Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৬৭ (৩)

খান সাহেব পর্ব ৬৭ (৩)

খান সাহেব পর্ব ৬৭ (৩)
সুমাইয়া জাহান

ইনায়া বুকটা কেঁপে উঠল। সে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে থেকে চলে যাবার জন‍্য পা বাড়াতেই, হঠাৎ শেরাজের গম্ভীর, ধারালো কণ্ঠ ভেসে এলো তার পেছন থেকে,
“ডিটেকটিভ ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথি। বাবার নাম— সাঈদ বিন হামাদ আল-হারথি। মায়ের নাম— আমিরা বিনত খালফান আল-বুসাইদি। সালালার গর্ব, কিন্তু শত্রুদের চোখে কাঁটা।”
ইনায়া থমকে গেল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। সে আর পা এগোল না।
“আট বছর দু’মাস আগে সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলেন বাবা-মা। আর ফিরে এলেন লাশ হয়ে। সবাই বলল এক্সিডেন্ট। কিন্তু ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথি জানতেন, এটা হত্যা।”
ইনায়ার চোখ বড় হয়ে গেল। ঠোঁট শুকিয়ে এলো। সে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

“সাঈদ বিন হামাদ ছিলেন ভীষণ সৎ একজন পুলিশ অফিসার। এতটাই সৎ, যে সততাই একদিন তাকে শেষ করে দিল। তার শত্রুদের সংখ্যা ছিল অগণিত। তখন ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথি ছিলেন পড়াশোনার জন‍্য দেশের বাইরে। মা-বাবার মৃত্যুর খবর শুনেই ফিরে এলেন। আর তিনি বিশ্বাস করলেন না, যে তার বাবা-মা হঠাৎ স্রেফ দুর্ঘটনায় মারা যেতে পারেন। কারণ, সাঈদ বিন হামাদ আল-হারথি সবসময় ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথির সাথে শেয়ার করতেন তার কাজের গল্প। শত্রুদের তালিকা। ঝুঁকির কথা।”
ইনায়ার চোখে পানি এসে গেল। সে ঠোঁট চেপে ধরল।
“সেখান থেকেই ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথি যাত্রা শুরু। প্রতিশোধের। ন্যায়বিচারের। মাত্র এক বছরে সমস্ত প্রমাণ জোগাড় করলেন। বাবা-মায়ের খুনিদের শাস্তি দিলেন তিনি। আর এখন ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথি সিআইডির ডিটেকটিভ, এসিপি প্রশান্ত ঘোষের আন্ডারে। কাগজে কলমে নাম তার ‘ইনায়া’।
ইনায়া চুপ করে আছে। শেরাজ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,

“এই জীবন কাহিনীগুলো ঠিক কার জীবন কাহিনীর সাথে মিল যাচ্ছে, আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। তো মিস ইনায়া, আপনি কি আমাকে বলতে পারবেন, এই গল্পগুলো কার জীবনের?”
চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ইনায়ার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না তার মুখ দিয়ে।
শেরাজ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখে অদ্ভুত এক ঝলক, যেন সত্যিটা জানার পরও আরও গভীরে খোঁড়াখুঁড়ি করতে চায়। সে ব্যঙ্গ মিশ্রিত গলায় বলল,
“এই কাহিনীগুলো ভীষণ সিনেমাটিক মতো শোনাচ্ছে। সততার জন্য খুন হওয়া এক পুলিশ অফিসার, তার কন্যা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে ওঠা, তারপর একে একে খুনিদের শাস্তি, হুম। কিন্তু, আমার প্রশ্ন হচ্ছে— এই গল্পটা ঠিক কার?”
সে একটু থামল, তারপর এক পা সামনে এসে দাঁড়াল। ইনায়ার চোখে চোখ রেখে বলল,

