ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৯
মারিয়াম ফুল
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের বিশালাকার পাথুরে ফটিকের সামনে এসে যখন কালো রঙের গাড়িটা থামল, চারপাশের পরিবেশ তখন এক ভারী নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ধুলোবালি আর আর্দ্র বাতাসের মিশেলে দমবন্ধ করা একটা থমথমে ভাব। এই শ্যাওলা ধরা উঁচু দেয়ালগুলোর পেছনেই আপাতত ঠাঁই হয়েছে সায়েদ পরিবারের বড় ছেলে, সায়েদ মির্জার।
গাড়ি পার্কিংয়ে রেখেই ধীরপায়ে বেরিয়ে এল মেহের আর রুদ্র। তবে চাইলেই ভেতর ঢোকার কোনো পথ ছিল না। কারারক্ষীরা জানিয়ে দিল—জেলখানার প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা বিকেলে নাস্তা সারতে বাইরে গেছেন। তিনি না ফেরা পর্যন্ত কয়েদির সাক্ষাৎ মেলানো অসম্ভব।
অগত্যা প্রতীক্ষার প্রহর গোনা ছাড়া কোনো গতি রইল না। এক ঘণ্টা, প্রায় একটি অনন্তকালের মতো সময় কাটার পর অবশেষে মিলল কাঙ্ক্ষিত সেই অনুমতিপত্র। একজন কনস্টেবল মেহেরকে সঙ্গে নিয়ে কয়েদিদের সাক্ষাৎকার কক্ষের সংকীর্ণ গলি ধরে হেঁটে চলল।
লোহার ভারি চেইন আর জং ধরা শিকের ফাঁক গলে মেহের যখন ছোট কামরাটিতে পা রাখল, চারপাশের মেটে আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধটা তার নাকে এসে ধাক্কা দিল। ঘরের দূরতম এক কোণে, মেঝের ওপর হাঁটুতে মাথা গুঁজে আষ্টেপৃষ্ঠে একমুঠো ছায়ার মতো বসে ছিল মির্জা। তার মাথার চুলগুলো জট পাকানো, শরীরের জামাকাপড় ধুলোমলিন ও উসকোখুসকো। মাত্র এক রাতের ঝড়ে প্রতাপশালী সায়েদ পরিবারের অহংকার যে এভাবে খসে পড়বে, তা যেন কল্পনারও অতীত।
কারারক্ষীর ভারী বুটের আওয়াজ আর চাবির ঠনঠন শব্দ কানে পৌঁছাতেই মির্জা ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। রক্তবর্ণ দুটি চোখ তুলে তাকাল সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে এক রমণী, যার অবয়বে ছড়িয়ে আছে এক পাথুরে কাঠিন্য।
মেহের ধীর, স্থির পায়ে এগিয়ে গিয়ে গরাদগুলোর ওপর নিজের হিমশীতল হাত দুটো রাখল। তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে বিধল মির্জার ওপর। মির্জার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল, কোটরগত স্পষ্ট বোঝা যায়, রাতে ঘুম তার চোখের পাতায় নামেনি।
মির্জা কিছুক্ষণ নিশ্চুপে চেয়ে থেকে হঠাৎই বলে উঠল, “কেন এসেছিস এখানে?”
মেহের উত্তর দিল না। তার নিষ্প্রাণ চোখের তারায় না ছিল কোনো ক্ষোভের উত্তাপ, না কোনো করুণা। মির্জার প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা এখন তার কাছে অর্থহীন। সে সোজাসুজি বরফশীতল কণ্ঠে উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “অন্তু কোথায়, ভাইয়া?”
মির্জা প্রথমে কিছুটা থতমতো খেয়ে গেল। কিন্তু পর মুহূর্তেই নিজের সেই পুরনো পৈশাচিক রূপটা যেন ফিরে পেল সে। ঠোঁটের কোণে বিকৃত এক উপহাসের রেখা ফুটিয়ে বলে উঠল, “মেরে ফেলেছি! নিজের হাতে শেষ করে দিয়েছি তাকে! দেখিসনি? মনে নেই? নাকি দশ মাস আগের সেই রক্তে রাঙা স্মৃতিটা আবার নতুন করে তোর মনে করিয়ে দিতে হবে, বল?”
