Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৮৯

খান সাহেব পর্ব ৮৯

খান সাহেব পর্ব ৮৯
সুমাইয়া জাহান

​তপ্ত দুপুরের কড়া রোদ পিচঢালা রাস্তার ওপর যেন আগুনের হলকা ছড়াচ্ছে। স্যান্ডি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গাড়ি চালাচ্ছে, কিন্তু পেছনের সিটে বসে থাকা শেরাজের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে ফোনে কারো সাথে বাক্যবিনিময় করছে।
​হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা চিরে বাতাসের বুক চিরে কানে এলো একঝাঁক ইঞ্জিনের গগনবিদারী গর্জন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামনের দিক থেকে একটি বিশাল কালো রোলস-রয়েস আর প্রায় শখানেক বাইকের এক বিশালাকার বহর ধুলো উড়িয়ে স্যান্ডিদের পথ আগলে দাঁড়াল। স্যান্ডি আতঙ্কিত হয়ে সজোরে ব্রেক কষল। টায়ারের ঘর্ষণে রাস্তার বুক থেকে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো।
​শেরাজ ছিটকে পড়ল সামনের সিটের দিকে। তার কপালের রগ ফুলে উঠল। ফোনের ওপর বিরক্তি আর স্যান্ডির ওপর ক্ষোভ মিশিয়ে সে গর্জে উঠল,

“দিস ইজ টু মাচ স্যান্ডি! তুমি কি ড্রাইভ করছ নাকি তামাশা করছ? নিজের চাকরিটার মায়া কি তোমার একদমই নেই?”
​স্যান্ডির গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে কাঁপাকাঁপা হাতে স্টিয়ারিং ধরে সামনের দিকে ইশারা করে বলল,
“স্যার, রাগ করার আগে দয়া করে একবার সামনের দিকে তাকান।”
​শেরাজ ভ্রু কুঁচকে সামনের কাচের দিকে তাকাতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল। সামনের বিশাল গাড়িটা থেকে একজন রহস্যময়ী নামল। আপাদমস্তক কুচকুচে কালো লেদার জ্যাকেটে ঢাকা শরীর, মাথায় কালো হেলমেট—যার গ্লাসে দুপুরের রোদ ঠিকরে পড়ছে। কিছু মুহুর্ত পরেই পেছনের শখানেক বাইক থেকে আরোহীরা বিদ্যুতের গতিতে নেমে এলো। প্রত্যেকের পরনে একই রকম ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট আর হেলমেট। নিমেষের মধ্যে তারা চারপাশ থেকে শেরাজের গাড়িটিকে একটি দুর্ভেদ্য দেয়ালের মতো ঘিরে ফেলল।
শেরাজ পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরোতে উদ্যত হলো, তার চোয়াল শক্ত—হয়তো কোনো এক সুপ্ত মাফিয়া সত্তা তার অবচেতন মনে জেগে উঠতে চাইছে।
সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রহস্যময়ী বিদ্যুতের গতিতে এগিয়ে এলো। কোনো আলাপ নেই, কোনো ভূমিকা নেই—সরাসরি গাড়ির পেছনের দরজা টেনে সে ভেতরে ঢুকে পড়ল। শেরাজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক জোড়া ধারালো চোখের শীতল দৃষ্টি হেলমেটের নিচ থেকে তার ওপর স্থির হলো। মুহূর্তের মধ্যে একটি শীতল ​একটি চকচকে কালো রিভলভার শেরাজের কপালে সজোরে চেপে ধরা হলো
শেরাজ পাথর হয়ে গেল। তার কপালে বন্দুকের নলের সেই হিমশীতল স্পর্শ আর পাশে বসা মানুষটির শরীর থেকে ভেসে আসা সেই অতি পরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণ তার মস্তিস্কে এক তীব্র বিশৃঙ্খলা তৈরি করল। ​স্যান্ডি স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে আড়ষ্ট হয়ে গেল। সে রিয়ার-ভিউ মিরর দিয়ে দেখল, বন্দুক হাতে থাকা মানুষটি হেলমেটের আড়াল থেকে শেরাজের চোখের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে আছে।
​শেরাজ তার জীবনের অনেক সন্ধিক্ষণ পার করেছে, কিন্তু এমন অদ্ভুত অনুভূতি তার কখনো হয়নি। মৃত্যুভয় নয়, বরং এক আদিম টান তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। সে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কে আপনি? আমার গাড়িতে ঢুকে আমার মাথায় বন্দুক ধরার সাহস আপনাকে কে দিল?”
​বন্দুকধারী মানুষটি কোনো কথা বলল না। শুধু বন্দুকের নলটা শেরাজের কপালে আরও একটু চেপে ধরল। ​বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লেদার জ্যাকেটধারীরা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। স্যান্ডি স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ভয়ে আবারও আয়না দিয়ে পেছনের দিকে তাকাতেই দেখল—সেই রহস্যময়ী কোনো কথা না বলে তার বাম হাতটা দিয়ে তাকে গাড়ি স্টার্ট করার জন‍্য ইশারা করল।
​স‍্যান্ডি ইশারা বুঝতে পেরে গাড়ি স্টার্ট দিল। ​গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগোতে শুরু করল। চারপাশের সেই শখানেক বাইক আরোহীরাও গর্জে উঠল। তারা মৌমাছির ঝাঁকের মতো শেরাজের গাড়িকে মাঝখানে রেখে প্রহরীর মতো চলতে শুরু করল।
​শেরাজ বিস্ময়ে বিমূঢ়। তার আত্মসম্মানে তীব্র দহন হচ্ছে, অথচ অদ্ভুত এক মায়াজালে সে বন্দী। তবুও সে উঁচু গলায় বলল,
“আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? স্যান্ডি, তুমিও কি এই পাগলামির অংশ?”
​স্যান্ডি কোনো উত্তর দিল না। তার নিরবতায় শেরাজের রক্তে আজন্ম লালিত সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সত্তাটা ফুঁসে উঠছে। কপালে বন্দুকের নল থাকা সত্ত্বেও সে নিজেকে সামলাতে পারল না। তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর আর রুক্ষ হয়ে ফেটে পড়ল, ​
“কে আপনি? এসব নাটকের মানে কী? আমাকে অপহরণ করার দুঃসাহস আপনাকে কে দিয়েছে? স্যান্ডি, গাড়ি থামা বলছি!”
​সে পাশ ফিরে তার পাশে বসা মানুষটিকে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করল। হেলমেটে ঢাকা অবয়ব, অথচ তার বসার ভঙ্গি, শরীরের ঘ্রাণ সবই শেরাজের মস্তিস্কের কোনো এক ধূলিধূসর কোণায় হাতুড়ি পেটাচ্ছে। বড্ড চেনা, বড্ড আপন মনে হচ্ছে এই মানুষটিকে।
​শেরাজের এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে হেলমেট পরা রহস্যময়ী হঠাৎ করে বন্দুকের নলটা সামান্য সরিয়ে নিল। তার শরীরটা একটু দুলে উঠল— যেন সে হাসছে। তারপর সেই চিরচেনা মোলায়েম দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, ​
“আহারে! আমার বাঘটা দেখি বড্ড বেশি গর্জন করছে। তা মিস্টার কিউট, আপনি কি জানেন—রাগের সময় আপনার ওই নাকের ডগাটা যখন লাল হয়ে ওঠে, তখন আমার ইচ্ছা করে সব বিজনেস ডিল বাতিল করে দিয়ে শুধু আপনাকে দেখি?”
​শেরাজ স্তম্ভিত হয়ে গেল। বন্দুকের নলের চেয়েও এই কথাগুলো তাকে বেশি ধারালোভাবে আঘাত করল। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই মানবীটি আরও একটু ঝুঁকে এলো তার দিকে।

​“এত চিৎকার করবেন না তো! আপনার এই ভরাট গলার আওয়াজ শুনলে আমার হার্টবিট যে ‘ডিসকো ড্যান্স’ শুরু করে দেয়, সেটা কি আপনি বোঝেন? আপনি কি ভেবেছেন বন্দুকটা আমি আপনাকে মারার জন্য ধরেছি? উঁহু! আমি তো শুধু আপনার হৃদপিণ্ডটা চুরি করার জন্য এই আয়োজন করেছি। তা আপনার ওই পাথুরে মনটা কি একটুও গলছে না? নাকি আমাকে আরও একটু বেশি কসরত করতে হবে?”
​শেরাজ বিস্ময়ে বিমূঢ়। এই অদ্ভুত নারী তাকে বন্দুকের মুখে রেখে অবলীলায় প্রেম নিবেদন করছে। সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে তুতলিয়ে বলল,
“আ-আপনি… আপনি কি পাগল?”
“পাগল তো আপনি করে দিয়েছেন, খান সাহেব। ওই ওমানের মরুভূমি থেকে এই বাংলার সবুজ ঘাস—সবখানেই তো আপনার জন্য আমার পাগলামির ছাপ রেখে এসেছি। বিশ্বাস না হলে নিজের বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে দেখুন তো, ওটা কি আপনার নামে ধুকপুক করছে নাকি আমার নামে?”
​গাড়ির ভেতর এসি চললেও শেরাজের মাথার ভেতর দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। সে যতবারই গম্ভীর হয়ে এই অপহরণের কারণ জানতে চাইছে, পাশের মানবীটি ততবারই যেন শব্দের ফুলঝুরি ফুটিয়ে তাকে আরও বেশি অপ্রস্তুত করে দিচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“আপনি কি জানেন, আপনি কার সাথে এইসব করছেন? আমি এস.কে! আমার একটা আঙুলের ইশারায় শহরের অর্ধেক আইন পাল্টে যেতে পারে। বন্দুকটা নামিয়ে কথা বলুন, নয়তো পরিণাম ভালো হবে না।”
​সুমু হেলমেটের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যেন সে খুব বিরক্তির সাথে কোনো অবাধ্য শিশুর কথা শুনছে। সে বন্দুকের নলটা দিয়ে শেরাজের চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে ধরল। তারপর অত্যন্ত আদুরে গলায় বলল, ​
“ওরে আমার বাঘ রে! পরিণামের ভয় দেখাচ্ছেন? আপনি যখন রেগে গিয়ে ওই পরিণাম শব্দটা উচ্চারণ করলেন, তখন আপনাকে দেখতে ঠিক জেমস বন্ডের মতো লাগল। তা মিস্টার বন্ড, আপনার ওই আগুনের গোলার মতো চোখ দুটো দিয়ে আমাকে ভস্ম করার বদলে যদি একটু ভালোবেসে তাকাতেন, তবে তো আমি বন্দুক ফেলে আপনার বুকে আছড়ে পড়তাম।”

শেরাজ এবার প্রায় চিৎকার করে উঠল,
“অসভ্যতা করবেন না! আপনি অলওয়েজ কি সব পুরুষের সাথেই এভাবে কথা বলেন? এই স্যান্ডি! আমি আবারও বলছি, গাড়ি থামা।”
​স্যান্ডি যেন কানেই তুলছে না। সুমু এবার শেরাজের হাতটা নিজের গ্লাভস পরা হাতের মুঠোয় নিল। শেরাজ হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু সুমুর সেই স্পর্শে সে যেন এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল। সুমু খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,
​“সব পুরুষ? আরে ছিঃ! আমার রুচি কি এতোই খারাপ? এই দুনিয়ায় একটাই তো আমার ‘খান সাহেব’ আছে, যার জন্য এই সুমু জীবন দিতেও পারে, আবার জীবন নিতেও পারে। আর আপনার এই হাতটা… উফ! এতোটা শক্ত কেন? মনে হচ্ছে কোনো পাথরের ভাস্কর্য ধরলাম। জিম কি একটু বেশিই করছেন আজকাল?”
​শেরাজ বাকরুদ্ধ। সে যতবারই নিজেকে নিষ্ঠুর প্রমাণ করতে চাইছে, এই মেয়েটি ততবারই তাকে গোলকধাঁধায় আটকে ফেলছে। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আপনার কথার কোনো মাথামুণ্ডু নেই। আপনি একটা আস্ত পাগল।”
​“ভালোবাসলে একটু পাগল তো হতেই হয়!” সুমু এবার শেরাজের খুব কাছে ঝুঁকে এলো, তার হেলমেটের গ্লাসটা প্রায় শেরাজের নাকের সাথে ঠেকেছে। সে ফিসফিস করে বলল, “আপনার মতো একটা হট পুরুষকে চোখের সামনে দেখে কোনো মেয়ে যদি পাগল না হয়, তবে বুঝতে হবে তার হৃদপিণ্ড বলে কিছু নেই। আপনি কি চান আমি আপনার এই লাল হয়ে যাওয়া কান দুটো কামড়ে দিই? যাতে আপনার রাগটা একটু কমে?”

