মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৭
ফারহানা নিঝুম
“তুমি কখনোই আমার ছেলেকে সময় দাও না, রাজিব! আজ আমার ছেলের জন্মদিন। আজ অন্তত তার পাশে থেকো!”
কণ্ঠস্বরের প্রতিটি কম্পনে জমাটবাঁধা ক্ষোভ, অভিমান আর দীর্ঘদিনের উপেক্ষার যন্ত্রণা মিশে ছিল। ফোনের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা জেসমিন বাদশাহ যেন শেষবারের মতো স্বামীর বিবেককে আহ্বান জানাচ্ছিলেন।
অথচ এপাশে বসে থাকা রাজিব বাদশাহর ভ্রূক্ষেপ পর্যন্ত হলো না।
সুশোভিত ডাইনিং টেবিলে নির্বিকার ভঙ্গিতে রাতের আহার সারছিলেন তিনি। তাঁর সম্মুখে বসে সুনন্দা, আপন হাতে স্বামীর প্লেটে মাংসের বৃহৎ লেগপিস তুলে দিচ্ছেন। স্পিকারে ভেসে আসা জেসমিনের কণ্ঠস্বরও তাঁর কর্ণগোচর হচ্ছিল, তবুও মুখাবয়বে অনুতাপের লেশমাত্র নেই।
রাজিব বাদশাহ বিরক্ত স্বরে বলে উঠলেন,
“আহ্ জেসমিন! এত চিৎকার করছো কেন? আমি কি এখানে ঘুরতে এসেছি? ব্যবসার কাজেই তো এসেছি।”
বাক্যগুলো যেন ধারালো অস্ত্রে’র ন্যায় বিদীর্ণ করে দিল জেসমিন বাদশাহর অন্তঃস্থল।
কত বছর ধরে তিনি একাই সংসার, পড়াশোনা, সন্তান সবকিছু সামলে এসেছেন! অথচ এই মানুষটি মাসের পর মাস ব্যবসার কাজ নামক অজুহাতে অদৃশ্য হয়ে থাকেন।
আজ শয্যের পনেরোতম জন্মদিন।
তার একমাত্র ছেলেটা হয়তো মুখ ফুটে কিছু বলে না, কিন্তু প্রতিটি জন্মদিনে বাবার জন্য অপেক্ষা করে সেটা কি তিনি বুঝতে পারেন না? কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো জেসমিনের।
“সবসময় একই অজুহাত চলে না, রাজিব। গত বছরও আমার ছেলে মন খারাপ করে কেক কেটেছিল। হয়তো এখন আর কিছু বলে না, কিন্তু সে কোথাও না কোথাও তার বাবাকে খোঁজে।”
কথাগুলো শুনে রাজিব বাদশাহ ক্ষণিকের জন্য আহার থামালেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন সুনন্দার দিকে।
সুনন্দা নীরবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। অতঃপর সূক্ষ্ম দৃষ্টির ইঙ্গিতে যেন কিছু বুঝিয়ে দিলেন তাঁকে।
পরমুহূর্তেই রাজিব বাদশাহর কণ্ঠে বিরক্তির মাত্রা বৃদ্ধি পেল।
“শয্য এখন আর ছোট নেই, জেসমিন। ওর পনেরো বছর বয়স হয়েছে। আর প্লিজ, আমাকে কাজের মধ্যে বারবার বিরক্ত করো না।”
বাক্যশেষে কোনো উত্তর শোনার অপেক্ষা না করেই তিনি কল বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। নিঃশব্দে কিছুক্ষণ খাবার খেতে খেতে সুনন্দা বললেন,
“আর এক সপ্তাহ পর কিন্তু আব্রাহামের জন্মদিন, রাজিব। ও সতেরোতে পা দেবে।”
রাজিবের কঠোর মুখাবয়ব মুহূর্তেই কোমল হয়ে এলো।
“জানি। আমার মনে আছে। তাই তো এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছি। তা আব্রাহাম কোথায়?”