মির্জার এই হুঙ্কার মেহেরের বুকের গহিনে বিষাক্ত তির হয়ে বিঁধল। তার গলার স্বর মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। শত চেষ্টা করেও সে আটকাতে পারল না….বন্ধ চোখের পর্দায় নিমেষেই ভেসে উঠল অন্তুর সেই ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত দেহখানা। চোখের মণি দুটো থরথরি কেঁপে উঠল এক সেকেন্ডের জন্য।
তবে মেহের নিজেকে দ্রুত সামলে নিল। হাত দুটো লোহার গরাদে আরও শক্ত করে চেপে ধরে, মেঝের দিকে তাকিয়ে থরথর করে কাঁপা গলায় শুধাল, “অন্তুর… অন্তুর লাশটা কোথায় দাফন করেছ? আদৌ কি আমার অন্তুকে একমুঠো মাটি দিয়েছিলে তুমি, ভাইয়া?”
মির্জা এই ব্যাকুল প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। রক্তচক্ষু সরিয়ে নিয়ে সেলের এক কোণে রাখা একটা পুরনো জং-ধরা মোড়ার ওপর গিয়ে বসে পড়ল। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শীতল, নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল, “তুই চলে যা এখান থেকে, মেহু। আমি তোর কোনো প্রশ্নের জবাব দেব না।”
মেহেরের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। মুখের কোমল ভাবটুকু কর্পূরের মতো উবে গিয়ে সেখানে নেমে এল এক কঠিন আক্রোশ। সেলের দিকে সামান্য ঝুঁকি গিয়ে থমথমে গলায় বলল, “মিরাজের ছোট, নিষ্পাপ মুখটার কথা মনে পড়ছে তোমার, ভাইয়া? কত অবুঝ, কত নিষ্পাপ তোমার সেই সাত মাসের ছেলেটা! বিশ্বাস করো … তোমাকে যদি এই লোহার খাঁচা পর্যন্ত টেনে আনতে পারি, তবে তোমার ওই দুধের শিশুটাকে অনাহারে মেরে ফেলতেও আমার হাত কাঁপবে না! বিশ্বাস করো আমাকে… তোমার মায়ের স্বার্থপরতার কাছে তোমার ছেলে বাঁচল কি মরল, তাতে উনার কিচ্ছু যায় আসে না! উনি ভীষণ ধূর্ত আর চরম অর্থলোভী এক নারী, ভাইয়া… ভীষণ স্বার্থপর! দেখো, আজ আমার স্বামীর অঢেল সম্পত্তি আছে বলে আমাদের সামনে কীভাবে তোষামোদ করছেন!
কিন্তু তুমি? তুমি কমসে কম ৩০ বছরের জন্য কয়েদি হয়ে এই অন্ধকূপেই পচবে! এসব আইনি প্যাঁচ থেকে তুমি আর কোনোদিন বের হতে পারবে না… তা তুমি আমার চেয়েও ভালো করে জানো..”
কথাগুলো শোনামাত্রই মির্জার ভেতরের ঘুমন্ত হিংস্রতা আচমকা জেগে উঠল! পশুর মতো গর্জন করে উঠে সে সোজা গরাদের দিকে তেড়ে এল, শক্ত হাতে লোহার ছড়গুলো চেপে ধরে মেহেরকে আক্রমণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করল।মেহের কিন্তু বিন্দুমাত্র পিছিয়ে গেল না। বরং তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদময় হাসি। “উঁহু! ভুল করছ, ভাইয়া… কেমন লাগছে পিতৃহীন হয়ে ? ঠিক একইভাবে তোমার এই নিজের রক্ত, আর নূরের গর্ভে বড় হতে থাকা ওই অনাগত সন্তানটি যদি বাবা ছাড়া, চরম দারিদ্র্যে আর অভাবে বড় হয়….তখন কেমন লাগবে তোমার?”
মির্জা যেন এক লহমায় স্থির হয়ে গেল! তার থাবাগুলো লোহার ছড় থেকে ঢিলে হয়ে খসে পড়ল। মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করে উঠল। সামনে ভেসে উঠল তার ছেলের চঞ্চল মুখখানি। এই তো সেদিনও ছেলেটা তাকে দেখে আধো আধো কণ্ঠে ‘বা-বা’ করে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ! খিলখিল করে হেসে উঠেছিল।
সেই নিষ্পাপ হাসির পাশাপাশি মেহেরের মুখ থেকে উচ্চারিত শেষ দুটি শব্দ ‘অনাগত সন্তান’ এক তীব্র বজ্রপাতের মতো মির্জার কানে বাজতে লাগল!
