Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৬

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৬

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৬
ফারহানা নিঝুম

“তুমি কি ভদ্র ভাবে থাকতে পারো না?”
তারা বাদশাহর এহেন তিরস্কারে নত হয় মস্তক! তার ঠোঁটের লেগে থাকা ক্ষীণ হাস্যরেখাটুকু নিমিষেই বিলীন হয়ে গেল।
ক্ষুব্ধ তারা বাদশাহর দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে ঝুমঝুম অপরাধী কন্ঠে বলল,
“সরি,মা।”

তারা বাদশাহ বিরক্তি নিয়ে চুপচাপ টেবিলে চলে গেলেন। ঝুমঝুম চোরা চোখে চাইলো টেবিলে বসা শয্যের দিকে। শয্যের পাশের চেয়ারটা খালি দেখে মনটা নেচে উঠল কন্যার! কিন্তু পরমুহূর্তেই রিমঝিমকে সেই দিকেই অগ্রসর হতে দেখে আতঙ্কের শীতল স্রোত বয়ে গেল তার শিরায়।
একপ্রকার অতর্কিত তাড়নায় ছুটে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই চেয়ারটি নিজের অধিকারে নিয়ে নিল ঝুমঝুম।
রিমঝিম দৃষ্টি সংকুচিত করে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল বোনের দিকে। আর ঝুমঝুম? সে যেন নির্বিকার!
সমস্ত বত্রিশটি দাঁত উন্মোচিত করে নির্লজ্জ হাসি হেসে স্বাচ্ছন্দ্যে চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
শয্য আড়চোখে সেই উচ্ছৃঙ্খল অথচ আশ্চর্যরকম সরল মেয়েটির দিকে তাকাল।
মেয়েটির মুখাবয়বে ছড়িয়ে থাকা শিশুসুলভ দীপ্তি আর অবুঝ উচ্ছ্বাস দেখে অদ্ভুত এক কোমলতায় ভরে উঠল তার অন্তঃস্থল। আর সেই কোমলতাই ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিতে লাগল বহু যত্নে নির্মিত শয্যের কঠোর ধৈর্যের প্রাচীর।
“ভাইয়া, ওয়েল কাম!”
শয্য চোখ বুঁজে নিজেকে সংযত করল! এই মূহুর্তে তার ইচ্ছে করছে কষিয়ে একটা থাপ্পর দিয়ে বলতে,
“আই অ্যাম নট ইও্যর ব্রাদার, ইডিয়ট!”
না এই কন্যাকে সে কখনো স্ত্রী স্বরূপ পাবেনা! এই কন্যা উঠেপড়ে লেগেছে তাকে ভাই বানানোর জন্য!

বুকের ভেতর ধকধক করছে জুঁইয়ের!‌ নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়েছে রমণীর! এভাবে কেউ জড়িয়ে ধরে? এই পুরুষ তাকে দমবন্ধ করা মেরে ফেলার চেষ্টা করছে! বলিষ্ঠ হাতের এমন জড়িয়ে ধরায় কুন্ঠিত বোধ করছে কন্যা,
“থ্যাংক ইয়্যু, জুঁই!”
জুঁই লম্বা নিঃশ্বাস টেনে স্বভাবসিদ্ধ লাজুক স্বরে বলল,
“আপনি এভাবে জড়িয়ে ধরলে আমি একদিনেই ম’রে যাবো!”
পিনপতন নীরবতা! সেই নিরবতা ভেঙ্গে জুঁইয়ের কর্ণ কুহুতে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে ভেসে এলো পুরুষালী জড়ানো স্বর,

“তাহলে রুমে চলুন আপনাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মে’রে ফেলি!”
হকচকালো জুঁই! লজ্জায় রক্তিম হয় চিবুক! অভ্যন্তরে আলোড়ন তুলতে সক্ষম এই পুরুষ!
কি নির্ভীকচিত্তে বলে দিল কথাখানা! জুঁই ক্রোধে ফোঁস ফোঁস করে উঠল, নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিলো তাকে!
নাক মুখ বিকৃত করে অদ্ভুত বিরক্তি ভাব নিয়ে বলল,
“আপনি এমন কেন হুঁ?, আশ্চর্য!”
আব্রাহাম একপেশে হেসে চোখ টিপে বলল,
“কেমন?”
কন্যার চক্ষু চড়কগাছ প্রায়! এ কেমন পুরুষ? কখনো ভদ্র কখনো অভদ্র! ভারী মুশকিল হলো তো!
জুঁই তাকে সম্পূর্ণ রূপে উপেক্ষা করে চলে গেল খাবারের বাটিগুলো নিয়ে। সেগুলো নিয়ে গিয়ে একে একে টেবিলে খেতে বসা সকলকে সার্ভ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
শয্যের প্লেটে বিরিয়ানি তুলে দিতে দিতে মুচকি হেসে নিজের দোষটুকু সাদরে গ্রহণ করে বলল,

