খান সাহেব পর্ব ৮৪
সুমাইয়া জাহান
অন্ধকার প্রকোষ্ঠের গভীরে বাতাসটা হঠাৎ যেন রূক্ষ হয়ে উঠল। সুমু ধীরে ধীরে শ্বাস নিল। তার বুকের ভেতরে বোধহয় সদ্য জন্ম নেওয়া কোনো ভয়ের কুঁড়ি
মাটির নিচের শেকড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। রায়য়ানের সব সত্যি তার সামনে দাঁড়িয়ে— সে যেন অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক অগ্নিভস্ম।
রায়য়ান অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সুমুকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“তোমরা জীবনকে যেভাবে কাটিয়েছ , আমি তা কখনও পাইনি। জন্ম থেকেই আমি সভ্যতার প্রান্তে ছুঁড়ে রাখা এক কালো খণ্ড। আমাকে আলো দেখতে শেখায়নি কেউ— তাই আজও অন্ধকার আমার উপাসনার মন্দির।”
সুমু শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
“কিন্তু… অন্ধকারেও তো আলো জন্ম নেয়।”
রায়য়ান মৃদু হাসল—সেই হাসিতে উষ্ণতা নয়, ধ্বংসের খেলা যেন।
“আলো জন্ম নেয় তাদের ভেতরে,” সে ফিসফিস করে বলল, “যাদের হৃদয়ে ভাঙনের পরও এক বিন্দু হলেও কোমলতা থাকে। আমার ভেতর যে কণাগুলো ছিল—সেগুলো আমি নিজেই এক, এক, করে পিষে ফেলেছি। প্রতিটি শক্ত মানুষের পেছনে একটি ভেঙে যাওয়ার গল্প লুকিয়ে আছে। আমারও তাই।”
সে থেমে গেল। মুহূর্তটা যেন সময়ের কাঁটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাতাসে ঝুলে রইল। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রেখে আবারও তাকাল অন্ধকারের দিকে। তার চোখদুটি যেন রক্তগঙ্গা থেকে উঠে আসা দুটি নরক-বাতি। মুখের রেখা যেন দীর্ঘদিনের দহন আর প্রতিজ্ঞার পাথরে খোদাই করা।
আরিয়ান এতক্ষণে মাথা তুলল। তার চোখে ক্ষতবিক্ষত যন্ত্রণার ছাপ, যেন সে ঠকে গেলে। জীবনের সবদিক থেকে আজ সে ঠকে গেল।
“তোদের সবকিছুই বুঝলাম, কিন্তু তোরা কেন তোদের নোংরা খেলার কেন্দ্রবিন্দু আমাকে বানালি? কী রে রায়য়ান—তুই কেন আমার সাথে এসব করলি? আফতাব চৌধুরী আমার ড্যাড হলেও… তার সাথে আমার সম্পর্ক কখনোই মসৃণ ছিল না। সবসময় একটা দূরত্ব… একটা অদৃশ্য দেয়াল আমাদের মাঝে ছিলই। কিন্তু তুই… তুই কেন? তোর সাথে যা হয়েছে, সেসবে তো আমার কোনো দোষ ছিল না।”
রায়য়ান ঘুরে তাকাল। সে আরিয়ানের দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন এই প্রথমবার তাকে দেখছে—না বন্ধু হিসেবে, না ভাইয়ের মতো পরিচিত মুখ হিসেবে— বরং একধরনের অব্যক্ত প্রতিফলন হিসেবে দেখছে।
“দোষ?” রায়য়ান ফিসফিস করে বলল, “মানুষ ভাবে ভুল করলেই সে দোষী, ভুল না করলে সে দোষী নয়। কিন্তু আরিয়ান— দোষ রক্তে থাকে, বংশে থাকে, বিপর্যয়ের কেন্দ্রে লুকানো জন্মসূত্রে থাকে।”
আরিয়ানের মুখ শক্ত হলো,
“মানে কি তুই বলছিস— ড্যাড তোর সাথে যা করেছে, সেটার জন্য তুই আমাকে শাস্তি দিবি?”
