Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৪৯

খান সাহেব পর্ব ৪৯

খান সাহেব পর্ব ৪৯
সুমাইয়া জাহান

বাইরে তখন ঝরঝরে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশটা কালো। বিদ্যুৎ মাঝে মাঝে ঝলক দিয়ে আলোকিত করছে চারদিকে। খান বাড়ির সামনে এসে ধীরে থামল শেরাজের গাড়ি। গাড়ির গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে জানালার ওপর ছন্দহীন শব্দ তুলছে। গাড়ি থামতেই দরজা খুলে গেল। শেরাজ নীরবে ঝুঁকে পড়ল সামনের সিটের দিকে। আলতো হাতে সে সুমুকে কোলে তুলে নিল। সারবাজ গাড়ি থেকে বেরিয়ে দরজা খুলে দিল। শেরাজ সুমুকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। সুমুর মাথাটা শেরাজের বুকে হেলে আছে।

শেরাজ এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হালকা বৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছিল তাদের দুজনকে। সেদিকে শেরাজের কোনো হেলদোল নেই, সে নির্বিকার। চেহারায় ছিল দৃঢ়তা আর গভীর একটা চিন্তার ছাপ। কে যেন তাকে ব্যথা দিচ্ছে, আর সেই ব্যথার মূলে রয়েছে সুমুর ক্লান্ত, নিস্তেজ মুখটা। বাড়ির বিশাল গেট অটোমেটিক খুলে গেল। ভেজা পায়ের ছাপ রেখে রেখে শেরাজ হাঁটছিল করিডোর পেরিয়ে নিজের রুমের দিকে।
নিজের রুমের সামনে এসে ডান পা দিয়ে ধাক্কা মেরে দরজা খুলে ফেলল সে। ঘরের ভেতরে নরম আলো। রুমের প্রতিটা পর্দা বাতাসে উড়ছে। রুমের দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের উষ্ণতায় একটুখানি আরাম পেল শেরাজ। সে সুমুকে বিছানায় শুইয়ে দিল যত্ন করে। বাইরের বৃষ্টির শব্দ যেন জানালার কাচ ছুঁয়ে নেমে আসছে ভিতরের নিস্তব্ধতায়।

সুমুকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে একবার সুমুর মুখের দিকে তাকাল সে। চোখ বন্ধ, ভেজা চুল ঘাড়ে ছড়িয়ে আছে, শরীরটাও ভেজা কাপড়ের ফলে কাঁপছে হালকা করে। মুহূর্তেই একটা অস্থিরতা ছড়িয়ে গেল শেরাজের বুকজুড়ে। সে দ্রুত নিজের ভেজা প্যান্টটা পাল্টে নিল, যেন তাড়াতাড়ি সুমুর যত্ন নিতে পারে। কাবার্ড খুলে একটানা খোঁজা-খুঁজির পর নিজের একটা ধূসর টি-শার্ট বের করল, সাথে একটা ট্রাউজার। টি-শার্ট আর ট্রাউজার নিয়ে বেডের কাছে এলো সে। বিছানায় বসে সুমুর গায়ে হাত রাখতেই টের পেল সুমুর ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া শরীরটা কাঁপছে। শেরাজ নিঃশব্দে সুমুর পরনের ভেজা শার্টের বোতামগুলো খুলে ফেলল একে একে। চোখে কোনো প্রত‍্যাশা নেই, আছে শুধু একটা গভীর যত্ন, দায়িত্ব, আর ভালোবাসা। ভেজা ট্রাউজারটাও সরিয়ে, সাবধানে সুমুর গায়ে পরিয়ে দিল শুকনো টি-শার্টটা। ট্রাউজারটাও গুছিয়ে পরিয়ে দিল ধীরে ধীরে। সারা সময়টায় সুমু কখনো একটু একটু কেঁপে উঠছিল, কখনো শ্বাসটা হালকা জোরে পড়চ্ছিল। শেরাজ সুমুর চুলের ভেজা অংশ আলতো করে তোয়ালে দিয়ে মুছে দিল। ব্লাঙ্কেট দিয়ে সুমুর সারা শরীর ঢেকে দিল। ভেজা জামাকাপড়গুলো ওয়াশরুমে রেখে এসে নিঃশব্দে সে সুমুর পাশেই বসল। একটু ঝুকে সুমুর কপালে গভীর স্পর্শ একেঁ দিল।
বাইরের ঝরঝর বৃষ্টি তখনো থামেনি। কিন্তু ঘরের মধ্যে এক আশ্চর্য শান্তি যেন পুরো দুনিয়া থেমে গেছে সুমুর নিঃশ্বাসের তালে।

