খান সাহেব পর্ব ৬৭
সুমাইয়া জাহান
ভোরের আলো আজ শেখবাড়িতে যেন কিছুটা ভারী হয়ে ঢুকল। বাগানের ফুলগুলো রোদে হেসে উঠলেও, ঘরের ভেতরকার আবহ ছিল অদ্ভুত চুপচাপ। আজ সকালবেলা নাস্তার টেবিলে এখনো সবাই জড়ো হয়নি। সাখাওয়াত সাহেব আগের মতোই চুপচাপ পত্রিকা উল্টাচ্ছেন, কিন্তু তার দৃষ্টিতে একটা কঠোরতা স্পষ্ট।
সামিয়া টেবিলে বসে আছে। সে মুখে হালকা হাসি রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু চোখ দুটো যেন সারারাত ঘুমহীন থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সুমু বোনের পাশে বসে— তার ভেতরের অস্থিরতা অনুভব করছে।
হঠাৎ সাখাওয়াত সাহেব পত্রিকা ভাঁজ করে রাখলেন। চারপাশে নিস্তব্ধতা। তিনি গভীর গলায় বললেন,
“সামিয়া!”
সামিয়া চোখ তুলে তাকাল তার দিকে।
“জি বড়বাবা!”
“আমি জানি তুমি কি চাও। নিজের ক্যারিয়ারের প্রতি তোমার টান আমি বুঝি। কিন্তু তোমাকে বুঝতে হবে— সবকিছু শুধু আবেগ দিয়ে চলে না, দায়িত্ব দিয়েও চলে। তুমি এখন বড় হয়েছ। একদিন না একদিন তো তোমাকে আমাদের বিয়ে দিতেই হবে। তুমি পড়াশোনা করছো, করো। পিয়াস আমাদের ভালো ছেলে। বিয়ের পর ও তোমার পড়াশোনা বন্ধ করবে না। বরং তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করতে, তোমার পাশে ছায়ায় মতো থাকবে।”
সামিয়া মাথা নিচু করে রইল। সুমু এগিয়ে এসে নরম স্বরে বলল,
“বড়বাবা, এখানে বোনের সুখও তো জরুরি। পরিবার মানে শুধু দায়িত্ব নয়, হৃদয়ের শান্তিও।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। শুধু চায়ের কাপে চামচের শব্দ শোনা গেল। সাখাওয়াত সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ধীর গলায় বললেন,
“সময়ই ঠিক করবে কোনটা সঠিক। আজ আর এ নিয়ে কথা নয়।”
তিনি চলে গেলেন। টেবিলে নেমে এলো আরও গভীর নিস্তব্ধতা। সামিয়া সুমুর হাত চেপে ধরল। তার চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রু।
সুমু আস্তে করে বলল,
“তুই আমাকে সব মনের কথা বল, সামু। তোর এই কষ্ট কীসের জন্য?”
সামিয়া কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে রুমে চলে গেল। সুমু তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
উপরে এসে সামিয়া রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। আয়নায় নিজের ক্লান্ত মুখ দেখে মনে হলো—এই চোখদুটো যেন কত কিছু বলতে চাইছে, অথচ কেউ শুনছে না। বিছানার পাশে বসে ডায়েরিটা খুলল। ডায়েরির প্রতিটি পাতায় পাতায় শুধু রাহিনের কথা, তার সাথে কাটানো মুহূর্তের টুকরো টুকরো স্মৃতি। সামিয়ার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল পাতার ওপর। পাতার ওপর ঝরে পড়া অশ্রু মুছে সে ডায়েরি বুকের সাথে চেপে ধরল। তার বুকের ভেতর যেন শূন্যতা আর কান্নার এক অদ্ভুত ঢেউ উঠছে। মনে পড়তে লাগল রাহিনের সাথে সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো।
ডাইনিং রুমটা এখন গমগম করছে। লম্বা টেবিলে সবাই আস্তে আস্তে বসতে শুরু করেছে। মাঝখানে সাজানো সকালের নাস্তা আর ডেজার্ট। হাসি বেগম আর রুমা বেগম দু’জন মিলে খাবার সার্ভ করছেন।
শেরাজ এসে সুমুর পাশে বসল। সুমু চুপচাপ মাথা নিচু করে রেখেছে। আইয়ুব প্রথমেই কথা শুরু করল,
“বিডিতে এলেই শুধু বিয়ের দাওয়াত খাই।”
নিহাল হেসে বলল,
“বিয়ে হলে খাওয়া ও দারুণ হয়, ভাই। এখন আবার ওয়ার্ক ফ্রম হোম।”
সারবাজ জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে বলল,
“অফিসের কথা বলতেই মনে পড়ল—ইনায়া, কালকের প্রেজেন্টেশন দারুণ হয়েছিল।”
ইনায়া লাজুক হেসে উত্তর দিল,
“ধন্যবাদ, এস.কে স্যার গাইড না করলে এতো সুন্দর হতো না।”
শেরাজ গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল;
“টিমওয়ার্ক ছাড়া কিছুই সম্ভব না। সবাই পরিশ্রম করেছে।”
অমিত আর রিয়াদ একসাথে বলে উঠল,
“এস.কে টিমওয়ার্ক বললি, কিন্তু টিমের অর্ধেক তো তোর ভয়ে কাঁপে।”
সবাই হেসে উঠল। রাহিন চুপচাপ সামিয়ার খোঁজে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু সামিয়া আজ টেবিলে নেই। রিসান খেয়াল করল ওর চাহনি। সে ঠোঁটে চাপা হাসি টেনে বলল,
“কী রে, খাচ্ছিস না কেন? কারও জন্য অপেক্ষা করছিস নাকি?”
