খান সাহেব পর্ব ৯১
সুমাইয়া জাহান
ভোরের লগ্নটা আজ বড্ড মায়াবী। রাতের অবশিষ্ট অন্ধকার তখনো পুরোপুরি কাটেনি, অথচ আকাশের এক কোণায় শুভ্রতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। শেখবাড়ির চারপাশটা কুয়াশার এক পাতলা চাদরে ঢাকা। নামাজের পর মনটা যখন প্রশান্তিতে ভরে আছে, ঠিক তখনই পিয়াস ধীরপায়ে শেখবাড়ির বিশাল বাগানে এসে দাঁড়াল। বাগানবিলাসের পাতা থেকে শিশিরবিন্দু টুপ করে ঘাসের ওপর পড়ছে।
হঠাৎ পিয়াসের নজরে এলো এক মায়াবী দৃশ্য। বাগানের ঠিক মাঝখানে, শিউলি গাছের তলায় একটা মেয়ে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। পরনে সাদা রঙের একটা সুতি কামিজ, ওড়নাটা মাথায় আলতো করে জড়ানো। মেয়েটা খুব যত্ন করে ঝরে পড়া শিউলি ফুলগুলো কুড়িয়ে নিজের ওড়নার আঁচলে রাখছে। ভোরের অস্ফুট আলোয় তাকে অনেকটা সাদা মেঘের হিল্লোলের মতো মনে হচ্ছে। পিয়াস চিনতে পারল—ওটা ইফতিয়া। সে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে ওর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে খুব শান্ত স্বরে ডাকল, “ইফতিয়া।”
অকস্মাৎ স্তব্ধতায় নিজের নাম শুনে ইফতিয়া চমকে উঠল। হাতের আঁচল থেকে কয়েকটা ফুল ঝরঝর করে নিচে পড়ে গেল। সে দ্রুত পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল পিয়াস দাঁড়িয়ে আছে। ইফতিয়া আমতা আমতা করে বলল,
“পি… পিয়াস ভাইয়া! আপনি এখানে?”
পিয়াস কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরপায়ে ইফতিয়ার আরও কাছে এগিয়ে এলো। পিয়াসের এই আকস্মিক ঘনিষ্ঠতায় ইফতিয়ার হৃদস্পন্দন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। পিয়াস পকেট থেকে একটা ছোট মখমলের বক্স বের করে ইফতিয়ার চোখের সামনে ধরল। বক্সটা খুলতেই ভেতরে একটা আংটি ঝিলমিল করে উঠল। পিয়াস খুব গম্ভীর গলায় বলল,
“এই অবুঝ ছেলেটার সঙ্গী হয়ে কি সারাজীবন পাশে থাকবে, ইফতিয়া? আমার ঘরটা কি তোমার ওই পবিত্র মায়া দিয়ে সাজাবে?”
ইফতিয়া মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে গেল। তার কান যেন কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারছে না। যে মানুষটা এতদিন তাকে স্রেফ ছায়ার মতো এড়িয়ে চলেছে, যার মনে অন্য একজনের রাজত্ব, সেই আজ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে!
ইফতিয়ার চোখ ভিজে এলো। সে অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“এটা কী বলছেন আপনি? এটা কি কোনো করুণা? নাকি কারো চাপে পড়ে বলছেন?” সে একটু থামল, ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “কিন্তু পিয়াস ভাইয়া… আপনি তো সামিয়াকে এখনো ভালোবাসেন। আপনার হৃদয়ের প্রতিটি ধমনীতে তো ওর নামই লেখা। সেখানে আমি কীভাবে জায়গা পাব? আমি তো চাই না কেউ আমাকে কারো ‘বিকল্প’ হিসেবে গ্রহণ করুক।”
পিয়াস এক পা এগিয়ে এসে ইফতিয়ার হাতটা ধরল। তার হাতের উষ্ণতা ইফতিয়ার সারা শরীরে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল। পিয়াস ইফতিয়ার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“সামিয়া আমার অতীত, ইফতিয়া। সে একটা সুন্দর স্মৃতি, যা আমি কোনোদিন মুছে ফেলতে চাই না। কিন্তু স্মৃতি নিয়ে মানুষ একা বাঁচতে পারে, সংসার করতে পারে না। আমি গত রাতে অনেক ভেবেছি। আমি বুঝতে পেরেছি, কারো মৃত স্মৃতির চেয়ে কারো জীবন্ত ভালোবাসার মূল্য অনেক বেশি।”
পিয়াস একটু হাসল, তবে সেই হাসিতে আজ কোনো বিদ্রূপ নেই। সে আবারও বলল,
“তুমি আমার ‘বিকল্প’ নও ইফতিয়া, তুমি আমার ‘নতুন শুরু’। আমি হয়তো এখনই বলতে পারব না যে তোমাকে আমি সামিয়ার চেয়ে বেশি ভালোবাসি, কিন্তু এইটুকু কথা দিতে পারি—আমার জীবনে তোমার মর্যাদা হবে সবার ওপরে। আমাকে এই একতরফা ভালোবাসার বন্দিশালা থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব কি তুমি নেবে?”
ইফতিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ওড়নার আঁচল থেকে সব ফুল মাটিতে পড়ে গেল। সে দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। এই কান্না দুঃখের নয়, এই কান্না দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান আর পরম প্রাপ্তির। পিয়াস হাসিমুখে পকেটে আংটিটা রেখে ইফতিয়ার চোখের পানি যত্ন করে মুছে দিয়ে আলতো করে ইফতিয়ার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। সে চোখের গভীরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“কান্না থামাও, ইফতিয়া। এতো সুন্দর শিউলি ঝরা ভোরে কেউ বুঝি চোখের অশ্রু ফেলে? যে মায়া দিয়ে আমাকে বাঁধতে চাইছ, সেই মায়া দিয়ে এখন ঘরটা সাজানোর প্রস্তুতি নাও।”
ইফতিয়া ভিজে গলায় কোনোমতে বলল,
“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, পিয়াস ভাইয়া। আপনি সত্যি বলছেন তো? আমার স্বপ্নগুলো তো বড্ড ভঙ্গুর, আমি ভয় পাচ্ছি এই ভোরটা কাটলেই যদি সব মরীচিকা হয়ে যায়।”
পিয়াস পকেট থেকে আংটিটা বের করে ওর কম্পিত অনামিকায় পরিয়ে দিল। রূপালি আংটির হীরেটা ভোরের প্রথম আলোর ছোঁয়ায় ঝিকমিক করে উঠল। সে মৃদু হেসে বলল,
“মরীচিকা নয় ইফতিয়া, এটা ধ্রুবসত্য। এখন চলো, বাড়ির ভেতর যাওয়ার আগে সবটুকু জড়তা এই বাগানে ফেলে যাও। কারণ আজ থেকে আমাদের পরিচয়টা বদলে গেছে।”
ইফতিয়া ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ মুছে একটা গভীর শ্বাস নিল। তার সারা শরীর এক অদ্ভুত স্পন্দনে কাঁপছে। তারা দুজনে ধীরপায়ে বাড়ির প্রধান ফটকের দিকে এগোলো।
সকালবেলার রোদটা জানালার কাচ চিরে ডাইনিং টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে। শেখবাড়ির বিশাল ডাইনিং টেবিলটা আজ লোকে লোকারণ্য। প্লেট-বাসনের টুংটাং শব্দ আর হালকা আড্ডার গুঞ্জনে পুরো ঘরটা মুখরিত। শেরাজ আজ বেশ খোশমেজাজে আছে, সে নিজের খাওয়া বাদ দিয়ে ছোট সিমরানকে যত্ন করে খাইয়ে দিচ্ছে। সিমরান ওর পাপার সাথে মাঝেমধ্যে কথা বলছে।
টেবিলের একপাশে শামীম সাহেব আর সাখাওয়াত সাহেব সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে নিচু স্বরে কথা বলছেন। হাসি বেগম আর রুমা বেগম ব্যস্ত সবাইকে গরম পরোটা আর ডিম ভাজা পরিবেশন করতে। পিয়াস এক কোণায় মুখ নিচু করে কফিতে চুমুক দিচ্ছে, তার চোখেমুখে বরাবরের মতোই এক অতলান্ত বিষণ্ণতার ছাপ। পাশেই বসা ইফতিয়া, যে কি না চোরের মতো আড়চোখে পিয়াসকে দেখছে আর প্লেটের খাবার নিয়ে অন্যমনস্কভাবে নাড়াচাড়া করছে।
হঠাৎ শেরাজ চামচটা প্লেটে নামিয়ে রাখল। তার এই সামান্য শব্দেই আড্ডার গুঞ্জনটা কেমন যেন থিতিয়ে এলো। শেরাজ গলায় একটা মৃদু আওয়াজ করে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করল। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“সবাই একটু শুনবেন? আপনাদের সবার উদ্দেশ্যে আমার কিছু বলার আছে।”
মুহূর্তেই টেবিলজুড়ে পিনপতন নীরবতা। শামীম সাহেব চশমাটা ঠিক করে তাকালেন। আইয়ুব, নিহাল আর সারবাজরা খাওয়া থামিয়ে শেরাজের দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে চাইল। শেরাজ একটু সময় নিয়ে সবার ওপর একবার নজর বুলিয়ে বলতে শুরু করল,
“সান আর নাতাশার বিয়ের কথা যে চলছে, সেটা তো সবাই জানেন। সবকিছু চূড়ান্ত। কিন্তু আমি ভাবছি, একই আসরে, একই দিনে যদি আরও একটা জুটিকে আমরা কবুল বলিয়ে আজীবনের জন্য গেঁথে দিতে পারি, তবে খুশিটা বোধহয় পূর্ণতা পায়।”
মুস্তাক সিকদার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কাদের কথা বলছ, বাবা? আর কোন জুটি বাকি রইল কে?”
