Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৬৫

খান সাহেব পর্ব ৬৫

খান সাহেব পর্ব ৬৫
সুমাইয়া জাহান

তিন বছর পর সুমু আজ ওমানের মাটিতে আবারও পা রাখল। এয়ারপোর্টের কাচের দরজা দিয়ে বেরোতেই ওদের দিকে ছুটে এলো আইয়ুব, রাহিন, নিহাল, অমিতরা সবাই। সবাই মুখে খুশির হাসি। কিন্তু শেরাজের চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তি ছাপ।
আইয়ুব এগিয়ে এসে শেরাজকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে শেরাজ কপাল কুঁচকে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“সর তো! জড়াজড়ি করিস না। এমনিতেই মেজাজ বিগড়ে আছে।”
রাহিন এক ভ্রু তুলে বলল,
“কেন ভাই? কি হয়েছে তোর?”
শেরাজ আঙুল তুলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুমুর দিকে দেখাল। সুমু তখন কোলে কিটিকে নিয়ে হাসছে আর গালে গালে ঘষে আদর করছে।
শেরাজ কড়া গলায় বলল,
“তোর বোনকে দেখ, বিড়ালের বাচ্চা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে কি ডং করছে। সামান্য একটা বিড়ালের বাচ্চা নিয়ে এত আল্লাদের কি আছে? ওটাকে আবার সারাদিন কোলে তুলে বসে থাকে।”
নিহাল হেসে বলল,

“তাহলে কি তুই ভাবিজির কোলে উঠতে চাস? আচ্ছা দাঁড়া, আমি ভাবিজিকে বলছি তোকে কোলে তুলে নিতে।”
সবাই হেসে উঠল। শেরাজের পাশে দাঁড়িয়ে স‍্যান্ডিও হেসে দিল। শেরাজ কপাল কুঁচকে গরম চোখে তাকাল নিহালের দিকে। অমিত মজা করে বলল,
“ওভাবে তাকাস কেন ওর দিকে? ও ভুল কি বলেছে? তুই সামান্য একটা বিড়ালের বাচ্চাকে নিয়ে জেলাস ফিল করছিস নাকি?”
“আমি জেলাস কেনো হবে? তাও একটা বিড়ালের বাচ্চাকে নিয়ে? আর শোন, ওইটা সামান্য বাচ্চা না। ও এখন বাচ্চা জন্ম দেবার ক্ষমতা রাখে।”
সাইফ তখন সুমুর কাছে গিয়ে হাসিমুখে বলল,
“কেমন আছেন, ভাবিজি?”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“জি ভাইয়া, ভালো আছি!”
সাইফ কিটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

“এইটা কি আপনার বাচ্চা? দেখতে তো অনেক কিউট। নাম কি ওর? আমার কোলে দিন।”
সুমু আলতো হেসে বলল,
“কিটি ওর নাম!”
সুমু কিটিকে সাইফের কোলে দিল। সাইফ যত্ন করে কিটিকে ধরতেই শেরাজ চোখ কপাল কুঁচকে বলল,
“ওই, ওর বাচ্চা মানে কি? তোর ব্রেন কি পচাৎদেশে নেমে গেছে নাকি? আমি মানুষ হয়ে বিড়ালের বাচ্চা জন্ম দেওয়ার স্পার্ম কীভাবে ডোনেট করব?”
সাইফ হতভম্ব হয়ে বলল,
“আরে শোন, এস,কে আমি…”
শেরাজ ঝট করে বাধা দিল,
“ব্রেনলেস শা*লা, চুপ থাক তুই। আমাকে তোর বিড়াল মনে হয় নাকি?”
“আরে না ভাই, আমি তো তোকে বিড়াল বলিনি।”
শেরাজ হাত তুলে থামিয়ে দিল।

“তুই চুপ কর!”
রিয়াদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি শুরু করলি, এস.কে? ও তোকে কেন বিড়াল বলবে? বিড়াল হলে তুই তো মিঁউ মিঁউ করতি। কিন্তু তুই তো ঝাড়ি মারছিস।”
রিসান হেসে বলল,
“হ্যাঁ ভাই, নামও ভালোই মানাবে। শেরাজ মিঁউ খান – দ্য ক্যাট কিং অব ওমান।”
আরবাজ হাসতে হাসতে বলল,
“তারপর ভাবিজি কোলে নেবে, আর কিটি দেখবে ওর জায়গা দখল হয়ে গেল।”
সবাই হো হো করে হেসে উঠল। শেরাজ মুখ গম্ভীর করে বিড়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজকে তাকাতে দেখে কিটি “মিঁউ” করে ডেকে উঠল। সকলে আবারও একসাথে হেসে উঠল।

সুমুকে নিয়ে আসা হলো একটি অন্য বাড়িতে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, পুরো বাড়টা একদম বিয়ে বাড়ির মতো করে সাজানো। সুমু আশ্চর্য চোখে চারপাশ ঘুরে দেখে বলল,
“এইটা কার বাড়ি?”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“এইটা সানের বাড়ি। কিন্তু এখানে আপনার হাজব‍্যান্ড আর দেবর আরবাজ ছাড়া ফুল টিম রাত কাটায়। আপনার হাজব‍্যান্ড আর আরবাজকে তো বাসায় ফিরতেই হয়। কারণ, তাদের ঘরে তো বউ আছে। কিন্তু আগে তারা দুজনও ওখানেই থাকত।”
সুমু কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করল,

“কিন্তু আপনি আমাদের এখানে কেন নিয়ে এসেছেন?”
শেরাজ চোখে দুষ্টু চাহনি নিয়ে বলল,
“কারণ আজ আপনি এখানে থাকবেন, ম‍্যাডাম।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এখানে থাকব মানে? আমি বাড়িতে ফিরব না?”
“হুম, ফিরবেন। তবে কাল।”
“কাল কেন? আজ কি সমস্যা?”
“কারণ, বিয়ের আগে মেয়েদের বাবার বাড়িতেই থাকতে হয়।”
সুমু অবাক হয়ে বলল,
“কার বিয়ে?”
“আপনার, ম‍্যাডাম!”
“আমার বিয়ে? খান সাহেব, আপনি কি বলছেন এসব? একটু বুঝিয়ে বলবেন, প্লিজ?”
শেরাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,

“কাল আপনার বিয়ে আপনার হাজব‍্যান্ডের সাথে। আজ রাতে আপনার গায়ে হলুদ, মেহেন্দি, সাংগীত—সবকিছুই হবে। যেহেতু এখানে আপনার ভাই থাকে, তাই এইটা আপনার বাবার বাড়ি। আপনি আজ এখানেই থাকবেন।”
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। নাতাশাও না বোঝার মতো করে তাকিয়ে রইল। স‍্যান্ডিরা সকলে ঠোঁট টিপে হাসছে। শেরাজ চোখে দুষ্টু চাহনি নিয়ে আবারও বলল,
“কাল বর সেজে, পুরো ওমান শহরকে দেখিয়ে, আপনাকে আমি আমার ঘরে বউ সাজিয়ে বিয়ে করে নিয়ে যাব।”
সুমু সামান্য হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি লুকিয়ে রেখে বলল,
“খান সাহেব, আপনি আগে থেকেই পরিকল্পনা করে এসব করছেন?”
শেরাজ কাঁধ হেলিয়ে হালকা হেসে বলল,
“হুম! কারণ আমি চাই, আমার বউ সব সময় আমার নিয়ন্ত্রণে থাকুক।”
সুমু চুপ করে শেরাজের দিকে তাকিয়ে রইল। একদিকে একটু নার্ভাস, অন্যদিকে ছোট ছোট হাসির ঝলক তার মুখে। শেরাজ সুমুর হাত ধরে বলল,

“আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান, স‍ান— এই নয় ভাইয়ের কাছে তাদের বোনকে আমানত হিসাবে রেখে গেলাম আমি। কাল আপনার এই নয় ভাই আপনাকে আমার সাথে তুলে দিবে। তো ম‍্যাডাম চলুন, আপনার বাবার বাড়ির রাত শুরু হোক।”
সুমু শুধু তাকিয়ে দেখল। শেরাজ নাতাশাকে উদ্দেশ্যে করে বলল,
“আপনার বোনকে সাজিয়ে নিয়ে আসুন। আজ রাতেই মেহেন্দী, গায়ে হলুদ, সাংগীত— সব হবে। আমি এখন বেরিয়ে যাব। বিয়ে করব তো, তাই কোনকিছুর কমতি রাখলে চলবে না।”
সুমুর চোখে পানি। শেরাজ সুমুর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
“এখন আমি যাই, সুইটহার্ট। খান ম‍্যানশনে বিয়ের অনেক কাজ পড়ে আছে। সাবধানে থেকো। কাল তাড়াতাড়ি নিতে আসব।”
সুমু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। শেরাজ সুমুর কপালে ছোট্ট করে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে চলে গেল।
শেরাজ চলে যেতেই সুমু আবারও বাড়িটা চোখ ঘুরিয়ে দেখল। অপূর্ব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে বাড়িটা। নাতাশা সুমু সামনে হাজির হলো। হাতে সাজের ব্যাগ, গহনা।
“ম‍্যাম চলুন! একটু ফ্রেশ হয়ে নিবেন। তারপর আপনাকে গায়ে হলুদের জন্য রেডি করব।”
সুমু উপরে চলে গেল নাতাশার সাথে। স‍্যান্ডিরা যার যার কাজে লেগে পড়ল। বিয়ে বাড়ি অনেক কাজ পড়ে আসে তাদের।

সুমুকে হলুদের সাজে এনে বসানো হলো। সুমু বসতেই কোথা থেকে কিটি দৌড়ে এসে তার কোলে উঠে বসল। সুমু আলতো হেসে কিটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তাকে আজ তাজা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। ঘরের প্রতিটা কোণ এক রাজকীয় সৌন্দর্যের মতো সাজানো হয়েছে। চারপাশে কাঁচা ফুলের সুবাস ছড়িয়ে আছে, যা বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে সুমুর চারপাশকে এক স্বর্গীয় আভায় ভরে দিয়েছে।
নাতাশা হালকা হাসি দিয়ে আইয়ুবদের কাছে গিয়ে বলল,
“আপনারা আগে ম‍্যামকে হলুদ দিন।”
আইয়ুবরা সকলে একসাথে এসে সুমুর সামনে গোলাপের পাপড়ির মধ্যে সাজিয়ে রাখা বাটি থেকে হলুদ তুলে সুমুর গালে ছুঁয়ে দিল। ক‍্যামেরাম‍্যান এই মুহুর্তের কিছু ছবি নিল। সুমুর নয় ভাই মিলে তার মাথায় ওপর একসাথে রেখে বলল,
“দোয়া করি বোন, সুখী হও।”
সুমু হেসে উঠল ওদের কাজ দেখে। সকলে কাটা চামচে করে নয়টা মিষ্টি তুলে একসাথে সুমুর মুখের সামনে ধরল। সুমু থতমত খেয়ে গেল। সে সবার হাত থেকে একটু করে মিষ্টি মুখে নিল। নাতাশা সুমুর গালে আলতো করে হলুদ মাখিয়ে দিল। কপালে আর হাতে ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়ে বলল,

“এই হাসিটাই যেন সারাজীবন থাকে, ম‍্যাম।”
সুমু হালকা লাজুক হাসি দিল। চারপাশে সবাই তখন আনন্দে মেতে আছে। হলুদের পর মিষ্টি মুখ করানোর পালা শেষ হতেই ঘরে ঢুকল দু’জন মেহেন্দি আর্টিস্ট। নাতাশা সুমুর হাত ধরে বলল,
“এবার চলুন, ম‍্যাম। আপনার হাতে আজ শুধু ডিজাইন হবে না, আপনার হাজব‍্যান্ডের নামও থাকবে। তবে খুব গোপনে। যাতে কাল ওনার খোঁজার কাজটা লম্বা হয়।”
চারপাশে হাসির রোল উঠল। রাহিন মজা করে বলল,
“এস.কে একেবারে ম্যাগনিফায়ার নিয়ে বসবে কাল।”
সুমু হাসি চাপতে চেষ্টা করলেও মুখ লাল হয়ে গেল। তাকে বসানো হলো এক নরম কুশনের ওপর। হাতদুটো সুন্দর করে সামনে রাখা হলো। মেহেন্দি আর্টিস্ট প্রথমে তার হাতে নকশা আঁকতে লাগল। সুমুর হাত ভর্তি মেহেন্দি ছড়িয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণের মধ্যে আর্টিস্ট ডান হাতের তালুতে হার্ট সেপের মধ্যে বিয়ের তারিখ লিখে একটা আংটির ছবি এঁকে দিল। নাতাশা পাশে বসে ছবি তুলতে লাগল। স‍্যান্ডি উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,

“এবার বা’হাতে স‍্যারের নাম লিখেন।”
সবাই আবার হেসে উঠল। বা’হাতেও একইভাবে হার্ট সেপের মাঝখানে শেরাজ নাম লেখা হলো। সুমু প্রথমে লাজুক দৃষ্টি নামিয়ে রাখলেও, নামটা দেখে হালকা এক মিষ্টি হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। মেহেন্দির রঙে হাতদুটো যেন একেবারে কনের মতো লাবণ্যময় হয়ে উঠল। নাতাশা পাশ থেকে বলল,
“এবার একদম সিক্রেট ভাবে স‍্যারের নাম লিখুন। যেটা স‍্যারকে খুঁজে বের করতে হবে।”
আর্টিস্ট ডিজাইনের ভেতর খুব ছোট করে শেরাজের নাম লিখে দিল। পাশেই রাখা ছিল ছোট ছোট প্লেটে সাজানো শুকনো ফল, পানীয়, আর মিষ্টি। নাতাশা আলতো করে সুমুর ঠোঁটের কাছে জুস ধরল যাতে হাত নাড়াতে না হয়। কিটি এদিক ওদিক ঘুরে মেহেন্দির প্লেটে থাবা মারার চেষ্টা করছিল। সবাই হেসে তাকে সরিয়ে দিচ্ছিল বারবার।
ঘরের চারপাশে “মেহেন্দি হ্যায় রচনেওয়ালি” গানের তালে তালে নাচতে লাগল মেয়েরা। তাদের সাথে অংশগ্রহণ করল নাতাশা। স‍্যান্ডি আজ অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে নাতাশাকে। মেয়েটা আজ হালকা পিংক রঙের গাউন পড়েছে। একদম সিম্পল সাজ, চুলগুলো খোলা রাখা। দেখতে বরাবরের মতো চোখ ধাধানো সুন্দর লাগছে। স‍্যান্ডি তাকিয়ে রইল নাতাশার দিকে।

