Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৬৬ (২)

খান সাহেব পর্ব ৬৬ (২)

খান সাহেব পর্ব ৬৬ (২)
সুমাইয়া জাহান

ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে শেখ বাড়ির চারপাশে। চারদিকে ভিজে ঘাস, কুয়াশার আবরণ, আর পাখির কিচিরমিচির শব্দ যেন সকালটাকে করে তুলেছে আরো সজীব। রাতের দীর্ঘ যাত্রা আর আবেগঘন মুহূর্ত কাটিয়ে সুমু ঘুমিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। জানালা দিয়ে ভোরের আলো তার মুখে এসে পড়তেই সে ধীরে ধীরে চোখ মেলল। পরিচিত নিজের দেশের আকাশ, গাছের ফাঁক দিয়ে ঢোকা আলো, আর বাতাসের মিষ্টি গন্ধ তাকে অন্য রকম প্রশান্তি দিল।
শেরাজ ওয়ার্কআউট শেষ করে শাওয়ার নিয়ে হালকা নীল শার্ট পরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। সুমু জেগে উঠতেই সে ফিরে তাকাল। ঠোঁটে একটুকরো নরম হাসি এনে বলল,

“জেগে উঠেছো, সুইটহার্ট? কেমন লাগছে নিজের দেশের সকাল?”
সুমু আধো ঘুম জড়ানো কণ্ঠে করে বলল,
“স্বপ্নের মতো লাগছে, খান সাহেব। মনে হচ্ছে, আমার শৈশবের সকালগুলো আবার ফিরে এসেছে।”
শেরাজ কাছে এসে বিছানার ধারে বসল। সুমুর কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল,
“যেই সকালে তোমার হাসি দেখা যায়, সেই সকাল আমার জন্য সবচেয়ে সুন্দর।”
সুমু মৃদু হেসে মাথা নামিয়ে নিল। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
“জানেন, এই ভোরবেলা উঠেই বারান্দায় বসে চা খেতে ইচ্ছে করছে।”
শেরাজ চোখ মেরে বলল,
“তাহলে চলো, আমি তোমার ইচ্ছে পূরণ করি।”
সুমু বেড থেকে নামতে গেলে শেরাজ তাকে ধরে বলল,

“চলো, আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
“কিন্তু কেনো, খান সাহেব? আমি একা যেতে পারব।”
“না, পারবে না। কেনো বুঝতে পারছ না– এখন তুমি একা নও, সুইটহার্ট।”
সুমু আলতো হেসে শেরাজের হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। সুমুকে ধরে নিয়ে গেল ওয়াশরুমে। ফ্রেশ করে এনে সুমুকে নিয়ে নিচে যাবার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল শেরাজ। করিডোর থেকে নিচে নামার সিঁড়িতে এসে শেরাজ হাত বাড়িয়ে দিল।
“সাবধানে, সুইটহার্ট। ধীরে ধীরে নামো।”
সুমু হালকা হেসে বলল,
“খান সাহেব, আমি পারব।”
শেরাজ হালকা হেসে বলল,
“এখন তুমি শুধু আমার বউ নও, তুমি আমার সন্তানের মা-ও। তাই তোমার আগের চেয়েও বেশি যত্ন করতে হবে।”

সুমু লজ্জায় কিছু না বলে তার হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। নিচে ডাইনিং হলে তখন নাস্তার টেবিল সাজানো হচ্ছে। পরোটা, ডাল, ডিম, হালকা ভাজি, সাথে গরম গরম চা আর দুধ। সকলে একে একে টেবিলে জড়ো হয়েছে।
সামিয়া, সুমুকে দেখেই খুশি হয়ে বলল,
“আপু, তুমি অবশেষে নেমেছো। তোমার জন্য সবাই বসে অপেক্ষা করছিল।”
নাজমিন হেসে বলল,
“আপুর জন্যই আজকে সকালের নাস্তা এতো জমকালো হয়েছে।”
শাহরুখ ঠাট্টা করে বলল,
“জমকালো না, ভিআইপি। কারণ সুমুর সাথে সাথে ভাইয়া ও তার ফ্রেন্ডরাও এসেছে।”
সবাই হেসে উঠল। রুমা বেগম স্নেহভরে এগিয়ে এসে সুমুর কাঁধে হাত রাখলেন।
“আয় মা! এ সময়ে নিজের একটু খেয়াল রাখ।”
তিনি সুমুকে টেবিলের কাছে নিয়ে এলো। শেরাজ সুমুকে নিজের পাশে বসাল। সে আস্তে করে সুমুর প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিল। এটা দেখে আশিক হেসে বলল,

“দ্যাখো দ্যাখো, কি যত্ন।”
সারবাজ পাশ থেকে বলল,
“আহা! শেরাজের রোমান্স শেষ হবার নয়।”
শেরাজ গম্ভীর মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমরা হাসাহাসি বাদ দিয়ে, খাও।”
সুমু নরম গলায় বলল,
“আব্বু, বড়বাবা আর দাদি খেয়েছে?”
হাসি বেগম শেরাজের সামনে গরম দুধ রেখে বললেন,
“হ‍্যাঁ! তোর বাবা আর বড়বাবা খেয়ে অফিসে চলে গেছে। আর তোর দাদি রুমে আছেন।”
সুমু আস্তে করে শেরাজকে বলল,

