খান সাহেব পর্ব ৬৪
সুমাইয়া জাহান
দুপুরের নিস্তব্ধতা ঘিরে রেখেছে কারাগারের কাচঘরটাকে। বাইরে রোদ ঝলমল করছে, কিন্তু ভেতরে এক অন্যরকম অন্ধকার আর নিঃসঙ্গতার আবরণ আছে। সুমুর মাথার এলোমেলো চুলগুলো তার কাঁধে নেমে এসেছে, চোখে ভেসে উঠেছে অজানা ক্লান্তি আর এক রকম নিষ্প্রভ আলো। কারাগারের দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে সে। হাতে ডায়েরি, যেখানে সে ধীরে ধীরে কিছু লিখছে এবং আঁকছে।
হঠাৎ নিরিবিলি সেই মুহূর্তে প্রবেশ করলেন আলিয়া, যিনি কিছুক্ষণ আগে চলেছিলেন, কিন্তু আবারও ফিরে এলেন নিঃসঙ্গতা ভাঙার জন্য। তার চোখে গভীর করুণার ছোঁয়া আর মুখে মৃদু একটি চিন্তাশীল হাসি। সে চুপচাপ সুমুর পাশে বসে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বললেন,
“তিনটা বছর নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে ছাড়া কাটিয়ে দিলে? কীভাবে পারলে সুমু?”
সুমুর ধীরে বলল,
“এখনো তো কাটাচ্ছি।”
আলিয়ার চোখে সন্দেহ আর কৌতূহল একসাথে ফুটে উঠল,
“এরপর তো সারাটা জীবন কাটাতে হবে? কীভাবে থাকবে তুমি তাকে ছাড়া?”
সারাটা জীবন শব্দটা শুনে সুমু হঠাৎ থমকে গেল। মুখে এক অদ্ভুত বিষাক্ত হাসি ফুটল তার। চোখে যেন এক গোপন পরিকল্পনার আগুন জ্বলছে। আলিয়া হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সুমু হাসি থামিয়ে চোখ বন্ধ করে গম্ভীর হয়ে বলল,
“রহস্যটাই তো এখানে, ম্যাম। আপনাকে বলেছিলাম, আমার এই ডায়েরির গল্পটা অসমাপ্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো— সত্যিই কী অসমাপ্ত? নাকি গল্প এখনো বাকি আছে?”
আলিয়া একটু খানিক এগিয়ে এলো। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“তুমি খুব রহস্যময়ী, সুমু। আমি তোমাকে বুঝতে পারি না কখনো। সে তো এখন নেই। তাহলে কীভাবে গল্প এখনো বাকি থাকে?”
সুমুর ধীরে ডায়েরিটা আলিয়ার হাতে দিয়ে বলল,
“গল্প যেখানে থেমে যায়, সেখান থেকেই ভালোবাসা সময় আর ব্যবধানের ঊর্ধ্বে উঠে যায়— সেখানেই বাকি থাকে গল্পটা।”
আলিয়া চোখ মেলে তাকিয়ে রইল, যেন কোনো অনন্ত গোপন সত্যের দরজায় পা দিয়েছিল সে। নীরবতা আবার ফিরে এলো। সুমুর মুখে সেই চিরচেনা কোমলতা ফিরে এলো। সে ডায়েরিটা নিয়ে আবারও ডায়েরির পাতায় কিছু আঁকতে শুরু করল।