সুনন্দা মৃদু হেসে বললেন,
“বন্ধুদের সঙ্গে কক্সবাজারে গেছে। তবে তুমি ফোন করে কথা বলে নিও।”
“অবশ্যই।”
সুনন্দার মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে উঠল।
আর বহু দূরে কোথাও, আরেকটি পরিবার ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল যার খবর তাদের কেউই রাখল না।
ফোন কেটে যাওয়ার পর নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ।
ধপ করে বিছানায় বসে পড়লেন জেসমিন বাদশাহ।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুকণাগুলো আর লুকিয়ে রাখা গেল না।
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা পনেরো বছরের কিশোরটি সব শুনেছে। সব। একটাও শব্দ তার শ্রবণ এড়ায়নি।
শয্যের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা জন্ম নিল।
বাবা না আসায় তার কষ্ট হচ্ছে না। কষ্ট হচ্ছে মায়ের চোখের জল দেখে। অসহায় সেই মুখখানি দেখে। মুঠোবদ্ধ হয়ে উঠল কিশোরের হাতদুটি। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
পরমুহূর্তেই হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল সে।
ড্রয়িংরুমে তখন অতিথিদের কোলাহল। বর্ণিল আলোয় সজ্জিত পরিবেশ। টেবিলের মাঝখানে রাখা বিশালাকার জন্মদিনের কেক। এক নিমিষে ছুটে গিয়ে দু’হাতে কেকটি ঠেলে মেঝেতে ফেলে দিল শয্য। ঝপাং শব্দে কেকটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।অতিথিরা স্তম্ভিত।
হেনা বাদশাহ আতঙ্কিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
“দাদুভাই! আমার দাদুভাই, কী হয়েছে তোমার?”
শয্যের রক্তাভ চোখদুটি জ্বলে উঠল।
“কোনো জন্মদিন পালন হবে না! আমার,, আমার অসহ্য লাগছে এসব!”
তারা বাদশাহ, আজিজ বাদশাহ সকলেই হতবাক।
“কি হয়েছে বাবা? এমন আচরণ করছো কেন?”
ভীতসন্ত্রস্ত রিমঝিম ভাইয়ের পিছনে লুকোতে চাইলো।কিন্তু শয্য কারও প্রশ্নের উত্তর দিল না।ঠিক তখনই ছুটে এলেন জেসমিন বাদশাহ।মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কেক আর অতিথিদের বিস্মিত মুখ দেখে অপমানে স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। কঠোর কণ্ঠে বললেন,
“শয্য! এসব কী অসভ্যতা?”
শয্যের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ যেন বিস্ফোরিত হলো। হিসহিসে স্বরে বলল,
“আই হেইট মাই বার্থডে, মাম্মা! কোনো জন্মদিন হবে না। না মানে না!”
দ্বিতীয়বার টেবিলে সজোরে লাথি মারতেই জেসমিন তেড়ে এলেন।
“শয্য!”
“মাম্মা!”
চিৎকার করে উঠে বসল শয্য।সমগ্র দেহ ঘামে সিক্ত।
বুক ওঠানামা করছে দ্রুত ছন্দে।দুঃস্বপ্ন।আবারও সেই অভিশপ্ত স্মৃতি।পনেরো বছরের সেই রাত।মায়ের কান্না।বাবার উপেক্ষা।নিজের অসহায়ত্ব।সবকিছু যেন পুনরায় জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে অন্ধকারে তাকিয়ে রইল সে।অতঃপর বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।কাঁপা হাতে সিগারেট প্রজ্বলিত করল।গভীর এক টান নিতেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।কিন্তু স্মৃতিগুলো মিলিয়ে গেল না।বরং আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।সেই একাকী হোস্টেল।সেই অপেক্ষা।সেই অপমান।সেই অবহেলা।
অবশেষে সিগারেট নিভিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল শয্য।
বরফশীতল ঝরনার নিচে নিজেকে দাঁড় করিয়ে দিল।
পানির ধারা বেয়ে নেমে যেতে লাগল অতীতের সমস্ত দহন।
কিন্তু হৃদয়ের ক্ষত কি এত সহজে মুছে যায়?
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। শিরাগুলো স্ফীত হয়ে উঠল।
দাঁতে দাঁত পিষে, ঘৃণা আর যন্ত্রণায় কম্পিত কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“আই হেইট ইউ, রাজিব বাদশাহ, আই হেইট ইউ!”
