খান সাহেব পর্ব ৬৩
সুমাইয়া জাহান
ভোরের হালকা আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকে ঘরে পড়েছে। বাইরে রাতের বৃষ্টি থেমে গেছে, শুধু গাছের পাতায় জমে থাকা পানি ফোঁটা টুপটাপ করে পড়ছে মাটিতে। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ। ভোরের আলো ঘরে ঢুকলেও সুমুর চোখ খুলতে পারছে না। শরীরটা অদ্ভুত গরম লাগছে তার। শ্বাস ভারী, কপালে ঘাম জমে আছে। তবুও সে অনেক কষ্টে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। শরীর এখনো ব্যথায় অবশ, কিন্তু তার কানে ভেসে আসছে এক মৃদু, স্থির শ্বাসের শব্দ। সে অনুভব করল, নিজের মাথা শেরাজের বুকের ওপর রাখা, আর শেরাজের হাত শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে তাকে—যেন ভয় আছে, ছেড়ে দিলেই সে হারিয়ে যাবে।
সুমু কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইল। বাইরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। সে আস্তে করে মুখ তুলে তাকাল শেরাজের দিকে। তার চুল এলোমেলো, চোখের নিচে ক্লান্তি। তবুও ঘুমের ভেতরে মুখে শান্তির ছাপ। তার মনে পড়ে গেল রাতের প্রতিটা মুহূর্ত—ব্যথা, ঝড়, কান্না আর সেই অব্যক্ত ভালোবাসা। সে ধীরে ধীরে শেরাজের বুক থেকে মাথা সরাতে গেল, কিন্তু শেরাজের হাতের বন্ধনটা আরও শক্ত হয়ে গেল। চোখ না খুলেই শেরাজ ফিসফিস করে বলল,
“কোথায় যাবে, সুইটহার্ট?”
সুমু উত্তর দিল না। সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে না পেরে আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলল। শেরাজ প্রথমে বুঝতে পারেনি, কিন্তু সুমুর শরীর নিজের বাহুর ভেতর অস্বাভাবিক গরম লাগায় সে সুমুর কপালে হাত রাখতেই আঁতকে উঠল।
“কলিজা, তোমার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।”
সুমু আধো ঘুমে কিছু অস্পষ্ট শব্দ করে, আবার চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সে তাকাতে না পেরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে, গলার স্বর কর্কশ তার।
“পানি!”
শেরাজ তড়িঘড়ি করে বেডসাইড টেবিল থেকে গ্লাস তুলে এনে তার ঠোঁটে ধরল,
“ধীরে খাও!”
পানি খাওয়ার পর সুমু বিছানায় হেলান দিয়ে বসতে চাইল, কিন্তু শরীরের ব্যথা যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। মুখ বিকৃত হয়ে গেল কষ্টে। শেরাজের বুকের ভেতর কেমন যেন খচখচ উঠল। সে চুপচাপ তার চুলগুলো সরিয়ে কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। অপরাধীর ন্যায় তাকিয়ে বলল,
“গতরাতে খুব বেশি হয়ে গেছে। কিন্তু তুমি আমাকে থামাওনি, সুইটহার্ট। এখন তোমার এই অবস্থা দেখে আমার নিজের উপর রাগ হচ্ছে।”
সুমু কিছু বলল না, সে চোখ বন্ধ করে রাখল। শেরাজ ব্লাঙ্কেটের মধ্যে সুমুকে ভালোভাবে জড়িয়ে দিয়ে উঠে গিয়ে হালকা গরম পানিতে কাপড়ের টুকরো ভিজিয়ে নিয়ে এলো। সুমুর কপাল, গলা আর হাতের তালুতে আলতো করে চেপে দিল, যেন জ্বরটা কিছুটা কমে। শেরাজ কাপড় দিয়ে সুমুর কপালে চেপে ধরে রাখল কিছুক্ষণ। তার চোখে এখন কোনো আগ্রাসন নেই, আছে শুধু গভীর চিন্তা আর অপরাধবোধ। সে আস্তে করে সুমুর হাত নিজের হাতে নিয়ে চেপে ধরল। সুমুর চোখ আধখোলা, ঠোঁটে ক্ষীণ হাসির মতো কিছু, সে জ্বরের ঘোরে উল্টাপাল্টা বলতে শুরু করল।
“আপনি অফিস যাবেন না?”
