Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ২১

রুহ এ ইশক পর্ব ২১

রুহ এ ইশক পর্ব ২১
আনান রোজ

আটত্রিশ প্লাস বয়স নিয়ে, একটা উনিশ বছরের মেয়ের জন্য প্রফেসর সাহেব এতটা উন্মাদ তা হয়তো লোকটা নিজেও জানত না।
ইনশিরা তার বাক্যগুলো শেষ করার কোনো সুযোগই পেল না। উযাইন ঝটকায় ইনশিরাকে নিজের একদম কাছাকাছি টেনে এনে ওর মায়াবী নরম ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁটে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরল!
এক পরম উন্মাদনা আর তীব্র তৃষ্ণায় সে ইনশিরাকে এক দম বন্ধ করা গভীর চু*ম্বন করতে শুরু করল!
ইনশিরা আজ আর আগের মতো সহজে গলে গেল না। তার বুকে ৩ বছরের দীর্ঘ অভিমান জমে ছিল, তাই সে উযাইনের চওড়া বুকে হাত দিয়ে নিজেকে ছিটকে বের করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল, আজকের এই অতর্কিত ভালোবাসায় সে বিন্দুমাত্র সাড়া দিল না। উযাইন ইনশিরার এই অবাধ্যতা দেখে আরও বেশি বেসামাল হয়ে উঠল।
উযাইন দীর্ঘক্ষণ ধরে ইনশিরার ঠোঁটে নিজের একচ্ছত্র পুরুষালী আধিপত্য বিস্তার করার পর একটু আলাদা হয়ে, দুজনেই তীব্র গতিতে ঘনঘন শ্বাস নিতে লাগল।
ইনশিরা হাঁপাতে হাঁটতে, রাগী গলায় বলল—

—”উযা… উযাইন…!”
উযাইন ইনশিরার মুখের একদম কাছাকাছি নিজের কাঁপতে থাকা ঠোঁট জোড়া রেখে, নেশাতুর কাপা গলায় বলল—
—”আমাকে মেরে ফেলো ইনশিরা… আমার কোনো আপত্তি নেই, কোনো অভিযোগ নেই! তোমায় ছাড়া এই তিন বছরে আমি নিজেকে কোনোদিন কল্পনা করেনি! এই তিনটা বছর অনেক কষ্ট সয়েছি…। ভাগ্য বরাবরই এক নিষ্ঠুর খেলা খেলেছে আমার সাথে। কিন্তু এখন আর এক সেকেন্ডও এই নিষ্ঠুরতা সইতে পারব না পাখি! এই দুরত্ব সইবার সামর্থ নেই, তার চেয়ে মেরে ফেল। শুধু…শুধু মরণের সময় একটুখানি জায়গা দিও তোমার বুকে, আর উমায়েরকে একটু দেখে রেখো!”
উযাইনের মুখ থেকে এই চরম বৈরাগ্য আর মৃত্যুর আকুতি শোনে ইনশিরা, রাগী চোখ নিয়ে বলল—
—”কী… কী ছাইপাশ বলছেন এসব উযাইন?! মুখ পুড়বে না আপনার ওমন কথা বলতে…?!”
উযাইন আর ইনশিরার বকুনি বা উত্তরের অপেক্ষা করল না। সে নিজের সমস্ত অধিকার আর তীব্র আসক্তি নিয়ে আবারও ইনশিরার ঠোঁট জোড়া নিজের পূর্ণ দখলে নিয়ে নিল। ইনশিরা নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। ৩ বছরের দীর্ঘ তৃষ্ণা আর ভালোবাসা এক সেকেন্ডে উপচে পড়ল। সে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে উযাইনের ওল্ফ কাট চুলের ভেতর আঙুল গলিয়ে ওকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে এক তীব্র, বুনো ও গভীর ভালোবাসায় সাড়া দিল!