রাহিন অস্বস্তি লুকাতে চাইল, কিন্তু অমিত সঙ্গে সঙ্গে কথায় ঢুকে পড়ল।
“এখানে এসব কথা বলিস না। আন্টিরা আছে।”
আইয়ুব হেসে বলল,
“রাহিনের অবস্থা এখন কাবির সিং এর মতো।”
সাইফ কপাল কুঁচকে বলল,
“তুই কি কখনও সিরিয়াস হতে পারিস না, আয়ুবা?
আইয়ুব হেসে বলল,
“আরে ভাই, সিরিয়াস হলে তো, এ টেবিলের মজা থাকবে না।”
নাতাশা চাপা গলায় বলল,
“মজা করতে পারেন, তবে মেয়ে মানুষের বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে, আর কারো ফিলিংস নিয়ে মজা করবেন না। সবাই জানে, রাহিন ভাইয়ার মনে এখন কী ঝড় বইছে।”
টেবিল হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। হাসি বেগম খাবার সার্ভ করতে করতে বললেন,
“সবাই চুপ কেন?”
রুমা বেগম চারদিকে তাকিয়ে বললেন,
“সবাই চুপ কেন? খাও, খাও, খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
নাজমিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে চাপাস্বরে বলল,
“চুপ হয়ে গেল কারণ, কেউ না কেউ মনের কথা ঢাকতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে।”
পাশে বসা আইয়ুব কাটাচামচ বাজিয়ে হালকা মজা করে বলল,
“বেবি, মনের কথা না খুললেই তো ভালো। মনের কথা বেরোলেই ঝামেলা।”
সারবাজ সিরিয়াস হয়ে বলল,
“ঝামেলা হলেও, সত্যি চাপা দিয়ে রাখা যায় না। এখনকার জেনারেশন খোলাখুলি সবকিছু বলে না। চাপা দিলে ভেতরে আগুন জ্বলতে থাকে।”
শেরাজ গম্ভীর মুখে সুমুর দিকে একবার তাকাল। সুমু মাথা নিচু করে বসে আছে। খাবার বা টেবিলের কারো দিকে মন নেই তার।
ইশিতা পরিবেশ হালকা করতে হাসিমুখে বলল,
“আচ্ছা নাজমিন, বিয়ের কোনো প্ল্যানিং নেই তোমার?”
নাজমিন আলতো হেসে বলল,
“আছে আপু! তোমাকে পরে বলব সব।”
রুমা বেগম আবারও টেবিলের কাছে এসে বললেন,
“বিয়ের আগে মেয়ে-ছেলের মতামত জানতে হয়। শুধু বড়দের সিদ্ধান্তে সংসার টিকে না। আর আমাদের বাড়ির ছেলে-মেয়েরা তো তাদের নিজের পছন্দ করা মানুষটাকেই পাচ্ছে। ওরা সকলে খুব সুখী হবে।”
এই কথা শুনে টেবিলে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। রাহিন নিচু গলায় বলল,
ঠিকই বলেছেন, আন্টি! মনের ইচ্ছা না থাকলে বিয়ে মানে শুধু সম্পর্কের নাম, তার ভেতরে কোনো শান্তি থাকে না।”
সবাই থমকে গেল। রাহিনের চোখে অদৃশ্য কষ্ট স্পষ্ট। সাইফ কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
“তুই কি কিছু বলতে চাইছিস, রাহিন?”
রাহিন চুপচাপ জুসের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকল। কিছু না বলে স্রেফ ঠোঁট কামড়াল। হঠাৎ সুমু বলল,
“ঠিক বলেছ, বড়মা। বিয়েতে ছেলে-মেয়ে দুজনের মতামত জানতে হয়। কিন্তু সত্যি কি তোমরা সকলের মতামত নিয়েছ?”
রুমা বেগম একটু অবাক হয়ে বললেন,
“মানে?”
হাসি বেগম কিচেন থেকে ছুটে এসে বললেন,
“কিছু না, আপা। ও এমনি বলেছে।”
হাসি বেগম এসে সুমুর হাত ধরে তাকে চেয়ার থেকে উঠিয়ে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে, শেরাজ বাঁধা দিয়ে বলল,
“সাবধানে আম্মু। আপনি ভুলে যাচ্ছেন, বউ আমার প্রেগনেন্ট।”
হাসি বেগম সুমুর হাত ছেড়ে দিল। সুমু হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,
“আমাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছো কেন, আম্মু? আমি কি ছোট বাচ্চা? নাকি আমার মুখে তালা দিয়ে রাখবে?”
টেবিলটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। শেরাজ সুমুর হাত ধরে শান্ত স্বরে বলল,
“সুমু, প্লিজ! তুমি শান্ত হও। তোমার শরীরের অবস্থা এখন…”
সুমু কণ্ঠ উঁচু করে বলল,
“শরীরের অবস্থা নিয়ে সবাই ভাবে, কিন্তু মনের অবস্থা নিয়ে কেউ ভাবে না। তোমরা সবাই বলছো ছেলে–মেয়ের মতামত নিতে হয়। কিন্তু সত্যি করে বলো তো, সামিয়ার মতামত নিয়েছ? কেউ জিজ্ঞেস করেছে, সে কাকে চায়?”
এইবার যেন বোমা পড়ল টেবিলে। সবাই স্তব্ধ। রাহিনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। গ্লাস হাতে ধরা হাত কাঁপতে শুরু করল। নাজমিন চাপা গলায় বলল,
“আপু প্লিজ, এখন এসব…”
কিন্তু সুমু থামল না। চোখে জল এসে গেছে তার।
“আমরা বাহির থেকে হাসি–খুশি পরিবার দেখাই, কিন্তু ভেতরে কতটা অশান্তি, কেউ জানে না। সামিয়াকে তোমরা জোর করে অন্যদিকে ঠেলে দিচ্ছো। বিশেষ করে আমার জন্মদাত্রী মা। সে আমার সাথেও এমনটাই করেছিল।”
রুমা বেগম বললেন,
“কিন্তু সামিয়া তো অমত করেনি।”
সুমু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“করবে কীভাবে? যদি ইমোশনালি কাউকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়, তাহলে সে আর কথা বলে কীভাবে?”
টেবিলে যেন বজ্রপাত হলো। সবাই থম মেরে বসে রইল। সুমু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনই হঠাৎ করেই দরজার দিক থেকে ভেসে এলো সামিয়ার কণ্ঠ,
“থামো আপু! আর কিছু বলো না।”
সবাই একসাথে তাকাল। সামিয়া ডাইনিং রুমে এলো। তার মুখে একরাশ ক্লান্তি, চোখ লাল, কিন্তু গলায় দৃঢ়তা। সে সোজা সুমুর সামনে এসে দাঁড়াল।
“আমি মন থেকেই বিয়েটা করতে চাই।”
টেবিলের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। রাহিনের হৃদয় কেঁপে উঠল, যেন বুকের ভেতর সবকিছু ভেঙে পড়ল এক মুহূর্তে। সুমু হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বলল,
“সামু, তুই?”
সামিয়া ভেতরের কষ্ট চেপে রেখে কণ্ঠ স্থির করার চেষ্টা করল।
“হ্যাঁ আপু। পিয়াস ভাইয়াকে আমি মেনে নিয়েছি। উনি ভালো ছেলে। উনি আমাকে বোঝে। উনি আমার পড়াশোনা, স্বপ্ন—সব চালিয়ে যেতে দেবে।”
রুমা বেগম তৃপ্তির হাসি দিলেন।
“দেখলে তো? ওর মুখ থেকেই শুনলে সবাই?”
কিন্তু শেরাজ গম্ভীর মুখে সামিয়ার দিকে তাকাল।
“শালিকা, তুমি সত্যিই মন থেকে চাও? নাকি কাউকে খুশি করার জন্য বলছো?”
সামিয়া মুহূর্তখানেক থমকালো। চোখ নামিয়ে নিল সে। ঠোঁট কেঁপে উঠল তার, কিন্তু আবার জোর করে মাথা তুলে বলল,
“আমি মন থেকেই চাই।”
টেবিল জুড়ে আবার নিস্তব্ধতা। শুধু রাহিনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। সে গ্লাস নামিয়ে ধীরে ধীরে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমার একটা কল করার আছে, আমি যাচ্ছি।”
রাহিনের চোখ নামানো, কিন্তু ভেতরের ভাঙচুর সবাই টের পাচ্ছে। সে চুপচাপ টেবিল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
সুমুর চোখ ভিজে গেল। সে তাকিয়ে দেখল, সামিয়া, রাহিনের এতক্ষণ বসে থাকা চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে আছে— যেন কথাগুলো বলেছে ঠোঁটে, কিন্তু হৃদয়ের ভেতরটা এখনো কাঁদছে।
ডাইনিং টেবিলে হঠাৎ যেন খাবারের স্বাদ হারিয়ে গেল। সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই। হাসি বেগম জোর করে হাসি আনতে চাইলেন মুখে।
“চলো, সবাই খাও। এত কথা বললে খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।”
কেউ জবাব দিল না। শুধু চামচের শব্দ টুংটাং করে ভেসে আসছে। সামিয়া চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তার হাত কাঁপছে সামান্য, কিন্তু ঠোঁটে কোনো কথা নেই। সুমু তাকে গভীর দৃষ্টিতে দেখছে— স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ওর বোনের ঠোঁটের কথা আর চোখের ভাষা মেলে না। কিছুক্ষণ পর, সামিয়া আস্তে করে বলল,
“আম্মু, আমি রুমে যাচ্ছি!”
কেউ কিছু বলল না। সামিয়ার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল করিডরে। রাহিন আগেই বেরিয়ে গেছে। বাইরে বাগানে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মুঠি শক্ত করে ধরে আছে নিজের হাত। তার ঠোঁট ফেটে বেরিয়ে এলো চাপা শব্দ,
“মন থেকে চাই? যদি মন থেকে চাইত, তবে চোখে এতো ব্যথা থাকত না”, একটু থেমে রাহিন আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বলল, “ভালোবাসা যদি নাই পাই, তবে কেন এভাবে ওর নাম খোদাই করা আমার নিঃশ্বাসে?”