“আপনার না দুধে এলার্জি?”
শেরাজ দুষ্টু হেসে চাপাস্বরে বলল,
“হ‍্যাঁ! পশুর দুধে এলার্জি আমার।”
শেরাজের উত্তর শুনে সুমু থতমত খেয়ে গেল। সে আর কিছু না বলে চুপচাপ খাওয়াতে মন দিল। শেরাজ দুধের গ্লাসটা সুমুর সামনে রাখল। সবাই কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর আবারও হাসি আর উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল চারপাশ।
টেবিলের কোণায় সামিয়া চুপচাপ বসে আছে। চোখে এখনো পানি জমে আছে তার। হঠাৎ রাহিন তার দিকে প্লেট এগিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কি হয়েছে তোর? এখনো কাঁদছিস কেন?”
সামিয়া চমকে তাকাল। তারপর আমতা আমতা করে বলল,
“আমি কাঁদছিলাম না।”

রাহিন মৃদু হেসে আবার চুপ করে গেল। কিন্তু সামিয়ার বুকের ভেতর যেন কেমন অদ্ভুত কাঁপন তুলে গেল।
অন্যদিকে, নাজমিন পরোটা ছিঁড়ে খাচ্ছিল। আইয়ুব তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“বিয়াইন! আপনার খাওয়ার ভঙ্গিটা কিন্তু একদম ছোটদের মতো।”
নাজমিন প্রথমে বিরক্ত নিয়ে তাকাল।
“আবার শুরু করলেন?”
আইয়ুব হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“কি করব বলো? তোমার পেছনে না লাগলে আমার ভালো লাগে না।”
নাজমিন চুপ করে খেতে লাগল। খাবার টেবিল জমে উঠল। সকলে হাসি-মজা করতে করতে সকালের নাস্তা শেষ করল।
নাস্তা শেষে সবাই গল্পে ব্যস্ত। কেউ চা নিয়ে বসে আছে, কেউবা হাসিঠাট্টায় মেতে উঠেছে। সেই ভিড় থেকে সুমুকে আস্তে করে সরিয়ে নিল শেরাজ। দু’জন বাড়ির পেছনের বাগানে এলো। ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস, ফুলের গন্ধ আর নরম রোদে চারপাশ ভরে গেছে।
শেরাজ সুমুকে গার্ডেনে থাকা চেয়ারের দিকে ইশারা করে বলল,

“বসো, সুইটহার্ট! অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছো।”
সুমু একটু অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনি এতো চিন্তা করছেন কেন? আমি ভালো আছি।”
শেরাজ নরম গলায় বলল,
“এখন তোমার শরীরটা শুধু তোমার নয়, আমাদের শিশুরও। তাই আমি কোনো রকম ঝুঁকি নিতে চাই না।”
সে আলতো করে সুমুর ওড়নাটা ঠিক করে দিল, যেন ঠাণ্ডা বাতাসে তার কষ্ট না হয়। তারপর নিজের হাতের তালুতে সুমুর হাত জড়িয়ে নিল।
“তুমি জানো, আমি শক্ত মানুষ– কিন্তু তোমার সামনে এসে সবসময় দুর্বল হয়ে পড়ি। তোমাকে আর আমাদের সন্তানকে রক্ষা করাই এখন আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”
সুমুর চোখ ভিজে উঠল। সে নিচু গলায় বলল,
“খান সাহেব, আমি ভাগ্যবতী যে আপনাকে পেয়েছি।”
শেরাজ মৃদু হেসে তার আঙুলে আলতো করে চাপ দিল।

“না সুইটহার্ট! ভাগ্যবান তো আমি। কারণ তুমি আমার জীবনে আছো।”
দু’জন কিছুক্ষণ নীরব হয়ে বসে রইল। দূরে পাখির ডাক, আর হালকা বাতাসে মুহূর্তটা আরও কোমল হয়ে উঠল। ঠিক সেই সময় ভেতর থেকে সামিয়ার কণ্ঠ ভেসে এলো।
“আপু, আম্মু ডাকছে। তুমি একটু ভেতরে এসো।”
সুমু উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু শেরাজ আগে হাত বাড়িয়ে তাকে উঠতে সাহায্য করল।
“সাবধানে, ধীরে ধীরে!”
সুমু হেসে বলল,
“আপনি তো একেবারে আমার ছায়া হয়ে গেছেন।”
শেরাজ ঠোঁটে একটুকরো দুষ্টু হাসি এনে উত্তর দিল,
“যতদিন বাঁচবো, তোমার ছায়া হয়েই থাকব।”

ড্রয়িংরুমে সকলে বসে আছে। সুমু ঘরে ঢুকতেই হাসি বেগম তাকে স্নেহভরে পাশে বসালেন। মমতাভরা চোখে তাকিয়ে বললেন,
“মা, এতদিন পর দেশে ফিরলি। এখন তোকে আগলে রাখতে হবে আরও বেশি। এটা তোর জন্য ছোট্ট একটা উপহার।”
তিনি হাত বাড়িয়ে একজোড়া ঝলমলে সোনার চুড়ি দিল সুমুর হাতে। সুমু অবাক হয়ে চুড়ি হাতে নিয়ে বলল,
“আম্মু, এতো সুন্দর?”
ঠিক তখনই রুমা বেগম এগিয়ে এলেন। তার হাতে সোনার নেকলেস আর কানের দুল।
“মা! তুই এখন শুধু আমাদের সুমু নস– তুই এখন মা হতে চলেছিস। তাই তোকে আমার তরফ থেকে উপহার হিসেবে এই গয়নাগুলো দিলাম।”
সুমু আলতো হেসে বলল,