উযাইন ইনশিরার এই পূর্ণ সাড়ায় এক্কেবারে বেসামাল হয়ে উঠল। সে ইনশিরাকে অনবরত গভীর চু*মু করতে করতেই এক ঝটকায় নিজের দুই বলিষ্ঠ বাহুর ওপর ওকে সোজা কোলে তুলে নিল ইনশিরা উযাইনের গলাটা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়েই রাখল। উযাইন ইনশিরাকে কোলে নিয়ে চু*মু দিতে দিতেই ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কাউচের দিকে গেল…
অন্ধকার ঘরের মাঝে তখন কেবল দুজনের অনিয়ন্ত্রিত ও তীব্র নিশ্বাসের ওঠানামার আওয়াজ এক অপার্থিব ও চিরন্তন পূর্ণতার গল্প বুনে যাচ্ছিল ! দুজনের হৃদস্পন্দন এক হয়ে কাঁপছিল। ওরা আরও কিছুক্ষণ একে অপরের ঠোঁটে নিজেদের তীব্র ভালোবাসা আর ৩ বছরের দীর্ঘ ব্যাকুলতা উগরে দিতে লাগল।
দীর্ঘক্ষণ পর চু*মুর তীব্র রেশটুকু ঠোঁটে মেখে উযাইন আলতো করে ইনশিরার ফর্সা কপাল থেকে ওর রেশমি চুলগুলো একহাতে সরিয়ে দিল। চাঁদের আলোয় উযাইনের চোখ দুটো তখন এক গভীর ভালোবাসার নেশায় পুরোপুরি বুঁদ হয়ে ডুবে আছে। সে ইনশিরার চোখের দিকে তাকিয়ে এক চরম নেশাতুর, পুরুষালী ও ভাঙা গলায় ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিল—

—”দাস হয়ে থাকব, ইনশিরা… আজীবন তোমার পায়ের কাছে দাস হয়েই বাঁচব!”
ইনশিরা উযাইনের এই প্রকাণ্ড আত্মসমর্পণের রূপ দেখে নিজের মনে মনে খুশিতে চিকচিক করে উঠে, কিন্তু এই মেয়ে তা মুখে প্রকাশ করে না। সে কিছু টা গম্ভীর ভাব নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
—”উমহুম… দাস হয়ে মালিকের এত কাছে আসা কিন্তু একদমই উচিত নয়, প্রফেসর সাহেব! দাসদের কি এতখানি স্পর্ধা মানায়?”
ইনশিরার এই খোঁচা আর বুনো ফুলের সুবাসে, উযাইনের ঠোঁটের কোণে এক মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। সে আর কোনো কথা না বলে এক ঝটকায় নিজের মুখটা নামিয়ে সোজা ইনশিরার ফর্সা গলার খাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিল সে ইনশিরার গলার নরম চামড়ার ওপর, কলারবোনের খাঁজে অনবরত বেশ কিছু গভীর ও ওম ছড়ানো চুমু বসাতে লাগল।
উযাইনের ঠোঁটের সেই তপ্ত ও অনিল শিহরণ লাগামাত্রই ইনশিরা পুরো শরীর তীব্রভাবে কেঁপে উঠছিল। উযাইন ইনশিরার গলায় নিজের মসৃণ ক্লিন সেভ করা গাল আর নাকটা খুব কড়াভাবে ঘষতে ঘষতে এক অদ্ভুত, বাচ্চার মতো অসহায় আকুতি নিয়ে আবার বলল—

—”তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি লিটল বার্ড…আমাকে মেরে ফেলার আগে, অন্তত একটাবার এই গন্ধে নিজেকে পুরোপুরি মাখাতে দাও! আমি বড় ক্লান্ত… একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই। প্লিজ পিচ্চি… আমাকে তোমার এই বুকে একটুখানি ঠাঁই দিও…!”
ইনশিরা আজ প্রতিটা মুহূর্তে উযাইনের এই রূপ দেখে দফায় দফায় চরমভাবে চমকে যাচ্ছিল। যে কঠোর, গম্ভীর ও কোল্ড-হার্টেড আর ইগোইস্টিক প্রফেসরকে সে বিগত ৩টি বছর চিনে এসেছে, সেই পুরুষটা যে বন্ধ ঘরের আড়ালে নিজের স্ত্রীর সামনে এসে এতটা ছেলেমানুষি করতে পারে, এতটা অবুঝ ও অসহায়ভাবে নিজেকে সঁপে দিতে পারে—তা ইনশিরার জানাই ছিল না!