শেরাজ মাথা নাড়ল। সে বিছানার পাশে বসে তার চুলে হাত বুলিয়ে যেতে থাকল, যেন প্রতিটা স্পর্শে রাতের সব ব্যথা মুছে দিতে চাইছে।
“তুমি জানো না সুইটহার্ট, গত তিন বছর তোমাকে ছাড়া আমার প্রতিটা সকাল ছিল মরুভূমির মতো শুকনো। আজ তুমি আছো, তাই এই সকালটা আমার কাছে বেঁচে থাকার মতো।”
সুমু চোখ বন্ধ রেখেই আস্তে বলল,
“ব্যথা তো এখনও আছে।”
শেরাজ ঝুঁকে তার কপালে ঠোঁট রাখল। মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে বলল,
“আমি জানি, সুইটহার্ট। আর সেই ব্যথা আমি সারিয়ে তুলব, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।”
সে আবার কাপড়ের টুকরো ভিজিয়ে সুমুর কপালে চেপে দিল। সুমু আবারও বলল,
“একটা কথা দিন খান সাহেব, আর কখনও কাঁদাবেন না আমাকে, প্লিজ। আমার চোখের পানি আপনার ভালো লাগেনা, বলেছিলেন তো?”
“শুধু রাত ছাড়া আর কখনো কাঁদাব না। তবে কথা দিতে পারছিনা, কারণ মাঝে মাঝে দিনেও কাঁদাতে পারি।”
“কেন? এতো নিষ্ঠুর কেন আপনি?”
“রাতের অন্ধকারে আমি খুব নিষ্ঠুর হতে পারি। আমার স্পর্শে তোমার চোখে পানি এলে, সে কান্না আমাকে পাগল করে দেয়।”
“রাতেই কেন? দিনে পারবেন না?”
এই পর্যায়ে এসে শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। সে জানে, তার ঝাঁসির রানি জ্বরের ঘোরে উল্টাপাল্টা বলছে। সে হাসি চেপে বলল,
“দিনে কখনও কখনও অসভ্য হই। তবে দিনে আমি বেশিরভাগ সময়-ই সভ্য স্বামী হয়ে থাকি, কিন্তু রাতে? রাতে তোমার জন্য আমার ভেতরের পুরুষত্বকে আর কন্ট্রোল করা সম্ভব হয় না। তখন সেই পুরুষ শুধু আদর করতে জানে না, সে দাবী জানে, শাস্তি জানে, স্পর্শে কাঁদাতে জানে।”
“আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
“না! আমি শুধু বলছি, তোমাকে ভালোবাসা মানে সব সময় কোমলতা নয়। কখনও সেটা গভীর কামনার কান্না, যেটা রাতের বুকে হারিয়ে যেতে চায়।”
“তাহলে কথা দিন, দিনে আমাকে ভালোবাসবেন, আর রাতে আমাকে ভেঙে, আবার গড়ে তুলবেন।”
“কথা দিলাম, দিনে তোমার সভ্য স্বামী হবো। আর রাতে, তোমার প্রিয়তম অত্যাচারী— শুধু তোমার জন্য।”
সুমুর চোখ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো। শেরাজ সুমুর কপাল থেকে চুল সরিয়ে আলতো করে গালে হাত বোলালো। তার আঙুলের স্পর্শে সুমুর নিঃশ্বাস খানিক কেঁপে উঠল। শেরাজ নিচু স্বরে বলল,
“তুমি জানো না সুইটহার্ট, তোমাকে হারানোর ভয় আমার সব রাগ, সব কঠোরতা গলিয়ে দেয়।”
সুমু আধো ঘুমে ফিসফিস করে বলল,
“তাহলে আমাকে আর কষ্ট দেবেন না, খান সাহেব।”
শেরাজ একটু ঝুঁকে তার কানে ফিসফিস করে বলল,
“দিনে তোমার হাসি দেখাই আমার সুখ। আর রাতে, তোমার কান্না শোনাই আমার পাগলামি।”
সুমু চোখ বন্ধ রেখেই হালকা হাসল।
“আপনি তাহলে আমাকে ইচ্ছা করে কাঁদাবেন?”
শেরাজের ঠোঁটে হালকা দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
“যে কান্না ভালোবাসার, সেটাই কষ্ট নেই, সুইটহার্ট। সেই কান্না আমার কাছে তোমার সবচেয়ে সুন্দর স্বীকারোক্তি।”
“আপনি জানেন, আমি আপনার সামনে দুর্বল হয়ে যাই?”
শেরাজ আলতো করে তার গাল দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলল,
“দুর্বলতা নয়, এটা আমার প্রতি তোমার আস্থা। তুমি জানো, তুমি যদি ভেঙে পড়ো, আমি তোমাকে ধরে রাখব। তুমি যদি হারিয়ে যাও, আমি তোমাকে খুঁজে আনব।”
সুমু আস্তে করে তার হাত চেপে ধরল।
“আর যদি আপনি কখনও হারিয়ে যান?”