“এসব কেনো? তোমাদের দোয়া তো এমনিতেই সবসময় আমার সাথে আছে।”
হাসি বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“এসব দিতে হয়। তুই একবার এগুলো পরে দেখ।”
রুমা বেগম আলতো হেসে বললেন,
“শেরাজ বাবা! গয়নাগুলো ওকে পরিয়ে দাও।”
শেরাজ ভদ্রতাসূচক হেসে সুমুর পাশে গিয়ে বসল। সে নেকলেসটা আস্তে করে সুমুর গলায় পরিয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে কানের দুল পরিয়ে দিল। ফারিয়া আয়না ধরল সুমুর সামনে। সুমু আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। এরপর শেরাজ চুড়ি হাতে নিয়ে সুমুর হাতে পরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু চুড়ি আটকে গেল।
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“চুড়ি ঢুকছে না তো!”
হাসি বেগম বললেন,

“ওর রুমে থাকা আগের চুড়ির মাপ নিয়ে বানানো হয়েছে। মনে হয় ছোট হয়ে গেছে।”
সুমুর একটু মন খারাপ হলো। তার মা এতো ভালোবেসে তাকে চুড়ি জোড়া দিল, কিন্তু তার হাতে ঢুকছে না– এইটা ভেবেই তার মন খারাপ হলো। শেরাজ সুমুর মন খারাপ হওয়া দেখে চুড়ি পরানো চেষ্টা করতে করতে বলল,
“সুইটহার্ট, ঢুকছে না তো। একটু তেল মেখে নিয়ে জোরে দেই, তাহলে ইজিলি ঢুকে যাবে।”
রুমা বেগম বললেন,
“আরে হ‍্যাঁ! হাতটা একটু পিছল হলে, হয়তো ঢুকে যাবে।”
সামিয়া গিয়ে তেল নিয়ে এলো। শেরাজ তেল নিয়ে সুমুর হাতে আগে ভালো করে মেখে নিল। তারপর ধীরে ধীরে চুড়িটা পরিয়ে দিল। চুড়ি হাতে ঢুকতেই সবাই তৃপ্তির হাসি দিল। সুমু মৃদু হাসল। তার চোখে যেন আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠল।
হাসি বেগম বললেন,

“চুড়ি জোড়া কি সুন্দর মানিয়েছে আমার মেয়ের হাতে।”
রুমা বেগম গর্বভরা দৃষ্টিতে শেরাজের দিকে তাকালেন।
“বাহ্! শেরাজ বাবা, কত যত্ন নিয়ে পরালে। তোমার হাতে যেন জাদু আছে।”
শেরাজ হেসে জবাব দিল,
“না বড়মা! জাদু আমার হাতে নয়, জাদু আছে সুমুর হাসিতে।”
সবাই আবার হেসে উঠল। সুমু ঠোঁট কামড়ে নিচু চোখে বসে রইল, কিন্তু তার গালে লাজুক লাল আভা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

সুন্দর একটি বিকেল। চারপাশে নীরবতা। শুধু পাখির কিচিরমিচির আর গাছের পাতার মৃদু শব্দ। শেখ বাড়ির ভেতর সবাই দুপুরের ভাতঘুমে ডুবে আছে। শুধু সুমু নিজের রুমে একা বসে আছে। হাতে উপন‍্যাসের বই থাকলেও চোখ বইয়ের পৃষ্ঠায় নয়, জানালার বাইরের আকাশে। হালকা হাওয়া এসে ওর চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন এই প্রশান্তি অনেকদিনের চেনা সঙ্গী। হঠাৎ দরজায় হালকা নক শোনা গেল।
“ঢুকব, মা?”
সুমু বইটা নামিয়ে রেখে বলল,
“এসো আম্মু!”
হাসি বেগম মিষ্টি হেসে ভেতরে ঢুকলেন। এসে সুমুর পাশে বিছানায় বসলেন। হাতটা মেয়ের মাথায় রেখে বললেন,
“শেরাজরা কি সন্ধ্যার আগে ফিরবে?”
“জানি না আম্মু! সে আজ বন্ধুদের সাথে বাইক নিয়ে বেরিয়েছে। কিন্তু কেন, আম্মু?”
হাসি বেগম গলা নামিয়ে একটু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

“আজ বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান আছে। সবাইকে থাকতে হবে।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“অনুষ্ঠান? কিসের অনুষ্ঠান?”
হাসি বেগম ঠোঁটে হালকা হাসি এনে উত্তর দিলেন,
“আজ সন্ধ্যায় সামিয়াকে দেখতে আসবে।”
সুমু চমকে উঠল।
“কী! দেখতে আসবে মানে? সামিয়ার কী আর এমন বয়স হলো, আম্মু? এতো তাড়াতাড়ি এসব কেন? আর পাত্রই বা কে?”
হাসি বেগমের মুখে শান্ত হাসি।

