Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৩৯

খান সাহেব পর্ব ৩৯

খান সাহেব পর্ব ৩৯
সুমাইয়া জাহান

ঘড়িতে ভোর পাঁচটা। বাইরের হালকা আলো ঘরের পর্দা ভেদ করে সুমুর মুখে পড়ছে। জানালার ফাঁক গলে হালকা আলো পড়ছে বিছানার একপাশে। সাদা পর্দার নরম দোলা, আর এক মধুর নীরবতা ঘিরে আছে রুমটা। সুমুর চোখ খুলতেই খেয়াল হলো, পাশটা খালি।
সে আধো ঘুমে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। সাদা চাদরটা কোমর পর্যন্ত টেনে নিয়ে আলতো করে ডাকল,
“খান সাহেব?”
শেরাজ টাওয়েল ঘাড়ে ঝুলিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো। ওড়নায় মুখ ঢেকে আধো ঘুম চোখে ওয়াশরুমের দিকে তাকাল সুমু। শেরাজ একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বলল,

“গুড মনিং! সুইটহার্ট।”
“গুড মনিং! আজ আপনি এত ভোরে উঠে গেলেন? তাও আমার আগে?”
“হুম! আমি ভোরেই ঘুম থেকে উঠি। বিয়ের পর একটু নিয়মগুলো চেঞ্জ হয়েছিল। নামাজ পড়বেনা, সুইটহার্ট? উঠে, অযু করে এসো।” শেরাজের গলায় প্রশান্তি, কিন্তু কন্ঠে গম্ভীরতার সাথে আদেশ।
সুমু মুচকি হেসে উঠে দাঁড়াল।
“আপনি এত গম্ভীর হলে, ভয় লাগে।”
শেরাজ কাছে এসে সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“সৃষ্টিকর্তার সামনে ভয় থাকা ভালো, তবে আমার সামনে না। আমি তো তোমার দোয়া হয়েই এসেছি। আমি তোমার জন‍্য ভয়ের কিছু না।”
সুমু মুচকি হেসে ওয়াশরুমে চলে গেল। ওযু করে এসে দুজনে একসাথে নামাজে দাঁড়াল। নামাজ শেষ করে রোজকারের মতো দুজন দুজনের জন‍্য মোনাজাতে দোয়া করল। শেরাজ সুমুকে কাছে টেনে কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“এই রকম সকাল আমি সারাজীবন চাই। শুধু তুমি, আমি আর নামাজের সিজদার মাটি।”
সুমু আলতো হেসে আস্তে করে বলল,

“আপনি থাকলে প্রতিটা সকালই ইবাদতের মতো পবিত্র লাগে, খান সাহেব।”
দুজনের মুচকি হেসে জায়নামাজ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সুমু জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে, আবার চাদর মুড়িয়ে বিছানায় ঢুকে পড়ল। শেরাজ জিম-ম্যাট বের করে ফ্লোরে ব্যায়াম শুরু করল। সুমু আলতো হেসে বলল,
“জিম সেন্টারে যান না কেন এখন? আর প্রতিদিন ওয়ার্কআউট করতে কেমন লাগে আপনার? আপনি এতো হ‍্যান্ডসাম। তাছাড়া এখন তো আপনার বিয়ে হয়ে গেছে। এখন এতো ফিট থেকে লাভ কি আপনার?”
পুশ আপ করতে করতে শেরাজ বলল,
“আপনার জন্যই তো শরীর ঠিক রাখতে হয়, মিসেস খান। আর তাছাড়া, ফিট থাকা ভালো। ফিট থাকলে রোমান্স করে মজা আছে। এখন ফিট থাকলে বুড়ো বয়সে কাজে লাগবে। আমি বুড়ো হয়ে গেলেও, আমার রোমান্সের থেকে রক্ষা পাবেন না আপনি।”
সুমু ঘুম জড়ানো গলায় বলল,

“তখন আপনি এতো এনার্জি পাবেন না।”
“পাবো সুইটাহার্ট। আগে বুড়ো হই, তারপর দেখবা বুড়ো বয়সে আমার রোমান্স দেখে তোমার আমাকে পঁচিশ বছর বয়সী তাগড়া যুবক মনে হবে।”
“সকাল সকাল লজ্জায় ফেলবেন না।”
কথাটা বলে সুমু চাদর মুড়ি দিল। শেরাজ আলতো হেসে ওয়ার্কআউটে মন দিল।

চায়ের কাপ, দুটো পেস্ট্রি, এক প্লেট কাটা ফল আর খেজুরের সাথে মধু সুমুর সামনে রাখা। সুমুর ব্রেকফাস্ট আজ শেরাজ নিজের হাতে বানিয়েছে। এই নিয়ে অনন‍্যা খাতুন অনেক রাগারাগি করেছে। শেরাজ সবটা সামলে নিয়েছে। সকলে ব্রেকফাস্ট করে যার যার রুমে চলে গেছে। শুধু শেরাজ আর সুমুই এখনো ব্রেকফাস্ট করেনি। শেরাজ আরিয়ানের সামনে সুমুকে পরতে দিবেনা বলে, ব‍্যস্ততার অযুহাত দেখিয়ে সুমুকে নিয়ে নিজের রুমে ছিল। সে চায়না সকাল সকাল বাসার মধ্যে কোনো ঝামেলা হোক।
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে খাবারের দিকে।
শেরাজ এক চামচ মধু তুলে সোজা সুমুর ঠোঁটে ছোঁয়ায়।
“মধু তো এমনিতেই আছে এখানে।”
সুমু হালকা কেঁশে বলল
“কি করছেন এইসব? কিচেনে অনেকে আছে।”
“বাড়ির সকল সার্ভেন্টরা অলরেডি জেনে গেছে যে, তাদের রাগি, গম্ভীর মেজো সাহেব বর্তমানে তাদের মেজো খান সাহেবরা প্রেমে ডুবে যাওয়া মানুষ।”

“খান সাহেব!”
“বলো সুইটহার্ট!”
সুমু আরও একবার খাবারের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“চা বানাতে আপনি তো বেশ পারদর্শী।”
“তুমি যেদিন আমার জীবনে এসেছো, তখন থেকেই আমি সব শিখে নিয়েছি। তুমিই তো আমার মুগ্ধতার ইবাদত, তাই তোমাকে নিজের কাছে একটা পুতুলের মতো করে যত্ন করে রাখার জন‍্য ইউটিউব দেখে সব ব্রেনের ভেতরে সেট করে নিয়েছি।”
“আপনি এমন করলে আমার সকালটা আর নরমাল সকাল থাকবে না। সবকিছু উপন‍্যাসের গল্পের মতো হয়ে যাবে।”
শেরাজ এক হাতে কাপ এগিয়ে দিল, অন্য হাতে সুমুর আঙুল ধরে রেখে বলল,