নিশুতি বৃষ্টির রাত পার করে ভোরবেলা যখন প্রথম আলোটা জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়, তখন ঘরটা এক অন্যরকম কোমল আলোয় ভরে যায়। কাচের জানালায় জমে থাকা জলের ফোঁটাগুলো রুপালি হয়ে ঝিকমিক করছে। পেছনে ধীর লয়ে চলতে থাকা ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর মাঝে মাঝে দূরে থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক, সব মিলিয়ে যেন কোনো ছবির মতো শান্ত এক সকাল।
সুমু ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। চোখের পাতা এখনো কিছুটা ভার। ঠোঁটের কোণে ঘুমভাঙা একটা হাসি। চারদিক দেখে বুঝে নিতে সময় লাগে একটু। নিজের গায়ে ব্লাঙ্কেট জড়ানো, চুল শুকিয়ে গুছিয়ে রাখা, গায়ে পরা টি-শার্ট আর ট্রাউজারে কার যেন চেনা গন্ধে ভরা। সুমুর কপালে একফোঁটা ঘাম জমেছে, শরীরটা একটু গরম মনে হচ্ছে তার, কিন্তু ভয়ের কিছু নেই, বরং চারপাশের উষ্ণতা তাকে আশ্বস্ত করল।
সুমুর চোখ গেল পাশে। সেখানে একহাত গুটিয়ে, চোখ বন্ধ করে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে শেরাজ। মুখে এক অদ্ভুত শান্তি, যেন রাতজেগে পাহারা দিয়েছে তার ভালোবাসাকে। সুমু ধীরে ধীরে উঠে বসল। চুলগুলো একটু এলোমেলো, মুখে হালকা ক্লান্তি। এক মুহূর্ত পরেই শেরাজের চোখ খুলে গেল। সেই একই তাড়াহুড়া নেই আজ, বরং এক প্রশান্ত বিস্ময়ে বলে উঠল,

“সুইটহার্ট, ভালো লাগছে এখন?”
সুমু মাথা নেড়ে একটা মৃদু হাসি দিল। একটু কাঁপা গলায়, চোখে তৃপ্তির দৃষ্টি নিয়ে বলল,
“আপনি সারারাত জেগে ছিলেন?”
শেরাজ প্রথমে কোনো উত্তর দিল না। সে সুমুর মাথায় হাত রেখে বলল,
“তোমাকে ছাড়া ঘুম হয়?”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস যেন দুজনের মাঝখানে ছড়িয়ে পড়ল। বাইরের তখন আলো আরও উজ্জ্বল হচ্ছে। পাখিরা জোরে গান গাইছে। সুমু ধীরে ধীরে শেরাজের কাঁধে মাথা রাখল। শেরাজ নিজের বাহুতে জড়িয়ে নিল সুমুকে।
রোদটা জানালার পর্দা ছুঁয়ে বিছানায় ছড়িয়ে পড়েছে। চারদিকে একরাশ শান্তির আবরণ। সুমু গায়ে মোটা ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে বসে আছে শেরাজের কাঁধে মাথা রেখে। হঠাৎ সুমুর চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। মুখটা কেমন স্থির হয়ে গেল। দৃষ্টি যেন জমে গেছে অনেক দূরে কোথাও। তার মনে কিছু একটা এসে ধাক্কা দিয়েছে। কোনো পুরনো স্মৃতি, কোনো অব্যক্ত ভাবনা, অথবা ভেতরের অনিশ্চয়তা। সে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ান। বেডে থেকে নেমে কয়েক কদম পেছনে সরে গেল। তার পায়ের শব্দ খুব হালকা, যেন না চাইতেই দূরত্ব তৈরি করছে। শেরাজ কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল।