“ছেলে আমাদের সবার পছন্দের।”
সুমুর চোখ আরও বড় হয়ে উঠল।
“পছন্দের মানে? কে সে?”
হাসি বেগম স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন মেয়ের দিকে। মৃদু হেসে বললেন,
“পিয়াস!”
সুমু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। বুকের ভেতর কেমন অজানা ধাক্কা লাগল তার। সে খবরটা শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। চোখেমুখে বিস্ময় আর অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। তারপর আস্তে গলা নামিয়ে বলল,
“আম্মু, আমি আপত্তি করছি। সামিয়ার এখনো পড়াশোনা বাকি। বিয়ের জন‍্য সামনে অনেক সময় পড়ে আছে। এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে হবে না।”
হাসি বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন,

“সুমু মা, পিয়াস তো খারাপ ছেলে না। বিয়ের পর সে সামিয়াকে পড়তে দিবে।”
সুমু মাথা নেড়ে বলল,
“সেটা আমি জানি, আম্মু। পিয়াস ভাইয়া আমার ফুফাতো ভাই– তাকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। মানুষ হিসেবে সে খারাপ নয়, কিন্তু…”
হাসি বেগম কথা কেটে দিলেন।
“কোনো কিন্তু নয়। আমার এক মেয়ের অনেক দূরে বিয়ে হয়ে গেছে। তোকে আমি সহজে কাছে পাই না। আমি চাই, আমার এই মেয়ে আমার কাছেই থাকুক। সামিয়া যদি পিয়াসকে বিয়ে করে, তাহলে অন্তত আমার চোখের সামনে থাকবে।”
সুমু মায়ের চোখে অজানা মায়া দেখতে পেল। কিন্তু তবুও তার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি রয়ে গেল। হাসি বেগম মৃদু হেসে আবারও বললেন,

“আর আজকে শুধু সামিয়ার ব্যাপার না, ফারিয়া আর শাহরুখের বিয়ের কথাও তারা বলতে আসবে।”
সুমুর মুখে হালকা হাসি ফুটল।
“ফারিয়া আর শাহরুখ, সত্যি? এ তো দারুণ খবর, আম্মু।”
মুখে বললেও সুমুর মনের গভীরে আনন্দটা পুরোপুরি জমলো না। ফারিয়া আর শাহরুখের কথা ভেবে খুশি হলেও– সামিয়ার বিয়ের কথা শুনে তার মন অজান্তেই ভারী হয়ে উঠল। জানালার বাইরে তাকিয়ে সুমু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“একটু ভেবে দেখো, আম্মু। আর সামিয়াকেও জিঙ্গাসা করো। সব কিছু কেমন যেন অনেক তাড়াতাড়ি হচ্ছে।”

সন্ধ্যার পর থেকেই শেখবাড়িতে আলোয় ঝলমল করছে। ড্রয়িংরুমে নরম সাদা আলো—সব মিলিয়ে যেন উৎসবের আমেজ। হঠাৎ গেটের বাইরে গাড়ি এসে থামল। নামল পিয়াস আর তার পরিবার। পিয়াস কালো পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা পরে বেশ স্মার্ট লাগছে তাকে। সাথে তার বাবা-মা আর দুই বোন।
ভেতরে ঢুকতেই হাসি বেগম এগিয়ে গিয়ে তাদের অভ্যর্থনা করলেন।
“আসসালামু আলাইকুম, ভাই! আসুন, ভেতরে আসুন।”
সবার কণ্ঠে শুভেচ্ছা, হাসি-আড্ডায় মুহূর্তেই পরিবেশ ভরে গেল। সুমি বেগম বললেন,
“সামিয়া তো ছোট থেকেই আমাদের চোখের মণি। ওকে আর নতুন করে দেখার কিছু নাই। আমরা শুধু আজ বিয়ের ডেট ঠিক করতে এসেছি।”
হাসি বেগম আলতো হেসে বললেন,
“তা তো অবশ্যই আপা!”
পিয়াসরা গিয়ে সোফায় বসল। রুমা বেগম আর হাসি বেগম তাদের জন‍্য নাস্তা আনতে গেল। শামীম সাহেব আর সাখাওয়াত সাহেব বোনের সাথে খোশগল্পে মেতে উঠল।
সামিয়া নিজের ঘরে বসে আছে। সাজগোজ করা হলেও মুখে কোনো উজ্জ্বলতা নেই। নাজমিন, সামিয়ার মুখটা দেখে বলল,

শোন, এতো চুপচাপ থাকিস না। সামিয়া তুই জানিস তো, তুই এই বিয়েতে রাজি না হলে, ফারিয়া আপু আর শাহরুখ ভাইয়ার বিয়েটাও হবে না।”
সামিয়া চোখ নামিয়ে বলল,
“হ‍্যাঁ! যার যার ভালোবাসাকে পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তো আমার ওপর, তাই না?”
নাজমিন কিছু বলতে যাবে তার আগে রুমা বেগম এসে বললেন,
“সামিয়াকে নিয়ে চল, নাজমিন। সবাই অপেক্ষা করছে।”
কথাটা বলেই তিনি চলে গেলেন। সামিয়ার চোখের পানি আর থেমে রইল না। নাজমিন সামিয়াকে অনেক বুঝিয়ে নিচে নিয়ে গেল।