“বলতে পারবেন, মিস ইনায়া? নাকি আমি ধরে নেব, এই গল্পটা আপনার জীবনের?”
ইনায়া এক মুহূর্ত চুপ করে তার চোখ নামিয়ে নিল। ঠোঁট কাঁপল। চারপাশের নিস্তব্ধতায় যেন শুধু তার হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সে কাঁপা গলায় বলল,
“আমি এসব কিছুই জানি না।”
শেরাজ হালকা হাসল। মাথা একপাশে কাত করে বলল,
“ওহ, আমি কিছুই জানি না? তাহলে আপনার চোখ পানি কেন? গলা কাঁপছে কেন? আমার তো মনে হচ্ছে, আমি কথা দিয়ে সঠিক জায়গাতেই আঘাত করেছি?”
ইনায়া মুখ ফিরিয়ে নিল, চোখ মুছে ফেলল তড়িঘড়ি করে। কিন্তু তার শরীরের কম্পন শেরাজের চোখ এড়াল না। শেরাজ আবারও বলল,
“ওপস্ সরি! পিকচার আভি বি বাকি হে। এরপরের পার্টটা শুনবেন না, মিস ইনায়া?”
ইনায়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,

“আমার অফিসে ঢোকা। প্রথম থেকেই সারবাজকে টার্গেট করে, ওর সাথে ঝগড়া করে, একটা আলাদা বন্ডিং তৈরি করার চেষ্টা। আস্তে আস্তে আমার অফিসের বেস্ট স্টাফ হয়ে ওঠা। নিজের কাজ দিয়ে সকলের নজরে বেস্ট একটা জায়গা তৈরি করে নেওয়া, যাতে সারবাজের নজরে আসা যায়। এরপর আমার ভাইকে প্রেমের ফাঁদে ফেলানো। ওর ক্লোজ হয়ে, ওর থেকে আমার সম্পর্কে জানতে চাওয়া।”
ইনায়া স্থির দাঁড়িয়ে আছে, মাথা নিচু তার। তার আঙুলগুলো কাঁপছে, যেন ভেতরের অস্থিরতা লুকোতে পারছে না।
“এরপরের পার্টটা মিস করলাম নাকি? আপনি তো বেশ চালাক। অফিসে ঢুকলেন একেবারে আমার ছায়ার ভেতর দিয়ে। সারবাজকে আগে টার্গেট— ঝগড়া, মান-অভিমান, ছোটখাটো নাটক, একটা ভিন্নরকম সম্পর্ক তৈরি করার খেলা। তারপর আস্তে আস্তে আমার পুরো টিমের চোখে সেরা স্টাফ হয়ে ওঠা”, সে একটু থেমে আবারও বলল, “কেন জানেন? কারণ, সারবাজের চোখে পড়লে আমার দরজায় পৌঁছানো সহজ হবে, তাই না? আর হ্যাঁ, খেলা এখানেই শেষ না। শেষ দাওয়াইটা তো দিলেন, প্রেমের ফাঁদে ফেলে। বাট ইউর গেম ইজ ওভার, মিস ইনায়া।”
ইনায়ার বুক কেঁপে উঠল। সে ধীরে মুখ তুলল। তার চোখে একরাশ আগুন, রাগ আর কষ্ট মিশ্রিত।

“আপনি যা ভাবছেন, সব ভুল।”
শেরাজ হাসল,
“ভুল? তাহলে আমার ভাইয়ের কাছে গিয়ে ওর থেকে এতটা জায়গা কেন নিলেন? কেন ওর সামনে এমনভাবে দাঁড়ালেন, যেন আপনি সত্যিই ওকে ভালোবাসেন?”
ইনায়া দাঁত চেপে বলল,
“হয়তো…”
কথা শেষ করতে পারল না ইনায়া। হঠাৎ শেরাজের দু’পাশে এসে দাঁড়াল আরিয়ান আর রায়য়ান।
ইনায়া ভয়ে এক’পা পিছিয়ে গেলেও চোখের দৃষ্টি শক্ত রাখল। সে ব্যঙ্গ করে বলল,
“তো মিস্টার শেরাজ খান ওরফে ম্যাফস্টার। এত ভয়ের খেতাব আপনার নামে। আপনার খুনের স্কিল নাকি ভয়ংকর? অথচ একটা সামান্য মেয়েকে মারতে আপনার দু’দুজন মাফিয়া আর গ্যাংস্টার লাগে?”
শেরাজ হেসে মাথা নিচু করল। তারপর ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে তাকাল ইনায়ার দিকে।
“না, ভুল বললেন। আমাকে “ম্যাফস্টার” বলা হয় এই দুইজনের জন্যই। একজন গ্যাংস্টার, একজন মাফিয়া। নামটা এসেছে ওদের রক্ত থেকে।”
শেরাজ এক ধাপ এগিয়ে এলো। ইনায়ার বুক কেঁপে উঠল।