সময় গড়িয়ে রাত তখন প্রায় ১১টা বাজল। পুরো লন্ডনের বুক জুড়ে এক অপার্থিব, গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। লিভিং রুমের মেইন লাইটগুলো সব নেভানো, শুধু জানলা গলে চাঁদের হলদেটে আলো এসে রাজকীয় সেই সোফাটার ওপর খেলা করছে।
লন্ডনের এই কনকনে ঠাণ্ডা রাতের মায়ায়, সেই সুদৃশ্য নরম সোফাটায় উযাইন আর ইনশিরা—দুজনে আষ্টেপৃষ্ঠে একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। তাদের মাঝখানে এখন আর কোনো সমাজ, কোনো বয়সের ব্যবধান বা কোনো দেয়াল অবশিষ্ট নেই; সব কিছু আজ একাকার হয়ে গেছে ।
প্রফেসর উযাইন আবরার নিজের মুখটা খুব গভীরভাবে গুঁজে রেখেছে ইনশিরার ফর্সা গলা আর ওর এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা সুগন্ধি কালো চুলের অরণ্যের মাঝে সে ইনশিরাকে নিজের দুই বলিষ্ঠ বাহুর মাঝে এতটা শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে, যেন এক সেকেন্ডের জন্যও সে এই মায়াবী বুনো ফুলকে নিজের অস্তিত্ব থেকে আলাদা করতে চায় না।
উযাইনের অনিয়ন্ত্রিত ও ধীরগতির তপ্ত নিশ্বাসগুলো অনবরত এসে আছড়ে পড়ছিল ইনশিরার গলার চামড়ায়। ইনশিরা উযাইনের ওল্ফ কাট চুলের ভেতর নিজের একহাত রেখে অন্যহাত দিয়ে ওর চওড়া পিঠটা পরম মায়ায় জড়িয়ে ধরে।

পরদিন সকাল ঠিক ৬ টা।
লন্ডনের ভোরের স্নিগ্ধ আলো কাঁপতে কাঁপতে এসে পড়েছে লিভিং রুমের সেই বিশাল নরম কাউচ ওপর। পুরো ঘরটা এক স্বর্গীয় শান্তিতে মগ্ন। সোফার ওপর উযাইন আর ইনশিরা—দুজনেই এক পরম মায়ায় একে অপরের সাথে গুটিশুটি মেরে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। ইনশিরা উযাইনের চওড়া বুকের ভেতর নিজের মুখটা খুব গভীরভাবে গুঁজে রেখেছে। আর প্রফেসরের সেই ট্যাটু করা ফরসা বলিষ্ঠ হাতটা ইনশিরার সুতির ড্রেসের হালকা ভাঁজের ভেতর দিয়ে গিয়ে ওর উন্মুক্ত কোমরটা আষ্টেপৃষ্ঠে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে ।
ভোর ঠিক ৭টা। ইনশিরা তখনও এক্কেবারে ঘুমে কাদা হয়ে উযাইনের চওড়া বুকের ভেতর গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে প্রফেসর উযাইন আবরার নিজের চোখ মেলে এক বুক গভীর তৃপ্তি নিয়ে ইনশিরার নিষ্পাপ ফেসটার দিকে তাকিয়ে রইল। সে নিজের মনে মনে এক বুক ভালো লাগা নিয়ে ভাবল—
—”তিনটা বছর… এই তিনটা বছর আমি প্রতিটা রাত ছটফট করে অপেক্ষা করেছি শুধু এই একটা মিষ্টি সকাল নিজের চোখে দেখার জন্য !”

