খান সাহেব পর্ব ৫০
সুমাইয়া জাহান
বাইরে তখন বিকালের শান্ত পরিবেশ। মেঘলা আকাশের নিচে শহরটা এখনো একটু হলেও চুপচাপ। হাসপাতালের করিডরের বাতিগুলো ফ্যাকাসে। শেরাজ বসে আছে চুপচাপ। তার চোখে লালচে ছাপ, মুখে ক্লান্তি, আর হৃদয়ের ভিতর টানা এক অস্থিরতা। হাসপাতালের সাদা দেয়ালগুলো যেন তার বুকের ভার আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ভেতরের আইভি-চলমান কক্ষে শুয়ে আছে সুমু, ঘুমন্ত আর নিঃশব্দ অবস্থায়। ফর্সা মুখটা ফ্যাকাসে, ঠোঁটের কোণ শুকিয়ে গেছে। হাতে স্যালাইনের পাইপ ঢোকানো। চোখের পাতাগুলো ভারি, যেন হাজার ফোটা অশ্রু জমে আছে সেখানে। পাশে মেশিনের টিক টিক শব্দ সুমুর বেঁচে থাকার প্রমাণ দিচ্ছে।
শেরাজ বারবার জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে, আবার ফিরে আসে। নার্স মাঝে মাঝে ভেতরে যাচ্ছে কিছু জিজ্ঞেস করছে আবার বেরিয়ে আসছে। শেরাজ চাতক পাখির মতো সুমুর কেবিনের দিকে তাকানো। খান বাড়ির আর চৌধুরী বাড়ির প্রতিটা সদস্য ইতিমধ্যে হসপিটালে উপস্থিত হয়েছে। সুমু প্রথম দিকে সকলের পছন্দের তালিকায় না থাকলেও, এখন সকলের ভালোবাসার আর পছন্দের শীর্ষে সে। আরিয়ান চৌধুরী ও এসেছিলেন, কিন্তু শেরাজ তাকে ঢুকতে দেওনি। সারবাজরা সকলকে বুঝিয়ে বাড়িতে পাঠিয়েছে। কিন্তু অনন্যা খাতুন, সাহাবাজ খান, রিয়াজ, ফিরোজা আর ইশিতাকে অনেক চেষ্টা করেও বাড়িতে পাঠানো সম্ভব হয়নি। সকলে খান বাড়ির বউ আর বংশধরের ভালো খবরের অপেক্ষায়।
সুমুর কেবিন থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এলো। সকলে তার কাছে এগিয়ে গেল। ডাক্তার সকলকে উপেক্ষা করে শেরাজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শেরাজ তাকিয়ে রইল ডাক্তারের দিকে।
“চিন্তার কিছু নেই। শরীর দূর্বল। মানসিক চাপও ছিল, কিন্তু এখন সেফ। কেবল ওনাকে মানসিক শান্তি দিতে হবে। এই মুহূর্তে সেটা সবচেয়ে বেশি জরুরি।”
শেরাজ মাথা ঝাঁকাল, কিন্তু নিজের ভিতরের অপরাধবোধটা যেন আরও গভীরে গিয়ে বসেছে। সে ভরসা পেল না ডাক্তারের কথায়। সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আমার কেনো জানি সবকিছু ঠিক লাগছে না। আপনি কি কিছু লুকাচ্ছেন?”
“মি. খান, আগে জানতাম নারীরা কোনো ভালো, খারাপ কিছুর পূর্বে ইঙ্গিত পায়। আজ আপনাকে দেখে বুঝলাম, পুরুষরাও বুঝতে পারে। আমার সাথে একটু আসবেন?”
শেরাজ চমকে উঠল। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে হাঁটতে শুরু করল ডাক্তারের পেছনে। দুজনে কেবিনে ঢুকে গেল। ডাক্তার বসতে বলল, কিন্তু শেরাজ দাঁড়িয়েই থাকল।
“বলুন ডক্টর, কী হয়েছে?”
ডাক্তার একটু দম নিয়ে বললেন,
“আপনার ওয়াইফ, ওনার মিসক্যারেজ হয়েছে। বেবিটা বাঁচেনি। আর তাছাড়া উনি মেবি বেবি নষ্ট করার জন্য মেডিসিন নিয়েছিলেন।”
শেরাজ মুহুর্তেই রেগে গেল। রাগিস্বরে বলল,
“আপনার মাথা ঠিক আছে? কি বাজে কথা বলছেন? আপনার কোনো আইডি নেই ও এই বেবিটার জন্য কতোটা এক্সাইটেড ছিল।”
“দেখুন মি. খান, আমরা ওনার অনেকগুলো টেস্ট করিয়েছি। আর তাতেই ধরা পড়েছে। রিপোর্ট তো আর ভুল বলবে না?”