“সুমু?”
সুমু কোনো উত্তর দিল না। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তাকিয়ে রইল, যেন বাহিরের নীল আকাশ, ভেজা গাছের পাতা আর দূরের রোদে চোখ রেখে সে কিছু একটা খুঁজছে। শেরাজ অনেকক্ষণ তাকিয়ে লইল তার দিকে। নিচু গলায় বলল,
“আই এম সরি, সুইটহার্ট।”
শেরাজের কণ্ঠে কোনো রাগ নেই, আছে শুধু একরাশ বোঝাপড়া আর ক্লান্তি। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে সে চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। বাড়তি কোনো শব্দ না করে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। সে ধীরে ধীরে সুমুর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। খুব কাছে নয়, স্পর্শের করা থেকে একফোঁটা দূরে। তার চোখ সুমুর কাঁধে। তার সুমুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা হলো। কোনো কথা ছাড়ায় সে পেছন থেকে শক্ত করে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। শেরাজের ছোঁয়া চোখ বন্ধ করে অনুভব করল সুমু। শেরাজ সুমুর কাঁধের ওপর থেকে একটুখানি টি-শার্টটা সরিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল। সুমুর চোখের পলক পড়ল না। গাল বেয়ে একটা ছোট্ট অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে নামল।

ঘরের মধ্যে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কিন্তু এবার সেই নীরবতায় একটা অজানা অপেক্ষা আর একটা গভীর টানাপোড়েন জড়িয়ে রইল। নিঃশব্দ ঘরের সেই মুহূর্তে, একটা অদ্ভুত ভার এসে পড়ল দুইটা মানুষের নিঃশ্বাসের মাঝে। সুমু একটুও নড়ল না। শেরাজের স্পর্শে তার শরীর কেঁপে উঠল না, বরং আরও নিঃশব্দ হয়ে উঠল, যেন এই ছোঁয়ার মধ্যে কত না বলা কথা, ভাঙা বিশ্বাস, না পাওয়া স্বপ্ন জমে আছে। শেরাজ একটু সময় নিয়ে ধীরে বলল,
“তুমি দূরে চলে যাচ্ছো, সুইটহার্ট। আমার থেকে নয়, নিজের থেকে।”
সুমুর ঠোঁট কাঁপছে। সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দেরা গলায় আটকে গেছে। গিলতে চায় কান্নাটা, কিন্তু তার গলার গভীরে আটকে ফেলে একবুক ভরা কষ্ট। শেরাজ আরেকটু কাছে এলো। তার কণ্ঠ এবার আরেকটু গভীর হলো।
“আমি ভুল করেছি, তুমি শাস্তি দাও। কিন্তু, এভাবে নিজেকে সরিয়ে নিও না প্লিজ, সুমু।”
সুমু চোখ বন্ধ করে একটু ঘাড় ঘোরাল, যেন শুধু শোনার জন্য। তার গাল এখনও ভেজা। শেরাজ সুমুর মুখের পাশের পানির রেখায় আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিল খুব ধীরে। সুমু মৃদু কন্ঠে বলল,

“পরশু রাতটা আপনি ভুলে গেছেন? আমি তো সেই রাতেই পর হারিয়ে গিয়েছি।”
শেরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার কণ্ঠ আরও নরম হলো। সে অপরাধীরন‍্যায় বলল,
“তুমি হারিয়ে যেতে পারো না, কারণ তুমি আমার হৃদয়ের ঠিক মাঝখানে আছো। আমি তো তোমাকে ছাড়া কিছু বুঝি না। তোমার কি সত্যি মনে হয়, আমি সেই রাতে নিজের ইচ্ছে থেকে ওসব করেছি?”
সে সুমুকে মুখোমুখি করে দাঁড় করাল। দু’হাত দিয়ে ধরে রাখল সুমু কাঁধ। চোখে চোখ রেখে বলল,
“নিজের বেঁচে থাকার কারণটাকে আমি নিজ হাতে দূরে সরিয়ে দিব, এমনটা তুমি ভাবলে কীভাবে?”
সুমু এবার একটু নড়ল। তার চোখের কোনায় আবছা একরাশ কোমলতা ভেসে উঠল। সে জবাব দিল না, শুধু ধীরে মাথা নিচু করে শেরাজের বুকে মুখ গুঁজে দিল। শেরাজ সুমুর চুলে হাত রাখল। বুক ভরে সুমুর চুলের ঘ্রাণ টেনে নিল। জানালার বাইরের রোদটা ধীরে ধীরে সরে এসে ওদের গায়ে লাগল। নরম আলোয় দুটো মানুষ দাঁড়িয়ে রইল একটানা চুপ করে। এই নীরবতাই হয়তো তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বোঝাপড়া।
শেরাজের বুকে মুখ গুঁজে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সুমু। হঠাৎই সে কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,
“পরশু রাতে আপনি নিজেই তো আমায় সরে যেতে বলেছিলেন, খান সাহেব। বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলেন, মনে নেই?”

