Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৭

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৭

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৭
ফারহানা নিঝুম

বুকের ভেতর ধকধক করছে কন্যার। পিটপিট চোখ করে তাকাচ্ছে সম্মুখে সটান দাঁড়ানো যুবকের পানে। রূঢ় মানব এক হাত দেয়ালে রেখে অন্য হাতটি ট্রাউজার পকেটে পুরে রেখেছে। দরজার ঠিক পাশেই চেপে আছে ঝুমঝুম! এমনভাবে তার দিকে শয্যকে ঝুঁকে থাকতে দেখে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কন্যার। কন্ঠনালি শুকিয়ে চৌচির প্রায়!

“কি,,, কি করবেন?”
নিষ্পাপ প্রশ্ন! শয্য দাঁতেথ কোণে ঠোঁট কামড়ে একদৃষ্টে চেয়ে আছে তার সুশ্রী মুখপানে! অবাধ্য অনূভুতিরা অস্থির হতে শুরু করেছে।মন চাইছে এই পাঁচ ফুটের কন্যাকে লন্ডভন্ড করে দিতে।তার ক্ষুদ্র এই দেহের উপর দিয়ে ঝড় বইয়ে দিতে। কিন্তু তার বইয়ে দেওয়া ঝড় কি সামলাতে পারবে সে?
অবশেষে মুখ খুলল শয্য।আরেকটু ঝুঁকে এলো ঝুমঝুমের মুখের পানে। বড্ড লঘু স্বরে বলল,
“তুই কি চাস আমি কিছু করি?”
কর্ণ গহবরে কথাগুলো ঝংকার তুলছে।কানের লতি রক্তিম হয়ে আসছে ঝুমঝুমের! অনূভুতিরা বাঁধন হারা, কিন্তু এই অনূভুতির নাম কি দেওয়া যায় জানা নেই ঝুমঝুমের! সহসা লাগাম টানল কন্যা। অস্ফুট স্বরে বলল,
“আ,, আমি বাড়ি,, যাবো!”
শুনলো যুবক! ফের দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো আদলপানে। ঘুরেফিরে দৃষ্টি যুগল আটকে যায় ওই গোলাপি রঙের অধর দুটির মাঝে! আচ্ছা মেয়েটা তো সাজসজ্জা বড্ড পছন্দ করে।এই যে ঠোঁটে লাগানো কৃত্রিম প্রলেপ এটার টেস্ট কেমন হবে?
অদ্ভুত সকল ভাবনা উদয় হচ্ছে মস্তিষ্ক জুড়ে। সহসা সরে এলো শয্য। দুহাত পকেটে গুঁজে টানটান হলো। লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“প্রয়োজন নেই থাকার। চলে যা!”

“কী রে, খাবার খাচ্ছিস না কেন?”
ডিনারে উপস্থিত থাকলেও ঝুমঝুমের সমগ্র মনোসংযোগ যেন অন্য কোনো অদৃশ্য জগতে বিচরণ করছিল। সম্মুখে পরিবেশিত খাবারের প্রতি তার ন্যূনতম মনোযোগও নেই। মস্তিষ্কজুড়ে বারংবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে শয্যের সেই আকস্মিক উচ্চারণ, আধঘণ্টা থাকতে পারবি? আর পরক্ষণেই নির্বিকার ভঙ্গিতে বলা প্রয়োজন নেই। চলে যা।
অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন মুক্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল ঝুমঝুম। মনে হচ্ছিল, কোনো সম্মোহনী, বিপজ্জনক, অলীক রাজ্য থেকে প্রাণপণে পালিয়ে এসেছে সে। শয্যের সান্নিধ্যে থাকা প্রতিটি ক্ষণ তার হৃদ্‌কম্পনকে অস্বাভাবিকভাবে তীব্র করে তুলছিল। বক্ষগহ্বরের অন্তঃস্থলে এক অনির্বচনীয় আলোড়ন ক্রমাগত আছড়ে পড়ছিল যে অনুভূতির সঙ্গে আজই প্রথম পরিচয় ঘটেছে তার।
রিমঝিম তীক্ষ্ণ, অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে অন্যমনস্ক ঝুমঝুমের দিকে তাকিয়ে রইল। ঝুমঝুম ইতস্তত কণ্ঠে, কৃত্রিম স্বাভাবিকতা আনার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় বলল,
“আসলে, আমার খিদে নেই।”
বাক্যটি উচ্চারণ করেই সে প্রায় তড়িঘড়ি করে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল। দ্রুত পদক্ষেপে নিজ কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করল। ঘর নিস্তব্ধ। ঝুমঝুম তৎক্ষণাৎ ল্যাপটপ খুলে বসল। কাঁপা আঙুলে তাড়াহুড়ো করে প্রিয়াকে নক করল।

