খান সাহেব পর্ব ৭২ (২)
সুমাইয়া জাহান
শেখ বাড়ির ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত নীরবতা। দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও যেন কানে বিঁধছে। মেঝের মোটা কার্পেটের উপর সবার পায়ের শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। শুধু শোনা যাচ্ছে একটানা কান্না। তিশা বুক ভেঙে কাঁদছে, তার কণ্ঠের হাহাকার ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। খুশি বেগম পাশে বসে আছড়ে পড়ছেন কান্নায়। চোখদুটো লাল হয়ে মুখ ভিজে গেছে অশ্রুতে। তাদের কান্নার প্রতিধ্বনি গোটা ঘরটাকে আরও থমথমে করে তুলেছে।
রুমা বেগম কখনো তিশার হাত ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। কখনো আবার খুশি বেগমকে পানি খাওয়ানোর জন্য এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কারও মুখে এক ফোঁটা জলও যাচ্ছে না। হাসি বেগমও একইভাবে ছুটোছুটি করছেন। এক মুহূর্তে তিনি তিশাকে বুকের মধ্যে টেনে নিচ্ছেন, পরের মুহূর্তে খুশি বেগমকে ধরে বলছেন,
“খুশি, একটু ধৈর্য ধর, আল্লাহ সব ঠিক করে দেবেন।”
কিন্তু কারও কানেই কিছু ঢুকছে না। দুজনার কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে প্রতিটি মুহূর্তে। কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য সদস্যরাও নিঃশব্দ হয়ে আছে। কারও চোখে পানি, কারও ঠোঁট নীরবে কাঁপছে। এই রাতে অশ্রু আর দীর্ঘশ্বাসে ভরে আছে শেখ বাড়ির ড্রয়িংরুম। ধৈর্যের সব বাঁধ যেন অনেক আগেই ভেঙে গেছে সবার।
সাখাওয়াত সাহেব, শামীম সাহেব আর ইফতিয়াক সাহেব তড়িঘড়ি করে থানায় গেছেন। ড্রয়িংরুমে তাদের অনুপস্থিতি যেন আরও ভারী করে তুলেছে পরিবেশ।
কোণায় দাঁড়িয়ে আছে আশিক আর ফারিয়া। হঠাৎ বাড়ির ভেতর ঢুকে এলো পিয়াস আর শাহরুখ। পিয়াসের গায়ে এখানো ব্যান্ডেজ, মুখে ফ্যাকাশে ছাপ, কিন্তু চোখে এক অদম্য দৃঢ়তা। শাহরুখ তার পাশে মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে আছে।
ভাইকে দেখে ফারিয়া আর স্থির থাকতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে পিয়াসের হাত আঁকড়ে ধরে বলল,
“ভাইয়া! তুমি এই অবস্থায় হাসপাতাল থেকে কেনো এসেছো?”