শেরাজ এবার সরাসরি পিয়াসের চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর অথচ স্পষ্ট স্বরে বলল,
“পিয়াস আর ইফতিয়া। আমি চাই এই শুভ কাজটা যেন ওদের হাত ধরেই পূর্ণ হয়।”
কথাটা শোনামাত্র ডাইনিং টেবিলের সেই মুখর পরিবেশ মুহূর্তের জন্য শ্মশানের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। পিয়াসের হাতে থাকা কফির কাপটা সামান্য কেঁপে উঠল। সামিয়া আর রাহিন একে অপরের দিকে তাকাল। সামিয়ার চোখে একরাশ বিস্ময় আর অপরাধবোধের মিশ্রণ। পিয়াসের মা সুমি বেগম আর বাবা মুস্তাক সিকদার যেন নিজেদের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। ইফতিয়ার মা-বাবাও স্তম্ভিত হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। সুমি বেগম একটু ধাতস্থ হয়ে ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“পিয়াস! শেরাজ যা বলছে, সেটা কি সত্যি? তুই… তুই কি সত্যিই বিয়ে করতে রাজি?”
পুরো ড্রয়িংরুমের সবার নিঃশ্বাস যেন আটকে আছে পিয়াসের উত্তরের ওপর। পিয়াস ধীরে ধীরে কফির কাপটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর মাথা তুলে সবার সামনে দাঁড়াল। তার চোখে আজ আর সেই পুরনো দ্বিধা নেই। সে ধীর পায়ে ইফতিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়াল এবং ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“হ্যাঁ মা। শেরাজ যা বলছে, তা একদম ঠিক। আমি ইফতিয়াকে বিয়ে করতে চাই। জীবনের অনেকটা সময় আমি ছায়ার পেছনে ঘুরেছি, এবার আমি বাস্তবের এই পবিত্র মায়াটাকে আগলে ধরতে চাই। ইফতিয়া যদি আমাকে গ্রহণ করে, তবে আমি তাকে আমার জীবনের সর্বোচ্চ মর্যাদা দেব।”
ইফতিয়াক সাহেব আর খুশি বেগম এতোক্ষণ পাথর হয়ে ছিলেন। পিয়াসের মতো এমন শিক্ষিত, সুদর্শন আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পাত্র তাদের মেয়ের জন্য পাবেন—এটা তাদের জন্য অনেক খুশির কথা। ইফতিয়াক সাহেব আবেগপ্রবণ হয়ে সোফা ছেড়ে উঠে পিয়াসের সামনে এলেন। তিনি পিয়াসের মাথায় হাত রেখে ভিজে গলায় বললেন,
“বাবা পিয়াস, তোমার মতো ছেলেকে জামাই হিসেবে পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার। আমাদের ইফতিয়া যে তোমার হাতে কতটা নিরাপদ, সেটা আজ আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।”
সুমি বেগম আর মুস্তাক সিকদারও আর বসে থাকতে পারলেন না। সুমি বেগম চোখের জল মুছে ইফতিয়াকে কাছে টেনে নিলেন। ইফতিয়ার কপালে একটা চুমু খেয়ে তিনি বললেন,
“তুই আমার অনেক বড় কষ্ট আজ দূর করে দিলি রে মা। আমার ঘরে তুই শুধু আমার ছেলের বউ না, তুই আমার নিজের মেয়ে হয়ে আসবি।”
ইফতিয়া লজ্জিত হয়ে মাথা নত করল। আইয়ুব আর নিহালরা শিস দিয়ে উল্লাস শুরু করল। শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে হাসল, যে হাসিতে লুকিয়ে ছিল এক বিরাট জয়ের তৃপ্তি। সুমু শেরাজের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি সত্যিই এক ম্যাজিশিয়ান, খান সাহেব। একটা মৃতপ্রায় জীবনকে আপনি এক লহমায় বসন্ত এনে দিলেন।”
সামিয়ার বুকের ভেতর জমে থাকা একটা বিশাল পাথর যেন এক নিমিষেই সরে গেল। পিয়াস যখন ইফতিয়ার হাত ধরে সবার সামনে নিজের সম্মতির কথা জানাল, তখন সামিয়ার চোখ দিয়ে অগোচরেই দু-ফোঁটা আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এতো বছরের এক দমবন্ধ করা অপরাধবোধ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল—পিয়াসের এই বৈরাগ্য, এই একাকীত্ব, সবকিছুর জন্য সে নিজেকেই দায়ী মনে করত।