“দুঃখিত, একটুখানি মিথ্যে বললাম!”
শয্য দাঁতে দাঁত চাপল যুবক; লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে শুধু একটিমাত্র বাক্য আওড়াল,
“সেয় অননি!”
থমকালো জুঁইয়ের ব্যস্ত হাত দুটি! কথার অর্থটুকু ধরতে সক্ষম হয়নি কন্যা! এই দেশে এই অদ্ভুত ভাষাগুলো জানেনা সে তাই শয্য ঠিক কি বলল তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বহন করতে সক্ষম হয়নি!
মনে মনে ধরে নিল হয়ত শয্য তাকে কোনোরূপ গালি দিয়েছে!

KK Group of Industries এর কর্ণধার মিসেস কায়নাত কায়রা ছিলেন কোরিয়ার শিল্প বাণিজ্য অঙ্গনের এক প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী বিজনেস ওয়ম্যান। প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং অদম্য ব্যক্তিত্বের বলয়ে তিনি স্বীয় সাম্রাজ্যকে পৌঁছে দিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়।
তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাঁর জীবনে আবির্ভূত হয় এক বাংলাদেশি পুরুষ কায়দার খান। একসময় যে ব্যক্তি কায়নাত কায়রার প্রতিষ্ঠানে সামান্য কর্মচারী হিসেবে নিয়োজিত ছিল, সময়ের অদ্ভুত ঘূর্ণিপাকে সেই মানুষটির সাথেই আকস্মিকভাবে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি।
বাহ্যিকভাবে কায়দার খান স্ত্রীর প্রতি গভীর অনুরাগ ও মুগ্ধতার অভিনয় করে গেলেও অন্তরালে তার লালসার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কায়নাত কায়রার অঢেল বিত্ত বৈভব এবং ক্ষমতার উত্তরাধিকার। মূলত আত্মপ্রতিষ্ঠা ও প্রভাব বিস্তারের দুর্বার আকাঙ্ক্ষাই তাকে এই বিয়েরবন্ধনে আবদ্ধ হতে প্ররোচিত করেছিল।
বিয়ের দুই বছর পর জন্ম নেয় তাদের একমাত্র কন্যা সুরাইয়া খান। অপরূপ সৌন্দর্যে দীপ্ত সেই কিশোরী স্বভাবের দিক থেকে ছিল তীক্ষ্ণ, দুর্দমনীয় ও ভীষণ একরোখা। শৈশব থেকেই সীমাহীন আদর আহ্লাদ এবং বিলাসিতার আবরণে বেড়ে ওঠায় তার চরিত্রে ক্রমশ জন্ম নিতে থাকে বেপরোয়া ঔদ্ধত্য ও নিয়ন্ত্রণহীন উগ্রতা।

যে বস্তু কিংবা বিষয় তার মনঃপূত হতো, তা অর্জনের জন্য সে হয়ে উঠত অবিচল ও প্রায় উন্মত্ত।
সুরাইয়ার বয়স যখন মাত্র পনেরো, ঠিক তখনই কায়নাত কায়রা এক ভয়াবহ স্ট্রোকের শিকার হন। সেই আকস্মিক দুর্যোগ তাঁর সুদৃঢ় জীবনকে মুহূর্তেই বিপর্যস্ত করে তোলে। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে তিনি হাসপাতালের শীতল শয্যায় প্যারালাইসিসে নিস্তেজ দেহ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মাতৃহীন স্নেহ, অবাধ স্বাধীনতা এবং অগণিত সম্পদের প্রাচুর্য সুরাইয়াকে আরো অধিক বেপরোয়া করে তোলে। নিয়ম, শৃঙ্খলা কিংবা সামাজিক বিধিনিষেধ কোনো কিছুর প্রতিই তার ন্যূনতম ভ্রূক্ষেপ ছিল না। উন্মত্ত পার্টি, গভীর রাত্রির উচ্ছৃঙ্খলতা এবং অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে সে নিজেকে নিমজ্জিত করতে থাকে এক অনিয়ন্ত্রিত অন্ধকার জগতে।
তিন বছরের এক্সক্লুসিভ চুক্তিতে কেপপ গ্রুপ অফ ইন্ড্রাস্ট্রির এর সঙ্গে আবদ্ধ হয় কেপপ টিম আলফা এর জনপ্রিয় আইডল Juned Shajya Badshah
মূলত ব্র্যান্ড প্রমোশন, আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইন এবং গ্লোবাল ইভেন্ট পরিচালনার উদ্দেশ্যেই এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল।