“আপনার কপাল ভালো যে, আপনি একজন মেয়ে। নয়তো, এখানেই এই মুহুর্তে আপনার লাশ ফেলে দিতাম।”
“কাম ডাউন মি. খান। আগে আমাকে পুরোটা শেষ করতে দিন।”
সময় যেন থেমে গেছে। শেরাজের ঠোঁট কাপছে। চোখ স্থির, অথচ ভেতরটা থরথর করে কাঁপছে।
“আপনি এসব কী বলছেন ডক্টর?”
ডাক্তার চোখ নামিয়ে বললেন,
“আমি দুঃখিত, মি. খান!”
শেরাজ পেছনে হেলে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না তার। শুধু নিঃশ্বাসে ব্যথা প্রকাশ পায়, কিন্তু ডাক্তার তখনও থামেন নি।
“আরও একটা ব্যাপার আছে। এটা আরও সিরিয়াস।”
শেরাজের কণ্ঠ যেন ভেঙে এলো।
“আরও কী?”
ডাক্তার আস্তে বললেন,
“আমরা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার সময় দেখতে পাই, আপনার ওয়াইফের ইউটেরাসে একটি টিউমার আছে। জায়গাটা খুব সেনসিটিভ।”
শেরাজের মুখে এবার ভয় জমে গেল। সে কাঁপা গলায় বলল,
“কি বললেন? টিউমার?”
ডাক্তার মাথা নাড়লেন,
“যদি এটা আগে ধরা না পড়তো, এবং উনি গর্ভটা রাখতে চাইতেন, তাহলে ভবিষ্যতে মা এবং সন্তান, দুজনেরই জীবন হুমকির মুখে পড়তো। এক অর্থে এই মিসক্যারেজটা তাকে বাঁচিয়েছে।”
শেরাজ সামনে এগিয়ে এসে চেয়ারে বসে পড়ল। মাথা দুহাতে চেপে ধরে বলল,
“সেটা আমি ওকে কীভাবে বলব, ডক্টর? ওকে এখানে আনার সময় আমি কথা দিয়েছিলাম, ওর আর আমাদের বেবির কিছু হতে দিব না আমি।”
ডাক্তার খুব ধীরে বললেন,
“একজন মা তার সন্তানের জন্য নিজের জীবনও দিতে প্রস্তুত থাকে। এই অবস্থায় আপনি ছাড়া কেউ তাকে বোঝাতে পারবে না। তাছাড়া ভয় নেই। ঠিকমতো অপারেশন করতে পারলে, আপনারা একবছর পর আবারও বেবি নেবার প্ল্যানিং করতে পারবেন।”
“কথাটা শোনার পর আমার স্ত্রীর যা অবস্থা হবে, সেটা আমি সহ্য করতে পারব না, ডক্টর।”
“আপনি কি খুব ভালোবাসেন আপনার স্ত্রীকে?”
শেরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার ঠোঁটে একটা হালকা হাসি আর চোখে অতল গম্ভীরতা। নিচু গলায় বলল,
“ভালোবাসি? এই শব্দটা ওর জন্য ছোট। ওকে আমি শুধু ভালোবাসি না, ও আমার বুকের বা’পাশটায় থাকা জীবনটা। ওর নিঃশ্বাসের হিসাব রাখি আমি। ওই মানুষটাকে দেখলে আমার রাগ থেমে যায়। হাত শক্ত হয়ে এলেও ওর চোখের দিকে তাকালে সেই হাত নরম হয়ে যায়। আমি যদি কখনো মরেও যাই, তবু ওর হাতটা যদি অন্য কেউ ধরতে চায় আমার আত্মা কাঁপবে। এই পৃথিবীতে যতটা গভীরভাবে একজন পুরুষ কাউকে ভালোবাসতে পারে, তার চেয়েও লক্ষ কোটি গুণ বেশি আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি। তাই, ভালোবাসি বললে কম বলা হয়। আমি ওতে বাঁচি।”
ডাক্তার মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ আবারও বলল,
“আমি কখনও ওকে বলি না। কিন্তু প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাতে ওর মুখটা না দেখে আমি ঘুমাতে পারি না। ও যদি একদিন না হাসে, আমার সব কিছু থেমে যায়। অনেক কিছু হারিয়েছি জীবনে, কিন্তু ওকে পেলাম বলেই জীবনটার হিসেব মিলে গেল।”
ডাক্তার হালকা হেসে বললেন,
“আমি যতদূর জানি, আপনি খুব চুপচাপ মানুষ, কখনো কাউকে নিয়ে মুখ খোলেন না। আজ যখন বললেন, মনে হচ্ছে আপনি শুধু ভালোবাসেন না, আপনার স্ত্রীকে ভালোবাসা আপনার পেশা হয়ে গেছে। আপনার স্ত্রীর কপাল খুব ভালো। ওনার মতো এতটা গভীর ভালোবাসা পায় ক’জন?”