নাচ–গান আর হাসি–আনন্দের মাঝেই ঘরে যেন এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ তৈরি হয়ে গেল। চারপাশের ঝলমলে আলো, কাঁচা ফুলের গন্ধ, আর মানুষের হাসিমুখ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা একেবারে আনন্দের হয়ে উঠল। মেয়েরা একে একে সুমুর হাতের মেহেন্দি দেখতে লাগল, কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে। মাঝেমাঝে গান থেমে যেতেই কেউ কেউ সুমুর সাথে মজা করছিল। সুমু শুধু লাজুক হাসি দিয়ে মাথা নিচু করে রেখেছে, কিন্তু চোখে-মুখে যে আনন্দ ফুটে আছে তা লুকাতে পারছেনা সে।
এদিকে, নাতাশা আর স্যান্ডি মিলে ছোট্ট করে কনের আসনের পাশে আরেকটা টেবিল সাজিয়ে রাখল—ফুল দিয়ে সাজানো কাঁচের জার, ভেতরে ছোট লাইট, আর চারপাশে রঙিন মোমবাতি। তাতে পুরো ঘরটা আরও স্বপ্নিল হয়ে উঠল। স‍্যান্ডি নাতাশাকে পরখ করে বলল,

“ঝগড়ার সাথে সাথে নাচটাও ভালো করেন আপনি।”
নাতাশা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“স্টুপিড!”
হঠাৎ কিটি আবার হাজির হলো। এবার সে নাতাশার ড্রেস টেনে ধরল। নাতাশা হেসে কিটির মাথায় ফুলের ছোট্ট মালা পরিয়ে দিল। কিটি গর্বিত ভঙ্গিতে সুমুর পায়ের কাছে বসে রইল, যেন সেও অনুষ্ঠানের অংশ। মেয়েরা সুমুর হাত আলতো করে কুশনের ওপর রাখল যাতে মেহেন্দি শুকাতে পারে।
অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে অনেক রাত গড়িয়ে গেল। হাসি-আনন্দের ক্লান্তি সবাইকে যেন এক মিষ্টি অবসাদের চাদরে জড়িয়ে ফেলল। হলঘরের কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে চারপাশে নেমে এলো শান্তি। যে যেখানে ছিল, সেখানে বসেই একসময় অলস হয়ে গেল সবাই। কেউ বিছানায় গা এলিয়ে দিল, কেউ বা সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজলো।
নাতাশা শেষবার সুমুর মেহেন্দির হাত দেখে হালকা হেসে বলল,

“কাল সকালে রঙটা দেখবেন ম‍্যাম, একদম জাদুর মতো ফুটে উঠবে।”
সুমু মাথা নেড়ে হেসে সায় দিল। তার হাতে তখনও মেহেন্দির তাজা গন্ধ, চোখে-মুখে আনন্দ জমে আছে। কিটি ওদিকে সুমুর ঘরের কোণে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে, মাথায় তখনও ফুলের মালা। নাতাশা সুমুকে ঘুমাতে বলে নিজেও ঘুমাতে চলে গেল।
সবাই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিলেও, সুমুর চোখে তখনও ঘুম আসেনি। বেডে বসে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল। আকাশ ভরা তারার দিকে চেয়ে ভাবল,
“এখন হয়তো খান সাহেবের ফোন আসবে।”
সময় কেটে গেল, মিনিটগুলো একে একে ঘন্টায় বদলে গেল। টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা নিঃশব্দে পড়ে রইল, স্ক্রিনে কোনো আলো জ্বললো না। সুমুর ঠোঁটে এক হালকা দীর্ঘশ্বাস ভেসে উঠল। মেহেন্দির নকশায় ঢাকা হাতদুটো বুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল সে। মনটা অজানা কিছুর অপেক্ষায় রইল, কিন্তু চোখ দুটো ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো।

নতুন দিনের শুরু হলো এক অদ্ভুত অনুভূতির সাথে। আজকের দিনটা আর পাঁচটা দিনের মতো নয়, আজ রাতেই সুমুর বিয়ে। ভোরের আলো ঘর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যেন প্রকৃতিও আজ সাজ সাজ ভাব নিয়েছে। জানালার বাইরে পাখির কলতান, হালকা বাতাসে দুলছে গাঁদা আর গোলাপের মালা, যা কাল রাতের গায়ে হলুদের রঙিন স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে।
সুমু ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠল। রাতভর কাঁচা ফুলের সুবাস আর মেহেন্দির গন্ধ যেন এখনো তার চারপাশে ভাসছে। সবার আগে চোখ গেল নিজের হাতের দিকে। মেহেন্দির রঙ গাঢ় লাল হয়ে ফুটে উঠেছে, যেন সেও জানে আজ সুমুর জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিন। হার্ট সেপের ভেতরে লেখা শেরাজ নামটা দেখে বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল তার।
নাতাশা দরজা ঠেলে ঢুকে হাসি দিয়ে বলল,

“গুড মর্নিং, ম‍্যাম! আজ কিন্তু আপনাকে পুরো রানির মতো সাজাব।”
সুমু হালকা লাজুক হেসে চুপ করে রইল। বাইরে তখন বিয়ের পুরো তোরজোড় জমে উঠেছে। আঙিনার এক কোণে বাবুর্চিরা বিশাল কড়াই বসিয়ে রান্নায় ব্যস্ত—গরম ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি, কাবাব, নান, আর সুগন্ধি পোলাওয়ের গন্ধ বাতাসে মিশে গিয়ে পুরো বাড়ি মম করে তুলেছে। মাঝে মাঝে কাঁচা মশলার ঝাঁজে নাকে সুঘ্রাণ লাগতেই সুমুর মনে অদ্ভুত এক খিদে আর উচ্ছ্বাস একসাথে জেগে উঠল। দালানজুড়ে রঙিন কাপড়ের ঝালর দুলছে হাওয়ায়, দরজায় দরজায় তাজা ফুলের মালা, আর বারান্দায় বাচ্চাদের দৌড়ঝাঁপ—সব মিলিয়ে যেন পুরো বাড়িটাই এক বিশাল উৎসবের মঞ্চ হয়ে উঠেছে। নিচতলায় দূর থেকে শোনা যাচ্ছে হইহুল্লোড়— কেউ সাউন্ড সিস্টেম চেক করছে, কেউ চেয়ার-টেবিল সাজাচ্ছে, কেউ বা মিষ্টির ট্রে হাতে এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে। নারীদের কণ্ঠে হাসি-গান মিশে যাচ্ছে বাসনের শব্দ আর কাজের গুঞ্জনের সাথে।
সুমু জানালার পর্দা সরিয়ে একটু উঁকি দিয়ে দেখল—গেটে কাছে বড় বড় গাড়ি আসছে, নামছে আত্মীয়-স্বজন। নাতাশা এসে সুমুর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“ম‍্যাম, আজ কিন্তু সময় কম। স‍্যার আসার আগে আপনাকে রেডি থাকতে হবে।”
সুমুর বুকের ভেতর হালকা ধুকপুকানি বেড়ে গেল। মনে হলো, চারপাশের এই কোলাহল, খাবারের গন্ধ, ফুলের সুবাস—সবকিছু মিলে যেন তাকে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই মুহূর্তের দিকে, যখন শেরাজের হাতে হাত রেখে আবারও শুরু হবে তার নতুন জীবন।

