Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৭৪

খান সাহেব পর্ব ৭৪

খান সাহেব পর্ব ৭৪
সুমাইয়া জাহান

গভীর রাত। শেরাজদের বাড়ির আলো নিভে গেছে। সকলে ঘুমে ডুবে। কিন্তু নীরবতার মাঝেই যেন এক অদ্ভুত স্রোত বইছে। রুমের কাঁচঘেরা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে ঠান্ডা বাতাস আর চাঁদের আলো মেঝেতে রুপালি ছায়া আঁকছে।
শেরাজের হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। সে বিছানায় উঠে বসল। পাশেই নিদ্রিত সুমু, শান্ত, নির্ভার আর তার মুখে ভোরের শিশিরের মতো কোমলতা। শেরাজের চোখ সেই মুখের দিকেই নিবদ্ধ হয়ে রইল। হঠাৎ এক অদ্ভুত ভয় আর টান একসাথে অনুভূত হলো তার বুকের ভেতর।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে সে বিছানা থেকে নেমে জানালার কাছে গেল। বাইরের অন্ধকারে তাকিয়েই যেন ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতা আরও বেড়ে উঠল। কারও অদৃশ্য উপস্থিতি যেন অনুভব করল সে।
হঠাৎ, গার্ডেন থেকে হালকা শব্দ ভেসে এলো তার কানে। শেরাজের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। মুহূর্তেই তার সজাগ চেহারাটা সামনে এলো। এতো রাতে অন্ধকারে কারো গার্ডেনের আশেপাশে থাকাটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক লাগল না তার কাছে।
সে ধীরে দরজার দিকে এগোলো। পিছন ফিরে আবার একবার সুমুর দিকে তাকাল। একটু সময় নিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“সুইটহার্ট, তুমি শান্তিতে ঘুমাও। আমি আছি।”
এরপর সে হুডি তুলে নিল। দরজা খুলে নীরবে বের হয়ে গেল, অচেনা অন্ধকারের মুখোমুখি হতে।

গার্ডেনে আলিশা একা দাঁড়িয়ে। চারপাশে পার্টির সাজানো আলো এখনো ঝলমল করছে। কাগজের লণ্ঠন, ঝুলন্ত ফেয়ারি লাইট, আর চারদিকে ছড়ানো গোলাপের পাপড়ি—সব মিলিয়ে যেন এক রোমান্টিক জগত। গার্ডেনের মাঝখানে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ব্যবস্থা করেছে আলিশা। টেবিলের ওপর রাখা দু’টি ওয়াইন গ্লাস আর সুগন্ধি মোমবাতির আলোতে চারপাশটা যেন অপরূপা সৌন্দর্যের রুপ ধরেছে।
আজ আলিশা সেজেছে রায়য়ানের জন্য। লাল শাড়িতে, খোলা চুলে, চোখে কাজল। তার ভেতর থেকে যেন এক অদম্য আকর্ষণ বের হচ্ছিল। হাতে ফোন নিয়ে সে শেষবারের মতো কল করল। অপরপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই সে ধীরে বলল,

“প্লিজ আর.সি! একবার এসো। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”
মুহূর্তেই হালকা বাতাস বইল, মোমবাতির শিখা দুলে উঠল। ঠিক তখনই গার্ডেনের অন্ধকার কোণ থেকে এক লম্বা ছায়া সামনে এগিয়ে এলো। আলিশা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। কালো হুডি পরে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে রায়য়ান চৌধুরী। তার চোখে এক অদ্ভুত তীব্রতা। আলিশা এগিয়ে এসে থেমে গেল। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আমি জানতাম তুমি আসবে।”
রায়য়ান তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো মোমবাতির আলোর কাছে। গার্ডেনের টেবিলের চারপাশে নরম আলো ছড়িয়ে আছে। মোমবাতির শিখা হাওয়ায় দুলছে। আলিশা সাহস সঞ্চয় করে ধীরে রায়য়ানের সামনে দাঁড়াল। সে কিছুক্ষণ নীরব থেকে মৃদু হাসল। তারপর কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আর.সি! আজ আমি আমার মনের সব কথা বলতে তোমাকে চাই। আমি তোমাকে ভালোবাসি, অনেকদিন ধরে। তুমি হয়তো বুঝেছো, হয়তো না। কিন্তু আমি আর লুকাতে পারছি না। আজ তোমার সামনে আমার সব অনুভূতি খুলে দিলাম।”

কথাগুলো বলেই সে নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করল। তার চোখে একবিন্দু আশা ঝলমল করছে। রায়য়ান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল, চোখে গভীর অন্ধকার নেমে এলো। মোমবাতির আলোয় তার মুখে তীব্রতা স্পষ্ট হলো। ধীরে সে বলল,
“আলিশা! তুমি ভুল জায়গায় তোমার হৃদয় রেখেছো। আমি তোমাকে সেইভাবে দেখি না। আমি যদি আজ কারও জন্য বেঁচে থাকি, আর কারও জন্য মরতে পারি—সে তুমি নও।”
আলিশা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“তাহলে কার জন্য?”
রায়য়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে সরাসরি উত্তর দিল,
“সুমু। আমার সুহাসিনী”

আলিশার বুকের ভেতর যেন বজ্রাঘাত হলো। তার চারপাশের সবকিছু যেন শূন্য মনে হতে লাগল। মোমবাতির আলোতে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। গার্ডেনের শীতল হাওয়া বয়ে যেতে লাগল। আলিশা হঠাৎ এগিয়ে এসে রায়য়ানের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে জল চিকচিক করছে। সে ধীরে বলল,
“কিন্তু সুমু তো তোমাকে ভালোবাসে না, আর.সি। ও একটা বিবাহিত মেয়ে। আর.সি! তুমি কেন ওর পেছনে পড়ে আছো? আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। তুমি কেন আমার ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছো না?”
তার ঠোঁটের কোণ কেঁপে উঠল। গলায় জমে থাকা সমস্ত আবেগ যেন একসাথে বেরিয়ে এলো। চারপাশের গোলাপের পাপড়িগুলো হাওয়ায় উড়ে পড়ল, মোমবাতির আলো হঠাৎ নিভে যাওয়ার মতো কেঁপে উঠল।
রায়য়ান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। সে হাতের মুঠো শক্ত করে দাঁড়াল। তার চোখে এখন এক তীব্র যন্ত্রণা আর দোষবোধের ছাপ। সে ধীরে বলল,