“আর আপনাকে মারতে আমার একজন গার্ডই যথেষ্ট। আপনার মতো বাচ্চাদের জন্য আমাকে হাত নোংরা করতে হয় না।”
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে ধরল, কিন্তু ভেঙে পড়ল না।
“তাহলে এত আয়োজন কেন?”
শেরাজ হেসে মাথা নেড়ে পাশে দাঁড়ানো আরিয়ান আর রায়য়ানের দিকে ইশারা করল।
“কারণ, আমার এই ভাই— আরিয়ান চৌধুরী। যদিও আমি তাকে ভাই বলতেই লজ্জা পাই। সে একজন গ্যাংস্টার হয়ে শুধুমাত্র আপনার জন্য ওমান থেকে বাংলাদেশে এসেছে। আর এইজন— রায়য়ান চৌধুরী। একজন নামকরা মাফিয়া। সেও এসেছে শুধুমাত্র আপনাকে একবার দেখার জন্য। এখন আপনিই বলুন, ওরা যদি আপনাকে শেষবার দেখতে চায়, আমি কি ওদের ইচ্ছা ফেলতে পারি?”
ইনায়ার কেঁপে উঠল। সে নিঃশ্বাস আটকে ফেলল, চারপাশের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল।
শেরাজ আবারও গভীর গলায় বলল,

“যদিও, ওদের এখানে আসার কারণ শুধু আপনি না। ইভেন আরেকটা বড় কারণ আছে।”
ইনায়া কপাল কুঁচকে বাঁকা হেসে জবাব দিল,
“দু’জনেই তো আপনার বউকে নিয়ে টানাটানি করছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে— আপনি কীভাবে এখনো ওদের সাথে আছেন?”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে মাথা সামান্য কাত করল।
“আমি এখানে আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে আসিনি। তবে একটা জিনিস জেনে রাখবেন, শত্রুর শত্রু সবসময় বন্ধু।”
ইনায়া হালকা হাসল, চোখ নামিয়ে আবার তার দিকে তাকাল।

“আচ্ছা! পুরানো বন্ধু?”
শেরাজ এক ভ্রু উঁচু করে থামল কয়েক সেকেন্ড। তারপর চোখে আগুনের নিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“বাহ! এটাও জানেন দেখছি? বাট অল ক্রেডিট গোজ টু মি। বিকজ এইসব ইনফরমেশন তো আমি নিজেই আপনাকে পেতে সাহায্য করেছি।” সে হালকা হেসে আরেক পা এগোল। কণ্ঠ নীচু করে বলল, “মানে দাঁড়াল, আপনি যতটুকু জানেন, সব আমার ইচ্ছাতেই জানেন।”
ইনায়ার হাসিটা মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। তার বুক ধুকপুক করতে লাগল, কিন্তু মুখে সে দমে গেল না।
“তাহলে আপনার খেলা এখানেই শেষ, ম‍্যাফস্টার। কারণ এবার যে চালটা হবে, সেটা আপনার বোর্ডে নয়— আমার বোর্ডে।”
শেরাজ, আরিয়ান আর রায়য়ান একসাথে হেসে উঠল। শেরাজ হাসি থামিয়ে বলল,