“আসুন! আবারও শুরু করি।”
কেটে গেল আরও একমাস। সবকিছু এখন অনেকটা স্বাভাবিক। আরিয়ান সেই রাতের পরেই ওমানে ফিরে গেছে। সুমুরাও কাল ফিরে যাবে। আজ সে অফিসে এসেছে শেষবারের মতো — সব কাজ গুছিয়ে নেবার জন্য, দায়িত্ব ম্যানেজারকে হস্তান্তর করার জন্য। তার অনুপস্থিতিতে সব কাজ এখন থেকে ম্যানেজার দেখাশোনা করবে।
সুমুর পরনে কালো শার্ট, শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা, হাতা ফোল্ড করা, সাথে কালো রিপ্ট জিন্স — হাঁটুর কাছে হালকা ফাটা ডিজাইন, সুমুর লম্বা চুলগুলো স্ট্রেইট করে ছেড়ে রাখা, কালো চুলগুলো কাঁধের ওপরে ও পেছনে ঝরে পড়েছে। মাথার ওপর কালো সানগ্লাস তুলে রাখা, কানে ছোট সোনালি রঙের দুল, বা’হাতে ঘড়ি সরু আর ডান হাতে ব্রেসলেট পরা। ডেক্সে বসে সে ধীরে ধীরে ফাইলগুলো সাজাচ্ছে। সে আজ খুশি। তিনটা বছর পর সে তার চিরচেনা সেই দেশে ফিরছে। সেখানের প্রতিটা মানুষ তার নিজের। নাতাশা দাঁড়িয়ে আছে সুমুর সামনে। তার পরনে গাঢ় ধূসর রঙের শার্ট, শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা, সাথে কালো রিপ্ট জিন্স— যার হাঁটুর কাছে হালকা ফাটা ডিজাইন। কাঁধে বাদামী রঙের ব্যাগ, চুল স্ট্রেইট করে ছেড়ে রাখা, মাথার ওপর সানগ্লাস তুলে রাখা, কানে ছোট কানের দুল। তার লুকটা হুবহু সুমুর মতো। তাদের দেখলে যে কেউ বলবে তারা দু’বোন। এমনিতেও সুমু নাতাশাকে নিজের বোন মনে করে। খুব ভালোবাসে এই মেয়েটাকে সে। তিন বছর ধরে দুজনে একসাথেই আছে।
নাতাশা একটু সময় নিয়ে বলল,
“ম্যাম, পরশু রায়য়ান স্যারও ওমান ফিরে যাচ্ছে। এবার আলিশা আর মরিয়ম আন্টিকে ও সাথে নিচ্ছে।”
সুমুর মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো না। নাতাশার দেওয়া খবর শোনার পরও তার মুখের হাসি অটুট রইল। সে মনোযোগ দিয়ে ফাইলগুলো গুছিয়ে উঠতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ মাথা ঘুরে সামনের দিকে হেলে পড়তে লাগল। নাতাশা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলল।
“ম্যাম, আর ইউ ওকে?”
সুমু গভীর শ্বাস নিয়ে আবারও চেয়ারে বসল।
“হুম! আমি ঠিক আছি। তুমি এই ফাইলগুলো ম্যানেজারের কাছে দিয়ে এসো। আর গাড়ি বের করতে বলো।”
নাতাশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“গাড়ি? এখন?”