“আলিশা! ভালোবাসা তো কোনো যুক্তি মানে না। আমি জানি সুমু বিবাহিত। আমি জানি ও আমার হবে না। তবুও আমি তাকে ভুলতে পারছি না। তুমি হয়তো আমাকে ভালোবাসো, কিন্তু আমার হৃদয় অন্য কারো জন্য।”
আলিশা আরেক পা এগিয়ে এসে রায়য়ানের হাতটা ধরে বলল,
“আমাকে ভালোবাসো, আর.সি। আমাকে ভালোবাসলে আমাদের একটা সুন্দর সংসার হবে। আমরা দু’জনে মিলে একেবারে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারব, আর.সি। আমাদের জীবনটাও স্বপ্নের মতো হবে।”
রায়য়ান নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের গভীরে ক্লান্তি আর যন্ত্রণা স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে আলিশার হাতটা ধীরে ধীরে ছেড়ে দিয়ে নিম্ন গলায় বলল,
“আলিশা! তুমি যা চাইছো তা আমি দিতে পারব না। আমি চেষ্টা করলেও তোমাকে ভালোবাসতে পারব না। আমার ভেতরটা অন্য কারও জন্য। যাকে আমি কখনো পাব না। তোমাকে নিয়ে সংসার করা মানে তোমার প্রতি অন্যায় করা। তোমার এটা প্রাপ্য নয়। আমাকে ভালোবাসা মানে সারাজীবনে জন‍্য কষ্ট। আমাকে তুমি কোনোদিনও পাবেনা। শুধু শুধু কেন এই দহনে জ্বলছো তুমি? ভুলে যাও আমাকে। তাহলে তুমি ভালো থাকবে।”
আলিশার ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল,

“আমি তো শুধু তোমাকে চাই।”
রায়য়ান তার দিকে তাকাল, তারপর মুখ ঘুরিয়ে অন্ধকারের দিকে হাঁটতে লাগল। আলিশা হঠাৎ পেছন থেকে এক নিঃশ্বাসে কষ্টগুলো উজাড় করে দিল,
“আমি জানতাম না ভালোবাসা এতটা নিষ্ঠুর হয়, আর.সি। আমি ভেবেছিলাম, তুমি একদিন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝবে আমি কতটা তোমার জন্য পাগল। কিন্তু আজ তুমি আমাকে বুঝিয়ে দিলে, একতরফা ভালোবাসার স্বপ্নগুলো সব ভাঙার জন্যই হয়।”
রায়য়ান দাঁড়িয়ে পড়ল। আলিশা আবারও বলল,
“তুমি যাকে ভালোবাসছো, সে তো তোমার দিকে ফিরেও তাকায় না। আর আমি, আমি তো তোমার জন্য সবকিছু দিতে রাজি ছিলাম। আমার ভালোবাসাটা কি এতো তুচ্ছ, আর.সি?”
আলিশা একটু থেমে আবারও বলল,

“তুমি বলছো, তুমি আমাকে ভালোবাসতে পারবে না। কিন্তু আমি? আমি কীভাবে বাঁচব তোমাকে ছাড়া? তোমার একটুখানি ভালোবাসা পেলে আমি পুরো দুনিয়াকে ভুলে যেতে পারতাম। কিন্তু তুমি তো আমার ভালোবাসকে মেনে নিচ্ছো না আর.সি।”
দমকা হাওয়ায় গার্ডেনের চারপাশে সব মোমবাতির আলো নিভে গেল, শুধু টেবিলে রাখা কয়েকটা মোমবাতির শিখা দুলছে। আলিশা দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের জল গাল বেয়ে নেমে আসছে। সে ভাঙা কণ্ঠে আবারও বলল,
“আর.সি! তুমি জানো না আমি কতদিন ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। তোমার একটুখানি ভালোবাসার আশায় আমি কত রাত ছটফট করে কাটিয়েছি। আমি স্বপ্ন দেখতাম তুমি আর আমি একদিন একসাথে থাকব। আমি তোমাকে খুশি করব, সংসার করব, আমরা একসাথে বৃদ্ধ হব। আর আজ তুমি আমাকে বলছো তুমি পারবে না। তুমি জানো, তোমার বলা এই কথাটা আমাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলছে। আমি কি এতটাই তুচ্ছ তোমার চোখে, আর.সি?”
রায়য়ান কিছু বলল না। সে চুপচাপ দূরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আলিশা কাঁদতে কাঁদতে আবারও বলল,

“তুমি কেন এমন করছো? আমি তো তোমার থেকে একটু ভালোবাসা চেয়েছিলাম।”
রায়য়ানের কোনো শব্দ নেই। সে কেবল শীতল নীরবতা। আর তার সেই নীরবতায় আলিশার কান্নার শব্দকে আরও তীব্র করে দিল। আলিশা কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে এলো।
“তুমি জানো না, আমি তোমাকে কতটা চাই। আমি স্বপ্ন দেখেছি আমাদের সংসারের, আমাদের হাসির, আমাদের ছোট ছোট খুশির। আর তুমি? তুমি আমাকে রিজেক্ট করছো। তুমি কি কিছুই শোনো না আর.সি? তুমি কি দেখতে পাওনা আমার কষ্ট?”
সে নিজের হাত চোখ মুছতে মুছতে বলল,

“আমি শুধু চাই তুমি আমাকে একটু ভালোবাসো, শুধু একটুই। আমি কি বেশি খুব চেয়েছি?”
রায়য়ান একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে কোনো আবেগ নেই। আলিশা আরও কাছে এগোতে চাইল, কিন্তু রায়য়ান এক পা দূরে চলে গেল, যেন সে আলিশার কষ্টকে একেবারেই অনুভব করতে চায় না।
আলিশা হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে গার্ডেনের মাঠে বসে পড়ল। রায়য়ান চুপচাপ ফিরে গেল বাড়ির ভেতরে। তার পেছনে আলিশার হাহাকার ও নিঃশ্বাসের শব্দ বাতাসে মিশে গেল।
দূরে দাঁড়িয়ে সব দৃশ্যটা লক্ষ্য করল শেরাজ। সবটা দেখার পর শেরাজ নিজেও চলে গেল।
গার্ডেনে শুধু আলিশার কাঁদার শব্দ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। সে কাঁদতে কাঁদতে নিজের কষ্টকে আড়াল করতে চাইল। তার প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, কতো গভীরভাবে একা সে। চারপাশের সাজানো আলো, ক্যান্ডেল, সবকিছুই যেন তার ব্যথাকে আরো গভীর করে তুলল। আলিশা নিজের বুকের ওপর হাত চেপে ধরল। সে আর কষ্ট চেপে না রাখতে পেরে, গগন ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। তার বুকফাটা চিৎকার মুহূর্তের জন্য রাতের নিস্তব্ধতাকে ছিঁড়ে ফেলল। গার্ডেনের বাতাস থমকে গেল, যেন গাছের পাতারাও কেঁপে উঠল সেই হাহাকারে। ক্যান্ডেলগুলোর শিখা দুলে উঠল। চারপাশের সাজানো সৌন্দর্য যেন ব্যঙ্গ করছিল তার ভাঙা হৃদয়কে।
চিৎকারের পর ক্লান্ত হয়ে আলিশা ধপাস করে মাটিতে শুয়ে পড়ল। বুকের ওপর রাখা হাতটা আস্তে আস্তে সরে গেল, আর সে হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁদছে। তার চোখ জোড়া আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেজা চাহনিতে প্রশ্ন করল,
“কেন? কেন সে আমার হইলো না? কেন সে আমারে ভালোবাসলো না? কেন সে আমার মায়ায় বাঁধা পড়ল না? এই একজনমে আমারে ভালোবাসলে কি তার খুব বেশি ক্ষতি হইয়া যাইতো? সে তো অন‍্যকারো হইতেই চায়, তাহলে আমার হইলে ক্ষতি কি ছিল?”
রাত তাকে কোনো উত্তর দিল না। আকাশের তারাগুলোও নিঃশব্দে সাক্ষী হয়ে রইল এক ভাঙা হৃদয়ের বেদনায়।