রায়য়ানের চোখে দপদপে বিষণ্ণতা ভেসে উঠল।
মায়ার মতো এক বিষণ্নতা, কিন্তু মরণব্যাধির মতো বিপজ্জনকও।
“না, আরিয়ান!” সে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ল, “তোকে শাস্তি দিতে চাইনি। তোকে তো আমি ব্যবহার করেছি। তুই ছিলি আমার সবচেয়ে সুবিধাজনক ‘ভাঙা দরজা’। তোর ড্যাড, আফতাব চৌধুরী— ওই মানুষটা আমার সাথে যা করেছে, তা কোনো শত্রুও শত্রুর সাথে করে না। আমি অনেক কষ্ট করে আজ এত বড় হয়েছি। আমার মাথার ওপর বাবা নামক সেই বটগাছটা ছিল না, যে আমাকে সঠিক পথের আলো দেখাবে। কিন্তু আমার পিঠে দগ্ধ চিহ্ন আঁকার জন্য মানুষের অভাব ছিল না।”
আরিয়ান নিঃশ্বাস আটকে এলো। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কিন্তু তুই তো আমার বন্ধু ছিলি, রায়য়ান। তুই তো আমাকে আমার থেকেও ভালো করে জানিস। আমি তো ড্যাডের মতো ছিলাম না।”
রায়য়ান হাসল,
“বন্ধুত্ব? জীবনে যেদিন প্রথমবার প্রতিশোধের পথ ধরলাম— তুই তখন ছিলি আমার সবচেয়ে সহজ রাস্তা। তোর মাধ্যমে আমি ফিরে এসেছিলাম আফতাব চৌধুরীর সামনে। তোর দুর্বলতা, তোর একাকিত্ব, তোর বাবার সাথে দূরত্ব— সবকিছুকে অস্ত্র বানিয়েছিলাম আমি।”
রুমটা আবারও স্তব্ধ হয়ে গেল। শেরাজ দুজনকে একবার ভালো করে দেখে বলল,
“হয়ে গেছে তোদের অতীতের স্মৃতিচারণ? তাহলে এবার থাম। অনেক বকেছিস, এবার আমার মাথা ধরেছে।”
রায়য়ান তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“কি করবি? মেরে ফেলবি? ধ্বংসের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়েও আমি বলব, ব্রো খেলা এখনো শেষ হয়নি। তোর সাথে আমার বিরোধীতা সারাজীবন থাকবে, এস.কে।”
অন্ধকারের ভেতর থেকে সুমু চেঁচিয়ে উঠল,
“খান সাহেব, আমাকে এখান থেকে মুক্ত করুন। কেন আটকে রেখেছেন আমাকে এখানে?”
শেরাজ কিছু বলার আগেই রায়য়ান বলল,
“এস.কে, কোনো সাধারণ ভিলেন নয়। ও এক সাইকো–অ্যারিস্টোক্র্যাট। পিওরলি অ্যারিস্টোক্র্যাটিক প্রেডেটর। নির্মম কিন্তু কম্পোজ্ড।”
সুমুর ভ্রু কুঁচকে এলো,
“মানে? কি বলতে চাইছেন?”
“মানেটা তোমার হাজব্যান্ডকে জিঙ্গাসা করো।”
শেরাজ, রায়য়ানের দিকে তাকাল,
“রায়য়ান… আমার বউয়ের সামনে বেশি কথা বলবি না। যা জানিস, মাথার ভেতরে রাখ।”
রায়য়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল,
“ওকে! সুহাসিনী এসব জানতে পারলে কী তোদের বিবাহিত জীবনে সমস্যা হয়ে যাবে? কিন্তু তুই তো আইস–মাইন্ডেড প্রেডেটর। তোর মতো লোকেরা কাঁদে না, কাঁদায়। ভয় পায় না, ভয় পাওয়ায়। তোর মতো লোকেরা মালিকানা দাবি করে আর সবাইকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে। যাকে বলে ডমিনেট করা।”
সুমুর কণ্ঠ আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল,
“আপনি ঠিক কি বোঝাতে চাইছেন? খান সাহেব কি আমাকে বন্দি করে রেখেছেন?”
শেরাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অন্ধকারের দিকে। সে ধীরে বলল,
“হ্যাঁ, বন্দি করে রেখেছি। কারণ বাইরে যারা আছে, তাদের কাছে তুমি সেফ নও, তুমি শুধু আমার কাছে সেফ।”
রায়য়ান সঙ্গে সঙ্গে একটি শুষ্ক হাসি হাসল,
“দেখেছো? আমি তো ভুল বলিনি। এটাই অ্যারিস্টোক্র্যাটিক প্রোটেকশনিজম— যেটা প্রেমের নামে আসে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে শ্বাসরোধ করে মারে।”
আরিয়ান দম নিয়ে বলল,
“বেবিগার্ল, বুঝতে পারছো তো? এই মানুষটা তোমাকে ভালোবাসে— হ্যাঁ পাগলের মতো ভালোবাসা। কিন্তু ভালোবাসার চেয়ে বেশি তোমাকে রক্ষা করার নামে দখলে রাখতে চায়।”
সুমু একটু উঁচু গলায় বলল,
“দু’জনেই চুপ! আমি কোনো অস্ত্র নই, কোনো তত্ত্ব নই, কোনো প্রতিশোধের কেন্দ্র নই। আমি মানুষ! আর আমার খান সাহেব আমার সাথে যা খুশি করুক, তাতে আপনাদের কী?”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। সে তার বসে থাকা চেয়ারটায় লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, বন্দি করে রেখেছি, তাতে তোদের সমস্যা কী? আমার বউ, আমার প্রোপার্টি, আমি যা খুশি করব। দেখছিস না, আজ একদম সোনার খাঁচায় বন্দি করে রেখেছি? এভাবেই সারাজীবন আমার বাহুদরে বন্দি করে রাখব ওকে।”
রায়য়ান হাসল,
“এটাই তো তোর আসল রূপ, এস.কে। তোর ভদ্রতার মুখোশ খুলে গেলে তোর মধ্যে থেকে ঠিক এমনই একটি সাম্রাজ্যবাদী জানোয়ার বের হয়। প্রোপার্টি? তুই তোর স্ত্রীকে, একজন মানুষকে, প্রোপার্টি বলছিস?”
আরিয়ান গলার স্বর উঁচু করল,
“ওর থেকে এর চেয়ে ভালো আর কি আশা করিস? শোন এস.কে, বেবিগার্ল কোনো জিনিস না, কোনো খাঁচার পাখি না—ও একজন মানুষ।”
সুমু কড়া গলায় বলল,
“আপনারা দু’জন চুপ করবেন? এটা আমার আর আমার স্বামীর ব্যাপার। সে আমাকে বন্দি করুক, আদর করুক, বকা দিক, মারুক, যাই করুক— সেটা ওনার অধিকার। এসব ব্যাপারের মধ্যে আপনারা ঢুকবেন না। আমি আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাইরের লোকের ঢোকাটা একদম পছন্দ করি না।”
শেরাজ তাকাল অন্ধকারের দিকে। সে খুব ধীরে, হিমশীতল স্বরে বলল,
“স্বাধীনতা বলে কিছু নেই, সুইটহার্ট। অন্তত তোমাকে আমি সেটা দেব না। তুমি আমার, শুধু আমার। এটা নিয়ে আমি কারও সাথে তর্ক করতে চাই না।”
সুমু চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। রায়য়ান আর আরিয়ান দুজনেই নির্বাক—দুজনের চোখেই একই প্রশ্ন, ‘এ কেমন ভালোবাসা? এ কেমন দাবি?’
রায়য়ান হেসে উঠে বলল,
“এর জন্যই সুহাসিনীকে তুই কখনও একা ছাড়িসনি। চারবছর আগেও মুক্তি দেবার নাম করে ওকে নিজের আয়ত্ব হিসাবে আমার কাছে রেখেছিলি?”