রুমা বেগমও ছুটে এলেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন,
“তুই এই অবস্থায় এখানে কেন এসেছিস বাবা? তোর তো এখন বিশ্রাম দরকার।”
পিয়াস সবার দিকে তাকিয়ে গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
“এই বাড়িতে এতো বড় একটা কান্ড ঘটে গেছে, আর আমি আসব না বড়মামি? তোমরা কোনো চিন্তা করো না। ইফতিয়াকে আমি খুঁজে বের করব।”
মুহূর্তেই দরজার মুখে মুস্তাক সিকদার, সুমি বেগম আর ফারিন এসে দাঁড়াল। মুস্তাক সিকদারের পদচারণায় ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল।
মুস্তাক সিকদার এক ঝটকায় পিয়াসের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখের ভিতর জোড়ালো ক্রোধ মিশে। তিনি তীব্র কন্ঠে বললেন,
“হসপিটাল থেকে ফোন করে বলল, তুমি ডাক্তারের পারমিশন ছাড়া হসপিটাল থেকে বেরিয়ে গেছো। তুমি এখানে কেন এসেছো—আমি সেটা জানতে চাই না। আমি শুধু একটা কথাই বলব, এখনই তুমি আমাদের সাথে বাড়ি ফিরে যাবে।”
ঘরের সবাই নড়েচড়ে উঠল। সুমি বেগমের চোখে চিন্তার ছাপ। পিয়াস একটা মৃদু শ্বাস নিয়ে মুস্তাকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“না, আব্বু! মামিদের এতো বড় বিপদের দিনে আমি কি করে বসে থাকতে পারি? আমি ডাক্তারদের বলেছি—আমি ঠিক আছি। আমি তো সত্যি এখন অনেকটা সুস্থ। আর তাই আমি এখানে চলে এসেছি। আমি ইফতিয়াকে খুঁজে বের করব।”
মুস্তাক সিকদার ভ্রু কুঁচকে কটু স্বরে বললেন,
“পিয়াস, তুমি অসাবধান হয়ে গেলে আবারও তোমার ক্ষতি হবে। তোমার শরীরটা এখনো পুরো ঠিক হয়নি। তুমি নিজেকে ঝুঁকির মুখে ফেলছ। আমি তোমার জন্য ভয় পাচ্ছি। তুমি আমাদের সন্তান। তোমার ভালো মন্দের চিন্তা আমাদের হয়।।”
হঠাৎ ইফতিয়াক সাহেবরা থানায় দীর্ঘ সময় কাটিয়ে ক্লান্ত মুখে বাড়িতে ফিরে এলেন। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই খুশি বেগম স্বামীকে দেখে আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি কান্নাভেজা চোখে দৌড়ে গিয়ে ইফতিয়াক সাহেবের হাত ধরে বললেন,
“তুমি ফিরে এসেছো, কিন্তু আমার মেয়ে কই?”
ইফতিয়াক সাহেব স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন। তার চোখে ক্লান্তি, মুখে উৎকণ্ঠা, কিন্তু তবুও তিনি তার পরিবারকে শক্তি দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
সাখাওয়াত সাহেবের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা পিয়াসের দিকে। তিনি অবাক হয়ে বললেন,
“একি পিয়াস! তুমি এই অবস্থায় এখানে?”
ঘরটা মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই সাখাওয়াত সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল। পিয়াস মাথা নিচু করে দৃঢ় কন্ঠে বলল,
“হ্যাঁ বড়মামা, আমি এসেছি। আমার অবস্থা যেমনই হোক, আপনাদের পরিবারের এই বিপদের সময় আমি কীভাবে দূরে থাকি? আমি খুঁজে আনব ইফতিয়াকে।”
সাখাওয়াত সাহেব পিয়াসের কাঁধে হাত রাখলেন। পিয়াস গম্ভীর চোখে সাখাওয়াত সাহেবের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“থানা থেকে কি বলল, বড়মামা?”
সাখাওয়াত সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে বললেন,
“তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। শুনলাম একটা নারী পাচার চক্র আছে। পুলিশ তাদের ধরার চেষ্টা করছে। আমি ভয় পাচ্ছি, মেয়েটা এমন কারো পাল্লায় পড়ে যায়নি তো।”
এই কথা শুনতেই খুশি বেগম বুক চাপড়ে আরও জোরে কেঁদে উঠলেন,
“হায় আল্লাহ! আমার মেয়েটা…”
ইফতিয়াক সাহেব স্ত্রীর কাঁধ চেপে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করলেন,
“চুপ করো, আল্লাহর নামে ধৈর্য ধরো। আমরা সবাই আছি, ইনশাআল্লাহ ওকে খুঁজে পাব।”
ঘরে কান্নার স্রোত আরও ভারী হয়ে উঠল। হঠাৎ পিয়াস বলল,
“কিছু মনে না করলে একটা কথা বলতাম?”