সুমুর চোখে হালকা এক উজ্জ্বলতা ফুটে উঠল।
“হ্যাঁ, আমি আজ ব্ল্যাক হেভেনে যাবো। কাল চলে যাচ্ছি, তার আগে আলিশা আর আন্টির সাথে দেখা করে আসতে চাই।”
নাতাশা কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। সে জানে, তার ম্যামের এই সিদ্ধান্তে কেউ বাঁধা দিতে পারবে না। নাতাশা চলে গেল ফাইলগুলো নিয়ে।
অফিসের কাচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সুমু বুঝতে পারল, এই শহরটা তাকে অনেক কিছু দিয়েছে— আবার অনেক কিছু কেড়েও নিয়েছে। তবু বিদায়ের আগে সে সব সম্পর্কের হিসাব মিটিয়ে যেতে চায়। সে ধীরে চেয়ারের পিঠে হেলান দিল। জানালার বাইরে হালকা বাতাসে গাছের পাতা দুলছে। চোখ বন্ধ করতেই মনের মধ্যে ভেসে উঠল গত তিন বছরের অগণিত স্মৃতি— হাসি, কান্না, ভয়, ভালোবাসা, আর কিছু না বলা কথার ভার। ব্ল্যাক হেভেন নামটা শুনলেই তার মনে পড়ে যায়, সেসব সময়, যখন সেখানে বসে অনেক কথা হয়েছিল আলিশার সাথে— আর সেই হাসিখুশি, সহজ-সরল মেয়েটার মায়ের সাথে এক অদ্ভুত আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছিল। কাল চলে গেলে, সে আবারও শশুর বাড়ি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। হয়ত আর সহজে দেখা হবে না, তাই এই শেষ দেখা যেন তার কাছে একধরনের দায়বদ্ধতা।
সুমু ধীরে উঠে দাঁড়াল। ডেস্কের ড্রয়ার খুলে ভেতর থেকে একজোড়া সোনার কানের দুল বের করল। এগুলো মরিয়ম বেগমের জন্য কিনছে সে। গাড়ির হর্ন বাজতেই সুমু গভীর শ্বাস নিয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত নিজের দিকে তাকাল— কালো শার্ট আর রিপ্ট জিন্সে আজ তাকে যেন আগের থেকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে।
অফিস থেকে বের হওয়ার সময় ম্যানেজার এগিয়ে এসে বলল,
“ম্যাম, শুভযাত্রা! আশা করি ওমানের জীবন আপনাকে আবার নতুন করে সাজিয়ে দেবে।”
সুমু হালকা হেসে উত্তর দিল,
“ধন্যবাদ। তবে জীবন সাজায় না, জীবন গড়ে তোলে— আর সেটা গড়ে ওঠে মানুষের মাধ্যমে।”
অফিসের সকলে সুমুকে ফুল দিয়ে বিদায় জানালো। সুমু সকলের থেকে বিদায় নিয়ে নাতাশার সাথে গাড়িতে উঠে ব্ল্যাক হেভেনের ঠিকানা বলল।
গাড়ি ধীরে শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরোতে লাগল। দুপুরের রোদ কড়া হয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে ফুটপাতের গাছপালা। দূরে কোথাও ভেসে আসছে হর্নের শব্দ আর মানুষের কোলাহল। সুমু জানালার বাইরে তাকিয়ে, কিন্তু তার দৃষ্টি যেন কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্যের উপর আটকে নেই— সে যেন খুঁজে ফিরছে স্মৃতির ভেতর লুকিয়ে থাকা কিছু মুহূর্ত। নাতাশা পাশে বসে চুপচাপ সুমুর দিকে একবার তাকাল।
“ম্যাম, আপনি ঠিক আছেন তো? আপনাকে খুব উইক দেখতে লাগছে।”
সুমু মাথা নাড়ল, কিন্তু কিছু বলল না। তার ঠোঁটে হালকা হাসি খেলে গেল, যেন সে কোনো
গোপন ভাবনায় হারিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর গাড়ি ব্ল্যাক হেভেনের সামনে এসে দাঁড়াল। নাতাশা আর সুমু একসাথে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল।
ব্ল্যাক হেভেনের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সুমু যেন এক অন্য জগতে প্রবেশ করল। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই একজন সার্ভেন্ট জোরে চিৎকার করে বলল,
“মেম সাহেবা! আপনার প্রিন্সেস এসেছে।”
উপরের রুম থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো আলিশা আর মরিয়ম বেগম। সুমুকে দেখে দুজনের দৌড়ে এলো। আলিশা এসে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। মরিয়ম বেগম সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“এতদিনে মনে পড়ল আমাদের কথা?”
