খান সাহেব পর্ব ৫৪
সুমাইয়া জাহান
সুমুর জ্ঞান ফিরেছে কাল রাতেই। অপারেশনের পর থেকে এক মিনিটের জন্যও শেরাজ সুমুর পাশ থেকে সরে যায়নি। হাসপাতালের সেই সাদা দেয়ালের মধ্যে তার সমস্ত পৃথিবী এখন শুধুই সুমু। সকালের দিকে সবাই একবার করে এসে সুমুকে দেখে গেছে। এখন কেবিনে একেবারে নির্জনতা। সুমুর কেবিনে এখন শুধু শেরাজ একা আছে। অনন্যা খাতুনরা বাড়িতে চলে গেছে। সারবাজরা সকলে অফিসে। মৌ সেনরাও এসেছিল, তবে এখন তারাও বাড়িতে ফিরে গেছে।
সুমু বেডে বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে। পাতলা ব্লাঙ্কেটা গায়ে। মুখে অল্প অস্বস্তি, কিন্তু চোখে একরোখা জেদ। জ্ঞান ফেরার পর থেকে সে বায়না ধরেছে, সে আর হসপিটালে থাকবে না। তার মুখে এখনো সেই একই কথা। শেরাজ চুপচাপ বসে আছে পাশে রাখা চেয়ারে। সে চোখ না তুলেই বলল,
“তুমি এখনও দুর্বল। ডাক্তার বলেছে, আরও দুদিন রাখতে হবে এখানে। এখন বাড়ি গেলে যদি…”
“আমি ঠিক আছি, খান সাহেব। আপনি যদি পাশে থাকেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার এই হসপিটালের গন্ধটা আর সহ্য হচ্ছে না।”
শেরাজ এবার তাকাল সুমুর দিকে। চোখে একরাশ ক্লান্তি আর তীব্র ভালোবাসা তার।
“তুমি জানো না, আমি কেমন ভয় পেয়েছিলাম।”
সুমু শেরাজের হাত চেপে ধরে বলল,
“ভয় পেয়েছিলেন বলেই তো এখনো আমার হাত ছাড়েননি। আমি চাইও না আপনি আমার হাত ছাড়ুন। কিন্তু দয়া করে আমাকে বাড়ি নিয়ে চলুন, খান সাহেব। এখানে আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে।”
শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুমি বসো। আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলে আসছি।”
সুমু মাথা নাড়ল। শেরাজ ডাক্তারের সাথে কথা বলে মিনিট দশেক পর ফিরে এলো। তার চোখে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি। সে সোজা এসে সুমুর পাশে বসল। সুমু করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“কি বলল, ডাক্তার?”
শেরাজ সুমুর দুই গাল দু’হাতে ধরে বলল,
“আমার বউ বাসায় যাবে, সেটার জন্য ডক্টরের পারমিশন লাগবে কেন? আমি ওদের বলেছি, সব পেপারস রেডি রাখতে, বউকে আমি আজই বাড়ি নিয়ে যাবো।”
সুমুর মুখে হাসি ফুটে উঠল। চোখের ক্লান্তিটাও যেন মুছে গেল তার। হঠাৎ শেরাজ সুমুর পরনের ড্রেসটা আলতো করে একপাশে সরাতে গেল। সুমু চমকে উঠে শেরাজের হাতটা চেপে ধরে বলল,
“কি করছেন আপনি?”
শেরাজ ভাবলেশহীন ভাবে বলল,
দেখছ না, ড্রেস ওপরে তুলছি?”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেবিনের দরজা খোলা, খান সাহেব।”
শেরাজ ঠোঁটে এক দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“তো তুমি কি চাইছো, আমি দরজাটা লক করে আসি?”
“অসভ্য, নির্লজ্জ, ঠোঁটকাটা, লাগামহীন একজন পুরুষ আপনি। সবসময় এসব উল্টাপাল্টা কথা বলেন।”
শেরাজ একটা ভ্রু উঁচু করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“তুমি চাইলে শুধু কথা বলে না, করেও দেখাতে পারি।”
সুমু ঠোঁট কামড়ে রাগ চেপে বলল,
“খান সাহেব! আপনার ওই অসভ্য মুখটা বন্ধ করুন।”
শেরাজ গলা আরও নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
“ঠিক আছে! মুখ বন্ধ রাখি, তবে অন্য কিছু খুলি, বউ?”
সুমু কপাল কুঁচকে বলল,
“অন্য কিছু মানে?”
শেরাজ কন্ঠে আদর মিশিয়ে বলল,
“খুলেই দেখাই!”
সুমুর মুখ লাল হয়ে গেল। শেরাজ উঠে গিয়ে কেবিনের দরজা লক করল। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল। সুমুর ভ্রু কুঁচকে উঠল। সে একটু পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“না, খান সাহেব!”
