খান সাহেব পর্ব ৬৯
সুমাইয়া জাহান
নতুন দিনের শুরু হলো। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ধরণীকে আলোয় ভরিয়ে তুলছে। গাছে গাছে পাখিরা মিষ্টি সুরে গান গাইছে। শেখবাড়ির সকল আত্মীয়-স্বজনদের জন্য বাড়ির বাহিরে গার্ডেনে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে নাস্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে, আর বাড়ির ভেতরের টেবিলে বাড়ির সকলের জন্য নাস্তার আয়োজন করা হয়েছে। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, সাথে পরোটা, সবজি, ডিম আর সেমাই। সকলে একসাথে বসে ব্রেকফাস্ট করছে। পরিবেশটা একেবারে শান্ত, তবে ভেতরে উৎসবের আমেজ টের পাওয়া যাচ্ছে—কারণ আজ সন্ধ্যায় সামিয়াদের গায়ে হলুদ। গার্ডেনে সাখাওয়াত সাহেব, শামীম সাহেব, ইফতিয়াক সাহেব, আনোয়ার সাহেব, সকল আত্মীয়স্বজনদের দেখাশোনা করছে। বাড়ির ভেতরে বাড়ির মহিলারা সবটা সামলাচ্ছে।
খাবার টেবিলে সকলে উপস্থিত। হঠাৎ আশিক কফির কাপ নামিয়ে রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
“শুনলাম, কাল রাতে নাকি পিয়াস ভাইয়ার পার্টির একটা ছেলে, ওই যে পাড়ার মোড়ে মোজাম্মেল চাচার ছেলে অর্ণব। সে নাকি বাড়ি ফেরেনি। সকলে ভেবেছিল, বোধহয় বন্ধুদের বাসায় আছে, কিন্তু ফোনে বার বার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি। শেষমেশ সব বন্ধুদের থেকেও কোনো খোঁজ মেলেনি তার। ছেলেটা নাকি পুরো উধাও।”
টেবিলের চারপাশে মুহূর্তেই নিরবতা নেমে এলো। কারো চামচের শব্দ থেমে গেল, কেউ থমকে গেল আধখাওয়া পরোটা মুখে নিয়েই। নাজমিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“উধাও মানে? মানুষ হাওয়ায় মিলিয়ে যায় নাকি?”
ফারিন কৌতূহলী গলায় বলল,
“কাল রাতেই তো শেষবার ওকে দেখা গেছিল, তাই না? এই বাড়িতে এসেছিল তো।”
সুমুর হাত থেমে গেল। তার চোখ এক ঝলক ঘুরল শেরাজের দিকে। তারপর সে একবার আরিয়ান আর রায়য়ানের দিকে তাকাল। শেরাজ মাথা নিচু করে নীরবে খেতে থাকল, যেন কিছুই শোনেনি। রায়য়ান আর আরিয়ান একে অপরের দিকে ক্ষণিকের জন্য তাকাল, তারপর চোখ সরিয়ে নিল। তাদের দুজনের মুখ অস্বাভাবিকভাবে গম্ভীর।
সুমুর তিনজনকে একবার পরখ করে দেখে মনে মনে বলল,
“হঠাৎ ছেলেটা উধাও কীভাবে হলো? কালরাতে তো এই বাড়িতে ওই ছেলের সাথে একটা ছোট ঝামেলা হলো, আর আজ সে উধাও। কে করতে পারে এই কাজ। খান সাহেব, আরিয়ান নাকি রায়য়ান? কিন্তু আরিয়ান আর রায়য়ান তো এমন না। আর খান সাহেব তো কাল বাড়িতেই ছিল।”
নিজের মনকে নিজেই প্রশ্ন করল সুমু। চারপাশের অস্বস্তিকর নীরবতায় শুধু কাঁটাচামচের শব্দ আর চায়ের কাপ নামানোর টুং শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সুমুর ভেতরে প্রশ্নের ঝড় থামছিল না। তার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছিল। হঠাৎই সে চমকে উঠে আশিকে বলল,