সুমু নিজের রুমে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করল। শেরাজ পেছনে এসে দাঁড়াল, কিন্তু কিছু বলল না। সুমু ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলল,
“আমার বোনকে আমি হারাচ্ছি, খান সাহেব। ওর হাসির আড়ালে কষ্ট লুকানো যাচ্ছে না।”
শেরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“কিছু কিছু সত্যি মানুষ জোর করেই সবটা লুকায়, সুইটহার্ট। হয়তো সামিয়া এখন নিজের মনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আমরা যদি এখন কিছু করি, তাহলে সবটা এলোমেলো হয়ে যাবে। তুমি একটু ধৈর্য্য ধরো, সবটা ঠিক করে দিব আমি।”
সুমু চোখ মুছে নিয়ে বলল,
“কিন্তু আমি চুপ করে থাকতে পারব না। এবার আমিই সামিয়ার সত্যিটা শুনব।”
শেরাজ সুমুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“এতো চাপ নিওনা। আমি আছি তো।”
সুমু আস্তে মাথা নেড়ে শেরাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শেরাজের টি-শার্টের ওপর গড়িয়ে পড়ল সুমুর চোখের পানি। সে আলতো করে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
সামিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে, কিন্তু মুখে একটা হাসি টেনে সে বলছে নিজের প্রতিফলনকে,
“হ্যাঁ, আমি মন থেকে চাই, তাই তো?”
কিন্তু তার ভেতর থেকে উত্তর ভেসে এলো,
“না সামিয়া, তুই মিথ্যে বলছিস। তুই রাহিনকেই ভালোবাসিস।”
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সামিয়া ভেঙে পড়ল। সে কাঁদতে কাঁদতে মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার বুক ফেটে বেরিয়ে এলো আর্তনাদ,
“আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি হারাচ্ছি— যেটা আমি সবচেয়ে বেশি চাই, সেটাই হারাচ্ছি আমি। আমার ভালোবাসা আমার হয়েও আমার নয়। সে আমার, কিন্তু আমি তাকে পাবো না। আমি শুধু হারাচ্ছি, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নিঃশ্বাস, শুধু যন্ত্রণার মধ্যে আমি তাকে হারিয়ে ফেলছি।”
হঠাৎ সামিয়া ফোন থেকে রাহিনের একটা ছবি বের করে বলল,
“তোমাকে চেয়েছিলাম জীবনসঙ্গী হিসেবে, অথচ ভাগ্য আমাকে ঠেলে দিচ্ছে অন্য কারও পাশে। তুমি ছাড়া বিয়ে করতে বসা মানে যেন নিজের কবরের ওপর বসা। আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছো, অথচ আমি কিছুই করতে পারছি না। এ অসহায়তাই আমাকে মেরে ফেলছে”, সামিয়া একটু থেমে আবারও অভিযোগ করে বলল,
“কেন আমাকে এভাবে ভেঙে দিলে, আল্লাহ? যাকে প্রাণ ভরে ভালোবাসলাম, তার হাতটা ধরতে পারব না। যে ছেলেটার চোখে আমি আমার সুখ খুঁজেছিলাম, তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক হবে না। আমার বিয়ে হবে অন্য কারও সাথে, অথচ হৃদয়টা যে পড়ে আছে ওই মানুষটার কাছে। আমি কীভাবে বাঁচব? কীভাবে হাসব? হাসি তো সাজাতে পারব সবার সামনে, কিন্তু বুকের ভেতর এই রক্তক্ষরণ কীভাবে থামাব?”
সে মাথা নীচু করে কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“হয়তো সবাই আমাকে বউ সাজিয়ে অন্যের হাতে তুলে দেবে, কিন্তু আসল আমি তো আজ থেকেই মরে যাচ্ছি। ভালোবাসা যদি এভাবে অবহেলিত হয়, তবে কেন জন্ম দিলা আমার বুকে এই অকারণ অনুভূতি? সে তো শুধু আমার ছিল, তবু কেন হলো না আমার? আমি তো তার জন্য বউ সাজতে চেয়েছিলাম, তবে কেন আমাকে বউ সেজে কাফনের বেশে অন্যের হাত ধরতে হবে। আজ আমার মনে হচ্ছে, কাফনের কাপড় সবসময় সাদা হয় না, কাফনের কাপড় কখনও কখনও বেনারসির লাল রঙেও হয়ে থাকে।”
ঘরটা ভরে উঠল তার কান্নার শব্দে। জানালার ওপাশে হাওয়া বয়ে যায়, কিন্তু সামিয়ার ভেতরের ঝড়টা থামাতে পারে না। হঠাৎ সামিয়ার রুমে নক পড়ল। নাজমিন একটানা ডেকে যাচ্ছে তাকে। সামিয়া ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে-মুখে পানি দিয়ে এসে দরজা খুলে দিল। নাজমিন ভেতরে ঢুকে দরজা লক করে দিয়ে বলল,
“রাহিন ভাইয়াকে তুই ভালোবাসিস। তাহলে নিচে কেন বললি, তুই এই বিয়েতে রাজি? তুই তো এই বিয়েতে রাজি নস।”
সামিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“কেন তোরা খুশি নস? তোরা তো এইটাই চাস। পিয়াস ভাইয়ার পাওয়ার আছে। তোর ধারণা, আমাকে না পেলে, সে হয়তো সবাই জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে। দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হবে। ফারিয়া আপু আর শাহরুখ ভাইয়ার বিয়েতে সমস্যা হবে— এসব তো তোরাই বললি। আমার বড় আপুর বিয়েতে ঝামেলা হয়েছে, এখন আমিও এমন করলে, পাড়ায় আমাদের বদনাম হবে— এসব তো তোদের কথা।”
“আমি বলেছিলাম, সামু। কিন্তু আমি চাই, তুই যাকে ভালোবাসিস তাকেই যেন পাস। ওসব আমি বলেছিলাম কারণ, আমি চেয়েছিলাম যেকোন ডিসিশন নেবার আগে তুই অন্তত ভেবে নিস।”
“এখন তো ভেবেই ডিসিশন নিয়েছি। তাহলে এসব কেন বলছিস?”
