Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৮

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৮

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৮
ফারহানা নিঝুম

সেদিন ছিলো শয্যের কাছে পৃথিবীর সবচাইতে জঘন্য দিন। যেদিন আব্রাহাম তার মাকে নিয়ে তাঁদের বাড়িতে এসেছিল।
রাজিব বাদশাহ কি চমৎকার ভঙিতে কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলেছিলেন,
“সুনন্দা আমার স্ত্রী এবং আব্রাহাম আমার বড় ছেলে!”
রাজিব বাদশাহর কথায় এক মূহুর্তের জন্য নিজেকে মূর্খ মনে হলো শয্যের।বড় ছেলে?তার মানে শয্য বাদশাহর বড়?

জেসমিন বাদশাহ যেন অবাক হলেন না। তিনি শুধু তাকিয়ে দেখলেন স্বামীর প্রতারণা! হেনা বাদশাহ মর’ণাপন্ন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মেজর হার্ট অ্যাটাক হলো উনার! অনেকগুলো দিন হসপিটালে ভর্তি ছিলেন। মেয়েসম জেসমিন বাদশাহর সহিত এত বড় অন্যায় হতে দেখে হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন তিনি।অথচ জেসমিন বাদশাহ ছিলেন নির্বাক। তিনি যে এর আগেই জেনেছিলেন রাজিব বাদশাহর সেই পরকীয়া সম্পর্কে। যেদিন ভুলবশত রাজিব বাদশাহ নিজের দ্বিতীয়, লুকায়িত ফোনটি টেবিলের উপর চলে গিয়েছিলেন
সুনন্দার কল আসায় কিঞ্চিৎ অবাক হয়েছিলেন তিনি। নারী কন্ঠ শোনে বিচলিত হয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন অথচ সুনন্দা দ্রুত ফোন রেখে দেয়। লুকায়িত এই ফোনটি ঘেটে দেখলেন জেসমিন বাদশাহ। গ্যালারিতে যেতেই এতদিন ধরে তার চোখের সম্মুখে টাঙানো পর্দা সরে এলো। নজরে এলো নিষ্পাপ আব্রাহামের স্নিগ্ধ বাচ্চা মুখশ্রী। দেখলেন রাজিব বাদশাহ সুনন্দার সহিত আলিঙ্গন করা চিত্র! তাতেই পায়ের নিচ হতে জমিন সরে গেল তার!
জেসমিন বাদশাহ সেদিন রাজিব বাদশাহকে শুধু একটাই প্রশ্ন করেছিলেন,
“কেন করলে এমন?”
রাজিব বাদশাহ কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক বাক্যে বললেন,
“আমি তোমাকে ভালোবাসি না!”

জেসমিন বাদশাহর আগ্রহ হয়নি বাকি কথাটুকু জানার। এতগুলো বছর সংসার করার পরেও, তাদের সন্তান থাকা সত্ত্বেও যে মানুষটি বলতে পারে তাকে ভালোবাসে না তার থেকে আর কিইবা জানার ইচ্ছে হয়?
শয্য সেদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল তার বাবা কিভাবে তার পবিত্র মায়ের সোনা চোখ হতে অশ্রু ঝরিয়েছেন। ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছেন তার মায়ের কোমল হৃদয় প্রান্তর!
ফের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখে আব্রাহামকে দেখল। দেখল সেই বিশ্বাসঘাতক ছেলেকে!
অথচ একটিবারও দেখল না আব্রাহামের চোখের কোনে চিকচিক করছে সেই লুকায়িত অশ্রুকণা!