শেরাজের বাসা থেকে বিয়ের তত্ত্ব নিয়ে এসে পৌঁছেছে। সুমু তখন রুমে একা দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করেই রুমের দরজা জোরে খোলা হলো। একজন মাস্ক পরিহিত লোক রুমে ঢুকে এলো। লোকটা মুখ পুরো মাস্ক আর ক‍্যাপের সাহায্যে ঢাকা।
সুমু চমকে উঠল। সে কিছু বলার আগেই তার মুখ চেপে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল লোকটা। সুমু ছটফট করে উঠতেই মাস্ক খুলে ফেলল লোকটা। মাস্ক খুলতেই সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শেরাজ দুষ্টুমির হাসি ঠোঁটের কোণে নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সুমু কিছু বলতে যাবে তার আগেই শেরাজ সুমুর ঠোঁটে ঠোঁট মেশালো। হঠাৎ এমন কাজে ভ‍্যাবাচেকা খেয়ে গেল সুমু। পাঁচ মিনিটের মাথায় শেরাজ সরে দাঁড়াল। সুমু বেডের ওপর বসে হাঁপাতে লাগল। শেরাজ সুমুর অবস্থা দেখে আলতো হেসে বলল,
“বিয়ের মতো একটা বড় কাজ করতে যাচ্ছি আজ, প্রচুর এনার্জির প্রয়োজন। তাই এনার্জি নিতে এলাম। রাতে রেডি থেকো।”
কথাটা বলে শেরাজ যেভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে গেল। সুমু অবাক। সে এখনো বুঝতে পারল না; আসলে কি হলো। শেরাজের চলে যাওয়ার পরও সুমু কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। বুকের ভেতর এখনো ধুকপুকানি চলছে, ঠোঁট গরম হয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন পুরো শরীরে এক অদ্ভুত কাঁপুনি ছড়িয়ে গেছে। হাতের মেহেন্দিতে লেখা শেরাজ নামের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ এক চিলতে লাজুক হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। তার মনে হলো, এই নামটা শুধু হাতের ওপর নয়— তার হৃদয়ের গভীরেও গাঢ় হয়ে ছাপ ফেলেছে।

ওমানের আকাশে কমলা-নীল রঙে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। দূর থেকে পাখির গানের সুর ভেসে আসছে, আর হালকা শীতল বাতাস জানালার পর্দা দুলিয়ে দিচ্ছে।
রুমের মাঝখানে বড় আয়নার সামনে বসে আছে সুমু। তাকে সাজানো হবে এখন। শেরাজদের বাড়ি থেকে আসা সুমুর সাজের তত্ত্ব বেডের ওপর রাখা। নাতাশা লেহেঙ্গার ট্রলিটা তুলতে গিয়ে পারল না। সে মেকআপ আর্টিস্টদের বলল সাহায্য করতে।
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সামান্য একটা ড্রেস তুলতে পারো না, নাতাশা।”
“ম‍্যাম, এইটা প্রচুর ভারি।”
“কি বলো? ট্রলির মধ্যে কি শুধু ড্রেস আছে নাকি ইট পাথরও ঢুকিয়ে পাঠিয়েছে?”
সুমুর কথায় সকলে হেসে উঠল। নাতাশা ট্রলিটা আনলক করে খুলতেই সবার দৃষ্টি আটকে গেল লেহেঙ্গাটির ঝলমলে সৌন্দর্যে। নাতাশা আমতা আমতা করে বলল,
“ম‍্যাম, একটু এদিকে আসুন!”
সুমু ফোনে স্ক্রোল করতে করতে বলল,
“উফফ নাতাশা! আবার কি হলো?”
“আসুন না, ম‍্যাম!”
সুমু উঠে এলো। লেহেঙ্গাটির দিকে তাকাতেই সে অবাক হয়ে গেল। একটি ব্ল‍্যাক ভেলভেট লেহেঙ্গা। ব্ল্যাক ভেলভেটের ওপর প্রতিটি ডায়মন্ড পাথরের সূক্ষ্ম কারুকাজ এমনভাবে বসানো, যেন রাতের আকাশে হাজার হাজার তারা একসাথে ঝিকমিক করছে। রুমে উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে। সুমু কোনকিছু না ভেবে শেরাজকে কল করল।
কল পিক করে শেরাজ বলল,

“কি সুইটহার্ট, আমাকে ছাড়া থাকতে পারছ না? এতো তাড়া কীসের? আসব তো আর একটু পর।”
সুমু বিরক্তিমুখে বলল,
“থামুন আপনি! আগে বলুন, কোন বড়লোকের বউয়ের বিয়ের লেহেঙ্গা ভুল করে এই বাড়িতে পাঠিয়েছেন?”
“মানে?”
“মানে একটা লেহেঙ্গা…”
“এই ওয়েট, সুইটহার্ট। কোন বড়লোকের মানে? তোমার আমাকে বড়লোক মনে হয় না?”
“খান সাহেব, মজা না করে বলুন!”
“মজা কোথায় করলাম? ওইটা তোমার জন‍্য।”
“আপনি জানেন, এই পুরো লেহেঙ্গাটা ডায়…”
“ডায়মন্ডের কাজ করা।”
“আপনি জানেন?”
“আমার পাঠানো জিনিস, আর আমি জানব না?”
“খান সাহেব, আপনি পাগল হয়ে গেছেন?”
“পাগল তো সেই কবেই হয়েছি। নাউ রেডি হও। সময় বেশি নেই, আমি আসছি।”
“খান সাহেব?”
“হুম সুইটহার্ট!”
“এই লেহেঙ্গাটার প্রাইজ কতো?”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,

পুরো লেহেঙ্গাটায় বসানো হয়েছে প্রায় ৩৫০০টি প্রাকৃতিক হাই-কোয়ালিটি ডায়মন্ড—প্রতিটির গড় ওজন ০.১৫ ক্যারেট, মোট প্রায় ৫২৫ ক্যারেট। বাজারদর অনুযায়ী প্রতিটি পাথরের গড় দাম প্রায় ১.৮ লাখ টাকা। তাহলে শুধু ডায়মন্ডের দামই দাঁড়াল প্রায় ৯৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর সাথে যুক্ত হলো কাস্টমাইজড ডিজাইন, আন্তর্জাতিক শিপমেন্ট, এবং হ্যান্ডওয়ার্ক—সব মিলিয়ে মোট দাম দাঁড়াল প্রায় ১০০ কোটি টাকা। লেহেঙ্গার মোট ওজন প্রায় ১২ কেজি—যার বড় অংশই ডায়মন্ড পাথরের জন্য।”
সুমু কপাল কুঁচকে বলল,
“আপনি এতো টাকা সামান্য একটা ড্রেসের জন‍্য নষ্ট করলেন? আমি এটা পরতে পারব না। আপনি এটা নিয়ে যান।”
ফোনের ওপাশ থেকে শেরাজের কণ্ঠ ভেসে এলো।