“সামু, পিয়াস ভাইয়া তোকে ভালোবাসে। রাহিন ভাইয়াও তোকে ভালোবাসে। আর তুইও রাহিন ভাইয়াকে ভালোবাসিস। পিয়াস ভাইয়া যেমন তোর সবসময় খেয়াল রাখত। রাহিন ভাইয়াও কিন্তু তোর পেছনে লোক রেখে তোর খবর রেখেছে। প্রতিদিন তোর খোঁজ খবর নিয়েছে। একদিন তোকে ফোনে না পেলে, সে কেমন পাগলামি করত, তুই না জানলেও আমি জানি।”
সামিয়া হঠাৎ চুপ করে গেল। চোখের পলক ফেলছে না, যেন কান্না আটকে রাখছে। নাজমিন তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“তুই ভাবছিস তুই একা কষ্ট পাচ্ছিস? রাহিন ভাইয়া প্রতিদিন মরে যাচ্ছে তোকে না পেয়ে। তোর হাসি না দেখলে ওনার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়। তোরা দু’জন দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে, অথচ মন একে অপরের কাছে বাঁধা। তুই যদি জোর করে এই বিয়েতে হ্যাঁ বলিস, তাহলে শুধু নিজের না, ওনার জীবনটাও শেষ করে দিবি।”
সামিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি দিলেও চোখ ভিজে উঠল। সে আস্তে করে বলল,
“তুই কি বুঝিস না, নাজমিন? ভালোবাসা থাকলেই সব পাওয়া যায় না। দায়িত্ব, সম্পর্ক, সমাজ—সবকিছু বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। আমি জানি রাহিন ভাইয়া আমায় ভালোবাসে। আমিও তাকে ছাড়া কিছুর কথা ভাবতেই পারি না। কিন্তু, আমি যদি না মানি, তাহলে শুধু আমার নয়, পুরো পরিবারের অপমান হবে। আমার বড় আপুর বিয়েতে যেমন ঝামেলা হয়েছিল, এবার যদি আমার ক্ষেত্রেও হয়? আমার আম্মু কেমন করে তা সহ্য করবে?”
নাজমিন চোখ মুছে বলল,
“কথাগুলো আমাকে শোনালি? সেদিন আমি এসব বলেছিলাম বলে, আজ আমাকে সবটা ফেরত দিলি? কিন্তু সামু, তোর মায়ের সম্মান আর সমাজের ভয় কি তোর সুখের চেয়ে বড়? তুই কি সারাজীবন একটা মুখোশ পরে কাটাবি? পিয়াস ভাইয়ার সাথে বিয়ে হলে হয়তো সবাই বাহবা দেবে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তুই যে মরবি— ওরা কি সেটা দেখবে?”
সামিয়া ভেঙে পড়ল। সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। বুক ভেঙে কান্নার স্রোত বেরোতে লাগল।
“আমি পারছি না, নাজমিন। আমি প্রতিদিন মরছি। রাহিন ভাইয়া ছাড়া প্রতিটা মুহূর্ত নিঃশ্বাস নেওয়া যেন শ্বাসরুদ্ধকর। কিন্তু আমি কারো কাছে সেটা বলতে পারছি না। আমার মনের কথা, আমার কষ্ট—কেউ বোঝে না। এমনকি আম্মুও না।”
নাজমিন, সামিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“আমি বুঝি সামু, আমি বুঝি। তুই যদি একবার সাহস করে নিজের মনের কথা বলিস, হয়তো সবকিছু বদলে যেতে পারে। তুই ভাবছিস ভাগ্য তোকে ঠেলে দিয়েছে, কিন্তু আসলে তুই নিজেই নিজেকে ঠেলে দিচ্ছিস অতল গহ্বরে।”
সামিয়া মাথা তুলে তাকাল।
“তুই বলছিস আমি যদি এখনও নিজের মনের কথা সবাইকে জানাই, কিছু বদলাতে পারে?”