শেরাজ উন্মাদের মতো বলল,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ! রেখেছিলাম!”
“কিন্তু আমার কাছেই কেন? নিজের শত্রুর কাছেই কেন নিজের বউকে রাখলি?”
“কারণ তোকে আমি খুব ভালো করে চিনি। তুই আর যাই করিস, সুমুর কোনো ক্ষতি করবি না। তুই অযাচিতভাবে আমার বউয়ের দিকে হাতও বাড়াবি না। তোর কাছে আমার বউ সেফ-ই থাকবে, হাজার হোক ভাবিজি হয় তোর। এইটুকু সম্মান তুই ওকে করবি, আমি জানতাম। আর তাই তোর সবথেকে বেশি বিশ্বস্ত লোক, মাহিনের মাধ্যম আমি সেইরাতে সুমুকে তোর কাছে পাঠাই। আর মাহিন তোকে জানায়, যে তোর লোকেরা সুমুকে পেয়েছে।”
“মানে… তুই আমাকে এতকিছুর পরেও শুধু শত্রু ভাবিসনি—একইসাথে আমাকে সবচেয়ে বড় প্রহরীও বানাইছিলি?”
“হ্যাঁ। কারণ আমি জানি, তুই যেমন আমাকে মারার জন্য হাজারটা প্ল্যান করতে পারিস— ঠিক তেমনি আমার বউকে রক্ষার জন্য হাজারটা প্ল্যান করতে পারিস।”
“তুই কি জানিস, এস.কে? আমি তখন প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছিলাম। তোর দিকে তাকালেই মনে হতো—তোর সবকিছু শেষ করে ফেলতে পারলে আমার সব ব্যথার কিছুটা হিসেব শোধ হয়ে যাবে। কিন্তু তোর মাথায় যে এমন বিকৃত, অদ্ভুত, অসুস্থ চিন্তা আছে— এটা আমার জানা ছিল না রে, এস.কে। তুই আমাকে একইসাথে ঘৃণা করিস, ভরসা করিস, আবার ব্যবহারও করিস।”
শেরাজ এবার একটু এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
“তুই করিস নি? আরিয়ানেরর বন্ধুত্ব, আরিয়ানের পরিবারের ফাটল, আরিয়ানের বিশ্বাস— সব ব্যবহার করিস নি?”
রায়য়ান মুখ তুলল,
“হ্যাঁ! কিন্তু আমি ওকে ব্যবহার করেছি, তোর আর আফতাব চৌধুরীর পতনের জন্য—আর তুই আমাকে ব্যবহার করেছিস, তোর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসকে রক্ষা করতে। দুইয়ের মধ্যে তফাৎ আছে।”
অন্ধকারের গহ্বর ভেদ করে সুমুর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“আমি জানতে চাই—সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল? কেন আমাকে পাঠালেন? কোন আতঙ্ক আপনাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল?”
শেরাজ খুব ধীরে সুমুর দিকে ঘুরল। সে নিচু, কিন্তু ভারী স্বরে বলল,
“সেই সময় আমার একটি মিশন ছিল ইন্ডিয়াতে।
আর ঠিক সেই সময়ই তোমার চোখের সামনে থেকে সরে গিয়েছিল আমার ছায়াচ্ছন্ন জগতের পর্দা। তুমি বুঝে গিয়েছিলে আমি আসলে কী—আর সেই বোঝা থেকেই তুমি আমার থেকে পালাতে চেয়েছিলে। তোমাকে নিয়ে আমার মন ছিন্নবিচ্ছিন্ন ছিল। তুমি যখন তখন পালাবে এই আতঙ্কে আমি ঠিকমতো কাজে মনও দিতে পারছিলাম না। কিন্তু মিশন তো আর অপেক্ষা করে না, আমাকে মিশনে বের হতেই হত। সেই সময় তোমার মানসিক অবস্থা এমন ছিল যে, তোমাকে জোর করে ইন্ডিয়াতে নিয়ে যেতেও পারতাম না। আর জোর করে নিয়ে গেলেও, আমি জানতাম, আমি ঘর ছাড়লেই তুমি পালিয়ে যাবে। শেরাজ খানের-ই তো বউ তুমি, এসব তুমি ইজিলি করে ফেলবে আমি জানতাম। দিনে তোমাকে চোখে চোখে রাখলেও, রাতে তুমি ঠিক পালিয়ে যেতে। তাই আমাকে একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজতে হয়েছিল—যেখানে থাকলে তুমি নিজের অজান্তেই আমার আয়ত্বের ভেতরে থাকবে, এবং কোথাও পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাববেও না।”
“আর সেই কারণেই আমাকে নিজের শত্রুর কাছেই পাঠালেন? আমার নিরাপত্তার নামে?”