“প্রিয়া,আমার না খুব অস্থির লাগছে! তুই জানিস, আজ শয্য ভাইয়া আমার হাতে খেয়েছে?”
প্রিয়া প্রায় পাঁচ মিনিট পর অনলাইনে এলো। কিন্তু ঝুমঝুমের এই বার্তা দেখামাত্রই সে যেন বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে গেল। দ্রুত টাইপ করতে লাগল,
“এহ? মানে কী? তুই না বলেছিলি শয্য ভাইয়া তোর ভাই হয়? তাহলে এখন কী চলছে? ওহ এখন তুই খাইয়ে দিচ্ছিস, দুদিন পর উনিই তোকে খাইয়ে দেবে তাই তো?”
প্রিয়ার কৌতুকমিশ্রিত খোঁচা একেবারেই পছন্দ হলো না ঝুমঝুমের। ভ্রূ কুঁচকে দ্রুত লিখল,
“উফ্! থামবি? আমি তোকে পুরো ঘটনাটা বলছি!”
অতঃপর ঝুমঝুম ধাপে ধাপে কিছুক্ষণ পূর্বে সংঘটিত প্রতিটি মুহূর্তের বিবরণ দিতে শুরু করল। অন্ধকারে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া শয্যের বুকে মুখ গুঁজে আতঙ্কে কেঁপে ওঠা,
তার রক্তাক্ত হাতে ব্যান্ডেজ করা ,নিজ হাতে খাইয়ে দেওয়া,
আর সেই অদ্ভুত, দুর্বোধ্য দৃষ্টিগুলো, সবকিছু।
অন্যদিকে, ভোলাভালা স্বভাবের প্রিয়া ঠিক তখনই পানির গ্লাস হাতে তুলেছিল। কিন্তু ঝুমঝুমের বার্তাগুলো পড়তে পড়তে এমন বিস্মিত হলো যে, মুখভর্তি পানি প্রায় ছিটকে বেরিয়ে এলো।
সে কয়েক মুহূর্ত হতচকিত দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। অতঃপর আর একটি শব্দও টাইপ না করে সরাসরি কল করে বসল। কল রিসিভ হতেই প্রিয়ার বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠ ভেসে এলো,

“ভাই! এসব কী বলছিস তুই? ব্যাপারটা তো ভীষণ গোলমেলে!”
ঝুমঝুমের কণ্ঠ কাঁপল,
“মানে?”
প্রিয়া কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরস্বরে বলল,
“ইয়ে,,মানে,,আমি সেদিন যেটা বলেছিলাম, এখন সেটা সত্যি মনে হচ্ছে। আচ্ছা তুই নিজেই ভেবে দেখ। একটা মানুষ কাউকে পছন্দ না করলে তাকে নিজের ব্যক্তিগত জায়গায় আসতে দেয়? তোর সঙ্গে রাগ দেখায়, আবার তোর কাছেই নরম হয়ে যায়। তোকে দিয়ে খাওয়ার আবদার করে। এদিকে তোকেই আবার দুচোখে সহ্য করতে পারেনা এসব কি সাধারণ?”
প্রিয়ার কথাগুলো বজ্রপাতের ন্যায় আ’ঘাত করল ঝুমঝুমের চেতনায়।সে হঠাৎ করেই ভাবতে শুরু করল সত্যিই তো!
শয্য কেন শুধু তার সঙ্গেই এমন আচরণ করে?
সে বিরক্ত করলে অন্যদের মতো ধমক দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয় না কেন? তার উপস্থিতি কেন শয্যের আচরণকে বারবার বিপরীতমুখী করে তোলে? ঝুমঝুম স্তব্ধ।
প্রিয়া আবার বলতে শুরু করল,