সামিয়ার পাশেই বসে ছিল রাহিন। সে সামিয়ার মনের অবস্থাটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারল। রাহিন টেবিলের নিচে পরম মমতায় সামিয়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। রাহিনের এই স্পর্শ সামিয়াকে মানসিক শক্তি দিল। সামিয়া রাহিনের দিকে তাকিয়ে ম্লান একটু হাসল, তারপর খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“আজ বড্ড হালকা লাগছে নিজেকে। মনে হচ্ছে খাঁচা থেকে মুক্ত হলাম। পিয়াস ভাইয়ার ওই একতরফা ভালোবাসা আমাকে প্রতিনিয়ত দহন করত। সত্যি… আজ এক বিশাল অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেলাম। ইফতিয়া আপু ওনাকে খুব ভালোবাসবে।”
রাহিন প্রতিউত্তরে শুধু একটু মাথা নাড়ল। তার চোখেও ছিল তৃপ্তির আভাস। সে জানত, সামিয়া পিয়াসকে ভালোবাসত না ঠিকই, কিন্তু ভাই হিসেবে পিয়াসের এই জীবন নষ্ট হওয়াটা তাকে তিলে তিলে শেষ করছিল।
টেবিলের অন্যপ্রান্তে বসে থাকা আইয়ুব আর নিহাল তখন আর চুপ থাকতে পারল না। আইয়ুব পরোটা চিবোতে চিবোতে বলল,
“আরে আরে! পিয়াস ভাইয়ের এই গম্ভীর মুখেও যে রোমান্স লুকিয়ে ছিল, সেটা তো আগে বুঝিনি। আমাদের শেরাজা তো ডন-গিরি ছেড়ে এখন ‘ম্যাচ-মেকার’ হয়ে গেছে, দেখছি!”
সবাই হেসে উঠল। শেরাজ তখন সিমরানকে কোলে নিয়ে খাওয়াচ্ছে। সে আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল,
“সবার খবর আমি রাখি আইয়ুবা। পিয়াস আর ইফতিয়ার বিয়েটা সান-নাতাশার সাথে একই দিনে হবে। ডাবল ধামাকা!”
নাতাশা লজ্জায় সুমুর পেছনে মুখ লুকানোর চেষ্টা করল। আর স্যান্ডি পাশে বসে হাসতে হাসতে প্রায় নাজেহাল। সে পিয়াসের দিকে তাকিয়ে বলল,
“পিয়াস ব্রো, স্বাগতম আমাদের এই ‘বিয়ের খাঁচায়’। একাকীত্বের দিন তো শেষ, এখন থেকে ইফতিয়ার ফরমায়েশ শোনার দিন শুরু।”
বড়দের এই আলোচনার মাঝেই ছোট ছোট প্রাণগুলো তাদের নিজস্ব জগতে মেতে উঠল। সিমরান আর শেরান দেখল সবাই খুব হাসছে, তাই তারাও খুশিতে হাততালি দিতে লাগল। নিশান, রুহি, আহিয়া আর হাসফা মিলে ডাইনিং টেবিলের নিচেই লুকোচুরি খেলা শুরু করে দিল।
সুমু শেরাজের দিকে ঝুঁকে এসে চুপিচুপি বলল,
“খান সাহেব, তাহলে তো সান ভাইয়া-নাতাশা আর পিয়াস ভাইয়া-ইফতিয়ার বিয়ের বাজার আজ থেকেই শুরু করতে হবে।”
শেরাজ টেবিলের ওপর হাত রেখে শান্ত অথচ অকাট্য স্বরে বলল,
“আরও একটা কথা! আমি চাইছিলাম দেরি না করে ওদের বিয়েটা যেন কালকেই সম্পন্ন হয়ে যায়। আর আজ সন্ধ্যায় মেয়েদের যা যা রিচুয়েলস আছে—গায়ে হলুদ, মেহেন্দী, সংগীত—সবই ধুমধাম করে পালন করা হবে। হাতে সময় বড্ড কম, তাই ব্রেকফাস্ট শেষ করেই আমি বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটা সম্পন্ন করতে চাই।”
শেরাজের এই সিদ্ধান্তে পুরো ডাইনিং টেবিলে যেন এক পশলা তড়িৎপ্রবাহ বয়ে গেল। সাখাওয়াত সাহেব বিস্ময়মাখা চোখে তাকিয়ে বললেন,
“কালকেই বিয়ে? এতো দ্রুত সবকিছু সামলানো কি সম্ভব, বাবা? মেহমান দাওয়াত থেকে শুরু করে আয়োজন—সবই তো বাকি।”
শেরাজ তার স্বভাবজাত আত্মবিশ্বাসে মুচকি হেসে বলল,
“বড়আব্বু, আমাদের জন্য কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আমাদের এই বিশাল বাহিনী কেন আছে? আইয়ুব, সারবাজ, রিয়াজ, অমিত, শাহরুখ—ওর সব ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব নেবে। আর আজ দুপুর নাগাদ আত্মীয়স্বজন যারা বাইরে আছে, তাদের খবর পাঠিয়ে দিন। কাল আমরা দুই জোড়া কপোত-কপোতীর নিকাহ্ সম্পন্ন করব, ইনশাআল্লাহ্।”