“তাহলে আমি তোমার হৃদয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকব। যত দূরেই যাই, তোমার ডাকে ফিরব। কারণ তোমার কাছে ফেরাটাই আমার আসল ঠিকানা।”
সুমু ধীরে বলল,
“আপনি কি প্রতিশ্রুতি দেবেন, যতদিন বাঁচবেন আমার হাত ছাড়বেন না?”
শেরাজ তার হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
“প্রতিশ্রুতি দিলাম সুইটহার্ট, শুধু এই জীবন নয়, যদি পরের জন্মও থাকে, সেখানেও তোমাকে খুঁজে বের করব। কারণ তুমি আমার শেষ, আর আমার শুরু।”
সুমুর মুখে এক অশ্রুসিক্ত হাসি ফুটে উঠল। শেরাজ ধীরে তাকে বুকে টেনে নিল। দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে গেল। হৃদস্পন্দনের তালে তালে যেন এক অটুট প্রতিশ্রুতির সুর বেজে উঠল। সুমু ধীরে চোখ খুলে দেখল, শেরাজ তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। জ্বরের ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও বুকের ভেতর একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল তার—এই মানুষটা, যাকে সে যতটা ভয় পায়, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। সুমু নরম গলায় বলল,
“খান সাহেব, আপনি কখনো ভাবেন, যদি আমি আপনার জীবনে না আসতাম?”
শেরাজ তার দিকে তাকাল, ঠোঁটে তীক্ষ্ণ হাসি তার।
“ভাবলেই রাগ হয়। কারণ তোমাকে ছাড়া আমার জীবন মানেই অপূর্ণ শ্বাস, অসম্পূর্ণ সকাল, আর নির্জন রাত।”
সুমুর ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল,
“তাহলে কী আমি আপনার জীবন বদলে দিয়েছি?”
শেরাজ ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো সুমুর আঙুলের ভাঁজে জড়িয়ে নিল।
“তুমি শুধু জীবন বদলাওনি, তুমি আমার ধ্বংস হওয়া ভেতরটাকে নতুন করে গড়ে তুলেছো। সুইটহার্ট, তুমি না থাকলে আমি আজও শুধু রাগ আর শূন্যতা নিয়েই বেঁচে থাকতাম।”
সুমু গলা নামিয়ে বলল,
“আপনি জানেন, আমি আপনাকে শুধু ভালোবাসি না, আমি আপনাকে ভয়ও পাই।”
শেরাজ হালকা হেসে সুমুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল।
“ভয় পাওয়া ভালো। তাতে ভালোবাসার গভীরতা টিকে থাকে। তবে মনে রেখো, আমাকে কঠোরতার চেয়ে আমার ভালোবাসা অনেক বেশি প্রবল।”
সুমুর চোখ ভিজে এলো।
“কথা দিন, এই ভালোবাসা কখনো বদলাবে না।”
শেরাজ তার চোখের পানি আঙুলের ডগায় মুছে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এ ভালোবাসা বদলাবে শুধু একভাবে—সময় যত যাবে, তত বাড়বে। এবার পুরো পৃথিবী জানবে তুমি শুধু আমার।”
সুমু হালকা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আমি তো এখনই আপনার, খান সাহেব।”
“জানি। কিন্তু আমি চাই, এই সত্যিটা তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে, প্রতিটা স্পর্শে, প্রতিটা ধ্বনিতে অনুভব করাতে। যাতে কোনদিন, কোনো মুহূর্তে তুমি আমাকে ছাড়া নিজেকে কল্পনাও করতে না পারো।”
সুমু চুপ করে রইল। শেরাজ সুমুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে নিচু স্বরে বলল,
“সুইটহার্ট, তুমি জানো কেন আমি তোমার দিকে এতক্ষণ তাকিয়ে থাকি?”
সুমু অবাক হয়ে মাথা নাড়ল।
“কেন?”
“কারণ আমি ভয় পাই, চোখ সরালেই তুমি হারিয়ে যাবে। আমি তোমাকে এতটাই কাছে চাই, যেন আমার ছায়াও তোমার থেকে দূরে যেতে না পারে।”
সুমুর শ্বাস হালকা কেঁপে উঠল,
“খান সাহেব, আপনি জানেন, আমি কখনও কারো জন্য নিজের সব কিছু ছাড়িনি। কিন্তু আপনার জন্য আমি আমার স্বপ্ন, আমার অহংকার, এমনকি নিজের সুখও ছেড়ে দিতে পারি।”
শেরাজ তার হাত দুটো নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল।
“না, সুইটহার্ট! তোমাকে কিছু ছাড়তে হবে না। তোমার প্রতিটা স্বপ্ন আমি নিজের হাতে পূরণ করব। তোমার হাসিটা আমার জয়ের মুকুট, আর তোমার কান্না আমার পরাজয়ের ঘোষণা।”
“আপনি কি সত্যি আমাকে সারাজীবন এভাবে ভালোবাসবেন?”