একটা নতুন দিনের সূচনা হলো। রাতভর কান্নার পরও আলিশার চোখে ঘুম আসেনি। ভোরের হালকা আলো গার্ডেনের ওপর ছড়িয়ে পড়তেই সে ধীরে ধীরে চোখ মেলল। চারপাশে রাতের গলে যাওয়া মোমবাতির অবশেষ অংশ, শুকিয়ে যাওয়া গোলাপের পাপড়ি—সবকিছুই আগের রাতের বেদনার সাক্ষী।
ক্লান্ত চোখ আর ফুলে যাওয়া মুখ নিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। ভোরের ঠান্ডা বাতাসে তার এলোমেলো চুল উড়ছিল। তার মনে হচ্ছিল, কষ্টে ডুবে থাকা এক রাত যেন হঠাৎ করেই তাকে আরও শক্ত করে দিল।
বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছিল সকালের কোলাহল, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ। পৃথিবী যেন স্বাভাবিক ছন্দে চলতে শুরু করেছে, অথচ আলিশার ভেতরটা এখনো অন্ধকার। সে গভীর নিঃশ্বাস নিল, বুকের ভেতর জমে থাকা দমচাপা কান্নাকে আড়াল করার চেষ্টা করল। তারপর ধীরে পায়ে হেঁটে বাড়ির ভেতর চলে গেল।
সকালটা শান্ত। জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল রোদের নরম আলো। হালকা হাওয়ায় পর্দা দুলছিল।
সুমু ধীরে ধীরে চোখ মেলল। দীর্ঘ নিদ্রার পরও তার চোখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল। পাশ ফিরতেই চোখে পড়ল—শেরাজ নেই পাশে। বালিশে এখনো তার গায়ের গন্ধ, তবুও খালি জায়গাটা হঠাৎ করে সুমুর বুকের ভেতর ছোট্ট এক শূন্যতা তৈরি করল।
সে উঠে বসল। হাত দিয়ে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে নিল। তারপর উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল। পানি ছেড়ে হাত তুলে মুখে একটু পানি ছিটিয়ে নিল, তারপর আয়নায় তাকাল। নিজের চোখের ভেতর সে যেন আগের দিনের সব আবেগ আর আনন্দ একসাথে দেখতে পেল। বুকের ভেতর অজানা শিহরণ নিয়ে সে ধীরে ধীরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো।

সে নিচে নামতেই থমকে দাঁড়াল সিঁড়ির মাঝখানে। সকলে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত। সে ধীরে ধীরে নেমে এসে ড্রয়িংরুমে দাঁড়াল। সবাই হাসি–আড্ডায় মশগুল। শেরাজ এক হাতে কফির কাপ ধরে বসে আছে, আরেক হাতে কাগজপত্র উল্টাচ্ছে। তার চোখ সুমুর দিকে পড়তেই সে বলল,
“সুইটহার্ট, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। আজ তোমাদের বাড়িতে যাচ্ছি। আর রাতে শপিং করব। তারপর…”
শেরাজ এক মুহূর্ত থামল, ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে বলল,
“পরশু সন্ধ্যায় আমাদের ফ্লাইট। আমরা আবার ওমান ফিরে যাচ্ছি।”
শব্দগুলো যেন সুমুর কানে ধাক্কা খেলো। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা টান অনুভব করল সে। এই কয়েকটা দিনের হাসি, খুনসুটি, ভালোবাসা—সব ভুলে সুমুর চোখ ভিজে উঠল। কিন্তু কারও সামনে দুর্বল হতে চাইল না সে।
সুমু চুপচাপ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। শেরাজ সুমুর চোখে চোখ রাখতেই বুঝে ফেলল, তার সুইটহার্টের ভেতরে ঝড় বইছে। সে ধীরে কফির কাপ নামিয়ে রাখল। সবার আড্ডা এড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সুমুর হাতটা আলতো করে ধরল।

“চলো, তোমাকে নিয়ে আজকের দিনটা বিশেষ করে তুলব।”
সুমু কান্নাভেজা গলায় বলল,
“এতো তাড়াতাড়ি চলে যাব? আম্মু-আব্বুর সাথে একটুও সময় কাটাতে পারলাম না।
শেরাজ সুমুর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে নিচু স্বরে বলল,
“সুইটহার্ট, আমিও চেয়েছিলাম আরও কিছুদিন থাকতে। কিন্তু ওখানে আমার বিজনেস পড়ে আছে, আমাদের ফিরতেই হবে। আর তাছাড়া এখানে থেকে কোনো লাভ নেই। তাই আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত। আমি, সামিয়া আর নাজমিনের সমস্ত পেপার রেডি করে ফেলেছি। রাহিন কাল সামিয়াকে নিয়ে ওদের বাড়ি থেকে ঘুরে আসবে।”
সুমুর চোখ ভিজে উঠল। সে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে রাখল। শেরাজ আঙুল দিয়ে সুমুর ভেজা চোখের কোণ মুছে দিয়ে বলল,
“তুমি মন খারাপ করো না। আমরা তো আবারও বিডিতে আসব, সুইটহার্ট। আজকের দিনটা তুমি আম্মু-আব্বুর সঙ্গে সময় কাটাতে পারবে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমাদের চ‍্যাম্পরা এসে গেলে, আমি আবারও তোমাকে এখানে নিয়ে আসব। আর শোনো! সামিয়া আর নাজমিনের দিকে তাকাও। তুমি ভেঙে পড়লে, ওদের কে সামলাবে?”
সুমু তাকিয়ে দেখল, সামিয়া আর নাজমিনও মন খারাপ করে বসে আছে। দু’জনের চোখে জল চিকচিক করছে।
সামিয়া গলাটা নিচু করে বলল,

“আপু! আমরা জানি, আমরাও তোমাদের সাথেই যাচ্ছি। তবুও বুকের ভেতরটা খালি খালি লাগছে। আম্মু–আব্বুর সান্নিধ্য, সব আপনজন সব ফেলে যাচ্ছি ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।”
নাজমিন কাঁপা গলায় বলল,
“ওমান নতুন হবে আমাদের জন্য, নতুন জায়গা, নতুন জীবন। জানিনা, আব্বু-আম্মুকে ছাড়া কীভাবে থাকব।”
সুমু এগিয়ে গিয়ে ওদের দু’জনকে জড়িয়ে ধরল।
“তোরা একা না। আমরা সবাই একসাথে থাকব। আর বিশ্বাস কর, কষ্ট আমারও হচ্ছে। ভেবেছিলাম, যে কদিন আছি, আম্মু-আব্বু আর নিজের পরিবারের সাথে সময় কাটাব। কিন্তু আমার ভাগ‍্য এতোটাই খারাপ যে, তাদের সাথে থাকা হলো না। তবে তোরা শোন! নতুন জায়গায় আমরা একসাথে অনেক সুন্দর নতুন নতুন স্মৃতি বানাবো।”
শেরাজ মৃদু গলায় বলল,

