাই রাতের ডিনার শেষ করে লিভিং রুমে গল্প করছিল। আর ওদিকে উযাইনের বাসায় উমায়ের জ্বরের ঘোরে ছটফট করছে আর অবিরত কেঁদে কেঁদে শুধু একটা কথাই বলছে—

—”ইনশিরা… আমি ইনশিরার কাছে যাব… পাপা, আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলো…”
রাত ১১টা।
ছেলের এই কষ্ট উযাইন আর সহ্য করতে পারল না। তার নিজের সব অহংকার, জেদ আর কঠোরতার দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে উমায়েরকে একটা কম্বলে জড়িয়ে কোলে তুলে নিয়ে সোজা পাশের বাড়ির দিকে ছুটল।
কলিংবেল বাজতেই জাহির দরজা খুলল। মাঝরাতে উযাইনের উষ্কখুষ্ক চুল আর কোলে অসুস্থ উমায়েরকে দেখে লিভিং রুমে থাকা জাহির, ইরা এবং ইনশিরা—সবাই চরম অবাক হয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। ইনশিরা আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সে প্রায় দৌড়ে এসে উযাইনের কোল থেকে উমায়েরকে নিজের বুকে টেনে নিল। উমাইরের গায়ে হাত দিতেই ইনশিরার বুকটা কেঁপে উঠল—
—বাচ্চাটার গা একেবারে পুড়ে যাচ্ছে!
উযাইন খুব অপরাধী ও ক্লান্ত গলায়, জাহিরের দিকে তাকিয়ে বলে—
—”জাহির… এত লেট নাইটে আসায় আমি দুঃখিত রে। ও আসলে জ্বরের ঘোরে বারবার ইনশিরার নাম ধরে কাঁদছিল… আমি আর ওকে সামলাতে পারলাম না।”
ইনশিরা উমায়েরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে প্রায় ছুটে নিজের বেডরুমের দিকে চলে গেল। লিভিং রুমে তখন জাহির আর ইরা উযাইনের দিকে কিছুটা রাগ আর অভিমান নিয়ে তাকালেন।

—”আরে উযাইন, ছেলেটার এত জ্বর, তুই আমাদের একবার জানাবি না? আমরা তো তোর বন্ধুই হই, নাকি?” (জাহির)
—”হ্যাঁ উযাইন, বাচ্চাটাকে ওভাবে একলা ঘরে কষ্ট দেওয়ার কী মানে? আচ্ছা, তুমি ওসব নিয়ে এখন ভেবো না।” (ইরা)
ইনশিরা উমায়েরকে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিল। উমাইরের কপালে আর গালে পরম মমতায় একের পর এক চুমু দিতে দিতে তার নিজের চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে তাড়াতাড়ি একটা পাত্রে জল আর সুতির কাপড় নিয়ে এসে উমাইরের কপালে জলপট্টি দিতে শুরু করল।
জলের ভেজা ছোঁয়ায় উমায়ের ধীর পায়ে চোখ মেলল। সে ইনশিরার ওড়নাটা নিজের ছোট হাত দিয়ে খামচে ধরে খুব দুর্বল স্বরে বলল—

—”তুমি… তুমি দুদিন আমাদের বাসায় কেন যাওনি ইনশিরা? পাপা তো আমাকে তোমার কাছে আসতে মানা করেছিল… কিন্তু তুমিও কেন আমাকে দেখতে এলে না?”
উমাইরের একদম ঠোঁট ভেঙে টলমল চোখে বলল। তার মুখে এই কথাটা শোনামাত্রই ইনশিরা এক চরম ধাক্কা খেল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে মনে মনে ভাবল—তার মানে উনিই…? আমি তো গত দুদিনই ওদের বাসায় গিয়েছিলাম!
ঠিক তখনই উযাইন ধীর পায়ে ইনশিরার ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। ইনশিরা চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা উযাইনের পাথুরে ফেসটার দিকে তাকাল। তার মনের সব ধাঁধা এক সেকেন্ডে পরিষ্কার হয়ে গেল।
লিভিং রুম থেকে জাহির আর ইরাও দরজার কাছে এলেন। উযাইনের ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত চেহারা দেখে তারা স্নেহভরে বললেন—