ঘরে সবার দৃষ্টি একসাথে তার দিকে ঘুরে গেল।
সাখাওয়াত সাহেব গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বললেন,
“বলো, পিয়াস।”
পিয়াস একটু সময় নিয়ে, সবার মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
“জনবহুল জায়গা থেকে এভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া সহজ না। যদি না, সে নিজে থেকেই কারো সাথে যায়। খুশি আন্টি আর তিশা! আপনারা সত্যি করে বলেন, ইফতিয়া কি কারো সাথে কোনো এফেয়ারে জড়িত ছিল?”
কথাটা শোনার সাথে সাথে খুশি বেগম আঁতকে উঠলেন। তার কান্না হঠাৎ আরও তীব্র হয়ে উঠল, কিন্তু মুখ থেকে একটি শব্দও বেরোল না। তিনি কেবল হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন।
তিশা ফ্যাকাশে মুখে বসে ছিল। সে কান্নাভেজা গলায় ধীরে বলল,
“এফেয়ারে ছিল কিনা আমি জানি না। তবে, ফারু আপুদের বিয়ের দিন থেকে আমি আপুকে একজনের সাথে অনেক কথা বলতে দেখেছি। ওদের মধ্যে কি চলছিল বুঝিনি।”
সকলে স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রত্যেকে একে অপরের দিকে তাকাল। পিয়াস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তিশার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কার সাথে কথা বলত, তুমি কি জানো?”
তিশা চোখ মুছে উত্তর দিল,
“না ভাইয়া! আমি ঠিক চিনতে পারিনি।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। ঠিক তখনই ফারিন ধীরে ধীরে বলল,
“আমি হয়তো জানি।”
সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। পিয়াস এগিয়ে এসে কণ্ঠ নিচু করে বলল,
“ফারিন! তুই যা জানিস, সেটা এখনই বল। এই মুহূর্তে প্রতিটা তথ্য খুব জরুরি।”
ফারিনের ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে একবার খুশি বেগমের মুখের দিকে তাকাল, তারপর নিচু চোখে বলল,
“গায়ে হলুদের দিন তোমার পার্টির দুটো ছেলে, আশিস আর জিসান, আমাকে আর ইফতি আপুকে অনেক ডিস্টার্ব করছিল। আশিসকে আমি তোমার ভয় দেখিয়েছিলাম, তাই ও আর কিছু বলেনি আমাকে। কিন্তু, ইফতি আপু কি করেছে আমি জানি না। আমার মনে হচ্ছে, ইফতি আপু ওই ছেলেটার সাথেই কোথাও একটা চলে গিয়েছে।”
খুশি বেগম বুক চাপড়ে কেঁদে উঠলেন,
“না! আমার মেয়ে এমন কিছু করতে পারে না।”
পিয়াসের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বলল,
“আশিস আর জিসান! আমি ওদের খুব ভালো করে চিনি। যদি ওরা এর সাথে জড়িত থাকে, তবে আমি ওদের ছাড়ব না। ওরা যেখানে থাকুক না কেন, আমি খুঁজে বের করব।”
শাহরুখের ফোনে কল এলো। সে কলটা রিসিভ করে কথা বলল। তারপর কল কেটে বলল,
“শেরাজ ব্রো’রাও এসেছে। তারা থানায় গিয়েছে। আমাদের এক্ষুনি যাওয়া উচিত।”
পিয়াস মাথা নাড়ল। দুজনে একসাথে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সুমি বেগম ছেলেকে সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
“তুমি এই অবস্থায় কোথাও যাবে না।”
পিয়াস তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মা, তুমি শুনলে না? আমার পার্টির ছেলে ওরা। এখানে আমার একটা দায়িত্ব আছে। এখন ইফতিয়াকে ফিরিয়ে আনাটাই আমার প্রথম দায়িত্ব।”