“রানিই কেবল সেরা জিনিসের যোগ্য, সুইটহার্ট। প্রতিটি স্টোন আমি নিজে বেছে এনেছি, পুরো লেহেঙ্গার ডিজাইন আমার নিজের পছন্দ মতো করা, শুধু তোমার জন্য। বিয়ে করলে এইটা পরেই তোমাকে বিয়ে করতে হবে।”
“কিন্তু আপনি এতো টাকা…”
“কতো টাকা? এই ড্রেসটার দাম আমার জীবনে তোমার থেকে বেশি নয়, সুইটহার্ট। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।”
কল কাটল শেরাজ। সুমু ফোনটা রেখে আবারও একবার লেহেঙ্গাটির দিকে তাকাল। নাতাশা, সুমু পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“ম‍্যাম চলুন! হাতে বেশি সময় নেই।”
সুমু সম্মতি জানিয়ে রেডি হতে গেল। মেকাপ আর্টিস্ট তাকে রেডি করতে শুরু করল।
সময় বয়ে যায়। সুমু আয়নার সামনে বসে আছে। লেহেঙ্গাটা পরে হাঁটতে পারছে না সে। তার গলায় ভারি ডায়মন্ড নেকলেস, কানে লম্বা ঝুমকা, হাতে চুড়ি, কপালে সিঁথির মাঝে টিকলি— সবকিছু মিলে সে যেন একেবারে রাজপ্রাসাদের রানি। অবশ্য রানিই তো, শেরাজ খানের রানি।
নাতাশা মনোযোগ দিয়ে তার চুলে হালকা ওয়েভ করে, পেছনে ডায়মন্ড পিন গেঁথে দিল। সুমুর ঠোঁটে ন‍িউড লিপস্টিক, চোখে কাজল আর স্মোকি শ্যাডো—তার দৃষ্টিতে আজ রহস্য আর সৌন্দর্যের মিশ্রণ। রুমে আলো আর গায়ে পারফিউমের গন্ধে এক স্বপ্নময় আবহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সাজের মাঝেই সুমুর বুকের ভেতর ধুকপুকানি চলছে—কারণ মনে পড়ছে সকালের সেই মুহূর্ত, শেরাজের দুষ্টু হাসি।

দূরে আতশবাজির শব্দ শোনা যাচ্ছে। চারপাশে আজ শুধু খুশির ঝিলিক। বাইরে তখন আলো-ঝলমলে আয়োজন পূর্ণতায় পৌঁছে গেছে। সোনালি ফেয়ারি লাইটে সাজানো গেট থেকে শুরু করে পুরো আঙিনা যেন এক স্বপ্নরাজ্য। দূরে ড্রামের তালে তালে বাজছে শাহী শেহনাই, আর তার সাথে মিলিয়ে বাজছে ওমানি ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সুর।
দূর থেকে ভেসে আসছে গাড়ির কনভয়ের শব্দ। ধীরে ধীরে গেটের সামনে এসে থামল একদম কাস্টম-মেড, কালো রোলস রয়েস ফ্যান্টম। দরজা খুলতেই চারপাশের আলো যেন তার দিকে ঝুঁকে পড়ল। শেরাজ নামল ব্ল‍্যাক শেরওয়ানি পরে, যার বোতামে আসল রুবির ঝলক। তার পাশে থাকা বন্ধুরা, আত্মীয়রা, আর নর্তকীরা মিলেমিশে যেন এক মহারাজের শোভাযাত্রা তৈরি করেছে।
গেটের ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই ফুলের ঝর্ণা ঝরে পড়ল শেরাজের ওপর। সে এমনভাবে এগোচ্ছিল যেন সে কোনো রূপকথার রাজপুত্র।
উপরে রুমের জানালায় দাঁড়িয়ে সুমু নিঃশ্বাস আটকে দেখছিল দৃশ্যটা। লেহেঙ্গার ভারে তার কাঁধ ভারী, কিন্তু বুকের ভেতর হালকা এক কম্পন—মনে হচ্ছে প্রতি পদক্ষেপে শেরাজ সরাসরি তার হৃদয়ের দিকে এগিয়ে আসছে।
নাতাশা হঠাৎ রুমে এসে বলল,

“ম‍্যাম, রাজা এসে গেছে। এবার রানির নামার পালা।”
সুমু নাতাশার কথায় লাজুক হাসল। সুমুর নয় ভাই রুমে ঢুকে এল তাকে নিয়ে যাবার জন‍্য।
বাইরে পুরো আঙিনা ঝলমলে আলোতে সেজেছে। মিউজিকের সুরে ঘর আনন্দে ভরে গেছে। আইয়ুবরা সুমুর মাথার ওপর তাজা রজনীগন্ধা আর গোলাপ দিয়ে বানানো সিরা ধরে রেখেছে। তাদের মাঝখান দিয়ে ধীরে ধীরে সুমুর সাথে এগিয়ে আসছে। সারবাজ, ইনায়া, ইশিতা, আরবাজ, শাহরুখ, রিয়াজ, ফিরোজা হাতে ফুলের পাপড়ি নিয়ে সুমুর দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যেন তার পথের প্রতিটি পদক্ষেপই সুগন্ধি ও রঙিন ফুলে ভরে উঠছে। সুমু ভারী লেহেঙ্গা পরে “সাজানজি ঘার আয়ে” গানে ধীরে ধীরে ড‍্যান্স করতে করতে শেরাজের দিকে এগোচ্ছে। শেরাজের মুখে তৃপ্তির হাসি। দূরে দাঁড়িয়ে রোজা হিংসাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আরিয়ান অসহায়ের মতো সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে।
ছেলে-মেয়ে অবস্থা দেখে আফতাব চৌধুরী মৌ সেনের কাছে এসে বললেন,
“তোমার ছেলে-মেয়েকে সামলে রেখো। আজ যেন ওরা কোনো ঝামেলা না করে।”
স্বামী কথায় মৌ সেন আরিয়ান আর রোজার দিকে তাকালেন। ছেলের মুখের দিকে তাকাতেই মৌ সেনের বুকের ভেতর ধক্ করে উঠল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

চারপাশে খুশির জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। সুমু নরম হাসি দিয়ে চোখ মৃদু নামিয়ে রাখল, তার ব্ল্যাক ভেলভেট লেহেঙ্গার ঝলক মিলিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আরও নাজুক ও রাজকীয় হয়ে উঠল। মিউজিকের তালে, সুমু ধীরে ধীরে নাচতে নাচতে স্টেজের দিকে এগোচ্ছিল। সে স্টেজের কাছে পৌঁছাতেই, শেরাজ তার আসন থেকে উঠে দাঁড়াল। চারপাশের অতিথিরা দেখছে। শেরাজ ধীরে হাত বাড়াল সুমুর দিকে। সুমুর আলতো হেসে শেরাজের হাতে হাত রাখল। ক‍্যামেরা ম‍্যান একের পর এক ছবি ক্লিক করতে লাগল।
সুমুকে আসনে বসিয়ে শেরাজ উঠে তার বন্ধুদের কাছে গেল। হঠাৎ রুমের লাইট অফ হয়ে গেল। চারপাশ নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল। এমন নিঃস্তব্ধতার মতো হঠাৎ একটা স্পটলাইল জ্বলে উঠল। স্পটলাইটের মধ্যে দেখা গেল শেরাজ পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। মিউজিক অন হলো। স্পটলাইট অফ হয়ে পার্টি লাইট অন হলো। একে একে দেখা গেল শেরাজের সবগুলো বন্ধুকে। অডিও স্পিকারে বাজতে শুরু করলো “বোলে চুড়িয়ান” গানটা। শেরাজের সাথে সকলে ড‍্যান্সে অংশগ্রহণ করল।