তবুও শেরাজ থামল না। শেরাজের অবস্থা দেখে সুমু নিজেকে গুটিয়ে নিতে গেলে, শেরাজ দ্রুত এগিয়ে এসে সুমুকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“পাগল হয়ে গেছো নাকি? কী করছো তুমি? কাল তোমার অপারেশন হয়েছে। কতোগুলো স্টিচ পড়েছে। একদম কাঁচা স্টিচ। এত ছটফট করলে যদি কিছু হয়ে যেত? আমি বুঝি যে, আমার মতো হট, হ্যান্ডসাম হাজব্যান্ডকে দেখলে তোমার মাথা ঠিক থাকেনা, তাই বলে এই অবস্থায় নিজেকে একটু কন্ট্রোল করো। এত ছটফট করোনা।”
সুমু কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“আপনিই তো…”
শেরাজ চোখ নামিয়ে হালকা হেসে বলল,
“আমি তো কী?”
“নষ্ট পুরুষ!”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“আমি তোমার কাছে শুদ্ধ পুরুষ হতে চেয়েছি কবে? বউয়ের সামনে যে পুরুষ শুদ্ধ, সে আবার কোনো পুরুষ হলো নাকি? সে শুধু নামেই পুরুষ, কাজে না।”
সুমু হালকা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ওহ আচ্ছা, তাই? তা কাজে পুরুষ কী করে হয়, খান সাহেব?”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“সেটা এখন ফিজিক্যালি করে দেখাতে হবে। আর তার জন্য আই ওয়ান্ট ইউ।”
সুমু আর কিছু বলল না। বলল না নয়, সে বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সে ধীরে সুমুকে ছেড়ে চেয়ারটায় গিয়ে বসল। সুমু চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ ধীরে সামনে এসে সুমুর ড্রেসটা আলতো করে তুলতে গেল, সুমু কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই শেরাজ নরম স্বরে বলল,
“তোমাকে কাছে পাওয়ার জন্য আমি ডেস্পারেট হতে পারি। কিন্তু এতটাও না যে, আমার অসুস্থ বউকে আদর করে এখন কাঁদাব।”
সুমু নরম চোখে তাকিয়ে রইল তার খান সাহেবের দিকে। সে আর বাঁধা দিল না। শেরাজ খুব যত্ন করে সুমুর অপারেশনের জায়গাটা আলতো করে উন্মুক্ত করল। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে, খুব ধীরে তার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল সেখানে। তার মুখের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে সুমুর নরম ত্বকে খোঁচা লাগল। সে হালকা ব্যথায় কেঁপে উঠে অস্ফুট স্বরে বলে ‘আহ’ উঠল। শেরাজ মুখ তুলে তাকাল সুমুর দিকে। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
“মাত্রই তো ছুঁতে দিচ্ছিলেনা। আর এখন, আহ-উফ এসব সাউন্ড করে আমাকে সিডিউস করার চেষ্টা করছ, বউ? লাভ নেই, এখন আমার মুড চলে গেছে।”
সুমুর মুখ লাল হয়ে গেল লজ্জায়। সে চোখ নামিয়ে একটু রাগিস্বরে বলল,
“আপনি একেবারেই ভালো না, খান সাহেব। আমি ব্যথা পেয়ে ওমন করেছি, আর আপনি উল্টাপাল্টা ভাবছেন?”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে ফিসফিস করে বলল,
“ওমন, কেমন বউ? ভুলে গেছি, আর একবার শোনাবে?”
সুমু মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। ভীষণ লজ্জায় তার গাল টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। কিন্তু মুখে সে রাগ চেপে রাগ চেপে রাখার চেষ্টা করে বলল,
“আপনি এমন বাজে কথা বলবেন বুঝিনি, খান সাহেব! ব্যথায় ওমন করেছি, বুঝলেন?”
শেরাজ আবার একটু ঝুঁকে এলো সুমুর দিকে। সুমুর কাঁধের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কি বলেছি বাজে কিছু? তুমি তো নিজেই এমন সাউন্ড করলে, ঠিক এমন করে।”
সে চোখ মেরে মুখ বাঁকিয়ে নকল করে ‘আহ’ আওয়াজ দিল। সুমু এবার সত্যিই থমকে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে কপি করছেন?”
শেরাজ একটু ভাব নিয়ে বলল,
“আমি তো খেয়াল রাখি তোমার সবকিছু। তোমার হাটার ভঙ্গি, রাগে ভ্রু কুঁচকানো, হাসার শব্দ, আর ব্যথা পেলে তুমি যে কীভাবে সাউন্ড করো, সেটাও।”
সুমু এক টানে চাদরটা দিয়ে টেনে মুখ ঢেকে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি খুব খারাপ। একদম ভালো না আপনি।”
শেরাজ ধীরে মাথা নিচু করে, চাদরের উপর দিয়েই সুমুর গাল স্পর্শ করল নিজের গালের খোঁচা খোঁচা দাড়ি দিয়ে। সুমু কেঁপে উঠে আবারও ‘আহ’ করে শব্দ করল। শেরাজ মুখ নিচু করে ঠোঁটটা খুব আলতো করে সুমুর কানের কাছে নিয়ে নেশালো কন্ঠে বলল,
“আবার সেই সাউন্ড। উফ, আবারও। এবার সত্যিই আমার মুড ফিরে এসেছে, বউ। কিন্তু আমার বউ যে অসুস্থ।”
সুমু লজ্জায় হেসে ফেলল। তবুও মুখ চাদরে নিচে লুকোন রইলো তার। সে চাদরের নিচে থেকেই ফিসফিস করে বলল,
“আমি অসুস্থ না হলে কী করতেন আপনি?”
শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,
“আমার প্রাইসলেস স্পার্ম ডোনেশনের কাজ শুরু করতাম।”
সুমু চাদরের নিচে মুখ লুকিয়ে রেখেই ছোট্ট গলায় বলল,
“আপনি খুব দুষ্টু!”
শেরাজ হেসে উঠে বলল,
“তোমার জন্যই তো দুষ্টুমি করি, সুইটহার্ট। এতো মিষ্টি একটা বউকে দেখলে আমার মতো ইনোসেন্ট ছেলে পাগল হতে বাধ্য। আর তাই সে দুষ্টুমি করে বসে।”
সুমু একটু চাদরের কোণা সরিয়ে মুখের অর্ধেকটা দেখাল। ঠোঁটে চাপা হাসি আর চোখে একটু পানি জমে উঠেছে তার। নিচু গলায় বলল,
“আচ্ছা খান সাহেব, সারাজীবন এমন ভাবেই ভালোবাসবেন?”
শেরাজ কিছু না বলে এগিয়ে গিয়ে সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর নিচু গলায় বলল,
“সারাজীবন? ভালোবাসা কোনো চুক্তি নয়। এটা আমার নিঃশ্বাসের সাথে মিশে যাওয়া এক অনন্ত সুর, যা কখনো থামে না, আর থামানোরও অধিকার নেই। আমার জীবনের প্রতিটা সকাল আমি চাই তোমার মুখ দেখে শুরু হোক, আর প্রতিটা রাত তোমার বুকে মাথা রেখে শেষ হোক। যতদিন বাঁচবো, তোমাকেই ভালোবেসে বাঁচবো।”
সুমু এবার সত্যিই আর কিছু বলতে পারল না। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা অশ্রু। শেরাজ তার চোখ মুছে দিয়ে বলল,
“তোমার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া এই পানির বিন্দুগুলোকে আমার হিংসা হয়। তারাও তোমাকে স্পর্শ করছে। কেনো করছে? তোমাকে শুধু আমি স্পর্শ করব।”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“আসুন, একটা গেম প্লে করি।”
শেরাজ অবাক হয়ে তাকাল। দুষ্টু হেসে বলল,
“সত্যি বউ! এই অবস্থা তুমি সত্যি খেলতে চাও। আবার ব্যথা পেয়ে কাঁদবেনা তো? তুমি তো জানোই, আমি কতোটা ডেস্পারেট। একবার শুরু করলে, কাঁদলেও ছাড়ব না।”
সুমু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“অসভ্য পুরুষ মানুষ। আমি ওসবের কথা বলিনি।”
শেরাজ চোরা চোখের তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ওসব কোনসব, বউ?”
সুমু হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“কিছুনা! আমি বলতে চাইছিলাম যে, আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব, আপনি সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর গানের মাধ্যমে দিবেন।”
শেরাজ করুণ দৃষ্টিতে তাকাল সুমুর দিকে। সুমু মুচকি হেসে বলল,
“তো শুরু করা যাক?”
“ওকে!”
সুমু মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আপনার জীবনে আমাকে কতোটা চান, খান সাহেব?”
শেরাজ আলতো করে বাঁকা হেসে গান ধরল,
“বাত দিল কি,
নাজরোনে কি,
সাচ কেহ রাহা,
তেরি কাসাম,
তেরে বিন আব, না লেঙ্গে এক ভি দাম,
তুঝে কিতনা, চাহনে লাগে হাম!”
গান শেষ করে শেরাজ মুচকি হাসল। সুমু আবারও বলল,
“আমাকে কতোটা ভালোবাসেন, খান সাহেব?”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে আবারও গান ধরল,
“হামারী গাজাল হ্যায়,
তাসাও্বর তুমহারা,
তুমহারে বিনা আব না,
জীনা গাওয়ারা!
তুমহে ইউহি চাহেঙ্গে,
জাব তাক হ্যায় দাম!
বহুত পেয়ার কারতে হে,
তুমকো সানাম!
কাসাম চাহে লে লো,
খুদা কী কাসাম!
বহুত পেয়ার কারতে হে,
তুমকো সানাম!”