“এই ব্যাপারটা কিন্তু সিরিয়াস। একটা ছেলে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল, আর কোনো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না—এটা স্বাভাবিক না। আমি বলি, তাদের থানায় খবর দেওয়া উচিত।”
আশিক গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, মোজাম্মেল চাচার জায়গায় আমার বাবা হলে তো আজকেই জিডি করত।”
টেবিলের সবাই এ নিয়ে কথা বলতে শুরু করল। মহিলারাও উদ্বিগ্ন চোখে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল। শেরাজ তখনও মাথা নিচু করে খাচ্ছিল। তার আঙুলে কাঁটাচামচের শব্দটা বারবার ধাতব ঠকঠক আওয়াজ তুলছিল। রায়য়ান ঠোঁট চেপে ধরেছিল, যেন ভেতরে ভেতরে নিজের রাগ বা অস্থিরতাকে চেপে রাখছে। আরিয়ান হালকা কাশির ভান করে নিজের চেয়ারে হেলান দিল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল,
“মোজাম্মেল চাচা এসেছেন।”
সবাই একসাথে চমকে উঠল। কয়েক মুহূর্ত আগেই যার ছেলের খোঁজে আলোচনা হচ্ছিল, তিনি বাড়ির ড্রয়িংরুমে সাখাওয়াত সাহেবের সাথে প্রবেশ করলেন। তার মুখ শুকনো, চোখ লাল, যেন সারারাত একফোঁটা ঘুম হয়নি। তিনি ঢুকেই ভারী গলায় বললেন,
“আজ আপনাদের বাড়িতে একটা আনন্দের দিন। কিন্তু কি করব বলুন, ভাই? কালরাত থেকে আমার ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছি না। কারো কাছে কি কোনো খবর নেই?”
বাড়ির ভেতর হঠাৎ করে চাপা নীরবতা নেমে এলো। সুমু নিঃশ্বাস আটকে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ শান্ত মুখে উঠে দাঁড়িয়ে সুমুকে বলল,
“বসে না থেকে, খেয়ে নাও। তুমি ভুলে যাচ্ছ, তোমাকে এখন রুটিন মেনে খেতে হয়।”
শেরাজের হঠাৎ করে সুমুকে উদ্দেশ্য করে বলা কথায় সবাই কিছুটা থমকাল। সুমু হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকাল, তারপর জোর করে ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে চামচ হাতে নিল। বুকের ভেতরটা তখনও কাঁপছে তার।
মোজাম্মেল সাহেব সোফায় বসতেই সাখাওয়াত সাহেব সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বললেন,
“আপনি চিন্তা করবেন না, ভাই। মাত্রই তো সকাল হলো। সবাই মিলে খোঁজ করলে আশা করি পাওয়া যাবে।”
মোজাম্মেল সাহেব ভারী গলায় বললেন,
“থানায় গেছি, আশেপাশের সব বন্ধুদের বাড়ি ঘুরেছি। কিছুতেই খুঁজে পাইনি। ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি। বুকের ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে, মনে হচ্ছে কোনো অঘটন ঘটেছে।”
পরিবেশে আবারও হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এলো। উৎসবের আবহ যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। নাজমিন আস্তে করে বলল,