“তুমি আমার গল্পের প্রথম শব্দ। যতদিন যাবে নতুন বাক্য তৈরী হয়ে যাবে, নতুন কবিতা হয়ে যাবে। যার প্রতিটি শব্দে শুধু থাকবে তুমি, আর আমি।”
“বাহ! আপনি তো দেখছি কবিদের মতো কথা বলছেন।”
“নিজের ভালোবাসা তোমার সামনে উপস্থাপন করলাম, আর তুমি কবি বানিয়ে দিলে?”
সুমু আলতো হাসল। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“আজ অফিস যাবেন না?”
“না, সানকে বাসায় আসতে বলেছি। আজ আমার সবগুলো ফ্রেন্ড আমার বাড়িতে আসবে। ওদের সাথে আড্ডা দিবো। আর সন্ধ্যায় তো জানোই আমার নিউ শপের ওপেনিং আছে।”
“হুম! রাহিন ভাইয়ার সাথে এখনো ভালো করে কথা হলো না।”
“আগে ব্রেকফাস্ট শেষ করো, তারপর সবাইকে গার্ডেনে ডেকে পাঠাচ্ছি।”

গার্ডেনে সোফায় বসে আছে শেরাজ। তার মুখোমুখি বসে আছে স‍্যান্ডি। হালকা রোদ, হালকা ঠান্ডা হাওয়া আর সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা ধোঁয়া ওড়ানো কফির কাপ। শেরাজ কাজ করছে ল‍্যাপটপে। পুরোপুরি মনোযোগ স্ক্রিনে। কাজের ফাঁকে শেরাজ কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
“স্যান্ডি, এখন আর শুধু ক্লোথিং ব্র্যান্ড না। এস.কে ফ‍্যাশান এখন একটা স্টেটমেন্ট। আমরা শুধু পোশাক বানাই না, আমরা পরিচয় বানাই। এখন সময় ভিজিবিলিটি বাড়ানোর। এটা এখন একটা স্টাইল বা পরিচয়ের ভাষা। যেই ব‍্যাক্তিই এস.কে ফ‍্যাশান পরে, সে নিজেই একটা স্টেটমেন্ট হয়ে দাঁড়ায়। আলাদা করে চিনিয়ে দেয় নিজেকে।”
“অ্যাগ্রি, স‍্যার! আমি ভাবছি ‘হেরিটেজ মিটস মডার্ন’ থিম নিয়ে চলতি সিজনের ক্যাম্পেইন প্ল্যান করি। পুরনো জামদানি প্যাটার্নের ওপর ওয়েস্টার্ন কাট স্মার্ট, ক্ল্যাসি, আর ইউনিক। ওয়েট আপনাকে আমি ব‍্যাখা করে বলছি।”
স‍্যান্ডি কফির কাপে একটা ছোট চুমুক দিয়ে আবারও বলল,

“আমি চাইছি এই সিজনের ক্যাম্পেইনের জন্য এমন একটা থিম নিতে যেটাতে পুরনো ঐতিহ্য আর আধুনিকতা একসাথে মিশে থাকবে। আমার ভাবনা হচ্ছে, পুরনো জামদানি ডিজাইন থাকবে, কিন্তু জামাগুলোর কাটিং বা ডিজাইন হবে ওয়েস্টার্ন স্টাইলের। যেমন ধরুন, ব্লেজার বা ট্রেঞ্চ-কোট টাইপ কাট, বা ওয়েস্টার্ন স্টাইলের ড্রেস, কিন্তু ফেব্রিক আর প্যাটার্ন হবে একদম দেশি, যেমন জামদানি। আর ফ্যাশনটা হবে, স্মার্ট (আধুনিক লুক), ক্ল্যাসি (রুচিশীল), ইউনিক (সবচেয়ে আলাদা)। এই মিলনটাই হচ্ছে ‘‘হেরিটেজ মিটস মডার্ন’ থিমের মূল আইডিয়া। মানে, পুরনো ঐতিহ্য প্লাস আধুনিক স্টাইল সমান নতুন ট্রেন্ড।”
শেরাজ চোখ সরু করল। তার গলার স্বরটা নেমে এলো নিচু তালে।

“আমাদের অডিয়েন্স কারা জানো? শুধু ধনী, পার্টি-গোয়িং ক্লাস না। আমি এমন কিছু চাই, যেটা ইউনিক, চোখে পরার মতো, কিন্তু, অ্যাফোর্ডেবল। জানো কেন? কারণ আমি চাই, একজন আর্ট কলেজের স্টুডেন্টও যেন সেটা গর্ব করে পরতে পারে। আবার, একজন কর্পোরেট এক্সিকিউটিভও সেটা কনফিডেন্সে ক্যারি করতে পারে।”
“তাহলে মাস মার্কেটিং এর সাথে টার্গেটেড লাইনে যাই? দুইটা লাইন ‘এস.কে লাক্স’ আর ‘এস.কে কোর’।”
“এক্স‍্যাক্টলি! ‘এস.কে লাক্স’ হবে লিমিটেড কালেকশন। ‘এস.কে’ হবে রোজকার ব্যবহার উপযোগী, স্টাইলিশ অথচ মিনিমাল। একজাম্পল, ‘এস.কে লাক্স’ হবে এক্সক্লুসিভ, লিমিটেড কালেকশন। যেটা প্রিমিয়াম ক্লায়েন্টদের জন্য। ডিজাইনে থাকবে একটা লাক্সারিয়াস টাচ, হয়তো সিল্ক, হ্যান্ডওয়ার্ক, বা ইউনিক কার্ট। দামও একটু বেশি হবে, কারণ এটা স্পেশাল ইভেন্ট বা ওকেশনের জন্য। আর ‘এস.কে কোর’ হবে রোজকার ব্যবহারের জন্য। অফিস, ইউনিভার্সিটি, বা ক্যাজুয়াল আউটিং। ডিজাইন হবে মিনিমাল, তবে ট্রেন্ডি আর স্টাইলিশ। দামটাও থাকবে অ্যাফোর্ডেবল রেঞ্জে, যাতে সবাই কিনতে পারে। এখন যেটা দরকার, সেটা হলো সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য একটা নতুন ফেস। যেটা ব্র্যান্ডের দুইটা লাইনকেই রিপ্রেজেন্ট করতে পারবে। মানে, ‘এস.কে লাক্স’ এর জন্য তার মাঝে থাকতে হবে এক্সক্লুসিভ গ্ল্যামার, এলিগ্যান্স। ‘এস.কে কোর’ এর জন্য থাকতে হবে ন্যাচারাল চার্ম, রিলেটেবল পার্সোনালিটি। একজন মডেল না, বরং ব্র্যান্ড আইকন, যাকে দেখে ফলোয়াররা ভাববে, আমি যেমন, সেও তেমন বা আমি ওর মতো হতে চাই।”
স‍্যান্ডি একটু হেসে বলল,