“আপনি তো সবকিছুতেই জয়ী, তাহলে আমার কাছে কেনো হার মেনেছেন? এই বিষয়ে আপনার মনের কথা জানতে চাই, খান সাহেব।”
“সারি দুনিয়া সে জিত কে মে, আয়া হু ইধার,
তেরে আগেই হি মে হারা কিয়া, তুনে ক্যা আসার,
ম্যা দিল কা রাজ কেহতা হু,
কে জাব জাব ছ্বাসে লেতা হু,
তেরা হি নাম লেতা হু,
ইয়ে তুনে ক্যা কিয়া?”
“আপনি কবে এতোটা আমার হয়ে গেলেন, খান সাহেব?”
“ম্যানে জাব দেখা থা তুজকো,
রাত ভি ওহ ইয়াদ হ্যায় মুঝকো,
তারে গিনতে গিনতে সো গেয়া!
দিল মেরা ধড়কা থা কাস কে,
কুছ কাহা থা তুনে হাস কে,
ম্যা উছি পাল তেরা হো গেয়া!”
“দুনিয়াতে কতো মেয়ে আপনাকে ভালোবাসে। তারা দেখতে কতো সুন্দর। সেসব সুন্দর মেয়েদেরকে রেখে আপনি আমাকেই কেনো ভালোবাসলেন?”
“ও…লাখো মিলে,
কোয়ি ভি না তুমসা মিলা,
ও…মেরা ইয়ে দিল,
তেরি অর চালতা গায়া না, রুকা!
মেরে ইয়ারা,
মেরে ইয়ারা,
মান যা না,
মেরে ইয়ারা!”
“আমি তো সুন্দর না, খান সাহেব। আপনার পাশে তো আমাকে একটুও মানায় না।”
শেরাজ সুমুর মুখটা দু’হাতে গাইল,
“জারা কাভি, মেরি নাজার,
ছে খুদকো দেখ ভি,
হ্যায় চাঁদ মে, ভি দাগ পার,
না তুজমে এক ভি!
খুদ পে হাক মেরা,
তেরে হাওয়ালে কার দিয়া!
জিস্ম কা, হার রুয়া,
তেরে হাওয়ালে কার দিয়া!”
“এই ভালোবাসা বাঁচানোর জন্য আপনি কি কি করতে পারবেন, খান সাহেব?”
মুহুর্তেই শেরাজের চোখের রঙ বদলে গেল। সে বাঁকা হেসে এবার গান ছাড়াই বলল,
“সবকিছু! এই ভালোবাসা বাঁচানোর জন্য আমি জান নিতেও পারি, আবার জান দিতেও পারি। কেউ যদি তোমার দিকে হাত বাড়ায়, সেই হাত কেটে ফেলতে আমি একটুও দ্বিধা করব না। তুমি যদি কখনও আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাও, আমি তোমার যাওয়ার সব রাস্তা এমনভাবে বন্ধ করে দিব, যাতে আর কোনো রাস্তাই খোলা না থাকে তোমার সামনে, শুধু আমি ছাড়া,” সে এক কদম এগিয়ে এসে বলল, “ভালোবাসা যদি যুদ্ধে পরিণত হয়, আমি রক্ত দিয়ে শেষটা লিখে যাব, সুইটহার্ট। তুমি আমার, আর আমার মানে শুধুই আমার।”
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শেরাজ উন্মাদের মতো বলল,
“ইউ আর জাস্ট মাইন, সুইটহার্ট। তুমি শুধুই আমার। তুমি আমার কথায় হাসবে, আমার কথায় কাঁদবে। আমি চাইলে তোমাকে ভাঙব, আমি চাইলে জুড়বে। তোমার হৃদয়ে, তোমার শরীরে, তোমার নিঃশ্বাসে, শুধু আমি থাকব, আমি।”
সুমু কিছু বলার আগেই শেরাজ ফিসফিস করে আবারও বলল,
“এই ভালোবাসা কেউ ছিনিয়ে নিতে এলে, আমি তাকে জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলব। বিনা টিকিটে জাহান্নাম ভ্রমণ করিয়ে আনব। তুমি ভাবতেও পারবেনা, আমি কী কী করতে পারি। আমি যেহেতু তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি, তাই তোমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে। আমি আমার জিনিস কারও সাথে শেয়ার করি না আর অন্যের ব্যবহার করা জিনিসের দিকে ফিরেও তাকাইনা। তুমি কেবল আমার। তোমার উপর আর কারও অধিকার নেই, থাকতেও পারে না। তুমি আমার দখলে। তুমি আমার থেকে পালাতে পারবে না। ইউ আর মাইন। তুমি শুধু আমার। এই পৃথিবীর চোখে তুমি যেই হওনা কেন, আমার চোখে তুমি শুধু একটাই পরিচয়ে আছে, সেটা হলো আমার নিজের। তোমার কাছে আমার নাম ‘খান সাহেব’, আর আমার কাছে তোমার নাম শুধু একটাই। সেট হলো, ‘আমার’”, সে আরও এক কদম এগিয়ে এসে বলল, “তুমি চাইলে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে পারো, কিন্তু আমার হৃদয় থেকে না। তুমি যা কিছু করো, যাকে দেখো, যেখানে যাও, সবকিছুর ছায়ায় থাকবে আমার স্পর্শ।”
সুমু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ সুমুর তাকানো দেখে নিজেকে সামলে আলতো হেসে বলল,
“নেক্সট?”