সে চোখ তুলে তাকাল। চোখের মণি দুটো ফ্যাকাসে, যেন ভেতরের কোনো ভয় জেগে উঠেছে। সে ভীতু গলায় বলল,
“তারপর কিছু লোক আমাকে মারতে চেয়েছিল। এরপর কী হয়েছিল আমি জানি না। কিছুই মনে নেই আমার। আমি এখানে আবার কীভাবে এলাম? কখন এলাম? কিছুই জানি না আমি?”
সুমুর কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো। চোখের কোনা আবার ভিজে উঠল। সে খুব কষ্টে কান্নাটাকে গিলে বলল,
“আমি শুধু জানি, অনেক অন্ধকারের মধ্য দিয়ে এসেছি আমি। কিন্তু কীভাবে ফিরলাম, আপনি আমাকে বলুন।”
শেরাজ পুরো স্তব্ধ। তার মুখ কঠিন হয়ে এলো, কিন্তু চোখে জমে উঠল যন্ত্রণার ছায়া। সে সুমুকে ছেড়ে দিয়ে মেঝের ওপর হাঁটুমুড়ে বসল। সুমুর পেটের ওপর ঠোঁট ছুঁইয়ে প্রসঙ্গে পাল্টে বলল,
“আমার চ‍্যাম্পরা আসছে, সুইটহার্ট?”

হঠাৎ শেরাজের চোখ গেল সুমুর হাতের দিকে। শেরাজ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল। সুমুর হাতে কাটা দাগটা যেন তার চোখে আগুনের মতো জ্বলে উঠল। হঠাৎ বুকের ভেতর থেকে এক অজানা কাঁপুনি উঠল তার। শরীর কাঁপছে, নিঃশ্বাস আটকে আসছে। গলা থেকে এক ফিসফিস কণ্ঠ বেরিয়ে এলো তার।
“তোমার হাত? আমার জন্য…”
সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। নিজের হাতের দিকে তাকাল। অকস্মাৎ পাগলের মতো উঠে দাঁড়াল। বেড সাইড টেবিল থেকে একটা ধারালো ছুরি তুলে আনলো। হাতে ধরে কাঁপতে কাঁপতে সুমুর সামনে আবারও হাঁটুমুড়ে বসে গেল। ছুরিটা সুমুর হাতের মুঠোয় গুঁজে দিয়ে কেঁপে ওঠা গলায় বলল,
“নাও, নাও এই ছুরি। আমাকে আঘাত করো। আমি তোমায় আঘাত করেছি। আমি যে নিজের কলিজাকে ছিঁড়ে ফেলেছি।”
শব্দগুলো অস্পষ্ট হয়ে গেল তার। তবে কঠোর মনের শক্ত মানুষ বিধায় চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল না তার। সে অপরাধীরন‍্যায় আবারও বলল,
“তুমি চাইলে এই ছুরি আমার গলায় চালাতে পারো বা বুকের মধ্যে চালাতে পারো। আমি আর পারছি না, সুইটহার্ট। আমি বাঁচতে পারছি না। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।”
সুমুর হাত টেনে ছুরিটা গলার কাছে নিয়ে গেল নিজেই।