তবে কি… নূর আবারও সন্তানসম্ভবা?
মির্জা বিস্ফোরিত, অবিশ্বাস্য চোখে মেহেরের স্থির চেহারার দিকে তাকাল। তার শুকনো, তোতানো কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল, “নূর… নূর আবার প্রেগন্যান্ট?”
মেহের কোনো আবেগ না দেখিয়ে, কেবল এক শব্দের এক কঠিন, অবিচল বাণী ভাসিয়ে দিল বাতাসে, “হ্যাঁ…”
শব্দটা শোনামাত্রই মির্জার মনে হলো তার বুকের ভেতরটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে খানখান হয়ে যাচ্ছে! সে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হতে পারে, সব পাপের অংশীদার হতে পারে, কিন্তু নিজের সন্তানের কাছে সে কোনোদিন নিষ্ঠুর বাবা হতে চায়নি।
মির্জা আইনের ছাত্র ছিল.. আইনের বইয়ের প্রতিটি ধারার মারপ্যাঁচ তার নখদর্পণে। সে খুব ভালো করেই জানে, তার কাঁধে যে খুনের দায় চেপেছে, তা থেকে কোনো অলৌকিক শক্তিও তাকে মুক্ত করতে পারবে না।তাহলে কি সে আর কোনোদিন নিজের ছোট ছোট দুটো সন্তানকে কোলজুড়ে তুলে নিতে পারবে? তাদের সাথে হাসতে পারবে?তাহলে কি সে আর কোনোদিন তার সন্তানদের সঙ্গে খেলতে পারবে না? আধো আধো গলায় তার সন্তানদের মুখে ‘বাবা’ ডাক শুনতে পারবে না? ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরার সেই মুহূর্তগুলো কি তার ভাগ্যে আর লেখা নেই? সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরে নিজের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে যাওয়ার সেই সুখটুকুও কি সে আর কখনো পাবে না?
মেহের যা বলছে, তার মিথ্যে নয়। মেহের মিথ্যা বলতে জানে না…তা মির্জার চেয়ে ভালো আর কে জানে? আর তাদের জন্মদাত্রী মা, সায়েদ কামিনী,সে যে চরম অর্থলোভী, তা মির্জাও হাড়ে হাড়ে জানে। মির্জার এই করুণ দুর্দিনে ছেলেকে বাঁচানোর বদলে নিজের অবস্থান আর সামাজিক সম্মান রক্ষা করাই হবে সেই নারীর প্রথম কাজ। টাকার তাগিদে নিজের নাতিদের দূরে ছুড়ে ফেলতেও কামিনী বেগমের হাত কাঁপবে না।মির্জার পুরো শরীর এক লহমায় নিষ্প্রাণ হয়ে এল। হাঁটু দুটো ভেঙে সে যেন মেঝের ওপর এলিয়ে পড়ল। মাত্র একদিন আগেই সে নিজের বাবাকে হারিয়েছে। পিতৃহীন হওয়ার যন্ত্রণার খবর তার অজানা নয়।
আক্ষেপের ভঙ্গিতে, শক্তিহীন নিস্পৃহ গলায় মির্জা বলে উঠল, “আমি যদি তোকে সব সত্যি কথা বলে দিই… আমার সন্তানদের দেখে রাখবি ?”
“যে হাহাকার আজ তোমার চোখে তোমার বাবার জন্য আর নিজের সন্তানদের জন্য দেখছি, ঠিক একই আগ্নেয়গিরির দাহ আমি প্রতিটা মুহূর্তে নিজের বুকের ভেতর বয়ে বেরিয়েছি! আমি তোমার সাথে আর কথা বাড়াতে চাই না। তুমি সব সত্যি বলে দাও… কথা দিচ্ছি, ওদের আমি নিজের ছায়া দিয়ে আগলে রাখব, সব বিপদ থেকে দূরে, প্রয়োজনে দেশের বাইরে পাঠাব।”
মির্জা এক দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। ঘরের বাতাস যেন সেই নিশ্বাসের উত্তাপে আরও ভারী হয়ে উঠল। আর কোনো ছলনার আশ্রয় না নিয়ে, ভাঙা গলায় সে বলল, “অন্তুর দাফন দিয়েছি আমাদের পুরনো সায়েদ বাড়ির পেছনের বাগানে… বাম পাশের বটগাছটার ঠিক নিচে…”
কথাটা শোনার সাথে সাথেই মেহেরের পুরো শরীর যেন এক অদৃশ্য বিদ্যুতের শোকে শিহরে উঠল! গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল তার, বুকটা ধক করে উঠল। পুরনো সায়েদ বাড়ি! যেখানে তাদের শৈশব আর কৈশোরের রঙিন মুহূর্তগুলো ছড়িয়ে ছিল ?