শেরাজ চোখের গভীরতায় প্রতিশ্রুতি মিশিয়ে বলল,
“যতদিন আমার শ্বাস চলবে, ততদিন আমার হৃদয়ে শুধু তোমার নাম থাকবে। আর যদি কখনও আমার ভালোবাসা কমে যায়, তখন আমি বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলব।”
সুমু নিঃশব্দে চোখের পানি মুছে ফেলে বলল,
“এতো কেন ভালোবাসেন আমাকে?”
শেরাজ ঠোঁটে রহস্যময় হাসি টেনে বলল,
“কারণ তুমি আমার শুধু ভালোবাসা নও, তুমি আমার অধিকার। তুমি আমার গল্পের একমাত্র নায়িকা, আর আমার জীবনের শেষ ঠিকানা।”
সুমু তার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কিছু বলার শক্তি নেই। শেরাজ ধীরে ধীরে বলল,
“একদিন তুমি বুঝবে সুইটহার্ট, আমি যতটা তোমাকে ভালোবাসি, ততটা কেউ কোনোদিন কাউকে ভালোবাসেনি।”
সুমু ধীরে শ্বাস নিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। বুকের ভেতর যেন একসাথে হাজারো প্রশ্ন আর উত্তর জাগছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কিছু বেরোলো না। শেরাজ আলতো করে তার থুতনি তুলে ধরে বলল,
“চুপ হয়ে গেলে কেন, সুইটহার্ট?”
সুমু ধীরে বলল,
“কারণ আমি ভয় পাচ্ছি। এই মুহূর্তটা যেন স্বপ্ন না হয়। যদি হঠাৎ চোখ খুলে দেখি, সব মায়া ভেঙে গেছে?”
“যতদিন আমি আছি, ততদিন এই মুহূর্ত কোনো স্বপ্ন নয়। এটা আমাদের বাস্তব, আমাদের গল্প।”
“আপনি কি জানেন, আমি আপনাকে শুধু ভালোবাসি না। আমি আপনাকে আমার জীবনের একমাত্র প্রার্থনা বানিয়ে ফেলেছি।”
শেরাজ তার কপালে দীর্ঘ চুমু দিয়ে বলল,
“আর আমি তোমাকে আমার একমাত্র নিশ্চিত ঠিকানা বানিয়েছি। পৃথিবী যতই বদলাক না কেন, আমার শেষ গন্তব্য সবসময় তুমি।”
সুমু হালকা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“যদি কোনদিন আমি আপনাকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হই?”
শেরাজের চোখ কঠিন হয়ে উঠল, তবুও সে নরম কণ্ঠে বলল,
“তাহলে আমি তোমার হাত ছেড়ে দেব না। তোমাকে হারানো মানে আমার নিজেকে হারানো। আমি তোমাকে আঁকড়ে ধরব, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার শ্বাস আছে।”
সুমুর চোখ ভিজে এলো। শেরাজ সেই অশ্রু মুছে দিয়ে হালকা হাসল।
“এই চোখের পানি আমি পছন্দ করি না। তবে যদি ভালোবাসার জন্য কাঁদো, আমি তোমার কান্না আমার বুকে সযত্নে রেখে দেব।”
সুমু তার বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“খান সাহেব, আপনি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দুঃসাহস।”
শেরাজ ঠোঁটে হাসি এনে তার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে বলল,
“আর তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে মিষ্টি বন্দিত্ব। এই কারাগার থেকে আমি কখনো মুক্তি চাই না, কারণ এই বন্দিত্বেই আমার মুক্তি লুকানো।”
কিছুক্ষণের নীরবতার মধ্যে শুধু দু’জনের হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছে। শেরাজ নিচু স্বরে বলল,
“তুমি জানো সুইটহার্ট, তোমাকে আলিঙ্গন করার এই মুহূর্তটাই আমার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। এখানে আমি কোনো ভয় পাই না, কোনো শূন্যতা থাকে না।”
সুমু ধীরে বলল,
“আপনি সবসময় এমন থাকবেন তো? বদলে যাবেন না তো?”