শেরাজ এবার সত্যিই কুঁকড়ে গেল। এই নারীর মধ্যে কোনো ভয় নেই, দ্বিধা নেই—আছে এক দুর্ধর্ষ অধিকারবোধ। সে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। ​ঠিক সেই মুহূর্তে গাড়ির গতি ধীর হয়ে এলো। চাকাগুলো পিচঢালা রাস্তা ছেড়ে পাথুরে পথে গড়িয়ে একটি বিশাল গেটের সামনে এসে থামল। শেরাজ দেখল, তারা শহরের কোনো নিভৃত কোণে এক আধুনিক বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে।
​সুমু বন্দুকটা নিজের জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। তারপর শেরাজের দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে বলল,
“ওয়েলকাম হোম, মাই লাভ! গাড়ি থেকে নামুন এবার। আপনার রাজপ্রাসাদ রেডি, আর আপনার রানি তো আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে।”

​শেরাজ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। গাড়ি থামার সাথে সাথেই বাইরের সেই শখানেক ইঞ্জিনের গর্জন এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। সুমু অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নামল। সে গাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে হেলমেটের কাচের আড়াল থেকে শেরাজকে চোখ দিয়ে ইশারা করল নামার জন্য।
শেরাজ অনেকটা দ্বিধা আর একরাশ বিস্ময় নিয়ে গাড়ি থেকে পা রাখল বাইরে। রোদ তখন কিছুটা ম্লান হয়ে এসেছে। সে নামতেই দেখল, বাইক থেকে নামা সেই লেদার জ্যাকেটধারী যুবকদের দল হুড়মুড় করে তার দিকে এগিয়ে আসছে। পিয়াস, সজীব, আশিক, শাহরুখ, আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম, রিসান, সারবাজ, আরবাজ, শাহরুখ আর রাহিন—প্রত্যেকের চোখে অশ্রু, মুখে এক অপার্থিব আনন্দের আভা। তাদের প্রিয় বন্ধু আজ আবারও তাদের সামনে।
কিন্তু শেরাজ যেন এক অচেনা দ্বীপে এসে দাঁড়িয়েছে। সে বিভ্রান্ত হয়ে পিছিয়ে যেতে চাইল। এই মানুষগুলো কেন তাকে ঘিরে ধরছে? কেন তাদের চোখে এতোটা আবেগ? কিন্তু সে’তো কাউকে চিনতে পারছে না।
ঠিক তখনই বাংলোর সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো একঝাঁক হাসিমুখ। ইফতিয়া, ফারিন, নাতাশা, সামিয়া, নাজমিন, ফারিয়া, ইনায়া আর ইশিতা—প্রত্যেকে তাদের স্বামীদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের কোল জুড়ে শিশুরা—নিশান, রুহি, হাসফা আর আহিয়া। শিশুদের কলকাকলিতে বাংলোর আঙিনা এক মুহূর্তে প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

শেরাজ স্তব্ধ হয়ে দেখল, এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে এক সুন্দরী কিশোরী ফিরোজা এবং এক যুবক রিয়াজ। তাদের সাথেই দাঁড়িয়ে আছে তার ছোট ভাই শাহরুখ। রিয়াজের চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে, সে তার বড় ভাইকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিল। শাহরুখও তার অগ্রজকে দেখে আবেগ আপ্লুত। পাশে নাতাশা দাঁড়িয়ে আছে। সে স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। সজীব হেলমেট খুলে শেরাজের দিকে গভীর শ্রদ্ধায় তাকাল।
একপাশে পিয়াস আর ইফতিয়ারা দাঁড়িয়ে আছে। পিয়াসের চোখে আজও নিরব হাহাকার, যে হাহাকার সামিয়ার জন্য আজও অমলিন। আর ইফতিয়া, যে একসময় শেরাজকে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল, আজ সে পিয়াসের দিকে চেয়ে নিজের না পাওয়া ভালোবাসার দহন লুকানোর চেষ্টা করছে।
এই বিশাল মিলনমেলার মাঝে শেরাজ নিজেকে খুব অসহায় বোধ করতে শুরু করল। তার মস্তিস্ক এই বিপুল তথ্য আর আবেগের ভার সইতে পারছে না। সে চিৎকার করে বলতে চাইল— “কারা তোমরা? আমি এখানে কেন?”
ঠিক সেই মুহূর্তে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো দুটি ফুটফুটে শিশু। সিমরান আর শেরান। তাদের দেখা মাত্রই শেরাজের হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সুমুর কলিজার টুকরো দুটো সরাসরি গিয়ে শেরাজের পা জড়িয়ে ধরল। সিমরান তার আধো আধো গলায় চিৎকার করে উঠল,

“ইয়ে… পাপা! আমাদেল পাপা এতেতে।”
শেরান তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শেরাজের দিকে তাকিয়ে রইল, ঠিক যেন শেরাজের নিজের প্রতিচ্ছবি। শেরাজ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ধুলোমাখা মাটিতে। সে বুঝতে পারে না কেন এই শিশুদের ‘পাপা’ ডাক শুনে তার পাথুরে হৃদয়ের ভেতরটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
সুমু ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। সে সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ধীর হাতে নিজের হেলমেটটা খুলল। ঘামে ভেজা তার সেই মায়াবী মুখ, আর ডাগর চোখ দুটোয় তখন সহস্রাব্দের প্রতীক্ষা। সে শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল,
“মিস্টার এস.কে, আপনি হয়তো কাউকে চিনছেন না। কিন্তু আজ এই আকাশের নিচে আপনার পুরো অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে আছে। ওই যে রিয়াজ—ও আপনার ভাই, এই যে বাচ্চা দুটো—ওরা আপনার রক্ত। আর আমি…” সে একটু থামল, তারপর এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল, “আমি আপনার সেই অর্ধাঙ্গিনী, যাকে আপনি ওমানের বালুচরে একা ফেলে এসেছিলেন। এবার কি আপনার স্মৃতিরা একটু কথা বলবে, নাকি আমি আরও একবার বন্দুক তাক করব?”
​পুরো বাংলোর আঙিনায় থমথমে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। আইয়ুব, সারবাজ আর রাহিনরা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে নিজেদের চোখের জল আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তারা পুরুষ মানুষ, তাদের আবেগ দেখানোর নিয়ম নেই—এমনটাই সমাজ শিখিয়েছে। কিন্তু সবার মাঝে দুজন মানুষ আজ আর কোনো নিয়ম মানতে পারল না।
​রিয়াজ এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার বড় ভাই, তার আদর্শ—যাকে সে ওমানের সেই ভয়ংকর ঘটনার পর মৃত বলে ধরে নিয়েছিল, সেই মানুষটি আজ রক্তমাংসের শরীরে তার সামনে দাঁড়িয়ে। রিয়াজের বুকের ভেতরটা যেন ফেটে যাচ্ছিল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সব জড়তা ঝেড়ে ফেলে সে চিৎকার করে “ব্রো!” বলে শেরাজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

​শেরাজ তখনো মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসা। রিয়াজ তাকে জাপটে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নাটা কোনো সাধারণ কান্না নয়, এ যেন পাঁচ বছরের এক দীর্ঘ বিসর্জনের অবসান। রিয়াজ কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগল,
“কেন এমন করলে, ব্রো? আমাদের এভাবে এতিম করে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে? তুমি জানো না, তোমাকে ছাড়া এই রিয়াজ কতটা একা? একবার শুধু বলো যে তুমি আমাকে চিনতে পারছ।”
​অন্যদিকে ফিরোজা, শেরাজের আদরের ছোট্ট মামাতো বোন। শেরাজ যখন ওমানের রাজত্ব চালাত, তখন ফিরোজার সব আবদার ছিল তার এই ‘লাভ’-এর কাছে। ফিরোজা দৌড়ে এসে শেরাজের অন্য পাশটা আঁকড়ে ধরল। তার চোখের জলে শেরাজের জ্যাকেট ভিজে একাকার। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“লাভ! তুমি কি সত্যিই আমাকে ভুলে গেছ? তোমার সেই ছোট্ট ফিরোজা আজ কত বড় হয়ে গেছে, একবার তাকিয়ে দেখো। আজ সে স্পষ্ট করেই কথা বলে। কেন আমাদের চিনতে পারছ না তুমি? আমরা তো তোমার কলিজার টুকরো।”
​শেরাজ পাথর হয়ে বসে রইল। তার দুই কাঁধে দুই ভাই-বোনের কান্নার কম্পন সে অনুভব করতে পারছে। তার মস্তিস্কে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। এই নামগুলো—রিয়াজ, ফিরোজা—কোথাও যেন খুব চেনা সুরে বাজছে, কিন্তু সে কিছুতেই সেই সুরের উৎস খুঁজে পাচ্ছে না।

​আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সামিয়া আর ইনায়ারা নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল। বাচ্চাদের কলকাকলি থেমে গেছে, তারাও যেন বড়দের এই গভীর শোক বুঝতে পেরে নিশ্চুপ হয়ে গেছে।
​সুমু দাঁড়িয়ে দেখছিল এই দৃশ্য। তার নিজের চোখও তখন অশ্রুসিক্ত। সে জানে, এই কান্নাই হয়তো শেরাজের স্মৃতির রুদ্ধ দুয়ারে চাবুক মারবে। সে ধীর পায়ে রিয়াজের মাথায় হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,
“শান্ত হও রিয়াজ। তোমার ব্রো ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরে এখনো লড়াই চলছে। তাকে সময় দাও।”
​রিয়াজ মুখ তুলে সুমুর দিকে তাকাল, তার চোখ দুটো জবার মতো লাল। সে শেরাজের হাতটা নিজের গালের সাথে ঘষে বলল,
“ভাবিজি, ব্রো’র চোখ বলছে, ব্রো আমাদের খুঁজছে। ব্রো আমাদের ভুলতে পারে না। রক্ত কি কোনোদিন রক্তের পরিচয় ভুলে যায়?”