—”উযাইন, আজ তোরা আর বাসায় ফিরে যাস না। তুই গেস্ট রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। আর উমায়ের আজ ইনশিরার কাছেই থাকুক। ও ভালো টেক-কেয়ার করতে পারবে।”
জাহির আর ইরা উযাইনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেলেন। রুমে এখন শুধু ঘুমন্ত উমায়ের, আর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা উযাইন ও ইনশিরা।
ইনশিরার চোখের কোণ বেয়ে তখন অনবরত জল ঝরছে, তার বুকটা অভিমানে আর রাগে কাঁপছে। সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে উযাইনের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ইনশিরা কান্নাভেজা, তীব্র অথচ নিচু গলায় উযাইনের চোখের দিকে তাকিয়ে
—”আপ… আপনি সার্ভেন্টদের মানা করে দিয়ে ছিলেন না, যাতে আমাকে না করে দেয়? রাইট প্রফেসর সাহেব? ৩ বছর আগের মতো আবারও আপনি আমাদের মাঝে দেয়াল তুলছেন?”
উযাইন কোনো জবাব দিতে পারল না। সে অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে রইল।ইনশিরা উযাইনের শার্টের কলারটা দুই হাত দিয়ে খামচে ধরে, ডুকরে কেঁদে উঠে বলল—

—”নিজের ইগো আর জেদ বজায় রাখতে গিয়ে আজ আমার ছেলেটা কতটা কষ্ট পাচ্ছে! দেখুন… ভালো করে তাকিয়ে দেখুন। হাউ কুড ইউ বি সো হার্টলেস, উযাইন?!”
‘আমার ছেলেটা’ শব্দটা ইনশিরার মুখে শোনামাত্রই উযাইনের বুকের ভেতর এক তীব্র অপরাধবোধ আর ভালোবাসার ভাঙন ধরল। সে স্তব্ধ হয়ে ইনশিরার কান্নাভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না ঠিক তখনই বিছানা থেকে উমাইরের দুর্বল কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সে জ্বরের ঘোরে চোখ বুজেই বিড়বিড় করে বলছে—
—”ইন…ইনশিরা… তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না…
উমাইরের কণ্ঠ শুনে ইনশিরা ঝট করে উযাইনের কলার ছেড়ে দিয়ে বিছানার দিকে ছুটে গেল। সে উমাইরের পাশে বসে ওর কপালে হাত রাখল, তারপর পরম মায়ায় ওর গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে নিচু স্বরে বলল—
—”না সোনা… আমি কোথাও যাব না। এই তো তোমার ইনশিরা তোমার কাছেই আছে। একদম ভয় পেয়ো না, বাবা আমার…”
ইনশিরার এই নিঃস্বার্থ মায়া দেখে উযাইনের বুকের ভেতরটা ওলটপালট হয়ে গেল। সে ধীর পায়ে বিছানার আরও একটু কাছে এগিয়ে এলো, খুব নিচু, অপরাধী এবং ভাঙা গলায় বলে—

—”ইনশিরা… আই অ্যাম সরি। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি আমার এই সিদ্ধান্তের জন্য উমায়ের এতটা অসুস্থ হয়ে পড়বে। বাট ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড, এটাই রিয়া…”
—”হ্যাঁ! রিয়ালিটি এটাই যে আমি আপনার বউ! ওর মা আর আপ… আপনি একজন পাপী! উযাইন সাহেব, নিজের জেদ ধরে রাখতে গিয়ে আপনি নিজের বউ সন্তানের সাথে পাপ করছেন!”
ইনশিরা ঝট করে উযাইনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে, চোখের জল মুছে ধারালো গলায় বলে। আর ‘পাপী’ শব্দটা উযাইনের কানে লাগামাত্রই সে তীব্রভাবে চমকে উঠল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
সে চোখ বড় বড় করে, চাপা ক্ষোভ নিয়ে বলে—
—”ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিটস! তুমি এখন আর সেই ১৬ বছরের ছোট বাচ্চা নও। ১৯ বছর বয়স হয়েছে তোমার। তুমি উমায়ের থেকে দূর…”
—”উফ বাদ দিন তো! আপনি একটা আস্ত পাষাণ পুরুষ! আপনার বুকে কোনো দয়ামায়া নেই!”
ইনশিরা উযাইনকে কথা শেষ করতে না দিয়ে, ঘৃণা ভরা চোখে তাকিয়ে বলে উঠে।