শেরাজ হালকা হেসে তার কপালে চুমু দিয়ে বলল,
“বদলাবো, তবে শুধু তোমাকে ভালোবাসার পরিমাণ প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়বে।”
“আপনার এসব কথা শুনে মনে হয়, আমি আপনার জন্য কিছুই করতে পারিনি।”
শেরাজ গম্ভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আমার জন্য শ্বাস নিচ্ছো, সেটাই যথেষ্ট। তোমার অস্তিত্বই আমার প্রতিদিনের অলৌকিকতা।”
সুমু চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি কি জানেন, আপনাকে ছাড়া আমি নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে করি?”
“তুমি অসম্পূর্ণ নও, তুমি আমার মধ্যে পূর্ণতা পেয়েছ, যেমন আমি তোমার মধ্যে পেয়েছি। আমরা একে অপরের শেষ অংশ। যেটা ছাড়া আমাদের গল্প অসমাপ্ত থেকে যেত।”
সুমু চুপচাপ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ ফিসফিস করে বলল,
“প্রতিদিন তোমার চোখে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে চাই, সুইটহার্ট। যাতে মনে থাকে, আমি তোমার, আর তুমি শুধু আমার।”
সুমু আস্তে বলল,
“আমি সবসময় আপনারই থাকব, খান সাহেব।”
শেরাজ ঠোঁটে একটা হাসি টেনে বলল,
“এই প্রতিশ্রুতিটা আমাদের জীবনের শেষ পর্যন্ত থাকবে। আর সেদিন, যখন আমরা বুড়ো হয়ে যাবো, তখনও আমি তোমাকে এভাবেই বলব—সুইটহার্ট, তুমি আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত।”
“কিন্তু, আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না, আমি জানি।”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে গান ধরল,
“ম্যা যো জি রাহা হুঁ,,,
ওয়াজা তুম হো….”
সুমু আলতো হাসল। কথা বলতে বলতে সুমুর চোখ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো। নিঃশ্বাসের শব্দ ধীর হলো, আর মুহূর্তের মধ্যে সে আবারও ঘুমিয়ে পড়ল। শেরাজ তার মুখের ওপর থেকে চুল সরিয়ে বেডে আরাম করে শুইয়ে দিয়ে ব্লাঙ্কেট ঠিক করে দিল, যেন ঠাণ্ডা না লাগে। তাদের তিন বছরের জমানো কথার সময়টা আজ একটু বেশি দীর্ঘ হলো। সে একবার সুমুর শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হালকা শ্বাস ফেলে নিঃশব্দে বেডসাইড টেবিল থেকে নিজের ফোনটা হাতে তুলে নিল। বেড থেকে নেমে বেলকনির দিকে হাঁটল। ফোনে ডায়াল করে স্যান্ডিকে কল দিল। লাইন ধরতেই কণ্ঠ কঠিন হয়ে গেল তার।
“ত্রিশ মিনিটের মধ্যে একজন ডক্টর নিয়ে আমার চোখের সামনে হাজির হবে।”
লাইন কেটে সে কিছুক্ষণ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রইল। দূরে শূণ্যের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, তার মন পড়ে রইল ঘরের ভেতরের ঘুমন্ত মেয়েটির কাছে। সে ফোনটা পকেটে রেখে আবার ভেতরে এলো। সুমুর কপালে হাত রেখে দেখল, জ্বর এখনো কমেনি। তার চোখে আবারও সেই অদৃশ্য অপরাধ বোধের ছায়া ফিরে এলো।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এসেছে। সুমু এখন বিছানায় বসে আছে, পিঠে নরম বালিশ ঠেস দিয়ে। হাতে একটা বই, পাতাগুলো ধীরে ধীরে উল্টাচ্ছে। ডাক্তার এসে তাকে দেখে গেছে। তার জ্বর এখনও আছে, তবে চিন্তার কিছু নেই বলে গেছেন।
শেরাজ আজ নিজ হাতে সুমুর জন্য স্যুপ বানিয়েছে। সে টেবিলের ওপর খাবারের ট্রে রেখে সুমুর পাশে এসে বসে আছে।
“বইটা এখন রাখো, সুইটহার্ট। আগে কিছু খেয়ে নাও।”
সুমু মাথা তুলে তাকাল।
“আপনি এখন আমাকে বাচ্চাদের মতো ট্রিট করছেন।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে হাসি এনে বলল,
“না, আমি তোমার, আমার মতো করে যত্ন নিচ্ছি। এখন মুখ খোলো।”
সুমু একটু গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“আমি নিজে খেতে পারি।”
শেরাজ মাথা নেড়ে চামচে স্যুপ তুলে ধরে বলল,
“আমি জানি তুমি পারো। কিন্তু আজ আমি খাওয়াতে চাই। একদিনের জন্য হলেও আমার ইচ্ছে পূরণ হতে দাও।”
সুমু কোনো কথা না বলে চামচের দিকে এগিয়ে এলো। শেরাজ ধীরে ধীরে তাকে খাওয়ালো। খাবার শেষে সে পানি এগিয়ে দিয়ে, ডাক্তার দেওয়া ওষুধগুলো একে একে হাতে তুলে দিল। সুমু ওষুধ খেয়ে হালকা বিরক্তির ভঙ্গি করে বলল,
“ঔষধের স্বাদ খুব বাজে।”
শেরাজ তার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“ঔষধের স্বাদ যদি তিক্ত হয়, আমি কি মিষ্টি কিছু দিয়ে সেটা ভুলিয়ে দেব?”