আর সেই এক্সক্লুসিভ চুক্তির সূত্র ধরেই পরিচয় ঘটে সুরাইয়া খানের সাথে।
প্রথম পরিচয়টা ছিল নিছক আনুষ্ঠানিক, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা এক অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতায় রূপ নিতে শুরু করে।
তবে শয্য ছিল ভীষণ নির্লিপ্ত প্রকৃতির মানুষ।
সে কখনোই আগ বাড়িয়ে কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করত না। চারপাশে অসংখ্য মানুষ থাকলেও নিজের ব্যক্তিগত গণ্ডির বাইরে কাউকে প্রবেশ করতে দিতে তার প্রবল অনীহা ছিল। কিন্তু সুরাইয়া ঠিক তার বিপরীত।
শয্যকে প্রথম দেখার পর থেকেই তার প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে সে। শয্যের সুদর্শন ব্যক্তিত্ব, শীতল নীরবতা এবং রহস্যময় আচরণ ধীরে ধীরে সুরাইয়ার মনে এক তীব্র আসক্তির জন্ম দেয়। সে অনুভব করতে শুরু করে এমন পুরুষকে সে শুধু পছন্দই নয়, সম্পূর্ণ নিজের করে চাই।
আর সেই কারণেই মাঝেমধ্যে শয্যের সাথে দেখা করার অজুহাতে সে চলে আসে তার ব্যক্তিগত জগৎ ফেইরি ল্যান্ডে”।
যেখানে কোলাহলময় পৃথিবী থেকে দূরে, নিজের নিঃসঙ্গতা নিয়েই বসবাস করত শয্য। তবে প্রতিবারই সুরাইয়ার উচ্ছ্বসিত উপস্থিতির বিপরীতে শয্য আগের মতোই শান্ত, সংযত এবং অনুভূতিহীন। যেন তার হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি বহু আগেই বরফের স্তরে চাপা পড়ে গেছে।

গাড়ির শব্দে খাওয়ায় ব্যস্ত থাকা শয্য সহ বাকিদের হাত থামল! তারা বাদশাহ বিরক্তিকর কন্ঠে বলে ওঠেন,
“এখন আবার কে এলো?”
তৎক্ষণাৎ শয্য খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, যেতে যেতে বলল।
“আমার গেস্ট!”
শয্যের কথায় ভ্রুদ্বয় কুঞ্চিত হয় ঝুমঝুমের! শয্য হনহন পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল!‌ জুঁই আড়চোখে তাকায় আব্রাহামের দিকে। আব্রাহাম খাওয়া বজায় রেখে ধীরে বলে,
“মেবি ওর টিম আলফা!”
জুঁই কোনোরূপ প্রত্যুত্তর করল না!

“হ্যালো শয্য! হাউ আর ইয়্যু?”
শয্য নিঃশ্বাস ছেড়ে হ্যান্ডশেক করল সুরাইয়ার সহিতে,
“ফাইন! তুমি কেমন আছো?”
সুরাইয়ার ভীষণ ভালো লাগলো পাল্টা প্রত্যুত্তরে! লিপগ্লস লাগানো ওষ্ঠদ্বয় প্রসারিত হলো কন্যার! আমোদিত চিত্তে বলল,
“আই অ্যাম ফাইন!”
শয্য আগের ন্যায় গম্ভীরভাবে বলে,
“ফেইরি ল্যান্ডে যাওয়া যাক?”
সুরাইয়া তৎক্ষণাৎ জবাবে বলে,
“ইয়া,শিও্যর!”