​শেরাজ নির্বাক। তার দুই পাশে রিয়াজ আর ফিরোজা যেন দুই পাহাড়ের মতো আঁকড়ে ধরে আছে তাকে। পাঁচ বছর পর এই প্রথম শেরাজের মনে হলো—এই বিশাল পৃথিবীতে সে একা নয়, সেও হয়তো কারো ভাই, কারো বন্ধু। তার চোখ থেকে অজান্তেই এক ফোঁটা লোনা জল টুপ করে রিয়াজের হাতের ওপর পড়ল। ​রিয়াজ আর ফিরোজার বুকফাটা আর্তনাদ তার মস্তিস্কের কোষে কোষে যেন সহস্র বজ্রপাত ঘটাচ্ছে। তার কপালে নীল শিরাগুলো দপদপ করে ফুলে উঠেছে, চোখের মণি অস্থিরভাবে এদিক-ওদিক ঘুরছে। অতিরিক্ত আবেগের এই তীব্র চাপ তার স্মৃতিহীন মস্তিস্ক আর সইতে পারছে না। শেরাজ হঠাৎ দুই হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরল, তার মুখ দিয়ে এক যন্ত্রণাকাতর গোঙানি বেরিয়ে এলো। সে যেন এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। সে চিৎকার করে বলল,
“আমি তোমাদের কাউকে চিনি না। আমি কারও ব্রো নই।”
​সুমু মুহূর্তেই পরিস্থিতি আঁচ করতে পারল। সে জানে, এই মুহূর্তে শেরাজকে একা না করলে তার বড় ধরনের কোনো মানসিক বা শারীরিক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। সে কঠোর দৃষ্টিতে সারবাজ আর রাহিনের দিকে তাকাল। তার চোখের একটি পলকই যেন আদেশ।
​সারবাজ আর রাহিন তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এলো। তারা জোর করেই রিয়াজ আর ফিরোজাকে শেরাজের ওপর থেকে সরিয়ে নিল। রিয়াজ চিৎকার করে বলল,

“ছেড়ে দাও আমাকে! আমি ব্রো-র কাছে যাব।”
কিন্তু সারবাজ শক্ত হাতে তাকে ধরে রাখল। অন্যদিকে ইনায়া আর সামিয়া মিলে সবাইকে দ্রুত বাংলোর ভেতরে নিয়ে গেল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে পুরো আঙিনা জনশূন্য হয়ে পড়ল।
​শেরাজ মাটিতে আধবসা হয়ে হাঁপাতে শুরু করেছে। তার চারপাশটা হঠাৎ নীরব হয়ে যাওয়ায় সে কিছুটা দিশেহারা। ঠিক সেই মুহূর্তে তার কপালে আবারও সেই পরিচিত শীতল ধাতব স্পর্শ অনুভূত হলো।
​সুমু আবারও তার সেই দুর্ধর্ষ রূপে ফিরে এসেছে। তার চোখে এখন অশ্রু নেই, আছে অটল কাঠিন্য। সে বন্দুকের নলটা শেরাজের কপালে সজোরে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ​
“অনেক হয়েছে আবেগ, অনেক হয়েছে ড্রামা। এবার সোজা হয়ে দাঁড়ান মিস্টার এস.কে। আপনার এই দুর্বলতা দেখার জন্য আমি আপনাকে এতোটা পথ নিয়ে আসিনি। গেট আপ। আপনি হয় এখন সোজা আমার সাথে থেরাপিস্টের কাছে যাবেন, আর নয় সোজা বাড়ির ভেতরে যাবেন। আপনি একবার থেরাপিস্টের কাছে গেলেই সবটা ক্লিয়ার হয়ে যাবে।”

“আমি কোথায়ও যাব না। আমি কেন থেরাপিস্টের কাছে যাব? আমি কি পাগল নাকি?”
“তাহলে ভেতরে চলুন।”
​শেরাজ যন্ত্রণার মাঝেও অবাক হয়ে সুমুর দিকে তাকাল। এই নারীটি কি পাথর দিয়ে তৈরি? একটু আগেই সে দয়াবতী ছিল, আর এখনই সে যেন সাক্ষাৎ আজরাইল। সুমু আবারও বন্দুকটা দিয়ে শেরাজকে তাগাদা দিয়ে বলল,
“ভেতরে চলুন! বাড়ির ভেতরে আপনার জন্য আরও কিছু সারপ্রাইজ বাকি আছে। আপনি ভাবছেন আমি আপনাকে মায়া দেখাব? ভুল! আমি আপনাকে আপনার ভাগ্যের মুখোমুখি দাঁড় করাব। চলুন!”

শেরাজ টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াল। বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়েই সে ধীরে বাংলোর সদর দরজার দিকে এগোতে শুরু করল। সুমু তার ঠিক পেছনে, শিকারি বাঘিনীর মতো পা ফেলছে। স্যান্ডি আর নাতাশা দূর থেকে দেখছে—তাদের ম্যাম আজ তার প্রিয়তম মানুষকে স্মৃতি ফেরানোর জন্য এক ভয়ংকর খেলায় মেতেছেন।
দরজার চৌকাঠে পা রাখতেই শেরাজের নাকে এক অদ্ভুত চেনা ঘ্রাণ এলো। সুমু পেছন থেকে ফিসফিস করে বলল, ​
“আপনি যদি আজ আমার কথা না শোনেন, তবে এই বন্দুকের গুলিটা কিন্তু আজ বিফলে যাবে না। আমি আপনাকে স্মৃতিহীন এস.কে হিসেবে নয়, আমার দুর্ধর্ষ শেরাজ খান হিসেবেই চাই—তা সে জীবিত হোক বা মৃত।”
শেরাজের কানে কথাটা পৌঁছাল কি’না কে জানে। ​সুমু তাকে একটি বিশাল সোফার সামনে নিয়ে গিয়ে থামাল। সে শেরাজের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,
“আপনাকে এভাবে কেন তুলে এনেছি জানেন? কারণ, আপনাকে আমার বড্ড পছন্দ হয়েছে। আর আপনি হয়তো জানেন না যে— যা আমার পছন্দ হয়, আমি তা যেভাবেই হোক নিজের করেই ছাড়ি। তাই ঠিক করেছি, আজই আপনাকে আমি বিয়ে করব।”
​শেরাজ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। এক লহমায় তার চোখের মণি আগুনের মতো জ্বলে উঠল। সে এক ঝটকায় সুমুর হাত সরিয়ে দিয়ে গর্জে উঠল,

“হোয়াট? বিয়ে? আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? আপনি ভাবছেন বন্দুক আর একদল গুন্ডা দিয়ে ভয় দেখিয়ে আপনি আমাকে দিয়ে যা খুশি করিয়ে নেবেন? ভুলে যাবেন না আমি কে! আমি এই মুহূর্তেই এখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি।”
​শেরাজ দ্রুতপায়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু সে দরজার হাতল ধরার আগেই মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ থেকে আইয়ুব, সারবাজ, আরবাজ আর রাহিনরা এসে তাকে ঘিরে ফেলল। ​শেরাজ চিৎকার করে উঠল,
“সরে দাঁড়াও বলছি! স্যান্ডি, এদের সরিয়ে দাও।”
​স্যান্ডি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সুমু সোফার হাতলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত হাসি দিল। তারপর ধীর পায়ে শেরাজের সামনে এসে দাঁড়াল।
​“বেরিয়ে যাবেন? কার সাধ্য আছে আমার অনুমতি ছাড়া এখান থেকে বাইরে যাওয়ার? এই যে দেখছেন শখানেক জ্যাকেটধারী লোক, এরা সবাই আমার লোক। আমার একটা ইশারায় এরা জান দিতে পারে, আবার নিতেও পারে। আপনি যদি আমার কথা না শুনে জেদ ধরেন, তবে আপনার এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা কী হবে জানেন?”
​সুমু আবারও পকেট থেকে তার রিভলভারটা বের করে সরাসরি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্যান্ডির কপালে তাক করল। স্যান্ডি অবিচল, কিন্তু শেরাজের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সুমু ঠান্ডা গলায় বলল, ​
“আপনার ওই একমাত্র সাথী, আপনার অতি বিশ্বস্ত পি.এ স্যান্ডি—ওকে আমি এই মুহূর্তেই খতম করে দেব। আপনার জেদের মাসুল কি আপনি স্যান্ডির জীবন দিয়ে দিতে চান, মিস্টার এস.কে?”

শেরাজ স্তম্ভিত হয়ে স্যান্ডির দিকে তাকাল। তার একমাত্র সঙ্গী, তার বিপদের বন্ধু আজ এক উন্মাদিনীর বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে। শেরাজ অনুভব করল, তার দর্প চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এই রহস্যময়ী নারী তাকে এমন এক জালে আটকেছে, যেখানে মুক্তি মানেই রক্তপাত। সে দাঁতে দাঁত চেপে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি মানুষ নন, আপনি একটা শয়তান।”
​সুমু হেসে উঠল, সেই হাসিতে পুরো ঘর যেন কেঁপে উঠল। সে কঠোর গলায় বলল,
“শয়তান হই বা রানি—আজ থেকে আমিই আপনার ভাগ্য। সো, রাজী তো?”
শেরাজ চুপ করে রইল। ​পুরো ড্রয়িংরুমে ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সুমুর হাতের রিভলভারটা স্যান্ডির কপালে স্থির হয়ে আছে, আর শেরাজের চোখের মণি রাগে আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। সুমু ভেবেছিল স্যান্ডির জীবনের ভয় দেখালে শেরাজ হয়তো নতি স্বীকার করবে, কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল—শেরাজ খান হার মানার জন্য জন্মায়নি, সে স্মৃতি হারাক আর না হারাক, তার ধমনীতে যেন এক অবাধ্য বাঘের রক্ত বইছে।
​শেরাজ এক পা এগিয়ে সুমুর বন্দুকের নলের সামনে নিজের বুকটা ঠেকিয়ে দিল। তার গলার স্বর পাথরের মতো কঠিন, ​
“অনেক হয়েছে আপনার এই সস্তা নাটক। আপনি স্যান্ডিকে মারতে চান? মারুন! কিন্তু মনে রাখবেন, জোর করে কবুল বলিয়ে নিলেই বিয়ে হয় না। আপনি আমার শরীরটা বন্দী করতে পারেন, কিন্তু আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাগজে সই করানোর ক্ষমতা আপনার ওই শখানেক গুণ্ডারও নেই।”
​শেরাজের এই অটল মনোভাব দেখে সুমুর ভেতরের জেদটা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“আপনি কি ভাবছেন যে আমি শুধুমাত্র আপনাকে ভয় দেখাচ্ছি? স্যান্ডির রক্ত এই মেঝেতে পড়ার পর আপনার এই দম্ভ কি টিকে থাকবে?”
​শেরাজ উপহাসের হাসি হাসল,
“দম্ভ নয়, এটা আমার আত্মসম্মান। স্যান্ডি মরলে আমি তার প্রতিশোধ নেব, কিন্তু আপনার মতো এক উন্মাদিনীকে আমি জীবনসঙ্গিনী হিসেবে মেনে নেব না। আপনি আমায় চিনতে ভুল করেছেন, মিসেস।”
শেরাজের এই সোজাসাপ্টা প্রত্যাখ্যান সুমুর কলিজায় গিয়ে তীরের মতো বিঁধল। সে দেখল, শেরাজের চোখে কোনো ভয় নেই, বরং সেখানে আছে এক পাহাড়সম ঘৃণা। এই ঘৃণাটা সুমু সহ্য করতে পারছে না। সে বন্দুকটা সশব্দে মেঝের ওপর ছুড়ে ফেলল।
​উপস্থিত সকলে থতমত খেয়ে গেল। সুমু শেরাজের কলারটা খপ করে ধরে তাকে নিজের দিকে হেঁচকা টানে নিয়ে এলো। তাদের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে। সুমু ভাঙা গলায় তীব্র আক্রোশে বলল, ​
“কেন রাজি নন? কীসের এতো অহংকার আপনার? আমি কি সুন্দরী নই? নাকি আমার ক্ষমতার দাপট আপনার সহ্য হচ্ছে না? লিসেন মিস্টার এস.কে, আপনি রাজি হন আর না হন—আজকের এই রাতটা আপনার জীবনের শেষ রাত হতে পারে, নয়তো আপনার নতুন জীবনের শুরু। আপনি আমার কথার অবাধ্য হলে আমি আপনাকে এই বাংলোর মাটির নিচে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব, তবুও অন্য কারো হতে দেব না।”
​শেরাজ সুমুর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে স্থির গলায় বলল,