সন্ধ্যার সোডিয়ামের নরম আলো ছাদে ছড়িয়ে পড়ছে। বাতাসে হালকা শীতলতা, আর দূরে শহরের বাতি ঝলমল করছে।
রাহিন ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে গভীর ভাব, মুখে অচেনা বিষণ্ণতা। বুকের ভিতরটা কেমন চাপা ব্যথা নিয়ে কেঁপে উঠছে তার। আইয়ুবরা দাঁড়িয়ে তার পেছনে। তারা কথা বলছে। কিন্তু রাহিনের মন তাদের কথায় মনোযোগ দিচ্ছে না।
হঠাৎ আইয়ুব বলল,
“এতো কী ভাবছিস, রাহিন? এখনো সময় আছে, সামিয়াকে সবটা বল।”
রাহিন ধীরে কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
“ভেবেছিলাম এবার বলব। কিন্তু হঠাৎ এমন কিছু শুনতে হবে ভাবিনি।”
ফাহিম বলল,
“সামিয়ার ব্যাপারটা একবার বোঝ। শুনলাম ও বিয়েতে রাজি না।”
রাহিন চোখ নামিয়ে নীরব থাকল। সাইফ হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“ভাই, মন খারাপের কথা বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে না থেকে, সামিয়াকে গিয়ে সবটা বল। আমরা আছি তোর পাশে।”
রাহিন ধীরে হেসে বলল,
“আমি জানি, কিন্তু আজ সবকিছু খুব দ্রুত হচ্ছে। সামিয়া রাজি নয় আমি জানি। কিন্তু ব‍্যাপারটা অন‍্য জায়গায়।”
অমিত রাহিনের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“শাহরুখ আর ফারিয়া, তাই না?”
রাহিন এক নজর আকাশের দিকে তাকাল। সেখানে ধূসর ও সোনালি রঙের মিশ্রণ, যেন তার মনোভাবের প্রতিচ্ছবি।
নিহাল হেসে বলল,

“আরে এতো চিন্তা করিস না। আমি জানি এস.কে একটা কিছু করবে।”
অমিত বলল,
“করবে ঠিক আছে। তবে তার আগে, রাহিনের সামিয়াকে ওর মনের কথা বলা উচিত।”
সারবাজ আঙুল দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করে বলল,
“আকাশটা দেখ, রাহিনের মতোই বিষন্ন মনে হচ্ছে।”
আরবাজ হেসে বলল,
“ভাই! পিয়াস সেই লেভেলের একটা ধোঁকা খাবে, আমি শিওর।”
রিয়াদ বলল,
“আমিও শিওর। এস.কে আর যাই হোক, তার বন্ধুর কষ্ট সহ‍্য করবে না।”
রিসান মাথা নেড়ে বলল,
“সব ঠিক আছে, তবে এস.কে কোথায়?”
নিহাল তার পিঠে থাপ্পড় দিয়ে বলল,
“ভাবিজির কাছে।”
স‍্যান্ডি এক হাত নেড়ে বলল,
“স‍্যার! এই পিয়াসের সাথে খারাপ কিছু না করে ফেলে।”
স‍্যান্ডির কথা শুনে সকলে তার দিকে তাকাল। এতক্ষণে সত্যি সকলের মনে একটা অন‍্য ভয় ঢুকে গেল।

জানালার পর্দা হালকা বাতাসে নড়ে, বাইরে রাতের হালকা ঠান্ডা বাতাস ঘরের ভেতরে ঢুকছে। নাতাশা, ইনায়া আর ইশিতা নরম সোফায় বসে আছে। তারা ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে, কিন্তু সুমু চুপচাপ একটি কোণে বসে আছে। তার চোখে-মুখে অচেনা চিন্তা আর অজানা বিষণ্ণতা ছাপ।
ইশিতা নরম কণ্ঠে বলল,
“সুমু, কী হয়েছে? এতো চুপচাপ কেন? আজকে তো অনেক ভালো লাগার মতো একটা দিন।”
সুমু ধীরে বলল,
“আমি জানি, কিন্তু আজকের কিছুই আমার ভালো লাগছে না।”
নাতাশা একটু এগিয়ে এসে বলল,
“বুঝতে পারছি, ম‍্যাম। বোনের কথা ভেবে আপনার কি খারাপ লাগছে?”
সুমু মাথা নেড়ে হালকা স্বরে বলল,
“হ্যাঁ! সবাই খুশি, কিন্তু আমার কেমন জানি সবকিছু অসহ‍্য লাগছে।”
ইনায়া আলতো হেসে বলল;
“ম‍্যাম! সবকিছু ঠিকই আছে। আপনাদের বাড়িতে একটা বিয়ে হবে– এইটা তো আনন্দের কথা।”
সুমু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“জানি, ইনায়া! কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, সামিয়া এই বিয়েতে রাজি না। আসার পর থেকেই ওর চোখ-মুখের অবস্থা আমার ভালো লাগছিল না।”
নাতাশা হাত দিয়ে সুমুর কাঁধে স্পর্শ করে বলল,
“সব ঠিক হয়ে যাবে, ম‍্যাম। আপনি এই অবস্থায় এতো টেনশন করবেন না। আপনি টেনশন করছেন– সেটা স‍্যার জানতে পারলে রাগারাগি করবে।”
সুমু ধীরে-ধীরে মাথা নেড়ে হালকা হেসে বলল,
“আমি চেষ্টা করি। কিন্তু মনটা শান্ত হচ্ছেনা।”
ঠিক তখনই দরজা ধাক করে খোলা হলো। শেরাজ ভেতরে ঢুকল। তাকে দেখে ইশিতারা চলে গেল। শেরাজ হালকা হাসি নিয়ে সুমুর পাশে এসে দাঁড়িয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল,
“নিচে চলো!”
সুমু মাথা নেড়ে ধীরস্বরে বলল,