সুমু নম্র স্বরে বলল,
“কাজের চাপে ব্যস্ত ছিলাম। আমি ফিরছি, আন্টি। আগামীকাল ওমানে ফিরে যাবো। তাই আজ আপনাদের শেষবার দেখার জন্য এসেছি।”
“শেষবার বলছো কেনো? আমরাও তো এবার ওমান যাচ্ছি।”
“আমি জানি, আন্টি। কিন্তু ওখানে যাবার পর আমি হয়ত আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ব।”
মরিয়াম বেগম গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন,
“বুঝতে পারছি, প্রিন্সেস। জীবনের পথে অনেক বাধা আছে, আর দায়িত্বও অনেক। তবুও মনে রেখো, যেখানেই থাকো না কেন, তোমার জন্য এই বাড়িতে সবসময় জন্য একটা জায়গা আছে।”
আলিশা একটু মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
“আসলে আমরা সবাই বুঝি, কাজ আর পরিবার— সব মিলিয়ে সময় খুব কমই মেলে।”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“আপনাদের ভালোবাসা আর স্নেহের জন্য ধন্যবাদ। ওমান ফিরে যাওয়া মানেই এই সম্পর্কগুলোকে ছেড়ে যাওয়া নয়, বরং নতুনভাবে গড়ে তোলা।”
মরিয়ম বেগম হাত বাড়িয়ে সুমুর হাত ধরে বললেন,
“এই যাত্রায় আল্লাহ তোমার সঙ্গে থাকুক, আর সুখ-শান্তি দিক তোমার জীবনে।”
নাতাশা এক পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখতে থাকল। আলিশা তাকে দেখে মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“নাতাশা, এসো। তোমার জন্য আমি নাস্তার ব্যবস্থা করছি।”
সুমু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কড়া স্বরে বলল,
“আলিশা, এসবের দরকার নেই। এখনই যেতে হবে আমাদের। প্যাকিং এখনও বাকি আছে। তুমি শুধু এক গ্লাস পানি নিয়ে এসো।”
আলিশা একটু অবাক হলেও সম্মতি দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে!”
আলিশা একজন সার্ভেন্টকে পানি আনতে বলল। মরিময় বেগম সুমুকে একটু সাইডে নিয়ে গিয়ে বললেন,
“তোমার চোখ মুখের অবস্থা আমার কাছে ঠিক লাগছেনা। এই লক্ষণগুলো আমি চিনি। সত্যি করে বলো, কোনো খুশির খবর আছে?”
সুমু আলতো হেসে উপর-নিচ মাথা নাড়ল। মরিয়ম বেগম খুশি হয়ে সুমুর কপালে আলতো ভালোবাসার পরশ এঁকে দিলেন। নিজের গলা থেকে একটা মোটা সোনার চেন সুমুর গলায় পরিয়ে দিয়ে বললেন,
“তুমি আজ চলে যাচ্ছো, তাই একটুই এখন দিতে পারলাম।”
সুমু মরিয়ম বেগমকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“সাবধানে থাকবেন। ওমানে গেলে আমি আপনাদের সাথে দেখা করতে যাবো।”
একজন সার্ভেন্ট ধীরে এগিয়ে এসে সুমুর হাতে পানি দিতে গেল, ঠিক তখনই অসাবধানতায় পানির গ্লাস থেকে পানি ছিটকে পড়ল সুমুর শার্টের ওপর। সার্ভেন্টটি ভয় পেয়ে গেল।
“সরি ম্যাম!”