“কোথায় নেশা করে পড়ে আছে।”
সামিয়া দ্বিধাভরা কণ্ঠে নিচুস্বরে বলল,
“কালরাতেও এখানে এসে ঝামেলা করেছে, আর এখন গায়েব। কে জানে, কোথায়, কোন মেয়ের সাথে অসভ্যতামি করতে গিয়েছে, আর সেখানে লোকজন ধরতে পেরে বেঁধে রেখেছে।”
নাজমিন ঠোঁট টিপে হাসল। রোজা ভ্রু কুঁচকে শেরাজদের দিকে একপলক তাকিয়ে আবারও খাওয়াতে মন দিল।
সাখাওয়াত সাহেব গম্ভীর মুখে ঠাণ্ডা গলায় বললেন,
“ছেলেপেলেরা তো মাঝে মধ্যে বন্ধুদের সাথে বাইরে রাত কাটায়। হয়তো ও অন্য কোন দূরের বন্ধুর বাড়িতে আছে। ফোনে হয়ত চার্জ নেই। আর অর্ণব বাবা হয়ত এখনো ঘুমিয়ে আছে। ভাইজান আপনি চিন্তা করবেন না। অর্ণব ঠিক ফিরে আসবে।”
তাদের আলোচনার সময় রায়য়ান আর আরিয়ান একদম চুপচাপ বসে রইল। দুজনেই কারও চোখের দিকে তাকাল না, যেন কিছুই জানে না। তাদের এই অস্বাভাবিক নীরবতা রোজা আর আইয়ুবদের চোখ এড়াল না।
মোজাম্মেল সাহেব ভারী নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“আচ্ছা, আমি যাচ্ছি। যদি কারো কাছে কোনো খবর আসে, দয়া করে আমাকে জানাবেন।”
তিনি চেয়ার থেকে উঠে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোলেন। কিছু আত্মীয় তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বিদায় জানাল।
তিনি চলে যেতেই ঘরে এক মুহূর্তের জন্য চাপা নীরবতা নেমে এলো। কারো চায়ের কাপ নামানোর শব্দ পর্যন্ত যেন কানে বিঁধছিল। তখনই সাখাওয়াত সাহেব কাশি দিয়ে সবার দৃষ্টি নিজের দিকে টেনে নিলেন। শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“শোনো সবাই! আমাদের এখন একটা দায়িত্ব আছে। এই বাড়িতে এখন আনন্দের দিন। সকলে মন খারাপ করলে চলবে না। আল্লাহ্ ভরসা, অর্ণব ঠিক ফিরে আসবে। এখন সবাই সামিয়াদের গায়ে হলুদের প্রস্তুতিতে মন দাও।”
তার কথায় পরিবেশে একটু হলেও ভার কমলো। মহিলারা আবারও নিজেদের কাজে মন দিল। আশিক নাস্তা শেষ করে চেয়ার-টেবিল গোছাতে সাহায্য করতে গেল। সাখওয়াত সাহেবও চলে গেলেন। সবকিছু যেন আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠল। সকলে নাস্তা শেষ করে যার যার কাজে মন দিল।
গার্ডেনের আঙিনায় রঙিন কাপড় ঝোলানো শুরু হলো। ফুলওয়ালা এসে পৌঁছাল টাটকা গাঁদা আর গোলাপের মালা নিয়ে।
শেখবাড়ির ভেতরে রান্নাঘর জমজমাট। বিশাল হাঁড়িতে ভাজা হচ্ছে পিয়াজু আর কাবাব, অন্যদিকে মিষ্টির ট্রে সাজানো হচ্ছে। রান্নাঘরের চারপাশে সুগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, যেন উৎসবের ঘ্রাণ পুরো বাড়িটাকেই আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
এদিকে ছেলেরা মঞ্চ সাজাতে ব্যস্ত। রঙিন কাপড়, লাইট আর ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে গায়ে হলুদের আসর। কয়েকজন আবার ডিজে সেট আর সাউন্ড সিস্টেম ঠিকঠাক করছে।