শেরাজ চোখ নামিয়ে বলল,
“হ্যাঁ! কারণ আমি জানতাম—আমার সবচেয়ে বড় শত্রুই তখন তোমার সবচেয়ে বড় রক্ষক হয়ে দাঁড়াবে। রায়য়ানের কাছে থাকলে তুমি নিরাপদ থাকবে, আর আমার আয়ত্বের ভেতরেই থাকবে।”
তার কণ্ঠ আরও নীচে নেমে এলো। সে আরিয়ান আর রায়য়ানের দিকে একসাথে দুটো গান তাক করে বলল,
“চল, অনেক কথা হয়েছে। এবার তোদের লাইফলাইন… খতম।”
রুমের বাতাস হঠাৎই জমাট বাঁধা ধাতুর মতো ঠাণ্ডা হয়ে উঠল। সুমুর গলা ফেটে চিৎকার বেরিয়ে এলো,
“না, খান সাহেব! এমনটা করবেন না! দয়া করে, ওদের ছেড়ে দিন। আমাকে এখান থেকে মুক্ত করুন। জীবনে অনেক রক্তে হাত ভিজিয়েছেন, আর না। ওরা অন্যায় করে থাকলে আইন ওদের শাস্তি দিবে, আপনি প্লিজ কিছু করবেন না।”
শেরাজ চোখ না সরিয়েই বলল,
“ওদের ছেড়ে দিলে, ওরা সবকিছু শেষ করে দেবে, সুইটহার্ট। ওরা আজ ভালো—আগামীকাল খারাপ। একেক দিন একেক রূপ ওদের। দুজনেরই মাথার স্ক্রু ঢিলা। আজ শান্ত, পরের মুহূর্তে আগুন। আজ বন্ধু, কাল শত্রু। আজ অনুতপ্ত, কাল আবার রক্তপিপাসু। ওদের মাথায় যখন-তখন আমার সন্তানদের খুন করার নেশা জেগে ওঠে—আবার সেই নেশা পাঁচ মিনিট পরেই উবে যায়। এমনভাবে যদি ওরা ঘুরে বেড়ায়, তাহলে একদিন না একদিন ওরা আমার বাচ্চাদের ক্ষতি করবেই। আর একজন বাবা হিসাবে আমি কিছুতেই সেটা হতে দেব না।
সুমুর চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এলো। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“তবুও হত্যা কোনো সমাধান নয়, খান সাহেব।”
শেরাজ ধীরে ঘুরে তাকাল তার দিকে,
“সুইটহার্ট… এসব জায়গায়, সমাধান বলে কিছু নেই। থাকে কেবল বাঁচা—নইলে শেষ হয়ে যাওয়া। ওদের প্রাণবায়ু শেষ হয়ে এসেছে। আজ ওদের মরতেই হবে। অনেক সুযোগ দিয়েছি দুটোকে, আর নয়। সেদিন রাতে আমি ওদের বলেছিলাম, ওই সময়টা ওদের আর তার পরের সময়টা আমার। আর তাই একজন ম্যাফস্টার হিসাবে আমি আমার কথা রাখতে বাধ্য। তাছাড়া তুমি ওদের ব্যাপারটা একটু বোঝো, ওরা সেই কখন থেকে আমার হাত থেকে মরবে বলে ছটফট করছে, বলো তো।”
“খান সাহেব, না! প্লিজ, এমনটা করবেন না। দয়া করে ওদের ছেড়ে দিন।”
শেরাজ শুনলো না সুমুর কথা, সে আরিয়ানদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল,
“বল তোদের শেষ ইচ্ছা কী?”
