খান সাহেব পর্ব ৮৮
সুমাইয়া জাহান
ঢাকার ব্যস্ততা পেছনে ফেলে মাইক্রোবাসের বহর যখন সুমুদের শেখ বাড়ির সামনে এসে থামল, তখন সন্ধ্যার ম্লান আলো গাছের পাতায় আলসেমি করে লেপ্টে আছে। এই বাড়িটি শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়, এটি সুমুর অস্তিত্বের শিকড়। গাড়ির দরজা খুলতেই সুমুর নাকে ভেসে এলো মাটির সেই আদিম সোঁদা গন্ধ, যা ওমানের মরুভূমিতে সে হাজার খুঁজেও পায়নি।
বাড়ির সকলে সুমুদের জন্য অধীর অপেক্ষায়। সুমু গাড়ি থেকে নামতেই চারপাশে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। জেলফেরত মেজো ভাইয়ের মেয়েটাকে দেখে সাখাওয়াত সাহেবের বুকটা এক অজানা হাহাকারে ভরে উঠল। শামীম সাহেব যেন মেয়েকে দেখে পাথর হয়ে গেছেন। বাড়ির বড় ছেলে সজীব মাস খানেক হলো সৌদি আরব থেকে ফিরেছে। সে নিজেও সুমুকে দেখে হতভম্ব হয়ে রইল। কারণ সুমুর জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো কাহিনী তার অজানা নয়।
হাসি বেগম এতক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। সুমু টলমল পায়ে এগিয়ে গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াল, হাসি বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। এতগুলো বছরের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা আর সমাজের হাজারো কটু কথাকে উপেক্ষা করে তিনি তার কলিজার টুকরোকে জড়িয়ে ধরলেন। তার বুকফাটা কান্নায় শেখ বাড়ির আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
“আমার মা ফিরে এসেছে! আমার রাজকন্যা ফিরে এসেছে।”
হাসি বেগমের এই আর্তনাদে উপস্থিত সবার চোখের জল বাঁধ ভাঙল। সুমু মায়ের কাঁধে মাথা রেখে জীবনের সমস্ত ক্লান্তি বিসর্জন দিতে চাইল। পাশে রুমা বেগম আর সুমি বেগমও আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছেন। সুমি বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে শান্তনা দিচ্ছেন মুক্তাক সিকদার।
ভেতর থেকে লাঠিতে ভর দিয়ে বেরিয়ে এলেন অশীতিপর বৃদ্ধা মাজেরা বেগম। সুমুকে দেখে তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। সুমু দাদির কাছে এগিয়ে গেল। মাজেরা বেগম কাঁপাকাঁপা হাতে সুমুর মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে বললেন,
“বেঁচে থাক, বোইন।”
ড্রয়িংরুম তখন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। আইয়ুব, সারবাজ আর আরবাজরা তাদের স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বড়দের সালাম করল। আইয়ুবের কোলে ছোট্ট নিশান, আর আরবাজ কোলে রুহি। অন্যদিকে রাহিনের কোলে ফুটফুটে হাসফা আর শাহরুখের কোলে ছোট্ট আহিয়া। নতুন এই শিশুদের আগমনে শেখ বাড়ির শূন্যতা নিমেষেই পূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও দুজন মানুষ বড্ড অস্থির। রিয়াজ তার বড় ভাইয়কে খুঁজছে আর ফিরোজা তার লাভকে দেখার জন্য পাগলপ্রায়। রিয়াজ অস্থির হয়ে সামিয়াকে জিজ্ঞেস করল,
“ভাবিজি, আমার ব্রো কোথায়? আমি এখনই যাব ব্রো’র কাছে।”
ফিরোজাও বলতে লাগল,
“নিউ ফ্রেন্ড, এবার আমাকে আমার লাভের কাছে চলো।”
সুমু এগিয়ে এসে রিয়াজ আর ফিরোজার কাঁধে হাত রাখল। তার চোখ দুটো বড্ড শান্ত। সে নিচু স্বরে বলল,
“রিয়াজ, ফিরোজা—শান্ত হও। তোমাদের ভাইয়া এখানেই আছে, এই শহরেই। কিন্তু এখনো সময় হয়নি তার সাথে দেখা করার। ওনার একটু চিকিৎসার প্রয়োজন, একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। আমি কথা দিচ্ছি, খুব তাড়াতাড়ি তোমরা ওনাকে দেখতে পাবে।”
সুমুর কথার জাদুতে রিয়াজ কিছুটা দমল, কিন্তু তার দীর্ঘশ্বাসে শেরাজকে দেখার ব্যাকুলতা স্পষ্ট। আইয়ুব আর সারবাজ তাদের সামলে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল।
শামীম সাহেব টলমল পায়ে এগিয়ে এলেন। এতগুলো বছর পর নিজের মেয়েকে চোখের সামনে দেখছেন, কিন্তু তার দৃষ্টি আটকে গেল সুমুর দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফুটফুটে দুটো শিশুর ওপর। বিশেষ করে সিমরানকে দেখা মাত্রই শামীম সাহেবের পা দুটো যেন আর চলল না। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন ধুলোমাখা মাটিতে।
সিমরান বড় বড় চোখে তার নানার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই একই তীক্ষ্ণ ভ্রু, একই রাজকীয় চিবুক আর দুর্ধর্ষ সেই চাহনি—যে চাহনি একসময় শেরাজ খানের পরিচয় ছিল। শামীম সাহেব কাঁপা কাঁপা হাতে সিমরানের গাল ছুঁয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তিনি সুমুর দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে বললেন,
“মা রে, এ তো স্বয়ং শেরাজ ফিরে এসেছে। ওমানের সেই বাঘটা বুঝি আজ আমার বাড়ির ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়িয়েছে।”
সাখাওয়াত সাহেব আর রুমা বেগমও এগিয়ে এলেন। তারা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখছেন সিমরান আর শেরানকে। সিমরান তার ছোট ছোট হাতে রুমা বেগমের শাড়ির আঁচল ধরে টান দিয়ে বলল,
“তুমি তাঁতদছ তেন? আমাল মাম্মা বলেতে এই বালিতে অনেত চতনেট আর তেলনা আতে। তেলনা দাও, তান্না তরো না!”