হলরুমের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ান আর সহ‍্য করতে পারল না। সে বেরিয়ে এলো বাড়ির ভেতর থেকে। আরিয়ানের সাথে সাথে মৌ সেনও বেড়িয়ে এলেন।
আরিয়ান গার্ডেনে এসে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। মৌ সেন এসে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন। পাশে তাকিয়ে নিজের মমকে দেখে আরিয়ান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে বাগানের নরম ঘাসের ওপর হাঁটুমুড়ে বসে গগন ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। মৌ সেন আরিয়ানের পাশে বসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তার চোখ বেয়ে নামছে ঝর্ণার মতো পানি।
আরিয়ান মৌ সেনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি আর সহ‍্য করতে পারছিনা, মম। আমি তাকে পাগলের মতো ভালোবাসি। অথচ সে আমার নয়। সে আমার জন‍্য নিষিদ্ধ কেন হলো, মম?”
মৌ সেন কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“শান্ত হও, বেটা। আমি জানি, তোমার হৃদয় ভেঙে পড়েছে। তুমি একা নও। এই যন্ত্রণার মধ্যে আমি তোমার পাশে আছি।”

আরিয়ানের চোখ থেকে অশ্রু ঝর্ণার মতো নামছে। তার হৃৎপিণ্ড যেন প্রতিটি ধাক্কায় বিদীর্ণ হচ্ছে। সে শুধু কাঁদছে না, সে হাহাকার করছে, প্রতিটি কণ্ঠস্বরেই তার নিষিদ্ধ ভালোবাসার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও অপ্রাপ্যতার যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি বাজছে। সে ঘাসের ওপর শুয়ে মৌ সেনের কোলে মাথা রেখে বলল,
“কীভাবে শান্ত হবো, মম? আমার কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। আমি বেবিগার্লকে এস.কের সাথে সহ‍্য করতে পারছি না। আমি জানি মম, বেবিগার্ল কোনদিনও আমার ছিল না, সে শুরু থেকেই এস.কের। এস.কের বউ সে, একজন বিবাহিত নারী। কিন্তু মম, আমি কি করব, বলো? আমি তো তার মায়ায় আটকে গেছি। তার মায়াবী চোখ, মনকারা হাসি — এসব কিছুর মায়াতে জড়িয়ে গেছি। আমি তো ইচ্ছে করে তার মায়াতে জড়াইনি, মম। কীভাবে যেন হয়ে গেছে সবটা। মায়া, ভালোবাসা তো বলে কয়ে আসেনা, মম।”
মৌ সেন নিঃশব্দে শুধু কাঁদছে। আরিয়ানের কণ্ঠের আঘাত তার হৃদয়কে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আরিয়ান আবারও গগন ফাটিয়ে চিৎকার করে বলল,

“মম, আমি আর সহ্য করতে পারছি না। প্রতিটি মুহূর্তে তার কথা মাথায় ভরে আছে। প্রতিটি নিঃশ্বাসে তার হাসি, তার মায়া— সব যেন আমাকে শ্বাসরোধ করছে। আমি তাকে ভুলতে পারছি না, মম। ভুলতে চাইলেও মনে হচ্ছে যেন সে আমার রক্তে মিশে গেছে। আমি কী করব? আমি কি কোনদিন শান্তি পাবো?”
তার আর্তনাদের শব্দে বাতাসে একদম কাঁপন ছড়িয়ে পড়ল। মৌ সেন চুপচাপ তাকে আরও শক্তভাবে জড়িয়ে ধরলেন। আরিয়ান মাথা নাড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তার মায়া, তার উপস্থিতি—সবই আমাকে ধরে রাখছে। আমি তো শুধু তাকে ভালোবাসি— ভালোবাসি পাগলের মতো, অথচ সে আমার নয়। নিষিদ্ধ, এতো নিষিদ্ধ কেন, মম? সে কেন আমার জন্য নয়? আমার যে মরে যেতে ইচ্ছে করছে, মম। তাকে অন‍্যকারো সাথে এভাবে দেখার থেকে মরে যাওয়া ভালো, মম। সে আমার নয়, কিন্তু আমি তাকে ছাড়তে পারছি না। আমি কি করবো, মম?”

মৌ সেন, ছেলের কণ্ঠে কান্নার আঘাত শুনছে আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আজ আরিয়ান থামছে না। তার হৃদয়ের আর্তনাদ গার্ডেনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যেন রাতের নীরবতাকে চূর্ণ করে দিচ্ছে।
বিয়ে পুরো জমে উঠেছে। সুমু আর শেরাজকে দু’দিকে বসানো হলো। তাদের মাঝখানে তাজা ফুল দিয়ে বানানো একটি পর্দা টানা হলো। সুমুর মুখ ঘোমটা দিয়ে ঢাকা।
কাজী বিয়ে পড়ানো শুরু করল। ‘কবুল’ বলে বিয়ে পড়ানো শেষ করা হলো। শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে ফুলের পর্দা সরিয়ে ধীরে ধীরে সুমুর কাছে এগিয়ে এসে তার দু’কাধ ধরে দাঁড় করালো। ঘোমটা তুলে সুমুর কপালে আলতো করে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল। বিয়েতে উপস্থিত সকলে হাততালি দিয়ে তাদের নতুন জীবনের শুভেচ্ছা জানালো।
নাতাশা পাশ থেকে বলল

“ম‍্যামের হাতে আপনার নাম সিক্রেট ভাবে লেখা আছে — সেটা খুঁজে বের করুন, স‍্যার।”
শেরাজ একটু খুঁজতে পেয়ে গেল। সকলে আবারও হাততালি দিল। রাহিনরা এসে সুমুকে শেরাজের হাতে তুলে দিল। রাজকীয় আলো, ফুলের বর্ষা, এবং তাদের দুজনের একে অপরের চোখে দেখা ভালোবাসা—সব মিলিয়ে যেন স্বপ্নের গল্পে বেঁধে দিল তাদের জীবনকে।
বিদায়ের পালা শুরু হলো। বাড়ির সামনে দু’শো প্রাইভেট কার, পাঁচশো বাইক এবং একটি রয়াল ওয়েডিং ক্যারিজ রাখা। রয়াল ওয়েডিং ক্যারিজটি পুরো ফুলে আবৃত, যেন এক রাজকীয় থ্রোন। গাড়ির ওপর রাখা দু’টো সিংহাসন দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, আর চারপাশে রজনীগন্ধা ও গোলাপের সুগন্ধি বাতাসে ভেসে আসছে।
রাস্তার একপাশ থেকে আরেকপাশ পর্যন্ত পুরো এলাকা ব্লক করা। অতিথিরা, পরিবারের সদস্যরা, এবং বন্ধুরা সবাই অপেক্ষায়। কেউ কেউ ফুলের পাপড়ি হাতে নিয়ে, কেউ কেউ হাততালি দিচ্ছে। মিউজিকের তালে বাতাসে বাজছে হালকা ঢোলের ছন্দ, যেন প্রতিটি শব্দ এই রাজকীয় বিদায়ের মুহূর্তকে আরও আনন্দে করে তুলছে।
শেরাজ সুমুকে কোলে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগোচ্ছে। সকলে তাদের দিকে ফুলের পাপড়ি ছিঁটিয়ে দিচ্ছে। সুমুর চোখে আড়ম্বর, হাসি লাজুক, আর শেরাজের চোখে শুধু তারই প্রতিফলন। সে সুমুকে নিয়ে সিংহাসনে বসালো। সুমুর লেহেঙ্গা ঝলমলে, তার ঘোমটা ধীরে সরানো হলো, আজ সবার চোখে যেন সে রাজকন্যার মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