“ভালো লাগছে না, খান সাহেব? আমি একটু শান্তি চাইছি।”
শেরাজ ধীরে সুমুর হাতটা ধরে বলল,
“তুমি সামিয়ার একমাত্র বোন। তোমাকে থাকতে হবে ওখানে। আজ রাতে সামিয়ার পাশে থাকাটা খুব জরুরি।”
“কিন্তু, আমার মনটা শান্ত নয়, খান সাহেব।”
শেরাজ মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“আমি জানি, সুইটহার্ট। তুমি চাইছো না এতো তাড়াতাড়ি সামিয়ার বিয়ে হোক। কিন্তু তোমার উপস্থিতি ওর জন্য বড় সাহসের মতো। তুমি থাকলে সে সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।”
“ঠিক আছে, খান সাহেব। আমি যাবো।”
শেরাজ তার হাতে হালকা চাপ দিয়ে বলল,
“ভালো! তুমি পাশে থাকলে সব ঠিক হবে।”
সুমু মাথা নাড়াল। শেরাজ সাবধানে সুমুর হাত ধরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

সন্ধ্যার আলো আস্তে আস্তে নিভতে লাগল। ড্রয়িংরুমে বসে সুমি বেগমরা হালকা চা আর নাস্তা খাচ্ছিল। কথোপকথনের মাঝেই হাসি, আলাপ–আড্ডা, এবং ছোটখাটো হাসি–কৌতুকের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে এগোচ্ছিল।
সামিয়া চুপচাপ বসে আছে। তার মধ্যে কোন অনুভূতি নেই। পিয়াস আজ খুব আনন্দে। শাহরুখ, ফারিয়াও খুশি আজ। সুমু, সামিয়ার পাশে বসে। আছে বোনের মুখ দেখে তার এখন আরও বেশি কষ্ট হচ্ছে।
ড্রয়িংরুমে রাহিন আর তার ফ্রেন্ডরা বাদে সকলে উপস্থিত। শেরাজ সুমুর পাশে বসে কাউকে একটা টেক্সট করছে। হঠাৎ ড্রয়িংরুমে এসে উপস্থিত হলো আইয়ুব, রাহিনরা।
আইয়ুবরা আসতেই শেরাজ সাখাওয়াত সাহেবের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি কিছু বলার আছে, বড়বাবা।”
সকলে শেরাজের দিকে তাকাল। সাখাওয়াত সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
“বলো বাবা!”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,

“দুটো বিয়ে যেহেতু হচ্ছে, তাহলে আরও একটা বিয়ে হোক।”
উপস্থিত সকলে কিছু বুঝল না। সাখাওয়াত সাহেব একটু সময় নিয়ে বললেন,
“আরও একটা বিয়ে? কিন্তু কাদের?”
শেরাজ কোন ভন্নিতা ছাড়াই বলল,
“আইয়ুব আর নাজমিনের।”
ড্রয়িংরুমে মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এলো। নাজমিন আর আইয়ুব অবাক। সবাই শুধু একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। সুমু চোখ বড় করে শেরাজের দিকে তাকাল।
রুমা বেগম বিস্ময় নিয়ে বললেন,
“কি বললে, বাবা? আইয়ুব আর নাজমিনের বিয়ে?”
শেরাজ, রুমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হ‍্যাঁ, বড়মা। ওরা একে অপরকে ভালোবাসে। সামিয়ার বিয়ে হচ্ছে। তাহলে নাজমিনের বিয়েটাও হয়ে যাক। আর তাছাড়া আমরা তো এখানে বেশিদিন থাকব না। একবার গেলে আবার কবে না কবে আসা হয়। তাই ভাবলাম, ওদের বিয়েটাও হয়ে যাক।”
সাখাওয়াত সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন,

“তোমার বন্ধু কি করে?”
শেরাজ চোখ ছোট করে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার মেয়ে যে জিনিসে হাত রাখবে, সেই জিনিস কিনে দেওয়া ক্ষমতা রাখে। আই থিংক, এরপর আর কিছু জানতে চাইবেন না।”
“কিন্তু…”
রুমা বেগম বাঁধা দিয়ে বললেন,
“আর কোন কিন্তু না। আইয়ুব ভালো ছেলে। আমার ওকে অসম্ভব ভালো লাগে। আর তার থেকেও বড় কথা ও শেরাজ বাবার বন্ধু। আর এই থেকেও বড় কথা ছেলে-মেয়ে দুজন দুজনকে পছন্দ করে।”
ড্রয়িংরুমে মুহূর্তের জন্য সবাই আবারও স্তব্ধ। নাজমিন লাজুকভাবে চোখ নামিয়ে রাখল। আইয়ুব কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলার শব্দ বের হলো না।
সুমু ধীরে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওরা কি সত্যিই একে অপরকে ভালোবাসে?”
শেরাজ মাথা নাড়ল। শাহরুখ হালকা হেসে বলল,
“বাহ! এটা তো চমক। আমি মোটেও ভাবিনি নাজমিন এমন কিছু করতে পারে।”
ফারিন বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
“একসাথে তিনটা বিয়ে। আমাদের আনন্দ আরও দ্বিগুণ হলো।”
রুমা বেগম মৃদু হেসে বললেন,
“ঠিক তাই! আমরা চাই, আমাদের সব সন্তান সুখে থাকুক। আর যেহেতু আইয়ুব ভালো ছেলে– তাই ওদের বিয়ে হয়ে গেলে আমরা সবাই শান্তিতে থাকব।”
হাসি বেগম হেসে বললেন,