মেহের শূন্য দৃষ্টিতে মির্জার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “কেন… কেন এমন কাজ করলে, ভাইয়া? কী অপকার করেছিল সে? আমার অন্তু তো ভীষণ সহজ-সরল, সাধারণ একটা মানুষ ছিল! মানলাম, আমার অবাধ্য হয়ে তাকে বিয়ে করাটা ভুল ছিল… কিন্তু কাউকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করার অপরাধে তাকে এভাবে খুন করতে হলো? সে তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি! আজ নিজের রক্তের জন্য বুকের ভেতর যে আকুলতা টের পাচ্ছ, সেদিন তো আমিও কেঁদে কেঁদে তোমার পায়ে পড়ে তার জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলাম! দিয়েছিলে তুমি? দাওনি ”
মির্জা মাথা নিচু করে রইল, তার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হলো না।
মেহের গলার স্বর কিছুটা উঁচিয়ে, ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল, “বলো… সত্যি করে বলো, কেন মেরেছিলে তাকে?”
কথাটা শুনে মির্জার যেন রাগ আরও বেড়ে গেল! সে হঠাৎ কর্কশ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, “কারণ তোর ওই অন্তু পুলিশকে সব বলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল! তার কাছে আমাদের সব অপরাধের প্রমাণ ছিল…”
মেহের আকস্মিক ধাক্কায় থমকে গেল, “অন্তু কীভাবে জানত এসব?”
মির্জা দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই সাক্ষাৎ কক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবল কড়া গলায় হাঁক দিল, “ম্যাডাম! আপনার সময় শেষ হয়ে এসেছে, আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। যা কথা বলার দ্রুত শেষ করুন।”
কনস্টেবল মুখ ফিরিয়ে নিতেই মেহের রাগে কটমট করে মির্জার আরও কাছে এগিয়ে এল। ধারালো কণ্ঠে বলল, “সত্যিটা কী হয়েছিল স্পষ্ট বলো! নয়তো তোমার এই অপরাধের খেসারত দিতে হবে তোমার অবুঝ সন্তানদের! তুমি কি চাও তোমার নিষ্পাপ ছেলে-মেয়েরা রাস্তায় রাস্তায় ধুঁকে ধুঁকে অনাহারে মরুক?”
মির্জা ক্রোধে আর অসহায়ত্বে দাঁত কিড়মিড় করে এক বীভৎস শব্দ করল।
মেহের গলার স্বর আরও এক ধাপ নামিয়ে এনে বলল, “এখন শুধু মুখে বলছি, কিন্তু সত্যি সত্যি করে দেখাতে আমার এক সেকেন্ডও দ্বিধা হবে না…”
মির্জার উত্তাপ যেন মুহূর্তের মধ্যে নিভে গিয়ে এক বিষণ্ণ ছাইয়ে পরিণত হলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল, “আজ থেকে প্রায় ১১ মাস আগে অন্তু আমাদের অফিসে এসেছিল। সে সোজাসুজি জানায় যে তোকে বিয়ে করতে চায়। সামান্য এক টিউটরের ছেলে আমাদের সায়েদ পরিবারের জামাই হবে শুনে আমি আর মা রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা তখনই তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিই। কিন্তু তোরা যে আমাদের না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করে ফেলেছিস, তা আমরা তখনও টের পাইনি… সে বারবার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। তারপর একদিন এসে জানিয়ে দিল, তোরা আগে থেকেই বিবাহিত।এই বিয়ের খবর জানাজানি হলে সমাজে আমাদের মান-সম্মান বলে কিছু থাকত না। তাই আমি আর মা ওকে আমাদের পুরনো বাড়িতে আসতে বলি সেখানেই শেষ ফয়সালা হবে বলে।তাকে মারার উদ্দেশ্য ছিল না। ভেবেছিলাম, শুধু ভয় দেখিয়ে সিলেট থেকে বের করে দেব।”
“তারপর?” মেহেরের বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল।