ঝরনার শব্দের আড়ালে হারিয়ে গেল বাকিটুকু।
তবুও সেই উচ্চারণে জমে ছিল এক অবহেলিত সন্তানের সমগ্র শৈশবের আর্তনাদ।
রজনীর প্রথম প্রহর! ক্লান্তি “মাশা অ্যান্ড দ্য বেয়ার ” ক্যাফে বন্ধ করে একত্রে বাইকে ওঠে বসল মেহরিমা আর রাকিব! ক্লান্ত মেহরিমা কাঁধে মাথা রেখে আছে রাকিবের! গাড়ি চলছে আপন গতিতে! হাপুস নয়নে চারিদিকে তাকাচ্ছে মেহরিমা! কে বলবে একটি বছর পূর্বেও তাদের জীবন ছিলো বিলাসবহুল? এতকাজ কি তাদের করতে হতো? চাইবা মাত্র সবকিছু হাতের কাছে পেয়ে যেতো অথচ আজ? আজ মেহরিমা বাদশাহ এবং রাকিব বাদশাহ কি-না ক্যাফে চালাচ্ছে! নিজেদের জন্য!
কথাগুলো মস্তিষ্ক জুড়ে ঘূর্ণাবর্ত চলমান! চক্ষুদ্বয় ঝাপসা হয়ে এলো কন্যার! হৃদয় কাঁদে তার মামুনির জন্য! মানুষটি তাদের উপর রেগে আছে শুধুমাত্র এই কারণে তারা পরিবারের কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছিল।আর রাজিব বাদশাহ? বাবা হওয়া সত্বেও এভাবে নিজের মেয়েকে ত্যাজ্য করে দিতে পারল?
আর তারা বাদশাহ? রাকিব তো ওনার ছেলে,একটা মাত্র ছেলে সেই ছেলেকে কি-না এভাবে না দেখে দিনের পর দিন পার করে যাচ্ছে?
“রাকিব?”
বাইক চালানো অবস্থায় রাকিব নাকে মুখে আওয়াজ তুলে বলল,
“হুঁ?”,
মেহরিমা অকস্মাৎ শুধোয়,
“আমার জন্য তোমাকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে তাইনা?”
আচম্বিতে শ্রবণেন্দ্রিয়তে এমন প্রশ্ন তীব্র ঝংকার তুলল।
“হঠাৎ এমন প্রশ্ন”
মেহরিমা নাক টেনে বলল,
“হঠাৎই মনে হলো আমার জন্য তোমাকে ভীষণ ভোগতে হচ্ছে!”
সহসা বাইকের গতি থামিয়ে দিলো রাকিব!বাইক ছেড়ে তৎক্ষণাৎ নেমে দাঁড়ালো মেহরিমা! রাকিব চট করে ওই অশ্রু ভেজা চোখ দুটোতে চুমু এঁকে বলল,
“একদম নয়।
“আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না! আমি তো খুশি মেহু। আমাদের একটা ছোট্ট সংসার হয়েছে। তুমি আমি আছি।আর কতদিন পর আমাদের ছোট্ট পরী আসবে। এখানে কষ্টের কি আছে?”
মেহরিমা হুহু শব্দে কেঁদে উঠল। কান্নার কারণটুকু বুঝতে বাকি নেই এই প্রণয় পুরুষের! পরিবার! বাদশাহ পরিবারের আদরের কন্যা এতটা কষ্ট সহ্য করতে পারছেনা!
আচ্ছা যদি শয্য না থাকতো তবে? তবে কি হতো? নিশ্চয়ই তারা আজ পথে পথে ঘুরে বেড়াতো?
রাকিবও আজও বুঝতে পারল না এই ভাই নামক মানুষটি কেন তাদের সাহায্য করেছে? সে তো বলেছে বাদশাহ পরিবারের কেউ তার আপন নয় শুধুমাত্র জেসমিন বাদশাহ ব্যতিত!
“তারপর?”