আরিয়ান রক্তলাল চোখে মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,
“বেবিগার্লকে শেষবারের জন্য একবার দেখতে চাই।”
শেরাজ বাঁকা হেসে রায়য়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোরটা বল?”
রায়য়ান তাচ্ছিল্যপূর্ণ হেসে বলল,
“প্রথমত, সুহাসিনীকে শেষবারের জন্য দেখতে চাই। দ্বিতীয়ত, আমার ফোনটা পাঁচমিনিটের জন্য চাই।”
শেরাজের চোখের পাতা একবারও নড়ল না, কিন্তু তার ভেতরের আগুন হঠাৎই যেন গর্জন তুলে উঠল। আলোর নিচে তার মুখের শিরাগুলো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, বুকে রুদ্ধ শ্বাসের মতো জমে উঠল অস্বস্তিকর নীরবতা। সে দাঁত চেপে বলল,
“আমার সুইটহার্টকে শেষবারের জন্য দেখতে চাওয়া তো মৃত্যুর অগ্নিকুণ্ডের ভেতর দাঁড়িয়ে পানি চাওয়ার মতো বোকামি। তোরা ভাবলি কি করে, আমি তোদের সেই ইচ্ছা পূরণ করব?”
সে ধীরে মাথা কাত করে তাকাল। চোখে মৃত্যুর নিষ্ঠুর আলো জ্বলে উঠল। ঠোঁটে এমন এক হাসি—যেটা হাসি নয়, রক্তমাখা ব্যঙ্গ। নিচু স্বরে বলল,
“তোদের আজ মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো সতর্ক করছি। আমার স্ত্রীর দিকে চোখ তুলে তাকাবি না, ওর নাম মুখে নিবি না, আর ওকে দেখার অনুমতি? সেটা তোদের মতো প্রতারক, কাপুরুষ, রক্তের গন্ধে মেতে থাকা নেশাখোরদের দেওয়া হবে না। শুধু তোদের কেন, দুনিয়ার কোন পুরুষকেই দেওয়া হবে না। তবে রায়য়ানের দ্বিতীয় ইচ্ছাটা পূরণ করে দিচ্ছি।”
টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে রায়য়ানের কাছে গেল। রায়য়ানের হাত খুলে দিয়ে ফোনটা তার হাতে দিল। শরীরের যন্ত্রণায় ফোনটা ধরতেও কষ্ট হলো রায়য়ানের, তবুও সে অনেক কষ্টে ফোনটা হাতে নিয়ে আনলক করল। বহুত কষ্টে আলিশার নাম্বার বের করে মেসেজ করল। দু’মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করে ফোনটা আবারও রেখে দিল। শেরাজ ফোনটা নিয়ে আবারও পুনরায় জায়গায় এসে বসল। সে এবার আর রায়য়ানকে বাঁধল না। কারণ সে জানে, আরিয়ান, রায়য়ান কারই উঠে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা নেই।
আরিয়ান রক্তলাল চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এস.কে, শুধু একবার আমাকে ওকে দেখতে দে। শেষবারের জন্য। আমি ওর মুখটা দেখতে চাই, শুধু একবার।”
“মরার আগেও বিকৃত চিন্তা তোর, আরিয়ান।”
আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে রাখল,
“হতে পারে আমার চিন্তা-ভাবনা বিকৃত, এস.কে! তবুও শুধু একবার মাত্র। শুধুমাত্র একপলক দেখতে চাই, বেবিগার্লকে। দয়া করে, এইটুকু ভিক্ষা দে। প্লিজ, একবার দেখতে দে।”
শেরাজ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে হিমশীতল স্বরে বলল,