শেরাজ থেমে রইল কিছু সময়। সে তীব্র অথচ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“ভুল বললেন, ডক্টর। ওর কপাল ভালো না, আমার কপাল ভালো। ও এমন একটা মেয়ে, যে আমার জীবন ছুঁয়ে গেছে। আমি রাগি হতে পারি, জেদি হতে পারি, কিন্তু ওর সামনে আমি কিছুই না। ও একমাত্র মানুষ, যে আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। ও আমার স্ত্রী না হলে, হয়তো আমি এখনো পাথরই থাকতাম। ও আমাকে মানুষ বানিয়েছে। আর ওর জন্য, আমি পুরো দুনিয়ার বিরুদ্ধে যেতে রাজি। সোজা কথা, আমি শেরাজ খান, আর আমার অস্তিত্বে সুমাইয়া জাহান গেঁথে আছে। ব্যস, এইটুকুই যথেষ্ট।”
রিপোর্টটা হাতে নিয়ে শেরাজ কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। ডাক্তারের কেবিন থেকে বেরিয়ে আসার সময় শেরাজ আর আগের মতো রইল না, যেন সেই সিংহপুরুষ হারিয়ে গেছে। সে যেন এখন একটা খালি খোলস। যার ভেতরে বিসর্জিত হয়েছে শব্দ, শক্তি আর সাহস।
হাসপাতালের করিডর তখনো ফ্যাকাসে আলোয় ঢাকা, কিন্তু শেরাজের চোখে শুধু অন্ধকার।
সে ধীরে ধীরে হাঁটছে, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তাকে একশো বছরের পথের সমান অনূভুতি দিচ্ছে। সুমুর কেবিনের সামনে সকলে দাঁড়িয়ে। সুমুর অবস্থায় কথা ভালো শুনে অনন্যা খাতুন, সাহাবাজ খান, রিয়াজ, শাহরুখ আর ফিরোজাকে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
শেরাজকে দেখে সারবাজরা কাছে এলো। শেরাজ সকলকে উপেক্ষা করে দরজা ঠেলে সুমুর কেবিনে ঢুকল। সারবাজ কিছু বলতে নিলে আইয়ুব চোখের ইশারায় থামিয়ে দিল তাকে। কেউ বুঝতে পারছেনা শেরাজের বিষণ্নতার কারণ।
শেরাজ কেবিনে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিল। সুমু তখনো ঘুমে বিভোর। শেরাজ চেয়ারে বসে পড়ল। ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখল। চোয়াল শক্ত তার। ভেতরের কষ্ট যেন রক্তে ছড়িয়ে গেছে তার। সে সুমুর হাতে হাত রাখল। স্যালাইনের পাইপে বেয়ে নামা ফোঁটার মতো তার চোখের কোণে জমে থাকা কষ্টগুলো এবার গলে পড়তে চাইছে। সে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার খান সাহেব এবার তোমার জন্য শেষ হয়ে যাচ্ছে, সুইটহার্ট। তুমি যখন চোখ খুলবে, তখন আমি তোমাকে আর একটা কথাও মিথ্যে বলতে পারব না। কারণ, তুমি নিজেই বুঝতে পারবে তোমার…”
থেমে গেল তার কণ্ঠ। মাথাটা সুমুর পাশে বিছানায় রেখে নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে রাখল সে। একটু সময় নিয়ে সে আবারও বলল,
“আমি জানি না, তুমি আর কখনও হাসবে কিনা। তবে আমি প্রতিদিন নিজেকে ঘৃণা করব, যদি তোমার মুখে আবার সেই পুরনো স্নিগ্ধ হাসিটা না দেখি। কিন্তু, আমার কিছু করার নেই। কারণ এই শেরাজ খানের কাছে সুমাইয়া জাহানের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু না।”
টেবিলের ওপর রাখা ফাইলের নিচে বেরিয়ে আছে একটুখানি রিপোর্টের লেখা অংশ। শেরাজ সেটা হাতে নিয়ে আবারও দ্যাখে। ডাক্তারি এক একটা শব্দ এখন তার বুকে ধারালো ছুরির মতো জখম করছে। সে হালকা ঠোঁট নেড়ে পড়তে শুরু করল,
“এন্ডোমেট্রিয়াল টিউমার, পোস্টেরিয়র ওয়াল, আর্লি স্টেজ বাট হাই সেনসিটিভিটি। ইমিডিয়েট মেডিকেল অ্যাটেনশন রিকোয়ার্ড।”