“আপনার মিষ্টি মানে তো…”
শেরাজ চোখ মেরে বলল,
“মানে তুমি খুব ভালো করেই জানো।”
সে ট্রেটা সরিয়ে রেখে আবার সুমুর পাশে বসে পড়ল।
“এবার বই বন্ধ করো।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“না, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস পড়ছি।”
“কি পড়ছ?”
“‘ফিফটি শেডস অফ গ্রে’ বুক। অনেকদিন ধরে বইটির কথা শুনছিলাম। অনেক রিভিউ ও দেখলাম। ভাবলাম, দেখি কী এমন আছে। তাই, আজ থেকে পড়া শুরু করলাম। আচ্ছা, এইটা নিয়ে নাকি মুভিও আছে? আপনি দেখেছেন মুভিটা?”
“হুম, কেন?”
“আগে স্টোরিটা পড়ে দেখি। ভালো লাগলে মুভিটাও দেখব।”
“হঠাৎ এই মুভি কেনো দেখতে চাইছ?”
“কি আর বলব। একা একা বোর হচ্ছিলাম। ফেসবুক স্ক্রোল করতে করতে মুভিটার রিভিউ দেখলাম। কিউরিয়াস লাগল। আপনি বলেন না, কি হয়। একটু রিভিউ দিন না। আমি দেখতে চাই।”
“রিভিউ কীসের দরকার? আমি তো আছি। তোমার জন্য এই মুভির প্রতিটা সিন লাইভ করে দেখাতে পারি।”
“আপনি?”
“হুম! তুমি যদি দেখার সাহস রাখো—তাহলে গল্পের বাইরেও অনেক কিছু শেখানো যায় তোমাকে।”
সুমুর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন?”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে এক দুষ্টু হাসি টেনে নিয়ে বলল,
“মানে, বইয়ে পড়লে শুধু কল্পনা পাবে, কিন্তু আমার কাছে বাস্তব অভিজ্ঞতা পাবে।”
“আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে, আপনি আমাকে বই পড়তে দেবেন না।”
“তোমার হাতে বই মানে, আমার সময় নষ্ট হওয়া। আর আমি আমার সময় নষ্ট হতে দেওয়া মানুষ নই, সুইটহার্ট।”
সুমু ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। শেরাজ তার মুখের ভঙ্গি লক্ষ্য করে কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি যদি ফিফটি শেডস পড়তে চাও, আমি তোমার জন্য সিক্সটি শেডস তৈরি করে দেব। যেটা শুধু আমার আর তোমার গল্প হবে।”
“আপনি তো খুবই…”
শেরাজ কথা কেটে নিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,
“খুবই কী?”
“খুবই ডেঞ্জারাস।”
শেরাজ ঠোঁটে হালকা চাপা হাসি টেনে ধীরে বলল,
“তোমার জন্য আমি সবসময় ডেঞ্জারাস, কিন্তু সেই বিপদেই তুমি সবচেয়ে নিরাপদ থাকবে।”
সুমু মুখ ঘুরিয়ে বাইরে তাকাল, কিন্তু তার গাল লাল হয়ে উঠল। শেরাজ তার গাল আলতো করে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
“অনেকদিন পর তোমার লজ্জামাখা মুখটা দেখলাম।”
“আপনি আজ এমন কথা বলছেন কেন?”
“কারণ তোমাকে এই লজ্জা পাওয়া মুখটায় খুব মানায়, সুইটহার্ট। মনে হয়, এই পৃথিবীতে তোমার জন্য সবকিছু থমকে আছে, শুধু আমার হৃদস্পন্দন ছাড়া।”
“আপনি সবসময় এমন নাটকীয় কথা বলেন কেন?”
