খান সাহেব পর্ব ৫৯
সুমাইয়া জাহান
সুমু আয়নার সামনে বসে আছে। তার কাছে চারপাশের পরিবেশ যেন থেমে গেছে, কেবল আয়নার প্রতিফলনে ধরা তার নিজস্ব পৃথিবীটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। আজ তার পরনে কালো আলারকলি। গাঢ় কালো রঙের মাঝে সোনালি জরির হালকা কাজ। চুলগুলো কোমরের নিচে পড়েছে। সুমু চুলগুলো একপাশে তুলে পেছনে খোঁপা বাঁধছে ধীরে। হাতে মেহেদির হালকা ছোঁয়া, চোখে গাঢ় কাজল। ঠোঁটে হালকা মেরুন লিপস্টিক। সে আজ নিজের একান্ত একটা জগৎ তৈরি করেছে তার মনে। মনটাকে ফ্রেশ রাখার চেষ্টা করছে। হয়তো কিছু একটা নতুন শুরু হবে আজ। হয়তো নিজের একটা সিদ্ধান্তের মুখোমুখি সে। কিন্তু তার সমস্ত প্রস্তুতির পেছনে আছে নিজেকে একটু ভালোবাসার প্রয়াস।
পেছনে বিশাল কুইন সাইজ বেডে শুয়ে আছে শেরাজ। মুখটা পাশে ফিরিয়ে উঁপুর হয়ে ঘুমিয়ে আছে সে। সাদা বালিশের ওপরে তার চুল ছড়িয়ে আছে। সাদা স্যাটিনের বালিশে তার তীক্ষ্ণ চেহারাটা শান্ত দেখাচ্ছে।
কিন্তু কেউ জানে না এই নিঃশব্দ ঘুমের আড়ালে লুকানো আছে কতটা আগুন। শেরাজের রুমটাও যেন তার মতোই। রাগ, শৃঙ্খলা, দুর্ধর্ষ এক রহস্য ঘেরা একটি রুম। রুমটা ডেকোরেট করা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট কম্বিনেশনে, একদম সিনেমার মাফিয়াদের মতো। দেয়ালে হালকা গ্রে টেক্সচার, এক কোণে একটি মার্বেল টপের মিনিমাল টেবিল, তার ওপর গাঢ় কালো ফুলদানি। ছাদের সিলিং লাইট জ্বলছে, যার প্রতিফলন পড়ে আয়নার ওপর। একপাশে একটি কাচের র্যাক, তাতে সাজানো শেরাজের ঘড়ি, পারফিউম, কালো সানগ্লাস। একটা সাদা ফ্লোরাল কার্পেট বিছানো পুরো ঘরজুড়ে। খাটের পাশেই একটা ছোট সোফা, যেখানে সুমুর একটা শাড়ি ঝুলে আছে।
সুমু আয়নায় নিজেকে আরেকবার দেখল। সে হঠাৎ ঠোঁটে নাড়িয়ে গেয়ে উঠল,
“মামা, আই’ম ইন লাভ উইথ অ্যা ক্রিমিনাল,
অ্যান্ড দিস টাইপ অফ লাভ ইজন’ট র্যাশনাল,
ইটস ফিজিকাল,
মামা, প্লিজ ডোন্ট ক্রাই, আই উইল বি অলরাইট,
অল রিজন অ্যাসাইড, আই জাস্ট ক্যান্ট ডিনাই, লাভ দ্য গাই!”
শেরাজের হালকা ঘুম ছিল। সে চোখ মেলে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে মেনে নিচ্ছো, যে তুমি একটা ক্রিমিনালকে ভালোবাসো? গুড, তাহলে এখন থেকে এই ক্রিমিনালের সাথে থাকার অভ্যাস করে নাও।”
সুমু আয়নার সামনে থেকে উঠে এগিয়ে এলো শেরাজের দিকে। এক হাতে চুলের খোঁপা ঠিক করতে করতে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“তবে স্বীকার করলেন, আপনি ক্রিমিনাল?”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“আমি? তুমিই তো বললে, আই এম ইন লাভ উইথ অ্যা ক্রিমিনাল। ক্রিমিনালকে ভালোবাসাটাও অপরাধ, সুইটহার্ট।”
“তাতে কি? ভালোবেসেছি বলে কি আমি অন্ধ?”