ফাইলটা বন্ধ করল সে। আকাশের সূর্যটা তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে সোনালি হচ্ছে। জানালার ফাঁক গলে সূর্যের আলো এসে পড়ল সুমুর কপালে। হাসপাতালের জানালায় পর্দা একটু নড়ল। হালকা রোদ এসে পড়ল বেডের পাশের সাদা চাদরে। মনিটরের একটানা শব্দ হচ্ছে। সুমু ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল।
“খান সাহেব!”
শেরাজ নিজেকে গুছিয়ে বসল, যেন কেউ নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিল অনেকক্ষণ।
“সুইটহার্ট!”
শেরাজের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। সুমু তার দিকে তাকাল। ধোঁয়াশা চোখে, মুখে ফ্যাকাসে ছায়া তার। সে বোঝার চেষ্টা করছে সবটা।
“আমি কোথায়?”
শেরাজ সুমুর কপালে হাত রাখল। স্বর শান্ত রাখার চেষ্টা করল সে।
“তুমি হসপিটালে।”
সুমুর চোখের কোণে অজানা কষ্ট। সে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু গলার মধ্যে যেন শব্দ আটকে আছে।
“আমার বাচ্চা?”
একটা কাঁপা প্রশ্ন। শেরাজ চুপ। তার মুখের অভিব্যক্তি কঠিন। গলা শুকিয়ে আসছে। সে উঠে দাঁড়াল, জানালার দিকে হাঁটল। জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে বলল,
“ডাক্তাররা বলেছে, এখন শুধু তোমার সুস্থ হওয়াটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।”
“আমার বাচ্চা কোথায়?”
শেরাজ পেছন ফিরে না তাকিয়ে বলল,
“সেটা ছিল আমাদের স্বপ্নের শুরু।”
সুমু সোজা প্রশ্ন করল,
“আর এখন?”
“এখন তুমি আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ।”
সুমু আস্তে করে উঠে বসল। হঠাৎ সে কিছু একটা অনুভব করল। বা’হাতটা সে ছোঁয়াল তার স্পর্শকাতর স্থানে। হাতটা চোখের সামনে আনতেই সে চিৎকার করে উঠল। শেরাজ দৌড়ে এলো সুমুর কাছে। সে সুমুর কাঁপা শরীরটা নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। সে কিছু বলতে চাইল না, কারণ এই মুহূর্তে সব শব্দ যেন বড্ড বেমানান। সুমু কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“চুপ করে আছেন কেনো? বলুন না কিছু।”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার মুখে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, শুধু আছে নিঃশব্দ হাহাকার। সুমু ধীরে বলল,
“আমি কেমন মা, বলেন? একটা প্রাণ রাখতে পারলাম না। নিজের সন্তানকে ধরে রাখতে পারলাম না।”
তার কাছে এই মুহূর্তে নিজের শরীরটাই যেন অপরাধী। সে হাত পেটের দিকে ছুঁয়ে আবার কেঁপে উঠল। শেরাজ সুমুর হাত দুটো চেপে ধরল। তার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে।
“তুমি কোনো দোষ করোনি, সুমু।”
“আমি খালি হয়ে গেছি, খান সাহেব। আমার ভেতরটা শূন্য হয়ে গেছে।”
শেরাজ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“তুমি খালি নও, আমি আছি তো। তুমি আমার প্রাণ।”