‘পাষাণ’ শব্দটা শুনে উযাইন এক নিমেষে থমকে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে ইনশিরার ওই জ্বলন্ত চোখ দুটোর দিকে চেয়ে রইল। তার মনের ভেতর এক তীব্র ঝড় বয়ে গেল। সে নিজের মনে মনে এক বুক হাহাকার নিয়ে ভাবল—
“আমি পাষাণ? এই মেয়েটা কি জানে আমার মনের অবস্থা? জানে আমার সেই অভিশপ্ত অতীত? জানে প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা সেকেন্ড ওর এই বুনো ফুলের সুবাস আর মায়া থেকে নিজেকে দূরে রাখতে আমার কতটা কষ্ট হয়? ওর চোখে পানি দেখলে আমার বুক টা ছিরে যায়? আমি কতটা পুড়ছি তা কি ও জানে?”
ঠিক তখনই হটাত করে বিছানায় উমায়ের ছটফট করে উঠল। সে চোখ মেলে, হাত দুটো বাড়িয়ে খুব কষ্ট নিয়ে জ্বরের ঘোরে বলল—

—”ই… ইনশিরা…”
ইনশিরা দ্রুত উমায়ের কাছে গেল। আর জল পট্টিটা উলটে দিয়ে, চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে—
—”এখানেই তো আছি, বলো?”
—”তু…তুমি আমার আম্মু হবে? সবারই তো আম্মু আছে শুধু আমারই নেই। তোমারও আছে পাপারও আছে, আমার নেই কেন? উমায়ের ব্যাড বয় তাইনা?
উমায়ের নিশপাপ আর্তনাত শুনে দুজনেরই স্পন্দন থমকে গেল। ইনশিরার চোখ আর বাধ মানল না, সে অভিমানী চোখে একবার উযাইনের দিকে তাকালো। উমায়ের জ্বরের ঘোর নিয়ে আবার বলল—
—”একটু ডাকি? তুমি রাগ করবে?আমার তোমাকে অনেক পছন্দ…”
—”হ্যা সোনা! আমিই তোমার আম্মু। একটুও রাগ করব না বাবা….”
—”আম…আম্মু … আমার খুব খারাপ লাগছে। ব… বমি লাগছে!”

আম্মু ডাক টা যেন ইনশিরার স্নায়ু অবশ করে দিল… কিন্তু বাকি কথাটা শোনামাত্রই ইনশিরা আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। সে দ্রুত উমায়েরকে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমের দিকে দৌড়ে গেল। উযাইনও চিন্তিত মুখে ওদের পেছন পেছন ওয়াশরুমে ঢুকল। উমায়ের বেশ কয়েকবার বমি করার পর একদম ক্লান্ত ও নিস্তেজ হয়ে পড়ল। ইনশিরা পরম যত্নে ওর মুখ মুছিয়ে দিয়ে ওকে আবার কোলে তুলে নিয়ে রুমে ফিরে এলো।
৩ বছর আগের সেই অবুঝ ১৬ বছরের ইনশিরা আজ ১৯ বছরে এসে কতটা ম্যাচিউর আর দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে, তা উযাইন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল।
উমায়ের বিছানায় বসার পর একদম ভেঙে পড়া গলায়, চোখ দুটো আধো-বোজা রেখে ইনশিরার দিকে হাত বাড়াল। উমায়ের খুব আদুরে ও দুর্বল গলায় বলে—