উযাইন আলতো করে ইনশিরার কোমর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। সে ইনশিরার মুখের ওপর ছড়িয়ে থাকা রেশমি চুলগুলো আলতো করে ওর কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে ওর কপালে টুপ টুপ করে কয়েকটা গভীর চুমু খেল। ইনশিরা ঘুমের ঘোরেই একটু নড়েচড়ে উঠল কিন্তু চোখ মেলল না। উযাইন নিজের ঠোঁটের কোণে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিসাল—

—”লিটল বার্ড!…দাসের বুকে ওমন রাজকীয় ভঙ্গিতে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছেন যে, আজ এক্সাম আছে?”
এই তীব্র শীতে ইনশিরা যেন এক্কেবারে জবুথবু হয়ে শুয়ে রইল, ওর ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণই নেই। উযাইন এবার নিজের এক কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে আড়াআড়ি হয়ে শুয়ে নিজের এই পিচ্চি বউয়ের আদুরে ভাব গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। ইনশিরার এই মায়াবী রূপ দেখে প্রফেসরের আত্মনিয়ন্ত্রণ আবার পুরোপুরি কাঁপতে শুরু করল। সে আর লোভ সামলাতে না পেরে ইনশিরার একদম কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে গেল। সে একটু ঝুঁকে এসে ইনশিরার ফরসা, তীক্ষ্ণ জ-লাইনের নিচে আর গলার নরম চামড়ার ওপর অনবরত গভীর ও তপ্ত চু*মু বসাতে লাগল।
ঠোঁটের সেই তীব্র কারেন্টের মতো শিহরণ আর উযাইনের মসৃণ ক্লিন সেভ করা গালের ঘর্ষণ লাগামাত্রই ইনশিরা ঘুমের ঘোরেই হালকা একটা আদুরে আওয়াজ করে উঠল। উযাইন এতে আরও একটু বেশি বেসামাল ও নেশাতুর হয়ে পড়ল। সে ইনশিরার গলার খাঁজে নিজের মুখটা আরও গভীরভাবে ডুবিয়ে দিতেই ইনশিরার ঘুমের ঘোর এক সেকেন্ডে ছুটে গেল। সে চরম বিরক্ত হয়ে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে উযাইনের চওড়া বুকে গায়ের জোরে এক তীব্র ধাক্কা মেরে বসল!
তীব্র বিরক্তি নিয়ে, চোখ রাঙিয়ে চড়া গলায় বলল—

—”কী করছেন কী সকাল সকাল?! দাস হয়ে এতখানি স্পর্ধা?! সরুন আমার ওপর থেকে!”
ইনশিরার এই অতর্কিত ও জোরালো ধাক্কায় উযাইনের নেশা কর্পূরের মতো উড়ে গেল! সে টাল সামলাতে না পেরে সোফার এক কোণে আছাড় খেয়ে পড়ে যেতে নিচ্ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজের পুরো শরীর শক্ত করে সোফাটা দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরে কোনোমতে নিজেকে বাঁচাল!
সে সোফায় উঠে বসার আগেই ইনশিরা চাদরটা বুকে টেনে নিয়ে চোখ বড় বড় করে কটমট চাউনি ছুড়ে দিল—
—” কাল রাতে একটু ঘুমাতে দিয়েছি বলে আপনি এক্কেবারে আমার ঘাড়ে উঠে বসবেন?! লাগবে না আমার আপনাকে! দূরে যান!”
শেষের কথাটা শুনে উযাইনের তীব্র পজেসিভনেস এক সেকেন্ডে চাড়া দিয়ে উঠল। সে সোফার ওপর সোজা হয়ে জাঁকিয়ে বসল। তারপর ইনশিরার একদম চোখের মণির দিকে নিজের সেই মায়াবী আইস ব্লু চোখ দুটো নিবদ্ধ করে অত্যন্ত গম্ভীর, চড়া এবং ধারালো গলায় বলল—
—”কিন্তু আমার লাগবে! তোমাকে আমার হাজার বার, লক্ষ বার লাগবে! কথাটা ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে রাখো… এই জীবনে উযাইন আবরারের মতো দাসের খাঁচা থেকে তোমার কোনোদিন, কোনোভাবেই মুক্তি মিলবে না !”