দ্রুত, প্রায় ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে প্রস্তুত হয়ে নিল শয্য। কালো রঙের ওভারসাইজড টি-শার্টের উপর লেদার জ্যাকেটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে একবার কব্জির ব্যান্ডেজের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সে। ক্ষতস্থান এখনও টনটন করছে, অথচ আশ্চর্যজনকভাবে সেই যন্ত্রণাও আজ তার কাছে মধুর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আর হবেই বা না কেন?
গতরাত্রির প্রতিটি ক্ষণ যেন তার মস্তিষ্কে অগ্নিলিপির মতো খোদাই হয়ে আছে। ঝুমঝুমের কাঁপা আঙুল
নিজ হাতে খাইয়ে দেওয়া আলো-আঁধারের সেই সম্মোহনী নৈকট্য সবকিছুই যেন তাকে অদ্ভুতভাবে অস্থির করে তুলেছে।
আজ সন্ধ্যার দিকে “টিম আলফা”-র সঙ্গে একটি ছোট্ট গ্যাদারিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। মূলত ক্যাজুয়াল রুফটপ পার্টি। সিউল সিটির রাত, নিয়ন লাইটস, লাউড মিউজিক আর এক্সপেনসিভ ড্রিংকস সবমিলিয়ে বেশ জমকালো আয়োজনই হতে চলেছে।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল,
মাম্মা কলিং! মুহূর্তেই শয্যের ওষ্ঠপ্রান্ত প্রসারিত হলো। দৃষ্টির রূঢ়তা খানিকটা কোমল হয়ে এলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কল রিসিভ করল সে।
“হ্যাঁ মাম্মা, বলো। হাউ আর ইউ?”

ওপাশে জেসমিন বাদশাহর কণ্ঠে মাতৃত্বসুলভ উদ্বেগ স্পষ্ট।
ছেলেটিকে একা রেখে আসার পর থেকেই তার মন অস্থির হয়ে রয়েছে। যদিও তিনি জানতেন শয্যকে জোর করেও সঙ্গে আনা সম্ভব নয়। তবু মাতৃহৃদয় তো যুক্তির অধীন নয়।
“আমি ভালো আছি বাবা। তুই বল, কেমন আছিস? কী করছিস? কিছু খেয়েছিস?”
শয্য নীরবে নিজের ব্যান্ডেজ করা হাতটির দিকে তাকাল। পরক্ষণেই ঠোঁটে চাপা হাসি ফুটে উঠল।
গতরাতের দৃশ্যটা আবারও মনে পড়ে গেল ঝুমঝুম নিজের হাতে তাকে খাইয়ে দিচ্ছে। সকালে অবশ্য মিসেস ইয়েরিন এসে ব্রেকফাস্ট প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন। সেটুকুই খেয়েছে সে।
“হ্যাঁ মাম্মা, আই অলরেডি হ্যাড ব্রেকফাস্ট। তুমি খেয়েছ?”
“এই তো একটু আগে খেলাম।”
ফোনে কথা বলতে বলতেই শয্যের দৃষ্টি গিয়ে থামল বিশাল থাই-গ্লাস জানালার ওপারে। আর পরমুহূর্তেই তার ভ্রূ সামান্য কুঁচকে গেল। ওই তো চঞ্চলা মাশা!
ঝুমঝুম দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে। তার কাঁধে যথারীতি বসে রয়েছে সেই বিরক্তিকর কাঠবিড়ালী পিউনিও।
শয্যের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।

“ফাকিং রাবিশ!”
মনে মনে অশ্রাব্য গালিটা ছুঁড়ে দিল সে। ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল।
মিসেস ইয়েরিন গিয়ে দরজা খুললেন। ঝুমঝুম স্বভাবসিদ্ধ সৌজন্যে তার সঙ্গে টুকটাক আলাপ করতে করতে ভেতরে প্রবেশ করল। হাতে ছোট্ট একটি হটপট।
শয্যকে দেখা মাত্রই কন্যার ওষ্ঠে দুষ্টুমিভরা কৌতুকমিশ্রিত হাসি ফুটে উঠল।
“গুড মর্নিং! আপনার জন্য ব্রেকফাস্ট নিয়ে এসেছি!”
শয্য নীরবে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল পা থেকে মাথা পর্যন্ত। আজ হালকা প্যাস্টেল রঙের হুডি পরেছে ঝুমঝুম। এলোমেলো কেশরাশি গাল ছুঁয়ে নেমে এসেছে। মুখভর্তি অদ্ভুত এক প্রশান্ত সরলতা।
পুরুষটির দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ড বেশি স্থির হয়ে রইল।
অতঃপর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখল সে।
এই নারী ভীষণ অবাধ্য। আর সেই অবাধ্যতাই তাকে ধীরে ধীরে উন্মাদ করে তুলছে।
ঝুমঝুম আবারও বলল,