“শশুর বাড়িতে যেতেই হবে, শালিকারা।”
সামিয়া আর নাজমিন চোখ মুছে হালকা হাসল। শেরাজের দৃঢ় কণ্ঠে তাদের বুকের ভেতরেও একটু ভরসা জমল। ড্রয়িংরুমের ভারী পরিবেশটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো। আইয়ুব হেসে বলল,
“আমার বউ কি এখানেই থাকতে চায়?”
নাজমিন তাকাল তার দিকে। আইয়ুব আবারও বলল,
“ঠিক আছে! সে এখানেই থাকুক। আমি না হয়, ওমান ফিরে গিয়ে আরও একটা বিয়ে করে নিব।”
ড্রয়িংরুমে হালকা হাসির রোল উঠল। ভারী পরিবেশটা যেন এক মুহূর্তে ভেঙে গেল। নাজমিন চোখ গোল করে আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে রাগী ভঙ্গিতে বলল,
“কি বললেন? আপনি আবারও বিয়ে করবেন? যান না, আমিও দেখি কে বিয়ে করে আপনাকে। কেউ করবে না বিয়ে আপনাকে।”
আইয়ুব গম্ভীর মুখে সোফার পেছনে হেলান দিয়ে বলল,

“আরে কেন করবে না? আমি যে হ্যান্ডসাম আইয়ুব খান! আমার জন্য তো লাইনে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মেয়ে।”
সবাই হেসে উঠল। শেরাজ কফির কাপ হাতে নিয়ে ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি চেপে রাখল।
নাজমিন এবার ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“ব্রাউন গার্লকে ফেলে নতুন কারো কথা ভাবছেন?”
আইয়ুব হেসে তার কাছে গিয়ে কানে কানে বলল,
“তুমি জানো না গো, ব্রাউন গার্ল! আমার পুরো পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আর কেউ না।”
নাজমিন লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মিষ্টি হাসি। বাকিরা আবারও হাসাহাসি শুরু করল।
সামিয়া ফিসফিস করে বলল,

“এদের দু’জনকে নিয়ে কিছু বলার নেই, যেখানে যায় সেখানেই প্রেম শুরু হয়ে যায়।”
ড্রয়িংরুমটা আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। কষ্টের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আনন্দ যেন আবার মাথা তুলে দাঁড়াল। রাহিন হঠাৎ সামিয়ার পাশে এসে বসে পড়ল। তার মুখে দুষ্টু হাসি। সে সামিয়ার কানের কাছে ঝুঁকে বলল,
“আবার একটু কাঁদো তো, বউ। তুমি কাঁদলে, নিজেকে বিবাহিত-বিবাহিত মনে হচ্ছে।”
সামিয়া ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“কি সব কথা বলেন। আমি কাঁদব কেন?”
রাহিন সিরিয়াস মুখে মাথা নেড়ে বলল,
“কারণ বিয়ের পর বউ শশুর বাড়িতে যাবার সময় কাঁদে। আর তখন একটা ছেলের নিজেকে বিবাহিত মনে হয়। আর তাছাড়া বউ মানেই তো একটু কাঁদা, একটু মান-অভিমান আর আনলিমিটেড ভালোবাসা। তুমি না কাঁদলে, আমি কেমন যেন অবিবাহিত অবিবাহিত ফিল করছি।”
সবাই হেসে উঠল। সামিয়ার গাল লাল হয়ে গেল। সে এক হাতে কুশন তুলে রাহিনের দিকে ছুঁড়ে মেরে বলল,
“বাজে লোক একটা।”
রাহিন কুশনটা ধরে হেসে বলল,

“ঠিক আছে, ঠিক আছে! তুমি হাসলেই আমার চলে। কাঁদা লাগবে না।”
সামিয়ার মুখের কোণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসি ফুটে উঠল। ড্রয়িংরুমের সবাই আবারও মজা আর খুনসুটিতে ব্যস্ত হয়ে গেল। এরই মধ্যে ড্রয়িংরুমে এলো আলিশা। মুখে আগের মতোই স্বাভাবিক হাসি, যেন গতরাতে কিছুই হয়নি। কেউ যাতে একটুও আঁচ করতে না পারে, সেই ভঙ্গিতে সে সবার সঙ্গে মিশে গেল।
শেরাজ একপলক তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“আলিশা! কাল রাতে কি ঘুম হয়েছে?”
আলিশা যেন এমন প্রশ্নে থমকে গেল। সে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে মিষ্টি হেসে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ! বেশ ভালোই ঘুমিয়েছি।”
তার ভেতরে অস্থিরতা আর কান্না চেপে রাখা থাকলেও, বাইরের দুনিয়ায় সে একটুও প্রকাশ করল না। কেউ বুঝল না, তার চোখের কোণে কতটা অশ্রু শুকিয়ে আছে। শেরাজ আবারও একবার তাকাল আলিশার দিকে। মুহূর্তের জন্যও আলিশার দৃষ্টি কেঁপে উঠল না, বরং দৃঢ় ভঙ্গিতেই সে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
ড্রয়িংরুমে হঠাৎ শেরাজের সব বন্ধু একসাথে হইচই শুরু করে দিল। সাইফ হঠাৎ বলল,

“আজ আমাদের সব শপিং করিয়ে দিবে এস.কে।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি শুধু আমার বউ ছাড়া, আর কারো জন‍্য একটা পয়সাও খরচ করব না।”
শাহরুখ হেসে বলে উঠল,
“ব্রো! ভাবিজি না থাকলে তো এতো এলিগেন্ট হতে না, তাই না? এখন দেখি ভাবিজির সামনে মিস্টার অ্যাঙ্গ্রি থেকে মিস্টার লাভ কিং হয়ে গেছো।”
সারবাজ হেসে বলল,
“এস.কে, মনে হয় না তোর জন্য আলাদা একটা অ‍্যাওয়ার্ড দেওয়া উচিত?”
অমিত মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আগে তো আমরা একসাথে প্ল্যান করতাম কিভাবে শেরাজকে হ্যান্ডেল করা যায়, এখন দেখি টিপস নিতে হবে ভাবিজির কাছ থেকে।”
নিহাল খিলখিল করে বলল,
“ভাই, তোদের এই হাল দেখে মনে হয় একটা ট্রেনিং সেন্টার খোলা দরকার। নাম হবে—‘খান সাহেবকে বশ করা কোর্স। আর আমাদের ফ্রিতে বশিকরণ শেখানোর ট্রেনিং দিবে ভাবিজি।”
সবাই একসাথে হো হো করে হেসে উঠল। সুমু লজ্জায় মুখ নিচু করে ফেলল। শেরাজ রাগ দেখানোর ভান করে বলল,