পুরো পরিবেশে উৎসবের আমেজ। হাসি-ঠাট্টা, কাজের ব্যস্ততা আর গান-বাজনায় বাড়িটা যেন আলোয় আর আনন্দে ভরে উঠছে।
সন্ধ্যা নামতেই শেখবাড়ি রঙিন আলোয় ঝলমল করে উঠল। চারপাশে লাইট ঝুলছে, গার্ডেনে রঙিন কাপড় আর ফুল দিয়ে সাজানো মঞ্চ। গায়ে হলুদের আমেজে পুরো পরিবেশটাই উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে।
ঘরটা আলো আর ফুলে ভরে গেছে। গায়ে হলুদের উজ্জ্বল আবহে তিনজন বোনকে বসানো হয়েছে মাঝখানে। সামিয়া পরেছে গাঢ় হলুদ লেহেঙ্গা, যার ঘেরজুড়ে ঝলমলে সোনালি কাজ করা। মাথায় বেলি আর গাঁদা ফুল দিয়ে খোঁপা, গলায় গাঁদা ফুলের মালা, হাতে ফুল দিয়ে বানানো গাজরা। তার সাজ নিখুঁত হলেও মুখে তেমন হাসি নেই। চোখে এক ধরনের অস্বস্তি, ঠোঁটে জোর করে রাখা হালকা হাসি। মাঝে মাঝে আঙুল দিয়ে লেহেঙ্গার ঘের টানছে—যেন মন তার অন্য কোথাও।
ফারিয়া একেবারে উচ্ছ্বাসে ভরা। তার লেহেঙ্গা সামিয়ার লেহেঙ্গার মতোই হলুদ, তবে ব্লাউজের গলায় আর হাতায় রঙিন সুতো দিয়ে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি করা। মাথার খোঁপায় লাল-সাদা গোলাপ গুঁজে দেওয়া হয়েছে। সে খিলখিল করে হাসছে, আশেপাশে যারা বসেছে তাদের সাথে লাগাতার মজা করছে।
নাজমিন এর সাজটা একেবারেই স্নিগ্ধ। হালকা হলুদ লেহেঙ্গার সাথে সবুজ দুপাট্টা, যা ফুল দিয়ে আটকানো। গলায় সাদা ফুলের মালা, হাতে গাঁদা ফুলের গাজরা।
ঘরের ভেতর অন্য মেয়েরা হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে, সামিয়ার মুখের অনাগ্রহ কারো চোখ এড়াচ্ছিল না। বিশেষ করে সুমুর। সে সামিয়ার চোখে তাকিয়ে দেখল, বোনটা যেন জোর করে সবকিছুতে অংশ নিচ্ছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কোথাও যেন ভারী হয়ে আছে।
হলুদের স্টেজটা সাজানো হয়েছে তাজা ফুল দিয়ে। গাঁদা আর গোলাপের মালা ঝুলছে চারপাশে। রঙিন ফেয়ারি লাইট জ্বলছে টিমটিম করে, চারদিকে ঝলমলে আবহ। হলুদ কাপড়ে মোড়ানো কুশন আর আসন রাখা হয়েছে স্টেজের মাঝখানে।
সামিয়াদের তিন বোনকে ধীরে ধীরে স্টেজে নিয়ে আসা হলো। সামিয়া মাঝখানে, দুপাশে ফারিয়া আর নাজমিনকে বসানো হলো। সামিয়া মাথা নিচু করে বসে রইল। ঠোঁটে জোর করে টেনে আনা হাসি, কিন্তু চোখ দুটো যেন ভারী হয়ে আছে। তার গায়ের হলুদ লেহেঙ্গা আর ফুলের গয়না তাকে রূপকথার রাজকন্যার মতো সাজিয়ে তুলেছে, তবুও ভেতরের অস্বস্তি তার মুখের অভিব্যক্তি লুকোতে পারছে না।
ফারিয়া আর নাজমিন খুশিতে উজ্জ্বল। তাদের হলুদের সাজ, হাসি আর প্রাণচাঞ্চল্য চারপাশের পরিবেশে প্রাণ ঢেলে দিয়েছে। তারা গান আর হাসিতে মাতিয়ে রাখছে। অতিথিরা মোবাইল বের করে ছবি তুলছে, ভিডিও করছে।