—”আম্মু … আমাকে একটু কোলে নেবে? আ…আমার খুব ঠাণ্ডা লাগছে…”
ইনশিরা এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে বিছানা থেকে একটা গরম নরম কম্বল টেনে নিয়ে খুব সাবধানে উমাইরের পুরো শরীরে পেঁচিয়ে দিল। তারপর উমায়েরকে নিজের কোলের মধ্যে তুলে নিয়ে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে বসল। কম্বলের ওমে আর ইনশিরার বুকের ওমে উমায়ের এক পরম শান্তি পেল।
সে ইনশিরার গলায় নিজের ছোট হাত দুটো জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মাথা রাখল। ইনশিরা একহাতে উমাইরের কপালে হাত রেখে অন্যহাতে ওর পিঠ চাপড়ে দিতে লাগল।
উযাইন আবরার ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে অপলক চোখে এই দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে রইল। সে কোনো রাগ দেখাল না বাধাও দিল না উমায়ের কে আম্মু ডাকতে, সেও যেন তাই চাচ্ছে। তার বুকের ভেতরের সব রাগ আর দিধা তখন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। সে মুগ্ধ ও স্তব্ধ হয়ে ভাবছিল— এই ছোট্ট মেয়েটা কত দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নিল, কত সুন্দর আর গোছানো উপায়ে সে একটা অসুস্থ বাচ্চার দেখভাল করছে!
ইনশিরার এই রূপ উযাইনের মনের শেষ শক্ত পাথরটাকেও গলিয়ে দিতে চাইল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আর নিজের দুর্বলতা বাড়াতে চাইল না। সে ইনশিরার ঘর ছেড়ে পাশের গেস্ট রুমের দিকে পা বাড়াতে গেল। ঠিক তখনই উমায়ের জ্বরের ঘোরেই আধো-বোজা চোখে খুব দুর্বল স্বরে ডাকল—

—”পাপা… আসো… পাপা…!”
উযাইন ঝট করে থেমে গেল। সে আবার বিছানার কাছে ফিরে এসে উমাইরের কপালে হাত রেখে নরম গলায় বলল—
—”হ্যাঁ সোনা… আমি এখানেই আছি। কোথাও যাচ্ছি না।”
উমায়ের হাত বাড়িয়ে উযাইনের শার্টের কোণা খামচে ধরে, টলমল চোখে, ঠোঁট উলটে কাদো কাদো স্বরে বলে—
—”পাপা… তুমি কি এখনো রেগে আছ? প্লিজ আমার কাছে আসো… যেও না…”
উযাইন এবার চরম ইতস্তত করতে লাগল। কারণ উমায়ের ইনশিরার কোলে শুয়ে আছে, আর উমায়েরের পাশে বসতে গেলে ইনশিরার একদম কাছে , ওর বিছানায় বসতে হবে। তার ভেতরের সেই চিরচেনা অস্বস্তি আর সামাজিক দ্বিধা আবার চাড়া দিয়ে উঠল। ইনশিরা উযাইনের এই দোটানা দেখে, খুব শান্ত কিন্তু হালকা খোঁচা দিয়ে নিচু গলায় বলল

—”বসতে পারেন, পর’নারীর বিছানা না। আমার বেডে বসলে আপনার কোনো পাপ হবে না।”
উযাইন ইনশিরার এই কথার কোনো জবাব দিল না। সে নিজের সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বিছানার অন্য পাশে গিয়ে ইনশিরার একদম কাছাকাছি বসে পড়ল। তাদের মাঝখানে শুধু অসুস্থ উমায়ের। উযাইন আলতো করে উমাইরের কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল, আর ইনশিরা উমাইরের চুলে বিলি কাটতে লাগল। আর ওদের হাত গুলো বার বার স্পর্শ হয়। পুরো ঘরে এক অদ্ভুত, মায়াবী নীরবতা নেমে এলো। সারাদিনের ধকল আর ইনশিরার গায়ের সেই চেনা বুনো ফুলের সুবাসে উযাইনের চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। এভাবেই… এক বিছানায় উমায়েরকে মাঝখানে রেখে উযাইন আর ইনশিরা দুজনেই এক সময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
পরদিন ভোর বেলা
জানলা গলে লন্ডনের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে ইনশিরার ঘরের বিছানায়। উমায়ের সবার আগে নড়েচড়ে উঠল এবং তার ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে বিছানার দুপাশে তাকাতেই ওর ফুটফুটে মুখে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। সে দেখল—তার একপাশে পাপা আর অন্য পাশে ইনশিরা। দুজনেই ওকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। উমায়ের বিছানায় উঠে বসল। তারপর দুই হাত গালে দিয়ে খুব ফিসফিস করে নিজের মনেই খুশিতে বলে উঠল—