সিমরানের কথা শুনে কান্নার রোলের মধ্যেও সবার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সুমি বেগম তাকে কোলে তুলে নিয়ে চুমুতে ভরিয়ে দিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ রে দাদুভাই, খেলনা-চকোলেট সব আছে। তুই শুধু আমাদের ঘরটা আলো করে থাক।”
ঠিক এই সময়ে এগিয়ে এলো নাতাশা। সুমুকে দেখা মাত্রই নাতাশা জড়িয়ে ধরল তাকে। কান্নায় তার কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। সে সুমুকে আঁকড়ে ধরে বলতে লাগল,
“ম্যাম, আপনি কেমন আছেন? আমি জানতাম আপনি নিরপরাধ, আমি জানতাম আপনি ফিরবেন।”
সুমু নাতাশাকে টেনে তুলল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“কেঁদো না নাতাশা। জেলের দেয়াল শরীরটা শুকিয়ে দিলেও আত্মাটাকে মারতে পারেনি। দেখো, আমি ঠিক ফিরে এসেছি।”
ফারিন, ফারিয়া, শাহরুখ, আশিক মিলে সুমুকে ঘিরে ধরল। ফারিন আর ফারিয়া একসাথে সুমু জড়িয়ে ধরল। সুমুও বোনদের আঁকড়ে ধরল।
ড্রয়িংরুমের এককোণে পিয়াস মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। এতগুলো বছর বয়ে গেছে জলধারার মতো, কিন্তু পিয়াসের মনের কোণে জমে থাকা সামিয়ার প্রতি সেই একতরফা ভালোবাসার চোরাবালি আজও তাকে সমানভাবে গ্রাস করে আছে।
সামিয়া হাসফাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পিয়াস দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার চোখে আজ কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু এক গভীর হাহাকার। সে বিড়বিড় করে নিজেকেই যেন শোনাল, “মানুষ বদলে যায়, ভাগ্য বদলে যায়, কিন্তু কারো কারো জন্য রাখা দীর্ঘশ্বাসটা কেন বদলায় না?”
আজ তার ছোট্ট সামু অনেক বড় হয়ে গেছে। সে এখন রাহিনের ঘর আলো করে থাকা এক সুখী গৃহিণী, এক সন্তানের মা, পিয়াস তা জানে, মানে, কিন্তু তার অবাধ্য মনটা বোধহয় মানতে চায় না।
সামিয়া হঠাৎ পিয়াসের দিকে তাকাতেই সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। এই লুকোচুরি খেলাটা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। পিয়াস জানে, এই ভালোবাসা তাকে কেবল দহনই দেবে, কোনোদিন পূর্ণতা দেবে না। তবুও সামিয়ার ওই হাসিমুখটুকু দেখার জন্য সে বারবার এই বাড়িতে ছুটে আসে, ঠিক যেমন আজ এসেছে ওমান থেকে ফেরা সুমুদের ভিড়ে সামিয়াকে একপলক দেখার তৃষ্ণায়। সে আবারও বিড়বিড় করে বলল,
“স্মৃতিদের মিছিলে না চাইতেও কত কিছু ধূসর হয়ে যায়, কত পরিচিত মুখ ধুলো জমে আড়ালে চলে যায়। তবে প্রহর শেষে প্রার্থনার জায়নামাজে বসে যখন আপনাকে ভুলতে চাই, ঠিক তখনই কেন আপনার নামটা হৃদস্পন্দনে আরও জোরালোভাবে বেজে ওঠে? বিস্মৃতি কি তবে আপনার মায়ার কাছে হেরে গেছে, নাকি আমার প্রার্থনায় কোনো খাদ ছিল?”
হঠাৎ শুরু হলো বাচ্চাদের নিয়ে এক অভাবনীয় হট্টগোল। হাসফা আর আহিয়া মুহূর্তেই সিমরান, রুহি, শেরান আর নিশানের সাথে মিশে গেল। শেখ বাড়ির ড্রয়িংরুমে এখন আর কোনো মাফিয়া জগতের অন্ধকার নেই, নেই কোনো ষড়যন্ত্রের গন্ধ। আছে শুধু এক ঝাঁক শিশুর কলকাকলি।
সিমরান তার ছোট বোন হাফসা, আহিয়া আর রুহির সাথে মিলে ড্রয়িংরুমের মধ্যে একটা বল নিয়ে ছুটোছুটি শুরু করল। সাখাওয়াত সাহেব হাসিমুখে বললেন,
“দেখ শামীম, মেয়েটার হাঁটাচলাও একদম ওর বাবার মতো।”
শামীম সাহেব মাথা নাড়লেন। সুমু হাসল, কিন্তু তার মনের কোণে তখন এক গভীর অস্থিরতা। সে জানে, এই পারিবারিক আনন্দটুকু পরম প্রশান্তি হলেও তার আসল গন্তব্য তার খান সাহেব। যেখানে তার প্রাণের মানুষটা আজ এক অচেনা আগন্তুক হয়ে আছে। সুমু ঘড়ির কাঁটার দিকে আড়চোখে তাকাল। সময় বয়ে যাচ্ছে। তাকে যেতে হবে।
রাতের খাবার শেষে পুরো বাড়ি কিছুটা শান্ত হতেই, সুমু রুমে এসে তার পুরোনো জানালার ধারে গিয়ে বসল। বাড়ির সবাই এখন বাচ্চাদের নিয়ে মেতেছে। সামিয়া আর ফারিয়া তাদের সন্তানদের সামলাতে ব্যস্ত। কিন্তু সুমুর মন পড়ে আছে শহরের সেই নিভৃত কোণে, যেখানে ‘এস.কে’ নামধারী একটা মানুষের স্মৃতির থেকে সুমু গভীর অতলে হারিয়ে গেছে। হঠাৎ সে স্যান্ডিকে কল করল।
“সান ভাইয়া, কনফারেন্স রুম রেডি তো? মিস্টার এস.কে-কে বলুন আমি আসছি।”
স্যান্ডির গম্ভীর উত্তর এলো,
“সব রেডি, ম্যাম! উনি আপনার ডিলের জন্য ওয়েট করছেন। উনি জানেন না ওমান থেকে আসা এই বিজনেস টাইকুন আসলে উনার নিজের স্ত্রী।”
সুমু ফোনটা রেখে অন্ধকার ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল। আপাতত ড্রয়িংরুমে কেউ নেই। বাচ্চাদের আওয়াজ শামীম সাহেবের ঘর থেকে আসছে। সুমু আবারও গিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। অপেক্ষা সকলের ঘুমিয়ে পড়ার।
রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে শেখ বাড়ির কলকাকলি ধীরে ধীরে আরও স্তিমিত হয়ে এলো। ওমান থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া আর বাংলাদেশে নামার পর এই দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল সবার চোখেমুখে ক্লান্তির ছায়া ফেলে দিয়েছে। একে একে আইয়ুব, নিহাল, সারবাজ যার যার রুমে বিশ্রামের জন্য চলে গেল। বাড়ির বড়রাও আজ অনেক আবেগের আতিশয্যে শরীর এলিয়ে দিয়েছেন বিছানায়।
পুরো বাড়িটা এখন নিঝুম, সুমু তার ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকার বাগানটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার পরনে তখনো সেই সাদা শাড়ি, যা সে জিয়ারতের সময় পরেছিল। তার মাথায় ঘুরছে কেবল একটাই চিন্তা—কীভাবে আজ রাতে চুপিচুপি বের হওয়া যায়।
ঠিক সেই সময় দরজায় টোকা পড়ল। সুমু পেছন ফিরতেই দেখল সিমরান আর শেরান দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে ঘুম নেই। শেরান এগিয়ে এসে সুমুর হাত ধরে বলল,
“মাম্মা, আত তি আমলা তোমাল তাতে না তুয়ে দাদু আর দিদুনের তাতে তুতে পারি? দিদুন আমাদেল অনেত চুন্দর রূপততার দল্প শোনাবে বনেছে।”
সিমরানও পাশ থেকে মাথা নেড়ে সায় দিল,
“হ্যাঁ মাম্মা! নানুভাই আমাদেল জন্য ততগুলো চতনেট বালিতের নিতে লুতিয়ে রেতেছে। আজ আমলা ওথানেই থাতব। তুমি নাগ তলবে না তো?”
সুমুর জানে, ওরা সাথে থাকলে আজ রাতে তার বেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব হবে। সে হাঁটু গেড়ে বসে দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তাদের কপালে পরম মমতায় চুমু খেয়ে বলল,
“না মাম্মা, মাম্মা একদম রাগ করবে না। বরং আমি খুব খুশি যে তোমরা নানু আর দিদুনকে সময় দেবে। যাও, সাবধানে থেকো আর বেশি রাত করো না কিন্তু।”
বাচ্চারা হাসিমুখে লাফাতে লাফাতে পাশের ঘরে চলে গেল। সুমু দেখল তার মা হাসি বেগম দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছেন। হাসি বেগম মৃদু হাসলেন।
“তুই চিন্তা করিস না সুমু, ওরা আমার কাছে আরামে থাকবে। তুই অনেক ক্লান্ত মা, এবার একটু ঘুমিয়ে নে।”
সুমু হাসার চেষ্টা করল,
“হ্যাঁ আম্মু, আমি এখনই শুয়ে পড়ব।”
হাসি বেগম চলে যেতেই সুমুর শরীরের সমস্ত জড়তা যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। সে দ্রুত কাবার্ড খুলে বের করে আনল তার সেই চিরাচরিত ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট আর ডার্ক জিন্স। চুলের খোপাটা খুলে শক্ত করে পনিটেল করে নিল।
সে দেখল ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট। বাড়িতে এখন সকলের প্রায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সুমু বেরোতে গিয়েও আবার থেমে গেল। না, এভাবে সে যাবে না। নিজেকে তার খান সাহেবের মনের মতো করে সাজিয়ে তুলতে হবে।
সে ফোনটা বেডের ওপর রেখে কাবার্ড খুলে একটি উজ্জ্বল কুচকুচে কালো রঙের শাড়ি বের করে আনলো। শাড়ির কাপড়টি মসৃণ ও সিল্কি ধাঁচের। শাড়ির আঁচল এবং পাড় জুড়ে কালো রঙের সিকুইনের কাজ করা বর্ডার রয়েছে। শাড়ির সাথে মিলিয়ে সে একই রঙের কালো সিকুইন করা গর্জিয়াস ব্লাউজ বের করল। ব্লাউজটি ফুল স্লিভ এবং গলার অংশটি ভি আকৃতির। সে শাড়িটার ওপর একবার হাত বুলিয়ে চেঞ্জ করার ওয়াশরুমে চলে গেল।
মিনিট দশেক পর বেরিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে বসল। গলায় সে একটি ভারি এবং কারুকার্যমণ্ডিত ডায়মন্ড পাথরের নেকলেস পরে নিল। কানে একই ঝুমকো ধাঁচের দুল। দু’হাতের আঙুলে আংটি পরে নিল। চোখ দুটোকে হাইলাইট করার জন্য মাশকারা ব্যবহার করল। তার সিল্কি, লম্বা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে রাখল। নখে মেরুন রঙের নেলপলিশ খুব ধীরে যত্ন করে পরল। সাজ শেষ হতেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের এই ক্লাসিক লুকটি বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ফ্লন্ট করে কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ নিল।
বাড়ির সবাই এখন ঘুমে। সুমু নিঃশব্দে গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে জানে, মস্তিস্ক ভুলে গেলেও হৃদপিণ্ড হয়তো তার মালিককে ঠিকই চিনে নেবে। সুমু খুব সাবধানে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। সদর দরজার ছিটকিনিটা এমনভাবে খুলল যাতে বিন্দুমাত্র শব্দ না হয়। বাইরে বেরোতেই ঝিরঝিরে ঠাণ্ডা হাওয়া তার মুখে এসে লাগল। গ্যারেজের এক কোণায় শাহরুখের কালো এসইউভি গাড়িটা রাখা। সুমু চাবি দিয়ে গাড়িটা স্টার্ট দিল খুব ধীর গতিতে।
গাড়িটা শেখ বাড়ির ফটক পার হয়ে মেইন রোডের দিকে মোড় নিল, সুমু লুকিং গ্লাসে একবার তার ফেলে আসা বাড়ির দিকে তাকাল। সেখানে তার মা, বাবা আর কলিজার টুকরো দুটো শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলল,
“খান সাহেব, তৈরি থাকুন। আপনার সুইটহার্ট আসছে আপনাকে আবারও তার মায়ায় বন্দী করতে।”