শেরাজ হালকা ভ্রু কুঁচকে উঠে বসল। ঘুমকাতুরে গলায় বলল,
“তুমি কি আমাকে ঘুম থেকে তুলে ঝগড়া করতে চাইছ?”
“আপনি তো এমনিতেই ঝগড়াটে। ভাবলাম আপনার মতো মানুষকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে একটু আপনার পাপগুলোকে দেখানোর চেষ্টা করি।”
শেরাজ হেসে রসিকতা করে বলল,
“তোমার মুখটা না, দেখলে একবার মনে হয় চুমু খাই। পরক্ষণেই মনে হয় বকা দেই।”
সুমু সোফার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনার মতো লোক আগে কখনো দেখিনি, বকা দেওয়ার বদলে চুমু খাওয়ার কথা বলেন। আর অনুশোচনায় ভোগার বদলে পাপের জন্য গর্ভবোধ করেন।”
শেরাজ আবারও শুয়ে বলল,
“এসবের জন্য দোষী তুমি!”
“আমাকে দোষারোপ করবেন না, খান সাহেব। আমি তো আপনার মতো ক্রিমিনালকে জেনে বুঝে ভালোবাসিনি।”
শেরাজ চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। সে উঠে গিয়ে এক টানে সুমুকে খাটের কিনারে বসিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি জানো না, রাগ আমার শরীরের নেশা। আর তুমি সেই আগুনে ঘি ঢালো, কিন্তু একবারও ভাবো না, আমি পুড়ে যাচ্ছি।”
সুমু ধীরে চোখ নামিয়ে বলল,
“আপনার এই পোড়ার কষ্টটা আমাকে আজ ছুঁতেও পারে না।”
শেরাজ গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে বল,
“তোমার জন্য আমি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছি, সুইটহার্ট।”
সুমু প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“আচ্ছা! ক্রিমিনাল সাহেব, আপনি কি জানেন এই মুহূর্তে আপনার রুমের সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিসটা কী?”
শেরাজ কৌতুহলী চোখে তাকাল। তার ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি।
“তুমি? নাকি তোমার এই সাজ, যা আমার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে?”
সুমু হেসে ফেলল। সে শান্ত দৃষ্টিতে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“না, আপনার এই শান্ত মুখটা। এটাকে দেখে মনে হয়, আপনি কখনো কাউকে কষ্ট দেননি। অথচ…”
সুমু থেকে গেল। শেরাজ তার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকাল। সে জানে না, আজ তার অর্ধাঙ্গিনী ঠিক কী করতে চলেছে। সুমু শেরাজকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,
“ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোমার ব্যাপারটা কি বলো তো? কালরাতে এতোকিছু হলো, সকালেও তুমি চুপচাপ ছিলে। এখন আবার তুমি সাজছ, হাসিমুখে কথা বলছ, এতো মুড সুইং হয় কীভাবে তোমার?”
সুমু আলতো হাসল। উঠে গিয়ে ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমার তো মুড সুইংয়ের থেকেও বেশি বডি সুইং হয়। এই যে দেখুন, কখনো ফর্সা, কখনো কালো, কখনো ব্রাউন দেখায়। আসল কালারটা কখনো ঠিকমতো দেখায় না।”
সুমুর কথা চুপচাপ শুনল শেরাজ। কালরাতে সুমু তার সাথে ঘুমায়নি। এখন নরমাল ব্যবহার করলেও সুমু কিছুক্ষণ আগেও শেরাজের সাথে কথা বলেনি। কাল রাতে পর থেকে প্রেয়সীকে ছুঁয়ে দেখেনি সে। উপরে শক্ত থাকলেও সুমুর অবহেলায় তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে। বউকে কাছে চাই তার, কিন্তু বউ তো এখন তার কথা শুনে কাছে আসবে না। জোর না করলে এখন বউকে কাছে পাওয়া সম্ভব না। তবুও শেরাজ সুমুর দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে করুণ গলায় বলল,