মির্জা সেই ভয়াল রাতের স্মৃতি মনে করে বলতে লাগল, “তারপর ও যখন সেই বাড়িটাতে গিয়ে পৌঁছায়, আমি আর মা আগেই সেখানে অপেক্ষা করছিলাম। সাথে ছিল আমাদের সেক্রেটারি। ঠিক তখনই আমি জানতে পারি, আমাদের সেই সেক্রেটারি সায়েদ পরিবারের সাথে গাদ্দারি করে সব গোপন নথিপত্র বাইরে পাচার করছে! তর্কের একপর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হলে আমি মাথা ঠিক রাখতে পারিনি… রাগের মাথায় পিস্তলের ট্রিগার চেপে দিই। গুলিটা সরাসরি গিয়ে সিক্রেটারির মাথায় লাগে আর সে রক্তে ভেসে ওখানেই শেষ হয়ে যায়…আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অন্তু ঘরের ভেতর ঢোকে… চোখের সামনে সেই খুনটা হতে দেখে সে আমাদের পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। তখন বাধ্য হয়ে…”
মেহেরের মনে হলো তার পায়ের তলার শক্ত মাটিটা হঠাৎ আলগা হয়ে যাচ্ছে, চারপাশের আলো কেমন ঝাপসা আর ঘোলাটে হয়ে আসছে। “তাই… তাই তোমরা তাকেও শেষ করে দিলে?”
কথা বলতে গিয়ে মেহেরের শ্বাসনালী যেন আটকে আসছে, কণ্ঠ বুজে আসছে কান্নায়। সে ঘৃণা, আক্রোশ আর ধিক্কার মেশানো চোখে মির্জার দিকে তাকিয়ে রইল। “এতগুলো রক্ত জমালে হাত দুটোয়? তোমরা মানুষ না কোনো পশু?”
মির্জার চোখে ক্ষণিকের জন্য অপরাধবোধের ছায়া নামলেও সে আর কিছু বলল না, পাথরের মতো নিথর হয়ে বসে রইল। মেহের আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াতে পারল না। টলমল পায়ে, বাইরে বেরিয়ে এল।
কারাগারের বাইরের সীমানা প্রাচীরের কাছে, নিজের গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রুদ্র।ভেতরে বসে থাকতে থাকতে একসময় তার দমবন্ধ লাগছিল, মেজাজটা খিঁচড়ে যাচ্ছিল। তাই খোলা হাওয়ার খোঁজে বাইরে বেরিয়ে আসা।তবে শুধু দমবন্ধ লাগছিল বলেই নয়, তার ছেলেটার কথাও বারবার মনে পড়ছিল। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় হয়ে গেছে, অথচ এখনো মা ছাড়া রয়েছে বাচ্চাটা।জিনসের পকেট থেকে ফোনটা টেনে বের করে সে রেহানা চৌধুরীকে কল করল। মা ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠে অভয় দিয়ে বললেন,বাচ্চা একদম ঠিক আছে, ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু তাতেও রুদ্রর মন সায় দিল না।
সে কালবিলম্ব না করে আবার ফোন করল হামজা চৌধুরীকে। হামজা চৌধুরী জানালেন, তিনি এখন বাড়িতে নেই… নির্বাচনী প্রচারণার কিছু জরুরি কাজে অফিসে আটকা পড়েছেন।রুদ্র বাবার কথা শুনে তাড়া দিয়ে বলল, “বাবা, যেকোনোভাবে বাড়ি যাও। আমার ছেলে ওখানে একা। শুধু মা আছে ওকে সামলানোর জন্য। ও যদি কান্না করে, তাহলে মা একা ওকে সামলাতে পারবে না।”
হামজা চৌধুরী ছেলের উদ্বেগ দেখে কিছুটা খুশি হলেন। ছেলেকে আশ্বস্ত করে বললেন, তিনি চৌধুরী বাড়িতে যাচ্ছেন।
বাবার সঙ্গে কথা বলে রুদ্র আবারও নিজের পকেটে ফোনটা রেখে দিল। ঠিক তখনই তার সামনে পড়ল মেহের। মেহের ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে।কাছে এসে দাঁড়াতেই রুদ্র মুখ তুলে তাকাল। মেহেরের মুখের প্রতিটি রেখা কেমন যেন বিবর্ণ ,অচেনা ঠেকছে।
রুদ্র মেহেরের বিবর্ণ চেহারা দেখে আতঙ্কিত কণ্ঠে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগল। “মেহের, ঠিক আছ তুমি? মিস অ্যারোফোবিয়া… কী হয়েছে? কাঁদছ কেন? তোমার ভাই কি তোমাকে কিছু বলেছে? মেহের… আর ইউ ওকে?”