“চুপ কর সবাই। যখনই শপিংয়ের কথা ওঠে, সবাই আমার পেছনে পড়ে থাকিস।”
সে রাগের ভানেও চোখে মুখের হালকা হাসি লুকোতে পারল না। রিয়াদ হাততালি দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
“এই তো আমাদের শেরাজ ভাই। রাগ দেখায়, কিন্তু আমাদের প্রতি থাকা ভালোবাসা লুকাতে পারে না।”
তাদের হাসি-ঠাট্টার মাঝেই ড্রয়িংরুমে এলো আরিয়ান, রায়য়ান আর রোজা।
শাহরুখ ফিসফিস করে অমিতকে বলল,
“এসে গেছে ঝামেলা।”
আরবাজ হেসে বলল,
“ওই আরিয়ান ব্রো! এলে তো পুরো হিরো স্টাইলে। মনে হচ্ছে ফিল্মের শুটিং চলছে।”
ফাহিমও হেসে বলল,
“শালা, ক্যামেরা থাকলে এক্ষুনি ‘স্লো মোশন’ দিতাম।”
রোজা ঢুকতেই রিয়াদ খোঁচা মেরে,
“এই যে রোজা ম্যাডাম, আজ তো একেবারে লাল গোলাপে ঢাকা। কার জন্য এই এত সাজগোজ?”
রোজা কটমট করে তাকাল রিয়াদের দিকে। রিসান হেসে আইয়ুবের কানে ফিসফিস করে বলল,
“এরা ফ‍্যাশন করে, আর আমরা শুধু ফ্যাশন শো উপভোগ করি।”
রোজা বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল,

“তোমরা ছেলেরা একটুও বদলাওনি। সবসময় শুধু মজা করা আর টিজ করে কথা বলা ছাড়া কিছু জানো না?”
আরিয়ান গম্ভীরভাবে বলল,
“ঠিকই বলেছিস রোজা। একটা পারিবারিক জায়গায় সময় যদি এমন হাসি-ঠাট্টা চলে, তাহলে বলতেই হয়, এদের ম্যাচুরিটির বয়স যে এখনো দশ বছরেই আটকে আছে।”
শাহরুখ ভ্রু কুঁচকে কটাক্ষ করে উত্তর দিল,
“আরে বাহ, হিরো সাহেব এসেই জ্ঞান বিতরণ শুরু করল। শোনো ব্রো! আমরা ম্যাচুরিটির বয়সে এসে এখনো দশে পড়ে থাকলেও, অন্তত মুখটা সবসময় হাসিখুশি থাকে, তোমাদের মতো কুঁচকানো মুখ নয়।”
সারবাজ হাসি চেপে রাখতে না পেরে বলল,
“থাক ভাই, ওকে বেশি কিছু বলিস না। আরিয়ান ভাই তো পুরো সিরিয়াস মুডে ঢুকেছে। একটু পরেই বক্তৃতা শুরু করবে।”
রায়য়ান হঠাৎ ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,

“আমার মনে হয়, তোমাদের কথাবার্তা যথেষ্ট হয়েছে। এবার যদি একটু চুপ করো, তাহলে সবাই শান্তিতে বসতে পারি।”
পরিবেশ এক মুহূর্তে থমথমে হয়ে উঠল। হাসি-ঠাট্টা ম্লান হয়ে গেল, শুধু চোখাচোখি আর চাপা হাসির ভেতর অস্বস্তি ভেসে রইল।
হঠাৎ ডাইনিংরুম থেকে নাতাশা এসে বলল,
“অনেক আড্ডা হয়েছে। এখন সবাই ব্রেকফাস্ট করবে চলো। আমি, ইশিতা ভাবিজি আর ইনায়া ভাবিজি সবাই জন‍্য ব্রেকফাস্ট রেডি করেছি।”
একথা শুনে স‍্যান্ডি খোঁচা মেরে বলল,
“মাত্র এই কয়জন মানুষের জন‍্য সিম্পল ব্রেকফাস্ট বানাতে নাকি এই মেয়ের আরও দুজনের হেল্প লাগে। একে যে কে বিয়ে করবে, গড নোজ।”
নাতাশা ভ্রু কুঁচকে স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার বিয়ের চিন্তা আপনাকে করতে হবে না। আমার মতো কিউটিকে যে বিয়ে করবে, সে তো লটারিই পেয়ে যাবে।”
আইয়ুব ঠাট্টা করে বলল,

“ওহো! লটারির টিকিট তো আজকাল অনেক দামী, সান্ডা ব্রো। আমারও দেখতে চাই কে সেই ভাগ্যবান, যে আমাদের কিউটি নাতাশাকে পাবে।”
সবাই আবার হেসে উঠল। রোজা বিরক্ত ভঙ্গিতে সোফায় বসে বলল,
“তোমরা কি সবসময় এত বোকা বোকা কথা বলো নাকি সকালে খালি পেটে বিশেষ করে বেশি বলো?”
সকলে চুপ হয়ে গেল। স‍্যান্ডি কপাল কুঁচকে বলল,
“সানটাই বেটার ছিল। হঠাৎ এই সান্ডা কেন ডাকছো আমাকে?”
হঠাৎ শেরাজ হেসে বলল,
“শুনেছি! সান্ডার তেল নাকি খুব উপকারী। দাম্পত্য জীবনে যারা অসুখী, তাদের জন‍্য পারফেক্ট একটা তেল। স‍্যান্ডি তুমি কি সান্ডার সেই তেল দিতে পারবে? যদি দিতে পারো, তাহলে ভাবছি, এই সান্ডার তেলের বিজনেস শুরু করব। তুমি কোনো টেনশন করো না, আমি তোমাকে তোমার প্রাপ‍্যমূল‍্য দিব।
স‍্যান্ডি কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,

“স‍্যার আপনিও? আমি তো ভেবেছিলাম অন্তত আপনি আমাকে সাপোর্ট করবেন।”
শেরাজ গম্ভীর ভঙ্গি করে বসে বলল,
“আমি তো সাপোর্টই করছি। তুমি যদি সত্যিই সান্ডার তেল বানাতে পারো, তাহলে আমি ইনভেস্টর। তুমিই হবে কোম্পানির সিইও—চীফ এক্সট্রাঅর্ডিনারি অক্স।”
শাহরুখ হাসতে হাসতে বলল,
“ভাইরে! সিইও মানে এখন থেকে ‘সান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের ওনার।’ বাহ বাহ।”
নাতাশা হেসে বলল,
“কিন্তু সাবধান! এই তেল যদি উল্টো কাজ করে, মানে কারও বউ যদি আবার…”
নাতাশা কথাটা শেষ করল না। সারবাজ বলল,
“আর যদি তেলটা ম্যাজিকের মতো কাজ করে, তাহলে তো স‍ান্ডা ভাই, তোমার লাইফে ‘ওয়েল প্রাইভেট লিমিটেড’ একেবারে সফল বিজনেসম‍্যান হয়ে যাবে। তাছাড়া তুমি নিজেও এই তেল ব‍্যবহার করতে পারবে।”
সবাই হাসতে লাগল। স‍্যান্ডি রাগস্বরে বলল,