“ম‍্যামকে সামনে আনার কথা ভাবছেন না তো?”
“সে তো আমার ব্র্যান্ডের রুহ। কিন্তু ও ক্যামেরার সামনে স্বচ্ছন্দ না। আমি চাই ওকে নিয়ে একটা বিহাইন্ড দ্য-সিনস ডকুমেন্টারি বানাই ‘দ্য সোল অফ এস.কে’। যেমন, ‘রুহ’ মানে ‘আত্মা’। অর্থাৎ এস.কে ব্র্যান্ডটা কেবল বাইরের ডিজাইন না। তার ভেতরে যে গভীরতা, ভালোবাসা, যত্ন, সবকিছুই সুমু। সে সামনে না থাকলেও, সে সবকিছুর মূল হবে। কিন্তু, সুমু যেহেতু ইন্ট্রোভার্ট টাইপ, স্পটলাইট পছন্দ করে না, তাই ওর উপস্থিতি নীরব, কিন্তু অনেক গভীর। তাই প্ল্যান, একটা বিহাইন্ড দ্য-সিনস ডকুমেন্টারি বানাব। নাম হবে ‘দ‍্য সোল অফ এস.কে’। এই ডকুমেন্টারিটা কীভাবে করবে শোনো? কনসেপ্ট, ছোট একটা ফিল্ম বা ভিডিও। ক্যামেরা সুমুর পেছনে থাকবে, কিন্তু ওর ছোঁয়া, ওর নীরব নেতৃত্ব সব ফুটে উঠবে। যেমন, সুমু কাপড় ছুঁয়ে দেখছে, ডিজাইন ঠিক করছে, হালকা হাসছে, কিন্তু ক্যামেরার দিকে তাকাচ্ছে না। আমার ভয়েসওভার হবে, ‘ওর ছোঁয়া ছাড়া কিছু পূর্ণ হয় না। সে সামনেই থাকে, শুধু আলোটা নিজের করে না।’ এইভাবে করলে, মানুষ বলবে, আহা! এটাই তো ভালোবাসা। এটাই তো সত্যিকারের ব্র্যান্ড। তাহলে কি বুঝলে সান?
এস.কে মানেই তখন হবে একটি অনুভব, একটি গল্প। সুমু হয়ে উঠবে “দ্য আনসিন স্টার’, আর সেটাই ব্র্যান্ডের বিশেষত্ব।”

“কিন্তু, স‍্যার সোশ্যাল মিডিয়াতে কীভাবে ব‍্যবহার করব?”
“ট্রেলার রিল দাও, ‘কামিং সুন, দ্য আনসিন স্টোরি অফ এসকে’। হ্যাশট্যাগ ‘দ‍্য সোল অফ এস.কে’। আমার কথার কোটেশন, ‘সব মুখ আলো চায় না, কিছু মুখ শুধু আলো ছড়িয়ে দেয়। এস.কে-এর প্রতিটি ছাঁটেই তার ছোঁয়া’।”
থামলো শেরাজ। কফির কাপে চুমুক দিয়ে আবারও বলল,
“আরও একটা দারুণ আইডিয়া, ডকুমেন্টারির পরেই শুরু করো, ‘সুমু এডিট’ মানে, সুমুর পছন্দের কালেকশন। এস.কে লাক্স আর এস.কে কোর-এর মধ্যে যা সে নিজে বেছে নেবে।”
স‍্যান্ডি হালকা গম্ভীর হয়ে বললো,
“পাওয়ারফুল আইডিয়া, স্যার। মানুষ দেখবে শুধু কাপড় না, জীবনের গল্প। ইমোশনস বেচলে ইমপ্যাক্ট আসে।”
“হুম রাইট! যখন পণ্যের সঙ্গে আবেগ জুড়ে দেওয়া হয়, তখন সেটার প্রভাব অনেক বেশি হয়। ব্র্যান্ড তখন আর শুধু ব্র্যান্ড থাকে না, সেটা হয়ে ওঠে একটা অনুভূতি।”

“ঠিক বলেছেন, স‍্যার।”
“একটা কাজ করো, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে দুইটা লাইন প্রেজেন্টেশন রেডি করো। মডেল লিস্ট, অর্থাৎ কোন কোন মডেল কোন পোশাক পরবে, তাদের নাম ও লুক। ফ্যাব্রিক কস্টিং, কাপড়ের ধরন, সাপ্লায়ার, ও খরচের হিসাব। বিজনেস প্রজেকশন, দুইটা লাইন থেকে কী পরিমাণ লাভ আশা করা যায়, মার্কেট ট্রেন্ড অনুযায়ী। আর এস.কে ফ‍্যাশন এর নতুন ট্যাগলাইন ঠিক করো। ‘ওর্ন উইথ প্রাইড’ ঠিক আছে?”
“ডান। লেটস মেক এসকে নট জাস্ট আ ব্র্যান্ড… বাট আ মুভমেন্ট।”
শেরাজ হালকা হাসল। ঠিক তখনই ছোট্ট একজোড়া পা চুপচাপ পেছন থেকে এগিয়ে এসে বলল,
“তুমি আমাল জন‍্য নিউ থেলনা আনোনি?”
শেরাজ চমকে তাকিয়ে দেখল, ফিরোজা মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স‍্যান্ডি আলতো হাসল। শেরাজ ফিরোজাকে কাছে টেনে এনে কোলের ওপর বসিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল,

“ওহ মাই লাভ! আমি তো ভুলে গেছি।”
ফিরোজা গলা নিচু করে বলল,
“তুমি তেবল নিউ ফ্রেন্ডের তথা ভাবো। আমাল কথা এতন আল ভাবোনা।”
“লাভ, আমি তো সব সময় তোমার কথাই ভাবি।”
“তুমি তত্যি বলত, ভাইয়া?”
“হ্যাঁ। তুমি তো আমার ছোট্ট রাজকন্যা।”
ফিরোজা একটু হেসে ফেললো। সে লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলল,
“তুমি আমাল ভাইয়া। তুমি নিউ ফ্রেন্ডের থেকেও আমাতে বেতি ভানোবাতবা। আমাল মতো কনে তাউতে ভানোবাতবা না।”
শেরাজ তার ছোট্ট হাত দুটো ধরে বলল,
“না, বাসব না। তোমার মতো করে আমি কাউকে ভালোবাসব না, লাভ।”
ফিরোজা এবার খুশি হয়ে বলল,