“আপনি খেয়েছেন? নাকি আমি প্লেট সাজাবো?”
শয্যের প্রবল ইচ্ছে করল বলে ওঠে,
“আমি অলরেডি খেয়ে ফেলেছি। তুই লেট করেছিস।”
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সে কথাটা বলল না। বরং চোখের ইশারায় প্লেট সাজাতে নির্দেশ দিল। ঝুমঝুম ধীর পায়ে ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল।
মিসেস ইয়েরিন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। মনে মনে ভাবছেন,
“স্যার তো কিছুক্ষণ আগেই ব্রেকফাস্ট করলেন! এখন আবার?”
কারণ শয্য নিজের ডায়েট ও খাবারের ব্যাপারে ভীষণ ডিসিপ্লিনড। কিছুক্ষণ পর শয্য এসে টেবিলে বসল।
ঠিক তখনই ঝুমঝুমের ফোন তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল।
রিংটোনে ভেসে এলো পরিচিত কার্টুন ভয়েস,
“পিক আপ দ্য ফোন, মাশা!”
ঝুমঝুম তড়িঘড়ি করে ফোন বের করল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে, প্রণয় কলিং! এক মুহূর্তের জন্য সে তাকাল শয্যের দিকে। তারপর জোরপূর্বক ঠোঁটে হাসি এনে বলল,

“আপনি খান, আমি এক্ষুনি আসছি!”
বলেই দ্রুত কিছুটা দূরে সরে গেল। অন্যদিকে শয্য মোটেও খাওয়া শুরু করল না। বরং চোয়াল শক্ত করে কান খাড়া করল। কে ফোন করেছে?
ঝুমঝুম কল রিসিভ করল।
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গেই প্রণয়ের অস্থির কণ্ঠ ভেসে এলো,
“মাশা, আই অ্যাম সরি! রিয়েলি ভেরি সরি, সুইটহার্ট! সেদিন আমি ভীষণ রুড বিহেভ করেছি। প্লিজ ফরগিভ মি!”
ঝুমঝুম বিস্মিত হয়ে গেল। প্রণয় তার কাছে ক্ষমা চাইছে?
কেন যেন তার বুকের ভেতর হালকা অপরাধবোধ জেগে উঠল।
“সরি তো আমাকে বলা উচিত, প্রণয়। আমার জন্যই তোমাকে সেদিন এতক্ষণ ওয়েট করতে হয়েছে। আমি কথা দিয়েও আসতে পারিনি,,
‘প্রণয়’ নামটি শয্যের কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই তার মুঠি শক্ত হয়ে এলো।
টেবিলের নিচে ধরা ফর্ক প্রায় বেঁকে যাওয়ার উপক্রম।
চোয়াল এত শক্ত হয়ে উঠেছে যেন দাঁত ভেঙে যাবে। তার হ্যাজেলবর্ণ চোখদুটো বিপজ্জনকভাবে গাঢ় হয়ে উঠল।
ওপাশে প্রণয় আবারও ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,