সুমু ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার ঠোঁটে ব্যথায় ভেজা একটুখানি হাসি। শেরাজ সুমুকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। আজ একজন পুরুষ হয়ে নয়, একজন অসমাপ্ত বাবা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। ঘরের ভেতর নীরবতা জমে এলো। শুধুই মনিটরের টিক টিক শব্দ হচ্ছে। সুমু অল্প নড়ে উঠল, চোখের কোণে ধীরে ধীরে জমতে থাকা একবিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই শেরাজ তা মুছে দিল নিজের হাত দিয়ে। সুমু কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বের হলো না। শেরাজ তার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। হঠাৎ দরজায় নক পড়ল। শেরাজ উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। একজন নার্স দাঁড়িয়ে আছে, হালকা হাসি মুখে নিয়ে।
“স্যার, তিন ঘন্টা হয়ে গেছে। আপনি যদি একটু বাহিরে আসতেন। আসলে ম্যামের…”
কথার মাঝখানে এক হাত উঁচু শেরাজ থামিয়ে দিন নার্সটিকে। সেই চিরচেনা গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“না, আপনাকে করতে হবে না। আপনি রেখে যান। আমার বউ, আমি করে দিব।”
নার্স একটু থমকে গেল। তিনি কিছু বলার চেষ্টা করেও, শেরাজের চোখের ভেতরের দৃঢ়তা দেখে মাথা নিচু করে বলল,
“ঠিক আছে স্যার, এখানে রেখে যাচ্ছি। কিছু প্রয়োজন পড়লে জানাবেন।”
তিনি চলে গেলেন। শেরাজ কেবিনের দরজা বন্ধ করে দিয়ে সুমুর কাছে ফিরে এলো। বিছানার পাশে রাখা ছোট প্যাকেটটা কাছে গেল, যেখানে নার্স ন্যাপকিন আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে গেছে। অন্যসময় হলে সুমু লজ্জা পেতো। ভ্রু কুঁচকে তার খান সাহেবের দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকাতো আর বলত, “এইসব কথা মানুষজনের সামনে বলে কেউ?” তারপর তার খান সাহেবের সাথে খুনশুটি করত। কিন্তু আজ সে চুপচাপ। তার চোখের কোণে একটুখানি নোনা জল। ঠোঁট দুটো শক্ত করে একসাথে চেপে রেখেছে, যেন শব্দ করলেই সবকিছু ভেঙে পড়বে।
শেরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে সুমুর কাছে এসে বসল। নিঃশব্দে সে এক হাতে চেঞ্জ করার জন্য সুমুকে সাহায্য করল। পুরো কাজটা সে খুব যত্নের সাথে করল। সুমুর চোখ বুজে এলো, ঠোঁট কাঁপছে, বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা শব্দ বেরিয়ে আসছে তার।
“আমি তো কিছুই চাইনি। আমি চেয়েছিলাম বাবুটা আমাদের কোলে আসুক। এটা তো খুব বেশি চাওয়া ছিল না, তাই না?”
শেরাজ তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। সুমু আবারও বলল,
“খান সাহেব, আমার বাবুটাকে কখন কোলে নেব?”
শেরাজ চোখ বন্ধ করল। তার ভেতরে একটা কিছু চিৎকার করে উঠল। কিন্তু বাইর থেকে সে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“যখন তুমি একেবারে ঠিক হয়ে যাবে, সুইটহার্ট। তখন আমরা আবারও ডাকব ওকে। আবার আসবে আমাদের বেবি।”
“আমি কি অসুস্থ, খান সাহেব?”
শেরাজ টেবিল থেকে রিপোর্টটা নিয়ে সুমুর হাতে দিল। সুমুর আলতো হাতে রিপোর্টটা ধরল। ধীরে রিপোর্টটা খুলে পড়তে শুরু করল। রিপোর্টটা পড়া শেষে, সে বালিশে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইল। শেরাজ রিপোর্টটা জায়গা মতো রেখে বলল,
“তুমি নিজেকে দোষ দিচ্ছো। কিন্তু তোমার কোনো দোষ নেই। সৃষ্টিকর্তা যা করেন অবশ্যই আমাদের ভালোর জন্য করেন। তুমি আর ভেবোনা। নিজেকে স্ট্রং বানাও। তুমি তো শেরাজ খানের বউ। এতো দূর্বল আমার সুইটহার্ট নয়।”
“আমি কি আর কোনোদিনও মা হতে পারব না?”