“আমি তো তোমাকে মেরেই ফেলেছিলাম প্রায়। আমি আমার পৃথিবীটাকে নিজেই শেষ করে দিয়েছি। এখন আমাকে শেষ করো, প্লিজ। আমাকে মেরে দাও। এই যন্ত্রণা, এই মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে আমায় মুক্তি দাও।”
সুমুর মধ্যে যেন সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল। সে ছুরিটা ঝটকা দিয়ে ফেলে দিল মেঝেতে। সে মেঝেতে বসে দুই হাতে শেরাজের মুখটা ধরে বলল,
“না, না! আপনি এসব বলবেন না। খান সাহেব, প্লিজ, এসব বাজে কথা বলবেন না।”
সুমুর কণ্ঠ ভেঙে এসেছে। চোখ ঝাপসা হয়ে এসছে।। শেরাজের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল সে। শেরাজ সুমুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমি নিজের হাত দিয়েই তোমার গায়ে আঘাত করেছি। আমি কেমন পুরুষ? কেমন স্বামী? যে রাগের মাথায় নিজের স্ত্রী হোক বা একজন মহিলার সাথে ঠাণ্ডা মাথায় আচরণ করতে পারিনা। আমি মানুষই না। আমি তো পশুও না। আমি একটা অভিশপ্ত, নীচ, জঘন্য মানুষ। আমি তো মরারও যোগ্য না।
একটা শুকনো হাসি এলো শেরাজের ঠোঁটের কোণে। নরম দৃষ্টিতে সুমুর দিকে তাকিয়ে দেখল। ঠোঁটে কোণে হাসিটা নিয়ে আবারও বলল,

“ছুরিটা একটু চালিয়ে দাও না, সুইটহার্ট। আমি যেন শেষ হয়ে যাই। আমি যেন চোখের সামনে তোমার যন্ত্রণা মাখা মুখটা না দেখি আর। আমি যে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না কোনোদিন।”
সুমু ফুঁপিয়ে উঠল। মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল। শেরাজ সুমুর মাথায় ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“একে তো বউকে আঘাত করে পাপের শেষ নেই আমার। এখন আবারও বউ আমার কাঁদছে। এতো পাপের শান্তি কি আমি সহ‍্য করতে পারব? মৃত্যু কি পারবে এই পাপের যোগ্য শাস্তি হতে? তাহলে তুমি আমাকে মৃত্যু দাও।”
সুমুর সামনে তখন আর শক্তিশালী শেরাজ খান নেই, আছে এক ছিন্নভিন্ন, ভেঙে যাওয়া, বুকের ভেতর আগুনে পোড়া এক অসহায় পুরুষ। যে নিজের ভালোবাসার মানুষটার কাছে মরণ ভিক্ষা চাইছে। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল। তাদের কথার মাঝে শুধু একটানা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ ভেসে আসে।
সুমু মাথা তুলে কাঁপা গলায় বলল,

“আপনি এসব বলবেন না, খান সাহেব। আপনি ভাবছেন আমি কষ্ট পেয়েছি? না খান সাহেব। আমি আপনাকে জানি। আপনি এসব ভাববেন না। সবকিছু ঠিক আছে। আমি ঠিক আছি। আমি আছি আপনার পাশে। আমি কষ্ট পাইনি।”
শেরাজ একটুও নড়ল না। হঠাৎ দরজায় নক পড়ল। সুমু চমকে উঠল। উঠে দাঁড়াতে গেল। শেরাজ সুমুর হাত ধরে বেডে বসিয়ে দিয়ে বলল,
“থাকো, আমি দেখছি।”
বেডের ওপর থেকে ওড়নাটা নিয়ে ভালো করে সুমুর গায়ে জড়িয়ে দিল। একবার চেয়ে দেখল সুমুকে। ভাঙা একটা হাসি ঠোঁটে টেনে নিল ঠোঁটে। নিজেই গিয়ে দরজা খুলে দিল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে বাড়ির প্রতিটা মানুষ। দরজা খোলার সাথেই অনন্যা খাতুন ছুটে ভেতরে ঢুকে এলো।
“সুমু মামনি!”