সেগুন কাঠের ভারী টেবিলের দুই প্রান্তে দুজন শিকারি যেন একে অপরের শক্তি পরিমাপ করছে। ঘরের আলোটা মৃদু হলেও আবহাওয়াটা এখন বরফশীতল। সুমু তার কুচকুচে কালো শাড়ির আঁচলটা সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়ে পেশাদার ভঙ্গিতে বসে আছে। তার চোখের চাহনিটা তীরের মতো তীক্ষ্ণ।
শেরাজ তার দুই হাতের আঙুলগুলো একের ভেতর অন্যটি ঢুকিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। তার পেশীবহুল শরীরটা চেয়ারে হেলান দেওয়া। সে একবার সুমুর চোখের দিকে তাকাল, তারপর খুব দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। কেন জানি না, এই নারীটির চোখের দিকে তাকালে তার মস্তিস্কের ভেতরে একটা শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে, যা আগে কখনো হয়নি।
স্যান্ডি ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে পাথরের মতো দেখছে। তার ভেতরটা রীতিমতো কাঁপছে। ওমানের সেই রয়্যাল দম্পতি আজ পাঁচ বছর পর আবারও মুখোমুখি, কিন্তু একজন অন্যজনকে চেনে না।
শেরাজ গম্ভীর গলায় কথা শুরু করল,
“দেখুন মিসেস… দুঃখিত, আপনার নামটা আমার জানা হয়নি। স্যান্ডি শুধু বলেছে ওমান থেকে একজন ইনফ্লুয়েনশিয়াল ইনভেস্টর এসেছেন। তো, আপনার অফারটা কী? সরাসরি পয়েন্টে কথা বলাই ভালো, আমি অকারণ গল্প একদম পছন্দ করি না।”
সুমু একটু হাসল। সেই হাসিতে খেয়ালীপনা, যেন সে সামনে থাকা মানুষটার কঠোরতা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। সে তার ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করে শেরাজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“বিজনেসে মানুষ শুধু পয়েন্ট খোঁজে মিস্টার এস.কে, কিন্তু আমি খুঁজি বিশ্বাস। ওমানে বসে আমি আপনার পুরোনো প্রজেক্টগুলো স্টাডি করেছি। আপনার কাজের ধরন বড্ড একগুঁয়ে, অনেকটা একরোখা বাজিগরের মতো।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকাল। ফাইলটা না খুলেই বলল,
“বাজিগর? বিজনেস কি আপনার কাছে জুয়া খেলা মনে হয়?”
সুমু চেয়ারে একটু এগিয়ে এসে বসল। তার চোখের মণি তখন শেরাজের চোখের মণির ওপর স্থির। সে মখমলের মতো মোলায়েম সুরে বলল,
“সব বিজনেসই তো আসলে এক ধরণের বাজি, খান সাহেব। কেউ টাকা বাজি রাখে, আর কেউ রাখে তার অস্তিত্ব। ওমানের সেই রাজত্ব থেকে আপনি আজ বাংলাদেশের এই ছোট্ট শহরে— এটাও কি একটা বাজি নয়?”
শেরাজ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ‘খান সাহেব’ সম্বোধনটা যখন সুমুর ঠোঁট থেকে বের হলো, তখন শেরাজের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে হাতের কলমটা শক্ত করে ধরল। কেন যেন মনে হলো, এই নারীর কথা বলার ভঙ্গি, তার বসার স্টাইল—সবই তার খুব চেনা।
স্যান্ডি দেখল শেরাজের কপালে এক বিন্দু ঘাম জমেছে। সে জানে, সুমু এখন দাবার চালটা খুব সূক্ষ্মভাবে দিচ্ছে।
শেরাজ নিজেকে সামলে নিয়ে ফাইলটা খুলল। পাতার পর পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল,
“আপনার দেওয়া ডিলটা লজিক্যাল। ফিফটি-ফিফটি শেয়ারে জয়েন্ট ভেঞ্চার করা সম্ভব। কিন্তু আপনি কি শুধু প্রফিটের আশায় এসেছেন? কারণ ওমান থেকে বাংলাদেশে এসে ইনভেস্ট করার কোনো যৌক্তিক কারণ আমি দেখছি না।”
সুমু তার পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা খোলা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে নিয়ে খুব আলতোভাবে বলল,
“মানুষ সবসময় লজিক দিয়ে চলে না মিস্টার এস.কে। মাঝে মাঝে কিছু হারিয়ে যাওয়া জিনিস উদ্ধার করতেও মানুষকে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে হয়। আমি শুধু বিজনেসের মুনাফা নিতে আসিনি, আমি এসেছি এমন এক পার্টনারের খোঁজে—যাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়।”
শেরাজ ফাইলের দিকে তাকিয়ে থেকেও যেন কিছু দেখছে না। তার চোখের সামনে বারবার সুমুর সেই মায়াবী চোখ দুটো ভেসে উঠছে। সে ফাইলটা সশব্দে বন্ধ করে দিয়ে সুমুর দিকে সোজা হয়ে তাকাল।
“আপনি খুব চমৎকারভাবে কথা বলেন, ম্যাম। কিন্তু মনে রাখবেন, বিজনেস টেবিলে আমি আবেগপ্রবণ হই না। আপনার ডিলটা আমি কনসিডার করব। তবে…”
সুমু মাঝপথেই কথা কেড়ে নিল। সে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল,
“তবে কি? আপনি কি আমাকে পরখ করতে চান? মনে রাখবেন মিস্টার, আপনি যাকে পরখ করতে চাইছেন, সে আপনার পুরো রাজত্বটা নিজের হাতের তালুর মতো চেনে। ডিলটা সই হবে কি হবে না, সেটা আপনার ওপর নয়—আমার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।”
সুমু আবারও বসে পড়ল। শেরাজ বাঁকা হেসে খুব মন দিয়ে ফাইলের একটা ক্লজ পড়তে শুরু করল। সুমু বিরক্ত হয়ে গেল। সে হঠাৎ খুব নিচু স্বরে বলল,
“এক মিনিট মিস্টার এস.কে! আপনার গালে কিছু একটা লেগে আছে।”
শেরাজ থমকে গেল। অত্যন্ত সচেতন এই মানুষটি নিজের পরিপাটি থাকা নিয়ে সব সময় খুঁতখুঁতে। সে ভ্রু কুঁচকে ফাইল থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী? কোথায়?”