“তারপর আর কী! আমি যখন শয্য ভাইয়ের নিকট গিয়ে একখানা অটোগ্রাফ প্রার্থনা করলাম, তিনি নিম্নস্বরে এমন তীক্ষ্ণ স্বরে ধমক দিলেন যেন আমার উপস্থিতিটাই অপরাধ! অথচ আমিও নির্বিকার ভঙ্গিতে বললাম, ‘আপনাকে একনজর দেখতেই এসেছি।’”
বাক্যগুলো উচ্চারণ করেই রুপোলি ঝংকারের ন্যায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠল ঝুমঝুম। নিশীথের গভীর প্রহরে ক্ষুদ্র এক আড্ডায় সমবেত হয়েছে জুঁই, রিমঝিম এবং ঝুমঝুম। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শয্যের অটোগ্রাফ ডে-র সেই বহুচর্চিত ঘটনা। ঝুমঝুমের বর্ণনায় জুঁইও হাসিতে ফেটে পড়ল। তবে রিমঝিম বিরক্তি আড়াল করতে না পেরে কপট রাগে বলে উঠল,
“ধুর! এই পাগল মেয়ের কথা বিশ্বাস করবেন না ভাবী! সর্বক্ষণ শয্য ভাইয়ার পিছনে ঘুরঘুর করাটাই যেন ওর একমাত্র কাজ! অথচ আমি মানুষটাকে দেখলেই ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে যাই!”
বাস্তবে ঝুমঝুম নিজেও শয্যকে ভয় পায়। কোরিয়ায় আগমনের পরপরই শয্যের করতলের দুর্বোধ্য অথচ প্রখর এক চপেটাঘাত সহ্য করতে হয়েছিল তাকে। আজ থেকে প্রায় তিন বছর পূর্বে শুধুমাত্র প্রথমবার ‘ভাই’ সম্বোধন করার দুঃসাহসে। সেদিন অপমানে ও যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ে অঝোরে কেঁদেছিল মেয়েটি, অথচ বিস্ময়করভাবে তবুও তার পিছু ছাড়েনি।
কখন, কোন দুর্ভাগ্যঘন মুহূর্তে পুনরায় শয্যের আরেকটি থাপ্পড় কবে পড়ে কে জানে?
মধ্যরাত তখন! সকলে আড্ডা ছেড়ে যে যার রুমে চলে গেল! ঝুমঝুম নিচের দিকে অগ্রসর হয়, উদ্দেশ্য ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম নিয়ে তবেই যাবে। কিন্তু ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই দেখলো জেসমিন বাদশাহ খাবারের বাটি গুছিয়ে বেরুতে যাচ্ছেন!
“ফু আম্মু?”
ঝুমঝুমের ডাকে থমকে দাঁড়ালেন জেসমিন বাদশাহ। ঝুমঝুম ত্বরিতে তার সন্নিকটে এসে দাঁড়ালো! হাতে থাকা বাকিগুলোর দিকে একপল দেখে শুধোয়,
“তুমি শয্য ভাইয়ের কাছে যাচ্ছ?”
জেসমিন বাদশাহ চওড়া হেসে বললেন,
“হ্যাঁ। কিন্তু এত রাত অবধি জেগে আছিস কেন?”
ঝুমঝুম চনমনে হয়ে বলল,
“ঘুম আসছিল না। কিন্তু এখন আমিও যাবো তোমার সাথে!”
জেসমিন বাদশাহ মানা করলেন না। ঝুমঝুমকে সঙ্গে নিয়েই বেরুলেন! ছেলেটার কাছে রাতে থাকবেন উনি। ছেলেটা যে ভেতরে বড্ড একা!
“আপনার কফি।”
কফিভর্তি ধূসর মগটি সম্মুখে বাড়িয়ে দিতেই আব্রাহামের ক্ষিপ্র ও ব্যস্ত অঙ্গুলি স্থবির হয়ে এলো। এই ক্ষণটিতে উষ্ণ কফির প্রয়োজনীয়তা প্রবল ছিল তার, তবে জুঁই নিজ হাতে তা এনে দেবে এমন সম্ভাবনা সে কল্পনাও করেনি।
আব্রাহাম অধরের কোণে রহস্যময় এক মৃদু হাস্যরেখা ফুটিয়ে মগটি গ্রহণ করল। ধীর ভঙ্গিতে এক চুমুক বসাতেই কপালের ভাঁজ গাঢ় হয়ে উঠল। দৃষ্টি হয়ে এলো গভীর ও ভাবুক।
তার এই গম্ভীর অভিব্যক্তি দেখে জুঁই ভ্রুযুগল সামান্য কুঞ্চিত করে প্রশ্ন করল,
“কেমন হয়েছে কফি?”