“একটু কাছে আসুন না, ম্যাডাম। সবকিছু ভুলে, আমায় একটু জড়িয়ে ধরুন। আসুন প্লিজ, আপনাকে একটু আদর করি, একটু স্পর্শ করি। কতক্ষণ হয়ে গেল বলুন তো, আপনাকে আমার এই বুকের মধ্যে পাইনি। এই বুকটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে আপনাকে ছাড়া। আপনার গায়ের মিষ্টি গন্ধ আর আপনার চুলের আলতো ছোঁয়ায় সব ক্লান্তি মুছে যায় আমার। আসুন না ম্যাডাম। আজকে আবারও আপনাকে আমার কাছে সপে দিন। আমি আপনার সবটা নিয়ে এই আমার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখি। কাছে আসুন! আদর করি, যত্ন করি। আর কিছু ভাবতে হবে না, শুধু আপনি আর আমি। আর আমাদের নিঃশ্বাসের শব্দ। সবকিছু ভুলে আমায় জড়িয়ে ধরুন। কাছে আসুন না। একটু ছুঁয়ে দেখি আপনাকে।”
সুমু চুপ করে রইল। শেরাজের বলা প্রতিটি শব্দ তার হৃদয়ে কাঁপন তুলছে, কিন্তু তবুও মুখে কোনও শব্দ নেই। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকেই যেন শক্ত করে রেখেছে সে। শেরাজ চুপ করে বসে থাকতে পারল না। সে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। নিঃশব্দ পায়ে সুমুর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। সুমু আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভালোবাসার অপরাধে আমি আজীবন আপনার কাছে দন্ডিত। আমার পাপ মোচনের সময় এসেছে। আপনাকে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করতে পারলেই আমার পাপ কিছুটা মোচন হবে হয়তো।”
শেরাজ হাসল। একবুক দম নিয়ে বলল,
“তোমার মনই আমার আজন্মের জেলখানা — আর এ জেলখানাই আমার স্বর্গ। তুমি যে মায়ার জাল বিছিয়ে রেখেছ, তা ছিঁড়তে পারি না — ছিঁড়তে চাইওনা।”
“আপনাকে শাস্তি পেতে হবে, খান সাহেব।”
“তুমি মায়ার পাহারা, আমি তোমার ভালোবাসার বন্দী— এই আমার এক আজীবনের সাজা।”
“এই সাজা থেকে এখন মুক্তি হন।”
“যেদিন তোমাকে হারাব, সেদিনই সত্যিকারের মুক্তি — আর সেই মুক্তিই হবে আমার মৃত্যুদণ্ড।”
“পালাতে চাইছেন?”
“চাইলেই কি পালানো সম্ভব?”
“তাহলে?”
“তুমি মায়ার কারাগার, আর আমি সেই মায়ায় চিরদিনের কয়েদি। চাইলেও এখান থেকে আমি পালাতে পারব না। আর আমি পালাতে চাইওনা।”
সুমু তাচ্ছিল্যের করে হেসে বলল,
“ভালোবাসার নামে যে পাপের বিষ ঢেলেছেন, তার জন্য আমার বুকে শুধু অভিশপ্ত ঘৃণা বাঁচিয়ে রেখেছি।”
“ঘৃণা করো?”
“অবশ্যই! ঘৃণার আগুনই এখন আমার রক্তে ছুটে বেড়াচ্ছে, আপনার ছায়াটাকেও আর সহ্য হচ্ছেনা, পাপিষ্ঠ পুরুষ।”
“যার জন্য আমার কষ্ট ফুরিয়েছিল, আজ সেই আমার জন্য তার বুকের ভেতর অভিশাপের স্রোত নামিয়েছে।”
“আপনার ছলনার নিচে আমার সবটুকু পুড়েছে, আর সেই ছাই থেকে জন্ম নিয়েছে আমার অমোঘ ঘৃণা।”
“আমি ছলনা করিনা।”
“খান সাহেব! এই মুহুর্তে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথেই অভিশাপ জড়িয়ে আছে। এখন থেকে আর ভালোবাসা নয়, এ জন্মে শুধু আমার ঘৃণা নিয়েই থাকেন আপনি।”
“তাহলে, আর কোন জন্মে ভালোবাসবে?”