“দেখ ঝুমঝুম, আমার মনে হয় এটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। শয্য ভাইয়া কিন্তু!”
“প্লিজ! এসব বলিস না। উনি আমার ভাইয়া হন!”
প্রিয়া তাচ্ছিল্যভরা হাসি হেসে বলল,
“তুই সত্যিই মানিস উনি তোর ভাইয়া? যদি মানতিস, তাহলে এত সামান্য ব্যাপার নিয়ে তোর বুকের ভেতর এমন খচখচানি হতো? আমাকে এত অস্থির হয়ে সব বলতিস?”
কথাগুলো যেন তীক্ষ্ণ সূচের ন্যায় বিঁধে গেল ঝুমঝুমের অন্তরে।
সে নির্বাক হয়ে গেল। ঘরের কোণায় টেবিলের উপর বসে থাকা ছোট্ট পিউনিও বেবির দিকে দৃষ্টি গেল তার। কাঠবিড়ালিটির পাশে গিয়ে নিঃশব্দে বসে পড়ল সে।
হৃদস্পন্দন ক্রমশ দ্রুততর হচ্ছে। মস্তিষ্কে জট পাকাচ্ছে শত প্রশ্ন। কিন্তু কোনো নিশ্চিত প্রমাণ তো নেই!
শয্য কি আদৌ এসব নিয়ে ভাবে? নাকি সে এবং প্রিয়া কেবলই অলীক কল্পনার জাল বুনছে? দীর্ঘ নীরবতার পর ঝুমঝুম কাঁপা স্বরে বলল,

“প্রিয়া, এখন আমি কী করব?”
প্রিয়া কিছুক্ষণ গভীরভাবে ভেবে বলল,
“তুই একটা কাজ করতে পারিস।”
“কী?”
“শয্য ভাইয়ার আড়ালে ওনার ফেইরি ল্যান্ডটা সার্চ করতে পারিস!”
সার্চ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভয়ের হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল ঝুমঝুমের শরীরজুড়ে।
“এইইই! কী বলিস? আমি সার্চ করব? না ভাই! আমি একা এসব পারব না!”
প্রিয়া এবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। কাঁধ দুলিয়ে নির্ভার ভঙ্গিতে বলল,
“চিল ইয়ার! আমি আছি না? তুই শুধু বলে রাখিস কবে, কখন ফেইরি ল্যান্ডে ঢোকা যাবে। ওইদিন আমিই চলে আসব।”
প্রিয়ার আশ্বাসে ঝুমঝুমের মনের ভিতর জমে থাকা আতঙ্ক খানিকটা প্রশমিত হলো। তবুও হৃদয়ের গভীরে এক অদ্ভুত কম্পন থেকে গেল। কারণ এবার সে সত্যিই জানতে চায়
শয্যের সেই রহস্যময় ফেইরি ল্যান্ড এর অন্তরালে আসলে কী লুকিয়ে আছে। আর কেন সেই দুর্বোধ্য পুরুষটির দৃষ্টিতে তার জন্য এমন বিপজ্জনক কোমলতা জ্বলে ওঠে।

“যাক! তুই যে অন্তত ক’টা দিন এখানে থাকবি!”
পিহুর কণ্ঠস্বরজুড়ে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাসের সুর মিশে ছিল। কিন্তু তার সেই আকস্মিক উৎফুল্লতার প্রকৃত কারণ অনুধাবন করতে পারল না জুঁই।
এখানে শব্দটি যেন তার কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
জুঁই মৃদু হাসল। আসলে আজগর চৌধুরীর একাধিক আন্তরিক অনুরোধের ফলেই তারা এই চৌধুরী বাড়িতে থাকতে সম্মত হয়েছে। অবশ্য এর অন্তরালে আজগর চৌধুরীর একপ্রকার সুপ্ত স্বার্থ নিহিত রয়েছে। এই সুযোগে ব্যবসায়িক গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনার অবকাশ মিলবে।
কিন্তু পিহু যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে নিমগ্ন।সে যখন থেকে এসেছে, তখন থেকেই জুঁইয়ের শরীরাবৃত গয়নাগুলোর দিকে গভীর লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। কানে দুলতে থাকা হীরকখচিত রিং ,গলায় শোভিত মূল্যবান নেকলেস। আর শুভ্র কব্জিজুড়ে ঝলমল করা ডায়মন্ডের চুড়ি। প্রতিটি গয়না যেন পিহুর অন্তর্গত হাহাকারকে আরও প্রজ্বলিত করে তুলছিল।
তার অন্তরের গভীরে দাউদাউ করে জ্বলছিল এক দহন,
“যদি সেদিন আব্রাহামকে সে বিয়ে করত তবে আজ এই ঐশ্বর্য, এই সম্মান, এই অবস্থান সবই তার হতো!”
অবশেষে দীর্ঘক্ষণ ধরে চেপে রাখা ঈর্ষা ও আক্ষেপ আর সংযত রাখতে পারল না সে। তিক্ত হাসি হেসে বলে উঠল,