—”Wow…Our Perfect Family!”
সে আর দেরি করল না। সাইড টেবিলের ওপর রাখা উযাইনের আইফোনটা চুপিচুপি তুলে নিল। তারপর ক্যামেরা অন করে খুব সাবধানে বিছানায় ঘুমন্ত পাপা আর ইনশিরার সাথে নিজের কিছু চমৎকার ও কিউট ছবি তুলে নিতে লাগলো…
ক্যামেরার ক্লিকের হালকা শব্দে ইনশিরার ঘুম ভেঙে গেল। সে ধীর পায়ে চোখ মেলতেই তার পুরো শরীর যেন এক সেকেন্ডে জমে বরফ হয়ে গেল! সে স্তব্ধ হয়ে আবিষ্কার করল—উযাইনের ফর্সা, সুদর্শন মুখটা তার থেকে মাত্র এক দু ইঞ্চি দূরে! ঘুমের ঘোরে উযাইনের ওল্ফ কাট চুলগুলো ওর কপালে ছড়িয়ে আছে। ইনশিরার বুকের ভেতর তীব্র ধড়ফড়ানি শুরু হলো, এক অদ্ভুত মিষ্টি অস্বস্তি তাকে গ্রাস করল। সে অপলক চোখে উযাইনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক বুক আক্ষেপ নিয়ে ভাবল—

“লোকটাকে ঘুমন্ত অবস্থায় কত নিষ্পাপ আর শান্ত লাগছে! কী এমন ক্ষতি হতো… যদি সে এই বিশ বছর বয়সের অন্তর আর সমাজের দেয়াল ভুলে আমাকে নিজের বউ বলে মেনে নিত?”
ঠিক তখনই ইনশিরা খেয়াল করল উমায়ের ফোন হাতে নিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ইনশিরা চট করে উঠে বসে উমাইরের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেওয়ার ভান করল। ইনশিরা নিচু স্বরে হেসে, দুষ্টুমি ভরা গলায়—
—”এই যে মিস্টার পুচকে আবরার! চুপিচুপি পাপার ফোনে কী করা হচ্ছে, শুনি?”
—”নো! আমি আমাদের পারফেক্ট ফ্যামিলির ছবি তুলেছি! দেখাব না একদম!”
উমায়ের ফোনটা লুকাতে লুকাতে আস্তে করে হেসে বলে উঠে। আর তারপরই শুরু হলো বিছানার ওপর উমায়ের আর ইনশিরার মিষ্টি খুনসুটি আর কানাকানি।
উমাইরের খিলখিল হাসির আওয়াজে এবার ঘুম ভেঙে গেল প্রফেসর উযাইনের। সে চোখ পিটপিট করে তাকাল এবং বিছানার এই মিষ্টি সকালের পাগলামি দেখে উঠে বসল। ৩ বছর পর তাদের এই সকালটা এক অদ্ভুত ও মায়াবী পূর্ণতা নিয়ে এলো।
ঘুম থেকে উঠেই বিছানার এই সুন্দর দৃশ্য দেখে গম্ভীর প্রফেসরের মনটা এক পরম শান্তিতে ভরে গেল। ৩ বছর ধরে যে শূন্যতা সে বুকে চেপে রেখেছিল, আজকের এই সকালটা যেন সেই ক্ষতগুলো এক নিমেষে ভুলিয়ে দিল। উযাইন অপলক চোখে ইনশিরা আর উমাইরের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এটা সত্যিই তাদের পরিবার….!! তার মনের দেয়াল ভেঙে এক অদ্ভুত অনুভূতি চাড়া দিয়ে উঠল। সে নিজের অজান্তেই একদম আনমনে ফিসফিসে বলে উঠল—

রুহ এ ইশক পর্ব ১৩

—”পারফেক্ট ফ্যামিলি…!”
“Age & society means nothing when the bond is rooted in the Rooh.”

রুহ এ ইশক পর্ব ১৫