“নাটকীয় নয়, সত্যি। তুমি যখন লজ্জা পাও, তখন আমার মনে হয়, আমি তোমার ভেতরের সবচেয়ে কোমল অংশটাকে ছুঁতে পেরেছি।”
“আপনি কী সবসময় আমাকে এভাবে টিজ করবেন?”
“টিজ করব, আদর করব, রাগাবো, হাসাবো, সবই করব। কারণ আমি তোমাকে শুধু ভালোবাসতে চাই না, তোমার প্রতিটা আবেগে থাকতে চাই।”
“চুপ করুন!”
“চুপ করব কেনো? সকালে জ্বরের ঘোরে তুমি আমার সাথে যা যা করলে। এখন আমি সমাজে মুখ দেখাব কীভাবে?”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কী করেছি আমি?”
“আমার তিন বছরের ভার্জিনিটি নষ্ট করে দিয়েছ। আমার ইজ্জত লুট করেছ।”
“আমি বিশ্বাস করিনা। আমি এসব করিনি।”
“আমার ইজ্জত লুট করে, এখন তুমি অস্বীকার করছ? আমি জানি, সবাই এমন করে। প্রথমে বাজে দৃষ্টি দিল, তারপর সুযোগ বুঝে ইজ্জত লুট করে। আর তারপর দায়িত্ব নেওয়ার ভয়ে সবাই অস্বীকার করে। তুমিও আমার সাথে তেমনটাই করছ।”
সুমু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“দেখুন খান সাহেব…”
কথা কেড়ে নিল শেরাজ।
“কাল রাতেই তো দেখলাম। আবারও দেখাতে চাও? ওকে, আই এম রেডি ঝাঁসির রাণী। ওপেন।”
“আপনি আমাকে লজ্জায় ফেলছেন।”
শেরাজ হালকা হেসে বলল,
“তাহলে লজ্জা পেতে থাকো, সুইটহার্ট। কারণ তোমার এই লজ্জাই আমাকে সবচেয়ে বিপজ্জনক করে তোলে।”
ওদের কথার মধ্যেই হঠাৎ দরজা জোরে ঠেলে রুমে ঢুকে এলো নাতাশা। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ম্যাম, আপনার কী হয়েছে? আপনি নাকি অসুস্থ?”
তার দৃষ্টি সুমুর দিকে, কিন্তু এক মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ গিয়ে পড়ল শেরাজের ওপর। শেরাজের গভীর, ঠাণ্ডা দৃষ্টি তার দিকে পড়তেই নাতাশা যেন জমে গেল। তড়িঘড়ি করে ‘সরি’ বলে সে বেরিয়ে যেতে গেল। দরজার বাইরে পা দিতেই নাতাশা স্যান্ডির সাথে ধাক্কা খেলো। স্যান্ডির হাতে থাকা ফাইল পড়ে নিচে যেতে গেল। স্যান্ডি বিরক্ত হয়ে বলল,
“হেই! সামনে তাকিয়ে হাঁটতে পারেন না নাকি?”
নাতাশাও কম যায় না। সে ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল,
“আপনি নিজেই তো রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিলেন।”
“আমি রাস্তা আটকাইনি। আপনি হুট করে রুম থেকে বের হলেন কেন?”
নাতাশা দু’হাত কোমরে রেখে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“আমি ম্যামকে দেখতে এসেছিলাম। আর আপনি কে?”
স্যান্ডি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আমি যেই হই না কেন, অন্তত অন্ধভাবে কাউকে ধাক্কা মারি না।”
“ওহ! মানে আপনি বলতে চাইছেন, আমি অন্ধ?”
“যদি জোরে ধাক্কা দিয়ে কারও জিনিস ফেলে দেওয়ার অবস্থা করেন। তাহলে হ্যাঁ, সেটাই বলতে চাইছি।”
দুজনের চোখে চোখ আটকে গেল, যেন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতর থেকে শেরাজের কঠিন কণ্ঠ ভেসে এলো,
“দুজনেই ভেতরে এসো!”