সুমু শান্ত স্বরে বলল,
“কোন ব্যাপার না, তুমি যাও। ‘সরি’ বলতে হবেনা। নাতাশা, দয়া করে গাড়ি থেকে আমার হোয়াইট শার্টটা নিয়ে এসো।”
নাতাশা তৎক্ষণাৎ গাড়ির দিকে ছুটে গেল। সে কিছুক্ষণ পর শার্টটা হাতে নিয়ে ফিরে এলো। সুমু গেস্ট রুমে গিয়ে শার্টটা বদলে নিল। ফিরে এসে আলিশার হাতে উপহার তুলে দিল, আর মরিয়াম বেগমকে দিল সেই কানের দুল।
“এগুলো তোমাদের জন্য, আমার ভালোবাসার ছোট ছোট স্মৃতি।”
আলিশা হেসে বলল,
“তোমার দেওয়া এই উপহার আমাদের কাছে সবসময় বিশেষ হয়ে থাকবে।”
মরিয়াম বেগম চোখে অশ্রু নিয়ে সুমুর হাত ধরে বললেন,
“যেখানেই যাও, আমাদের ভালোবাসা তোমার সঙ্গে থাকবে। নিশ্চিন্তে যেও।”
সুমু হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে বলল,
“আল্লাহ্ হাফেজ।”
সুমু আর নাতাশা বেরিয়ে এলো ব্ল্যাক হেভেন থেকে। আলিশা আর মরিয়ম বেগম তাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল, যেন বহুত বছরের বাধন ছিঁড়ে খুব আপন কেউ তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
তিন বছরে সবকিছু যেন বদলে গেছে। মাইশা এখন তিন বছরের একটি পুত্রসন্তানের মা—তার হাসির শব্দে ঘর ভরে থাকে। রাইশা, তিশা আর রাইফ পড়াশোনার চাপে বুঁদ হয়ে গেছে। একসময় প্রাণবন্ত ইফতিয়া এখন অনেকটাই চুপচাপ। সে এখন নিজের ভেতরে ডুবে থাকে। সামিয়া আর নাজমিন—দুজনেই এখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী, নতুন বন্ধু-বৃত্ত আর নতুন স্বপ্নে মগ্ন তারা। শাহরুখ মেডিক্যালের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র হয়ে ডাক্তার হওয়ার শেষ পথে হাঁটছে। ফারিয়া মাস্টার্স করছে, ফারিন অনার্স শেষ বর্ষে। পিয়াস এখন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। দু’বছর আগে ভোটে দাঁড়িয়ে জিতেছে, আর এখন রাজনীতির ব্যস্ততা তাকে প্রায় ছায়ার মতো ছুঁয়ে থাকে। তবু অবসরে সে ফিরে আসে পুরোনো কলেজে —যেখানে তার হাসি-আড্ডা।
কলেজ ক্যাম্পাসের এক কোণে বসে আছে সামিয়া, নাজমিন আর ওদের বেস্ট ফ্রেন্ড বৃষ্টি। দুপুরের রোদে হালকা ঝলসে যাচ্ছে কাচা ঘাস। হঠাৎ চারপাশ গর্জে উঠল ইঞ্জিনের শব্দ। দশটা বাইক একসাথে ক্যম্পাসে ঢুকে পড়ল। বাতাসে ধুলো ছড়িয়ে দিল।
সামিয়া একবার তাকাল—চোখে এক মুহূর্তের বিস্ময় নিয়ে, তারপর দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। সামনের অফিস রুমের দরজায় গিয়ে বাইকগুলো থামল। প্রথমেই নামল পিয়াস। চোখে সানগ্লাস আর মুখটা গম্ভীর। সঙ্গে তার দলবল। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েও পিয়াস এখনও ফ্রি টাইমে এই কলেজের পুরোনো অফিস রুমে বসতে আসে—যেন সময়ের কিছু দরজা সে এখনও বন্ধ করতে পারেনি। শুধু আড্ডা নয়, নিজের প্রেয়সীকে চোখে চোখে রাখার জন্যও তার আসা।
পিয়াস অফিস রুমে ঢুকে চেয়ার টেনে বসল। টেবিলে রাখা পুরোনো কাপে চা ঢালা হচ্ছিল, কিন্তু তার চোখ যেন বাইরের দিকে গিয়েই আটকে রইল। জানালার ফাঁকা দিয়ে সামিয়ার হাসির শব্দ ভেসে এলো। হঠাৎ পিয়াস উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে বাইরে এসে তিনজনের টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“কি ব্যাপার? নতুন বন্ধু নাকি?”