রুদ্রর কথায় মেহের কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি শূন্যে স্থির হয়ে আছে। রুদ্রর সব প্রশ্ন এড়িয়ে সে ধীরে জিজ্ঞেস করল, “আমাকে নিয়ে যাবেন… আমাদের পুরোনো বাড়িতে?”
কথাটার অর্থ প্রথমে ঠিক অনুধাবন করতে পারল না রুদ্র। সে ভ্রু জোড়া কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলল।রুদ্রকে ইতস্তত করতে দেখে মেহের আপনমনেই বিড়বিড় করে বলে উঠল, “পুরোনো সায়েদ বাড়ি…”
রুদ্র আর দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন বা তর্কে গেল না। নিঃশব্দে গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটের দরজাটা খুলে দিল। শান্ত গলায় বলল, “বস এখানে। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে তোমাকে।”
মেহের কোনো কথা না বাড়িয়ে যান্ত্রিক পুতুলের মতো গিয়ে সিটে বসে পড়ল। রুদ্রও ঘুরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন চালু করল। নিশ্চয়ই খারাপ কিছু ঘটেছে ভেতরে, নয়তো হঠাৎ এমন আচরণ করবে কেন?গাড়ি চালাতে চালাতে রুদ্রর মস্তিষ্কে দোলা দিতে লাগল অগুনতি প্রশ্ন।
কিছুদূর এগোনোর পর মেহের আবার কথা বলল। তার কণ্ঠ ভারী, ভাঙা, কান্নায় রুদ্ধ।”আমি… ভীষণ ক্লান্ত, ক্যাপ্টেন সাহেব। জীবন আমাকে এত পরীক্ষা করছে কেন বলুন তো? আমার আর সহ্য হচ্ছে না, একদম সহ্য হচ্ছে না… আজ আমারও একটা সুন্দর সংসার হতে পারত, হতে পারত না?”
রুদ্র কথাটা শুনে একবার মেহেরের দিকে তাকাল। মেহের যে এই মুহূর্তে কার কথা বলছে, বুঝতে বাকি রইল না তার। অন্তুর স্মৃতি আবার নতুন করে উঁকি দিয়েছে ওর মনে।রুদ্রর মনে হলো, কেউ যেন তাকে আচমকা গভীর সমুদ্রে ছুড়ে ফেলেছে। চারপাশের অথই জল তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে, বুকের ভেতরটা ভারে ফেটে পড়ছে, অথচ সেই অসহ্য কষ্টটুকু কাউকে বলে বোঝানোরও উপায় নেই।
মেহের চোখের কোণের জল না মুছেই বিষাদের সুরে বলতে লাগল, “আমি আপনার জীবনে এসে আপনার জীবনটাও শেষ করে দিচ্ছি, তাই না? আমি বদনসিব নিয়ে জন্মেছি, বুঝলেন, আমি… আমি বোধহয় আল্লাহর প্রিয় নই। আমার সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, ক্যাপ্টেন সাহেব…”
রুদ্র নীরব রইল। কী-ই বা বলবে সে এই বিধ্বস্ত মুহূর্তে? এখন যদি সে সান্ত্বনা দিতে যায়, মেহের হয়তো আরও ভেঙে পড়ে অহেতুক যুক্তিতর্কে জড়িয়ে পড়বে। রুদ্র ভালো করেই জানে, স্রষ্টার প্রতি মেহেরের অন্ধ বিশ্বাস প্রবল, যা রুদ্রর যুক্তিবাদী ভাবনার সাথে মেলে না। এই মুহূর্তে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মেয়েটার সাথে কোনো তর্কে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই।
কী বলবে ভেবে পেল না রুদ্র। তার মুখ থেকে শুধু একটি শব্দই ভেসে এলো,”হুম…”
একবার করুণ চোখে মেহেরকে দেখে নিয়ে সে আবার স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করল।কিছুক্ষণ পর গাড়িটা এনে একটা অচেনা গলির মুখে থামাল রুদ্র। চারপাশটা বেশ নিরিবিলি, বড় বড় গাছের ছায়ায় ঘেরা। সে মেহেরের দিকে ফিরে শুধাল, “কোন দিকে তোমাদের পুরোনো বাড়ি?”