“হ্যাঁ, সত্যি খুব ভালো সিদ্ধান্ত। সব কিছুর আনন্দ একসাথে হলে আরও দারুণ হবে।”
সাখাওয়াত সাহেবও হালকা মাথা নেড়ে বললেন,
“সবাই যখন রাজি, তখন আমিও রাজি।”
শামীম সাহেব সামান্য হেসে বললেন,
“ওরা একে অপরকে পছন্দ করে, আর আমরা শুধু আমাদের সন্তানদের খুশি দেখতে চাই।”
ড্রয়িংরুমে হালকা হাসি আর উচ্ছ্বাসের ভরে উঠল। সবাই নিজের আনন্দ আর বিস্ময় নিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে। সুমু সামান্য হাসি দিয়ে নিজের বোন সামিয়ার দিকে তাকাল। সামিয়া এখনও খুশি নয়। সে মাথা নিচু করে বসে আছে। সুমু আলতো করে সামিয়ার হাত ধরল। সামিয়া তবুও মাথা তুলে তাকাল না।
হঠাৎ সুমি বেগম হেসে বললেন,
“তো ভাইজান! এই শুক্রবার বিয়ের ব‍্যবস্থা করা হোক। ফারিয়া, সামিয়া আর নাজমিনের বিয়ে একই দিনে হোক।”
মুস্তাক সিকদার হালকা মাথা নেড়ে বললেন,

“এটি সত্যিই ভালো সিদ্ধান্ত।”
শামীম সাহেব একটু সময় নিয়ে বললেন,
“ঠিক আছে, তাই করো। বিয়ে যখন হবে, একসাথেই হোক।”
রুমা বেগম হালকা হেসে বললেন,
“ওয়েডিং হলে বিয়ের ব‍্যবস্থা করা হোক।”
সকলে সম্মতি দিল। শামীম সাহেব, রুমা বেগম, হাসি বেগম আর অন্যরা সকলে মিষ্টি খাইয়ে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানালো। সবাই একে অপরের মুখে আনন্দের হাসি দেখল।
রুমা বেগম হালকা হেসে বললেন,
“এবার সব ঠিক হলো। শুক্রবারেই তিনটি বোনের বিয়ে একসাথে।”
পিয়াসের বাবা-মা কৃতজ্ঞভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। পিয়াস নিজেও হাসিমুখে সবার সঙ্গে ছোটখাটো আলাপ করল।
হাসি বেগম বললেন,
“সকলে চলুন! ডিনার করে নিবেন।”
হাসি বেগমের কথায় সকলে চলে গেল ডিনার করার জন‍্য। আজ সবাই খুশি। শুধু বিষণ্ন দুটি মন ছাড়া।
ডিনারের শেষে, পিয়াস আর তার পরিবার বিদায় নিল। হাসি বেগম সবাইকে বাইরে পর্যন্ত পৌঁছে দিল। সুমুরা সকলে রুমে চলে এলো। শেরাজকে সারবাজরা ধরে তাদের সাথে নিয়ে গেল।

ছাদে হালকা বাতাস বইছে। শহরের দূরের আলোগুলো চিকচিক করছে। অন্ধকারে ছাদের চারপাশে এক ধরনের নিরিবিলি পরিবেশ।
শেরাজ ছাদের এক পাশে দাঁড়িয়ে। পাশে সারবাজ, আরবাজ, নিহাল, অমিতরা দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর আইয়ুব এগিয়ে এসে বলল,
“এস.কে, তোকে ধন্যবাদ। আজকের দিনে আমার হয়ে যা বলেছিস, বিশ্বাস কর আমি ভাবতেও পারিনি এমন কিছু আজ হবে।”
শেরাজ হালকা হেসে বলল,
“ধন্যবাদের কিছু নেই। আমরা সবাই একসাথে। তোদের সুখের জন‍্য এসব আমার কাছে কিছুনা।”
আইয়ুবের চোখে কৃতজ্ঞতার আভা। সে আবার শেরাজের হাত চেপে ধরল। পাশে দাঁড়িয়ে রাহিন নিঃশব্দে সবকিছু দেখছিল। আইয়ুবের হাসিমুখ দেখে সে কষ্টের ভেতর থেকেও একটা ছোট্ট হাসি আনলো মুখে। কিন্তু বুকের ভেতরের চাপা দুঃখটা ঢাকতে পারল না।
অমিত ধীরে বলল,

“আর রাহিনের ব‍্যাপারে কি ভাবলি?”
শেরাজ একটু চুপ থেকে বলল,
“ওরটা ভাগ‍্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। দেখা যাক কি হয়।”
সবাই হেসে উঠল। কারণ তারা জানে, শেরাজ ভাগ‍্যের ওপর ছেড়ের দেওয়ার মতো মানুষ না। রাহিন নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আকাশের অন্ধকারের ভেতর তার নিজের মনটা যেন আরও ভারী হয়ে আসছে।