“আমার তো তেলের দরকার নেই। আমি অলরেডি স্ট্রং।”
সবাই একসাথে “উইইইই…” বলে উঠল। স্যান্ডি কাঁদো কাঁদো মুখে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“স্যার, আপনিও আমার সাথে ফান করছেন। আমি তো আপনাকে নিজের গুরু মানি।”
শেরাজ শান্ত গলায়, একেবারে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
“না রে, আমি তো খুবই সিরিয়াস। ভেবে দেখো, আজকাল বাজারে কত ধরনের তেল আছে—নারিকেল তেল, অলিভ অয়েল, বাদাম তেল। কিন্তু সান্ডার তেল—এই নামটাই এমন যে, একবার শুনলেই মানুষ কিনবে।”
অমিত কফিতে চুমুক দিয়ে হেসে বলল,
“ঠিকই বলেছিস, এস.কে। স্লোগানও হয়ে গেছে— ‘সান্ডার তেল, অসুখী দাম্পত্য জীবনে ফেরাবে খুশির আলো।’”
আইয়ুব হাসতে হাসতে বলল,
“আরে না না, আরো স্টাইল দিতে হবে। লিখবে, ‘এক ফোঁটা সান্ডার তেল, অসুখী সংসারে মিলবে সুখের খেল।’”
ইনায়া বলল,
“তোমার এবার সান ভাইয়াকে রাগানো বন্ধ করো, আর সকলে ব্রেকফাস্ট করতে চলো।”
সবাই একসাথে ডাইনিংরুমে চলে গেল। শেরাজ সুমুর হাতে ধরে তাকে খাওয়াতে নিয়ে গেল।

সারাদিন আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে বিকালে শেরাজরা সবাই শেখবাড়িতে এলো। শেখবাড়িতে আজ পিয়াসের পুরো পরিবারও উপস্থিত। নাজমিন এসে তার মা-বাবার কাছে ছুটে গেল। সামিয়াও একই কাজ করল। হাসি বেগম আর রুমা বেগম মেয়েদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে ভাসাচ্ছেন। সোফার ওপর গভীর মুখে বসে আছেন, শামীম সাহেব, সাখাওয়াত সাহেব। তাদের পাশে বসে আছেন, ইফতিয়াক সাহেব আর মুস্তাক সাহেব। ইফতিয়ারা সিদ্ধান্ত নিয়ে কাল রাহিনদের সাথে দর্শনাতে ফিরে যাবেন।
পিয়াস সোফায় বসে সামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখে ব‍্যথার ছাপ। শেখবাড়ির ড্রয়িংরুমটা ভারী হয়ে উঠেছে। সুমু শেরাজের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সে কাঁদতে চাইলেও, কাঁদছেনা। কারণ সে জানে, সে কাঁদলে সামিয়া আর নাজমিন আরও বেশি ভেঙে পড়বে। আইয়ুবরা সকলে দাঁড়িয়ে আছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
হঠাৎ সামিয়া হাসি বেগমকে ছেড়ে শামীম সাহেবের সামনে গিয়ে মেঝের ওপর বসল। শামীম সাহেব মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। সামিয়া শামীম সাহেবের হাত আলগোছে ধরে বলল,

“আমি মানছি, আমি একটা অন‍্যায় করেছি আব্বু। তোমাদের সম্মান নষ্ট করেছি। কিন্তু দেখো, পরশু তোমার এই অপরাধী, খারাপ মেয়েটা সব ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। আজ অন্তত তুমি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিওনা আব্বু।”
শামীম সাহেব যেন নিজেকে আটকাতে পারলেন না। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন। সামিয়া তার বাবার আদুরে ছোঁয়া পেয়ে জোরে কেঁদে উঠল। ড্রয়িংরুমের সবকিছু থমকে গেল। শামীম সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
“আমার দোয়া সবসময় তোমাদের সাথে আছে। তোমার আব্বু এখন আর তোমার ওপর রেগে নেই আম্মু।”
সুমু তার বাবার মুখ থেকে এমন কথা শুনে আলতো হাসল। হঠাৎ তার পাশ থেকে শেরাজ বলল,
“তুমিও একটু কাঁদবে নাকি বউ?”
সুমু কপাল কুঁচকে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ মুচকি হাসল। সুমু আবারও সামনের দিকে তাকাল। সামিয়া একে একে সবার কাছে গেল। সে সবার থেকে বিদায় নিয়ে পিয়াসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পিয়াস অন‍্যদিকে তাকিয়ে রইল।
সামিয়া ধীরে বলল,

“পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। এর থেকে বেশি আপনাকে আমার আর কিছু বলার নেই।”
পিয়াস কোনো কথা বলল না। সামিয়া এসে রাহিনের পাশে দাঁড়াল। শেরাজ সবার উদ্দেশ্যে বলল,
“পরশু সন্ধ্যায় আমরা ফিরে যাচ্ছি। আমি চাইব, পরশু সকালটা আপনারা সকলে আমাদের ওই বাড়িতে কাটান।”
সাখাওয়াত সাহেব বললেন,
“ঠিক আছে। সব যখন ঠিক হয়ে গেছে, তাহলে তো আর না যাবার কিছু নেই। আমরা সকলে যাব।”
শেরাজ আন্তরিকতার সাথে বলল,
“তাহলে আজ আমরা আসি। কিছু শপিং করার আছে। এরপর বের হলে, অনেক রাত হয়ে যাবে।”
সাখাওয়াত সাহেব মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন। শেরাজ ও তার সব বন্ধুরা একে একে সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিল। শেষে সুমুরাও সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিল। শেখবাড়িতে থাকা সকলে বাহিরে এসে দাঁড়াল। শেরাজরা গাড়িতে উঠে চলে গেল।

শেরাজরা বাড়িতে ফিরে এলো। সবাই একে একে রুমে ঢুকে নিজের নিজের মতো ফ্রেশ হতে শুরু করল।
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“সুইটহার্ট, একটু রেস্ট করো। তারপর আমরা বের হব শপিং করতে।”
সুমু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে মাথা নাড়ল। সামিয়া আর নাজমিনরাও নিজের রুমে গিয়ে রেস্ট নিতে লাগল।
প্রায় বিশমিনিট পরে সকলে একবারে রেডি হয়ে নিচে নামল। শপিং করতে যাবার খুশিতে কেউ ঠিকমতো রেস্ট নিল না। সকলে একসাথে ড্রয়িংরুমে এসে শেরাজ আর সুমুর অপেক্ষায় রইল। সামিয়া আর নাজমিন শপিং করার খুশিতে নিজেদের মনকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
সকলে নেমে আসার দশমিনিট পরে শেরাজ আর সুমু নেমে এলো। সুমুর পরনে গোলাপি রঙের আনারকলি আর শেরাজের পরনে ফুল হোয়াইট শার্ট আর প‍্যান্ট। দুজনে নিচে নেমে আসতেই আইয়ুব বলল,