ইনশিরা আক্ষরিক অর্থেই পুরো টাসকি খেল লোকটার এই গভীর ও তীব্র কথার ধরনটা তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর শিহরণের সৃষ্টি করল, সে হা করে তাকিয়ে রইল, কেমন জানি একটা উগ্রতা ছিল। উমায়ের তখন ওপুরের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে, ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মুখ ছোট করে বলল
“আম্মু পাপা তোমরা আমাকে একা রেখে, এখানে খেলা করছ? আই অ্যাম সো অ্যাংরি!”
উমায়েরের নিষ্পাপ ও কিউট কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই উযাইন আর ইনশিরা—দুজনেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ইনশিরা তাড়াহুড়ো করে উঠে বসে নিজের এলোমেলো জামাটা টেনেটুনে ঠিক করে এক গাল হেসে বলল—
—”আরেহ না সোনা… তোমার পাপা তো ল্যাপটপে…” ।
কিন্তু উমায়ের ওদের কোনো বাহানা শুনল না। সে এক লাফে সোফার ওপর উঠে এসে ধপাস করে ওদের একদম মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায় বসে পড়ল। সে ইনশিরার একটা হাত নিজের ছোট ছোট দুটো হাতের মুঠোয় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওপরের দিকে তাকিয়ে খুব কিউট গলায় আবদার জুড়ে
দিয়ে চোখ পিটপিট করে, বলল—

—”আচ্ছা আম্মু…আজকে বাইরে বড্ড বেশি ঠান্ডা আর স্নো-ফল হচ্ছে। আজকে প্লিজ আমি স্কুলে না যাই
উমাইরের সেই মিষ্টি আবদারে ইনশিরা মুচকি হেসে রাজি হতে চাইলেও উযাইন আবরার নিজের প্রফেশনাল মুড থেকে এক বিন্দুও নড়ল না । সে কড়া গলায়, না করে দিয়ে উমায়েরকে ব্রেকফাস্ট কমপ্লিট করে রেডি হওয়ার তাগাদা দিল।

সময় গড়িয়ে সকাল ৯টা বাজল।
উযাইনের গাড়িটা এখন ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে । ইনশিরা আজ অভিমান করে উযাইনের পাশের ফ্রন্ট সিট ছেড়ে দিয়ে সোজা গাড়ির ব্যাক-সিটে গিয়ে গুমট মুখে বসে রইল। সে মনে মনে চরম ক্ষোভ নিয়ে ভাবল
—”ঢং কত! এতগুলো দিন ধরে আমাকে অনবরত কুকুর-বেড়ালের মতো তাড়িয়ে দিল, ইগনোর করল, আর এখন এক রাতের আদর পেয়েই প্রেম উতলে উঠছে আমি কোনো কথাই বলব না ওনার সাথে!”
উমায়েরকে ওর স্কুলে ড্রপ করে দেওয়ার পর উযাইন ইউনিভার্সিটির পার্কিং লটে নিখুঁত ব্রেক কষে থামাল। ইনশিরা কোনো শব্দ না করে, অত্যন্ত গম্ভীর মুখে চুপচাপ গাড়ির দরজা খুলে নামতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ড্যাশবোর্ডের পাশ থেকে উযাইনের সেই গভীর, পুরুষালী ও মারাত্মক চতুর কণ্ঠস্বর পুরো গাড়ির ভেতর প্রতিধ্বনিত হয়, উযাইন আড়চোখে পেছনের লুকিং গ্লাসে ইনশিরার ফেসটার দিকে তাকিয়ে, খুব কড়া ও বোল্ড গলায় বলল—

—”লিসেন মিসেস আবরার! নিজের সারনেমটা মনে রাখবেন। দ্যাটস মাই রিমাইন্ডার!”
ইনশিরার পুরো শরীর এক সেকেন্ডে তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। সে বড় বড় চোখ করে উযাইনের দিকে কটমট চাউনি ছুড়ে দিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে—ঠিক তখনই ঘটল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ধামাকা! করিডোর দিয়ে দৌড়ে আসতে থাকা আবির হুট করেই উযাইনের গাড়ির দরজা টেনে এক ঝটকায় ইনশিরার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ফেলল!
আবির ইনশিরার হাত ধরে প্রায় টেনে হিঁচড়ে গাড়ি থেকে নামাতে নামাতে চড়া গলায় বলল—
—”এই ইনশি! এই মেয়ে! তুই এতক্ষণ ধরে পার্কিং লটে কী করছিস? তাড়াতাড়ি আয়, আজ না এক্সাম! তুই তো আমাকে একটা কল পর্যন্ত দিলি না!”