সুমি বেগম কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মুস্তাক সিকদার এগিয়ে এসে বললেন,
“ওকে যেতে দাও।”
তিনি পিয়াসের উদ্দেশ্যে বললেন,
“পিয়াস! আমরা জানি তুমি যা করছ—সঠিকই করছে। তবে সাবধানে থাকো।”
পিয়াস ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। শাহরুখও পেছন থেকে তার হাত পিয়াসের কাঁধ স্পর্শ করে বলল,
“চল, ভাই।”
সুমি বেগম চোখে জল ধরে বললেন,
“সাবধানে যেও। ওকে ফেরত এনো, পিয়াস। এই মা অপেক্ষা করবে তোমাদের।”
পিয়াস একটি মৃদু হাসি দিয়ে মায়ের কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর শাহরুখকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
থানায় এসে পৌঁছাল তারা। শেরাজরা সকলে সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত। সুমুকে রাগানোর পর সে সোজা তার বন্ধুদের নিয়ে ইফতিয়াকে খোঁজার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে এসেছে। পিয়াস রাহিনকে দেখে রেগে গেলেও প্রকাশ করল না।
শেরাজ আর পিয়াস থানার ওসির সাথে কথা বলল। হঠাৎ পিয়াস বলল,
“আমার ধারণা ওরা এই পাচারকারীদের সাথে যুক্ত। আপনারা গোপালগঞ্জ শেষ সিমান্তে ফোর্স পাঠান। আমরা একটা কাজ শেষ করে আসছি।”
ওসি পিয়াসের কথায় ফোর্স পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। পিয়াসরা উঠে বাহিরে চলে গেল। সে শেরাজের উদ্দেশ্যে বলল,
“তেঁতো সম্পর্ক হলেও, এখন আমাদের লক্ষ এক।”
শেরাজ মাথা নাড়ল। পিয়াস একটু ভেবে বলল,
“চলো! একটা জায়গায় যাব।”
সকলে মিলে একসাথে গাড়িতে উঠে পড়ল। দশ মিনিটের মাথায় তারা এসে পৌঁছাল জিসানের বাড়ির সামনে। কিন্তু বাড়িতে জিসান না থাকায় তারা আশিসের বাড়িতে গেল। আশিস পিয়াসদের দেখে পালাতে গেলে, শাহরুখরা তাকে ধরে ফেলল।
পিয়াস এগিয়ে এসে আশিসকে জিজ্ঞাসা করল,
“জিসান আর ইফতিয়ার সম্পর্কে কি জানিস? আর ওরা এখন কোথায়?”
আশিস মুখ খুলল না। পিয়াস তার ধৈর্যের সীমা পার করে বেধড়ক মারতে শুরু করল আশিসকে।
মার সহ্য করতে না পেরে আশিস অবশেষে মুখ খুলল,
“জিসানের সাথে ইফতিয়ার এফেয়ার আছে। আর আজ সন্ধ্যার পরও আমি ওদের একসাথে ঘুরতে দেখেছি।”
পিয়াস চোখে অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে বলল,
“আর কিছু জানিস জিসানের ব্যাপারে?”
আশিস হালকা কণ্ঠে জানাল,
“আমি তেমন কিছু জানিনা। কিন্তু কিছুদিন আগে আমি জিসানের কাছে অনেক টাকা দেখেছিলাম। ওকে যখন আমি জিঙ্গাসা করলাম, ও এতো টাকা কোথা থেকে পেয়েছে। তখন ও আমাকে বলল, ও একটা কাজ করে আর সেখান থেকে এতো টাকা পেয়েছে। কাজে কথা জিঙ্গাসা করতেই, ও ব্যাপারটা এড়িয়ে গিয়েছিল।”
“জিসান এখন কোথায় বলতে পারবি?”
“শিওর জানিনা। তবে কাল ও বলেছিল, আজরাতে ও কোনো একটা জরুরী কাজের জন্য কিছুদিনের জন্য ঢাকাতে যাবে।”
“তাহলে তুই যখন জিসান আর ইফতিয়াকে সন্ধ্যায় একসাথে দেখলি, ওদের কোনো প্রশ্ন করিসনি কেন?”