“তোর চোখে যে কুৎসিত ইচ্ছে জেগেছে, সেটা আমি চিরকালের জন্য নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছি।”
আরিয়ান তাচ্ছিল্যপূর্ণ হেসে বলল,
“একজন অপূর্ণতার স্বাদ গ্রহণ করে বলেই, অন্যজন পূর্ণতার স্বাদ পায়।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকালো,
“কি বলতে চাস? ঠিক করে বল।”
“তুই পূর্ণতার স্বাদ পাচ্ছিস, কারণ আমরা বেবিগার্লের জন্য অপূর্ণ হয়ে যন্ত্রণার শেষ সীমা দেখে এসেছি।”
“ওকে তোদের আগে থেকে আমি ভালোবাসি। ও আমার বউ, ডাফার।”
“আমিও ওকে ভালোবাসি।” সে থেমে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “আমি এক আকাশ সমান চাই না। আমি চাই, আমার জন্য আপনার মনে একবিন্দু মায়ার জন্ম হোক। হোক না সেই মায়ার পরিমাণ স্বল্প, তবুও খাঁটি হোক এবং একান্তই আমার জন্য হোক। দিবেন আমায় একবিন্দু ভালোবাসা। আজ তো আমার শেষ সময়, একবার কি মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকাবেন আমার দিকে? একবার বলুন না, আপনার স্বামীকে, যাতে একটাবার আপনার মুখটা আমাকে দেখতে দেয়। আপনার মুখটা না দেখতে পেয়ে মরলে যে, আমার ব্যর্থ জীবনে বিশাল বড় একটা অপূর্ণতা থেকে যাবে। এই অপূর্ণতা নিয়ে আমি মরব কীভাবে, বলুন তো? আমার রূহটা যে ছটফট করছে আপনাকে দেখার আশায়। একবার বলুন না। বেঁচে থাকতে তো আপনাকে পেলাম না, মৃত্যুর আগেও কি একবার দেখতে পাব না?”
ওদের দুজনের কথার মাঝেই রায়য়ান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
“চোখ বন্ধ হওয়ার আগে যদি শেষবার আপনাকে দেখতে পারতাম, তবে মৃত্যুটা হয়তো এতটা ভয়ংকর লাগতো না। আপনি জানেন, পৃথিবীর কোনো অভাব আমাকে কাঁদাতে পারেনি, কিন্তু আপনার অভাব আমাকে প্রতিটি নিঃশ্বাসে কাঁদিয়েছে। আজ হয়ত সবকিছুর সমাপ্তি হবে। কিন্তু আপনি কি জানেন, সমাপ্তি সুন্দর, ভীষণ রকমের সুন্দর। কারণ সমাপ্তি মানেই, আর কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকবে না। আর কোনো অপেক্ষা থাকবে না।”
সুমু মুখে হাত দিয়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। আরিয়ানের করুণ চিৎকার আর রায়য়ানের ভাবনার মাঝেই হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো। দুটি গুলি একসাথে আরিয়ান আর রায়য়ানের কপাল ভেদ করে মাথার পেছনের দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল।
সুমুর নিঃশ্বাস থেমে গেল। মনে হলো পৃথিবীটা ধসে পড়ল তার পায়ের নিচে। ঘরটাও নিস্তব্ধ। শুধু রক্তের শব্দ টুপ, টুপ, টুপ, করে অন্ধকার ঘরের মেঝেতে স্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