“আপনি আসলে আমার খেলার গুটিই ছাড়া কিছু না, ডিটেকটিভ।”
ইনায়া দাঁত চেপে তাকিয়ে রইল। শেরাজ ভ্রু উঁচু করে আবারও হেসে উঠল, সেই হাসিতে শীতলতা আর ব্যঙ্গের ঝিলিক। সে পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে কিছু ট্যাপ করে ফোনটা আবারও পকেটে রেখে বলল,
“বলুন কার হাতে মরবেন? রায়য়ান নাকি আরিয়ান? আরিয়ান আবার খুন-টুন করেনা। ওর সব কাজ, ওর লোকেরা করে। কিন্তু রায়য়ান, রায়য়ানের কিলিং স্কিল আবার বেটার। ও খুব আয়োজন করে মার্ডার করে। আর মার্ডার করার আগে, দারুন দারুন গেম প্লে করে।”
ইনায়া ঠোঁট চেপে ধরল। মনে ভয় এলেও মুখের ভেতর সাহস জড়ো করল।
“মৃত্যুর হাত কার কেমন, সেটা আমার জন্য কোনো ব্যাপার না। ব্যাপার হলো— আজ মরবে কে।”
আরিয়ান, রায়য়ান দুজনেই হেসে উঠল। সেই হাসি নিস্তব্ধ ছাদটাকে আরও ভয়ংকর করে তুলল। শেরাজ বাঁকা হেসে দু’হাত বুকের সামনে ভাঁজ করল।

“বাহ, ডিটেকটিভ! সাহসটা এখনো যায়নি দেখছি। কিন্তু আমি আপনাকে একটু রিয়েলিটি চেক দিই।”
সে আঙুল তুলে পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদ দেখাল। এক এক করে লাল লেজার ডট ইনায়ার শরীরে এসে পড়ল। স্নাইপার রেড ডটগুলো তার বুক, কপাল, গলায় নাচতে লাগল। শেরাজ হাসি চেপে রেখে বলল,
“ওরা সবাই আমার লোক। একটুখানি সিগন্যাল দিলেই, টাটা, গুডবাই ডিটেকটিভ, ইনায়া।”
ইনায়া শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। শরীর কাঁপলেও চোখে দৃঢ়তা। রায়য়ান দাঁত চেপে এক ধাপ এগিয়ে এলো। সে গর্জে ওঠে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বালের কাহিনী বন্ধ কর, এস.কে। আর এক সেকেন্ডও দেরি করিস না। এটাকে এখানেই ফেলে দে।”
শেরাজ ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল।
“তুই এখনো বাল কাটিসনি, রায়য়ান? ছ‍্যা! এমন খবিসের মতো থাকলে, তোকে আমি একদিন নর্দমায় ফেলে আসব।”

রায়য়ান গর্জে উঠল। চোখ লাল হয়ে গেছে তার।
“বাল বাল করা বন্ধ কর। আর এটাকে মার, শেষ কর এখানেই।”
শেরাজ হঠাৎ তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়ে দিল। এক সেকেন্ডে নিস্তব্ধতা আরও ভারী হয়ে উঠল।
“তোরা ভুলে গেছিস, আজকে আমি কী বলেছিলাম?”
কিছুক্ষণের নীরবতা। তারপর রায়য়ান আর আরিয়ান একে অপরের দিকে তাকাল। দু’জনেই বিরক্ত মুখে ছাদ থেকে বেরিয়ে গেল।
শেরাজ একা দাঁড়িয়ে রইল। বাতাস তার শার্টের কলার উড়িয়ে দিচ্ছিল। সে একবার ইনায়ার দিকে তাকাল।
“আজ বাঁচলেন, ডিটেকটিভ। কিন্তু প্রতিবার ভাগ্য আপনাকে বাঁচাবে না।”

এ কথা বলে সে ধীর পায়ে ছাদ ত্যাগ করল। ইনায়া একা দাঁড়িয়ে রইল, বুক ধুকপুক করছে তার, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। আকাশে আধখানা চাঁদ যেন আরও ভয়ংকর হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
হঠাৎ ছাদের দরজার কপাট ধাক্কা খেয়ে খুলে গেল। কঠিন, ভারী পায়ের শব্দ ছাদের নিস্তব্ধতায় কেঁপে উঠল। ইনায়া চমকে তাকাল। অন্ধকারের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো একটা ছায়া। চাঁদের আলোয় তার মুখ স্পষ্ট হয়ে গেল। সারবাজ দাঁড়িয়ে। কালো শার্টের হাতা গোটানো, চোখে আগুন, মুখে তীব্র রাগের ছাপ। সে একদৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকাল। তারপর ছাদের মেঝেতে রাখা একটা চেয়ার লাথি মেরে ফেলে দিল। চেয়ারটা কট করে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। সে গর্জে উঠে বলল,