“পূর্ণজন্ম বলতে কিছু নেই, খান সাহেব। তাই আর কোনো জন্মেই আপনাকে ভালোবাসা হবে না। আর যদি পূর্ণ জন্ম থেকে থাকে তাহলে…”
“তাহলে, সেই জন্মে তোমার মনের মতো হবো, মায়াবতী, যেন আর কোনো অভিযোগ ভালোবাসায় কিংবা ভাগ্যের প্রতি না থাকে।”
সুমুর চোখ ভিজে উঠল। কান্নাটাকে লুকিয়ে সে বলল,
“যাকে ফেরেশতা ভেবেছিলাম, সে হলো বিষধর। এখন আমার প্রার্থনায়ও শুধু তার পাপের সর্বনাশ কামনা।”
“ঘৃণার ওজনে একদিন তোমার বুকই ভেঙে যাবে, পাপিষ্ঠ মানুষের ভালোবাসা এমনই শাস্তি টেনে আনে।”
“পাপিষ্ঠ পুরুষরা দেখতে খুব নিষ্পাপ হয়। সবচেয়ে পবিত্র মুখই সবচেয়ে গভীর পাপ লুকিয়ে রাখে।”
শেরাজ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। চোখদুটো লাল, ঠোঁট শক্ত করে চেপে রাখা, যেন নিজের সমস্ত ধৈর্য গিলে ফেলছে। তার বুকের ভেতরটা ছটফট করছে, কিন্তু সে চুপ।
সুমু আবার বলে উঠল,
“আপনি চুপ করে আছেন যে?”
শেরাজ ধীরে কাছে এগিয়ে এলো।
“আমি জানি, আমি তোমার চোখে এখন শয়তান। আর এইটাই স্বাভাবিক।”
সুমু হেসে ফেলল,
“আমি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার বিনিময়ে পেলাম বিষ।”
“তোমার ভালোবাসার দোরগোড়ায় আমি পাপী হয়েছি, সুইটহার্ট। কিন্তু মনে রেখো, আমার ভালোবাসায় কখনো পাপ ছিল না। পাপ করেছি আমি, কিন্তু ভালোবাসা—তা ছিল সত্যি।”
সুমু এক পা পিছিয়ে গেল। চোখে জল টলমল করছে, কিন্তু গলা শক্ত করে বলল,
“তাহলে সেই ভালোবাসার শাস্তিটাও আপনি একা ভোগ করবেন, আমি নই। এবার বিদায় এই ঘৃণার শহরেই থেকে, যেখান থেকে আমার ভালোবাসা বেরিয়ে গেছে চিরদিনের জন্য।”
“চলে যেতে চাইছ?”
“হ্যাঁ, ডিভোর্স দিয়ে দিন।”
শেরাজ নিজেকে শান্ত রাখতে পারছেনা, তবুও নিজেকে শক্ত করে রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য দুষ্টু হেসে বলল,
“বেডে এসো, ডিভোর্সের নেশা ছাড়াচ্ছি তোমার।”
“আমি মজা করছিনা, খান সাহেব। আমি সত্যি মুক্তি চাইছি।”
রুমটায় এক চিলতে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শেরাজ বেডসাইড টেবিল থেকে পানি ভর্তি গ্লাস তুলে এক চুমুকে শেষ করল। সে গ্লাসটা মুঠো করে এমনভাবে চেপে ধরল যেন ওটার মধ্যেই তার সব রাগ আটকে যায়। কিন্তু এক মুহূর্তে গ্লাসটা চূর্ণ হয়ে গেল। সুমু চমকে দৌড়ে এগোতে চাইলে শেরাজ এক হাতে ইশারা করে তাকে থামিয়ে দিল।
“ওকে যাও, মুক্তি দিলাম। তুমি পালাও।”
সুমু হতভম্ব হয়ে তাকাল তার দিকে।
“সত্যি বলছেন?”
“হুম! তবে ঠিক বাহাত্তুর ঘন্টা।”
“মানে?”