শেরাজ সুমুর হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“এমনটা নয়। অবশ্যই পারবে। ডক্টর বলেছেন, অপারেশনটা হয়ে গেলে একবছর পর আমরা আবারও ফ্যামিলি প্লানিং করতে পারব।”
সুমু একটু স্বস্তি পেল। শেরাজ সুমুকে জড়িয়ে বসে রইল, যেন এতো হাহাকার মধ্যে প্রেয়সীকে একটু প্রশান্তি দেওয়ার চেষ্টা।
ধবধবে সাদা মার্বেলের ওপর কাচের দেয়াল। কোনো জানালা নেই, আলো আসে ছাদের নিচে বসানো নীলাভ বাতি থেকে। সেই আলো চোখে লাগে না, কিন্তু দেয় এক অজানা গা ছমছমে অনুভূতি। রুমের কোণায় রাখা এক বিশাল একুরিয়ামে কালো অ্যারাওয়ানা মাছ ধীরে সাঁতার কাটছে, যেন এই ঘরের নীরব পাহারাদার সে।
কেন্দ্রে এক বিশাল চকচকে টেবিল। টেবিলের চারপাশে বসবার চেয়ার গুলো কালো লেদার।
রুমের ঠিক মাঝখানে বসে আছে রায়য়ান চৌধুরী। একহাতে মোবাইল, অন্যহাত ডান পায়ের হাঁটুতে ঠেস দেওয়া। চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। ঠিক যেন সে কাউকে শেষবারের মতো জীবনের গেমে চাল দিচ্ছে। মোবাইলে স্পিকারে ভেসে আসছে কাঁপা গলায় ডাক্তার দূর্জয়ের কন্ঠ। রায়য়ান গম্ভীর গলায় বলল,
“দূর্জয়, ওর এখন কি অবস্থা আমি দেখতে চাই। আমাকে একটা ভিডিও ক্লিপ পাঠাও।”
ফোনের অপর প্রান্তে দূর্জয়ের গলা কাঁপছে, কণ্ঠে ভয় মিশে আছে তার।
“বস, রুমের সামনে খুব কড়া সিকিউরিটি দেওয়া আছে। আর ওই কেবিন কোনো পুরুষ ডাক্তার ঢুকতে পারবে না। এটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে।”
রায়য়ান ঠোঁট কুণ্ঠিত করে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“ঠিক আছে, তবে কোনো নার্স পাঠাও। আমার ভিডিও ক্লিপ চাই। চাই মানে চাই।”
দূর্জয় একটু থমকালো। কণ্ঠে কম্পনের সাথে বলল,
“চেষ্টা করছি, বস।”
“চেষ্টা? চেষ্টা না, আমার চাই।”
দূর্জয় হালকা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
“বুঝেছি, বস! আমি দেখছি কি করা যায়।”
রায়য়ান কলটা কাটল। দূর্জয় একজন নার্সকে তার কেবিনে ডেকে পাঠালো। নার্স আসতেই দূর্জয় তার সামনে এক বান্ডিল টাকা রেখে বলল,
“১০৩ নাম্বার কেবিনের পেশেন্টের কি অবস্থা এখন, তার একটা ভিডিও ক্লিপ আমাকে এনে দাও।”
“কিন্তু স্যার! ওই কেবিনের সামনে গার্ড দাঁড়ানো। এখন তো কারো ঢোকা নিষেধ।”
দূর্জয় টাকার বান্ডিলটা নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, আপনি যান। অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নিব।”
নার্সটি লোভে পড়ে গেল। এতোগুলো টাকা হাতছাড়া করার ভয়ে সে তাড়াহুড়ো করে বলল,
আমি পারব, স্যার। আমি পারব।
দূর্জয় হাসল। নার্সটি টাকাগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।
হাসপাতালের করিডর ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে এসেছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীরা ঘুমিয়ে পড়েছে। নার্সদের গলার আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে আসছে, যেন রাতের গভীরতাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু সুমুর কেবিনের চারপাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াগুলো এখনো সজাগ। ঘড়ির কাটায় রাত দুটো। শেরাজের বডিগার্ডেরা কড়া নজরে দেখছে আশেপাশে চলাফেরা করা প্রতিটি মানুষকে। চতুর্থ তলায় কেবল এই একটি কেবিনের সামনে রয়েছে পাঁচজন সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী।