“প্লিজ সুইটহার্ট! আজ বিকেলে দেখা করি? মাশা অ্যান্ড দ্য বেয়ার ক্যাফেতে?”
ঝুমঝুম কিছুক্ষণ দ্বিধায় নীরব রইল। প্রণয়ের কণ্ঠে অনুশোচনা স্পষ্ট। সেই অস্থিরতা শুনে তার মন সত্যিই নরম হয়ে এলো।
অবশেষে ধীরস্বরে বলল,
“আচ্ছা,ঠিক আছে। দেখা করব।”
বাক্যটি শোনামাত্র প্রণয়ের দীর্ঘদিনের অস্থির হৃদয় যেন শান্তি পেল।
তার ওষ্ঠ আনন্দে প্রসারিত হয়ে উঠল।
“থ্যাংক ইউ সো মাচ, ডিয়ার!”
ফোনালাপ সমাপ্ত করে ধীর পদক্ষেপে পুনরায় ডাইনিং স্পেসের দিকে এগিয়ে এলো ঝুমঝুম। তার মুখাবয়বে এখনও লাজুক সংকোচের ছাপ স্পষ্ট, অথচ অন্তরের গভীরে কোথাও যেন এক অদ্ভুত অস্বস্তি পাক খেয়ে উঠছে।
সে নীরবে শয্যের প্লেটের দিকে হাত বাড়াল খাবার পরিবেশন করবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই সটান দাঁড়িয়ে পড়ল শয্য।
আকস্মিক ঘটনায় প্রচণ্ডভাবে চমকে উঠল ঝুমঝুম। তার হাত কেঁপে উঠল। বিস্মিত, থতমত কণ্ঠে বলল,

“কি,,,কী হয়েছে?”
শয্য কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল।
একদৃষ্টিতে। তার হ্যাজেলবর্ণ চক্ষুদ্বয় তখন ক্রোধে, ঈর্ষায়, দহনজ্বালায় প্রায় রক্তিম হয়ে উঠেছে। দৃষ্টিতে এমন এক উন্মত্ত আগ্নেয়তা জ্বলছিল, যেন মুহূর্তেই চারপাশ ভস্মীভূত করে ফেলবে। পরমুহূর্তেই প্রচণ্ড শক্তিতে ডাইনিং চেয়ারটি ছুঁড়ে মারল কাঁচের টেবিলের উপর! ঝনাআআঙ;
বিকট শব্দে কাঁচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
ঝুমঝুম আতঙ্কে কান চেপে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। তার সমগ্র শরীর কেঁপে উঠছে। চোখের কোণে মুহূর্তেই জল জমে এলো।
শয্য যেন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সে গর্জে উঠল,
“তুই আমার কাছে কেন আসিস?আমি কি বলেছি আমার কাছে আসতে?! বলেছি আমার যত্ন নিতে?! কেন করিস এসব?”
প্রতিটি শব্দ যেন বজ্রাঘাতের ন্যায় আছড়ে পড়ল ঝুমঝুমের উপর। ভয়ে তার শরীরের রোমকূপ পর্যন্ত সজাগ হয়ে উঠেছে। ঠোঁট কাঁপছে। অবশেষে আতঙ্ক আর অপমানে কেঁদে ফেলল কন্যাটি।
হঠাৎই শয্য ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে তার বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।

“আহ্,,,
ব্যথায় কেঁপে উঠল ঝুমঝুম। শয্য তাকে টেনে আনল নিজের অত্যন্ত সন্নিকটে। এতটাই কাছে, যে দু’জনের উত্তপ্ত নিশ্বাস পরস্পরের মুখমণ্ডলে আছড়ে পড়ছে।
শয্যের কণ্ঠ তখন কর্কশ, ভারী, উন্মত্ত।
“হোয়াই?এগুলো করে কী বুঝাতে চাস? তুই আমার কিছু হোস? হুঁ? বল!”
শেষের ধমকটিতে ঝুমঝুম আতঙ্কে কেঁপে উঠল। অশ্রুসজল চোখে দ্রুত দু’দিকে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল সে।