নাজমিন দৃঢ় স্বরে বলল,
“হ্যাঁ সামু! তুই যদি সত্যিই রাহিন ভাইয়াকে ভালোবাসিস, তাহলে এই সময়টাই তোর শেষ সুযোগ। না হলে কাল হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।”
সামিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না। একটু সময় নিয়ে সে আবারও হেসে বলল,
“বাদ দে।! তোর সমস্যা কোথায়, আমি খারাপ থাকলে? সেদিন তুই, তোরা সবাই আমাকে যা যা বলেছিস, আমি সবটা মেনে নিয়েছি। নাউ, প্লিজ যা।”
নাজমিন তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
“সামু, ভালোবাসা লুকিয়ে রাখলে সেটা অভিশাপে পরিণত হয়। তুই ভাবছিস তুই ত্যাগ করছিস, কিন্তু আসলে তুই তিনটা জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছিস—তোরটা, রাহিন ভাইয়ারটা আর পিয়াস ভাইয়ারটা।”
সামিয়ার বুক ভেঙে আসছে, তবু সে ঠোঁটে জোর করে হাসি টেনে বলল,
“কিন্তু নাজমিন, সবকিছু কি ভালোবাসার উপর দাঁড়িয়ে থাকে? দায়িত্ব, সমাজ, পরিবারের ইজ্জত—এগুলোও তো আছে। আমি যদি নিজের ভালোবাসা দাবি করি, তাহলে অনেক সম্পর্ক ভেঙে যাবে।”
“সম্পর্ক ভাঙবে যদি মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। তুই কি চাস, পিয়াস ভাইয়া সারাজীবন এমন একজন মেয়েকে পাশে পাক, যার হৃদয় অন্য কারও কাছে পড়ে আছে? এটা তো ওনার জন্যও অবিচার।”
সামিয়ার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে বিছানার কিনারায় বসে পড়ল, বুক চেপে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আমি জানি, রাহিন ভাইয়াকে ছাড়া আমি বাঁচব না। প্রতিটা নিশ্বাসে আমি তাকে খুঁজি। কিন্তু আম্মু, আমার আম্মু যদি আমার মুখ থেকে এই কথা শুনে ভেঙে পড়ে? তার চোখের পানি আমি দেখতে পারব না । আমি তার অবাধ্য হতে পারব না।”
নাজমিন আস্তে করে সামিয়ার মুখ দু’হাতে তুলে চোখে চোখ রাখল।
“তোর মা তোর কষ্টটা দেখতে পারছে না, সামু। তুই যদি আজ নিজে থেকে সত্যিটা না বলিস, তবে ভবিষ্যতে একদিন তোর মা-ও বুঝবে, যে তুই শুধু হাসিমুখে সাজানো একটা লাশ ছিলি। তুই কি সেই লাশ হয়ে বাঁচতে চাস?”
“রাহিন ভাইয়াকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি, কিন্তু মুখ ফুটে বললেই যদি সবকিছু হয়তো শেষ হয়ে যাবে— এইটাই সবাই বলছে। কিন্তু কেউ ভাবল না, আমি কীভাবে বাঁচব।”
“বেঁচে থাকার একটাই পথ আছে সামু—সত্যি বলা। তুই যদি এখনো রাহিন ভাইয়াকে চাস, তবে কালকের আগেই, সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে। না হলে সত্যি খুব দেরি হয়ে যাবে।”
সামিয়া চোখের পানি মুছে বলল,
“তোর তো শাহরুখ ভাইয়া আর ফারিয়া আপুর কথা ভাবা উচিত। হঠাৎ আমাকে নিয়ে এতো ভাবছিস কেন?”
নাজমিন, সামিয়ার পাশে বসে বলল,
“সেদিন আমি জানতাম না, তুই রাহিন ভাইয়াকে ভালোবাসিস। আমি সবসময় রাহিন ভাইয়াকে তোর জন্য পাগলামি করতে দেখেছি, কিন্তু তোর মধ্যে এমন কিছু দেখেনি। সেদিন যখন কাকিমনি ফুপির সাথে ফোনে কথা বলছিল, আমি সবটা শুনে খুব খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু সেইরাতেই যখন তোকে কাকিমনি এই ব্যাপারে সবটা বলল, আর তুই অমত করতে শুরু করলি, তখন আমি ভেবেছিলাম তুই হয়তো তোর পড়াশোনার জন্য অমিত করছিস। তাই কাকিমনি তোকে ওসব বলে বোঝানোর সময়, আমিও তোকে বোঝাচ্ছিলাম। কিন্তু সেদিন গভীর রাতে যখন কারো কান্না আর আর্তনাদ শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেল, তখন আমি আমার ভুলটা বুঝতে পেরেছিলাম।”
সামিয়ার ঠোঁটে জোর করে টানা হাসিটা এমন ছিল, যেন নিজের বুকের ভেতরের রক্তক্ষরণ ঢাকতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। নাজমিন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। সামিয়া আস্তে করে বলল,
“বাদ দে! এই ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই। আমি বা রাহিন ভাইয়া—আমরা তো কেউ কোনোদিন কাউকে ভালোবাসি বলিনি। ভালোবাসায় যদি এতটাই নীরব থেকে যায়, তবে সেটা দাবি করার অধিকারও নেই।”
নাজমিন তাকিয়ে রইল। সামিয়া আবারও বলল,
“দয়া করে তুই এখন যা। আমি একটু ঘুমাতে চাই।”
এ কথা বলে সামিয়া মাথা নামিয়ে নিল। চোখের কোণ বেয়ে আবারও পানি ঝরে পড়তে লাগল। সে বালিশ টেনে মুখ ঢেকে দিল, যেন কান্নার শব্দ কারো কানে না যায়।
নাজমিন নিঃশব্দে বসে রইল কিছুক্ষণ। তার বুকের ভেতরেও কষ্ট জমে উঠল, কিন্তু সে কিছু বলল না। সামিয়ার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে আস্তে করে উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়েও একবার পেছন ফিরে তাকাল— দেখল, একটা ভেঙে পড়া মেয়ে, যে নিজের ভালোবাসা অস্বীকার করে, নিজের জীবনকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল সে। ঘর ভরে রইল সামিয়ার কান্নার শব্দে।
ডাইনিং টেবিলে দুপুরের খাবারের আয়োজন জমকালো হলেও, সবার চোখে-মুখে একধরনের অস্বস্তি ছড়িয়ে আছে। পরিবেশটা অদ্ভুত রকমের ভারী। রুমা বেগম খাবার পরিবেশন করতে করতে চারদিকে তাকিয়ে বললেন,
“সামিয়া কোথায়? খেতে এলো না?”