“এস.কে! আরিয়ান, রায়য়ান আর রোজাও কি আমাদের সাথে যাবে?”
শেরাজ ফোনে স্ক্রল করতে করতে বলল,
“ডোন্ট নো!”
সুমু চারপাশে খেয়াল করে বলল,
“ওরা না যাক। কিন্তু আলিশা কই?”
ইশিতা বলল,
“ও হয়তো রুমে আছে। তোমরা একটু ওয়েট করো। আমি ওকে ডেকে নিয়ে আসছি।”
ইশিতা দ্রুত আলিশার রুমের দিকে ছুটে গেল। সে আলিশার রুমের দরজায় টোকা দিয়ে বলল,
“আলিশা! বাইরে এসো, সবাই শপিংয়ের জন্য রেডি হয়ে গেছে।”
আলিশার ভেতর থেকে বলল,
“ইশিতা, আমার মাথা ব‍্যথা করছে। আমি যেতে পারব না। তোমরা যাও, আমি এখন একটু ঘুমাব।”
“মাথা কি বেশি ব‍্যথা করছে, আলিশা?”
আলিশা চোখ মুছে বলল,
“এখন একটু কম। আমি মেডিসিন নিয়েছে। ইনশাআল্লাহ! একটু ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে।”
ইশিতা কিছুটা হতাশ হলেও মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে, আলিশা। তুমি রেস্ট করো।”
ইশিতা চলে এলো। সুমু ইশিতাকে দেখে বলল,

“আলিশা কই?”
ইশিতা একটু চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“ওর মাথা ব‍্যথা করছে। যাবে না বলল।
সুমু একটু ভেবে বলল,
“তাহলে আমাদেরও যাবার দরকার নেই। ওকে এভাবে একা ফেলে রেখে যাওয়াটা ঠিক হবেনা।”
ইনায়া এগিয়ে এসে বলল,
“একা কোথায়? আরিয়ান চৌধুরী , রায়য়ান চৌধুরী আর রোজা চৌধুরী তো আছে।”
সুমু তাচ্ছিল্য করে বলল,
“ওদের ওপর ভরসা করে আলিশাকে ফেলে যাব। ওরা নিজেরা তো সারাদিন নিজেদের মতো থাকে।”
হঠাৎ নাতাশা বলল,
“একটা কাজ করি, তোমরা সকলে যাও। আমি আলিশার কাছে থাকি।”
সুমু ধীরে বলল,
“কিন্তু তুমি যাবেনা?”
নাতাশা এগিয়ে এসে বলল,
“ম‍্যাম! আপনি আমার পছন্দ জানেন। আপনি আমার জন‍্য যা আনবেন, আমি সেটাই নিব।”
ইনায়া বলল,
“ঠিক আছে, নাতাশা। তুমি থাকো, আমরা যাই।”
নাতাশা আশতো হাসল। শেরাজরা সকলে বেরিয়ে পড়ল শপিংমলের উদ্দেশ্যে।

টানা চারঘন্টা ধরে সকলে শপিং করল। শপিংমল থেকে বের হয়ে সবাই হাঁটতে হাঁটতে ক‍্যাফের দিকে গেল।ক‍্যাফের মধ্যে ঢুকতেই হালকা মিউজিক আর ক‍্যাফের ঠান্ডা বাতাসে সবাই একটু স্বস্তি পেল। সুমু, সামিয়া, নাজমিন, আইয়ুব, শেরাজ আর অন্যান্যরা চারপাশে খেয়াল করতে করতে এক বড় টেবিলে বসে গেল। সবাই একসাথে কফি আর হালকা স্ন্যাকস অর্ডার করল।
শেরাজ বলল,
“সুইটহার্ট, এখন একটু রেস্ট নাও। অনেক কষ্ট হলো তোমার আজ।”
সুমু হাসল,
“হ্যাঁ, খান সাহেব। একটু বিশ্রাম খুব দরকার ছিল।”
আইয়ুবরা টেবিলের পাশে রাখা সোফায় বসে আড্ডায় মেতে উঠল। সামিয়া আর নাজমিন চুপচাপ একে অপরের সঙ্গে হেসে কথা বলছিল। ইশিতা আর ইনায়া কিনে আনা কসমেটিকগুলো দেখছিল। সারাবাজ ফোনে ক‍্যাফের আর্কষণীয় জিনিসগুলোর ছবি তুলছিল। হঠাৎ সে এগিয়ে এসে বলল,
“সব কাপলদের একটা করে পিক তুলি। এস.কে! তুই আর ভাবিজি প্রথমে।”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকাল। সুমু আলতো হেসে উঠে দাঁড়াল। দুজনে একটু সাইডে গিয়ে পাশাপাশি দাঁড়াল। সুমু শেরাজের বুকের ওপর একহাত রাখল আর শেরাজ সুমুর কোমরে। তারপর দুজনে একসাথে ক‍্যামেরার দিকে তাকাল। মুহুর্তেই সারবাজ তাদের দুজনকে ক‍্যামেরা বন্দি করল। ছবি তোলা শেষ হতেই শেরাজ সুমুকে নিয়ে পুনরায় জায়গাতে বসল। সারবাজ, সামিয়া আর রাহিনকে আসতে বলল। তারা দুজন উঠে গেল। দুজনে ছবি তোলার জন‍্য রেডি হয়ে দাঁড়াতেই হঠাৎ ক‍্যাফের বাহিরে প্রচন্ড জোরে বিকট একটা শব্দ হলো। ক‍্যাফের মধ্যে থাকা সকলে আঁতকে উঠল। ক‍্যাফের কাচের জানালা কাঁপতে লাগল।
একজন লোক দৌড়ে এসে বলল,