হাসি বেগম আর রুমা বেগম তো হড়বড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন। খুশি বেগম কপালে হাত দিয়ে বললেন,
“ওরে বাবারে! বিয়ের বাজার, হলুদের ডালা, মেহেন্দী—এসব তো অনেক কাজ। সুমু, সামিয়া, তোরা জলদি রেডি হয়ে নে। সোনার দোকানে আর শপিং মলে আজ আমাদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হবে।”
সুমু শেরাজের দিকে একপলক তাকিয়ে তার অধরের কোণে এক বাঁকা হাসি দেখল। সে বুঝল, তার খান সাহেব আবারও তার পুরোনো ফর্মে ফিরে এসেছে—যে আদেশ দিতে ভালোবাসে আর সেই আদেশ পালনে কার্পণ্য করে না।
নাতাশা আর ইফতিয়া লজ্জায় রাঙা হয়ে একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। পিয়াস একবার শেরাজের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ এক দৃষ্টি বিনিময় করল। সে জানে, শেরাজ চাচ্ছে না এই খুশির মুহূর্তে কোনো দ্বিধা বা বিষাদ বাসা বাঁধুক। দ্রুত বিয়ের আয়োজন করা মানেই হলো নতুন জীবনকে সজোরে আঁকড়ে ধরার সুযোগ দেওয়া।
আইয়ুব ডাইনিং টেবিলের এক পাশ থেকে লাফিয়ে উঠে বলল,
“শুরু হয়ে যাক তবে! এস.কে গাড়ি বের করি? আজ পুরো শপিংমল আমরা চষে বেড়াব। এস.কে, তুই যখন মাঠে নেমেছিস, তখন কালকের আয়োজন হবে রাজকীয়।”
ব্রেকফাস্টের সেই শান্ত টেবিলটা মুহূর্তেই এক রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। মহিলারা শপিং লিস্ট নিয়ে ব্যস্ত, পুরুষরা ডেকোরেশনের প্ল্যান করছে, আর বাচ্চারা বড়দের এই দৌড়াদৌড়ি দেখে পুরো বাড়ি মাথায় তুলছে।
সিমরান এতক্ষণ চুপচাপ শেরাজের কোলে বসে বড়দের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ সে তার ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে শেরাজের গলা জড়িয়ে ধরল। তার ডাগর ডাগর চোখ দুটোয় যেন দুনিয়ার সব কৌতূহল আর বায়না এসে ভর করেছে। সে আধো আধো গলায় আবদারের সুরে বলল,
“পাপা, আমাল নিউ ডেনেস নাগবে। নিউ ছুছ নাগবে। নিউ মেতাপ তিত নাগবে। থব তিনে দিবে।”
শেরাজ মেয়ের নাকে নিজের নাক ঘষে বলল,
“আচ্ছা মাম্মা, তুমি যা যা চাইবে সব দিব। আজ তোমার জন্য পুরো মার্কেট খালি করে ফেলব।”
সুমু পাশ থেকে প্লেট গোছাতে গোছাতে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সে জানে, এই বাপ-মেয়ের জোটে তাকে হার মানতেই হবে। তবুও সে কড়া স্বরে ধমক দেওয়ার ভান করে বলল,
“এতো বায়না করো কেন, মাম্মা? তোমার কি ড্রেসের অভাব? আর সেদিনই তো তোমার দুই নানাভাই তোমাকে নতুন ড্রেস কিনে এনে দিল। ওগুলো তুমি এখনো পরোনি। নতুন ড্রেস কিনতে হবে না। তুমি ওগুলোই পড়বে।”
মায়ের এই অযাচিত শাসন সিমরানের মোটেও পছন্দ হলো না। সে শেরাজের বুকের মধ্যে আরও একটু সেঁধিয়ে গিয়ে কোমরে হাত দেওয়ার ভঙ্গি করল। তারপর সুমুর দিকে তাকিয়ে বেশ তাচ্ছিল্যের সাথে ঠোঁট উল্টে বলল,
“ওগুনো ওন্ড হয়ে গেতে। তুমি বুতবে না, মাম্মা। তোমাল পেশান তেন্ত নেই।”
এইটুকু মেয়ের মুখে ‘ফ্যাশন সেন্স’ নেই শুনে ডাইনিং টেবিলের সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল। মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলেও পরের সেকেন্ডেই হাসির জোয়ার বয়ে গেল। আইয়ুব হাসতে হাসতে প্রায় চেয়ার থেকে পড়েই যাচ্ছিল। সে দম নিয়ে বলল,
“শেরাজা, তোর মেয়ে তো সাক্ষাৎ তোর কার্বন কপি।”
শেরাজ সুমুর দিকে এক বিজয়ী হাসি ছুঁড়ে দিল। সে সুমুকে খানিকটা টিপ্পনী কেটে বলল,
“শুনলে তো? তুমি ফ্যাশন সম্পর্কে কী বুঝো? আমার প্রিন্সেস যখন বলছে ওগুলো ওল্ড হয়ে গেছে, তার মানে ওগুলো বাতিল। তুমি বরং এখন রেডি হও, শপিংয়ে গিয়ে আমার মেয়ের স্টাইল সেন্স দেখে কিছু শিখে নিও।”