“মানে, তুমি ঠিক বাহাত্তুর ঘন্টা সময় পাবে পালানোর জন্য। এই সময়ের মধ্যে তুমি নিজেকে যেখানে খুশি লুকাও। কিন্তু, তার পরবর্তী চব্বিশ ঘন্টা—তা হবে আমার”, সে এগিয়ে এসে সরাসরি সুমুর চোখের দিকে তাকাল, “চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে যদি তোমাকে খুঁজে বের করতে না পারি, তাহলে তুমি মুক্ত সারা জীবনের জন্য। কিন্তু যদি খুঁজে পাই, তখন তোমাকে আমার খাঁচায় বন্দি করব, সারাজীবনের জন্য। তখন আর কোনোদিন পালানোর কথা মুখে এনো না। কারণ তখন তুমি দেখবে আমার সেই রূপ, যেটা কোনোদিন কল্পনাও করোনি।”
সুমু নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিস্ময় আর ভয় একসাথে খেলে যাচ্ছে তার চোখে-মুখে। শেরাজ রক্তমাখা হাত বাড়িয়ে সুমুর গাল ছুঁয়ে বলল,
“চিন্তা করোনা, সুইটহার্ট। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তোমাকে খুঁজে পেলেও তোমাকে আমার কাছে আনব না। আমি চাই তুমি উড়ো। উড়তে থাকো, যতদিন আমি চাই,” ঠোঁট এগিয়ে সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “এই শেরাজ খানহীন দুনিয়া চিনে নাও, ভালো করে বোঝো কেমন লাগে। যেদিন সব চেনা হয়ে যাবে, সেদিন আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনব আমার খাঁচায় চিরদিনের জন্য। আর তাছাড়া পালানোটা তোমার একটা স্বপ্ন হিসাবে ধরে নিলাম আমি। বলেছিলাম না, তোমার সব ইচ্ছা পূরণ করব।”
শেরাজ শেষ কথাগুলো বলে দরজার দিকে ঘুরে গেল। তার চলার গতি ধীর, কিন্তু পদক্ষেপ ভারী। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ঘরের মেঝে কাঁপিয়ে তুলছে। দরজা খুলে বেরিয়ে গেল সে। সুমু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখ দুটো স্থির, যেন শরীর এখানে, মন অন্য কোথায় হারিয়ে গেছে। কোনো শব্দ নেই। সুমুর বুকের ভেতরে বারবার কেঁপে উঠছে একটা প্রশ্ন,
“এটা কি সত্যি মুক্তি? নাকি নতুন কোনো শিকল পরানো হলো? এই বিদায় কি শেষ বিদায়?”
সুমু কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ ধীরে হাঁটা শুরু করল সে। হেঁটে বেলকনিতে চলে গেল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল উন্মুক্ত আকাশের দিকে। একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ তার কণ্ঠ ভেঙে বেরিয়ে এলো নরম অথচ কঠিন কিছু শব্দ,
“আমি আপনার সাথে থাকলে আপনি কোনোদিনও নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করবেন না,” তার চোখের কোনায় জমা জল এবার গড়িয়ে পড়ল, “আমি চাই প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা আপনি বুঝুন। বুঝুন, সেই ভাঙা বুকের অসহায়তা, যেটা আপনি অন্যদের বুকে চাপিয়ে দেন।”
সুমু হাতের মুঠো শক্ত করল। গলার সুর আরও দৃঢ় হয়ে উঠল তার।
“আপনি যাদের মারেন, তাদের জন্যও কেউ না কেউ বাড়ি ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে। তাদের জন্যও কেউ চোখে জল নিয়ে বসে থাকে। আপনি যাদের শেষ করে দেন, তারা শুধু নাম নয়— তারা কারো সন্তান, কারো ভাই, কারো স্বামী। কারো অবস্থানে না গেলে, কেউ কারো কষ্ট বোঝেনা। আর তাই আমি চাই, আপনি তাদের জায়গায় আসুন। আমি হারিয়ে গিয়ে আপনাকে শোধরাব। আমি আপনাকে একা রেখে সেই শূন্যতা বুঝতে বাধ্য করব। সবসময় ভালোবাসা মানেই পাশে থাকা না। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে, কাউকে নিজের মধ্যে অনুশোচনার আয়না দেখানোর জন্য দূরে সরে যাওয়া।”
মাস্কাট শহরের হাই-অ্যান্ড ক্লাব “দ্য ভেলভেট মুন”। ভেতরে হালকা ডিম লাইটিং, কাঠের কাঠামো ঘেরা প্রাইভেট বুথ, গোল্ডেন-গ্রে রঙের কম্বিনেশনে ইন্টেরিয়র। ড্রিঙ্কস কাউন্টার থেকে মৃদু জ্যাজ ভেসে আসছে। ক্লাবের জানালা দিয়ে দূরের শহরের আলো দেখা যাচ্ছে—ছবির মতো।
আরিয়ান চৌধুরী ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে। কালো টার্টলনেক, ওপরে হালকা ব্লেজার। হাতে একটা ক্লাসিক কফি মগ। ক্লান্ত চোখে ফোনে স্ক্রল করছে। রায়য়ান চৌধুরী এসে ঢুকল। হাফ স্লিভ শার্ট, একহাতে ফোন, আরেক হাতে গাড়ির চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে এলো সে। আরিয়ানকে কফি খেতে দেখে হেসে বলল,
“ক্লাবে কফি খাচ্ছিস?”