এদিকে পিয়াস, শাহরুখ আর আইয়ুবকে আলাদা স্টেজে একসাথে বসানো হলো। বাড়ির বড়রা একে একে প্রথমে গিয়ে পিয়াসদের গায়ে হলুদ ছুঁয়ে তাদের মিষ্টি খাইয়ে দিল। তারপর তারা চলে গেলে সামিয়াদের কাছে।
বড়দের হলুদ ছোঁয়ানো শেষ হতেই সব মেয়েরা এগিয়ে গেল। সকলে একে একে তাদের ছয়জনের মুখে হলুদ মাখিয়ে দিল। হলুদের রঙে ভরে উঠেছে স্টেজটা।
হঠাৎই সামিয়ার দৃষ্টি চলে গেল ভিড়ের একপাশে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রাহিন। সামিয়ার বুক কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস আটকে গেল।
হঠাৎ চারপাশে আবার হইচই পড়ল। সামিয়াদের গায়ে হলুদ লাগানোর জন্য একে একে ছেলেদের ডাকা হলো।
শামীম সাহেব মজার ছলে বললেন,
“এই যে, মেয়েদের হলুদ লাগানো শেষ, এখন ছেলেদের পালা। তোমরা ছেলেরা এগিয়ে যাও।”
সবাই হেসে উঠে দাঁড়াল। অমিত, আরবাজ, সারবাজ, নিহাল—এক এক করে এগিয়ে গেল। তারা আগে পিয়াসদের গালে হলুদ লাগিয়ে এগিয়ে গেল সামিয়াদের দিকে। রাহিন আইয়ুবের গালে হলুদ লাগিয়ে চলে যেতে নিলে সারবাজ রাহিনকে আটকে দিল। অমিতরা আগে গিয়ে সামিয়াদের গালে আস্তে করে হলুদ মেখে দিল। ফারিয়া আর নাজমিনের গালেও লাগাল। চারপাশে হাততালি আর হাসির রোল উঠল।
রাহিন সারবাজের হাত ছেড়ে একটু পেছনে সরে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো হাসি নেই। চোখে অদ্ভুত অস্বস্তি। সে নিচু গলায় বলল,
“আমি যাব না, আমাকে ছাড়।”
সারবাজ মজা করে তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“কী রে, এত লাজুক হলি কবে থেকে? চল না, সামিয়া তো তোরও বোনের মতো।”
রাহিন রাগিলুকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি বলছি, আমি যাব না। ছাড় তো, ভালো লাগছে না।”
আইয়ুব তাদের দেখে স্টেজ থেকে নেমে এসে হেসে বলল,
“আরে না গেলে হবে নাকি? আজ কারো ছাড় নেই। চল, আমিও হলুদ লাগাব আমার শ্যামকন্যাকে।”
রাহিন যেতে চাইল না। তারা দুজন মিলে হইচই করে রাহিনকে টেনে স্টেজের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। রাহিন হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার চেষ্টার কোনো ফল হলো না। অমিতরা হাসতে হাসতে বলল,
“আজ না বলে কোনো উপায় নেই, তোকে যেতেই হবে।”
স্টেজে উঠে যখন তাকে সামিয়ার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো, তখন রাহিনের বুকটা ধক করে উঠল। সামিয়া মাথা নিচু করে বসেছিল, কিন্তু রাহিনকে সামনে দাঁড়ানো দেখে একবার মুখ তুলে তাকাল।
দু’জনের চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য মিলল। সামিয়ার চোখে তখনো সেই চাপা বিষণ্ণতা। রাহিন মুহূর্তেই সরে যেতে চাইল, কিন্তু চারপাশ থেকে হাততালি আর হাসি ভেসে উঠল। সারবাজ হলুদের বাটি রাহিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“চল, এখন লাগা!”