“আমাকে খেলার গুটি মনে হয় তোমার? ভালোবাসার নামে ছলনা করলে?”
ইনায়া বুক ভরে শ্বাস নিল, কিন্তু কিছু বলল না। তার হাত এখনো সামান্য কাঁপছে, চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। সারবাজ ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার পায়ের শব্দে যেন ছাদটাই কেঁপে উঠছে।
“আর কাউকে পেলে না, এসব করার জন‍্য? আমাকেই কেন, ইনায়া? আমি তো তোমাকে সত্যি ভালোবেসেছিলাম। কেন আমার বিশ্বাস নিয়ে এভাবে খেললে?”
ইনায়া এগিয়ে এসে বলল,
“সারবাজ! আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। হতে পারে প্রথমে সব মিথ্যা ছিল। কিন্তু এখন কোনো ছলনা নেই, কোনো খেলা নেই। আমি এই খেলার মধ্যেই তোমাকে ধীরে ধীরে ভালোবেসে ফেলেছি।”
“আমি বিশ্বাস করিনা? এখনো মিথ্যা বলা বন্ধ করো, প্লিজ।”
ইনায়া ছাদের মেঝের ওপর বসে পড়ল। সে ধীরে বলল,
“তোমার ভাইয়ের কিছুই কি তোমার চোখে পড়ছেনা। আমি যেটা করেছি, সেটা আমার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু তোমার ভাই তো একজন…”

সারবাজ একহাত উঁচিয়ে ইনায়াকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আমার ভাই সম্পর্কে কোন বাজে কথা শুনতে চাই না। আজ আমার ভাই আছে বলেই, তুমি এখনো বেঁচে আছো।”
ইনায়া কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“মানে?”
সারবাজ হেসে বলল,
“ওরা শুরু থেকেই তোমার সম্পর্কে সবটা জানতো। রায়য়ান আরও আগেই তোমাকে মেরে দিত, কিন্তু এস.কের জন‍্য পারেনি। রায়য়ান আর আরিয়ান ঠিক করেছিল, রায়য়ান ইন্ডিয়া থেকে ব‍্যাক করলেই তোমাকে ওরা মারবে। কিন্তু রায়য়ান ইন্ডিয়া থেকে ব‍্যাক করার আগেই এস.কে তোমাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এলো, ইভেন তোমাকে ওদের হাত থেকে বাঁচানোর জন‍্য, আমাদের সাথে বিডিতে নিয়ে এলো। কারণ তোমাকে ওখানে রেখে এলে, এতোদিনে তুমি আর এই দুনিয়াতে থাকতেনা। কিন্তু এস.কে জানত না যে, ওরা বিডিতে চলে আসবে। ওরা যেদিন বিডিতে এলো, এস.কে ইচ্ছে করেই ওদের এই বাড়িতে এনে রাখল, কারণ এখানে এস.কের সামনে থাকলে ওরা তোমার ক্ষতি করার সুযোগ পাবে না। আর আজকের বাইক রেস হয়েছিল একটা বাজিতে। ওরা রেসের বাজি হিসাবে সুমুকে রেখেছিল, আর এস.কে রেখেছিল তোমার প্রাণ। এস.কে ওদের বলেছিল, ও রেসে জিতলে, ওরা আর কোনোদিনও তোমাকে মারার চেষ্টা করতে পারবে না। আর হলোও তাই, এস.কে রেস জিতল। রায়য়ানরা খারাপ হলেও, ওরা যাকে যা কথা দেয়, তা রাখে। তাই ওরা আর কোনদিনও তোমাকে মারতে চাইবে না। এখন তুমি ইচ্ছামতো ওদের ধ্বংস করার প্ল‍্যান করতে পারো। তোমার আর কি কি ইনফরমেশন লাগবে আমাকে বলো, আমি তোমাকে সব উত্তর দিয়ে দিব। কিন্তু আজকের পর, আর কোনদিনও তোমার এই মুখটা নিয়ে আমার সামনে আসবে না।”
ইনায়া বুকের ভিতর চাপা কান্না ধরতে পারল না। সে কেঁদে উঠল। সারবাজ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,