আরিয়ানের কপাল থেকে রক্তের রেখা বয়ে যাচ্ছে চোখের কোণ দিয়ে, আর রায়য়ানের কানপাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে ঠোঁট রাঙিয়ে দিচ্ছে। দুজনেই নিথর। দুজনেই শব্দহীন। দুজনের চোখের পাতা আর কেঁপে উঠল না। না, আরিয়ান আর একবার সুমুকে দেখার জন্য পাগলের মতো ভিক্ষা চাইল না। আজকের পর আর এই আরিয়ান চৌধুরী নামক অসহ্য লোকটা আর তাকে জ্বালাতে আসবে না, আর না রায়য়ান চৌধুরীর মতো কঠোর লোকটা আর তাকে নিঃশব্দে গোপনে ভালোবাসে, পাশে বন্ধু হয়ে দাঁড়াতে আসবে। আসবে না আর তারা। তাকাবে না আর তার দিকে। আজ থেকে যে সুমু মুক্ত। না, শুধু সুমু মুক্ত না। আজ থেকে এই দুই পাপী পুরুষও মুক্ত। আজ থেকে সুমু নামক এক বিবাহিত নারীর মায়া আর তাদের কষ্ট দিবে না। আজকের পর আর তারা একতরফা ভালোবাসার যন্ত্রণা ভোগ করবে না।
সুমু ভাবল, ‘মৃত্যু এত সহজ? এত তাড়াতাড়ি? এত নির্মমভাবে?’ তার গলা থেকে শব্দ বেরোল না, কিন্তু চোখের ভেতরের আতঙ্কটা যেন হাড়ে হাড়ে ছড়িয়ে পড়ল। তার চোখের সামনে দুটো জীবন শেষ হয়ে গেল—ঠিক যেন জ্বলন্ত মোমের ওপর হঠাৎ ঠাণ্ডা বাতাসের আঘাত। আগুন নিভে যায়—কিন্তু ধোঁয়াটাই বেশি ভয়ংকর লাগে। আর সবচেয়ে ভয়ের এখন শেরাজের মুখটা। না, আজ তাকে আর মানুষ মনে হলো না। না রাগ, না উল্লাস, না ব্যথা—শুধু পাথরের মতো ফাঁকা দেখাচ্ছে। চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু বিপজ্জনকভাবে গভীর। তার বাকি শিকারীদের থেকে আরিয়ান আর রায়য়ানকে সে যেন সহজ মৃত্যুই দিল, তবুও তাকে যেন আজ একটু বেশি-ই নিষ্ঠুর, বেশি-ই পাষাণ মনে হলো।
সুমু ভেঙে পড়ল। অনুভব করল—এই মুহূর্তটা শুধু ভয় আর নিষ্ঠুরতার নয়, বরং করুণতারও এক অসীম স্রোত। আরিয়ান, যে এতক্ষণ তার জন্য পাগলের মতো বুক ফাটিয়েছে, সে এখন নিথর। যে চোখ দিয়ে সে শেষবারের জন্য একবার তাকে দেখার জন্য আবেদন করেছিল, ও চোখগুলো এখন বন্ধ। রায়য়ান, যে এতক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিল, তার চোখগুলো এখন বন্ধ। তার মুখে আর কোনো শব্দ নেই। শুধু রক্তের স্রোত, এবং নিথর দেহের নিস্তব্ধতা। সুমু যেন সমস্ত করুণতার বীভৎস রূপ একবারে অনুভব করল, পৃথিবী কি এত নিষ্ঠুর হতে পারে? একটি চোখের পলকে ওদের দুজনের আবদার, আশা, ভালোবাসা— সব রক্তে মিশে গেল।
সুমুর কান্না বেরোচ্ছে না—শুধু বুকের ভেতর কেঁপে উঠছে। শ্বসন আটকে গেছে, মন কাঁপছে, হৃদয় থেমে গেছে। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে বুঝিয়ে বলতে লাগল,
খান সাহেব পর্ব ৮৩ (৩)
“এটা হতে পারবে না। এসব সত্যি হতে পারবে না।”
কিন্তু চোখ খুলতেই আবারও তিন পুরুষের নিষ্ঠুরতা, ভালোবাসা, প্রতিশোধ, করুণা— সবকিছুই একসাথে এক ঝলক দেখল সে। আর এই এক ঝলকে, এই এক মুহূর্তেই সে বুঝল, ‘আজ সে পৃথিবীর সবচেয়ে করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি’। যে বাস্তবতা সে চাইলেও কোনদিন বাদলাতে পারবে না।