“না,,
এই ক্ষুদ্র অস্বীকৃতিটুকুই যেন শয্যের অন্তর্গত সমস্ত সংযম ছিন্নভিন্ন করে দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কারণ সে কি এতটুকুও বলতে পারত না,
“হ্যাঁ,আমি আপনার কিছু হই।”
হঠাৎই প্রচণ্ড রূঢ়তায় ঝুমঝুমকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল শয্য। কন্যাটি টলমলিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
শয্য দুই হাতে নিজের কোমর আঁকড়ে ধরে গভীর শ্বাস নিতে লাগল। চেষ্টা করছিল নিজেকে শান্ত করার।
কিন্তু ব্যর্থ। সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
তার অন্তরে জমে থাকা হিংস্র ঈর্ষা, দহন, অধিকারবোধ সবকিছু যেন তাকে ভিতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।
পরক্ষণেই দ্বিতীয়বার সজোরে লাথি মারল উল্টে পড়ে থাকা চেয়ারটিতে। ধড়াম! তারপর প্রায় চিৎকার করে উঠল,

“মিসেস ইয়েরিন, জিগুম দাংজাং ইগওতদুল চিউসেয়ো!”
(মিসেস ইয়েরিন এখুনি এগুলো পরিষ্কার করুন!)
আদেশটি উচ্চারিত হতেই সমগ্র কক্ষের বায়ুমণ্ডল যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। শয্যের কণ্ঠস্বর তখনও ক্ষোভে তীক্ষ্ণ, অনিয়ন্ত্রিত ও দগ্ধতায় পূর্ণ। ডাইনিং স্পেসে ভাঙা কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে যেন কোনো নীরব বিস্ফোরণের পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ।
কিছুটা দূরে, এতক্ষণ যাবৎ আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মিসেস ইয়েরিন। তার মুখমণ্ডলে স্পষ্ট উদ্বেগ ও দ্বিধার ছাপ। তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে তিনি আর বিলম্ব করলেন না।
দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে এসে তটস্থ কণ্ঠে বললেন,
“নে, আলগেস্সুমনিদা। বারো চিউগেস্সুমনিদা।”
(জি, বুঝেছি। এখনই পরিষ্কার করে দিচ্ছি, স্যার।)
কন্ঠ জুড়ে বিনীততা, সাথে সামান্য কাঁপনও।

এদিকে, ঝুমঝুম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ভয়ের তীব্র অভিঘাতে তার হৃদয় যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। চোখের জল থামছে না। সে দ্রুত পদক্ষেপে, প্রায় দৌড়ে, পিউনিওকে সঙ্গে নিয়ে সেই ফেইরি ল্যান্ড নামক বিশাল বাড়ি থেকে।
যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে তার চোখ থেকে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছিল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ব্যথা অপমান, ভয়, আর অজানা অনুভূতির জটিল মিশ্রণ।
অন্যদিকে, শয্য সোফার উপর ধপ করে বসে পড়ল।
তার নিঃশ্বাস তখনো অনিয়মিত, ভারী ও ক্ষিপ্ত।
চোখ বন্ধ করে সে কপালে আঙুল চেপে ধরল। যেন নিজের ভেতরের বিস্ফোরণকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর, গভীর, ক্লান্ত অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে নিজেকেই উদ্দেশ করে বলল,
“বিলিভ মি বেটার হাফ, শুধু একবার আমার হয়ে যা তারপর ওই প্রণয়ের কি যে হাল করব তখন দেখতে পাবি।”

“দুঃখিত, আমি ডিলটা নিয়ে কনফিউজড।”
এই একটি বাক্যেই মিটিং রুমের বায়ুমণ্ডল মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়ে গেল। যেন নিরব ঘরের ভেতর কেউ ভারী এক পাথর নিক্ষেপ করেছে প্রতিধ্বনিতে কেঁপে উঠল উপস্থিত সকলের মনোযোগ।
আজগর চৌধুরীর মুখাবয়বে বিস্ময়, ক্রোধ এবং অবিশ্বাস একসাথে ছায়া ফেলল। আব্রাহামের কাছ থেকে এমন দ্বিধাগ্রস্ততা তিনি কল্পনাও করেননি।
“মানে এসব কী বলছো তুমি, আব্রাহাম? জেসমিন আপা, আপনি কিছু বলুন!”
জেসমিন বাদশাহ নির্লিপ্ত নন, বরং পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তার চোখে যুক্তির কঠোরতা।
যদি এই বিজনেস প্রজেক্টটি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়, তবে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ অগণিত কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন,
“দুঃখিত আজগর সাহেব। আমি কিছুই বলতে পারছি না। আপনার প্রস্তাবনা বিশ্লেষণ করার পর আমাদের মনে হচ্ছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।”