“পুঁতে ফেলুন! কবরের অন্ধকার আপনার এই বিষাক্ত সান্নিধ্যের চেয়ে অনেক বেশি শান্তির হবে।”
​সুমুর হাতটা কাঁপতে শুরু করল। সে বুঝতে পারছে না, এই মানুষটাকে কীভাবে বশ করবে। যার স্মৃতি নেই, সে এতোটা কঠোর হয় কীভাবে? সুমু হঠাৎ পাগলের মতো হাসতে শুরু করল, সে হাসিতে কান্নার সুর মিশে আছে। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে কোনো কথা না বলে শুধু আইয়ুব আর সারবাজের দিকে শীতল দৃষ্টিতে ইশারা করল।
​ইশারা পাওয়া মাত্রই আইয়ুব আর সারবাজ স্যান্ডির দুই বাহু শক্ত করে ধরল। স্যান্ডি বুঝতে পারল খেলা এবার প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। সে হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করতে শুরু করল,
“ম্যাম! দয়া করুন! স্যার, প্লিজ রাজি হয়ে যান! নয়তো এরা আমাকে মেরে ফেলবে, স্যার। আপনার একটা ‘হ্যাঁ’ আমার জীবন বাঁচিয়ে দেবে।”
সারবাজ আর ​আইয়ুব স্যান্ডিকে টানতে টানতে একটি রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। স্যান্ডি দরজার চৌকাঠ আঁকড়ে ধরে শেরাজের দিকে শেষবারের মতো করুণ চোখে তাকাল,
“স্যার, জেদ ছাড়ুন! আপনার এই জেদ আমার কলিজাটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে। স্যার!”
​শেরাজ চিৎকার করে উঠল,

“ছাড়ুন ওকে! আপনি আপনার এই নিচতা বন্ধ করুন। একজন নির্দোষ মানুষকে কেন মাঝখানে টানছেন?”
​কিন্তু সুমু নির্বিকার। সে ধীর পায়ে গিয়ে সোফায় আয়েশ করে বসল এবং একটি আপেল হাতে নিয়ে ছুরিতে কাটতে শুরু করল। পাশের রুমের দরজাটা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
​পরক্ষণেই সেই বদ্ধ ঘর থেকে ভেসে এলো স্যান্ডির এক বুকফাটা আর্তনাদ—
“আহহহ! আমাকে মারবেন না! স্যার, বাঁচান আমাকে!”
​চাবুকের শব্দ, ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করার শব্দ আর স্যান্ডির গগনবিদারী চিৎকার পুরো ড্রয়িংরুম ছড়িয়ে পড়ল। শেরাজ আর স্থির থাকতে পারল না। সে পাগলের মতো পাশের রুমের দিকে দৌড়ে যেতে চাইল, কিন্তু আরবাজ আর রাহিন তাকে লোহার খাঁচার মতো জাপটে ধরল।
শেরাজ গর্জে উঠল,

“হাত ছাড়ুন বলছি। স্যান্ডিকে ওরা মেরে ফেলবে। সুমু ম‍্যাম, আপনি কি মানুষ না কি রাক্ষসী? থামান ওদের।”
​রুমের ভেতর থেকে স্যান্ডির কণ্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে, সে যন্ত্রণায় আধো আধো গলায় বলল,
“স্যার… সই করে দিন… আমি আর পারছি না… ওরা আমার হাড় ভেঙে দিচ্ছে, স্যার…”
​সুমু শান্তভাবে আপেলের এক টুকরো মুখে নিল। তারপর শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে শীতল হাসি হেসে বলল,
“কান্নার আওয়াজটা খুব একটা শ্রুতিমধুর নয়, তাই না মিস্টার এস.কে? স্যান্ডির প্রতিটি হাড় ভাঙার শব্দ কি আপনার কানে পৌঁছাচ্ছে না? আপনি যত দেরি করবেন, স্যান্ডির শরীরের একটা করে অঙ্গ তত বিকল হয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত আপনার—বন্ধুত্ব নাকি আপনার ফালতু সো কল্ড ইগো?”
​শেরাজ ছটফট করছে। পাশের ঘর থেকে আবার একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এলো, আর তারপর সব নিঝুম হয়ে গেল। শেরাজ পাথর হয়ে গেল। সে ভাবল স্যান্ডি কি তবে শেষ? ​সে সুমুর দিকে তাকিয়ে এক অমানুষিক আর্তনাদ করে বলল,

“থামান! আমি রাজি। আমি বিয়ে করব আপনাকে। কিন্তু স্যান্ডিকে ছেড়ে দিন।”
​সুমু মুচকি হাসল। শেরাজের মুখ থেকে ‘রাজি’ শব্দটা বেরোনো মাত্রই সুমু হাতের আপেলটা ছুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল। সে হাততালি দিয়ে বাইরের দিকে ইশারা করতেই যেন আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা কাজী সাহেব আর উকিল ফাইল নিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন। তাদের পেছনে সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল আইয়ুব আর আরবাজ।
​শেরাজ তখনো হাঁপাচ্ছে। তার বুকটা ধুকপুক করছে পাশের ঘরের ওই নিস্তব্ধতার ভয়ে। সে কাঁপা গলায় বলল,
“আমি তো বললাম রাজি! এবার স্যান্ডিকে সামনে আনুন। আমি দেখতে চাই ও বেঁচে আছে কি না।”
​সুমু রেজিস্ট্রি পেপারে সহ করে কলমটা টেবিলের ওপর সশব্দে রাখল। তারপর শেরাজের খুব কাছে গিয়ে তার কলারটা টেনে ধরে শীতল চোখে তাকিয়ে বলল, ​

“বেশি কন্ডিশন দেবেন না মিস্টার এস.কে। আপনি এখন আমার কয়েদি। আপনার একটা বাড়তি কথার বিনিময়ে আমি ওপাশ থেকে স্যান্ডির জ্যান্ত শরীরের বদলে ওর রক্তাক্ত লাশটা সামনে নিয়ে আসব। আপনি কি সেটা চান?”
​শেরাজ সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এই নারী এখন যা বলছে তা করতে এক সেকেন্ডও দ্বিধা করবে না। সুমু ফিসফিস করে আবার বলল,
“আগে বিয়ে, আগে সই—তারপর আপনার স্যান্ডি। সই না করা পর্যন্ত স্যান্ডির ঘরের দরজা খুলবে না, আর ওর চিকিৎসার জন্য কোনো ডাক্তারও ভেতরে ঢুকবে না। এখন ঠিক করুন, স্যান্ডিকে কি আপনি জীবিত দেখতে চান নাকি ওর কবরে মাটি দিতে চান?”

​শেরাজ ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে সুমুর দিকে তাকাল। যে মানুষটাকে কিছুক্ষণ আগে তার ‘চেনা চেনা’ মনে হচ্ছিল, এখন তাকে তার পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মানবী মনে হচ্ছে। কাজী সাহেব কাঁপাকাঁপা হাতে বিয়ের খাতাটা এগিয়ে দিলেন।
​শেরাজ কলমটা হাতে নিল। তার হাত কাঁপছে, কিন্তু স্যান্ডির সেই আর্তনাদ তার কানে এখনো বাজছে। সে বুঝতে পারছে, নিজের স্বাধীনতার বিনিময়ে তাকে তার বন্ধুর প্রাণ ভিক্ষা নিতে হচ্ছে। কাজী সাহেব বললেন,
“বাবা, এখানে একটা সই দিন।”
​শেরাজ সুমুর দিকে একবার তাকাল। সুমু ঠোঁট কামড়ে ধরে বিজয়ী হাসিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। শেরাজ খসখস করে বিয়ের কাবিননামায় সই করে দিল।
​সই করা শেষ হতেই শেরাজ কলমটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলে গর্জে উঠল,
“হয়েছে? আপনার শখ মিটেছে? এবার স্যান্ডিকে বের করুন। এক্ষুণি!”