“কিছু জিঙ্গাসা করার আগেই তো দুজনে গায়েব হয়ে গেল।”
পিয়াস ছেড়ে দিল আশিসকে। শাহরুখের থেকে কিছু টাকা নিয়ে সে আশিসের হাতে দিয়ে বলল,
“ট্রিটমেন্ট করিয়ে নিস।”
আশিস হালকা মাথা নাড়ল। পিয়াসরা বাহিরে বেরিয়ে এলো।
সকলে গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। শেরাজের তীক্ষ্ম বুদ্ধি আর পিয়াসের সজাগ মনোশক্তি একত্রিত হয়ে কাজ করতে শুরু করল। দুজনের ধাঁধাঁ মেলানোর ফলে, সবটা দ্রুত তাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেল।
কোথায় ইফতিয়া থাকতে পারে, কারা তাকে তুলে নিয়েছে—সবই তারা মুহূর্তের মধ্যে আন্দাজ করতে পারল। দুয়ে দুয়ে চার করতে তাদের বেশি সময় লাগল না।
শেরাজ ধীর কণ্ঠে বলল,
“পিয়াস, আমরা যদি ঠিকমতো প্ল্যাণ করে কাজ করি, তাহলে ইফতিয়াকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব।”
পিয়াস চোখে দৃঢ়তা নিয়ে উত্তর দিল,
“ঠিক বলেছ। এবার আর দেরি নয়। তাড়াতাড়ি চলো।”
গোপালগঞ্জ জেলার শেষ সীমান্তের কাছে সিভিল পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়েছে। রাতের অন্ধকারে ছোট ছোট আলো জ্বলছে, রাস্তার পাশে পুলিশ দাঁড়িয়ে তল্লাশি করছে। গাড়ি একে একে থামছে, পুলিশ ভ্যান থেকে নামছে, চালক ও যাত্রীদের পরিচয়পত্র পরীক্ষা করছে।
পিয়াস, শাহরুখ আর শেরাজরা একটি প্রাইভেট কারে চুপচাপ বসে আছে। পিয়াসের চোখ তীক্ষ্ম, চারপাশের প্রতিটি গাড়ি সে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছেন। শেরাজ তার পাশে বসে আছে।
হঠাৎ এক পুলিশ একটা গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“এই গাড়ি কোথায় যাচ্ছে?”
লোকগুলো নিজেদের পরিচয় দিল। পুলিশ তাদের গাড়ি ছেড়ে দিল। হঠাৎ একটা ট্রাকের শব্দ ভেসে এলো। পুলিশরা সকলে আড়ালে চলে গেল।
গাড়ি চেকপোস্ট অতিক্রম করে রাস্তার মোড়ে যেতেই পুলিশরা গাড়িটা ঘিরে ধরল। ট্রাকের হেডলাইট সরাসরি পুলিশদের গাড়ির দিকে পড়ল। ট্রাকের ড্রাইভার হঠাৎ ব্রেক মেরে গাড়ি থামাল। ট্রাক থেকে গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে নামল জিসান। সে পুলিশের সামনে নিজের নকল পরিচয়পত্র বের করে দিতেই পিয়াস পেছন থেকে এসে তার কাঁধে হাত রাখল। জিসান পেছন দিকে তাকাতেই পিয়াস তার মুখ বরাবর একটা ঘুষি মারল। পিচঢালা রাস্তার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ল জিসান। জিসানের সাথে থাকা লোকগুলোকে আটক করল পুলিশ। পিয়াস তাকে টেনে তুলে গাছমা টান মেরে খুলে ফেলে বলল,
“তুই কি ভেবেছিস, তুই মুখ ঢেকে এলে আমি তোকে চিনতে পারব না?”