সে নিজের হাত দিয়ে গালটা ঘষার চেষ্টা করতেই সুমু ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল। খুব সাবলীল ভঙ্গিতে সে বলল,
“আরে ওটা মুছলে কি আর যাবে? ওটা তো আপনার জন্মগত কিউটনেস। ওটা মুছার সাধ্য আপনার নেই।”
শেরাজের হাতের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা স্যান্ডি বিষম খাওয়ার উপক্রম করল। সে ভাবতেই পারেনি পাঁচবছরের আগে দেখা ওমানের সেই রাশভারী সুমু এখানে এসে এমনভাবে ফ্লার্ট করবে।
শেরাজের মুখভঙ্গি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল। তার পৌরুষে যেন কিছুটা আঘাত লাগল। সে চেয়ারটা সামান্য পিছিয়ে নিয়ে সুমুর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“ম্যাম! আপনি কি এখানে বিজনেস ডিল করতে এসেছেন নাকি বাকি নারীদের মতো আমাকে অ্যাপ্রোচ করতে? মনে রাখবেন, এই ডেস্কে বসে আমি অসভ্যতা একদম পছন্দ করি না।”
শেরাজের মুখে বাকি নারী শব্দটা শুনে সুমুর বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠল। সে নিজেকে সামলে মনে মনে সে এক চিলতে রাগ নিয়ে বলল,
“বড় এসেছেন নীতিবান পুরুষ। অন্য কোনো মেয়ে হলে তো এতক্ষণে গলে জল হয়ে যেতেন। আর কত মেয়ে যে আপনাকে এভাবে পটানোর চেষ্টা করে কে জানে।”
শেরাজকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুমু আবারও সেই মায়াবী হাসিটা ঠোঁটে টেনে বলল,
“না মিস্টার এস.কে, আপনি ভুল বুঝছেন। আমি আসলে হ্যান্ডসাম পুরুষদের প্রশংসা করতে জানি, এটা আমার একটা স্বভাব। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো—আপনি জানেন না।”
শেরাজ কিছুটা কৌতূহলী হলো, “কী জানি না আমি?”
“সুন্দরী মেয়েদের প্রশংসা করতে জানেন না। আপনার সামনে একজন গর্জিয়াস লেডি বসে আছে, আর আপনি কিনা তাকে অ্যাপ্রোচ করার অপবাদ দিচ্ছেন? আপনার এই নিরামিষ ব্যবহার তো বিজনেসের জন্য মোটেও ভালো নয়।”
শেরাজ হালকা ব্যঙ্গাত্মক হাসল। তার সেই চেনা বাঁকা হাসিটা দেখে সুমুর কলিজাটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। শেরাজ ফাইলটা একপাশে ঠেলে দিয়ে বলল,
“প্রশংসা দিয়ে পেট ভরে না, ম্যাম। কাজের কথায় আসি—দিনের আলো থাকতে এই গভীর নাইটে মিটিং ডাকার কারণটা কী? বিজনেস মিটিং কি দিনের আলোয় করা যেত না?”
“অন্ধকারে মানুষকে আমি খুব ভালো চিনতে পারি, মিস্টার এস.কে। দিনের আলোয় তো সবাই মুখোশ পরে ঘোরে, কিন্তু অন্ধকারের নির্জনতায় মানুষের আসল সত্তাটা বেরিয়ে আসে। তাছাড়া…” সে একটু থামল, তারপর ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল, “অন্ধকার আমার খুব পছন্দের। নাউ, সাইনটা করে দিন।”
শেরাজ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই নারীর প্রতিটি শব্দ তার অবচেতন মনে তপ্ত সীসার মতো বিঁধছে। তার মনে হচ্ছে, এই অন্ধকার কনফারেন্স রুমে তিনি নন, বরং এই মায়াবী নারীটিই সব নিয়ন্ত্রণ করছে।
স্যান্ডি ঘড়ির দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছে, সুমু আজ রাতের জন্য তার কাজ করে দিচ্ছে। এগুলোই আজ রাতে তার স্যারের মস্তিস্কে ঝড় তুলবে।
শেরাজ এখনো স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল। একজন নারী তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকেই চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে? অথচ তার রাগ হচ্ছে না, বরং মনে হচ্ছে এই নারীটির সামনে সে কত ছোট। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে একটু গম্ভীর হলো। সে টেবিলের ওপর রাখা ড্রাফট পেপারটার দিকে একবার তাকিয়ে সুমুর দিকে চোখ ফিরিয়ে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বেশ কাটখাট্টা গলায় বলল,
“ম্যাম, এই কনট্রাক্টটা অনেক বড়। এর প্রতিটি ক্লজ না বুঝে আমি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে পারছি না। আমি এখনই এটা সই করছি না। আমার একটু সময় প্রয়োজন। আমি এ বিষয়ে পরে ভেবে আপনাকে জানাব, তারপর দিনের কোনো এক সময়ে মিটিং রেখে আমরা সাইন করার ব্যবস্থা করব।”
শেরাজের এই পেশাদার দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা দেখে সুমু ভেতরে ভেতরে একটু হাসল। তার সেই খেয়ালী মনটা যেন আরও জেদি হয়ে উঠল। সে চেয়ার থেকে ওঠার উপক্রম করেও আবার একটু ঝুঁকে বসল।
“দিনকাল তো খুব খারাপ মিস্টার এস.কে। অনেক সময় পরের জন্য কিছু ফেলে রাখলে সেটা হাতছাড়া হয়ে যায়। দিনের আলোয় তো সবাই কাগজপত্রে সাইন করে, সেটা তো খুব সাধারণ।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে আপনি কী চান?”