আরিয়ান চোখ না তুলে মৃদু হেসে বলল,
“ব্রেন জ্যাজ চালিয়ে রাখার জন্য ক্যাফেইন দরকার। তো আজ শেষরাতের ফ্লাইট, তাই না?”
রায়য়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল,
“হ্যাঁ ভাই, রাত তিনটা পনেরোতে। দিল্লি হয়ে কলকাতা, ছোট একটা ট্রিপ।”
আরিয়ান হালকা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“হুম! শুধু ব্যবসা, নাকি কিছু অন্য প্ল্যান?”
রায়য়ান চোখ ছোট করে বলল,
“ব্যবসা বলতে পারিস। কিন্তু একটু অন্যরকম শান্তির খোঁজেও যাচ্ছি।”
“তোর শান্তি মানে তো কাউকে অশান্ত করে ফেলা।”
রায়য়ান হালকা হেসে মুখ ঘোরাল ক্লাবের জানালার দিকে। বাইরে ঝিকিমিকি শহরের আলো। মৃদু জ্যাজের ভেতরে কথাগুলো যেন একটু ভারী হয়ে পড়ল। সে চোখ না সরিয়ে বলল,
“আশ্চর্য ব্যাপার কি জানিস? সবচেয়ে শান্ত মানুষগুলোকেই বেশি ঝাঁকুনি দিলে ওরা সবচেয়ে বেশি কাঁপে। আর কাঁপা শুরু করলেই, ভেঙে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।”
আরিয়ান গলার স্বর নিচু করে শান্ত কন্ঠে বলল,
“তুই কি সুমুকে নিয়ে বলছিস?”
রায়য়ান চোখ ফেরাল। সরাসরি তাকাল আরিয়ানের দিকে।
“তুই তো জানিস, ওর নাম এখন চৌধুরীদের আলোচনার টেবিলে। একটা নাম, একটা মুখ, যার চারপাশে সবকিছু ঘুরছে।”
আরিয়ান গ্লাসে থাকা কফিতে শেষ চুমুকটা দিয়ে বলল,
“তোর মুখে সুমুর নাম শুনলে আমার অস্বস্তি হয়। কারণ তোর আগ্রহটা পরিষ্কার। তুই সুমুকে ভাঙতে চাস।”
রায়য়ান চেয়ার থেকে সামান্য সামনে ঝুঁকে এসে বলল,
“ভাঙব কেন? আমি শুধু দেখতে চাই, ও নিজে কতটা গড়া। এস.কে ওকে আগলে রেখেছে, সেটা মানি। কিন্তু তুই-ই বল, একটা মানুষ যখন অন্য কারো ছায়ায় থাকে, তখন সে নিজের মতো করে বাঁচে কীভাবে?”
আরিয়ান চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল,
“তুই তাকে ছায়া বলছিস, আমি বলি নিরাপত্তা। সুমু যদি চায়, ও নিজেই বেরিয়ে আসতে পারবে। সেক্ষেত্রে কারো সাহায্য লাগবে না ওর।”
রায়য়ান হেসে উঠে বলল,
“তুই খুব আদর্শবানের মতো কথা বলিস, ভাই। কিন্তু ভালোবাসায় যারা হারে, তারা এসব আদর্শ নিয়েই ডুবে যায়। আমি হেরে যাওয়া খেলোয়াড় না। আমি শুধু দেখি কোথায় ফাঁকা, আর সেটা দিয়েই ঢুকি।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। ক্লাবের লাইট একটু ম্লান হলো, নতুন গান শুরু হলো ব্যাকগ্রাউন্ডে। রায়য়ান সামনের গ্লাসটা হাতে তুলে নাড়াতে নাড়াতে বলল,
“শোন, আমি কখনো সরাসরি আঘাত করি না। আমি শুধু জায়গা খুঁজি, যে জায়গায় হাত দিলেই মানুষটা নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে।”
আরিয়ান এবার চোখ তুলে চুপচাপ রায়য়ানের দিকে তাকাল।
“সেই ভারসাম্য যদি হয় ভালোবাসার, তাহলে হাত দিলে কিন্তু শুধু মানুষ না—ভালোবাসাও ভেঙে পড়ে। তুই কি সেইটা চাস?”