“ইশ্! সেদিন যদি আমি বিয়েটা ভেঙে না দিতাম, তাহলে আজ তোর জায়গায় আমি থাকতাম তাই না জুঁই?”
বাক্যটি শুনে যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় আঁতকে উঠল জুঁই।
তার মুখমণ্ডল মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু পিহু থামল না। বরং আরও বিষাক্ত স্বরে উচ্চারণ করল,
“আমার জন্যেই তুই এত বড় বাড়ির বউ হতে পেরেছিস। আব্রাহামের মতো মানুষকে পেয়েছিস। নয়তো আজ আমি-ই ওর স্ত্রী হতাম!”
জুঁইয়ের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।
সে কাঁপা কণ্ঠে, প্রায় মিনতির সুরে বলে উঠল,
“আপু,প্লিজ!”
তারপর আরও নিচু স্বরে বলল জুঁই।
“এসব বলো না। আব্রাহাম এখন আমার স্বামী!”
জুঁইয়ের কণ্ঠে ছিল লজ্জা, সংকোচ, অথচ একইসঙ্গে এক নিঃশব্দ অধিকারবোধ। কিন্তু সেই বাক্য যেন পিহুর অন্তর্গত ক্রোধকে আরও প্রজ্বলিত করে তুলল।
রাগে তার মুখমণ্ডল লালচে বর্ণ ধারণ করল। চোখেমুখে হিংস্র তীব্রতা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

“তো? সেটা তো আমার কারণেই হয়েছে! আমি যদি সেদিন বিয়েটা করে নিতাম, তাহলে তুই কখনোই ওকে পেতি না!”
পিউ এক মুহূর্ত থেমে বিদ্রূপাত্মক হাসল।
“কি আর হতো প্রেগন্যান্সির কথা জানাজানি হলে? আমি না হয় ক্ষমা চেয়ে নিতাম! তাহলেই সব ঠিক হয়ে যেত!”
প্রতিটি শব্দ যেন ধারালো অস্ত্রের ন্যায় বিদ্ধ করতে লাগল জুঁইকে। তার হৃদয়ের গভীরে যেন র’ক্তক্ষরণ শুরু হলো।
আব্রাহাম এখন তার স্বামী। তার জীবনের পরম আশ্রয়।
তার ভালোবাসা, তার অধিকার, তার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকা একজন মানুষ।
অথচ পিহুর এই কথাগুলো সেই সম্পর্কের ভিত্তিকেই যেন অপমান করল।জুঁই আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।অভিমানে, অপমানে, আর অসহনীয় যন্ত্রণায় তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো।
অতঃপর কোনো উত্তর না দিয়েই দ্রুত পদক্ষেপে কক্ষ ত্যাগ করল সে। তার পদচারণায় ছিল ক্ষো’ভের ঝড়, অথচ অন্তরে
এক নিঃশব্দ ভাঙচুর। করিডোর অতিক্রম করতে করতে জুঁই অনুভব করল, বুকের ভেতর কেউ যেন নির্মমভাবে ধারালো নখ চালিয়ে চলেছে। কারণ পৃথিবীর সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে একটিই সত্য সে নিঃসন্দেহে জানে আব্রাহাম এখন তার। শুধুমাত্র তার।

দ্রুত পদক্ষেপে করিডোর অতিক্রম করতে গিয়েই ঘটল অনাকাঙ্ক্ষিত বিঘ্ন।
সামনের দিক থেকে আসা সুঠামদেহী পুরুষটির সঙ্গে হঠাৎই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ল জুঁই। পরম মুহূর্তেই ভারসাম্য হারাতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু ঠিক সেই ক্ষণেই আব্রাহাম তীব্র প্রতিক্রিয়ায় তার বাহু দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে নিজের বক্ষদেশে টেনে নিল।
জুঁই মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। আতঙ্কে তার দেহ যেন জমে গেল বরফের মতো। ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাতেই সে বন্দী হলো সেই পরিচিত হ্যাজেলবর্ণ দৃষ্টির গভীরতায়।
“আব্রাহাম!”
পুরুষটি নিচু, দৃঢ় অথচ মৃদু তির্যক স্বরে বলল,
“বোকা জুঁইফুল, এখনই তো পড়ে যেতে!”
জুঁইয়ের মস্তিষ্কে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছুটে গেল। তৎক্ষণাৎ নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে সে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে উঠল,
“ধরবেন না একদম!”