তিনি সুমুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন। ইশিতা ও ছুটে এসে সুমুর পাশে বসল। সাহাবাজ সাহেব এসে সুমুর মাথায় হাত রেখে অনন‍্যা খাতুনকে চোখ দিয়ে শান্ত থাকতে বললেন। তিনি মায়া ভরা কন্ঠে বললেন,
“এখন থেকে নিজের খেয়াল রাখবে বেশি বেশি। আর আমার ছেলে তোমাকে কিছু বললে, আমাকে এসে বলবে। আমি শাস্তি দিব আমার ছেলেকে।”
সাহাবাজ সাহেবের কথার মধ্যে অনন্যা খাতুন শেরাজকে বাহিরে টেনে আনলেন। তিনি শেরাজের দিকে তাকিয়ে আদেশের সুরে বললেন,
“খান পরিবারের বউয়ের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস যে করেছে, তার কলিজা ওজন আমি নিজে মেপে দেখতে চাই। তার নাম, ঠিকানা, গোত্র সব মুছে ফেল। আমার পুত্রবধূর চোখে এক একফোঁটা পানির মূল্য, রক্ত দিয়েই দিতে হবে।”
শেরাজ মাথা তুলে তাকয়। চোখ লাল তার। অনন্যা খাতুন রাগিস্বরে বললেন,

“এই অপমান আমি সইব না। এই ঘরের বউয়ের চোখের জল আমি সইব না। তুই ওই নোংরা রাস্তার কুকুরটাকে আমার পায়ের নিচে এনে ফেলবি। ওর কলিজা ছিঁড়ে বের করে এনে দিবি। আমি নিজের হাতে মেপে দেখব, এত সাহস কার হলো, যে খান পরিবারের দিকে তাকায়? এই পরিবারের কারো দিকে হাত বাড়ালে তাকে মরণ ঘরে পৌঁছে দিতে কত সময় লাগে, সেটা দেখিয়ে দে। আমার আদেশ, কোন মাফ নেই, কোন ক্ষমা নেই। দয়া দেখাস না, একটুও না। এই পরিবারের বউয়ের দিকে হাত বাড়ালে কেউ ছাড় পায় না, সেটা বুঝিয়ে দে।”
শেরাজ চোখের পাতা কাঁপছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে মাথা নত করে বলল,
“তার কলিজা ছিঁড়ে আমি তোমার পায়ের নিচে এনে ফেলব, মম। তুমি আদেশ দিয়েছো। রক্তের বন‍্যা বয়ে যাবে এবার।”
অনন্যা খাতুন মাথা নাড়লেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বললেন,
“এটাই চাই। সবাই দেখুক, খান পরিবারের রক্ত কিভাবে জ্বলে ওঠে।”

ঘরের ঠিক মাঝখানে চেয়ারটায় বসে আছে রায়য়ান চৌধুরী। পায়ের নিচে এলোমেলো পড়ে আছে সিগারেটের ছাই, ভাঙা কাচের টুকরো, আর একটা ফেলে দেওয়া হুডি। ডানহাতে হুহস্কির একটা আধভর্তি বোতল। আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে গ্লাসের গায়ে টোকা মারছে টুপটাপ শব্দ তুলে। বা’হাতটা চেয়ারের হাতলে ঝুলে আছে অলসভাবে। চেয়ারে বসে ধীরে ধীরে ঘুরছে সে, একবার সামনে, একবার পেছনে। চোখে একটা অদ্ভুত নিষ্ঠুর খেলা, ঠোঁটের কোনে হালকা বাঁকা হাসি।
ঘরের একপাশে পিলার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মাহিন। চোখমুখ ঘামে ভিজে। কাঁপা কাঁপা চোখে চেয়ে আছে রায়য়ানের দিকে। বসের পরবর্তী পদক্ষেপ বোঝার আপ্রাণ চেষ্টা তার। রায়য়ান একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে হুহস্কির বোতলটা ঠোঁটে তুলল। ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে গলা ছেড়ে গাঢ় একগলা হাসি দিল। হাতের ঘড়িতে সময়টা চেক করে নিল। রায়য়ান নরম গলায়, ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের হাসি নিয়ে বলল,