জিসান কিছু বলার আগেই পিয়াস তাকে মারতে শুরু করল। অফিসাররা এসে তাকে থামাল। পিয়াস গর্জে উঠে বলল,
“ইফতিয়া কোথায় বল?”
জিসানের অবস্থা কাহিল। সে কোনোমতে বলল,
“গাড়ির পেছনে।”
পিয়াস আর একমুহূর্তও দাঁড়াল না। সে গিয়ে ট্রাকের পেছনের দরজা খুলতেই তার চোখ কপালে উঠল। ট্রাকের ভেতর অজ্ঞান অবস্থায় মোট ছয় জন মেয়ে। তাদের মধ্যে একজন ইফতিয়া।
পিয়াসের রাগ ছুঁয়ে যায় শীর্ষে। সে এসে আবারও মারতে লাগল জিসানকে। শেরাজ এসে থামাল তাকে। সে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের দিকে ইশারা করে বলল,
“ওফিসার, ভেতরে সবাই অজ্ঞান। ওদের বের করার ব্যবস্থা করেন।”
পিয়াস আবারও ট্রাকের দিকে ছুটে গেল। ট্রাকের পেছন থেকে পিয়াস ধীরে ধীরে ইফতিয়াকে কোলে তুলে নামাল। তার চোখে রাগ আর উদ্বেগ মিশে আছে। ইফতিয়াকে রাস্তার পাশে শুইয়ে দিয়ে সে পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“অফিসার, বাকিদেরও দ্রুত নিরাপদ স্থানে আনার ব্যবস্থা করুন।”
পাশে দাঁড়িয়ে শেরাজও পুলিশকে নির্দেশ দিচ্ছিল।
অফিসাররা দ্রুত ট্রাকের দিকে এগোলো। একে একে অজ্ঞান অবস্থায় থাকা মেয়েদের বাইরে বের করা শুরু হলো।
শাহরুখ দ্রুত গাড়ি থেকে পানি নিয়ে এল। পিয়াস পানির বোতল খুলে ইফতিয়ার মুখের ওপর ছিটিয়ে দিল। পানি লাগতেই ইফতিয়ার সেন্স ফিরে এলো। সে ধীরে চোখ মেলে তাকালো।
পিয়াস রাগমিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“এখানের কাউকে তুমি চেনো, মেয়ে? একটা ছেলে প্রপোজ করল, আর তুমি লাফাতে লাফাতে প্রেমে পড়লে। কতোদিন ধরে চেনো তাকে, যে দেখা করতে চলে এলে। ইচ্ছে তো করছে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পর মারি।”
ইফতিয়া কেঁদে কণ্ঠ আস্তে করে বলল,
“তো আমি আর কি করতাম? কেউ আমাকে ভালোবাসেনা। দেখুন, এই যে দাঁড়িয়ে আছে শেরাজ খান। ওনাকে আমি ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু উনি আমাকে ভালোবাসলেন না। এরপর আরিয়ান চৌধুরী আর রায়য়ান চৌধুরী দুজনকেই দেখে মনে হলো, ওদের মধ্যে একজন হয়তো আমাকে ভালোবাসবে। কিন্তু বিয়ের দিন রাতে বুঝলাম, দুজনই সুমুকে ভালোবাসে। কেন বলেন? কেন সবাই ওকেই ভালোবাসে? আমি কি ভালোবাসার যোগ্য নই? দেখুন, আমি সুমুর থেকে বড়। কিন্তু আজ সুমুর কি নেই। ওর একটা লাভিং, কেয়ারিং ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে, কিছুদিন পর বাচ্চা হবে, সুখের জীবন ওর। কিন্তু আমার কি আছে? কিছু নেই। এই জিসান নামের ছেলেটা বলল, সে আমাকে ভালোবাসে। আমি বিশ্বাস করিনি, কিন্তু হঠাৎ করে আমি ওর সাথে সম্পর্ক জড়ালাম। আজ দেখুন, ও আমাকে মিথ্যা ভালোবাসা দেখিয়ে পাচারকারীদের হাতে তুলে দিচ্ছিল। আমার কি দোষ? একটা পুরুষের একটুখানি যত্ন আর ভালোবাসার কাঙাল আমি। আর তাই ওর মিথ্যা ভালোবাসায় ভুলে গিয়েছিলাম।”
পিয়াস চুপচাপ শুনল। সে একটু সময় নিয়ে আনমনে বলল,
“মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো—কেউ তোমার অর্ধেক হয়েও, তোমার না হওয়া।”
তাদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে শেরাজ আইয়ুবকে চাপাস্বরে বলল,
“একটা নতুন কাপলকে দেখতে পাচ্ছি আজ।”
আইয়ুব বুঝতে পারল শেরাজের কথার মানে। সে আলতো হেসে পিয়াদের দিকে তাকিয়ে রইল।
রাত প্রায় তিনটা। সুমু শেরাজের অপেক্ষায় ছাদে দাঁড়িয়ে। বাতাস অনেক ঠান্ডা, চাঁদের আলো সাদা কুয়াশার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। সে বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে। শেরাজের দেরি তাকে অস্থির করে তুলছে।
হঠাৎ সুমুর মনে হলো, তার পেছনে কেউ আছে। কণ্ঠরোধী ভয় আর আগ্রহের মিশ্রণে সে ধীরে ধীরে পেছনে তাকিয়ে দেখল, আরিয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
সুমুর হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে গেল। সে নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করে ধীরে ধীরে বলল,
“আপনি এখানে কী করছেন?”
আরিয়ান কেবল শান্তভাবে তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। সুমু ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেল। আরিয়ান হঠাৎ ধীর কণ্ঠে বলল,
“আমি তোমার জন্য এখানে এসেছি, বেবিগার্ল।”
সুমুর চোখ বড় হয়ে গেল। হৃদয় আরও দ্রুত ধুকপুক করতে লাগল। সে চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু আরিয়ান হঠাৎ তার পথ আটকে দাঁড়ালো।
“একটু থাকো না, বেবিগার্ল। তোমার সাথে অনেকদিন কথা হয়নি।”
সুমু রাগিস্বরে বলল,
“আপনি এখানে এসে কি চাইছেন?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বলল,
“শুধু তোমার কথা শুনতে। শুধু তোমার কাছে থাকতে।”
সুমুর মেজাজ গরম হয়ে গেল। চোখ জ্বলে উঠল। সে কণ্ঠে রাগ আর হতাশার মিশ্রণে বলল,
“আমি বিবাহিত, এইটা কবে বুঝবেন? আমি যে অন্য কারো, এইটা কবে বুঝবেন?”
আরিয়ান শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আমি জানি। আমি শুধু…”
সুমু হঠাৎ তার কথা থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনি যদি জানেনই, তবে কেন আমার হয়রানি করছেন? আমার জীবনকে জটিল করছেন?”
আরিয়ান ধীরে ধীরে সুমুর দিকে তাকাল,
“বেবিগার্ল! তুমি জানো কি, আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস, আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন, তোমার জন্য আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। যতই সময় কাটুক, যতই জীবন আমাকে পরীক্ষা করুক, আমার প্রতি নিঃশ্বাসের সঙ্গে তোমার প্রতি ভালোবাসা আরও প্রগাঢ় হয়। আমি যতই চেষ্টা করি, তোমার ছায়া থেকে দূরে থাকতে, সেটা সম্ভব নয়। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি ভাবনায়, তুমি আমার ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা বাড়ে।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান একধাপ এগিয়ে এসে বলল,
“বেবিগার্ল! তোমাকে কেন আমি পেতে পারি না?”