হাসি বেগম গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন,
“ও একটু ক্লান্ত, বিশ্রাম নিচ্ছে।”
কেউ আর কোনো প্রশ্ন করল না, কিন্তু টেবিলের নিস্তব্ধতা অনেক কিছু বলে দিচ্ছিল। শেরাজ চামচ নামিয়ে বলল,
“সবার মুখ এমন গম্ভীর কেন?”
আইয়ুব হালকা হাসি টেনে বলল,
“সবাই মনে হয় কথার ডায়েট শুরু করেছে, তাই কেউ কথা বলছে না আজ।”
আইয়ুবের কথা শোনার পর হালকা হাসাহাসি উঠলেও মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। হঠাৎ সারবাজ গ্লাস নামিয়ে বলল,
“সবাই চেষ্টা করছে, কিন্তু মন খুলে হাসতে পারছে না।”
তার কথা শুনে সবাই থমকে গেল। ফাহিম তাকাল রাহিনের দিকে। রাহিন খাচ্ছে না। সে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। তার আঙুল অন্যমনস্কভাবে টেবিলে ছন্দ তুলছে। রিসান পরিবেশ হালকা করার চেষ্টা করে বলল,
“আচ্ছা, এভাবে চুপচাপ খেলে খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাবে। কাল আমরা একসাথে বিয়ের শপিংয়ে যাচ্ছি, আমাদের তো খুশি হওয়ার কথা।”
এই কথার পর টেবিলে আবারও এক অদৃশ্য চাপা অস্বস্তি নেমে এলো। সামিয়ার অনুপস্থিতি, আর রাহিনের অদৃশ্য কষ্ট যেন সকলে টের পাচ্ছিল। স্যান্ডি খেতে খেতে হঠাৎ উঠে গেল। কিছুক্ষণ পর এসে আবারও চেয়ারে বসে চাপাস্বরে শেরাজকে কিছু একটা বলল। শেরাজ একটু বাঁকা হেসে রুমা বেগম আর হাসি বেগমের উদ্দেশ্যে বলল,
“বড়মা আর আম্মু! আপনাদের একটা কথা বলতে চাই।”
সকলে কৌতুহলবশত তাকাল শেরাজের দিকে। শেরাজ একটু সময় নিয়ে বলল,
“আজ সন্ধ্যায় এই বাড়িতে আমার চারজন গেস্ট আসবে। আর তারা হয়তো কিছুদিন থাকবে এখানে।”
শেরাজ কথাটা বলতেই টেবিলে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সকলে অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রুমা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
“কারা আসছে, বাবা?”
শেরাজ হালকা রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল,
“এখনই সব বলে দিলে মজা নষ্ট হয়ে যাবে, বড়মা।”
আইয়ুব কাটাচামচ ঘুরাতে ঘুরাতে মজা করে বলল,
“কি রে, বিয়ের আগে আবার নতুন সারপ্রাইজ নাকি?”
শেরাজ শুধু হালকা হেসে মাথা নেড়ে দিল। সুমু পাশ থেকে চাপাস্বরে বলল,
“কারা আসবে?”
“পরে জানতে পারবে, সুইটহার্ট!”
সুমু আর কথা বাড়াল না। শেরাজ আবারও বলল,
“তো বড়মা! তারা এখানে কিছুদিন থাকলে কোন আপত্তি নেই তো আপনাদের?”