সুমু মৃদুস্বরে বলল,
“আর কোনো প্রশ্ন নেই।”
শেরাজ এগিয়ে গেল সুমুর কাছে। সুমুকে জড়িয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে মাথার ওপর ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“পাগলিটা আমার!”
কেবিনের দরজায় নক পড়ল। শেরাজ সুমুকে ছেড়ে দিয়ে কেবিনের দরজা খুলতে গেল। কেবিনের দরজা খুলতেই একজন মধ্যবয়সী নার্স ভেতরে এলো। তিনি মৃদু হাসি দিয়ে বললেন,
“স্যার, ম্যামের ইনজেকশনের সময় হয়ে গেছে। আমি দিয়ে দিই?”
শেরাজ একবার সুমুর দিকে তাকাল। সুমু চুপচাপ বসে আছে। শেরাজ মাথা নেড়ে বলল,
“জি, আপনি দিন।”
নার্স কাছে এসে সুমুর পাশে বসে ইনজেকশন প্রস্তুত করতে লাগল। সুমু একটু ভয় পাওয়া মুখ করে হাত শক্ত করে বিছানার চাদর চেপে ধরল। শেরাজ এগিয়ে এসে বলল,
“সুইটহার্ট, চোখ বন্ধ করো। ব্যথা লাগবে না। আমি আছি।”
সুমু চোখ বন্ধ করল। ইনজেকশন দেওয়ার মুহূর্তে শেরাজ তার হাত ধরে রাখল। সুমু শেরাজের হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ইনজেকশন দেওয়া শেষ হলে নার্স বলল,
“হয়ে গেছে, স্যার। ম্যাম, আপনি রেস্ট করুন।”
নার্স চলে গেল। শেরাজ আলতো করে সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে তাকে বুকের মধ্যে নিয়ে বসে রইল।
অফিসে তখন নিস্তব্ধতা। ঘরভর্তি একটা হিমশীতল হাওয়া বয়ছে। কাঠের ডেস্কে মাথা হালকা নিচু করে রায়য়ান বসে আছে। আঙুলে একটি সিগারেট ঘোরাচ্ছেন, কিন্তু জ্বালাচ্ছেন না। মুখে তার থমথমে নীরবতা। মাহিন ফাইল হাতে ঢুকল। ফাইলটা রায়য়ানের সামনে রেখে নরম গলায় বলল,
“বস, কলকাতার ডায়মন্ড এক্সপোর্ট প্রজেক্টে একটা নতুন লোকের এন্ট্রি হয়েছে। নাম ‘সুধাংশু বাগচী’। আগে ছোটখাটো কাজ করতো। এখন হঠাৎ করেই আমাদের এক ক্লায়েন্টকে কিনে নিয়েছে।”
রায়য়ান ধীরে ফাইলটা খুলে চোখ বুলিয়ে নিল। কপাল ভাঁজ করে ঠোঁটের কোণায় বিরক্তি ফুটিয়ে বলল,
“সুধাংশু বাগচী, ওই নামটা কোথা থেকে এলো মাহিন? কে দিল ওকে সাহস?”
মাহিন নিজেকে সামলে বলল,
“খবর বেরোচ্ছে, ওর পেছনে কিছু ফান্ডিং এসেছে দুবাই থেকে। সম্ভবত কোনও পুরনো ব্যবসায়ী, যিনি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন একসময়।”
রায়য়ান সিগারেটটা ঠোঁটে নিয়ে জ্বালালো। একটা টান মেরে ধোঁয়া ছেড়ে চোয়াল শক্ত করে বলল,
“পুরনো শত্রুদের আমি বাঁচিয়ে রাখি না, আর নতুন শত্রুদের আমি সময় দিই না মাথা তুলে দাঁড়াতে।”
মাহিন একটু এগিয়ে এসে নরম গলায় বলল,
“আপনি ইশারা দিলেই কলকাতায় লোক বসিয়ে দেই, স্যার। মিডিয়াতে একটুখানি কেলেঙ্কারি হলে, তার পেছনের লোকরাও পিছু হটবে।”
রায়য়ান ঠাণ্ডা হেসে বলল,
“না মাহিন, খুব সহজ হবে সেটা। আমি খেলাটা একটু লম্বা করতে চাই। সুধাংশু নামের ছেলেটা কী জানে না, সে যার বাজারে ঢুকেছে, সে শুধু ব্যবসা করে না, মানুষ ভাঙে?” সে একটু থেমে মাহিনের দিকে তাকাল। তার গলার স্বর এবার আরও নিচুতে নেমে এলো, “তুমি কলকাতার ম্যানেজার শোভনকে বলো, আগামী সাত দিনের মধ্যে যদি বাগচীর রুট বন্ধ না হয়, তাহলে বাগচীর জায়গায় আমি শোভনকেই বসিয়ে দেবো। সবাইকে মনে করিয়ে দিতে হবে, ওই শহরের ছায়াও আমার নামে চলে।”
মাহিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। রায়য়ান বাঁকা হেসে বলল,
“কেউ যদি ভাবে আমার ব্যস্ততার সুযোগে আমার ব্যক্তিগত জগতে ঢুকবে, তাহলে আমি আর ব্যবসায়ী থাকব না, সরাসরি শিকারি হয়ে উঠব। আমার মাফিয়া রূপটা আবার খুব একটা সুবিধার না।”
কেবিনের দরজায় হালকা নক পড়ল। রায়য়ান চোখ না তুলে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“কাম ইন!”