সিমরান জয়ের আনন্দে শেরাজের কোল থেকে নেমে ড্যান্স করতে শুরু করল। সুমু হাতের ইশারায় এক কোণায় শান্ত হয়ে বসে থাকা শেরানকে দেখিয়ে বলল,
“দেখুন খান সাহেব, সন্তানকে স্নেহ করা এক জিনিস আর প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তোলা অন্য জিনিস। এতো আদর দিবেন না। কই, এখানে তো বাকি বাচ্চারাও আছে। আমার শেরান আছে, সামিয়ার মেয়ে হাসফা আছে—ওরা তো কখনো এমন অহেতুক বায়না ধরে না। কিন্তু আপনার এই মেয়ে তো দিনকে দিন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।”
সুমু ভেবেছিল তার এই যুক্তিনির্ভর কথায় অন্তত মুরুব্বীরা সায় দেবেন। কিন্তু ফল হলো ঠিক তার উল্টো। সুমুর কথা শেষ হতে না হতেই ড্রয়িংরুমের গুমোট ভাবটা ভেঙে দিয়ে হেসে উঠলেন হাসি বেগম। তিনি সিমরানকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন,
“আরে রাখ তো সুমু! বাচ্চা মানুষ, ওর মনে সখ হয়েছে নতুন ড্রেস পরবে—তাতে দোষের কী? আমাদের নাতনি কি এতোটাই ফেলনা যে মামার বিয়েতে পুরনো কাপড় পরবে? শেরাজ ঠিকই বলেছে, আমার নাতনির যা পছন্দ সব কিনে দিবে।”
রুমা বেগমও সুমুর দিকে তাকিয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন,
“তুই বড় বেশি কড়াকড়ি করিস সুমু। আমাদের নাতনি তো সারা বছর বায়না ধরে না। আজ বাড়িতে উৎসব, খুশির মেলা বসেছে—এখন ও যদি একটু মেকআপ কিট আর নতুন জুতো না চায়, তবে কি এই বুড়ো মানুষগুলো চাইবে? তুই একদম চুপ কর তো!”
সাখাওয়াত সাহেব আর মুস্তাক সিকদারও মুচকি হেসে নাতনির পক্ষ নিলেন। সাখাওয়াত সাহেব শেরানের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“শেরান তো শান্ত ছেলে, ও যখন যা চাইবে আমি নিজের হাতে কিনে দেব। কিন্তু তাই বলে কি সিমরানের আবদার মিটবে না? সুমু মামনি, উৎসবের দিনে হিসেব কষতে নেই। আজ শুধু হাসির দিন, খুশির দিন।”
সিমরান যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে বিজয়ী ভঙ্গিতে নাক কুঁচকে ভেংচি কাটল। তারপর শেরাজের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে এমনভাবে বলল যা সবাই শুনতে পেল,
“পাপা, মাম্মা বড্ড পতা। তুমি মাম্মাতে তিনে দিবে না।”
পুরো ঘর ফেটে পড়ল হাসিতে। শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু নাচিয়ে বিদ্রূপের স্বরে বলল,
“বুঝলেন তো খান সাহেবা? একতরফা শাসন এখানে চলবে না। আমার প্রিন্সেসের দলের সদস্য সংখ্যা কিন্তু আপনার চেয়ে অনেক বেশি। আপনি বরং নিজের ফ্যাশন সেন্স নিয়ে একটু গবেষণা করুন।”
সুমু অসহায় চোখে সবার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানত, এই বাড়িতে শেরাজ আর সিমরানের জোটের কাছে তার হার নিশ্চিত। তবুও এই হারার মাঝেই যে এক ধরণের পরম তৃপ্তি আর পারিবারিক পূর্ণতা লুকিয়ে আছে, তা সুমুর ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা এক চিলতে হাসিই বলে দিচ্ছিল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“বাপের প্রশ্রয়ে মেয়ে তো দেখি আস্ত এক বাঘিনী হয়ে উঠছে।”
শেরাজ রুমে এসে আলমারি খুলে শপিংয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করল। হঠাৎ সুমু ভেতরে ঢুকল। সে কোনো কথা না বলে শেরাজের জন্য একটা শার্ট বের করে দিল। শেরাজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো ঠিক করতে করতে সুমুকে আড়চোখে দেখল। আজ সুমুর মেজাজটা একটু বেশিই চনমনে মনে হচ্ছে। শেরাজ মৃদু হেসে বলল,
“সুইটহার্ট, তোমার লাইফে এই মূহুর্তে বড় কোনো ইচ্ছা আছে? মানে একদম মন থেকে যেটা চাও?”