সুমু কণ্ঠস্বরটা আরও খাদে নামিয়ে আনলো,
“সাইনটা যে এই বিজনেস কনট্রাক্ট পেপারেই করতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। আপনার যদি খুব ইচ্ছে হয়, তবে আপনি চাইলে রেজিস্ট্রি পেপারেও সাইন করতে পারেন। আমার কিন্তু কোনো আপত্তি নেই।”
কথাটা বলেই সুমু নিজের চোখের পলক একবার মায়াবী ভঙ্গিতে ফেলে শেরাজের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
ঘরের কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা স্যান্ডি যেন স্তম্ভিত। সে মনে মনে ভাবল, “সর্বনাশ! ম্যাম তো ডিরেক্ট বিয়ের প্রস্তাবের ইঙ্গিত দিয়ে দিল। এই স্মৃতিভ্রষ্ট বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে এতো সাহস কোথায় পায়?”
শেরাজ কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলল। রেজিস্ট্রি পেপার শব্দটা তার কানে গিয়ে বাজার পর তার হৃৎপিণ্ডটা এক লাফে কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। একজন বড় মাপের ইনভেস্টরের প্রথম মিটিংয়েই এমন দুর্ধর্ষ রসিকতা—নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর ইঙ্গিত আছে?
শেরাজ নিজেকে কিছুটা শক্ত করে বলল,
“রেজিস্ট্রি পেপার? আপনি কি রসিকতা করছেন মিসেস…?”
“রসিকতা কি না, সেটা না হয় সময়ের ওপর ছেড়ে দিলাম। তবে মনে রাখবেন, আমি একবার কোনো পেপারে সাইন করালে সেখান থেকে ফিরে আসার রাস্তা আমি নিজেই বন্ধ করে দিই। আপনার সেই সাহস আছে তো?”
শেরাজের কপালে চিন্তার ভাজ গভীর হলো। তার ভেতরের সেই কঠোর ডিসিপ্লিনড সত্তাটা যেন ফুঁসে উঠল। সে চেয়ার ছেড়ে সশব্দে উঠে দাঁড়াল। কক্ষের তাপমাত্রা যেন কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল মুহূর্তেই। সে স্থির দৃষ্টিতে সুমুর দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল,
“ম্যাম, আপনি অসভ্যতা করছেন।”
সুমু যে এই প্রতিক্রিয়ার জন্য তৈরি ছিল না, তা নয়। তবে শেরাজের এই অসভ্যতা শব্দটা তার কানে গিয়ে একদম তীরের মতো বিঁধল। অথচ সে ঘাবড়াল না। বরং খুব ধীরস্থিরভাবে বলল,
“অসভ্যতা? আমার কথাগুলো কি আপনার কাছে খুব বেশি অশোভন মনে হলো মিস্টার এস.কে? নাকি আপনি নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে ঢাকতে আমাকে এই অপবাদ দিচ্ছেন?”
“বিজনেস ডিল নিয়ে কথা বলতে এসে আপনি রেজিস্ট্রি পেপারের অফার দিচ্ছেন। এটাকে আপনি আর কী বলবেন? আপনি কি সব পুরুষকেই এভাবে হ্যান্ডেল করেন?”
“সব পুরুষের জন্য তো আর এই সুমু কালো শাড়ি পরে আসে না, মিস্টার। আর রেজিস্ট্রি পেপারের কথা শুনে আপনার এত রাগ কেন হচ্ছে? একজন সুন্দরী নারী যদি আপনাকে আপনার অজান্তেই কোনো অধিকার দিতে চায়, সেটা কি আপনার কাছে অসভ্যতা মনে হয়?”
শেরাজ তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে স্যান্ডির দিকে তাকাল, যেন সাহায্য খুঁজছে। তারপর আবার সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি অধিকার বা মায়া—কোনোটাতেই বিশ্বাসী নই। আমি শুধু কাগজ আর কলম চিনি। আপনার সাথে আমার পরিচয় মাত্র আধঘণ্টার। এই স্বল্প সময়ে আপনি যা করছেন, তা একজন ডিগনিফাইড বিজনেসওম্যানের সাথে যায় না।”
সুমু তার এক হাত টেবিলের ওপর রেখে শেরাজের চোখের দিকে খুব গভীরে তাকিয়ে বলল,
“কীসের বিজনেস ডিল মিস্টার এস.কে? এই কাগজের টুকরোগুলো তো যেকোনো সময় ছিঁড়ে ফেলা যায়। আসল কথা বলি—আপনাকে না আমার বড্ড ভালো লেগে গেছে। আপনি মানুষটা বড্ড বেশি সুন্দর।”
শেরাজ কিছু বলতে যাবে, তার আগেই সুমু তাকে থামিয়ে দিয়ে একদম নিচু স্বরে বলল,
“সোজা কথায় আসি—বিয়ে করবেন কি না বলুন? কারণ আমি ভাবছি আপনাকে আমি আর হাতছাড়া করব না।”
“হোয়াট? আর ইউ ক্রেজি?”
“আরে শোনেনই না! আমাকে বিয়ে করলে কিন্তু আপনার লাভই লাভ। কারণ আমাকে বিয়ে করলে আমার সাথে আরও কিছু জিনিস আপনি ফ্রি পাবেন। ওটাকে কী বলে আপনাদের বিজনেসের ভাষায়? ওহ হ্যাঁ, বোনাস।”
শেরাজ পুরো হতভম্ব। স্যান্ডি দেওয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিজের হাসি চাপার চেষ্টা করছে। শেরাজ রাগী চোখে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কীসের ফ্রি?”