“অ‍্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। একটি বড় বাস ট্রাফিকে থামার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লাগায় বাস নিয়ন্ত্রণ হারাল। ট্রাকটি আর বাসটি সরাসরি রাস্তার ধারে গিয়ে উল্টে পড়ে গেল। বাসের মধ্যে অনেক যাত্রী ছিল। না জানি তাদের এখন কি অবস্থা।”
লোকটির কথা শুনে সুমু আঁতকে উঠল। লোকজন আতঙ্কিত হয়ে বাইরে ছুটতে লাগল। শেরাজ সাথে সাথেই সুমুর হাত ধরে বলল,
“সুইটহার্ট, সামিয়াদের সাথে এখানেই থাকবে। বের হবে না তুমি। আমি যাচ্ছি।”
শেরাজ উঠতে নিলেই সুমু শেরাজের হাত ধরে বলল,
“সবাইকে সাহায্য করে তারপর ফিরে আসবেন। আমি আপনার অপেক্ষায় থাকব।”
শেরাজ মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল। আইয়ুব, সারবাজ এবং অন্যান্য বন্ধুরাও বাইরে ছুটে গেল। রাহিন সামিয়াদের সাবধানে থাকতে বলে চলে গেল।
সড়কের পাশে মানুষ জমে গেল। ট্রাকের চালক আহত, বাসের যাত্রীরাও আহত। শেরাজ দ্রুত সামনের দিকে দৌড়ে এগোলো। সে এসে দেখল, ট্রাকের চালক আহত, আর বাসের কয়েকজন যাত্রী আহত হয়ে পাশের ফুটপাথের ওপর বসে আছে। ছোটবাচ্চাদের কান্না ভেসে আসছে। কিছু স্থানীয় লোক আর পুলিশ সাহায্য করছে—কেউ পানি নিয়ে এসেছে, কেউ কাপড় দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছে। কেউ আহতদের নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে ছুটছে। লোকজন বেশি ভীড় করার ফলে, সাহায্যকারীদের সাহায্যে করতে সমস্যা হচ্ছে। তারা লোকজনদের সরে যেতে বলছে, কিন্তু কেউ যেন কথা কানেই তুলছেনা। তারা শুধু ভিড় জমিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ কেউ চিৎকার করছে। শেরাজরা এসে সবাইকে সরিয়ে দিতে দিতে বলল,

‌‌ “প্লিজ! সবাই দূরে যান। এইটা ভীড় জমানোর মতো জায়গা না। নিজেরা সাহায্য করতে না পারলে, অন‍্যদের সাহায্য করতে দিন।”
লোকজন প্রথমে দাঁড়িয়ে রইল। শেরাজ ধমকেরস্বরে সবাইকে বলল। শেরাজের রাগি কণ্ঠ শুনে এবার সকলে ধীরে ধীরে সরতে শুরু করল। কেউ আহতদের পাশে এসে সাহায্য করল, কেউ হাসপাতালে দ্রুত নেবার ব‍্যবস্থা করল।
এদিকে, সুমু টেনশনে আর বসে থাকতে পারল না। সে ইশিতাদের বাধা না মেনে বেরিয়ে এলো ক‍্যাফে থেকে। ইশিতারাও তার পিঁছু পিঁছু বেরিয়ে এলো।
শেরাজ দ্রুত আহতদের একে একে অ‍্যাম্বুলেন্সে তুলে দিচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ গেল ট্রাকের চালকের দিকে। চালক হালকা কাঁপছে, আর রক্তের দাগ তার জামার ওপর স্পষ্ট। শেরাজ কাছে গিয়ে বলল,
“আপনি ঠিক আছেন? চলুন, অ‍্যাম্বুলেন্সে উঠুন?”
চালক হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে মাথা নাড়ল। শেরাজ দ্রুত আশেপাশের লোকদের দিকে তাকাল,
“দ্রুত! কেউ হাসপাতালে নিয়ে যান। আর পানি আনার মতো কেউ থাকলে পানি আনুন, প্লিজ।”
সুমু এসে পৌঁছাল। সে এসে দেখল এখনো কিছু মানুষ সাহায্য না করে ভিডিও করতে ব‍্যস্ত। সুমুর ভীষণ রাগ হলো। সে লোকগুলোর কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“সিনেমার শুটিং চলছে এখানে?”
লোকেরা চুপ করে গেল। কেউ কপাল কুঁচকালো, কেউ লজ্জায় মুখ নামালো। সুমুর রাগের কন্ঠ শুনে কেউ কথা বলতে পারল না।
সুমু আরও এগিয়ে গিয়ে বলল,

“লজ্জা করেনা আপনাদের? এখানে মানুষ মরতে বসেছে আর আপনার হেসে হেসে ভিডিও করছেন? আজ যদি এই জায়গায় আপনার পরিবারের কেউ হতো, পারতেন এভাবে দাঁড়িয়ে ভিডিও করতে?
সুমু একটু থেমে রাস্তার ওপর থু মেরে বলল,
“ধিক্কার জানাই, আপনাদের মতো মেরুদণ্ডহীন মানুষদের। ধিক্কার জানাই, এই নির্লজ্জ জাতিকে। আপনারা এখন আর মানুষ নেই। ফিরাউনের থেকে অধম হয়ে গেছেন আপনারা। কোথাও বিপদ হলে আগে আপনারা সাহায্য না করে, পকেট থেকে ফোন বের করেন ভিডিও করার জন‍্য। কেন ভাই? ও, আপনাদের তো আবার ভিউ লাগবে? প্রথমে ভিডিও করবেন, তারপর দুটো ইমোশনাল কথা বলে ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করবেন, তারপর শেয়ারের ওপর শেয়ার পরবে। লাখ লাখ ভিউ হবে ভিডিওতে, আর তারপর ডলার কামাবেন? কিন্তু একবারও একটা ভাবেন না, যতোক্ষণে আপনি ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করবেন, ততক্ষণে আপনি চাইলে একটা মানুষকে বাঁচানোর জন‍্য হসপিটালে পাঠানোর ব‍্যবস্থা করতে পারবেন। কিন্তু আপনারা তো সেটা করবেন না। কারণ এতে আপনাদের লাভ নেই। লাভ আছে তো ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করতে পারলে। তাতে যা টাকা ইনকাম করতে পারবেন, সেটা টাকা দিয়ে পরেরদিন কোনো ভালো রেস্টুরেন্টে গিয়ে ভালো মন্দ খেতে পারবেন। কিন্তু খাবার আগে একবারও ভাববেন না যে, কোন ভিডিও থেকে আপনার এই খাবার টাকাটা এসেছে। সেই ভিডিওটা না করে, একটা মানুষকে হেল্প করলে, আজ একটা পরিবারের সন্তান তার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারত। এই আপনাদের মতো মানুষদের না ধরে ধরে শিক্ষা দেওয়া উচিত। ‘থু’ নোংরা বাঙালি জাতি। ঘৃণা হয় আপনাদের দেখলে। যদি সাহায্য করতে না পারেন, অন্তত পিছে সরে দাঁড়ান। নয়তো আহতদের কাছে যান, ছবি তুলবেন না। এটা আপনাদের জন্য বিনোদন নয়।”

খান সাহেব পর্ব ৭৩

কিছু লোক ধীরে ধীরে সরে গেল। কেউ ফোন নামিয়ে ফেলল। কেউ কেউ আহতদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ভীড় ক্রমেই কমতে লাগল। আহতদের জন্য পথ খালি হলো। শেরাজরা প্রতিটি আহত যাত্রীর দিকে নজর রাখছে, আর সাহায্যকারীদের ও সাহায্য করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এলো।
হঠাৎ একটা বাচ্চা ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে সুমু নিজের পেটে হাত রাখল। তার হৃদয়ের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে মাথা ঘুরে পরে যেতে নিলে, সামিয়ারা এসে সুমুকে ধরে ফেলল। তারা সুমুকে ধরে ক‍্যাফের মধ্যে নিয়ে গেল।

খান সাহেব পর্ব ৭৫