নাজমিন আলতো হেসে বলল,
“হ্যাঁ, পরিচয় করিয়ে দিই—এ বৃষ্টি, আমাদের নিউ বেস্ট ফ্রেন্ড।”
বৃষ্টি ভয় পাচ্ছে পিয়াসকে দেখে। সে আস্তে করে বলল,
“হ্যালো ভাইয়া!”
পিয়াস আস্তে মাথা নাড়াল। সামিয়া একদম চুপ। তার চোখ পিয়াসের দিকে উঠছে না। পিয়াস সামিয়ার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
“তুই অনেক বদলে গেছিস। কথা বলিস না কেন?”
সামিয়া অবশেষে তাকাল। ঠোঁটে একটুকরো শীতল হাসি নিয়ে বলল,
“সময় সবারই বদল আনে, ভাইয়া। কারো জন্য ভালো, কারো জন্য দূরত্ব।”
পিয়াস ধীর গলায় বলল,
“এই দূরত্ব খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে, সামু।”
সামিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। পিয়াস ঠোঁটে হালকা হাসি রেখে মনে মনে বলল,
“খুব তাড়াতাড়ি তোকে আমার খুব কাছে আনার ব্যবস্থা করছি।”
সে সামিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সামিয়া পিয়াসকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নাজমিন আর বৃষ্টির উদ্দেশ্যে বলল,
“তোরা থাক, আমি ক্লাসে যাচ্ছি।”
নাজমিন আর বৃষ্টি একে অপরকে দেখল। সামিয়া উঠে ক্লাসের দিকে চলে গেল। সামিয়া চলে যেতেই পিয়াসের দৃষ্টি তার পেছন পর্যন্ত অনুসরণ করল, যেন চোখ দিয়ে তাকে আটকে রাখতে চাইছে। নাজমিন মুচকি হেসে বলল,
“চেয়ারম্যান ভাই, কলেজে এসে পুরোনো প্রেম মনে পড়ছে নাকি?”
পিয়াস গম্ভীর মুখে বলল,
“মনে পড়ছে না, মনে করাচ্ছি।”
বৃষ্টি অবাক হয়ে নাজমিনের দিকে তাকাল, যেন বুঝতে চাইছে, এই কথার ভেতরে আসল মানে কী। পিয়াস তাকাল ক্লাসরুমের দিকে। সে মনে মনে বলল,
“এটা শুধু পুরোনো ভালোবাসা নয়, এটা যেন এক অসমাপ্ত গল্পের নতুন অধ্যায়ের শুরু।”
সুমু রুমে এলো। শেরাজ বেলকনিতে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। কারো ঢোকার আওয়াজ পেয়ে সে ভেতরে এলো। হোয়াইট ফিটিং শার্ট, উপরের দুটো বোতাম খোলা, কালো রিপ্ট জিন্স, এলোমেলো চুল খোপা করে বাঁধা, সামনের কিছু চুল হালকা করে মুখের পাশে পড়ে আছে, মাথার ওপর সানগ্লাস তুলে রাখা, কানে ছোট সোনালি দুল, বা হাতে ঘড়ি, ডান হাতে ব্রেসলেট পরিহিত এলোমেলো সুমুকে দেখে শেরাজ কথা হারাল। সে এক পা এগিয়ে এলো। চোখে একধরনের গভীর আকর্ষণ জমে আছে তার। নিচু আর ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তুমি জানো, এভাবে তোমাকে দেখলে আমার মাথা কাজ করে না। শুধু মনে হয়, তোমাকে এখনই কাছে টেনে নিই। এতটা কাছে, যেন তোমার নিঃশ্বাস আমার শরীরে লাগে।”
শেরাজের এমন কন্ঠ শুনে সুমুর বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি উঠল। সে চোখ ফিরিয়ে বিছানায় ব্যাগ রাখতে লাগল। কিন্তু সে বুঝছিল —শেরাজের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও তার দিক থেকে সরে যায়নি। সুমু ব্যাগটা রাখতেই শেরাজ ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়াল। মুহূর্তের জন্য দু’জনের মাঝে নীরবতা ঘন হয়ে উঠল। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসে সুমুর চুল আলতো নড়ে উঠছিল। শেরাজ হাত বাড়িয়ে সেই চুল কানের পাশে গুঁজে দিল। তার আঙুলের স্পর্শে সুমুর শরীর কেঁপে উঠল। কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু নিঃশ্বাস সামলানোর চেষ্টা করল। শেরাজ আরও কাছে আসতেই সুমু সরে গিয়ে বলল,
“সরেন তো, আমি কোথাও যাবো না। কাল আপনি একাই চলে যান।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি কি এখনো রেগে আছেন, ম্যাডাম?”