“আমাকে বিয়ে করলে সাথে দুটো বাচ্চাও পাবেন। মানে সুন্দরী বউয়ের সাথে দুটো কিউট বেবি একদম ফ্রি। আপনাকে আর কষ্ট করে বেবি নেওয়ার ঝামেলার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। সব একদম রেডিমেড তৈরি আছে। বলুন, এমন লাভজনক অফার আর কেউ দেবে আপনাকে?”
“আপনি… আপনি কি আজ কোনো ড্রাগস নিয়ে এখানে এসেছেন? নাকি কোনো সস্তা সিনেমার স্ক্রিপ্ট আমাকে শোনাচ্ছেন? আপনি নিজের বাচ্চাদের কাউকে ফ্রি দেওয়ার কথা বলছেন?”
“অফারটা তো খারাপ না। ভেবে দেখবেন। আমার বেবিরা কিন্তু দেখতে একদম আপনার মতোই—জেদি, একরোখা আর ঠিক আপনার মতোই কিউট।”
শেরাজ স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“স্যান্ডি! এই পাগল মহিলাকে এখনই এখান থেকে নিয়ে যাও। সি ইজ ড্যাঞ্জারাস।”
সুমু এবার তার চূড়ান্ত চালটি চালল। সে ধীরস্থিরভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সুমু চলে যাবে ভেবে শেরাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। কিন্তু তার ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে সুমু সরাসরি শেরাজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শেরাজ তার কঠোর ভঙ্গি বজায় রাখার চেষ্টা করলেও সুমুর এই আকস্মিক পদক্ষেপে কিছুটা হকচকিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
সুমু শেরাজের বসার চেয়ারের হাতল ধরে তাকে নিয়ে দিয়ে ঘুরিয়ে দুই হাতলে নিজের হাত রেখে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার লম্বা, সিল্কি চুলগুলো পিঠ থেকে আলগা হয়ে শেরাজের মুখের সামনে ঝুলে পড়ল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সুমুর চুলের সেই চিরাচরিত ঘ্রাণ শেরাজের নাসারন্ধ্রে গিয়ে এক প্রবল আঘাত হানল।
শেরাজ যেন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল। এক অদৃশ্য মোহে আচ্ছন্ন হয়ে সে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। তারপর দীর্ঘ এক প্রশ্বাসে সুমুর চুলের ঘ্রাণ বুক ভরে টেনে নিল। শেরাজের এই অবস্থা দেখে সুমুর মনের পর্দায় স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে পাঁচ বছর আগের সময়গুলো ভেসে উঠল। শেরাজ যখন তার সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী খান সাহেব ছিল, তখন তার চুলের ঘ্রাণ নেওয়া ছিল শেরাজের সবচেয়ে প্রিয় এবং অবাধ্য এক অভ্যাস। মস্তিস্ক হয়তো স্মৃতিগুলো ধুয়ে মুছে দিয়েছে, কিন্তু শরীরের কোষগুলো যেন আজও সেই পুরনো অভ্যাস ভোলেনি।
শেরাজ আবারও চোখ মেলে তাকাল, তার দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত ঘোর। সুমু ভ্রু নাচিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল,
“আপনি কি জানেন মিস্টার এস.কে, আমাদের দুজনের মধ্যে একটা জায়গায় অনেক মিল আছে?”
শেরাজ তখনো সুমুর চুলের ঘ্রাণের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সে সম্মোহিতের মতো ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কীসের মিল?”
“বলছি! তার আগে বলুন তো, আপনি কি নিজেকে ভালোবাসেন?”
“অবশ্যই বাসি!”
সুমু তার একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“মিলটা হলো, আপনিও নিজেকে ভালোবাসেন, আর আমিও আপনাকে ভালোবাসি। তার মানে কী দাঁড়াল? আমরা দুজনেই একটি মানুষকে ভালোবাসি।”
কথাটা বলেই সুমু সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে বিজয়ী বাঘিনীর মতো বাঁকা হাসি। শেরাজ পাথর হয়ে নিজের চেয়ারে বসে রইলেন। ‘আমরা দুজনেই একই মানুষকে ভালোবাসি’—এই বাক্যটি তার মস্তিস্কের প্রতিটি তন্ত্রীতে এক তীব্র ঝঙ্কার তুলল। সে বুঝতে পারছে না, এই নারী তাকে ধ্বংস করতে এসেছে নাকি বিজনেস করতে।
কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা স্যান্ডি দেখল, শেরাজের হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। সে মনে মনে ভাবল, “অভ্যাস কোনোদিনও ভুলে যাওয়া যায় না, স্যার। আপনি যতই নিজেকে নতুন মানুষ ভাবুন না কেন, আমার ম্যামের মায়ার কাছে আপনাকে বার বার হার মানতেই হবে।”
সুমু তার ব্যাগটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
“আজকের জন্য এইটুকুই। ডিলের বাকি কথা না হয় কোনো এক আলো-ছায়ার বিকেলে হবে। ভালো থাকবেন, মিস্টার কিউট!”
স্যান্ডি এগিয়ে এসে দরজার পাল্লা খুলে দিল। সুমু চলে যাওয়ার সময় আবারও একবার শেরাজের দিকে তাকাল। সে জানে, আজকের রাতের জন্য এইটুকুই যথেষ্ট। শেরাজকে সে এক বিশাল গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে বের হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হলো ভালোবাসা।
শেরাজ উঠে দাঁড়িয়েও ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। তার বুকটা প্রবলভাবে ওঠানামা করছে। হার্টবিট তখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। স্যান্ডি এগিয়ে এসে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে ভাবল—আগামীকাল সকালে এই বাড়িতে যে প্রলয় আসতে যাচ্ছে, তার জন্য হয়তো কোনো সাইক্লোন শেল্টারও যথেষ্ট হবে না। শেরাজ স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে বলল,
“স্যান্ডি, এই মহিলা কে? উনি কেন আমাকে খান সাহেব বলে ডাকছিল? আর ওনার গায়ের পারফিউমটা… ওটা কেন আমার এতো চেনা লাগছে?”