“তাহনে, আমাল জন্য একটা পিংতি কিতি আনবে তাল?”
“ওকে লাভ। তোমার কথা আমি আর ভুলব না, মাই লাভ। কথা দিলাম, কাল তোমার জন‍্য একটা পিংকি কিটি আনব।”
“আল নিউ ফ্রেন্ডকে বলবা, সে যেন তোমাল থেকে বেতি আমাতে আদল করে।”
শেরাজ হেসে বলল,
“তোমার কথাই তো শেষ কথা প্রিন্সেস।”
ফিরোজা খুশি হয়ে হাততালি দিল। শেরাজ ফিরোজার গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“এখন আমি একটু কাজ করছি। তুমি তোমার নিউ ফ্রেন্ডের কাছে যাও।”
ফিরোজা কোল থেকে নেমে বাড়ির ভেতর দৌড়ে চলে গেল। তখনই শেরাজের সব ফ্রেন্ডরা এসে হাজির হলো। আইয়ুব নাজমিনের সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে একটু সাইডে গিয়ে দাঁড়াল।
আইয়ুব হেসে বলল,

“এই সকালটা পুরো তোমার মতো।”
নাজমিন চমকে, কিন্তু ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,
“আপনি কি সবসময় এভাবে কথা বলেন? না শুধু আমার সাথে কথা বললেই কবি হয়ে যান?”
“তোমার কন্ঠ শুনলেই কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে, ব্রাউন গার্ল।”
নাজমিন কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলল,
“আপনি আমাকে এই নামে ডাকেন কেন?”
“কারণ তোমার চোখের রঙ, তোমার ত্বকের ছায়া, তোমার অভিমান, সব একসাথে একটা গল্প বলে। একটা গভীর, রঙিন গল্প।”
“আপনি শুধু কথা দিয়েই মানুষকে মুগ্ধ করেন? নাকি কাজেও সেইরকম?”
“আমি সবকিছুতেই পারদর্শী। বলো তুমি আমাকে কেমন দেখতে চাও?”
“আমি শুধু এটা চাই, আপনি কখনো বদলে যাবেন না।”
“আমি যদি বদলাই, তাহলে ওই আকাশটা গোলাপি হয়ে যাবে। তুমি তো জানো, আমি ব্রাউন গার্লের সব কথা রাখি।”

“আপনি এতো চাপা কীভাবে মারেন? আকাশের রং গোলাপি আপনি বদলে গেলেও হবেনা। যতসব ফালতু কথা।”
“এই ছাম্মাক ছালো, আমি কোনো চাপা মারিনি। সব সত্যি বলছি।”
“আপনি আবার আমাকে ছাম্মাক ছালো বললেন? আপনি একা ছাগল। আমি আপনাকে ভুল করে এতক্ষণ ফিল্মি প্রেমিক ভাবছিলাম।”
“এই তুমি কি বললে? আমি ছাগলের বাচ্চা? তবুও তুমি এই ছাগলের বাচ্চাটার প্রেমে পড়েছো।”
“আপনার প্রেমে পড়ে তো পেট খারাপের মতো অবস্থা। পচা গু খাইলেও বোধহয় কারো পেটের এতো খারাপ অবস্থা হবেনা।”
আইয়ুব নাটকীয় ভাবে বুক চেপে ধরে বলল,
“আহা, প্রেমে পাগল আইয়ুবের এত বড় অপমান। ভালোবাসা টয়লেটে ফ্লাশ করে দিলে তো? কাজটা ঠিক করলেনা।”
“হুম হয়েছে যান তো। সবসময় উল্টাপাল্টা লজিক দিয়ে কথা বলেন।”
কথাটা বলে নাজমিন কল কেটে দিল। পেছন থেকে আইয়ুবের সব কথাশুনে সারবাজরা হাসিতে ফেঁটে পড়ল। রাহিন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মুখ টিপে হেসে বলল,

“ভাই, আইয়ুবরে দেখলি? পুরা নিব্বাদের মতো প্রেম করে বেড়াচ্ছে। এইসব নাটক তো আমি কলেজে দেখতাম।”
নিহাল বলল,
“আহা, আইয়ুব ভাইয়ের প্রেম এখন পিওর স্ন্যাকস! ব্রাউন গার্লরে দেখে সে কবি হয়ে গেছে। পুরাই এস.কের মতো।”
শেরাজ চোখ সরু করে, ঠোঁটে চাপা হাসি নিয়ে বলল,
“আইয়ুবের টপিকের মধ্যে হেডলাইনে আমার নাম উঠলো কেনো?”
সারবাজ হাসতে হাসতে বলল,
“তুই আইয়ুবরের প্রেম আলাপ শুনেছিস। আল্লাহ গো, আমি হাসতে হাসতেই মারা যাবো।”
শেরাজ চোখ মেরে বলল,
“ওরে প্রেম করতে দে। ব্রাউন গার্লকে কাঁদালে, আইয়ুব আবার রেগে যাবে।” সে হালকা হেসে আবারও আইয়ুবকে বলল, “তোর প্রেম আলাপ ভালো ছিল। কিন্তু সাবধানে করবি। আমি হেডমাস্টার! যখন তখন তোর প্রেমের বারোটা বাজিয়ে দিব।”
আইয়ুব মুখ ভেঙিয়ে বলল,

“তুই হেডমাস্টার হলে, আমি হলাম ক্লাসের মনিটর।”
সকলে একসাথে হেসে উঠল। এমন সময় রিয়াজ এসে বলল,
“আমি বলেই দিচ্ছি, ভাবিজি আজ থেকে আমার পার্টনার।”
সবাই থমকে তাকাল। শেরাজ চোখ তুলে তাকিয়ে ঠোঁটে বাঁকা হাসি রেখে বলল,
“রিয়াজ, তোর এই সিদ্ধান্ত কি ফাইনাল?”
“হ্যাঁ। তুমি তো সব সময় রাগ করো। ভাবিজিকে আমি একটুও কাঁদতে দেব না।”
“তাই নাকি! আমি রাগ করি বলেই তুই আমার সুইটহার্টকে নিয়ে নিতে এসেছিস?”
নিহাল বলল,
“এখনকার ছোটরা ডেঞ্জারাস। বড়রা যত কিছুই করে, ওরা এক লাইনে এগিয়ে দাবী করে।”
সারবাজ হেসে বলল,
“তবে এখন থেকে সুমুর নাম হবে রিয়াজা জাহান।”
শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,

“সবাই চুপ। আমার সুইটহার্টকে নিয়ে কেউ রসিকতা করবি না। বিশেষ করে আমার প্রতিদ্বন্দ্বি রিয়াজ।”
রিয়াজ হাত তুলে বলল,
“ঘোষণা করছি! আমি রিয়াজ খান, এইমাত্র সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আজ থেকে ভাবিজি আমার পার্টনার। ওনাকে কেউ আর শেরাজ খানের স্ত্রী বলবে না।”
“রিয়াজ, একটু সামনে আয় ভাই। আমি তোকে একটু আদর করি।”
রিয়াজ হেসে বলল,
“তোমার আদর আমার লাগবেনা। ভাবিজি আমার কিউট পার্টনার। তার আদর আমার লাগবে। আমি কাল রাতেই টিকটকে ঘোষণা দিয়েছি, অলরেডি আমার ৫০০ ফলোয়ার।”
নিহাল বলল,
“ভাইরে ভাই! এই যে বলেছিলাম না, টিকটক একটা বিপদ।”
আইয়ুব হেসে বলল,