“হ্যাঁ, আমি এখনো রেগেই আছি।”
“কিন্তু ঠিক কোন কারণে রেগে আছেন, ম্যাডাম? সেটা তো বলুন, আমি তো বুঝতেই পারছি না।”
“কারণটা আমার এখন ঠিক মনে নেই। তবে মনে না থাকলেও, রাগটা ঠিকই রয়ে গেছে। আর সেটা সহজে যাবে না, এই বিষয়ে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে ধীরে বলল,
“সে রাগ আপনি করতেই পারেন। রাগ করা মেয়েদের জন্মগত অধিকার। কিন্তু, কারণ ভুলে গিয়েও রাগ ধরে রাখবেন?”
“তো? কারণ ভুলে গেছি বলে কি রাগ থাকবে না?”
“হুম, ভাববার বিষয়। আপনি খুব সুন্দর করে রাগ করতে পারেন।”
সুমু চোখ ঘুরিয়ে ব্যাগের চেইন টেনে দিয়ে বলল,
“আপনার প্রশংসা দরকার নেই।”
শেরাজ এক ধাপ এগিয়ে এসে টেবিলে হাত রেখে ঝুঁকে পড়ল, যাতে সুমু সরে গিয়েও তার চোখ এড়াতে না পারে।
“আমি জানি না, তুমি কী কারণে রেগে আছো। কিন্তু আমি এইটা জানি, রাগ করলে তোমাকে অনেক বেশি সুন্দর লাগে।”
সুমু মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে চাপা একটা হাসি যেন জোর করে আটকে রেখে বলল,
“আপনার এসব ডায়লগে আমি ইমপ্রেস হবো না, স্যার।”
শেরাজ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“ইমপ্রেস করতে চাইও না। আমি শুধু চাই, তোমার এই রাগটা শুধু আমার জন্য থাকুক।”
বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো। সুমু কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই হালকা বজ্রপাতের শব্দে ঘর মুহূর্তের জন্য আলো-আঁধারে ভরে গেল। সুমু আনমনে বলল,
“আপনার ভালোবাসা এতো প্রখর কেন, খান সাহেব?”