আবির ইনশিরার হাতটা ভালো করে নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে ওকে করিডোরের ভেতরের দিকে প্রায় দৌড়ানোর ভঙ্গিতে নিয়ে যেতে লাগল। ওদিকে গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসে নিজের চোয়াল শক্ত করে, চক খামচে ধরার মতো তীব্র কটমট চোখে আবিরের ওই হাতের স্পর্শের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে লাগল প্রফেসর উযাইন আবরার ! ইনশিরা করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় দ্রুত নিজের ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকিয়ে উযাইনের সেই জ্বলন্ত আইস ব্লু চোখের ভয়ংকর রূপটা এক পলক দেখে নিল।
সে উযাইনকে আরও একটু জ্বালানোর জন্য এবার ইচ্ছা করেই আবিরের হাতটা আরও একটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে খিলখিল করে হাসতে হাসতে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল !
কিছুক্ষণ পর পুরো ক্লাসরুম স্টুডেন্টদের কানাকানিতে মুখরিত হয়ে উঠল। ইনশিরা আর আবির—দুজনে একদম পাশাপাশি এক-ই ডেস্কে এসে বসল।

তখন ক্লাসরুমে প্রবেশ করল প্রফেসর!
সে পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে এক সেকেন্ডের জন্য ইনশিরা আর আবিরের এক বেঞ্চে ঘেঁষে বসাটার দিকে একটা তীব্র শীতল চাউনি ছুড়ে দিল। তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে, বোর্ডের মনিটরে গত চ্যাপ্টারের ওপর কয়েকটা জটিল কোয়েশ্চেন দিল ।
ইনশিরা বোর্ডের প্রশ্নগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের কপালে হাত দিয়ে হা করে রইল। বিগত দুদিন ধরে এক ফোঁটাও পড়ালেখা করা হয়নি। এই কঠিন প্রশ্ন দেখে ও যে আজ নির্ঘাত ফেইল করবে, তা নিশ্চিত। উযাইন ব্ল্যাকবোর্ড থেকে ঘুরে ডায়েরিটা হাতে নিয়ে ইনশিরার ওই জবুথবু আর ফ্যাকাশে ফেসটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক মুচকি হাসি দিল ইনশিরা উযাইনের এই দুষ্টুমি ভরা হাসি দেখে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এক তীব্র জ্বলন্ত চোখে ওর দিকে তাকাল।
উযাইন পুরো ক্লাসের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে ব্রিটিশ এক্সেন্টে বলল—

—”এটেনশন প্লিয এভরিওয়ান! এই এক্সামে যারা ফেল করবে, তাদের জন্য স্পেশাল পানিশমেন্টের ব্যবস্থা রাখা আছে, সো বি কেয়ারফুল!”
উযাইনের এই “স্পেশাল পানিশমেন্ট” শব্দের আসল ডাবল মিনিং থ্রেটটা যে কী, তা ইনশিরা বুঝে লজ্জায় আর রাগে লাল হয়ে মুখ নামিয়ে নিল। ঠিক তখনই ইনশিরার ঠিক পেছনের বেঞ্চে বসা দুটো ব্রিটিশ মেয়ে এনা আর আইভা, উযাইনের এই ড্যাশিং রূপ দেখে খাতা দিয়ে মুখ ঢেকে অনবরত ফিসফিস করে ক্রাশ খাওয়া শুরু করল।আইভা চোখ গোল গোল করে,বলে—

—”উফফ গড! এই প্রফেসর আবরার যে এতখানি হ্যান্ডসাম অ্যান্ড হট, তা আমি ভাবতেই পারি না! পারসোনালিটিটা জাস্ট…উফফ… কিলিং মি!”
—”হুম! এক্কেবারে এক ওয়াইল্ড এন্ড জেনটল টাইপ লুক! উনি আমার বোনের ক্রাশ! আমার আপু তো এখানে পিএইচডি করছে, উনি মাঝে মাঝেই পিএইচডি’র ক্লাস নিতে যান!” (এনা)
—”উনি কি মেরিড না? ওনার কি কোনো ফ্যামিলি নেই?” (আইভা)
—”ডিভোর্সি! ওনার নাকি ৭ বছরের একটা কিউট ছেলেও আছে, ফেমিলির সাথে থাকে না।(এনা)
—ওহ গড! তার মানে উনি সিঙ্গেল!! বাই দ্য ওয়ে ওনার এক্স-ওয়াইফটা বড্ড বেশি আনলাকি ছিল, এমন একজন হট পুরুষকে হাতছাড়া করল! (ইভা)
—”হুম আমার আপুর একটা চান্স আছে, কি বলিস!” (এনা)