“কি হলো? বলো, কি জানতে চাও?”
ইনায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি আর কিছু জানতে চাই না, সারবাজ। আমি… আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। আমি তোমাকে হারাতে পারব না। এই দুনিয়ায় আমার বলতে এক তুমি ছাড়া কেউ নেই। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও, সারবাজ। আমি তোমার জন্য আমার এই প্রফেশন ছেড়ে দেব। আমি যে ভালোবাসার কাঙাল, সারবাজ। আমার কাছে এই প্রফেশনের চেয়ে একটা ভালোবাসার মানুষ বেশি দরকার। প্লিজ, তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। হতে পারে আমি তোমাকে ব‍্যবহার করেছি। তোমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করেছি, কিন্তু এখন আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি।”
সারবাজ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“তোমার প্রফেশন নিয়ে আমার কোন মাথা ব‍্যথা ছিল না। তুমি আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে ইনফরমেশন কালেক্ট করেছো, সেটা নিয়েও আমার কোন সমস্যা ছিল না। কারণ, এস.কের জন‍্য এসব কিছুইনা। কিন্তু তুমি তো আমার বিশ্বাসের সাথে খেলা করেছ। আমার ভালোবাসাকে ব‍্যবহার করেছ। তুমি ভাবলে কীভাবে এতোকিছুর পরেও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব? সরি ইনায়া! বেটার হবে, যদি তুমি আমার থেকে দূরে থাকো।”
কথাগুলো বলে ছাদ থেকে চলে গেল সারবাজ। তার পায়ের ধাক্কা বাতাসে প্রতিধ্বনি হয়ে গেল। ইনায়া ছাদের মেঝেতে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার দম বন্ধ কান্নার সঙ্গে মিলিয়ে রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।

পরের দিন দুপুর। বাতাস হালকা, সূর্যের আলো বাগানের ফুলগুলোকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। শেখবাড়ির প্রতিটা কোণা আজকে বিশেষ করে সাজানো হচ্ছে।
আজ রাতের মেহেন্দীর জন্য সবাই আগ্রহে মুখরিত। নাজমিন, সামিয়া আর ফারিয়া—তিন জনেরই আজ মেহেন্দীর আয়োজন হবে শেখবাড়ি থেকেই। ঘরের ভেতর রঙিন লাইট, কুশন, ফুলের সুবাসে পরিবেশ আরও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠেছে।
শেরাজ শাওয়ার শেষে বেডে বসে টাওয়েল বুকের ওপর ঝুলিয়ে ফোনে স্ক্রল করছে। তার ভেজা চুল থেকে পানি টপটপ করে পড়ছে।
সুমু, নাতাশার সাথে কিছু ইমপর্টেন্ট বিষয়ে কথা বলে এসে রুমে ঢুকল। সে ভ্রু কুঁচকে দেখল, শেরাজ ভেজা চুল নিয়ে ফোনে ব্যস্ত। রুমের দরজা লক করে সে এগিয়ে এলো শেরাজের কাছে। ফোনটা হাত থেকে কেড়ে বেডের ওপর ফেলে দিয়ে, টাওয়েল হাতে নিয়ে বলল,
“কি চাইছেন আপনি? অসুস্থ হলে ভালো লাগবে, তাই না?
সে ধীরে ধীরে শেরাজের চুল মুছতে শুরু করল। শেরাজ মুচকি হেসে একটানে সুমুকে কোলের ওপর তুলে নিল। সুমু দু’পা নিজের কোমরের সাথে জড়িয়ে নিয়ে একটানে সুমুর ওড়না ফেলে দিল। সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আপনার লক্ষণ ভালো না। একদম দুষ্টুমি করার চেষ্টা করবেন না।”
শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,
“এই স্টাইলে রাউন্ডে কথা মনে আছে, সুইটহার্ট?”
সুমু চোখ রাঙিয়ে বলল,
“চুপ করুন! বাজে কথা বলে আমাকে লজ্জায় ফেলবেন না।”
শেরাজ তাকিয়ে রইল। সুমু চুল মোছায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পরে শেরাজ আবারও সুমুর বুকের মাঝখানে মুখ গুঁজে দিল। সুমু তাকে সরিয়ে দিল। শেরাজ একই কাজ আবার করল। সুমু কপাল কুঁচকে বলল,
“কি হয়েছে আপনার? সবকিছু ঠিক আছে তো?”
শেরাজ ধীরে মাথা নাড়ল। সুমু চুল মুছতে মুছতে জিজ্ঞাসা করল,
“তাহলে এমন করছেন কেন?”
শেরাজ তার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“নিড ইউ, বউ। আই ব‍্যাডলি নিউ ইউ।”
সুমু কোল থেকে নামার চেষ্টা করল। শেরাজ আরও শক্ত করে ধরে বলল,