সুমু ত্যাড়ামি করে উত্তর দিল,
“খুব ইচ্ছা আছে একদিন একটা মাইক নিয়ে পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে সবার গোপন কথা ফাঁস করে দেবো। কার ছেলে কার সাথে পালাল আর মেয়ে কার সাথে প্রেম করল—পুরো এলাকায় একটা তুলকালাম লাগিয়ে দিয়ে আমি শান্তিতে ঘুমাবো।”
দুপুর দুটো বাজার সাথে সাথেই শেখবাড়ির সামনে একে একে গাড়িগুলো এসে থামল। কড়া রোদে শপিং মলে রীতিমতো যুদ্ধের পর সবার চোখেমুখে এখন ক্লান্তির প্রবল ছাপ। ড্রয়িংরুমে ঢুকেই শেরাজ সোফায় গা এলিয়ে দিল। আরবাজ শান্ত ভঙ্গিতে একপাশে বসে নিজের কবজি ডলছে, হয়তো ব্যাগ বইতে বইতে হাতে ঝিনঝিন ধরে গেছে।
সুমু এতক্ষণ কিচেনে ছিল। সে আজ শপিংয়ে যায়নি। আজ তার শ্বশুরবাড়ির সবাই ওমান থেকে প্রথমবার এই বাড়িতে আসছে, তাই সে নিজেই রান্নার ভার নিয়েছে। আফগানি পোলাও আর মটন কোর্মার সুবাসে পুরো বাড়িটা এখন ম ম করছে। সুমু অ্যাপ্রনটা খুলতে খুলতে ড্রয়িংরুমে বেরিয়ে এলো। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলেও চোখে তৃপ্তি।
আইয়ুব আর সারবাজ যখন হাঁপাতে হাঁপাতে ভেতরে ঢুকল, তখন শেরাজ আয়েশ করে পায়ের ওপর পা তুলে বসল। সে আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে বেশ নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“আইয়ুব, আমাদের হাতের শপিং ব্যাগগুলো আপাতত গাড়িতেই থাক। তোরা বরং আলাদা যে বড় গাড়িটা করে ব্যাগগুলো এসেছে, ওগুলো সব ভেতরে নিয়ে আয়।”
শেরাজের হুকুম শুনে আইয়ুবের মেজাজটা মুহূর্তেই সপ্তমে চড়ে গেল। সে কপালে জমা ঘামটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এস.কে, এটা কি স্রেফ অনুরোধ নাকি জিম ইনস্ট্রাক্টরের নির্দেশ? সকাল থেকে তোর ফরমায়েশ খাটতে খাটতে আমার শরীরের কলকব্জা সব ঢিলে হয়ে গেছে। আর এখন তুই বলছিস, ওই ব্যাগগুলো আমি বয়ে আনব?”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল,
“তোর বডি বিল্ডিং কি শুধু জিমেই দেখানোর জন্য? যা, কাজ কর।”
আইয়ুব গজগজ করতে করতে বলল,
“শেরাজার বাচ্চা, তুই স্মৃতি ফিরে পাওয়ার পর থেকে বড্ড বেশি খাটানি শুরু করেছিস। কাল আমার বন্ধুত্বের পদত্যাগপত্র তোর টেবিলে জমা পড়বে, দেখে নিস।”
সুমু হাসতে হাসতে আইয়ুবের মেজাজ খারাপ হওয়া দেখছিল। সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনার এই অভ্যাসটা এখনো গেল না। বেচারাদের ওভাবে না খাটালে কি হতো না?”