সুমু কাবিননামাটা হাতে নিয়ে পরম মমতায় একবার দেখল, যেন এটাই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কাজী সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে সুমুর আপাদমস্তক একবার দেখে নিলেন। কুচকুচে কালো লেদার জ্যাকেট, গ্লাভস পরা হাত আর পাশেই রাখা সেই ভয়ংকর হেলমেট—সব মিলিয়ে সুমু যেন এক রণংদেহী নারী। ​কাজী সাহেব আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন,
“মা, একটা কথা বলব? এই… এই পোশাকেই তুমি বিয়েটা করবে? কোনো শাড়ি বা গয়না… মানে কনের সাজ তো একটা ব্যাপার থাকে।”
​সুমু এক পলক নিজের জ্যাকেটের দিকে তাকাল। তারপর শেরাজের দিকে ফিরে এক রহস্যময় হাসি দিয়ে কাজী সাহেবের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
​“কাজী সাহেব, এই বিয়েটা কোনো সাধারণ সামাজিক উৎসব নয়। এটা একটা উদ্ধার অভিযান। আর উদ্ধার অভিযানে মানুষ বেনারসি পরে আসে না, রণসজ্জা পরে আসে। এই লেদার জ্যাকেটটা আমার কাছে আমার যুদ্ধের বর্ম। আমার বাঘটাকে খাঁচায় ভরার জন্য এর চেয়ে ভালো পোশাক আর কী হতে পারে?”
​শেরাজ পাশ থেকে বিদ্রূপের স্বরে বলে উঠল,

“রণসজ্জাই তো হবে। যে বিয়েটা হচ্ছে বন্দুকের মুখে আর রক্তের বিনিময়ে, সেখানে রক্তের রঙের শাড়ি পরার চেয়ে খুনিদের এই কালো পোশাকটাই আপনার জন্য মানানসই।”
​সুমু শেরাজের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে কাজী সাহেবের দিকে ফিরে গম্ভীর গলায় বলল,
“পোশাক দেখে সময় নষ্ট করবেন না। কাজ শেষ করুন। বরকে কবুল বলতে বলুন। স্যান্ডির শরীরের রক্ত এখনো ঝরছে, আমার সময়ের খুব দাম।”
​কাজী সাহেব আর কথা বাড়ানোর সাহস পেলেন না। তিনি শরিয়ত মোতাবেক সমস্ত দোয়া পাঠ করে শেরাজের দিকে ফিরে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,
“আপনি কি এই সুমু মামণিকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি? বলুন—কবুল।”
​শেরাজ পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ রুমের বন্ধ দরজার দিকে, যেখানে স্যান্ডি মৃত্যুর সাথে লড়ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে, চরম ঘৃণা নিয়ে বলল,
“কবুল।”

সুমু এবার আর বিজয়ী হাসি হাসল না। সেও একই পদ্ধতিতে কবুল বলে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনেই বলল,
“স্মৃতি না থাকা অবস্থাতেও আজ থেকে আপনি শুধু আমার, খান সাহেব। ঘৃণা দিয়ে হোক বা ভালোবাসা দিয়ে—আপনাকে আমি আমার মনের রাজপ্রাসাদে ফিরিয়ে আনলাম।”
বিয়ে সম্পন্ন হতেই ড্রয়িংরুমের সেই গুমোট ভাবটা নিমিষেই উধাও হয়ে গেল। পাশের ঘরের দরজা খুলে স্যান্ডি বেরিয়ে এলো। শেরাজ রুদ্ধশ্বাসে তার দিকে তাকাল, কিন্তু একি! স্যান্ডির গায়ে কোনো রক্তের দাগ নেই, এমনকি একটা আঁচড়ও লাগেনি। সে দিব্যি সুস্থ শরীরে পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছছে।

শেরাজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আইয়ুব, নিহাল আর সারবাজরা হাততালি দিয়ে উঠল। সিমরান আর শেরান দুই ভাই-বোন “পাপা-মামনি” বলে চিৎকার করে শেরাজের চারপাশে নাচতে শুরু করল। খুশিতে ডগমগ হয়ে সবাই যখন শুভকামনা জানাতে এগিয়ে আসছে, শেরাজের মাথায় তখন রক্ত চড়ে গেছে। ​সে স্যান্ডির কলার চেপে ধরে গর্জে উঠল,
“এই তোমার আর্তনাদ? এই তোমার হাড় ভাঙার শব্দ? আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করার জন্য তুমি এই নাটক করলে?”
​স্যান্ডি ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে হাত জোড় করে বলল,
“স্যার, বিশ্বাস করুন আমার কোনো ভুল নেই। ওনারা আমার আমার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বলেছিল—যদি প্রাণের মায়া থাকে তবে এমনভাবে চিৎকার করবি যেন মনে হয় তোকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাওয়া হচ্ছে। নাহলে ওরা সত্যি আমার মাথায় গুলি করে দিত। আমি তো শুধু আপনার আর নিজের জীবন বাঁচাতে অভিনয় করেছি, স্যার।”
​স্যান্ডির কথা শুনে শেরাজ এবার সুমুর দিকে ফিরল। সুমু এখন সোফায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে আপেলের শেষ টুকরোটা চিবোচ্ছে, ঠোঁটে বাঁকা হাসি তার। শেরাজ রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে উঠল,
​“ইউ ডেভিল! আপনি একটা জঘন্য নারী! তাসের ঘরের মতো মিথ্যে দিয়ে আপনি আমাকে এই জালে আটকালেন? আপনারা সবাই মিলে আমাকে পাগল বানানোর ছক কষেছেন? মনে রাখবেন, সই আমি করেছি ঠিকই, কিন্তু আপনাদের কাউকেই আমি কোনোদিন ক্ষমা করব না। আর না আপনাকে আমি কোনদিনও বউ বলে মেনে নিব।” ​সে উপস্থিত সবাইকে শাসিয়ে কর্কশ গলায় বলল, “আজকের পর যদি কেউ আমার ছায়া মাড়ানোর চেষ্টা করেন, তবে এস.কে-র আসল রূপ দেখতে পাবে।”

শেরাজ ঝড়ের বেগে বাংলোর বাইরে বেরিয়ে যেতে লাগল। স্যান্ডি অভ্যাসবশত তার পিছু নিতে গেলে শেরাজ ঘুরে দাঁড়িয়ে তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে উঠল,
“খবরদার স্যান্ডি! যদি এক পা-ও আমার পিছে আসো, তবে এই হাতেই তোমাকে গুলি করে মারব। তোমার মতো বেইমান পি.এ আমার দরকার নেই।”
​শেরাজ হনহন করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। স্যান্ডি ফ্যাকাশে মুখে সুমুর দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বলল,
“ম্যাম, আজ মনে হয় আমি সত্যি শেষ। স্যার আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।”
এই বলেই সে তার বসের মান ভাঙাতে জীবন বাজি রেখে শেরাজের গাড়ির পিছু পিছু ছুটল। শেরাজ আর স্যান্ডি চোখের আড়াল হতেই ড্রয়িংরুমে হাসির রোল উঠল। সারবাজ, আইয়ুব আর সামিয়ারা পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ল। সুমুও এবার তার গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,
“আমার বাঘটা এখনো বড্ড অবুঝ! উনি ভাবছে উনি পালিয়ে যাচ্ছে, অথচ উনি জানে না—রানির শিকল এখন ওনার গলায় বাঁধা পড়ে গেছে।”

নাতাশা সোফায় এলিয়ে পড়ে হাসতে হাসতে বলল,
“উফ! স্যান্ডির ওই আর্তনাদটা জাস্ট অস্কার পাওয়ার মতো ছিল।”
​আইয়ুব ওর বাইকার জ্যাকেটটা খুলে নাজমিনের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল,
“স্যান্ডির গলায় যে এতো সুর আগে জানতাম না তো। ওর চিৎকার শুনে আমারই তো মায়া লাগছিল। মনে হচ্ছিল সত্যিই বুঝি ওর হাড়গোড় গুঁড়ো করে দিচ্ছি।”
​নাজমিন পাশ থেকে বলল,
“হ্যাঁ, আপনার তো দয়া লাগবেই। নিজের বন্ধু তো।”

এরই মাঝে বাচ্চারা গোল হয়ে বসে বড়দের মতো আলোচনা শুরু করল। নিশান রুহির দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেথলি নুহি, তবাই তেমন ওই আঙ্কেন তাতে ভয় দেথাল?”
​শেরান গম্ভীর মুখে বলল,
“ভয় দেথায় নি। পাপা এততু অতুত্ত, তাই তবাই মিলে পাপাতে তুত্ত তরার তেত্তা করতে।”
সবাই ওদের পাকা পাকা কথা শুনে হেসে উঠল। ​সামিয়া তার মেয়ে হাসফাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করল। সকলের হাসি আনন্দের মধ্যে ​পিয়াস এক কোণায় বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দেখে ইফতিয়া কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আপনি এখনো সামিয়াকে ভালোবাসেন, তাই না? এবার নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনুন। সামিয়াকে নিয়ে সব অনুভূতির কবর দিতে শিখুন।”
পিয়াস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“মন কি আর কন্ট্রোল করা যায় ইফতিয়া? আমার জীবনটা ঠিক ওই দু’লাইন গানের মতো…”
ইফতিয়া পিয়াসের দিকে তাকালো। পিয়াস মৃদুস্বরে গেয়ে উঠল,
“তারে আমার আমার মনে করি,
আমার হয়েও আর হইলো না!
দেখেছি…,
দেখেছি, রূপ সাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা!”
​এদিকে ফিরোজা আর রিয়াজ নিজেদের মধ্যে খুনসুটি শুরু করছে। এতক্ষণে দুজনে মনটা একটু ভালো হয়েছে। ফিরোজা হেসে বলল,
“রিয়াজ ভাইয়া, তুমি কিন্তু একদম ছোট বাচ্চাদের মতো কাঁদছিলে।”
রিয়াজ হাসতে হাসতে বলল,
“আর তুই কি করছিলি, হ‍্যাঁ! তুইও তো ন‍্যাকবতী।”
ফিরোজা ভ্রু কুঁচকাতেই রিয়াজ বলল,

“ব্রো’কে ওভাবে দেখে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। কিন্তু সুমু ভাবির প্ল্যানটা মানতেই হবে। ভাইয়াকে টাইট দেওয়ার জন্য এই বিয়েটাই সেরা দাওয়াই ছিল।”
​নাতাশা স্যান্ডির জন্য একটু চিন্তিত হয়ে বলল,
“ম্যাম, স্যান্ডি তো পাগল হয়ে পিছু পিছু গেল। স‍্যার যদি সত্যি ওকে কিছু করে ফেলে?”
সুমু নাতাশার কাঁধে হাত রেখে হাসল,
“চিন্তা করো না, নাতাশা। তোমার হবু বর স্যান্ডি একটা পাকা খেলোয়াড়। উনি ঠিকই খান সাহেবকে শান্ত করতে পারবে।”
​সজীব আর আশিক সোফায় বসে ফারিয়া আর শাহরুখের মেয়ে আহিয়ার সাথে খেলছিল। শাহরুখ বলল,
“ভাই, আজকের এই পুরো নাটকটা সুপারহিট হয়েছে। এবার শুধু দেখার পালা, আমাদের শেরাজ ভাই কখন তার রানির কাছে ফিরে আসে।”
​ইনায়া সারবাজের দিকে তাকিয়ে টিপ্পনী কাটল,

“সারবাজ, তুমি যেভাবে স্যান্ডিকে টানলে, মনে হচ্ছিল, তুমি সত্যি ভিলেন। এতো ভালো অভিনয় শিখলে কবে?”
সারবাজ একটু ভাব নিয়ে মাথা চুলকালো। ​পুরো ঘর হাসাহাসি আর খোশগল্পে মেতে উঠল। ইশিতা, ফারিন আর ফারিয়া টেবিলে খাবার সাজাতে ব্যস্ত, কেউ আবার বাচ্চাদের সামলাতে। সুমু সবার দিকে একবার তাকিয়ে মনে মনে ভাবল— পরিবারটা আবার এক হয়েছে। এবার শুধু শেরাজের সেই হারানো স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনার পালা।
সকলে গিয়ে খাবার টেবিলে বসল। সুমু মজা করে বলল,
“দেখলেন সারবাজ ভাইয়া, আপনার ভাই আমাকে বিয়ে করে এখানে একা একা ফেলে রেখে চলে গেল। আজ যে আমাদের বাসর রাত সেদিকে তার কোনো হুঁশ আছে?”
​সারবাজ হাসতে হাসতে বলল,

“আরে সুমু, তুমি ওকে বাসর ঘরের বদলে যেভাবে ‘রণক্ষেত্রে’ দাঁড় করালে, বেচারা তো ভয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে। এখন তো ওর মাথায় রক্ত চড়ে আছে, তোমাকে চোখের সামনে দেখলেই খুন করতে চাইবে। আমার ভাইটাকে তুমি একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছ।”
​ইশিতা আর নাজমিন সুমুর পাশে এসে বসল। ইশিতা আলতো হেসে বলল,
“সুমু, রাতে কী প্ল্যান? আবার কি বন্দুক? নাকি এবার কোনো রোমান্টিক ট্র্যাপ?”