রাহিন কাঁপা হাতে বাটি ধরল। কিন্তু তার আঙুল যেন নড়ছিল না। সে জোর করে সামিয়ার গালে সামান্য হলুদ ছুঁইয়ে দিল। সামিয়ার ঠোঁটে হালকা কাঁপন খেলে গেল।
চারপাশে সবাই আবারও হেসে উঠল। কিন্তু তাদের ভেতরে ভেতরে যে অন্যরকম কিছু চলছে, সেটা কেউ বুঝতেই পারল না।
রাহিন হলুদ লাগিয়ে নামতেই স্টেজের চারপাশে আবার করতালি বেজে উঠল। সে ভিড়ের মধ্যে জায়গা করে নিচে নামল। ঠিক তখনই শাহরুখ আর পিয়াস স্টেজ থেকে নেমে সামিয়াদের দিকে এগিয়ে এলো।
সামিয়া ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিবোধ আরও বেড়ে গেল। মুহূর্তখানেক আগে রাহিনের চোখের দৃষ্টি তার বুকের ভেতর ঝড় তুলেছিল। এখন আবার পিয়াস—দুজনের আগমন যেন তাকে আরও ভারাক্রান্ত করে তুলল।
শাহরুখ এসে প্রথমে হাসিমুখে সামিয়ার গালে হলুদ মাখিয়ে বলল,
“আমাদের সামুকে আজ একদম রাণীর মতো লাগছে।”
পিয়াস, সামিয়ার পেছনে দাঁড়িয়ে চাপাস্বরে বলল,
“সত্যিই, আজকে সবাইকে হার মানিয়েছিস।”
সামিয়া চুপ করে রইল। তার মনের মধ্যে চলা ঝড়কে সে বার বার ঢাকতে চেষ্টা করল। এরই মধ্যে নাচ-গান শুরু হলো। নাচ-গানের আয়োজনে প্রথমে স্টেজে ডাকা হলো আইয়ুব আর নাজমিনকে। সাউন্ড সিস্টেম গান বেজে উঠল,
“মন ভাবে তারে,
এই মেঘলা দিনে!
শীতল কুয়াশাতে,
তার স্পর্শে!
তার রুমঝুম নুপুরের সাজে,
বাতাসে যেন মৃদু সুবাসে!
নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক,
পায়েল খানি বাজে!
মাদল বাজে সেই সঙ্গেতে,
শ্যামা মেয়ে নাচে!”
আইয়ুব আর নাজমিন ধীরে ধীরে স্টেপ মিলিয়ে নাচছে। নাজমিনের লেহেঙ্গা ঘুরতে ঘুরতে বাতাসে ভাসছে, চুলের ছোট্ট ফুল আর পায়ে পড়া নুপুরের ঝিনিক মিলিয়ে এক অনন্য ছন্দ তৈরি করছে। আইয়ুব হাসিমুখে তার পাশে তাল মিলিয়ে নাচছে, মাঝে মাঝে নাজমিনের দিকে হালকা চোখে তাকিয়ে উৎসাহ দিচ্ছে।
ভিড়ের মধ্যে থাকা সকলে উচ্ছ্বাসে হাততালি দিচ্ছে। কেউ কেউ ফোনে ভিডিও করছে। কেউ স্টেজের আলোও তাদের নাচের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে, গার্ডেনের চারপাশে আনন্দের ঝংকার ছড়িয়ে পড়ছে।
সারবাজরা একপাশে বসে চুপচাপ নাচ দেখছিল। হঠাৎই ইনায়া তাদের কাছে এলো। অমিতরা ইনায়াকে দেখে হাসতে হাসতে চলে গেল। সারবাজও উঠে যাওয়ার চেষ্টা করল। ঠিক সেই মুহূর্তে ইনায়া দ্রুত তার দিকে এগিয়ে এসে সারবাজের হাত ধরে তাকে আটকালো।
সারবাজ রাগ দেখিয়ে বলল,
“কি করছেন?”