“প্লিজ!”
সুমু কপাল কুঁচকে বলল,
“পাগল হয়েছেন আপনি? আপনি জানেন না আমি…”
তার কথার মাঝেই শেরাজ বলল,
“জানি তো, জান। কিন্তু এতোগুলো দিন কীভাবে থাকব। আমার যে খুব কষ্ট হবে, বউ।”
সুমু কিছু বলতে পারল না। শেরাজ হঠাৎ তার গলায় ঠোঁট ছোঁয়াল। সুমু নড়ে উঠতেই শেরাজ বলল,
“একটু জান। ভয় নেই, আমি বেশি কিছু করব না। আর অন্য কোনদিকেও যাব না। ব্যস্ত নেককিস করব। নিজের চ‍্যাম্পদের জন‍্য এইটুকু সহ‍্য করে নিতে পারব আমি।”
রুমের মধ্যে দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ। মেঝের ওপর পড়ে আছে সুমুর পরনের আনারকলি। শেরাজ সুমুকে জড়িয়ে তার গলায় মুখ গুঁজে বসল। সে সুমুর কোমর আরও শক্ত করে ধরল।
সুমু কিছুটা হকচকিয়ে থাকল, তারপর ধীরে তার হাত শেরাজের পিঠে রাখল। দু’জনের নিঃশ্বাস মিলতে লাগল, রুমে স্রেফ তাদের নিঃশব্দ মিলনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল।
শেরাজ তার গলায় ঠোঁটের ছোট ছোট ছোঁয়া দিয়ে ভরিয়ে দিল। শেরাজের ছোঁয়ার সাথে সাথে সুমুর বুকের ওঠানামা বেড়ে গেল। সে হালকা কাঁপছে। কিন্তু তার মনের মধ্যে আছে একরকম বিশ্বাস আর আত্মসমর্পণ। সুমুর হাত অবশ হয়ে শেরাজের পিঠ আরও শক্ত করে আকড়ে ধরল। শেরাজ আলতো হেসে আবদারের সূরে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৬৭ (২)

“একটু আদর করো না, বউ।”
সুমু আলতো হেসে শেরাজের কপালে গভীরভাবে ঠোঁটে ছোঁয়াল। শেরাজ চোখ বন্ধ করে অনুভব করল। সুমু ধীরে ধীরে শেরাজের গালে আলতো ঠোঁটের স্পর্শ করল। পরমুহূর্তে সে শেরাজের চোখের পাতা জুড়ে হালকা ঠোঁটের ছোঁয়া দিল। তারপর সে শেরাজের ঠোঁটের দিকে ধীরে এগিয়ে গিয়ে গভীরভাবে ঠোঁট ছোঁয়াল। শেরাজ চোখ বন্ধ রেখেই তার ভালোবাসার স্পর্শ মাখা নিঃশ্বাস অনুভব করল। শেষে সুমু শেরাজের গলায় আলতো হাত রেখে ঠোঁটের স্পর্শ দিল। শেরাজ তার প্রেয়সীর এই গভীর ভালোবাসা অনুভব করতে লাগল। রুমের মধ্যে নিস্তব্ধতা বয়ে গেল। শুধু শোনা গেল দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ।

খান সাহেব পর্ব ৬৮