রুমে আলো জ্বলছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা রাতের হাওয়া পর্দাকে দুলিয়ে দিচ্ছে। বিছানার কোণে সুমু চুপচাপ বসে আছে। মুখে কোনো কথা নেই, শুধু হালকা অভিমানের ছাপ। হঠাৎ দরজা ঠেলে শেরাজ ঢুকল। হাতে মোবাইল তার। সুমুর গম্ভীর মুখ দেখে সে ধীরে দরজা বন্ধ করে দিল।
সে এগিয়ে এসে নরম স্বরে বলল,
“সুইটহার্ট, তুমি রাগ করেছ আমার ওপর?”
সুমু মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“রাগ করব না কেন? আইয়ুব ভাইয়া আর নাজমিনের ব্যাপারটা আপনি আগেই জানতেন, অথচ আমায় একবারও বললেন না।”
শেরাজ বিছানার পাশে বসে মৃদু হেসে বলল,
“আমি ভেবেছিলাম, আগে সঠিক সময় আসুক। সবাই রাজি হলে তখন জানাবো। তোমার অযথা দুশ্চিন্তা হোক সেটা চাইনি।”
সুমু চোখ ভিজে উঠল।
“আমি অযথা দুশ্চিন্তা করি নাকি? আমি আপনার স্ত্রী হয়েও কিছু জানব না, এটা কি স্বাভাবিক?”
শেরাজ ধীরে সুমুর হাত ধরে বলল,

“তুমি আমার সবকিছু জানো, সুইটহার্ট। শুধু মাঝে মাঝে আমি চাই তোমাকে ঝামেলা থেকে দূরে রাখতে।”
সুমু চোখ নামিয়ে চুপ করে রইল। অভিমান যেন ভেতরে আটকে গেল। শেরাজ আলতো করে তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
রাগ করেনা, জান। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এরপর থেকে তোমায় না জানিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।”
সুমু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অবশেষে বলল,
“প্রতিশ্রুতি?”
শেরাজ মৃদু হাসল,
“হ‍্যাঁ, প্রতিশ্রুতি!”
সুমু নিঃশ্বাস ফেলে আরেকবার মুখ ফিরিয়ে নিল, কিন্তু চোখের কোণে জমে থাকা অভিমানী জল আর আটকে থাকল না। শেরাজ আবারও সুমুর মুখটা আলতো করে নিজের দিকে ফেরাতে চাইলে সুমু ধীরে ধীরে বলল.
“আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, সামিয়ার ব্যাপারে কিছু জানেন?”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল,

“সামিয়ার ব্যাপারে? মানে?”
সুমু চোখ নামিয়ে বলল,
“ও রাজি না এই বিয়েতে। আমি বুঝতে পারছি ওর ভেতরে অন্য কিছু চলছে। কিন্তু কাউকে বলছে না।”
শেরাজ গভীর শ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর মৃদু স্বরে বলল,
“আমি জানি, ও রাজি না। কিন্তু ও নিজে থেকে আমাকে কিছু না বললে, আমার কিছুই করার নেই।”
সুমু শেরাজের চোখের দিকে তা,
“আপনি জানেন তাহলে?”
শেরাজ একটু থেমে বলল,
“আমি নিশ্চিত নই, সুমু। আমি যতটুকু দেখেছি, সামিয়া খুব শক্ত মনের মেয়ে। ওর মুখ থেকে কথা বের করা সহজ না।”
“আপনি কি রাহিন ভাইয়ার কথা বলছেন?”
শেরাজ সোজা হয়ে বসল। তার ঠোঁটে রহস্যময় হাসি,

“তুমি নিজেই তো উত্তরটা দিয়ে দিলে।”
সুমু ম্লান মুখে বলল,
“আমি ভয় পাচ্ছি, খান সাহেব। সবকিছু খুব দ্রুত হচ্ছে। সামিয়া যদি নিজের মন খুলে না বলে, তাহলে তো ওর জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। সারাজীবন এমন একজনের সাথে ওকে থাকতে হবে, যাকে ও ভালোবাসে না।”
শেরাজ হাত বাড়িয়ে সুমুর হাত ধরে নরম স্বরে বলল,
“ভয় পেও না, সুইটহার্ট। আমি আছি। তুমি শুধু আমাকে বিশ্বাস করো। আমি সামিয়ার কথাও বুঝে নেবো।”
সুমু মাথা নেড়ে বলল,
“আমি জানি, আপনি সব ঠিক করে দিবেন।”
শেরাজ তার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৬৬

“এখন আর মন খারাপ করবে না। অনেক রাত হয়েছে, চলো ঘুমাই।”
সুমু হালকা নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। দুজনেই লাইট অফ করে শুয়ে পড়ল। শেরাজ আবদারের সূরে বলল,
“বুকের মধ্যে নাও আমাকে।”
সুমু লাজুক হাসল। শেরাজ বালিশ নামিয়ে সুমুর বুক বরাবর রাখল। তারপর বালিশে মাথা রেখে সুমুর কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে রাখল। সুমু একহাত শেরাজের উন্মুক্ত পিঠে রাখল, অন‍্যহাত দিয়ে শেরাজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। প্রেয়সীর আদরের ছোঁয়া পেয়ে শেরাজ শান্তিতে চোখ বন্ধ করল।

খান সাহেব পর্ব ৬৭