রুমা বেগম চুপচাপ কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
“আপত্তি কীসের, বাবা? বাড়িতে বিয়ে, নতুন মেহমান এলে আমাদের ভালো লাগবে।”
শেরাজ মাথা নাড়ল। সবার চোখে মুখে হালকা উত্তেজনার ছোঁয়া। ডাইনিং টেবিলটা যেন আজ সন্ধ্যার নতুন গেস্টদের অপেক্ষায়।
ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা ছয়টা। রাহিন একা ছাদে দাঁড়িয়ে। শেরাজের গেস্টরা এখনো এসে পৌঁছায় নি, তাই বাকি সবাই গেস্টদের অপেক্ষায় এখন ড্রয়িংরুমে। বেশি মানুষজন রাহিনের এখন ভালো লাগছে না। তাই সে ছাদে একা দাঁড়িয়ে। তার চোখে অশ্রু, বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে। সে নিজের প্রতি, ভাগ্যের প্রতি, এমনকি পৃথিবীর প্রতি কড়া অভিযোগ জড়ো করছে।
“কেন এমন হলো? কেন আমার জীবনকে এতো কষ্টে ভরা হলো? আমি শুধু চাইছি আমার পিচ্চিটার সঙ্গে থাকব। কিন্তু কেন সবকিছু আমাকে তার থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে? আল্লাহ তুমি দেখছ, আমি কি ভুল করেছি? আমি কি কখনও কাউকে আঘাত দিয়েছি? তবুও কেন আমার ভালোবাসার থেকে আমাকে আলাদা হতে হবে?” সে রেলিং চেপে ধরে আবারও বলল, “আমি সবসময় চেষ্টা করেছি সত্যির সঙ্গে থাকার, নিষ্ঠার সঙ্গে বাঁচার। কিন্তু কেন আমার ভালোবাসা এতো অমীমাংসিত? কেন সে আমার নয়? আমার জীবনের প্রতিটা অংশ তার জন্য তৈরি। আমি চাইছি তার কাছে যাব, শুধু একবার। কিন্তু পারছি না। কোন পাপের শাস্তিস্বরূপ তাকে আমার থেকে কেড়ে নিচ্ছো?”
সে মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকাল।
“আমি তার কাছে যেতে চাই, তার হাতে হাত রাখতে চাই, তার চোখে চোখ রাখতে চাই। তাকে ভালোবাসি বলতে চাই। কিন্তু পারছি না। আমি কি এতই অপরাধী? আমি কি তাকে যথেষ্ট ভালোবাসি নি? আমি কি তাকে সুখ দিতে পারব না? কেন আল্লাহ, কেন আমার হৃদয়ের সমস্ত আশা শেষ হয়ে যাচ্ছে? আমি কি তার জন্য যথেষ্ট নই? আল্লাহ, কেন আমাকে এতো কষ্টে ফেলে দিলে? আমার ভালোবাসার পৃথিবীটা কেন এতো নিষ্ঠুর?”
সে হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল ছাদের ওপর। ধীরে বলল,
“আমার পিচ্চি অন্যকারো হয়ে যাবে, অন্য কারো জন্য বউ সাজবে, অন্য কেউ তাকে স্পর্শ করবে, অন্য কারো বুকে মাথা রাখবে, আর আমি বেঁচে থেকে কীভাবে এসব সহ্য করব? নিজের প্রিয় মানুষটাকে অন্য কারো পাশে কীভাবে মেনে নিব?”
হঠাৎ অমিত ছাদে এলো। সে রাহিনের কাছে এগিয়ে পাশে বসে হালকা কণ্ঠে বলল,
“এখানে বসে কষ্ট না পেয়ে, নিচে চল। এস.কের গেস্টরা এসে গেছে। আর দশ মিনিটের মধ্যে তারা এই বাড়িতে ঢুকবে। এস.কে নিচে যেতে বলেছে। আর তুই কী বোকা? এভাবে ভেঙে পড়েছিস কেন? এস.কে কখনোই সামিয়ার বিয়ে পিয়াসের সাথে হতে দিবে না। এখন চল ভাই।”
রাহিন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“ভালো লাগছে না।”
অমিত তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“আমি জানি, কিন্তু বিশ্বাস রাখ। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
রাহিন সম্মতি জানাল। অমিত রাহিনকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। দুজনে ধীরে ধীরে ছাদ থেকে নেমে গেল।
ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা আগে থেকেই একটু ভারী। সবাই খোলামেলা হাসি বা কথা বলছে না। সকলে গেস্টদের অপেক্ষায়। অমিত আর রাহিন এসে বসল। হঠাৎ বাইরে গাড়ি থামার শব্দ শোনা গেল। সবাই চুপচাপ বাড়ির দরজায় দিকে তাকাল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শেখবাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল স্যান্ডি। তার পেছনে ধীরে-ধীরে ঢুকে এলো রায়য়ান চৌধুরী, আরিয়ান চৌধুরী, রোজা চৌধুরী আর আলিশা।
খান সাহেব পর্ব ৬৬ (২)
ড্রয়িংরুমে সবাই তাদের দিকে তাকাল। মুহূর্তেই অবাক হয়ে গেল সকলে। চোখ বড় করে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে সবাই। আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, সারবাজ, আরবাজ, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান, শাহরুখ একসাথে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবাক হলো সুমু। তার চোখ বড় হয়ে গেল। সে এতক্ষণ বসে আইসক্রিম খাচ্ছিল। তার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। বুকের ভেতর একধরনের অদ্ভুত উত্তেজনা আর কৌতূহল মিশ্রিত হয়ে ধক করে উঠল। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। শেরাজের ঠোঁটে তখন রহস্যময় একটি হাসি। সে বাঁকা হেসে তাকিয়ে আছে রায়য়ানদের দিকে। সুমু অবাক চোখে শেরাজের দিকে তাকিয়ে আছে। আলিশা দৌড়ে এসে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। সুমু প্রথমে হকচকিয়ে গেল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে আলিশাকে জড়িয়ে ধরল। শামীম সাহেব, সাখাওয়াত সাহেব, হাসি বেগম আর রুমা বেগম হাসিমুখে রায়য়ানদের গ্রহণ করে নিল।