“বাহ! রোমান্টিক রিয়াজ।”
সারবাজ রিয়াজের টিকটক একাউন্ট চেক করে বলল,
“রিয়াজের টিকটক বায়ো দেখ সবাই,‘শেরাজ ব্রোকে হারিয়ে আমি জিতেছি’।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“বাচ্চা ছেলে ভেবেছিলাম। এখন দেখি প্রেমিক হয়ে গেছে। এইসব কোথা থেকে শিখছে ও?”
শাহরুখ পেছন থেকে বলল,
“ভাই, আমার কাছে একটা ডিভোর্স ফর্ম আছে। চাইলে দিয়ে দিই, এখনই ভাবিজি রিয়াজের নামে ট্রান্সফার হয়ে যাক।”
রাহিন হেসে বলল,

“শেরাজ ভার্সাস রিয়াজ — সিজন ওয়ান শুরু হয়ে গেছে।”
“আমি পার্টনার বলেছি মানেই পার্টনার। আজ থেকে আমি ভাবিজির হিরো, রিয়াজ খান।
শেরাজ উঠৈ রিয়াজকে ধাওয়া করল। রিয়াজ দৌড়ে পালালো। বাকিরা একসাথে আট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

সামিয়া, নাজমিন আর শাহরুখ ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছে। আজ শাহরুখ বাড়িতেই আছে। ফারিয়া এলো শেখ বাড়িতে। গিয়ে বসল সামিয়া আর নাজমিনের পাশে। শাহরুখকে দেখে বলল,
“ভাইয়া, তোমার সাথে একটা সিরিয়াস কথা আছে।”
শাহরুখ না শোনার ভান করে বসে রইল। ফারিয়া কাঁধের ওড়না ঠিক করে আবারও বলল,
“তুমি না, একদম অসহ্য! আমি একটা সিরিয়াস কথা বলতে চাইছি, আর তুমি শুনছ না।”
শাহরুখ না তাকিয়ে বলল,
“তোর সিরিয়াস কথাও কার্টুনের মতো শোনায়, কী করি বল তো?”
“তুমি জানো একটা মেয়ে তোমাকে অনেক পছন্দ করে?”
“হুম, জানি। পাশের বাসার সুন্দরী মেয়েটা তো বলেছিল, আমি নাকি খুব হ্যান্ডসাম।”
“কিহ! তুমি পাশের বাসার মেয়েদের সাথে কথা বলো? আর আমি যে তোমাকে সিরিয়াসলি ভালোবাসি, তুমি বুঝোই না।”

শাহরুখ এবার তাকাল, একটু স্মিত হেসে বলল,
“ভালোবাসা শুধু বললেই হয় না, প্রমাণ লাগে।”
“তোমাকে রোজ সহ্য করি, এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।”
শাহরুখ হাসতে হাসতে বলল,
“তবে আর কী? তোর এই সাহসিকতার জন্য একটা পুরস্কার দেওয়া উচিত। শাহরুখ সহ্য করার পুরস্কার।”
“একদিন আমি যদি সত্যি চলে যাব। তখন বুঝবা।”
শাহরুখের চোখে একটু গভীরতা, কিন্তু মুখে ব্যঙ্গ করে বলল,
“তুই গেলে আমি কাঁদব না, বরং পকোড়া ভেজে পার্টি করব।”
নাজমিন আর সামিয়া নিরব দর্শকের মতো দুজনের কথা শুনছে। ফারিয়া নরম গলায় বলল,
“একটা কথা বলব, ভাইয়া?”
শাহরুখ না তাকিয়েই বলল,

“তুই আবার কী নতুন নাটক শুরু করবি?”
ফারিয়া হালকা অভিমান নিয়ে বলল,
“তুমি তো জানো না, আমার ভেতরে কত কথা জমে থাকে।”
শাহরুখ কিঞ্চিত বিরক্ত হয়ে বলল,
“আবার যদি সেই ভালোবাসার সংলাপ শুরু করিস, তাহলে আমি কিন্তু উঠে চলে যাব।”
ফারিয়া কষ্ট চেপে বলল,
“কেন? ভালোবাসলে বলতে নেই?”
“তুই বুঝিস না, তাই বলিস। আমি এসব ভালোবাসা-টাসা বিশ্বাস করি না। মাথা খারাপ করে দিবি একদিন তুই আমার।”
ফারিয়ার চোখে পানি এলো।

“আমি তো বেশি কিছু চাইনা। শুধু তোমাকে একটু ভালোবাসি। এইটুকুও সহ্য হয় না তোমার?”
“না হয়না। যা তো, ডাস্টবিনের মধ্যে গিয়ে মর।”
ফারিয়া রেগে বলল,
“ভাইয়া তুমি নিজেই তো গু মাখা ডাস্টবিনের মতো, সব সময় বাজে কথা বলো। তাহলে তোমার মধ্যেই মরি?”
“আর তুই কী? পচা নর্দমার ওপর লাফ দেওয়া ব্যাঙ।”
“তুমি আমাকে ব্যাঙ বললে, তুমি নিজে হইলা সেপটিক ট্যাঙ্ক। মুখ খুললেই গন্ধ বের হয়।”
“ভাইরে! এই মেয়েটা তো পুরাই গু বোমা। ছুঁইলেই বিস্ফোরণ।”
ফারিয়া ভেংচি কেটে বলল,
“আমি গু বোমা হলে, তুমি হলে গু প্যারা। কারো গায়ে লাগলেই প্যারা শুরু হয়।”
“তোরে একদিন বস্তায় ভরে আসলেই ডাস্টবিনে ফেলে দিবো। লিখে রাখ।”
সামিয়া হেসে বলল,
“ভুলে যেও না ভাইয়া, ফারিয়া আপু তোমার লাইফে সেই বিশেষ গু, যেটা কোনোভাবেই কাটে না।”
শাহরুখ হেসে বলল,