সুরাইয়ার এবং শয্য ভেতরে চলে গেল!
খাওয়ার পর্ব অসমাপ্ত রেখেই চেয়ার ত্যাগ করল ঝুমঝুম।
অন্যমনস্ক দৃষ্টি আচমকাই গিয়ে স্থির হলো টেবিলের প্রান্তদেশে উপেক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা একটি মোবাইল ডিভাইসের উপর।পরক্ষণেই যেন তীক্ষ্ণ সজাগতায় স্নায়ুব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে উঠল কন্যাটির। এ তো শয্যের ফোন!
সম্ভবত অসতর্কতাবশত এখানে ফেলেই প্রস্থান করেছে সে।
ক্ষীণ কৌতূহল ও দুর্বোধ্য উচ্ছ্বাসে অধরপ্রান্ত সামান্য বক্র হয়ে উঠল ঝুমঝুমের। মুহূর্ত বিলম্ব না করে ফোনটি করায়ত্ত করল সে। অন্তর্লীনে তখন অন্য হিসাব এই ফোন ফিরিয়ে দেওয়ার বাহনায় অন্তত পুনরায় দেখে আসা যাবে, ফেইরি ল্যান্ডে আজ আবার কোন রহস্যময় অতিথির আবির্ভাব ঘটেছে।
চারপাশে সকলকে স্বীয় ব্যস্ততায় নিমগ্ন দেখে নিঃশব্দে সদর দরজা অতিক্রম করল সে। তারপর ধীর, মৃদু , সতর্ক পদক্ষেপে অগ্রসর হতে লাগল ফেইরি ল্যান্ডের অভিমুখে।
আজ অদ্ভুতভাবে সেই অসহনীয় কুকুর, থমাসের উপস্থিতি দৃশ্যমান নয়। স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস নিঃসৃত হলো তার বক্ষগহ্বর থেকে। অর্থাৎ প্রাণীটি ভেতরেই অবস্থান করছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই কর্ণকুহরে আঘাত হানল এক নারীকণ্ঠ,

“ড্যাড তোমাকে দেখা করতে বলেছিল, শয্য তুমি গতকাল এলে না কেন?”
কণ্ঠস্বর শ্রবণমাত্রই পদচারণা স্তব্ধ হয়ে গেল ঝুমঝুমের।
শয্য তখন থমাসের মস্তকে ধীর ছন্দে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
চিরাচরিত নির্বিকার স্বরে উচ্চারণ করল,
“Sorry, but I was occupied.”
সুরাইয়ার ভ্রুদ্বয় কিঞ্চিৎ সঙ্কুচিত হয়ে এলো। মনের গভীরে সূক্ষ্ম সংশয়ের কাঁটা ক্রমাগত বিঁধতে শুরু করেছে তার।
যতদূর সে জানে, শয্য কখনোই এতটা খামখেয়ালি নয়
তবে আকস্মিক এই পরিবর্তনের নেপথ্যে কোন অদৃশ্য কারণ ক্রিয়াশীল? অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
শয্যের মনোজগৎ এই মুহূর্তেও আবদ্ধ হয়ে আছে অন্য এক অস্তিত্বে, ঝুমঝুমে।
খাবার টেবিলে বসে থাকা মেয়েটার সেই গাঢ়, গম্ভীর অথচ অব্যক্ত মাদকতায় পূর্ণ দৃষ্টি বারবার আচ্ছন্ন করে তুলছে তাকে। অভিমানী ভঙ্গিতে স্ফীত হয়ে ওঠা গালদ্বয়। নিঃশব্দে তার পাশে বসে খাবার খাওয়ার সরল দৃশ্যটুকুও কেন যেন অস্বাভাবিক রকম প্রশান্তিদায়ক মনে হচ্ছিল।

আর সেই বিরিয়ানির তেলে হালকা তৈলাক্ত হয়ে ওঠা অধরযুগল , মা’দকদ্রব্য!
মাত্র এক ক্ষণিক দুর্বলতায় শয্যের অন্তর্গত আদিম পুরুষসত্তা প্রবলভাবে আলোড়িত হয়ে উঠেছিল।
ইচ্ছে করছিল সেই কোমল, তেলচকচকে ওষ্ঠাধরকে নির্মম আকর্ষণে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলতে। তবে বহু কষ্টে স্বীয় প্রবৃত্তিকে সংযত করেছিল সে। কারণ কিছু আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্তই সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক, সবচেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে থাকে।
“ওকে ফাইন, কিন্তু আজকে তো যাবে নিশ্চয়ই?”
শয্য হালকা মাথা দোলায়! তৎক্ষণাৎ মিস ইয়েরিন কফি নিয়ে হাজির হলেন! সুরাইয়া সাদরে গ্রহণ করল কফির কাপ!