“আমি শুধু দেখতে চাই, এস.কে কতটা স্থির। তোর মনে হয় না, ওর ভিতরেও ভয় আছে? সুমুকে হারানোর ভয়। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ সেই, যার ভিতরে ভয় আছে কিন্তু মুখে তা নেই।”
“ভয় মানেই ভালোবাসা। যে মানুষ ভয় পায় কাউকে হারানোর, সে কখনো তাকে আঘাত করে না। তুই সেই ভয়টাকেই অস্ত্র বানাতে চাইছিস —এটাই পার্থক্য।”
রায়য়ান একটু চুপ করে গেল। গ্লাসটা ঠেলে দিল পাশে। হাতজোড় করে টেবিলের উপর ভর দিয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল”
“এস.কে শেষ হলে, সুমুকে তুই এমনিতেই পেয়ে যাবি।”
আরিয়ান থেমে গেল। কিছু বলার মতো থাকলেও, গলায় আটকে থাকা বাক্য বেরোলো না। সুমুর মুখ ভেসে উঠল মনে। সে আর কিছু বলতে পারল না। তবে চোখের ভেতরেই একটা স্বীকারোক্তি ঘুরছে—সে সত্যিই সুমুকে চায়।
রায়য়ান হাতঘড়ির দিকে চোখ রাখল। সময় রাত ১১ : ৫৮। গভীর রাত নামছে মাস্কাট শহরে, কিন্তু কারও কারও ভিতরে রাত নেমেছে আগেই। রায়য়ান উঠে দাঁড়াল। জ্যাকেটটা কাঁধে তুলল।
“উড়ছি আমি। তারপর কলকাতার আকাশে কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেব। যদি উত্তর মেলে, তাহলে সেই উত্তরের ওজন নিয়ে ফিরব। তুই এখানে ভালো করে দেখ, কে কেমন করে আগলে রাখে কাকে।”
সে চলে যেতে যেতে থামল এক মুহূর্ত। আরিয়ানকে আবারও দেখে বলল
“আর হ্যাঁ, যদি কোনোদিন সত্যিই সুমুকে তুই পেয়ে যাস, তখন নিজেকে জিজ্ঞেস করিস, তার ভালোবাসা কি তুই কোনোদিনও পাবি?”
কথাটা বলে সে হাঁটতে থাকে দরজার দিকে। বডিগার্ড ক্লাবের দরজা খুলে দিল। রায়য়ান ক্লাব থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। আরিয়ান একটুও নড়ল। সে বসেই রইল আগের জায়গায়।
ঘড়ির কাটায় রাত একটা পনেরো। বাড়ির সব আলো নেভানো। শুধু সুমুর রুমে বেলকনির একটা লাইট জ্বলছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সুমু। আজ আকাশে চাঁদ নেই। শহরের প্রতিটি দালানে জোনাকির মতো আলোগুলো দূরে দূরে জ্বলছে। সুমুর চোখে জল নেই, তবুও একটা অদৃশ্য ভার চোখের কোণে জমে আছে। শেরাজ এখনো ফেরেনি। ফোনটা একবার স্ক্রিন অন করে দেখল সে। কোনো মেসেজ নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর পায়ে রুমে ফিরে এলো। হালকা বাতাসে পর্দা একটু উড়ছে। বিছানার পাশে টেবিলের ওপরে রাখা খাতা আর কলম। সুমু ধীরে গিয়ে চেয়ারে বসল। একটু চুপ করে বসে থেকে, তারপর কলমটা তুলে নিল। খাতা খুলে, মাঝখানের একটা পাতায় লিখতে শুরু করল,
“খান সাহেব”
এই চিঠি লিখতে গিয়ে আমার হাত কাঁপছে না, শুধু বুকটা ভার হয়ে আসছে। এই প্রথমবার আমি এমন কিছু লিখছি, যেটা আপনি পড়ে হয়তো চুপ করে যাবেন। হয়তো ভাঙবেন কিছুটা। হয়তো চোখের কোণায় কিছু জমে উঠবে, যেটা আপনি খুব ভালো লুকাতে জানেন।