সুমু রহস্যময়ী হাসি হেসে বলল,
“উঁহু! এবার আর বন্দুক নয়। এবার হবে ‘ইমোশনাল ব্লাস্ট’। ওমানের সেই দিনগুলোর কোনো একটা স্মৃতি আজ রাতে ওনার বেডরুমের মধ্যে ঘটবে। উনি যতবার ইগনোর করতে চাইবে, আমি ততবার ওর চোখের সামনে ওনার অতীতটা মেলে ধরব। দেখি বাঘ কতক্ষণ খাঁচায় বন্দি থাকতে অস্বীকার করে।”
​সিমরান দৌড়ে এসে সুমুর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল,
“মাম্মা, পাপা যতন ফিনে আতবে, আমি তি পাপাতে বনব যে তুমি পাপাতে কততা ভানোবাতো? তুমি নোজ পাপার তবি নিয়ে তান্না তরো?”
​সুমু সিমরানের নাকে একটা টোকা দিয়ে বলল,
“একদম না, মাম্মা! ওটা বললে তো পাপার ইগো আরও বেড়ে যাবে। তুমি বরং তোমার পাপাকে বলবে— তুমি তাকে অনেক ভালোবাসো।”
​শাহরুখ হাসতে হাসতে বলল,

“ভাবিজি, আপনি তো অভিনয়ে বড় বড় অভিনেত্রীদেরকেও হার মানাবেন। কিন্তু একটা কথা ভাবছি, সান ব্রো কি আসলেই আজ রাতে আস্ত ফিরবে? ব্রো তো বলল পিছু পিছু গেলে গুলি করে মারবে।”
আইয়ুব পাশ থেকে টিপ্পনী কাটল,
“আরে রাখ তোর গুলি! সান তো সানই। ও এখন মাঝরাস্তায় নিশ্চয়ই কোনো স্টলে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে আর ভাবছে—এস.কে’র রাগটা যখন একটু কমবে, তখন গিয়ে বলব, ‘স্যার, আমি নিরুপায় ছিলাম, আপনি প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিন’।”
​সামিয়া হাসতে হাসতে বলল,

“আপনারা যাই বলুন, আমার আপুর সাহস আছে। শেরাজ ভাইয়ের মতো মানুষের কপালে বন্দুক ধরা—বাপরে! আমি হলে তো হাত-পা কাঁপিয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতাম।”
​পিয়াস এক কোণায় দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“শেরাজ ভাই খুব ভাগ্যবান। স্মৃতি হারিয়েও এমন একটা পরিবার আর এমন পাগলি বউ পেয়েছে যে তাকে ফিরিয়ে আনতে জান বাজি লড়ছে।”
​সুমু এবার ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত নামছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সবাই খেয়ে যার যার রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিন। আমি বেরোচ্ছি।”

​সারাদিনের ঝঞ্ঝা আর মানসিক যন্ত্রণার পর শেরাজ নিজের ঘরে পা রাখল, তার শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে। পুরো ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। এক অদ্ভুত, মাদকতাময় সুগন্ধ বাতাসে ভাসছে—যেন রজনীগন্ধা আর গোলাপের মিশ্রিত এক তীব্র আঘ্রাণ। শেরাজ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে দেয়ালের সুইচটা হাতড়ে আলো জ্বালাল।
​আলো জ্বলতেই সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার ছিমছাম আধুনিক বেডরুমটা আজ চেনাই যাচ্ছে না। বিছানা থেকে শুরু করে মেঝের কোণা পর্যন্ত টাটকা কাঁচা ফুলে ফুলে সাজানো। লাল গোলাপের পাপড়ি বিছানো ধবধবে সাদা বিছানাটা যেন তাকে বিদ্রূপ করছে। শেরাজ স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা হজম করার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই তার চোখের সামনে একটি দুধের গ্লাস ধরা হলো।
​শেরাজ চমকে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে কর্কশ গলায় বলল,

“হোয়াট দ্য…! এসব কী সার্কাস শুরু করেছেন আপনি? আমার রুমে ঢোকার সাহস কী করে হয় আপনার?”
​সুমু এতক্ষণ ঘোমটার আড়ালে ছিল। সে ধীরলয়ে মাথার ওড়নাটা সরিয়ে দিল। তার পরনে এখন আর সেই রুক্ষ লেদার জ্যাকেট নেই, বরং সে সেজেছে আগাগোড়া এক মোহময়ী কনের সাজে। চোখে কাজল, ঠোঁটে এক চিলতে রহস্যময় হাসি। সে গ্লাসটা শেরাজের দিকে আরও একটু এগিয়ে দিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, ​
“নিয়মমাফিক আজ আমাদের বাসর রাত, মিস্টার খান। আর বাসর রাতে বউ তার স্বামীর ঘরে আসবে না তো কি পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর ঘরে যাবে?”
​শেরাজ উপহাসের হাসি হাসল,
“বাসর রাত? বিয়েটাই তো হয়েছে বন্দুকের নলে, সেখানে বাসর রাতের স্বপ্ন দেখেন কোন সাহসে? আমি আপনাকে এই মুহূর্তে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি।”
​সুমু গ্লাসটা পাশের টেবিলে রাখল। তারপর শেরাজের একদম কাছে এসে তার শার্টের বোতামে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, ​

“নির্দেশ তো আপনি ওমানের রাজপ্রাসাদেও দিতেন, কিন্তু দিনশেষে হার মানতেন আমার কাছেই। আপনি স্মৃতি হারিয়েছেন খান সাহেব, কিন্তু আপনার শরীরের ঘ্রাণ বলছে—আপনি এখনো আমার উপস্থিতিতে একইভাবে অস্থির হন। এই যে আমাকে দেখে আপনার হার্টবিট ‘ডিসকো ড্যান্স’ শুরু করেছে, এটাকে কি থামতে পারবেন?”
​শেরাজ সুমুর হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আপনি একটা অসভ‍্য নারী। আপনি জানেন আমি আপনাকে ঘৃণা করি, তবুও কেন আমার পিছু ছাড়ছেন না? বেরিয়ে যান এই রুম থেকে আর নয়তো আমি যাচ্ছি।”
​সুমু দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে আবারও শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে এক পা এগিয়ে গেল।
​“ঘৃণা আর ভালোবাসার মাঝে খুব পাতলা একটা দেয়াল থাকে প্রিয়তম। আমি তো সেই দেয়ালটাই ভাঙতে এসেছি। আপনি আজ রাতে এই রুম থেকে কোথাও যাচ্ছেন না। আর যদি যাওয়ার চেষ্টা করেন…” সুমু তার বালিশের নিচ থেকে একটা রুপালি রঙের হাতকড়া বের করে আনল। সে দুষ্টুমিভরা হাসিতে বলল, ​“তবে আমি আপনাকে বিছানার সাথে বেঁধে রাখব। আর বিশ্বাস করুন, ওমানের সেই দিনগুলোতে আপনি এই বন্ধন বেশ উপভোগই করতেন। মনে পড়ছে কি কিছু?”

​শেরাজ বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। এই নারীটি মুহূর্তের মধ্যে খোলস পাল্টাতে পারে—কখনো দস্যু, কখনো রানি, আর এখন এক মোহময়ী জাদুকরী। তার ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল। সুমুর এই সাজসজ্জা আর বাসর রাতের আলাপ তার কাছে স্রেফ একটা বিকৃত রসিকতা মনে হতে লাগল। সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠল, ​
“যথেষ্ট হয়েছে! অনেক সহ্য করেছি আপনার এই নোংরা খেলা। আপনি কি মনে করেন নিজেকে? আপনি একজন সস্তা অপরাধী ছাড়া আর কিছুই নন। আপনার মতো নির্লজ্জ মেয়ে আমি আমার জীবনে দেখিনি, যে কি না একটা পুরুষকে জোর করে বিয়ে করে তার ঘরে ঢুকে পড়ে। ছিঃ!”
​সুমু বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে বরং শেরাজের এতো রাগ দেখে গালে হাত দিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত ভঙ্গিতে বলল,
“জানেন! আপনি যখন রেগে গিয়ে কথা বলেন, তখন আপনাকে ঠিক রাগী রাগী কোনো বলিউড হিরোর মতো লাগে। তো মিস্টার খান, হিরোর ডায়ালগ তো শেষ, এবার হিরোইনের সাথে ডিনারটা করবেন নাকি আমিই খাইয়ে দেব?”
​শেরাজ যেন আরও বেশি অপমানিত বোধ করল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ডিনার করবেন মানে? আপনি কি ভাবছেন এসব পাগলামি করে আমার মন জয় করবেন? আপনি একটা রক্তচোষা জাদুকরী। আপনাকে দেখলে আমার ঘেন্না লাগে। আপনার মতো মেয়ের জায়গা এই বাড়িতে নয়, কোনো পাগলা গারদে।”

​সুমু খিলখিল করে হেসে উঠল। সে শেরাজের কাছে গিয়ে তার কোটটা টেনে ধরে বলল,
“পাগলা গারদে গেলে তো আপনাকেও আমার সাথে যেতে হবে প্রিয়তম। কারণ আপনার জন্যই তো আমি পাগল, আর আমার এই পাগলামির একমাত্র ওষুধ আপনি। তো, বাসর রাতে ওষুধটা কি তেতো হবে না মিষ্টি?”
​শেরাজ আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সে সুমুর দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখে আগুন জ্বলছে। সে সুমুকে দরজার দিকে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“আপনার মতো অসভ্য নারীর সাথে এক রুমে থাকা তো দূর, আপনার ছায়া মাড়ানোও পাপ। বেরিয়ে যান আমার ঘর থেকে, এখনই।”
​সুমু যেতে যেতেও মজা করতে ছাড়ল না,

“আরে আরে, ধাক্কা দিচ্ছেন কেন? লোকে দেখলে তো ভাববে আমাদের মধ্যে কত প্রেম। সাবধানে ধরুন, আমার চুড়ি ভেঙে গেলে কিন্তু সবাই অন‍্য কিছু মনে করতে পারে।”
​শেরাজ কোনো কথা না শুনে সুমুকে ঘরের বাইরে বের করে দিল। সুমু দরজার বাইরে দাঁড়িয়েও হাসতে হাসতে বলল,
“শুনুন মিস্টার বাঘ, দরজা লাগালেই কিন্তু মুক্তি পাওয়া যায় না। আমি তো আপনার হৃদপিণ্ডের ভেতর আগে থেকেই তালা মেরে বসে আছি।”
​শেরাজ সশব্দে দরজাটা লাগিয়ে দিল এবং ভেতর থেকে খিল তুলে দিল। সে বড় বড় করে নিঃশ্বাস নিল। পুরো ঘরটা ফুলে সাজানো, অথচ তার কাছে মনে হচ্ছে সে একটা কারাগারে বন্দি। সে বিছানার দিকে তাকাল—যেখানে ফুলের পাপড়ি দিয়ে ‘এস প্লাস এস লেখা। সে পাগলের মতো হাত দিয়ে সব ফুল মেঝেতে ফেলে দিল।
​দরজার ওপাশ থেকে সুমুর ফিসফিসে আওয়াজ এখনো ভেসে আসছে। ​শেরাজ কানে হাত দিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। তার মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। সে মনে মনে ভাবল, কেন এই মেয়েটির কথাগুলো তার মনে এতোটা আলোড়ন তুলছে? কেন সুমুর সেই হাসিমুখটা চোখের সামনে থেকে সরছে না?