আজগর চৌধুরীর মুখ তৎক্ষণাৎ কঠোর হয়ে উঠল।
“কি যা-তা বলছেন? আপনি তো বিয়ের সময় বলেছিলেন এই ডিলটা ফাইনাল করবেন! এখন নিজের কথার বিরোধিতা করছেন কেন?”
ঠিক তখনই আব্রাহামের কণ্ঠস্বর ছুরি-ধারালো ভঙ্গিতে কেটে পড়ল পরিবেশের উপর।
“লিসেন, বাবা। আপনি আসলে কী বলছেন বুঝতে পারছেন?”
আব্রাহামের চোখে ঠান্ডা নিয়ন্ত্রণ, অথচ ভিতরে অস্থির আগু’ন।
“আপনার প্রজেক্টটা আমরা ভালোভাবে দেখেছি। এখন জেনেশুনে এত বড় ইনভেস্টমেন্টে যাওয়া মানে সোজা লস।”
আজগর চৌধুরী যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু আব্রাহামের সিদ্ধান্ত অটল। তার কণ্ঠ আরও কঠোর হয়ে উঠল

“সরি, এই ডিলটা আমরা এক্সিকিউট করতে পারব না।”
বাক্যটি শেষ করেই সে চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়াল।
এক মুহূর্তে যেন পুরো মিটিং রুমের শক্তি ভেঙে পড়ল।
আজগর চৌধুরী ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। চোখে হতাশার ছায়া। এত কিছুর পেছনে ছিল তার দীর্ঘ পরিকল্পনা আর আজ সেটাই ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
এমন সময়ই, “টুং!” ফোনের রিং বেজে উঠল।
আব্রাহাম কোট হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই স্ক্রিনে ভেসে উঠল নাম, জুঁই। তার ঠোঁটে অচেনা কোমলতা ছুঁয়ে গেল। অল্প হাসি ফুটে উঠল।
“বোকা জুঁইফুল আমাকে কল করেছে?”
সে গাড়িতে উঠে ফোন রিসিভ করল।
“হ্যালো, ওয়াইফ?”

অন্য প্রান্তে জুঁইয়ের মুখ মুহূর্তেই লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল। সে আসলে কল করেছে একেবারেই ভিন্ন কারণে কিছু চাইতে। আব্রাহাম গাড়ির ভেতর হেলান দিয়ে বসতেই বলল,
“হ্যাঁ বলো জুঁই, কী লাগবে তোমার?”
জুঁই দ্বিধায় কাঁপছে। রুমের ভেতর দাঁড়িয়ে সে অস্বস্তিতে হাত মুচড়াচ্ছে। বলবে কি? নাকি রেগে যাবে?
অবশেষে সে মিনমিনে গলায় বলল,
“আ,,,আমার একটু কিছু দরকার ছিল,,,,
আব্রাহামের চোখ সংকুচিত হলো। ড্রাইভারকে ইশারা করে গাড়ি থামাল। তার কণ্ঠ এবার নরম, কিন্তু দৃঢ়,
“বলো জুঁই, কী লাগবে? আমি নিয়ে আসব।”
জুঁই আরও অস্থির হয়ে পড়ল।

“আমার খুব টক খেতে ইচ্ছে করছে। আপনি কি আনতে পারবেন?”
এক মুহূর্ত থেমে গেল আব্রাহাম।
“টক?”
তার কণ্ঠে সামান্য বিস্ময়। জুঁই দ্রুত যোগ করল,

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৭

“যদি না পারেন, সমস্যা নেই,,,
কিন্তু কথাটা শেষ হতেই টুট, টুট, টুট,কল কেটে গেল।
ঝুমঝুম মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। ফোনটা কি কেটে দিল আব্রাহাম?

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৯