ফুলের বর্ষা, বাতাসে ভেসে আসা সুগন্ধি, এবং অতিথিদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে যেন রাতটি এক স্বপ্নের মতো হয়ে উঠল। বাইক আর গাড়ির হর্নের শব্দে একে একে বাজতে শুরু হলো। শেরাজ আর সুমু ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বিদায়ের পথে এগোলো। রাস্তা থেকে শুরু হলো মিষ্টি বিদায়ের খুশি।
পুরো ওমান শহর আজ তাদের বিয়ের সাক্ষী হলো। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়ানো মানুষ— ছোট-বড়, ছেলে-মেয়ে—সবাই বিস্ময়ে ও উচ্ছ্বাসে তাদের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ ফোন বের করে মুহূর্তটি ভিডিও করছে।
রাস্তার আলোয় গাড়িগুলো ঝলমল করছে। পাঁচশো বাইক ও দু’শো প্রাইভেট কারের সামনে ফুলে সজ্জিত রয়াল ওয়েডিং ক্যারিজটি যেন এক রাজকীয় পদযাত্রা। গাড়ির ওপর রাখা সিংহাসন, ফুলের ঝলক, আর রজনীগন্ধার সুগন্ধি—সব মিলিয়ে পুরো শহরকে এক জাদুকরী রাতে পরিণত করছে।
মাঝরাস্তায় এসে সুমু আবদার করে বলল,
“খান সাহেব! আমি চাই, বাকি রাস্তা আমরা বাইকে করে যাব।”
শেরাজ চোখে একটু অবাক ভাব। সে ভ্রু খানিকটা তুলল,
“বাইকে?” সে ধীরে ধীরে ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“ঠিক আছে, সুইটহার্ট।”
গাড়ির হর্ন থেমে গেল। শেরাজ নেমে গিয়ে একজনকে গাড়িতে যেতে বলে বাইকটা এনে রয়াল ওয়েডিং ক‍্যারিজের সামনে দাঁড়াল। বাইক থেকে নেমে সুমুকে কোলে তুলে এনে বাইকে বসিয়ে দিল।
অতিথিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। বউ আর বর এক বাইকে করে রাস্তার ধারের ফুল-সজ্জিত পথ ধরে এগোবে। শেরাজ বাইকের সামনে বসে শক্ত হাতে হ্যান্ডেল ধরে রাখল। সুমু তার পেছনে বসে শেরাজকে আলতো করে আঁকড়ে ধরল। তার চোখে লাজুক হাসি, আর ঘোমটার আড়ালে যেন উজ্জ্বল আলোয় তার মুখ ঝিলমিল করছে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়ানো মানুষ উচ্ছ্বাসে হাততালি দিল। বাইক ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো খান ম‍্যানশনের উদ্দেশ্যে।

খান ম‍্যানশন চোখ ধাধানো সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। সুমু আর শেরাজ ধীরে ধীরে খান ম্যানশনের ভেতর প্রবেশ করল।
ম্যানশনের ভিতরে উপস্থিত সবাই—অনন্যা খাতুন, সাহবাজ খান, শেহেজাদ খান ও আফিয়া খাতুন, সারবাজ, আরবাজ, ইশিতা, শাহরুখ, রিয়াজ, ফিরোজা, আদনান চৌধুরী ও রুহি খাতুন—সবাই উচ্ছ্বাসে ও আনন্দে ফেটে পড়ল।
অনন্যা খাতুন চোখে টলমল জল নিয়ে সুমুর দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
“আমার মামনি আবার আমার ঘরে ফিরে এসেছে।”
তার কণ্ঠে এমন কোমলতা যে, সুমুর হৃদয় এক মুহূর্তে উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল। সে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে অনন‍‍্যা খাতুনকে জড়িয়ে ধরল।
সাহবাজ খান আলতো হেসে বললেন,

“মা, মেয়ে কি শুরু করলে? সুমু মামনি টায়ার্ড। কান্নাকাটি কাল করবে। এখন ওদের ভেতরে আসতে দাও।”
শেহেজাদ খান ও আফিয়া খাতুন সুমুর কাছে এসে তাকে দোয়ায় ভরিয়ে দিল। সারবাজ, আরবাজ ও শাহরুখ আলতো করে শেরাজের কাঁধে হাত রেখে শুভেচ্ছা জানিয়ে ড্রয়িংরুমের ভেতর এসে দাঁড়াল। আদনান চৌধুরী ও রুহি খাতুন সুমু আর শেরাজকে নতুন জীবনের জন‍্য শুভেচ্ছা জানালো। রিয়াজ আর ফিরোজা সুমুর হাতে ফুল তুলে দিল। পুরো ম্যানশন যেন খুশির জোয়ারে ভেসে গেল। সকলে তাদের দুজনকে সম্মানের সাথে স্বাগত জানালো।
রাত গভীর হওয়ায় অনন‍্যা খাতুন শেরাজকে বললেন ‘সুমুকে নিয়ে রুমে চলে যেতে’। শেরাজ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। ইশিতা, ইনায়া, নাতাশা আর কিটিকে নিয়ে তাদের থাকার রুম দেখিয়ে দিল। কিটি, নাতাশা কোল থেকে নেমে সারাবাড়ি ঘুরঘুর করতে লাগল।
বাড়ির বড়রা একে একে রুমে চলে গেল। শেরাজ সুমুকে নিয়ে গোলাপের পাপড়ি বিছানো সিঁড়িতে পা রাখতেই হঠাৎ নাতাশা, ইশিতা আর ইনায়া এসে পথ আটকে দিল।
“আগে সুমু এক রুমে যাবে। আপনি এখানেই দাঁড়ান, ভাইয়া।”

সুমু হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। তারা সুমুকে ধরে রুমের ভিতরে নিয়ে গেল। এদিকে শেরাজ পেছনে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
রুমের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। পুরো ঘর সাজানো হয়েছে কাঁচা লাল গোলাপ দিয়ে, চারপাশে ছড়িয়ে আছে আলো আর সুগন্ধ। গোলাপের মধ্যে হালকা মোমবাতির আলো ঝলমল করছে। সুমুর চোখে আনন্দ আর বিস্ময়ের মিশ্রণ ভরে উঠল।
ইনায়ারা সুমুকে ভেতরে রেখে রুমের বাইর থেকে দরজা আটকে দিল। সুমু ভিতরে দাঁড়িয়ে মনে মনে হাসি ধরে রাখতে পারছে না। এদিকে সারবাজরা শেরাজকে রুমের সামনে নিয়ে এলো। শেরাজ ঢুকতে চাইলে ইশিতা পথ আটকে বলল,
“টাকা দিয়ে বউয়ের কাছে যান।”
শেরাজ এতোটাই মরিয়া যে, সে কোনো জামেলাতে না গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। সবাই অবাক হয়ে একে অপরের দিকে চেয়ে থাকল। মুহূর্তটা এমন ছিল যেন হঠাৎ সবকিছু থেমে গেছে।
পাঁচ মিনিটের মাথায় শেরাজ আবার এলো। হাতে একটা চেক নিয়ে ইশিতার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“এমাউন্ড বসিয়ে নিও। এখন রুমের দরজা ছাড়ো। আর ওই যে ঘুরঘুর করছে ম্যানার্সলেস বিড়ালের বাচ্চা—ওটাকেও সাথে নিয়ে যাও।”