আব্রাহাম পুনরায় থমকে গেল। অতঃপর সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“অসাধারণ।”
মুহূর্তেই আত্মতৃপ্তির এক কোমল ঢেউ বয়ে গেল জুঁইয়ের অন্তরে। সামান্য গর্ব মিশ্রিত ভঙ্গিতে সে বলল,
“কিন্তু কফিটা কে বানিয়েছে, সেটা তো জানতে হবে!”
জুঁইয়ের সেই অহমিকামিশ্রিত সরলতা দেখে আব্রাহাম ল্যাপটপের শাটার নামিয়ে রাখল। তারপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিম্নস্বরে বলল,
“আমার স্ত্রী।”
বাক্যদ্বয় যেন নিঃশব্দ বজ্রপাত হয়ে আঘা’ত হানল কন্যার অন্তর্লোকে। চঞ্চলতা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। অকারণ লজ্জায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে যেন রাত্রির আবরণে হারিয়ে যেতে চায় কোনো লাজুক নক্ষত্রের মতো।
আব্রাহাম ধীরে কাউচ ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াল। গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আর কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা বাংলাদেশে যাচ্ছি, জুঁই। ব্যবসায়িক কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে।”
বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হতেই জুঁইয়ের স্মৃতিপটে ভেসে উঠল তার পরিবার। আজগর চৌধুরী যে এই ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণেই তাকে এমন প্রভাবশালী পরিবারে বিয়ে দিয়েছিলেন সেই বাস্তবতা পুনরায় হৃদয় ভারাক্রান্ত করে তুলল তাকে।
আব্রাহাম ধীরে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল জুঁইয়ের ডান করতল। আকস্মিক স্পর্শে শিহরিত হয়ে উঠল কন্যা।
পরক্ষণেই আব্রাহাম তাকে আলতো টানে নিজের সন্নিকটে নিয়ে এলো এতটাই নিকটে, যেখানে তার উষ্ণ নিঃশ্বাস ও পুরুষালী সুগন্ধ স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
জুঁই শুষ্ক কণ্ঠে নিঃশব্দে ঢোক গিলল।আব্রাহাম অধর বাঁকিয়ে নিম্নস্বরে বলল,
“হানিমুনটা না হয় সেখানেই সেরে ফেলব?”
বাক্যটি কর্ণগোচর হতেই জুঁইয়ের কর্ণদ্বয় যেন উত্তাপে ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। লোকটা যে এতখানি স্পষ্টভাষী তা ভাবতেই পারেনি সে! বিব্রত ও লজ্জিত স্বরে নাক কুঞ্চিত করে বলে উঠল,
“ছিঃ! আপনি না ভীষণ অসভ্য!”
তার প্রতিক্রিয়ায় আব্রাহাম মৃদু হাসিতে ফেটে পড়ল। দু’হাতে জুঁইকে আরও নিবিড়ভাবে আবদ্ধ করল সে।
কটিদেশে পুরুষালী করতলের দৃঢ় স্পর্শ অনুভব করতেই লজ্জার রক্তিম আভায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠল কন্যার সমগ্র সত্তা।
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ১৬
আব্রাহাম তার কানের নিকট মুখ এনে ধীরস্বরে বলল, “তোমার কি সত্যিই মনে হয়, জুঁই আমি আজীবন উপোষ
কাটিয়ে দেব? তা তো সম্ভব নয়, সুইটহার্ট।”
“উপোষ” শব্দটির অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত প্রথমে অনুধাবন করতে পারেনি জুঁই। কয়েক সেকেন্ড পর অর্থ স্পষ্ট হতেই বিস্ময় ও লজ্জায় তার নয়ন বিস্ফারিত হয়ে