“ও একটা পাগল। পুরাই নর্দমার রাজকুমারী।”
“আর তুমি, গু-র রাজপুত্র ভাইয়া।”
“এই যা তো। নোংরা মেয়ে একটা।”
ফারিয়া, সামিয়া আর নাজমিনকে চোখ মেরে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ভাইয়া! আজকে কেমন জানি লাগতেছে তোমাকে, যেন হট কেক।”
শাহরুখ হকচকিয়ে বলল,
“তুই আবার কিরকম গাঁজাখুরি কথা বলিস? আমি কেক নাকি? তোর ব্রেইনে গু ঢুকছে?”
ফারিয়া মুচকি হেসে বলল,
“গু না ভাইয়া, প্রেম! তোমারে দেখলেই প্রেম করতে ইচ্ছা করে। গায়ে পড়তে ইচ্ছা করে।”
শাহরুখ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“গায়ে পড়তে ইচ্ছা করে মানে? তুই হয়েছিস একটা নোংরা ময়লা? নর্দমা থেকে উঠে এসেছিস?”
“তুমি নর্দমা আমাকে বললা? নিজেকে দেখো আগে। টয়লেটে পড়ে থাকা পঁচা সাবানের মতো মুখ।”
“তুই তো গু দিয়ে বানানো মানুষ। প্রেমের নাম করে শুধু বাজে পঁচা কথা।”
ফারিয়া আবারও ভেংচি কেটে বলল,
“আমি গু হলে তুমি হইলা সেই টয়লেটের ফ্ল্যাশ, যেটা চাপ দিলেও কিছু নামেনা।”
শাহরুখ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আর তুই সেই ডাস্টবিন, যার মুখ খোলা থাকলে পুরো মহল্লায় দুর্গন্ধ ছড়ায়।”
“তুমি হ্যান্ডসাম মনে করো নিজেকে? আয়নার সামনে দাঁড়ালে তো তোমার চেহারা দেখে আয়না নিজেই অক্কা পাবে।”
শাহরুখ ঘাড় কাত করে বলল,

“তোর মুখ খোলামাত্রই চারপাশে সবকিছু থামে যায়। রাস্তায় প্রতিটি মোড়ে মোড়ে লিখে দেওয়া উচিত, সতর্ক থাকুন, ফারিয়া পঁচা কথা বলব এখন। সকলে মুখে মাস্ক বা রুমাল চেপে ধরুন।”
“তোমার মুখ দেখলেই মনে হয়, কেউ হাড়ি ভর্তি বৃষ্টি-ভেজা পচা কাকরোল ছুঁড়ে মেরেছে।”
“তুই আসলেই একটা নর্দমার রাজকন্যা। একদম ডাস্টবিনের দুঃখিনী পরী।”
“আর তুমি সেই টয়লেটের দরজা, যেটা সব সময় খোলা থাকে আর কেউ ঢুকতে চায় না।”
শাহরুখ সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা ফলের ঝুড়ি থেকে আপেল তুলে নিল। ফারিয়া নাক ধরে বলল,
“তুমি আপেলটা ছোঁয়া মাত্রই, আপেলটা থেকে এমন গন্ধ দিচ্ছে, মনে হচ্ছে কোনো পিচ্চি বাচ্চা আপেলটার ওপর টয়লেট করে গেছে।”
শাহরুখ ঠান্ডা গলায় বলল,

“তোর মুখ খুললে গন্ধ আসে, আপেল থেকে না। তুই মুখ খুলেছিস, তাই গন্ধ পেয়েছিস।”
নাজমিন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেয়ে বলল,
“আহা রে, ফারিয়া আপু! তোমাকে আর ভাইয়াকে দেখলে মনে হয় পচা ডাস্টবিনে প্রেম।”
সামিয়া বলল,
“ওদের দুজনকে নিয়ে নেটফ্লিক্স সিরিজ বানাইলে নাম হইতো—’গুতে ভেজা হৃদয়’।”
ফারিয়া কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“তুমি আমাকে নিয়ে এমন বাজে কথা বলো কেন ভাইয়া? আমি তোমাকে মন থেকে ভালোবাসি। তুমি জানো না আমার হৃদয়ের দরজা সবসময়ে তোমার জন্য খোলা।”
শাহরুখ কপাল কুঁচকে বলল,
“ওটা তোর হৃদয়ের দরজা খোলা না, ওটা নর্দমার ঢাকনা ছাড়া স্ল্যাব।”
ফারিয়া অভিমান করে হাত বুকে রেখে বলল,
“তুমি বুঝবা না। ভালোবাসা মানে শুধু লাল গোলাপ না, কখনো কখনো পঁচা আলুর মধ্যে থেকেও ভালোবাসা জন্মায়।”
নাজমিন বলল,

“ফারিয়া আপু! সেই ভালোবাসা মানে, টয়লেটে পানি না থাকা অবস্থায় ঢুকে পড়া।”
সামিয়া বলল,
“বা রে! এতো গভীর প্রেম? ভাইয়া তোমাকে পাত্তা না দিলেও, তুমি তারে দিয়েছো পাতলা প্রেমের দুঃস্বপ্ন।”
শাহরুখ রেগে বলল,
“আচ্ছা তোরা থামবি? না হলে আমি তোদের তিনজনকে একসাথে মেরে পঁচা খিচুড়ি বানায় ফেলব।”
ফারিয়া লাজুক মুখ করে বলল,
“তুমি ছাড়া আমি কিছুইনা, ভাইয়া। কিন্তু তুমি এমন কেনো? আমার ভালোবাসা কি নর্দমা?”
“না! তোর ভালোবাসা নর্দমা না। পুরাই ডাস্টবিন।”
সামিয়া হেসে বলল,
“ভাইয়া ঠিকই বলছে, ফারিয়া আপু। তুমি মাঝে মাঝে এমন ভালোবাসা দাও, যেটা কিনা রান্না ঘরের নিচে আটকে থাকা পঁচা মুরগির মতো গন্ধ দেয়। একটু রোমান্টিক হতে পারোনা?”
ফারিয়া কপাল কুঁচকে বলল,