দরজার প্রান্তে নিঃশব্দ ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে রইল ঝুমঝুম।
অর্ধআড়াল থেকে সে অবলোকন করল সেই রমণীকে অদ্ভুত রূপলাবণ্য ও আভিজাত্যে পূর্ণ এক নারীমূর্তি, যাকে ঘিরে যেন আলো ছায়ার অদৃশ্য বলয় ঘনীভূত হয়ে আছে।
শয্যের সাথে তার অনর্গল হাসি আলাপে মুহূর্তেই ঝুমঝুমের অন্তর্লোকে নেমে এলো এক অচেনা শূন্যতা।
অন্তঃকরণে ছড়িয়ে পড়ল বেদনাবোধের এক গভীর নীলাভ যন্ত্রনা । যেন হৃদয়ের গহীনে কেউ নিঃশব্দে বরফ স্থাপন করছে।
এ কী অদ্ভুত দহন! হৃদপিণ্ড এতটা অস্থির কেন?
কেন সেই রমণীর রূপসজ্জা, কোনো কিছুই তার চেতনায় সামান্যতম অনুরণন সৃষ্টি করতে পারল না?
শ্বাসরুদ্ধ সেই অনুভূতির ভার থেকে পালিয়ে যেতে চাইল ঝুমঝুম। ঠিক তখনই, পিছনের দিক থেকে ভেসে এলো এক পুরুষালী, কর্কশ অথচ গভীর স্বর,
“মাশা?”

পদযুগল মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল। ধীরে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সে। শয্যকে সম্মুখে দণ্ডায়মান দেখে কিঞ্চিৎ বিস্ময় ও অস্থিরতা গ্রাস করল তাকে। পেছনে অবস্থানরত সুরাইয়া খানও তড়িঘড়ি করে নিজ অবস্থান পরিবর্তন করল।
শয্য ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হতে শুরু করতেই ঝুমঝুম অচেতন প্রতিক্রিয়ায় দুই কদম পিছিয়ে গেল।
দুজনের দৃষ্টি সংঘর্ষে মুহূর্তটি ভারী হয়ে উঠল যেন সময় স্থির।
শয্যের হ্যাজেল বর্ণের দৃষ্টির গভীরতায় ঝুমঝুমের চেতনা ক্রমশ বিঘ্নিত হতে লাগল। আড়ষ্ট সেই ভঙ্গি লক্ষ্য করে শয্যের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ অঙ্কিত হলো। নিঃশ্বাস গ্রহণের মুহূর্তে ঝুমঝুমের শরীরঘেঁষে ভেসে উঠল শিশুসুলভ বেবি পাউডারের মৃদু সুবাস
অদ্ভুতভাবে তা তার সংযমকে এক পলকের জন্য টলিয়ে দিল। অধরপ্রান্তে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ক্ষীণ এক বক্ররেখা ফুটে উঠল।
“কি চাই?”
ঝুমঝুম দৃষ্টি নত করে ক্ষীণ, প্রায় শ্রুতিহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“আপনার ফোনটা!”

এক মুহূর্তে বিস্মিত হলো শয্য।গম্ভীর স্বরে সন্দেহের ছায়া মিশিয়ে বলল,
“আমার ফোনে তোর কী প্রয়োজন?”
ঝুমঝুম মুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল।
তারপর দ্রুত সংবিৎ ফিরে পেয়ে প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটি বের করে তার দিকে এগিয়ে দিল।
“আপনি খাওয়ার টেবিলে ভুলে রেখে গিয়েছিলেন।”
শয্য ধীর ভঙ্গিতে ফোনটি নিয়ে নিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে তার আঙুল স্পর্শ করল ঝুমঝুমের আঙুলের সাথে ক্ষণিক, তবু বিদ্যুৎসম সংবেদনশীল এক স্পর্শ। ঝুমঝুমের সমগ্র সত্তা যেন শিহরিত হয়ে উঠল। তাৎক্ষণিকভাবে সে দ্বিতীয়বারের মতো দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সুরাইয়ার দিকে অনুসন্ধিৎসু, অস্থির, সংশয়ী। শয্যও তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল সেদিকে।

ঝুমঝুমের অন্তরে তীব্র অপছন্দের এক অনুভূতি দানা বাঁধল সেই নারীর প্রতি। আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে সে স্থান ত্যাগ করল দ্রুত, প্রায় প্রলয়গতিতে।
শয্য নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল, তার পেছনে উড়তে থাকা এলোমেলো চুলের ছায়ার দিকে।
পেছন থেকে সুরাইয়া খান প্রশ্ন করল,

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৫

“হু ইজ সি,শয্য?”
শয্যের দৃষ্টি তখনো সেই শূন্য প্রান্তে স্থির। অর্ধমোহাচ্ছন্ন কণ্ঠে সে উচ্চারণ করল,
“নো ওয়ান।”

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৭