কেবিনের ভেতরে নরম আলো জ্বলছে। সুমুর নিঃশ্বাস ওঠানামা করছে ধীরে শান্তভাবে। ক্লান্ত শরীরটা ঘুমে আচ্ছন্ন, কিন্তু কপালের মাঝে লুকানো দুশ্চিন্তার ছায়া এখনো মুছেনি তার। শেরাজ পাশে বসে আছে। সে হাত ধরে রেখেছে সুমুর। তার চোখে ঘুম নেই। আছে শুধু নিরব ধ্যান আর বুকের গভীর থেকে জমে ওঠা অপরাধবোধ। সেই অপরাধ, যা তাকে বারবার বলছে,
“তোমার স্ত্রী আজ তার শরীরের ভেতর হারিয়েছে একটি স্বপ্ন। আর তুমি কিছু করতে পারোনি।”
শেরাজ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে চাঁদের আলো কাচের ওপর পড়ে সাদা রেখার মতো জ্বলছে। হাসপাতালের নিচে তার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, আলো নিভানো। আকাশ একটানা নিস্তব্ধ, অথচ শেরাজের বুকের ভেতর ঝড়। হঠাৎ পেছন থেকে একটা মৃদু কাশি ভেসে আসে। সে ঘুরে তাকাল। সুমু উঠে বসেছে। চোখ আধবোজা।
“আপনি জেগে আছেন?”
শেরাজ দ্রুত তার পাশে ফিরে এলো। সুমু নিঃশব্দে তাকাল তার খান সাহেবের চোখের দিকে। মানুষটার চোখের নিচে কালি, ঠোঁট ফাটাফাটা। তবুও তার চোখে সেই শান্ত দীপ্তি।
“কাল আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবেন না?”
শেরাজ তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল।
“নিয়ে যাব। নিজের হাতে শাড়ি পরিয়ে দেব কাল তোমাকে।”
“আপনি আমার সাথে ঘুমাবেন না?”
শেরাজ আলতো হাসল। সে আবারও ঠোঁট ছোঁয়াল সুমুর কপালে। তারপর বেডে উঠে সুমুকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল।
দূর্জয়ের পাঠানো নার্স সুমুর কেবিনের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ভেতরে যাবার জন্য পা বাড়াতেই বডিগার্ডরা তাকে আটকে সোজা মুখে বলল,
“বিনা পারমিশনে এই কেবিনে কাউকে এলাউ করা হবে না, ম্যাডাম। অনুগ্রহ করে ফিরে যান।”
নার্স হালকা কড়া গলায় বললেন,
“আমি প্রেশেন্টকে দেখতে এসেছি।”
“সরি! ভেতরে স্যার নিজে আছে। স্যার দেখে নিবেন ম্যামকে। আপনি আসতে পারেন।”
নার্স লজ্জায় ও ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। সে বুঝল আর এদিক থেকে ঢোকা সম্ভব নয়। আড়ালে গিয়ে নার্স ফোনে ড: দূর্জয়ের কাছে রিপোর্ট করল,
“স্যার, বডিগার্ডরা আমাকে ঢুকতে দিচ্ছে না। তারা বলছে, পারমিশন ছাড়া কেউ এলাউ হবে না। আর ভেতরে ওনার হাজব্যান্ড আছে।”
দূর্জয় শান্ত গলায় বলল,
“ঠিক আছে, আমি রায়য়ান স্যারের সঙ্গে কথা বলছি।”
দূর্জয় কল কেটে রায়য়ানকে কল করল। রায়য়ান কল পিক করতেই দূর্জয় ভয় মেশানো কন্ঠে বলল,
“স্যার, নার্স ঢুকতে পারেনি। বডিগার্ডরা কেবিনের দরজা পাহারা দিচ্ছে। আর তার থেকেও বড় কথা, ভেতরে শেরাজ খান নিজে আছেন।”
রায়য়ান মুহূর্তেই উত্তেজিত হয়ে উঠল। তার চোখ জ্বলে উঠল অগ্নির মতো। সে ফোন ছুঁড়ে ফেলে রুমের মধ্যে ভাঙচুর করতে শুরু করল। মাহিন দ্রুত রায়য়ানের পাশে এসে বলল,
“স্যার, শান্ত হন। এই রাগে কোনো লাভ নেই। পরিকল্পনা করে ধীরে ধীরে কাজ করা দরকার।”