আমি জানি না, আপনি কখন পড়বেন এই চিঠি। আপনি কি আমার খালি জায়গাটা দেখে বুঝবেন আমি নেই? নাকি এই চিঠিটার ভাঁজেই আমার অনুপস্থিতি ধরা দেবে? আমি পালাচ্ছি না, আমি হার মানছি না, আমি বিদায় জানাচ্ছি না— আমি শুধু আপনাকে সময় দিচ্ছি। আপনি জানেন, আমি আপনাকে ভালোবাসি। একটা নির্মল, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, যা কোনো শর্তে বাঁধা না। কিন্তু আপনি? আপনি ভয় পান হারাতে। আর সেই ভয় ঢেকে রাখতে গিয়ে, আপনি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছেন। আপনি ভয় দেখান। আপনি অন্যদের কাঁদান। আপনি নিজেকে পাহাড় ভাবেন, কিন্তু পাহাড়ও একদিন ধসে পড়ে।
আপনি জানেন, যাদের আপনি শেষ করে দেন, তাদের জন্যও কেউ অপেক্ষা করে। আমি চাই, আপনি জানুন কারো হারিয়ে যাওয়ার ভয় কতটা পোড়ায়। আমি চাই, আপনি দাঁড়িয়ে থাকুন একা—আমার মতই চুপ করে। আমি চাই, আপনি আয়নায় নিজের চোখে তাকিয়ে দেখুন, আপনি কতটা খালি হয়ে গেছেন। আমি হারিয়ে গিয়ে আপনাকে শোধরাতে চাই, খান সাহেব। কারণ আমি পাশে থাকলে আপনি বদলাবেন না। আপনি জানেন, আমি থেকে যাব, আর তাই আপনি বদলাবেন না। আমি না থেকে বুঝিয়ে দিতে চাই—ভালোবাসা মানেই পাশে থাকা না। ভালোবাসা মানে কখনো কখনো নিজে না থেকে, কাউকে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ দেওয়া।
আপনি যেদিন বুঝবেন, ভালোবাসা হারিয়ে গেলে বুকের ভেতরে কেমন শুন্যতা অনূভব হয়। সেদিন আমি ফিরে আসব না হয়। আর যদি না বুঝেন, তাহলে আমি আর ফিরব না। আমি কখনো ভাবিনি, আমাকে এইভাবে চলে যেতে হবে। কিন্তু কিছু করার নেই, আমাকে যে যেতেই হবে।
আমি আপনাকে ভালোবাসি। আর তাই চলে যাচ্ছি। কারণ, আমি চাই আপনি শুধরে যান। আর আমাদের একটা সুন্দর সংসার হোক।
ইতি আপনার অর্ধাঙ্গিনী,
“সুমু!”
খান সাহেব পর্ব ৫৮
সুমু ধীরে চিঠিটা ভাঁজ করল। সাদা কাগজের গায়ে ছাপ ফেলল কিছু অনুচ্চারিত কান্না। কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দিল টেবিলের ওপরে। আলমারির দরজা খুলে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে নিল। গলা ছুঁয়ে দেখল তার মায়ের দেওয়া ছোট্ট পেন্ডেন্টটা। মৃদু হেসে সেটা খুলে রেখে দিল চিঠির ওপর। তার বদলে কিছু রিয়াল নিয়ে নিল।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল সে। শেরাজের দেওয়া সেই পারফিউমটা তুলে নিল। ঢাকনাটা খুলে একবার স্মেল নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সুমুর মনে হলো, তার খান সাহেব তার কাছেই দাঁড়িয়ে। সে চোখ মেলে তাকাল। দরজার দিকে হাঁটার আগে সে একবার ফিরে তাকাল রুমটার দিকে। চোখের পানি এসে জমেছে। সে তবুও কাঁদল না। কারণ সে জানে, ভেঙে পড়লে আর যেতে পারবে না সে। শক্ত হাতে চোখ মুছে নিল সে। ফোনটা হাতে নিয়ে সিমটা খুলে ফেলে দিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