আরিয়ান কেবিনে ঢুকল। রায়য়ান তাকে দেখে মুখের কোণায় হালকা হাসি টেনে বলল,
“দেখো কে এসেছে”, সে মাথা ঘুরিয়ে মাহিনকে বলল, “মাহিন, ওর জন্য কফি আর স্ন্যাকস পাঠাও। ও যেন অতিথির মতোই আপ্যায়ন পায়।”
মাহিন সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে গেল। রায়য়ান চেয়ারে থেকে হেলান দিয়ে বসে বলল,
“তাহলে বল আরিয়ান, আজ কী ঝড় বয়ে এনেছিস?”
আরিয়ান একটু চুপ করে রইল। তার চোখে এক অস্থিরতা। সে ধীরে বলল,
“সুমু!”
রায়য়ান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল। আরিয়ান কেবিনের ছাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কিছু ভালো লাগেনা, ভাই। মানসিক শান্তির জন্য হলেও, সুমুকে আমার প্রয়োজন।”
রায়য়ান তাকিয়ে রইল ডেস্কের ওপর থাকা ল্যাপটপের দিকে। রুমের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। শুধু শোনা যাচ্ছে দুটি মানুষের ভারী দীর্ঘশ্বাস। একজনের প্রকাশে, অন্যজনের গোপনে।
যানজট ভর্তি রাস্তা দিয়ে শেরাজের ব্ল্যাক রোলস-রয়েস ধীরে ধীরে ছুটছে। সন্ধ্যার নরম আলোয় শহরের ঝলমলে আলোগুলো এক এক করে গড়িয়ে যাচ্ছে জানালার গ্লাসে। সুমুর হাতগুলো হালকা কাঁপছে। শরীর দুর্বল, কিন্তু তার চোখে ধরা দিচ্ছে অদ্ভুত এক স্বস্তি। শেরাজ হসপিটালে আজ বাড়ির কাউকে আসতে আগে থেকেই বারণ করে দিয়েছিল। হাসপিটাল থেকে ডিসচার্জ দিয়ে আনার পর সুমু খুব খুশি হয়েছে। রাস্তাঘাটে মানুষ আর গাড়ির হর্নের শব্দে মাঝেমধ্যে পরিবেশটা ঝামেলার মনে হলেও, শেরাজের গাড়ির ভেতরে এক শান্তির আবরণ বয়ে যাচ্ছে। সুমু হঠাৎ করে বলল,
“গাড়িটা কোনো ফাঁকা রাস্তায় নিন না।”
শেরাজ স্টিয়ারিংয়ে হাত ঘোরাতে-ঘোরাতে বলল,
“কেনো?”