স্যান্ডি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,
“স্যার, পৃথিবীতে কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর না পেলেই বোধহয় জীবনটা রহস্যময় হয়। উনি আপনার নতুন পার্টনার, এটুকুই জেনে রাখুন।”
বাইরে গাড়িতে উঠে সুমু চোখ বুজল। তার শরীরটা কাঁপছে। সে জানে, আজকের রাতের এই আলাপটুকু শেরাজ খানকে সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে দেবে না। তার হারানো খান সাহেবকে ফিরে পাওয়ার লড়াইটা ঠিক এখান থেকেই শুরু হলো। সে মনে মনে বলল,
“খুব শীঘ্রই আপনার মস্তিস্ক হার মানবে, খান সাহেব। আপনার সুইটহার্ট ফিরে এসেছে।”
স্যান্ডি ফাইলটা হাতে নিল। শেরাজ চেয়ারে হেলান দিয়ে কপালে হাত রাখল। তার মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে আবারও বেরিয়ে এলো,
“স্যান্ডি, এই মেয়েটা কি পাগল? নাকি উনি আমাকে পাগল করার জন্য এসেছে? উনি রেজিস্ট্রি পেপারের কথা কেন বলল?”
“স্যার, সব সই কলম দিয়ে হয় না, কিছু সই ভাগ্য দিয়েও হয়। তাছাড় ম্যাম কিন্তু অনেক সুন্দরী। আপনার জন্য একদম পারফেক্ট। দারুণ মানাবে আপনাদের।”
স্যান্ডির এই অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে শেরাজ যেন আকাশ থেকে পড়ল। কনফারেন্স রুমের সেই গুমোট করা নিস্তব্ধতায় স্যান্ডির কথাগুলো যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দিল। শেরাজ তার টেবিলের ওপর রাখা একটা ভারি পেপারওয়েট সজোরে চেপে ধরল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, কপালে ধপধপ করছে রাগের শিরা। সে স্থির দৃষ্টিতে স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“স্যান্ডি! তুমিও কি ওই পাগল মেয়েটার সাথে হাত মিলিয়েছ? উনি আমার ফেসভ্যালু নিয়ে মজা করল, আমাকে বিয়ে করার মতো ধৃষ্টতা দেখাল, এমনকি বাচ্চা পর্যন্ত ফ্রি দিতে চাইল—আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওনার রূপের প্রশংসা করছ?”
স্যান্ডি একটুও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে মেঝের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল, তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল,
“স্যার, রাগ করবেন না। আমি শুধু একটা সত্যি কথা বললাম। আপনি ওনাকে পাগল বলুন আর যাই বলুন—ম্যাম কিন্তু আসলেই বেশ সুন্দরী। শুধু সুন্দরী বললে ভুল হবে, ওনার মধ্যে এমন এক ধরণের আভিজাত্য আর তেজ আছে, যা আমি আগে কোনো বিজনেসওম্যানের মধ্যে দেখিনি।”
স্যান্ডি একটু থেমে শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও বলল,
“আর আপনি কি একবারও খেয়াল করেছেন স্যার? উনি যখন আপনার দিকে তাকিয়ে ‘খান সাহেব’ বলে ডাকছিলেন, তখন আপনার নিজের অবস্থাও খুব একটা স্বাভাবিক ছিল না। আপনিও কিন্তু ওনার চোখের মায়া থেকে নিজেকে সরাতে পারছিলেন না।”
শেরাজ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। স্যান্ডির কথাগুলো তীরের মতো তার বুকের একদম গভীরে গিয়ে বিঁধল। সত্যিই তো, মেয়েটা যখন কাছে এসেছিল, তখন তার সেই পারফিউমের তীব্র ঘ্রাণ আর চোখের ওই মায়াবী চাহনি তার মস্তিস্কের কোনো এক অন্ধকার কোণায় হাহাকার তুলেছিল। কিন্তু নিজের দম্ভ আর বর্তমান পরিচয়ের খাতিরে সে সেটা স্বীকার করতে পারছে না।
শেরাজ সজোরে টেবিল চাপড়ে বলল,
“থামাও তোমার এই বাজে বকবক। উনি সুন্দরী নাকি কুৎসিত তা দিয়ে আমার কোনো কিছু যায় আসে না। আমি শুধু জানি, উনি আমার বিজনেস প্রোটোকল ভেঙেছে। আর কাল উনি যদি সত্যিই ওনার ওই তথাকথিত ফ্রি গিফট মানে বাচ্চাদের নিয়ে আমার বাড়িতে আসে, তবে আমি ওনাকে পুলিশের হাতে তুলে দেব।”
স্যান্ডি এবার একটু বাঁকা হাসল। সে মনে মনে ভাবল, “পুলিশের হাতে তুলে দেবেন? নিজের কলিজার টুকরোদের সামনে দাঁড়ানোর পর আপনি নিজেকেই সামলাতে পারবেন না, পুলিশ তো দূরের কথা।” সে মুখে শুধু বলল,
“ঠিক আছে স্যার! রাত অনেক হয়েছে, আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন। আমি ফাইলগুলো নিয়ে নিচ্ছি।”
খান সাহেব পর্ব ৮৭
শেরাজ আর কোনো কথা বলল না। সে বড় বড় পা ফেলে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে নিজের বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু সুমুর সেই কথা আর তার চোখের চাহনি তাকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থির হতে দিচ্ছে না।
পুরো বাংলো যখন নিস্তব্ধ, শেরাজ তখন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শহরের অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কানে অনবরত বাজছে সুমুর সেই খামখেয়ালি কণ্ঠ— ‘আমাকে বিয়ে করলে দুটো বাচ্চা ফ্রি পাবেন’।
শেরাজ নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলল,
“কে এই মেয়ে? কেন ওনাকে দেখে আমার ভেতরে এক অদ্ভুত দহন শুরু হলো? কেন মনে হচ্ছে ওই কালো শাড়িটা উনি শুধু আমার জন্যই পরে এসেছিলেন?”