রায়য়ান গর্জে উঠল,
“আমি আর কোনো দেরি চাই না। ওকে আমার চাই।”
মাহিন হালকা কণ্ঠে বলল,
“ঠিক আছে স্যার, আমরা সব সামলে নিব। আপাতত একটু ধৈর্য ধরুন।”
রায়য়ানের চোখে রাগ। সে গর্জন করে বলল,
“ধৈর্য ধরতে পারছি না। আমার হাতে সময় কম। সে পার্টির দিন ওই মেয়েকে আমি প্রথম দেখেছিলাম। সেদিন ওর প্রতি ভালো লাগা আসলেও পাত্তা দেয়নি। কিন্তু…”
থেমে গেল রায়য়ান। এক মুহূর্ত থেমে আবারও বলল,
“আমি তো জানতাম না ভালোবাসা এমন হয়, মাহিন। ছুঁতে না পারলেও, অনুভব করতে হয়। কথা না বললেও, শুনে ফেলতে হয়। আর কাছে না গিয়েও, সারাজীবন পাশে থাকতে ইচ্ছে করে। আমি ওকে চাই, মাহিন। শুধু একজন নারীর মতো না, আমার জীবন হয়ে, আমার বেঁচে থাকার কারণ হয়ে আমার কাছে থাকবে।
মাহিন নীরবে তাকিয়ে রইল রায়য়ানের দিকে। একবারের জন্যও আর মুখে কোনো শব্দ এলো না তাদের, শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
রায়য়ান একটু হেসে আবারও বলল,
“ভালোবাসা? মাহিন, এই শব্দটা তো আমি বহুবার শুনেছি বহু মেয়ের ঠোঁটে, চোখে, কণ্ঠে। কিন্তু জানিস, সুমুর চোখে যখন আমি প্রথম সেই বিষন্ন প্রশান্তি দেখেছিলাম, আমি বুঝেছিলাম আমি শেষ হয়ে গেছি। আমি তাকে চেয়েছি, যেমন মরুভূমি চায় একফোঁটা জল। আমি তাকে চেয়েছি, যেমন এক অভিশপ্ত কবি চায় তার অপূর্ণ কবিতার শেষ পঙক্তিটি। আমি তাকে ছুঁতে চাই না, মাহিন। আমি চাই, সে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে থাকুক। আমার রক্তে, আমার ঘৃণায়, এমনকি আমার পাপেও। তাকে পাবো কি না জানি না। কিন্তু আমি চাই, সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলবে, ‘রায়য়ান তোমাকে আমি ভয় পাই’। সেদিন আমি তার সামনে বসে বলব, ‘ভয়টাই তো ভালোবাসার আরেক রূপ, মায়াবতী। ভালোবাসলে মানুষ তার নিজের মনকেই ভয় পায়’।”
“আপনি তো নারীদের ঘৃণা করতেন, বস। আপনার মতো কঠোর মনের মানুষের পক্ষে কাউকে ভালোবাসা সম্ভব? বিশেষ করে নারীকে ভালোবাসা সম্ভব?”
রায়য়ান এক মুহূর্ত চুপ থাকল। তার চোখের পাতা ধীরে নামল। গলায় এক বিষণ্ন ধ্বনি এনে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৪৯
“হ্যাঁ, আমি নারীদের ঘৃণা করতাম। তাদের কাঁদতে দেখলে হাসতাম, ভালোবাসা বলতে বুঝতাম দুর্বলতা। আমি বিশ্বাস করতাম, নারীরা কেবল ছলনার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু সুমু, সে আমার সব বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে। তার চোখে ছিল না কোনো জটিলতা, তার মুখে ছিল না কোনো সার্থ। আজ আমি? আমি সেই ভয়টাকেই ভালোবেসে ফেলেছি, মাহিন। ওকে আমি মারতে চেয়েছিলাম। ওকে ভালোবেসে ফেলার ভয়েই আমি আরও বেশি মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম ওকে মারার জন্য। কিন্তু পারলাম কই? ও অনেক বেশি পবিত্র। ও একদম অন্যরকম। আমি তোকে বলে বোঝাতে পারব না। ওর চোখে আমি যা দেখেছি, ওর মধ্যে আমি যা দেখেছি, তা আমি জীবনে অন্য কোনো নারীর মধ্যে দেখিনি। আমি নারীদের ঘৃণা করতাম। কিন্তু সুমু নামের মেয়েটা আমার সেই ঘৃণার গায়ে ভালোবাসার আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।”