“নিন না। একটু ঘুরে আসি। এরপর বাড়িতে ঢুকলে তো আর বেরোতে পারব না।”
শেরাজ কপাল কুঁচকে বলল,
“না! এখন সোজা বাড়িতে যাবো। তোমার রেস্টের প্রয়োজন।”
সুমু বায়না করে বললো,
“প্লিজ, চলুন না। কতোগুলো দিন ধরে হাসপিটালে পড়ে আছি। আমার একটু রিফ্রেশমেন্ট দরকার।”
শেরাজ বারবার নাকোচ করল। শেষমেশ সুমুর জেদের কাছে হার মেনে বাধ্য হলো গাড়ি ঘোরাতে।
গাড়িটি একটা ফাঁকা শূনশান জায়গায় এসে থামাল। চাঁদের আলো আর ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ঝলমল করছে জায়গাটা। আকাশে হালকা মেঘ, তার মাঝে চাঁদ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। শেরাজ গ্লাস নামিয়ে ফ্রেশ বাতাসে মুখ ডোবাল। সুমু তার পাশে বসে, হাতের কাঁপুনি একটু থেমে এসেছে তার। শেরাজ গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। সুমু কিছু বলার আগে এক ঝটকায় সুমুকে কোলে তুলে নিল সে। গাড়ির ভেতর থেকে বের করে এনে একদম গাড়ির হুডের ওপর আলতো করে বসিয়ে দিল। গাড়ির গ্লাভ বক্স খুলে রেড বুলের বোতল এনে গাড়ির হুডের ওপর বসে একহাতে সুমুকে জড়িয়ে নিয়ে অন্যহাতে ক্যানের বোতল উঁচু করে চুমুক দিল। দুজনের দৃষ্টি আকাশের চাঁদের দিকে। রাস্তায় হালকা হাওয়া বয়ছে। সুমু চাঁদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে তার খান সাহেবের দিকে তাকাল। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ, সাদা মিশ্রিত আলোয় কি দারুণ সুন্দর লাগছে তার খান সাহেবকে। পরনে সাদা, লাইট ব্রাউন আর ডার্ক ব্রাউন মিশ্রিত চেক শার্ট আর কালো জিন্স প্যান্ট, শার্টের প্রতিটা বোতাম খোলা রাখা, শার্টের নিচে ব্লাক ট্যাঙ্কটপ পরা, দু’হাতের অনামিকা আঙুলে মেন্স স্টোন রিং পরা, বা’হাতে পাটেক ফিলিপ গ্র্যান্ডমাস্টার চাইম রেফারেন্স ৬৩০০এ-০১০ ঘড়ি পরা আর ডান হাতে কালো মোটা একটা ডাবল লেয়ার্ড লেদার ব্রেসলেট পরা, চুলগুলো পরিপাটি করে রাখা। সবকিছু দেখে সুমু বলল,
“আপনার পরনে হোয়াইট অ্যান্ড ব্ল্যাক শার্ট, ইট’স ওকে। বাট, চেক শার্ট হিট’স ডিফারেন্ট। মারাত্মক ব্রো, মারাত্মক।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সুমুর জিভে কামড় দিয়ে বলল,
“সরি! মারাত্মক হাজব্যান্ড, মারাত্মক।”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। সুমু আবারও বলল,
“ট্রাস্ট মি! ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট শার্ট বা টি-শার্টে আপনাকে একদম হিরোর মতো লাগে। আমি’তো যতোবার দেখি, ততোবারই ক্রাশ খেয়ে আপনার প্রেমে পা পিছলে ধপাস করে পড়ি। কিন্তু, যেদিন আপনি একটু ডিফারেন্ট ভাবে নিজেকে তৈরি করেন, মানে পাঞ্জাবী, জুব্বা বা চেক শার্টে, সেদিন আমি জাস্ট ফিদা হয়ে যায়। আপনাকে মেন্স সব ড্রেসে জাস্ট ওয়াও লাগে, খান সাহেব।”
শেরাজ কিছু বলল না। সে একেরপর এক ক্যানের বোতলে চুমুক দিচ্ছে আর তার বউয়ের পাগলামী মার্কা কথা মন দিয়ে শুনছে। সুমু আবারও চুপ করে গিয়ে তাকিয়ে রইল তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ আরও শক্ত করে সুমুকে মিশিয়ে নিল নিজের সাথে। সুমু একটু সময় নিয়ে সে দুষ্টু হেসে গান ধরল,
“বাহো মে তেরি মেরি,
ইয়ে রাত থেহের যায়ে,
তুঝ মে হি কাহি পে মেরি,
সুবহা ভি গুজার যায়ে!”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে সুর ধরল,
“জিস বাত কা তুঝকো ডার হ্যায়,
ও কার কে দিখা দুঙ্গা!”
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ দুষ্টু হেসে সুমুর নাকে নাক ঘষে আবারও গাইল,
“অ্যাইসে না মুঝে তুম দেখো,
সীনে সে লগা লুংগা!
তুমকো ম্যায় চুরা লুংগা, তুমসে
দিল মে ছুপা লুংগা!”
সুমু লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। শেরাজ নেমে গেল গাড়ির ওপর থেকে। সে গাড়ি থেকে কিছুটা সামনে গিয়ে একটা পিলারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল তার প্রেয়সীর দিকে। সুমু প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কি কিছু বলবেন, খান সাহেব?”
শেরাজ পিলারের সাথে কাঁধ ঠেকিয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে গান ধরল,
“সিনে সে তুম মেরে আ কে লাগ যাও না,
ডারতে হো কিউ, জারা পাস তো আও না
তুম মেরি ধাড়কানো কি শুনো!”
সে মাথা পিছনের দিকে ঝুঁকিয়ে চোখ বন্ধ করে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে চুলগুলোকে হালকা ঝেড়ে সুমুর দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে গানটা প্লে করল। ফোনে গান বাজতে শুরু করল,
“চাল ওহা যাতে হে,
চাল ওহা যাতে হে,
পেয়ার কার নে চালো,
হাম ওহা যাতে হে!”
শেরাজ সুমুর সামনে এগিয়ে এসে দু’দিকে দু’হাত মেলে দিয়ে বলল,
“সিনে সে তুমি মেরে আ কে লাগ যাও না, ডারতে হো কিউ? জারা পাস তো আও না!”