ভোরের স্নিগ্ধ আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে এসে পড়েছে। রাতের সেই ঝড়ো পরিস্থিতির পর সারাটা রাত শেরাজের চোখে দুফোটা ঘুম আসেনি। স্মৃতির অলিগলিতে হাতড়ে বেড়ানো আর সুমুর অদ্ভুত সব আচরণ তাকে অস্থির করে রেখেছিল। শরীরটাকে একটু সচল করতে আর মনের ভার কমাতে সে জিম করার উদ্দেশ্যে রুমের দরজাটা খুলল।
​কিন্তু দরজা খুলতেই শেরাজের পায়ের গতি থমকে গেল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল দরজার ঠিক পাশটিতে।
​সেখানে মেঝেতে দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে সুমু। সারা রাতের ধকল আর অনিদ্রায় মেয়েটা বোধহয় সেখানেই তলিয়ে গেছে গভীর ঘুমে। তার ঘাড়টা ক্লান্তিতে একপাশে কাত হয়ে আছে। পরনের শাড়িটা মেঝের ধুলোয় লুটাচ্ছে, আর দুহাতে নিজের হাঁটু দুটোকে জড়িয়ে ধরে সে যেন কোনো এক হারানো আশ্রয়ের সন্ধান করছে। ভোরের হালকা ঠাণ্ডায় মেয়েটার শরীরটা মাঝে মাঝে সামান্য কেঁপে উঠছে।

​শেরাজ শক্ত মনে নিজেকে বোঝাল—ইগনোর করো। ও একটা অসভ‍্য, একটা লেডি মাফিয়া! যে মেয়ে তাকে বন্দি করে জোর করে বিয়ে করেছে, তার জন্য মায়া দেখানো বোকামি।
​শেরাজ পা বাড়াল সামনের দিকে। কিন্তু কয়েক পা যেতেই তার অবাধ্য মনটা বিদ্রোহ করে বসল। কী এক অদৃশ্য সুতোর টানে সে আবার ফিরে এলো। অবচেতন মনেই সে হাঁটু গেড়ে বসল সুমুর ঠিক সামনে।
​খুব কাছ থেকে মেয়েটাকে আজ অন্যরকম লাগছে। কালকের সেই রণংদেহী চণ্ডী রূপটা এখন কোথাও নেই, বরং এক নিস্পাপ, ক্লান্ত শিশুর মতো লাগছে তাকে। একগুচ্ছ অবাধ্য চুল সুমুর নাকের ডগায় আর চোখের ওপর এসে পড়েছে, যেন মেয়েটার ঘুম ভাঙানোর ষড়যন্ত্র করছে।
​শেরাজ খুব সন্তর্পণে, হাতের স্পর্শ না লাগিয়ে আলতো করে একটা ফুঁ দিল। চুলগুলো সরে যেতেই সুমুর ফর্সা মুখটা পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঘুমের ঘোরেই সুমুর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল, যেন স্বপ্নে সে তার বহু কাঙ্ক্ষিত কাউকে খুঁজে পেয়েছে।
​শেরাজ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সুমুর মায়াভরা মুখটার দিকে। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল। কেন এই মেয়েটার প্রতি তার মনে এতো ঘৃণা থাকার পরেও অদ্ভুত এক টানের সৃষ্টি হচ্ছে? কেন হাজারো অপমানের পরেও এই মেয়েটা তার দরজায় পড়ে থাকে?
​শেরাজের ইচ্ছে করছিল সুমুর গালটা ছুঁয়ে দেখতে, কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ওপর তার রাগ হলো। সে বিড়বিড় করে ঘুমন্ত সুমুকে প্রশ্ন করল, “কে তুমি? কেন আমার সাজানো গোছানো পৃথিবীতে এসে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে? কেন আমি তোমাকে চেয়েও ঘৃণা করতে পারছি না?”

শেরাজ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। মেঝেতে কুঁকড়ে শুয়ে থাকা এই মানবীটির জন্য তার কঠোর হৃদয়ের কোথাও একটা ফাটল ধরেছে। সে যতবারই নিজেকে নিষ্ঠুর হওয়ার আদেশ দিচ্ছে, তার অবচেতন মন ততবারই সুমুর এই ক্লান্ত ও অসহায় মুখটার কাছে হেরে যাচ্ছে।
​শেরাজ চারপাশে একবার তাকাল। করিডোরে কেউ নেই। সে খুব সাবধানে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী কোনো জিনিসকে স্পর্শ করছে, সুমুর হাঁটু আর পিঠের নিচ দিয়ে নিজের শক্ত হাত দুটো গলিয়ে দিল। এক ঝটকায় তাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল সে।
​সুমু ঘুমের ঘোরেই অবচেতন মনে শেরাজের বুকের শার্টটা খামচে ধরল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস শেরাজের গলার কাছে আছড়ে পড়ছে। শেরাজ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার হৃদপিণ্ডটা যেন বেইমানি শুরু করেছে—তীব্র গতিতে ধুকপুক করছে সেটা। সুমুর শরীর থেকে ভেসে আসা সেই চিরচেনা পারফিউমের ঘ্রাণ আর তার শরীরের ওম শেরাজের মস্তিস্কে এক অদ্ভুত নেশা তৈরি করল।

শেরাজ ধীর পায়ে নিজের রুমের ভেতর ঢুকল। লাথি দিয়ে দরজাটা হালকা করে ভেজিয়ে দিল সে। তারপর অত্যন্ত সন্তর্পণে সুমুকে তার সেই ফুল ছড়ানো বিছানাটার ওপর শুইয়ে দিল।
​বিছানার নরম ছোঁয়ায় সুমু একটু নড়েচড়ে উঠল, কিন্তু তার ঘুম ভাঙল না। শেরাজ তার পায়ের জুতো জোড়া খুলে পাশে রাখল এবং আলতো করে একটা পাতলা কম্বল টেনে সুমুর গলা পর্যন্ত ঢেকে দিল।
​বিছানায় শোয়ানোর পর সুমুর মুখটা এখন আরও শান্ত লাগছে। শেরাজ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। কাল রাতে এই রুম থেকেই সে সুমুকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, অথচ আজ নিজ হাতেই তাকে এখানে এনে আশ্রয় দিল। ​সে বিড়বিড় করে বলল,
“তুমি কি সত্যিই জাদুকরী? নাহলে আমি কেন বারবার নিজের জেদ ভেঙে তোমার কাছে হেরে যাচ্ছি?”
​সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। সুমুর দিকে শেষবার এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। জিম করাটা এখন তার বেশি প্রয়োজন, কারণ সে বুঝতে পারছে—এই মেয়েটি শুধু তার ঘরে নয়, তার অস্তিত্বের গভীরেও দখল নিতে শুরু করেছে।

বেলা দশটার কড়া রোদ জানলার পর্দা ভেদ করে সুমুর চোখের ওপর এসে পড়ল। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর সারা রাতের অনিদ্রার পর ঘুমটা আজ বড্ড গাঢ় ছিল। সুমু চোখ মেলতেই প্রথমে খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। তার মনে পড়ল সে তো দরজার পাশে মেঝেতে বসে ছিল, তবে এখানে এলো কী করে?
​সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। চারপাশটা ভালো করে দেখে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। এটা শেরাজের বিছানা, এটা শেরাজের সেই ঘর—যেখান থেকে কাল রাতে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সুমু নরম বিছানায় হাত বুলিয়ে অনুভব করল, শেরাজ এখানে নেই। বালিশের পাশে হাত দিয়ে দেখল জায়গাটা একদম শীতল, অর্থাৎ শেরাজ গত কয়েক ঘণ্টায় এই বিছানার ধারেকাছেও আসেনি।
​সুমু আনমনেই হেসে ফেলল। সে বিড়বিড় করে বলল,

“ওরে আমার রাগী বাঘ রে! মুখে তো বড় বড় কথা—আমাকে ঘৃণা করেন, বের করে দেন। তাহলে এই বিছানায় এখন শুইয়ে দিল কে? আমি নিজে তো আর উড়াল দিয়ে এখানে আসিনি।”
​সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার এলোমেলো চুল, কাজল লেপটে যাওয়া চোখ আর কুঁচকে যাওয়া শাড়িটার দিকে তাকিয়ে নিজের ওপরই মায়া হলো তার। গত পাঁচটা বছর এই দিনটার জন্যই তো সে নিজেকে তিল তিল করে গড়েছে। শেরাজ তাকে চিনতে পারছে না ঠিকই, কিন্তু শেরাজের অবচেতন মন যে এখনো সুমুরই দাস, তার প্রমাণ আজকের এই সকালটা। তার মনে অনেক প্রশ্ন—খান সাহেব কোথায়? সে কি এখনো রাগ করে বাইরে কোথাও বসে আছে? নাকি জিম শেষ করে শাওয়ার নিতে গেছে?
​রুমে শেরাজের কোনো চিহ্ন নেই। পুরো ঘরটা একদম নিঝুম। সুমু ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে দেখল দরজা খোলা, সেখানেও কেউ নেই। ​সে দ্রুত নিজের শাড়িটা ঠিক করে নিল। ​সুমু ঘর থেকে বেরোনোর ঠিক আগেই দরজার কপাটে শেরাজের গম্ভীর অবয়ব ফুটে উঠল। জিম শেষ করে আসায় তার কপালে ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দু, পরনে কালো রঙের ফিটিং টি-শার্ট। সুমুকে দেখে শেরাজের চোখ কিছুটা কুঁচকে গেল।
​সুমু সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে শেরাজের সামনে এসে দাঁড়াল। মুখে সেই বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