শেরাজ ধীরে জানালার পাশে গিয়ে পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল।
“কারণ আমি এক নারীতে আসক্ত। আর সেই নারীটা তুমি, বউজান। একটা পুরুষ যদি এক নারীতে আসক্ত হয়, আর সেই নারীকে সেই পুরুষ যদি মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসে— তাহলে সেই পুরুষের ভালোবাসা আর যত্নের কোনো সীমা থাকে না, শুধু প্রখরতা থাকে। আর সেই প্রখরতা দিন দিন বাড়তেই থাকে।”
সুমু চুপ করে শুনলো। শেরাজ সুমুর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল,
“তুমি জানো, এই বৃষ্টি ঠিক তোমার মতো। শান্তভাবে আসে, কিন্তু আসার পর চারপাশ বদলে দেয়।”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“কাল কী ফেরার ইচ্ছে নেই আপনার? যদি থাকে, তাহলে প্যাকিং করতে আমাকে হেল্প করুন।”
শেরাজ এগিয়ে এলো। দুজনেই একসঙ্গে বসে প্যাকিং শুরু করল। সুমু সাবধানে কাপড়গুলো ভাঁজ করছিল, আর শেরাজ সেগুলো ব্যাগে রাখতে গিয়ে আরও এলোমেলো করে ফেলছে।
ঘড়িতে সময় রাত দুটো। বারের এক কোণে মুখোমুখি বসে আছে শেরাজ খান আর রায়য়ান চৌধুরী। সামনে টেবিলের ওপর রাখা বড় একটি মোটা ব্রিফকেস। শেরাজ বাঁকা হেসে ব্রিফকেসটি ধীরে রায়য়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আমার বউয়ের পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়েছে তোর। আমি জানি, আমার বউ সেই সব টাকা তোকে ফিরিয়ে দিয়েছে। তুইও নিয়েছিস, বন্ধুত্বটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু আজ আমি তোকে তার ডাবল টাকা দিলাম। আর সাথে এইটাও বলি—আমার বউয়ের থেকে দূরে থাক। তুই জানিস আমি খুব একটা সুবিধার লোক না। আমি ছাড় দিই, তবে ছেড়ে দিই না।”
রায়য়ান চোখ মেলে শেরাজকে একবার গভীরভাবে দেখল। সে ধীরে ভাবে হাসল—একটা হাসি, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে আগুন। শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“হাস! মন খুলে, প্যান্ট খুলে হাস। কারণ আমি যেদিন ধরব, সেদিন আর হাসার সুযোগ পাবি না। আর শোন, ওমান ফিরছিস তো? তোকে ফাস্ট ইনভাইট করলাম। একটা গ্রান্ড মাফিয়া ওয়েডিং হবে। পুরো ওমান দেখবে। তুইও আসিস দেখতে। সেদিন আরিয়ানের জন্য ওই যে ওই গানটা প্লে করব,
“রাব হাস্তা হুয়া রাখখে তুম কো
তুম তো হাসনে কী আদি হো
উস ঘার মে খুশহালী আয়ে
জিস ঘার মে তুমহারি শাদি হো!”
থামল শেরাজ। উচ্চস্বরে হেসে আবারও বলল,
“আর তোর জন্য কোনটা প্লে করব জানিস? ওয়েট গেয়ে আর অভিনয় করে দেখায়।
কথাগুলো বলে শেরাজ একহাত রায়য়ানের দিকে বাড়িয়ে গান ধরল,
“দুলহে কা সেহেরা সুহানা লাগতা হ্যায়
দুলহান কা তো দিল দিওয়ানা লাগতা হ্যায়
পালবার মে ক্যাছে বাদাল তা হ্যায় রিশতে
আব তো হার আপনা বেগানা লাগতা হ্যায়!”
উঠে দাঁড়াল শেরাজ। রায়য়ানের কাছে গিয়ে ওর আশেপাশে ঘুরতে ঘুরতে গাইল,
“সাত ফেরোণ সে বান্ধা জানমো কা ইয়ে বান্ধান
প্যায়ার সে জোড়া হ্যায় রাব নে পীত কা দামান
হ্যায় নেহি, রাসমে নেহি, কাসমে নেহি উলজান
হোন্ঠ হ্যায় খামোশি, লেকিন কেহ রাহি ধারকান!”
শেরাজ ঠোঁটে শয়তানি হাসি টেনে শার্টের নিচ দিয়ে বুকে হাত রেখে নিজের কাঁধ দিয়ে রায়য়ানকে ধাক্কা মারতে মারতে গাইল,
খান সাহেব পর্ব ৬৩ (২)
“ধারকান, ধারকান
ধারকান, ধারকান
ধারকান, ধারকান
ধারকান, ধারকান!”
গান শেষ করে ঠোঁটে তার প্রিয় সূর বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে গেল সে। রায়য়ান পেছন থেকে ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে তার চলে যাওয়া দেখল।