আব্রাহাম মৃদু হাসল। সেই হাসির মধ্যে ছিল একধরনের দমনহীন আত্মবিশ্বাস। মুহূর্তেই সে আবারও জুঁইকে আরও দৃঢ়ভাবে নিজের কাছে টেনে নিল। আষ্টেপৃষ্ঠে ধরল!
“যতবার ‘ধরবেন না’ বলবে, ততবারই ধরব।”
বাক্যটি শোনামাত্র জুঁই হতবাক হয়ে গেল। তার দৃষ্টি অস্থির হয়ে উঠল। মস্তিষ্কে বারবার পিহুর বলা কথাগুলো আ’ঘাত করতে লাগল যেন কোনো অদৃশ্য প্রতিধ্বনি তাকে বিভ্রান্ত করে তুলছে।
চোখের কোণে জল জমে এলো। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে উঠল।
আব্রাহাম তৎক্ষণাৎ উপলব্ধি করল পরিবর্তনটি। বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
“কাঁদছ, জুঁই? কী হয়েছে?”
কিন্তু জুঁই কোনো উত্তর দিল না।তার নীরবতা দেখে আব্রাহাম মুহূর্তেই পরিস্থিতির আভাস পেয়ে গেল। কণ্ঠস্বর কিছুটা নরম করে বলল,
“চলো, রেডি হয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ো।”
জুঁই ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কোথায় যাবো?”
আব্রাহাম হালকা হাসল। দৃষ্টিতে একধরনের খেলাধুলার ছোঁয়া।
“পার্কে যাবো। একটু ঘুরবো, আর হঠাৎ করে গাছের আড়ালে লুকিয়ে তোমাকে চুমু খাবো, একদম টিনেজারদের মতো।”
বাক্যটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জুঁইয়ের কানে যেন আগুন লেগে গেল। লজ্জায় তার গাল রক্তিম হয়ে উঠল।
“ছিঃ! আপনি কত খারাপ!”
আব্রাহাম ঠোঁট চেপে হাসল। তার দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও সরল না। মনে হলো, এই নরম, লাজুক নারীর উপস্থিতিই তাকে ধীরে ধীরে এক অচেনা উন্মাদনার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

প্রণয় আজ এক অভিনব গিফট নিয়ে উপস্থিত হয়েছে তুষারধবল এক ক্ষুদ্র খরগোশ। তার উদ্দেশ্য একটিই ঝুমঝুমের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। সেদিনের তুচ্ছ বিষয়ে অকারণ রূঢ় আচরণের কারণে কন্যাটি গভীরভাবে আঘা’তপ্রাপ্ত হয়েছে, যার ফলস্বরূপ বিগত দুই দিন যাবৎ সে সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করেছে।
প্রণয় তখন শহরের বাইরে ছিলো, নিজের এক আত্মীয়ের সঙ্গে পারিবারিক কারণে ব্যস্ত থাকায় তার পক্ষে ঝুমঝুমের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি। এই অনুপস্থিতিই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সাদা খরগোশটির লোমশ মাথায় কোমলভাবে হাত বুলিয়ে প্রণয় ধীর স্বরে উচ্চারণ করল,
“মাই ডিয়ার মাশা, আই এম ট্রুলি স্যরি। আই রিয়েলি লাভ ইউ, কিউটি। এই ছোট্ট গিফট নিশ্চয়ই তোমার হৃদয়ের সমস্ত অভিমান ভেঙে দেবে।”

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৬

প্রণয়ের কণ্ঠ জুড়ে অনুতাপের সূক্ষ্ম অনূভুতি, আবার একধরনের আত্মবিশ্বাসও যেন এই ক্ষুদ্র জীবন্ত উপহারটিই তার ক্ষমার সেতুবন্ধন রচনা করবে।
বাক্যশেষে প্রণয়ের ঠোঁটে অনিচ্ছাকৃত এক সন্তুষ্টিমিশ্রিত হাসি ফুটে উঠল। সে আপনমনে হালকা হেসে উঠল, যেন নিশ্চিত এই নিরীহ সাদা খরগোশটি ঝুমঝুমের রাগ গলিয়ে দেবে, আর তাদের মধ্যকার নীরবতা অবশেষে ভেঙে পড়বে।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৮