মেহের ঝাপসা চোখ দুটো তুলে সামনের দিকে তাকাল। সামনে দু-দিকে দুটো সরু পথ চলে গেছে, যার দু-পাশে ঘন গাছপালার মেলা। এক মুহূর্তের জন্য মেহেরের মনে হলো, তার স্মৃতির কোঠা যেন পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে গেছে। মস্তিষ্কে চাপ দিল সে, কিন্তু কিছুতেই মেলাতে পারল না।
ইতস্তত করে বলল, “হয়তো… ডান পাশের গলি।”
রুদ্র ভ্রু জোড়া সামান্য উঁচিয়ে মনে মনে আওড়াল, ‘হয়তো?’ নিজের পুরোনো ভিটের ঠিকানা বলতে গিয়েও ‘হয়তো’ শব্দটা ব্যবহার করছে মেয়েটা?
রুদ্র আর কিছু না ভেবে রুদ্র গাড়িটা ডানদিকের সরু রাস্তাটিতে ঢুকিয়ে দিল। কিন্তু সেখানে কয়েকটা ছোট ছোট মুদি দোকান ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কোনো বসতবাড়ির চিহ্নমাত্র নেই। রুদ্র এবার কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে বলল, “তুমি ঠিক লোকেশন দিয়েছ তো? এখানে তো কোনো ঘরবাড়িই নেই ”
মেহের নিজেও হতভম্ব চোখে চারপাশটা পরখ করল। সত্যি তো, এটা তো পশ্চিম পাড়ার গলি! এখানে তারা কীভাবে এল?
সে রুদ্রর দিকে ফিরে শুধাল, “এদিকে কেন নিয়ে এলেন?”
রুদ্র অবাক হয়ে বলল, “মানে? তুমিই তো বললে…”
“আমি বলেছি?” মেহের নিজের বুকের ওপর তর্জনী ঠেকিয়ে অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল। রুদ্র ভ্রু জোড়া আরও শক্ত করে কুঁচকে বলল, “ভুলে গেছেন ম্যাডাম? আপনি না বললে আমি অহেতুক এখানে আসব কেন?”
মেহের যেন একদম থতমতো খেয়ে গেল। মাথার ভেতর স্মৃতির প্রচণ্ড তোলপাড় আর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকার কারণে হয়তো ভুলেই সে এই গলির কথা বলে ফেলেছিল। নিজেকে সামলে নিয়ে অনুচ্চ স্বরে বলল, “বাম দিকের রাস্তায় গেলে প্রথম বাড়িটাই তো ওটা…”
রুদ্র আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে এল। বাম দিকের সরু গলি ধরে কিছুটা এগোতেই স্যাঁতসেঁতে, জীর্ণ-শীর্ণ এক বিশাল বাড়ি নজরে এল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এখানে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের কোনো বসতি নেই। সায়েদ পরিবার প্রায় ১২ বছর আগেই এখান থেকে চলে গেছে। বিশেষ কোনো প্রয়োজন না পড়লে এই পুরোনো ভিটেতে কেউ ভুল করেও পা রাখে না।গাড়ির গিয়ার নিউট্রাল করে রুদ্র দ্রুত নেমে এল। নেমে দেখতে পেল, মেহের গাড়ি থেকে নেমেই একপ্রকার প্রায় দৌড়ে গিয়ে বাইরের মরিচা ধরা গেটটা ধাক্কা দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে যেন তাকে আটকে রাখা এখন কারোর পক্ষেই সম্ভব নয় !
তার পরা পোশাকের আঁচল আর ওড়নার একটা পাশ মাটির ধুলোয় ছেঁচড়ে যাচ্ছে, মাথার বাঁধন আলগা হয়ে হিজাবটাও খসে পড়ার উপক্রম।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৮
পেছন থেকে রুদ্র উচ্চস্বরে ডেকে উঠল, “মেহের! মেহের! এই… মিস অ্যারোফোবিয়া…”
মেহের সে ডাক কানেই তুলল না, অন্ধের মতো এগোতে লাগল সামনে। অগত্যা রুদ্রও কালবিলম্ব না করে তার পিছু পিছু দৌড় লাগাল।