“তুই ভাবছিস আমি এখন কি করব, তাই তো মাহিন?”
মাহিন গলার স্বর খুঁজে পেল না। শুকনো ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। রায়য়ান আবার বোতল হাতে ঘুরতে থাকে চেয়ারটায়। একসময় থেমে গিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ে বোতল দিয়ে ছোট্ট শব্দ তুলল। মাহিন শুকনো গলায় বলল,
“হঠাৎ করে আপনার প্ল্যান চেঞ্জ করার কারণ বুঝলাম না, বস।”
রায়য়ানের ঠোঁটের কোণে আবারও ঠাণ্ডা একটা হাসি খেলে গেল। বা হাত দিয়ে হুহস্কির বোতল টেবিলের উপর রাখল ঠক শব্দ তুলে। চেয়ারের হাতল ধরে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে কয়েক পা মাহিনের দিকে এগোলো। চারপাশে থাকা সকল পাহারাদার সতর্ক হয়ে দাঁড়াল। রায়য়ান মাহিনের চোখ বরাবর মুখটা নামিয়ে আনলো। চোখে তীক্ষ্ণ বিদ্ধ করা দৃষ্টি নিয়ে নরম গলায়, ঠাণ্ডা হেসে বলল,
“কিছু পেতে হলে, কিছু দিতে হয়। সবকিছু আমার ইচ্ছা মতোই চলছে। বেশি না, আর দু’ঘন্টা। তারপর দেখ, কি হয়?”
রায়য়ান সোজা হয়ে দাঁড়াল। আবার ধীরে পায়ে পায়ে নিজের চেয়ারটায় ফিরে গেল। বোতলটা তুলে নেড়ে নেড়ে দেখল। মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলল,
“আই নো, তোমার অনেক কষ্ট হবে। বাট আমাকে এইটা করতেই হতো।”
সে পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনের ওপর ভেসে থাকা একটা ঘুমন্ত মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন প্রাণভরে কাউকে দেখছে।

ঘরটা আলোয় ভরা। বাইরে দুপুরের ঝিম ধরা রোদ। রুমের ভেতর সুমু বিছানার মাঝে গুটিশুটি হয়ে কাঁপছে। পেটের ওপর দুই হাত চেপে ধরে রেখেছে। মুখ ফ্যাকাশে তার। ঠোঁট কামড়ে ধরে যেন কষ্ট চেপে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। হঠাৎ একটা কান্নার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল। শেরাজ দরজা ঠেলে রুমে ঢুকল। হাতে খাবার ভর্তি ট্রে’টা বেডসাইড টেবিলের ওপর রেখে ছুটে গেল সুমুর কাছে। শেরাজ গলা কাঁপছে। সে পাশে বসে সুমুর হাত ধরে বলল,
“সুইটহার্ট, কী হয়েছে? কাঁদছো কেনো? কোথায়ও ব্যথা করছে? প্লিজ, আমাকে বলো।”
সুমু দুই হাত পেটের ওপর চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে অনেক কষ্টে বলল,
“আমার পেটটা অসম্ভব ব্যথা করছে। আমি মরে যাব, খান সাহেব। আমি সহ‍্য করতে পারছি না। আমার বেবিটা… আমার বেবিটা, আমার বেবিটার কিছু হবে না তো, খান সাহেব? আমাকে বাঁচান। আমার বেবিটাকে বাঁচান।”
শেরাজ শিউরে উঠে সুমুকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরল। চোখ ফেটে পানি আসতে চাইছে, কিন্তু নিজেকে সামলে নিল সে। ভাঙা গলায় বলল,

“না! কিছু হবে না। আমি আছি। আমি কিছু হতে দিব না তোমাদের। কিছু হবেনা আমাদের বেবির, কিছু না। আমি থাকতে কিছু হবেনা তোমাদের।”
সুমুর কান্নার আওয়াজ শুনে সকলে ছুটে এলো। অনন‍্যা খাতুন আর আফিয়া খাতুন সুমুর কাছে এগিয়ে গেল। অনন‍্যা খাতুন চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“কী হয়েছে মামনির? এইভাবে কাঁদছে কেন? সুমু মামনি, কোথায় সমস্যা হচ্ছে তোমার?”
শেরাজ কাঁপা গলায় চিৎকার করে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৪৮

“গাড়ি বের করো। সুমুকে এখনই হসপিটালে নিতে হবে।”
সবার মুখে আতঙ্ক। সারবাজ নিচে দৌড়ে গেল গাড়ি বের করতে। আফিয়া খাতুন ফিসফিস করে সুরা পড়তে লাগল। সুমু ছটফট করছে, মুখ লাল হয়ে গেছে তার, নিশ্বাস কাঁপছে। শেরাজ তাকে কোলে তুলে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

খান সাহেব পর্ব ৫০