“সামিয়া! তুই আমার না ভাইয়ার টিমে?”
নাজমিন হাসতে হাসতে বলল,
“আরেহ! আমরা তো দর্শক, কখনো তোমার টিমে, কখনো শাহরুখ ভাইয়ার টিমে।”
সামিয়া বলল,
“আমি তো শুধু ভাবি, এই দুইজনের বিয়ের রাতে ঝগড়ার শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা পুলিশ ডাকবে।”
সামিয়ার কথা শুনে নাজমিন বলল,
“ওদের হানিমুন হবে গুলিস্তান ডাস্টবিন ট্যুর।”
শাহরুখ মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“ওকে কে বিয়ে করবে? পচা নর্দমা একটা।”
ফারিয়া শাহরুখের কথা পাত্তা না দিয়ে একটু রোমান্টিক হয়ে বলল,
“ভাইয়া, তোমার জন্য চা করে আনি? এক কাপ ভালোবাসা। গু দিয়ে না, চিনি দিয়ে বানাব।”
“তোর এই ভালোবাসা মানে হইলো সেই পাতলা টয়লেট। একবার নামলে আর উঠার উপায় নাই।”
ফারিয়া নাক ফুলিয়ে, ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“তুমি না, সবকিছু টয়লেট দিয়ে বোঝো। আমি তো হৃদয়ের গভীর থেকে বলছি।”
“তোর হৃদয়ের গভীর মানে সেই সেপটিক ট্যাংকের তলা, যেইখানে ভালোবাসা গেলেই হজম হয়ে যায়।”
ফারিয়া চোখ গরম করে বলল,
“তুমি না একটা অন্ধ গাধা। আমার ভালোবাসা যদি টয়লেট হয়, তুমি তো সেই কমোড যার ফ্ল্যাশ কাজ করে না।”
“এইটা কি প্রেম না নর্দমা প্রেম। আমার তো মনে হয়, তুই প্রেমের নামে আমায় পচা পেঁয়াজ ভাজা দিস।”
ফারিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুমি আমার প্রেম বোঝোনা, কারণ তোমার ব্রেনেই গু ভরা। প্রেম বুঝতে হলে আগে ফ্রেশ হও।”
শাহরুখ চিৎকার করে বলল,
“তুই চুপ কর! তোর প্রেমে ঢুকলে মন নয়, পেট খারাপ হবে। পাতলা প্রেম দিয়া আমার ভুঁড়ি ফুলে যাবে।”
ফারিয়া চোখ ছোট করে রোমান্টিকসুরে বলল,
“ভাইয়া, জানো? আমি না স্বপ্নে তোমাকে দেখেছি। আমরা দুইজন হাত ধরে ঘুরতেছি বৃষ্টির মধ্যে, রোমান্টিক না?”

“ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা ভালো।”
“তুমি না কিছুই বুঝো না? তুমি আমার হৃদয়ের নোংরা ঝাড়ুদার।”
“আরে ধুর! তোর হৃদয়ে নোংরা। ওটা তো পুরা নর্দমার সেপটিক ট্যাংক। আমি গু পরিস্কার করতে আসিনি।”
“তুমি ছাড়া আর কে পরিষ্কার করবে? তুমি তো আবর্জনার রাজপুত্র।”
সাইডে বসে থাকা সামিয়া ফিসফিস করে নাজমিনকে বলল,
“এই দুইজনরে প্রেম করতে দিলেই দেশজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়াবে রে ভাই।”
নাজমিন হাসল। ওদের দুজনের ঝগড়া যেন আরও বড় আকারে লাগবে এবার। সামিয়া আর নাজমিনের হাসতে হাসতে মরে যাবার মতো অবস্থা। তারা না পারছে সহ‍্য করতে আর না পারছে দুজনকে থামাতে।

ঘড়িতে সময় বিকাল ছয়টা। সুমু বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সবগুলো ফুল গাছে পানি দিচ্ছি। শেরাজ সারবাজের ঘরে গেছে নিউ শপ ওপেনিং নিয়ে আলোচনা করতে। সুমু খুব যত্নসহকারে ফুল গাছগুলোর যত্ন নিচ্ছে। হঠাৎ রোজা চুপচাপ সুমুর পেছনে এসে দাঁড়াল। হাতে কফির কাপ, ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি, চোখে সেই অতল ঈর্ষা। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমাকে দেখে বোঝা যায় না যে, তুমি এই রকম জায়গায় ফিট করো না।”
সুমু চমকে ওঠে পেছনে তাকায়। রোজা আবারও বলল,
“এই সো-কলড ‘স্মার্টনেস’ আর ‘সিম্পল লুক’ হয়তো এস.কের এখন ভালো লাগছে, কিন্তু ক্লাসি টেস্ট মানে তো শুধু মুখ নয়, মাইন্ডও তো লাগে, তাই না?”
সুমু এবার একটু ফ্যাকাসে মুখে তাকাল। তার চোখে ব্যথা। কিন্তু মুখে একটা শান্ত হাসি এনে বলল,
“মানুষের চোখে না ফিট হলেও, হৃদয়ের জায়গাটা কিন্তু অনেক বড়। তাতে সবাই ফিট হতে পারে না, রোজা আপু। আমার মতে, মানুষের চোখে ফিট সবাই হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ে কয়জন ফিট হতে পারে?”
রোজা তাচ্ছিল্য করে হাসি দিয়ে বলল,

“প্রথমদিন তোমাকে এস.কের পাশে দেখে ভেবেছিলাম, তুমি খুব সহজ-সরল, এই বাড়িতে দু’দিনও টিকতে পারবেনা। কিন্তু এখন তো দেখছি, দিব্যি নিজের মতো করে সব জায়গায় চলাফেরা করো।”
সুমু এক মুহূর্ত চুপ। ঠোঁটের কোণায় হালকা হাসি রেখে বলল,
“সময় মানুষকে বদলায়, রোজা আপু।”
রোজা হেসে ওঠে, কণ্ঠে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ে।
“বদলায় হয়তো। কিন্তু কিছু মানুষ যতই বদলাক, তাদের রুচি আর আসল জায়গা বদলায় না। কারো দয়া আর সহানুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভালোবাসা কতদূর যাবে, জানো তো?”
সুমুর মুখে স্থিরতা। সে ধীরে বলল,
“ভালোবাসা যদি সহানুভূতি হয়, তবে ঈর্ষা কি আত্মমর্যাদার চিহ্ন?”
রোজা থমকালো। সে বেলকনিতে থাকা ফুলগাছগুলো দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই ফুলগুলো যেমনই সুন্দর, তেমনি তুচ্ছ। একদিন শুকিয়ে যাবে। ঠিক তোমার মতো।”
“আপনি ফুলকে তুচ্ছ বললেন, মানে নিজের রুচির পরিচয় দিলেন। মানুষ যা বোঝে, তা নিয়েই তো কথা বলে।”
রোজা ব্যঙ্গ করে হাসল।

“তুমি আসলে নিজের জায়গাটা ভুলে গেছো। এই খান ম্যানশনের আলো, হঠাৎ এসে তোমার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে, বুঝতে পারছো না তুমি এখানে একজন ভিজিটর মাত্র।”
সুমু এবার রোজার মুখোমুখি দাঁড়াল।
“আপনার কথায় একটা জিনিস বুঝলাম, আপনি নিজের জায়গা নিয়ে খুব অনিশ্চিত। তাই অন্যের আত্মবিশ্বাসে এত ভয় পান।”
রোজার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। সুমু আবারও বলল,
“আমি এখানে কোনো আলো কাড়তে আসিনি, রোজা আপু। আলো জ্বলে, যেখানে ভালোবাসা থাকে। সেটা কেউ নিজে না জ্বালালে, কারো কাছ থেকে ধারেও পাওয়া যায় না।”