ইনায়া সারবাজের মুখে ‘আপনি’ সম্মোধন শুনে থমকালো। সে ব্যথাতুর হেসে বলল,
“আপনি? যাক ভালো! এতোটা পর করে দিলে যে, তুমি থেকে আপনিতে নিয়ে এলে। কিন্তু, তুমি উঠে চলে যাওয়ার আগে আমাকে একটু সময় দাও।”
সারবাজ তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“কোথায় যেন পড়েছিলাম, আপনি থেকে তুমিতে আসার গল্পটা অনেক সুন্দর। তবে, তুমি থেকে আপনিতে যাবার গল্পটা অনেক বেদনার।”
ইনায়া দম বন্ধ হয়ে আসা কণ্ঠে বলল,
“সারবাজ! আমি জানি, আমি ভুল করেছি। কিন্তু আজ আমি সত্যি বলছি, আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। শুধু একবার আমাকে সুযোগ দাও, তুমি দেখবে আমি কতটা পরিবর্তিত।”
সারবাজ ঠোঁট চেপে ধরল। তার ভেতরটা অস্থির। সে চুপচাপ ইনায়ার চোখে চোখ রাখল। মুহূর্তটা ভারাক্রান্ত, যেন সময় থমকে গেছে। ইনায়া ধীরে ধীরে বলল,
“আমার ভালোবাসা তোমার জন্য, সারবাজ। আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি। প্লিজ, একটা শেষ সুযোগ দাও!”
সারবাজ হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কেন? আবারও আমার মন নিয়ে খেলার জন্য? দেখো ইনায়া! আমি তোমাকে পরিষ্কার করে বলছি, আমার থেকে দূরে থাকো, প্লিজ।”
ইনায়ার চোখে অশ্রু জমে এলো। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“সারবাজ! আমি আজ মিথ্যা বলছি না। আজ আমি সত্যিই তোমার কাছে এলাম, নিজের ভুল স্বীকার করতে। তুমি আমাকে ইগনোর করো, তবুও আমি হাল ছাড়ব না। শুধু একবার বিশ্বাস করো আমাকে। আমি সত্যি সব ঠিক করে দেব।”
সারবাজের মন একটু নরম হলো, কিন্তু সে মুখে কিছুই প্রকাশ করল না।
“সরি, আমার দ্বারা আর সম্ভব না।”
ইনায়া তার হাত ধীরে ছেড়ে দিয়ে বলল;
“একদিন তুমি ঠিক বুঝবে। আর আমি অপেক্ষা করব সেই দিনটার।”
সারবাজ নীরবে তাকিয়ে রইল ইনায়ার দিকে। ইনায়া হতাশ হলেও চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে চলে গেল।
সামিয়াকে হলুদ দিয়ে শেরাজকে না বলেই নিজের রুমের চলে এলো সুমু। চোখের সামনে বোনের কষ্ট দেখতে ভালো লাগছে না তার, অন্যদিকে শরীরটাও একটু খারাপ লাগছে। রুমে ঢুকতেই হালকা নিঃশ্বাস ফেলল। দরজাটা ধীরে চাপিয়ে রেখে বেডে গিয়ে বসে রইল। চোখের সামনে সামিয়ার কষ্ট তাকে ভেতর থেকে কাঁপাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে সে বলল,
“বোনটা এত কষ্টের মধ্যে আছে, আর আমি কিছু করতে পারছি না।”
পাশের ছোট বালিশে মাথা রেখে সে অনুভব করল—হৃদয়ের ভেতর অস্বস্তি আর দুশ্চিন্তা একে একে জড়িয়ে ধরছে। সুমু ধীরে হাত দিয়ে নিজের কপাল চাপল। মনে মনে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৬৮
“যদি আমি কিছু করে বোনটাকে এই কষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারতাম।”
গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বালিশে মাথা গুঁজল। শরীরটা হালকা দুর্বল লাগছে, গায়ে একটু অসহনীয় ব্যথা। চোখ বন্ধ রেখেও মনে হচ্ছিল সামিয়ার কষ্টের ছাপ তার নিজের ভেতরে লেগে আছে।
হলুদ, ভিড়, খুশির মধ্যে লুকানো বোনের অশ্রু—সব মিলিয়ে সুমুর মনে একটা অদ্ভুত ভারী চাপ তৈরি করছে। সে জানে, সামিয়ার পাশে থাকার জন্য তার শক্তি দরকার।
তার এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ দরজা খোলার একটা শব্দ হলো। সুমু চোখ মেলে তাকাল। সে মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই গেলেই, কেউ একজন তার মুখ চেপে ধরল।