সুমু তার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল,
“খান সাহেবের বউ হওয়ার পর আমি এতোটাই এক্সপেনসিভ হয়েছি যে, আমাকে সবাই এফোর্ট করতে পারেনা।”
আরিয়ান হেসে বলল,
“আমি কি হ্যান্ডসাম নই? আমার কি ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স নেই, বেবিগার্ল?”
সুমু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি যতই সুন্দর, হ্যান্ডসাম বা ধনী হন না কেন, আমি আমার খান সাহেবের জন্য এই পৃথিবীর সব সুন্দর, সব ধনী আর সব বুদ্ধিমান ছেলেকেই ইগনোর করার ক্ষমতা রাখি।”
আরিয়ান তাকিয়ে রইল। তার চোখে কষ্টের ছাপ ফুটে উঠল। হঠাৎ বাহিরে গাড়ির শব্দ পেতেই সুমু ছাদ থেকে নেমে গেল।
ভোরবেলায় সুমুর ঘুম ভেঙে গেল। পাশে হাত বাড়াতেই খালি বিছানা। সুমু চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, শেরাজ নেই। সে ধীরে উঠে বসল। বেড থেকে নেমে ওড়না গলায় জড়িয়ে বেলকনির দিকে এগোল।
সেখানে দাঁড়িয়ে সে দেখল, শেরাজ এক্সারসাইজ করছে। পরনে কফি কালারের টি-শার্ট, ঘামে শরীর ভিজে একাকার। তার হাতে থাকা ডাম্বেল বারবার উঠছে-নামছে, আর প্রতিবারই তার হাতের পেশি ফুলে উঠছে। শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শেরাজের শক্ত আর ভেইনি হ্যান্ড যেন আলাদা এক আকর্ষণ ছড়াচ্ছে।
সুমুর চোখ আটকে রইল সেই দৃশ্যে। বুকের ভেতর কেমন যেন গরম হয়ে উঠল। তার অস্থির লাগতে শুরু করল। সে ঘেমে উঠল। এমন অবস্থায় সে আর দাঁড়িয়ে না থেকে, তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে বাতাস করতে করতে রুমে ঢুকে গেল।
ঠিক তখনই সুমুর পায়ের শব্দ কানে এল শেরাজের। সে ধীরে পেছনে তাকাল। সে ডাম্বেল রেখে ধীরে ধীরে সুমুর পেছন পেছন রুমে এলো।
সুমু এসে সোফায় বসল। তার পরনে পার্পেল কালারের আনারকলি, চোখেমুখে এখনও ঘুমের ছাপ। শেরাজকে দেখে সুমু হঠাৎ লজ্জায় মুখ সরিয়ে নিল। এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে এসির টেম্পারেচার বাড়িয়ে দিল।
শেরাজ ঠোঁট বাঁকিয়ে দুষ্টু হেসে উঠল। তারপর সোফার পেছনে গিয়ে দু’হাত শক্ত করে হাতলে ঠেকিয়ে দাঁড়াল। সুমু ধীরে মাথা তুলে তাকাল। মুহূর্তেই তাদের চোখ একে অপরের দিকে আটকে গেল। চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
শেরাজ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে ফিসফিস করে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৭২
“সুইটহার্ট, সকাল সকাল এসি বাড়িয়ে কী লাভ হবে বলো তো? আমার হটনেস দেখে যে তুমি হট হয়ে গেছ, সেটা তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।”
সুমুর বুকের ভেতর কাঁপন উঠল। সে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়ে ধীরে বলল,
“আপনি খুব বেশি কথা বলেন, খান সাহেব।”
শেরাজ মাথা ঝুকিয়ে আরও কাছে এলো। তার কণ্ঠস্বর গাঢ় হয়ে গেল,
“আজ এই বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান আছে। রাতে রেডি থেকো।”
সুমু চোখ তুলে তাকাল। তার সেই দৃষ্টির ভেতর লাজ আর ভালোবাসা মিশে রইল। দুজন আবারও নিঃশব্দে ডুবে গেল দুজনের চোখের গভীরে।