“কী ব্যাপার খান সাহেব? কাল রাতে তো খুব গর্জন করে আমাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তবে সকালে নিজেকে আপনার এই রাজকীয় বিছানায় আবিষ্কার করলাম যে বড়? আমাকে কি ডানা কাটা পরী ভেবে কোলে করে উড়িয়ে এনেছেন, নাকি রাতে ঘুমের ঘোরে আমার বিরহে কাতর হয়ে নিজেই দরজা খুলেছিলেন?”
শেরাজ অপ্রস্তুত ভাবটা আড়াল করতে জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তারপর অত্যন্ত ভাবলেশহীন গলায় বলল,
“আপনার ওখানে দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমাতে কষ্ট হচ্ছিল, বার বার গোঙাচ্ছিলেন। অমানবিক দৃশ্যটা সহ্য হচ্ছিল না বলেই রুমে এনে শুইয়ে দিয়েছি। এর বাইরে এসবের অন্য কোনো মানে বের করার চেষ্টা করবেন না।”
​সুমু এক পা এগিয়ে শেরাজের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,
“তার মানে আপনার মনে আমার প্রতি কোনো ভালোবাসা নেই? সবটাই কি স্রেফ দয়া?”
​শেরাজ পাথরের মতো স্থির হয়ে সোজাসুজি তাকাল সুমুর দিকে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল,
“না, নেই। আমার হৃদয়ে আপনার জন্য কোনো জায়গা নেই, কারণ আমি আপনাকে চিনিই না।”

সুমুর বুকের ভেতরটা মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। তার চেহারায় এবার দৃঢ়তা ফিরে এলো। সে বলল,
“ঠিক আছে। তাহলে চলুন আমার সাথে।”
​শেরাজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কোথায়?”
​“থেরাপিস্টের কাছে। আপনার একটা বিশেষ থেরাপি করানো দরকার। আপনার যদি সত্যিই মনে হয় যে আমি আপনার কেউ না, তবে চলুন থেরাপিস্টের কাছে। সেখানেই সবটা পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। আজই এর একটা ফয়সালা হওয়া দরকার।”
​শেরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আর যদি থেরাপি দেওয়ার পরেও আমি আপনাকে না চিনি? যদি আমার স্মৃতি না ফেরে?”
​সুমু কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল,
“তাহলে আমি কথা দিচ্ছি—এরপর আর কোনোদিন, কোনো অজুহাতেই আমি আপনার চোখের সামনে আসব না। আপনাকে আপনার মতো মুক্তি দিয়ে আমি আমার বাচ্চাদের নিয়ে চিরতরে হারিয়ে যাব।”
​শেরাজ সুমুর চোখের গভীরতা মেপে নেওয়ার চেষ্টা করল। সেখানে জেদ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে এক বুক হাহাকার। সে ভাবল, এই আপদ বিদায় করার এটাই হয়তো শেষ সুযোগ। সে গম্ভীর গলায় বলল,
“ডিল! আমি রাজি। চলুন তবে থেরাপিস্টের কাছেই যাওয়া যাক।”

​শহরের এক নিরিবিলি ক্লিনিকে বিখ্যাত একজন নিউরো-থেরাপিস্টের চেম্বারে বসে আছে শেরাজ। ​থেরাপির ঘরটা একদম নিঝুম, চারপাশ সাদা দেওয়ালের মাঝখানে কেবল একটা যান্ত্রিক স্থিরতা। শেরাজকে মাথায় অনেকগুলো ইলেকট্রোড এবং সেন্সর লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। রুমের আলো নিভিয়ে দিয়ে তার চোখের সামনে স্লাইডের মতো দ্রুত গতিতে কিছু ছবি এবং ওমানের দৃশ‍্য, বাড়ি আর পুরনো দিনের কিছ ভিডিও ক্লিপ চালানো হচ্ছে।
​ডক্টর পাশের কন্ট্রোল রুম থেকে ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়ে দিলেন। শেরাজের মস্তিস্কে কৃত্রিমভাবে ইলেকট্রিক পালস পাঠানো হচ্ছে যাতে তার অবচেতনে জমে থাকা স্মৃতিগুলো ধাক্কা খেয়ে বেরিয়ে আসে।
​কিছুক্ষণ পরেই শেরাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করল। মস্তিস্কের ভেতরে যেন হাজার হাজার সুঁই একসাথে ফুটছে। সে যন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত চেপে গোঙাতে লাগল। স্ক্রিনে সুমুর সাথে তার বিয়ের একটা মুহূর্ত আসতেই শেরাজ আর্তনাদ করে উঠল,

“আহহহ! বন্ধ করুন এসব! আমার মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে।”
​কাচের দেওয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে সুমু তখন জীবন্ত লাশের মতো হয়ে গেছে। শেরাজকে ওভাবে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে তার কলিজাটা যেন কেউ খামচে ধরছে। শেরাজ যখন ব্যথায় চেয়ারের হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরল এবং তার গলার শিরাগুলো ফুলে উঠল, তখন সুমু আর স্থির থাকতে পারল না। ​সে পাগলের মতো কাচের ওপর দুহাতে থাবড়ে চিৎকার করে বলতে লাগল,
“ডক্টর, প্লিজ থামান! ওনার অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমি আর স্মৃতি ফেরাতে চাই না, উনি সুস্থ থাকলেই হবে। ডক্টর, দরজা খুলুন।”
ইনায়া আর ইশিতা পেছন থেকে সুমুকে জাপটে ধরল। সুমু তাদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করছে, তার কান্না এখন গগনবিদারী আর্তনাদে রূপ নিয়েছে। সে মেঝের ওপর বসে পড়ে হাত জোড় করে বলতে লাগল,
“আইয়ুব ভাইয়া, ওনাকে বের করে আনুন! আমি আর পারছি না দেখতে। আমার খান সাহেব শেষ হয়ে যাচ্ছে। দরকার নেই স্মৃতির, আমি ওনাকে এভাবেই মেনে নেব। প্লিজ, দরজাটা খুলুন।”
​রুমের ভেতর শেরাজের অবস্থা তখন আরও শোচনীয়। সে যন্ত্রণায় চেয়ার থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে, মুখ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে আসার উপক্রম। ডক্টর পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত সুইচ অফ করে দিলেন। থেরাপি থেমে গেল, কিন্তু শেরাজের চেতনা তখন তলানিতে।
​সুমু রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ল। শেরাজের মাথায় সেন্সরগুলো লাগানো থাকা অবস্থাতেই সে তার বুক জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।

“ক্ষমা করে দিন আমাকে! আমি খুব বড় ভুল করেছি। আর কখনো আপনাকে জোর করব না, আর কখনো কোনো থেরাপি আপনাকে দেওয়া হবে না। প্লিজ চোখ মেলুন।”
​শেরাজ ভারী চোখে সুমুর দিকে তাকাল। তার মস্তিস্কটা এখনো ভোঁভোঁ করছে। সে সুমুকে দেখল, তার কান্না দেখল, কিন্তু পরিচিত কিছুই তার চোখে ভেসে উঠল না। অনেক ক্লান্তি নিয়ে সে সুমুর বুকের ওপর মাথাটা ছেড়ে দিল। ​সবাই আশা করেছিল এই তীব্র যন্ত্রণার পর হয়তো সে “সুমু” বলে ডেকে উঠবে। কিন্তু ঘর জুড়ে তখন কেবল সুমুর কান্নার শব্দ আর শেরাজের ভারী নিঃশ্বাস ছাড়া আর কিছুই ছিল না। থেরাপি ব্যর্থ হয়েছে। শেরাজ স্মৃতি ফেরানো তো দূর, এখন যন্ত্রণায় সে ঠিকমতো তাকাতেও পারছে না।
আইয়ুব দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ডক্টরকে ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ডক্টর? কিছু কি মনে পড়েছে ওর? ও কি আমাদের চিনতে পারছে?”
​ডক্টর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করলেন। তিনি অত্যন্ত দুঃখিত স্বরে বললেন,
“আই অ্যাম সরি! আমরা আমাদের লেভেল বেস্ট ট্রাই করেছি। কিন্তু ওনার ব্লকেজটা অনেক বেশি গভীর। কোনো ইমেজ, কোনো মিউজিক বা কোনো স্মৃতিই ওনার ব্রেইনে কোনো পজিটিভ রেসপন্স তৈরি করতে পারেনি। ওনার কাছে সবটাই এখনো অন্ধকার।”

​কথাটা শোনার সাথে সাথে সুমুর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে টাল সামলাতে পারল না। আইয়ুব আর সারবাজ একে অপরের দিকে তাকাল—তাদের চোখেও আজ পরাজয়ের গ্লানি। স্যান্ডি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
“এটা হতে পারে না! স্যার এভাবে আমাদের সবাইকে ভুলে থাকতে পারেন না।”
​শেরাজ এবার সুমুকে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কঠিন গলায় বলল,
“থেরাপি তো হলো। ডক্টর যা বলার বলে দিয়েছেন। এবার আশা করি আপনার ড্রামা আর কন্ডিশন দেওয়ার পালা শেষ হয়েছে। আপনার সময়ও শেষ। তার মানে, আমার জীবনে আপনার বা এই মানুষগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। এবার কি আপনার দেওয়া কথা অনুযায়ী আমাকে মুক্তি দেবেন?”
​সুমু ফ্যাকাশে মুখে শেরাজের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ সে শুধু হারেনি, তার বিশ্বাসের পাহাড়টা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যে ভালোবাসার জোরে সে বন্দুক ধরেছিল, যে ভালোবাসার জোরে সে লড়াই করছিল—সেই ভালোবাসাই আজ শেরাজের কাছে অর্থহীন।
​আইয়ুব এগিয়ে এসে শেরাজকে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু সুমু হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। সে চোখের জল মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু নিজের সম্মানের কাছে সে আজ দায়বদ্ধ। সে শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল,

“ঠিক আছে, খান সাহেব। আজ থেকে সুমু নামের অধ্যায়টা আপনার জীবন থেকে চিরতরে মুছে গেল। আমি কথা দিচ্ছি, এই মুহূর্তের পর আপনি আর কখনো আমার ছায়াটাও দেখতে পাবেন না। আপনার জয় হয়েছে, আর আমার পাঁচ বছরের প্রতীক্ষার পরাজয়। আমি কথা দিচ্ছি, কাল সকালেই আমি আপনার জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যাব। এতো দূরে, যেখান থেকে চিৎকার করলেও আর আমার কণ্ঠস্বর আপনার কাছে পৌঁছাবে না। আপনাকে আর কোনোদিন কোনো কিছুর জন্য জোর করা হবে না। আপনি আপনার এই স্মৃতিহীন শান্ত পৃথিবীতে একাই সুখে থাকুন।”
​শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু নির্লিপ্তভাবে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। সুমু আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুতপায়ে ক্লিনিকের সদর দরজার দিকে হাঁটা দিল। ইনায়া আর ইশিতা ছুটল তার পিছু পিছু।
​আইয়ুব আর সারবাজ শেরাজের দিকে একবার জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুমুর পিছু নিল। স্যান্ডি হতভম্ব হয়ে একবার শেরাজের দিকে তাকাল, তারপর চিৎকার করে সুমুর পিছে ছুটল।

খান সাহেব পর্ব ৮৮ (২)

“ম্যাম! দাঁড়ান! আমাদের এভাবে ফেলে যাবেন না।”
​শেরাজ একা দাঁড়িয়ে রইল। তার মনের ভেতরে ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে। তার মনের ভেতর কোনো আনন্দ নেই, বরং এক অদ্ভুত হাহাকার তাকে ঘিরে ধরছে। কিন্তু তার জেদ তাকে বলছে সে ঠিক করেছে।

খান সাহেব পর্ব ৯০