পেছনের মেয়েগুলোর মুখে তার বরকে নিয়ে এই সস্তা আড্ডা শোনামাত্রই ইনশিরার ভেতরের বাঘিনী রূপটা এক সেকেন্ডে রি-রি করে জ্বলে উঠল! তার মাথা পুরো গরম হয়ে গেল। সে নিজের খাতা খামচে ধরে সামনের পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে থাকা উযাইনের দিকে এক তীব্র, আক্ষরিক অর্থেই খুন করে ফেলার মতো রাগী চাউনি ছুড়ে দিল!
উযাইন পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে হুট করে ইনশিরার ওই ভয়ংকর রুদ্রমূর্তি দেখে কিছুই বুঝতে পারল না যে মেয়েটার হঠাৎ কী হলো। ঠিক তখনই উযাইনের ফোনটা হালকা কেঁপে উঠল। সে ডায়েরির আড়ালে ফোনটা বের করে স্ক্রিন অন করতেই তার চোখের মণি চড়কগাছ হয়ে গেল! স্ক্রিনে ইনশিরার নম্বর থেকে টেক্সট মেসেজ ভেসে উঠেছে, যেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা—

—”মেরে ফেলব একদম…! বেশি হচ্ছে কিন্তু…!”
উযাইন ফোনের মেসেজটা পড়া মাত্রই নিজের চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে ইনশিরার দিকে তাকাল। সে মেয়েটার চোখমুখের ওই ভয়ংকর রাগ দেখে প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেলেও, তার ঠোঁটের কোণে এক চতুর হাসি ফুটে উঠল । সে বুঝতে পারছিল না মেয়েটা হঠাৎ কেন এত রেগে গেছে। সে ডায়েরির আড়ালে নিজের ফোনের কীবোর্ডে দ্রুত আঙুল চালিয়ে ইনশিরাকে মেসেজ টাইপ করে পাঠিয়ে দিল—
—”I am your slave, Inshira… my every breath belongs to you ! তুমি চাইলে আমাকে ডেফিনেটলি মেরে ফেলতে পারো আমার কোনো আপত্তি নেই!”
ইনশিরা ফোনটা হাতে নিয়ে উযাইনের এই মেসেজটা দেখে, মনে মনে বলল,—” উফ, এই লোকটা এত ভাব মারতে জানে কোত্থেকে?!
রাগী চোখে উযাইনের দিকে তাকিয়ে আবার টাইপ করল—

—”এখানে এত রূপ নিয়ে, সেজেগুজে আসার কী দরকার, শুনি? আপনি যে বুড়ো হয়ে গেছেন, তা কি আপনার মনে নেই?”
উযাইন ইনশিরার এই টেক্সটটা দেখে তীব্রভাবে চমকে উঠল! সে কিছুতেই মাথায় মেলাতে পারছিল না—এই মেয়েটা সকাল সকাল হঠাৎ তাকে বুড়ো বলে কেন খোঁচা মারছে!

রুহ এ ইশক পর্ব ২০

ইনশিরা আর কোনো মেসেজ না দিয়ে ফোনটা উল্টো করে ডেস্কে রেখে দিল। তখন পাশে বসা আবির ইনশিরার এই উশখুশানি দেখে একদম অবুঝের মতো নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে ইনশিরার ফর্সা গালটা আলতো করে ধরে ধীর গলায় নিচু একদম স্বরে বলল—
—”কী রে ইনশি? পড়ে আসিসনি তো? চিন্তা করিস না, আমি তো আছি, তোকে সব দেখিয়ে দেব!”

রুহ এ ইশক পর্ব ২২