স্যান্ডি নাতাশার দিকে শেষবার এক বিদ্রূপী দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। নাতাশা বিরক্ত মুখে ফিসফিস করে বলল,
“উফ! কী অভদ্র লোক।”
স্যান্ডি ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে মনে মনে বলল,
“এই মেয়ে তো একেবারে তেড়েমেড়ে টাইপ।”
স্যান্ডি ঢুকতেই নাতাশাও ভেতরে ঢুকল। শেরাজ চোখ সরু করে দুজনের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল,
“এতো জোরে ঝগড়া করছো কেন তোমরা দুজন? বাইর থেকে তোমাদের দুজনের আওয়াজ এখান পর্যন্ত আসছে।”
নাতাশা মুখ খুলে কিছু বলতে চাইলে স্যান্ডি আগে বলে উঠল,
“আমি আসছিলাম স্যার, উনি এসে ধাক্কা দিয়ে…”
নাতাশা সাথে সাথে কথা কেটে দিল,
“মিথ্যে বলছেন উনি। উনিই রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিলেন।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“চুপ! এখানে আমি কোনো বাজার বসাইনি। তোমরা দুজনেই চুপচাপ থাকবে।”
দুজনই মুখ বন্ধ করে চুপ দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু চোখে চোখ পড়তেই ভেতরে ভেতরে যেন আবারও ছোট্ট যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তাদের। নাতাশা স্যান্ডিকে মুখ ভেঙিয়ে সুমুর দিকে তাকাল। হঠাৎ সে খেয়াল করল সুমুর গলায় রক্তের মতো ছোপ ছোপ দাগ। নাতাশা বিচলিত হয়ে বলল,
“ম্যাম, আপনার হঠাৎ এতো জ্বর এলো কীভাবে? আর আপনার গলায়…”
নাতাশা কথাটা শেষ করতে পারল না। তার আগেই স্যান্ডি তার হাতে চিমটি কাটল। নাতাশা চমকে উঠল। স্যান্ডির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“এই, আপনি আমাকে চিমটি কাটলেন কেন?”
স্যান্ডি মুখে একেবারে নির্দোষ ভাব এনে বলল,
“আমি? আহা! হয়ত ভুল করে লাগিয়ে ফেলেছি। আপনি তো এমনিতেই গরম হয়ে আছেন, তাই বুঝতে পারেননি।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে দুজনের দিকে তাকাল।
“তোমরা আবার শুরু করেছ নাকি?”
নাতাশা ঠোঁট কামড়ে চুপ হয়ে গেল, কিন্তু তার দৃষ্টি এখনও সুমুর গলায়। সুমু অপ্রস্তুত হয়ে ওড়না সামলে নিল। শেরাজ সেটা লক্ষ্য করে সুমুর দিকে একবার তাকিয়ে নাতাশা আর স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে সোজা গলায় বলল,
“দুজনেই এখন যাও!”
নাতাশা গম্ভীর মুখে মাথা নাড়াল। স্যান্ডি হালকা হাসি চেপে ফাইলের কাগজ উল্টাতে থাকল, যেন কিছু হয়নি। নাতাশা মাথা সোজা করে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগোলো, কিন্তু বের হওয়ার সময় সুমুর দিকে একবার দীর্ঘ দৃষ্টি ফেলে গেল। ঘরে আবারও নীরবতা নেমে এলো। শেরাজের মনোযোগ আবারও পুরোপুরি সুমুর দিকে ফিরে গেল। স্যান্ডি ও নাতাশার পিছু পিছু বেরিয়ে গেল।
দুজনেই নিচে আসতেই, স্যান্ডি নাতাশার পথ আটকে বলল,
“আপনি কি বাচ্চা?”
নাতাশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে?”
“মানে, ম্যামের গলায় কিসের দাগ আর জ্বর আসার কারণটা কী আপনি বুঝেন না?”
নাতাশা চোখ বড় করে স্যান্ডির দিকে তাকাল।
“আপনি বলতে চাইছেন, কাল রাতে স্যার এখানে ছিল? আর তারা দুজন…”
নাতাশা লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেল। স্যান্ডি ঠোঁটে কৌতুকমাখা হাসি এনে ফিসফিস করে বলল,
“কিছু বিষয় আছে, যা জিজ্ঞেস না করাই ভালো। বিশেষ করে যখন সেটা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘটে।”
নাতাশার মুখে লজ্জা, রাগ আর অস্বস্তি মিশে।
“আপনি খুব বাজে মানুষ।”
স্যান্ডি হালকা হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“আমি শুধু বাস্তব বুঝি। আর আপনি বুঝতে চান না বলেই এতো প্রশ্ন করেন।”
নাতাশা ঘুরে চলে যাওয়ার সময় পেছন ফিরে একবার কটমট করে তাকাল।
“আপনার সাথে আর কথা বলার ইচ্ছে নেই আমার।”
স্যান্ডি মুচকি হেসে পিছন থেকে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৬২
“ভালোই হবে, তাতে আমার কানও বাঁচবে।”
নাতাশা বিরক্ত ভঙ্গিতে কটমট করতে করতে চলে গেল। স্যান্ডিও মাথা নেড়ে নিজের কাজে চলে গেল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে সেই বিদ্রূপী হাসিটা রয়েই গেল।