ইশিতা, নাতাশা ও ইনায়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু সারবাজরা হেসে ফেলল। শেরাজের এই দৃঢ়তা আর উদ্যম দেখে সবাই স্তম্ভিত। সুমু রুমের ভিতরে দাঁড়িয়ে শুধু অবাক চোখে পরিস্থিতি দেখছে, আর হাসি ও লাজুকতা মিশ্রিত আনন্দে তার হৃদয় ভরে উঠেছে।
ইশিতারা চলে গেল। শেরাজের রুমে ঢুকল। সে সুমুকে বেডে বসিয়ে শেরওয়ানি খুলে সুমুকে চেঞ্জ করে নিতে বলে বাহিরে যাবার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। সুমু পেছন থেকে বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন?”
শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“চেঞ্জ করো নাও, আমি এক্ষুনি আসছি।”
বেরিয়ে গেল সে। সুমু কাবার্ড থেকে ড্রেস নিয়ে চেঞ্জ করতে চলে গেল। সে চেঞ্জ করে এসে দেখল শেরাজ ডিভানে বসে আছে। তার সামনে রাখা এক প্লেট বিরিয়ানি। শেরাজ সুমুকে দেখে মুচকি হেসে বলল,
“এদিকে এসো, সুইটহার্ট।”

সুমু এগিয়ে গেল। শেরাজ সুমুকে বসতে বলল। সুমু বসতেই শেরাজ বিরিয়ানি তুলে সুমুর মুখের সামনে ধরল। সুমু অবাক হয়ে তাকাতেই শেরাজ বলল,
“শুনেছি বিয়ের দিন মেয়েরা টেনশনে ঠিকমতো কিছু খেতে পারে না। যদিও এইটা আমাদের প্রথম বিয়ে না। তবুও তুমি টেনশনে ছিলে। আমি খেয়াল করেছি— তুমিও তেমন কিছু খাওনি। এখন তো বিয়ে শেষ। সেই সাথে টেনশনও শেষ। এখন খেয়ে নাও।”
সুমু আলতো হেসে খাবার মুখে নিল। শেরাজ খুব যত্ন করে খাইয়ে দিল তাকে।
খাওয়ানো শেষ হলো। শেরাজ আলতো হাসি দিয়ে সুমুকে বেডে বসতে বলল। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে ফিরে এলো। সে ধীরে ধীরে আলমারি থেকে একটি ফাইল বের করল। সুমুর দিকে তাকিয়ে বেডে বসে ফাইলটি তার হাতে দিয়ে বলল,
“এইটা তোমার গিফট।”
সুমু কৌতুহলবশত ফাইলটি খুলে দেখল। সে অবাক হয়ে তাকাল। এটি কোনো সাধারণ গিফট নয়। ফাইলের মধ্যে একটা সম্পূর্ণ বাড়ির দলিল। সুমু চোখ বড় করে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ মুচকি হাসি দিয়ে বলল,

“সুমুরাজ মহল—এইটা শুধু তোমার জন্য।”
“এসব কেন, খান সাহেব?”
“দরকার আছে তাই। এখন এটা রাখো। রাত শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
শেরাজ সুমুর হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখল। সুমু মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ সুমুর কাছে আসতে গেলেই সুমু তাকে বাঁধা দিয়ে বলল,
“আমিও আপনাকে কিছু দিতে চাই।”
শেরাজ কৌতুহলবশত তাকাতেই সুমু শেরাজের হাত তার পেটের ওপর রাখল। শেরাজ অবাক হয়ে সুমুর দিকে তাকাল। সুমু আলতো হেসে মাথা নেড়ে সায় জানালো। শেরাজ যেন বিশ্বাস করতে পারল না। সে ধীরে বলল,
“সত্যি?”
“হুম, খান সাহেব!”
শেরাজ সুমুকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বলল,
“সুইটহার্ট! তুমি জানো না, তুমি আমাকে দুনিয়ার বেস্ট গিফট দিলে। আমি সত্যি বাবা হবো। সত্যি আমার চ‍্যাম্পরা আসবে। আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা।”

সুমু আলতো হাসলো। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল উষ্ণ নোনা পানি। শেরাজ সুমুকে জড়িয়ে ধরে রাখল। সুমু শীতল হাত দিয়ে শেরাজের কাঁধে আলতো স্পর্শ করল। বেডের ওপর পড়ে থাকা নরম আলো এবং ঘরের শান্ত পরিবেশে এই মুহূর্ত যেন সময়কে থামিয়ে দিয়েছে। শেরাজ ধীরে কণ্ঠে বলল,
“সুইটহার্ট! তুমি জানো না, তুমি আমার জীবনে কত আনন্দ এনেছো। আর আজ, আজ তুমি আমাকে জীবনের সবচেয়ে বড় সুখের খবর দিয়েছ। আমি সত্যি ভাগ্যবান।”
“আমি কেবল আপনার সুখ চাই।”
শেরাজ আলতো হেসে তার কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল।
“তুমি আমার জীবনকে সম্পূর্ণ করেছো। আমি আর কিছু চাই না। এবার আমি আমার চ‍্যাম্পদের সবটা দিয়ে আগলে রাখব।”
সুমু শেরাজকে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরল। ঘরের নরম আলো, গোলাপের সুবাস—সব মিলিয়ে এই রাত যেন এক চিরস্মরণীয় মুহূর্তে পরিণত হলো।

নতুন দিনের প্রথম আলো অনেক আগেই ছড়িয়ে পড়েছে। সোনালি রোদ খুঁজে খুঁজে বেডরুমের জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। ঘরের নরম আলোতে সবকিছু আরও উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে।
সুমু ধীরে চোখ খুলে শেরাজকে পাশে দেখে হেসে উঠল। শেরাজ এখনও অর্ধ ঘুমে। সুমু আলতো করে শেরাজের উন্মুক্ত বুকে হাত রাখল, সাথে সাথে শেরাজ চোখ খুলে তাকিয়ে বলল,
“গুড মনিং, সুইটহার্ট!”
সুমু আলতো হাসলো। হঠাৎ শেরাজের ফোনটা বেজে উঠল। কল রিসিভ করে শুধু কথা শুনলো সে। তারপর ফোনটা জায়গা মতো রেখে বলল,
“বিকালে একটা জায়গায় যাব, আর রাতে এসে প‍্যাকিং করব।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৬৪

“প‍্যাকিং কিসের?”
“আম্মু আব্বুকে দেখতে যেতে চাও?”
সুমু চোখে পানি এলো। শেরাজ তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
“আমরা আজ রাতে বিডিতে যাচ্ছি। শুধু আমি, তুমি না। আমি, তুমি, রাহিন— আমরা সবাই মিলে।”
“কিন্তু এতোদিন পরে এ বাড়িতে এলাম…”
“তো? সারাজীবন তো এখানেই থাকবে। বেবি বাম্প হবার আগে বিডি থেকে ঘুরে আসি। আর তাছাড়া আরও একটা কাজ আছে।”
“কি কাজ?”
“সেটা না হয় সারপ্রাইজ থাক।”
সুমু শেরাজকে জড়িয়ে ধরল। শেরাজ সুমুকে নিজের বুকের মধ্যে নিয়ে আবারও ঘুমানোর চেষ্টা করলো।

খান সাহেব পর্ব ৬৬