সুমু আর বসে রইল না। আস্তে করে নেমে এলো গাড়ির ওপর থেকে। ধীরে গিয়ে শেরাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শেরাজও মৃদু হেসে সুমুকে জড়িয়ে নিল বুকের মধ্যে। সুমুর চুলের ওপর আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল সে। সে সুমুকে একটু সরিয়ে সুমুর সামনে একটু ঝুঁকে কোমরের নিচে আলতো করে ধরে সুমুকে উপরে তুলে খুব সাবধানে ঘোরাতে শুরু করল। সুমু মুক্ত পাখির মতো দু’দিকে হাত মেলে দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। প্রেয়সীর মুখের হাসি দেখে শেরাজ মানসিক শান্তি পেল। কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে শেরাজ দাঁড়িয়ে পড়ল। সুমু দু’হাত দিয়ে শেরাজের মুখ আগলে ধরে শেরাজের মাথার সাথে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখল। শেরাজ মৃদুস্বরে বলল,
“আমি আমার বউকে পৃথিবীর সেই সব সুখ এনে দিবো, যেই সুখের মাঝে আমার বউয়ের ঠোঁটে ফুটে ওঠে একটানা প্রাণখোলা হাসি। সেই হাসি, যে হাসিতে লুকানো থাকবে আকাশের নীল, শিশির ভেজা সকাল, আর আমার ভালোবাসার সবটা যত্ন।”
সুমু মুগ্ধ হয়ে শুনল তার খান সাহেবের কথা। একটু সময় নিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“খুদা লেগেছে।”
“চলো! তোমাকে খাওয়াতে নিয়ে যায়।”
সুমু বাধা দিল। শেরাজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই সুমু শেরাজের ঠোঁটে ঠোঁট মেশালো। আচমকা কাণ্ডে শেরাজ অবাক হয়ে গেল। সে একহাতে সুমুর কোমর সাবধানে শক্ত করে ধরে অন্যহাত দিয়ে সুমুর ঘাড়ের পেছনে ধরে নিজেও তাল মেলালো তার প্রেয়সীর সাথে। একটি সুন্দর রাত আজ আবারও সুমুরাজের এই মিষ্টি সময়ের সাক্ষী হিসাবে রইল।
কলকাতার বুকে তখন মাত্রই সন্ধ্যা নেমেছে। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। এক গলির মুখে দাঁড়িয়ে আছে একজন লম্বা, কালো কোট পরা লোক। তার কানে একটি ব্লুটুথ ইয়ার। সে চোখ দূরে থাকা একটি বিলাসবহুল বাড়ির দিকে। ইয়ারবাডসে কন্ঠ ভেসে আসছে। লোকটি অপর প্রান্তের লোকটিকে বলল,
“শোভন বলছি, লোকটা বাড়িতে ঢুকেছে। ডানদিকে একটা ঘর, ওখানেই সে রাতে কাজ করে। সময় হয়েছে, মুভ করো।”
লোকটি কোটের ভেতর থেকে একটি ছোট ড্রোন বের করে ছাদ বরাবর ছেড়ে দিল। মুহূর্তে ড্রোন উড়তে থাকল আর ঘরের ভেতরকার ভিডিও পাঠাতে শুরু করল। একই সময়, মাস্ক পরে একজন লোক বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। সুধাংশু তখন ল্যাপটপে ব্যস্ত। চশমার কাচে আলো পড়ে থাকায় মুখটা স্পষ্ট নয়, তবে চোখদুটোতে আত্মবিশ্বাসের ছাপ। হঠাৎ একটা শব্দ হলো, যেন কাচের জানালায় হালকা টোকা পড়ল। সে চমকে তাকাল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলনা। অন্ধকারে কেউ একজন ফিসফিস করে বলল,
“তোমার সময় শেষ, মিস্টার বাগচী। তুমি ভুল দরজা খুলেছ।”
ঘর ভর্তি ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে পড়ল। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত আটটা ছুঁই ছুঁই। রায়য়ান তখনো নিজের ডেস্কে বসে সিগারেট শেষ করছে। তার চোখদুটোতে ঠাণ্ডা আগুনে জ্বলছে। আরিয়ান চলে গেছে অনেকক্ষণ আগে। মাহিন আবারও কেবিন ঢুকল ফোন হাতে নিয়ে।
“স্যার, কলকাতা থেকে ভিডিও এসেছে। ড্রোন ফুটেজ, আর রেকর্ড করা ভয়েস মেসেজ। কাজ হয়ে গেছে।”
রায়য়ান উঠে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৫৩
“গ্রেট!”
সে আবারও পকেট থেকে সিগারেট বের করল। সিগারেটের মাথায় আগুন জ্বালিয়ে ঠোঁটের ভাঁজে ধরল। দূরের ল্যাম্পপোস্টের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“সুহাসিনী!”