রোজা এবার একদম নীরব। গলার কাছে যেন কিছু আটকে গেল। সুমু আবার নিজের কাজে মন দিয়ে বলল,
“আমার কথায় কষ্ট পাবেন না। আপনি এখানে এসেছেন আমাকে অপমান করে, ছোট করে কথা বলতে। আপনার কথা আগুনের শিখার মতো উত্তপ্ত। আমি শুধু সেই উত্তপ্ত শিখার তেজ বাড়ানোর জন‍্য কেরোসিন ঢেলেছি।”
রোজা কিছু বলতে নিবে, তখনই পেছন থেকে অনন‍্যা খাতুন বললেন,
“তুই এইখানে? আর আমি তোকে সারা বাড়ি খুঁজছি।”
কথাটা বলে অনন‍্যা খাতুন শেরাজের রুমটা একবার পরখ করে বললেন,
“আমার রোজাকে দেখো, কেমন গর্ব হয় ওকে দেখে। আমার বংশের রক্ত ও। শেরাজের জন্য এমন একটা মেয়েই দরকার ছিল। একটা কোরিয়ান-আফগানি-ওমানি মেয়ের মধ্যে যেমন শালীনতা আর গ্ল্যামার দুই-ই থাকে। সব আমার রোজার মধ্যে আছে।”
রোজা আলতো হাসল। অননা খাতুন আবারও বললেন,

“কিন্তু আমার কপাল দেখো, কোথাকার একটা মেয়ে, আমার ঘরের বউ হয়ে বসে আছে। কে জানে কেমন রক্ত। ওদের দেশে তো সবকিছুই একটু বেশি সহজ মনে হয়। এত সহজে বিয়ে হয়? এত সহজে বউ হওয়া যায়?”
সুমু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। রোজা বাঁকা হেসে বলল,
“ও একবারও ভাবল না, এস.কের পাশে ওকে মানায় কি’না।
“আরে বড়লোক ছেলে দেখলে কার মাথা ঠিক থাকে বল?”
“তোমার রক্ত, তোমার গর্ব– সবই তোমার জায়গায় ঠিক আছে, মম। কিন্তু একটা কথা মনে রাখো, যার হাত আমি নিজের হাতে ধরে নিয়ে এসেছি, তার মানে আমি পুরো পৃথিবীর সামনে বলতে পারব, ও আমার জন্য বেস্ট। তুই হয়তো বউ পছন্দ করো রক্ত দেখে, আমি করি হৃদয় দেখে।”
ঘরে পিনপতন নীরবতা। শেরাজ এগিয়ে এসে সুমুর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

“সুমু আমার স্ত্রী। আমার দায়িত্ব ওর সম্মান রক্ষা করা। তুমি যদি তাকে এই পরিবারের একজন ভাবতে না পারো, তাহলে ভাবার দরকার নেই। কিন্তু আমি আগেও বলেছি, ওর অপমান আমি সহ্য করব না। আর রোজা তুই, তোর মতো ফালতু মেয়ে আমার পাশে দাঁড়ানোরও যোগ্যতা রাখেনা। আমি চাইলে তোর করা অপমানের উত্তর দিতে পারতাম। কিন্তু তোর সাথে কথা বলতে আমার রুচিতে বাঁধে।”
অনন্যা খাতুন রাগে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে রোজার হাত ধরে রুম ত‍্যাগ করলেন। শেরাজ সুমুকে নিজের দিকে ঘোরাল।
“তোমাকে কতোবার বলেছি, কেউ অপমান করলে চুপ করে না থাকতে।”
“উনি আপনার মা। আমি ওনার সাথে বেয়াদবি করতে পারব না। এতে ওনার সম্মান নষ্ট হবে।”
“এইটা বেয়াদবি না। আর কেউ যদি তার সম্মান নিজে ধরে রাখতে না পারে, তাহলে তোমার কোনো দায়ভার নেই সে সম্মান ধরে রাখার। উনি আমার মম বলে, উনি যা তা বলবেন আর তুমি সহ‍্য করে যাবে?”
সুমু প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,

“আপনি না কাজের কথা বলতে গেলেন?”
শেরাজ তাচ্ছিল্য করে হাসি দিয়ে বলল,
“টপিক চেঞ্জ করতে চাইছো? গুড, ভেরি গুড! রিয়াজ আমাকে বলেছে, মমের এই ঘরে আসার কথা। আর তাই আমি দেখতে এলাম, তোমার প্রতি আমার মমের ভালোবাসা।”
সুমু আর কোনো কথা বলল না। শেরাজ মৃদুস্বরে বলল,
“রেডি হয়ে নাও, আমাদের বেরোতে হবে।”
কথাটা বলে রুম ত‍্যাগ করল শেরাজ। সুমু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বোরকা পরে রেডি হয়ে নিল। তারপর সকলে মিলে বেরিয়ে পড়ল শেরাজের নিউ শপের উদ্দেশ্যে।

গাড়ি এসে থামল শপের সামনে। সকলে মেনে দাঁড়াল। একটু পরেই ওপেনিং হবে। শেরাজ সুমুকে তার সাথে যেতে বলল। সুমু আলতো হেসে বলল,
“আপনার সবকিছুই আমার, তাই আলাদাভাবে আমাকে যেতে হবেনা। আপনি শুরু করুন। আমি সর্বদা আপনার পাশে আছি।”
শেরাজ আর জোর করল না। সে আলতো হেসে বলল,
“ওকে, তাহলে তুমি আর ইশিতা রিয়াজদের সাথে থাকো। ওপেনিং হয়ে গেলে আমি এসে তোমাদের ভেতরে নিয়ে যাব।”
সুমু মাথা নাড়ল। শেরাজ মুচকি হেসে চলে গেল। সুমু দেখছে তার খান সাহেবকে। কতটা সুদর্শন লোকটা, পরনে আজ কালো পাঞ্জাবি, চোখেমুখে কতো খুশি। সুমুর তাকিয়ে থাকার মাঝে উল্লাসের শব্দশুনে ধ‍্যান ভাঙলো তার। শেরাজ কাচি দিয়ে নীল রঙের ফিতা কেটে ভেতরে ঢুকল। সকলে হাততালি দিয়ে ভেতরে ঢুকল।
সুমু মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ এগিয়ে এলো সুমুর কাছে। সে ফিরোজাকে কোলে তুলে নিয়ে একহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৩৮ (২)

“চলো সুইটহার্ট!”
সুমু শেরাজের হাতের ওপর হাত রাখল। ধীর পায়ে এগিয়ে চললো তার খান সাহেবের সাথে। রিয়াজ, ইশিতারা ভেতরে চলে গেছে। শেরাজ ভেতরে পা রাখতেই ফিরোজা কোল থেকে নেমে গেল।

খান সাহেব পর্ব ৩৯ (২)