শেরাজ পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে বলল,
“সবাই অলস হয়ে গেছে, সুইটহার্ট। বাড়িতে বিয়ে, একটু পরিশ্রম না করলে কি হবে?”
সুমু আর কোনো কথা না বাড়িয়ে কিচেনে চলে গেল। আইয়ুব আর সারবাজ যখন শেষ ব্যাগটা ড্রয়িংরুমে এনে ধপাস করে ফেলল, তখন তাদের চেহারায় যেন দুনিয়ার সমস্ত ক্লান্তি ভর করেছে। আইয়ুবের ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, আর তার পরনের শার্টটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। সুমু কিচেন থেকে বেরিয়ে ব্যাগগুলোর স্তূপ দেখে একদম থমকে দাঁড়াল। ড্রয়িংরুমের বিশাল মেঝেটা যেন এখন কোনো শপিং মলের গুদামঘর। সে বিস্ময়বিস্ফোরিত চোখে ব্যাগগুলোর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“বিয়ের এতো শপিং? পিয়াস ভাইয়া আর সান ভাইয়া কি তবে পুরো মার্কেটটাই বাড়িতে তুলে নিয়ে এসেছে?”
শেরাজ তখন সোফায় আয়েশ করে বসে সিমরানকে নিজের কোলে তুলে নিল। সিমরান তার পাপার কাঁধে মাথা রেখে খুব তৃপ্তির সাথে একগাল হাসল। শেরাজ অত্যন্ত নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
“উঁহু! তুমি ভুল ভাবছ, সুইটহার্ট। এসব কিন্তু বিয়ের শপিং না।”
সুমু কৌতূহল সামলাতে না পেরে কয়েকটা ব্যাগ খুলে দেখতে শুরু করল। যতগুলো চেইন খুলল, ততবারই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। প্রতিটি ব্যাগে একই সাইজের ছোট ছোট ড্রেস আর নানান রকমের জুতো। সুমু একটা একটা করে জামা বের করল আর নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল। সে হতভম্ব হয়ে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এতো বাচ্চাদের ড্রেস? আর এতো জুতো দিয়ে কী হবে খান সাহেব? আপনি কি তবে নতুন কোনো বিজনেস শুরু করার ফন্দি আঁটছেন?”
শেরাজ পকেট থেকে চকলেট বের করে শেরান, নিশান, হাসফা, রুহি আর আহিয়ার হাতে দিয়ে তাদের খুশির তোড়ে ভাসিয়ে দিল। এরপর সে সিমরানের চুলে বিলি কাটতে কাটতে সুমুর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“বিজনেস নয়, সুইটহার্ট। এসব ড্রেস আর জুতো শুধুমাত্র আমার মাম্মার জন্য। আসলে আমার মাম্মার ফ্যাশন সেন্স তো আমার মতোই প্রখর, তাই কোনো কিছু বাদ দিতে পারলাম না। ও যা যা পছন্দ করে ছুঁয়েছে, আমি সব নিয়ে এসেছি। তবে তুমি তো আরও চমৎকার একটা আইডিয়া দিলে! এটা কেন আগে আমার মাথায় আসেনি? আমি তো আমার মেয়ের জন্য একটা লাক্সারি শপ খুলতেই পারি। যেখানে আমার প্রিন্সেস রোজ নতুন নতুন ডিজাইনের ড্রেস চুজ করবে।”
সুমুর মেজাজটা আক্ষরিক অর্থেই সপ্তমে চড়ে গেল। সে বাকরুদ্ধ হয়ে ব্যাগগুলোর দিকে একবার আর বাপের আদরে আহ্লাদে আটখানা হওয়া মেয়ের দিকে একবার তাকাল। এই পরিমাণ অপচয় আর অতি-আদর দেখে তার মস্তিস্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সুমু কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে সোফাতেই ধপাস করে বসে পড়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“এই লোকটাকে মানুষ করা আর পাহাড় সরানো—দুটোই সমান কঠিন। এইটুকু মেয়ের জন্য এই শয়ে শয়ে ড্রেস! আল্লাহ্, আমাকে ধৈর্য দাও!”
সিমরান তার মাম্মামের দশা দেখে পাপার কানে ফিসফিস করে বলল,
“পাপা, মাম্মাতে এততাও ডেনেস দিবে না। মাম্মা বতুনি দেয়।”
সুমুর ধৈর্যের বাঁধ এবার আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে গেল। সে সোফা থেকে তড়িৎবেগে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগগুলোর স্তূপের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“মাঝেমধ্যে আমার সন্দেহ হয় খান সাহেব, আপনার স্মৃতি ফিরেছে নাকি বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছে। একজন মানুষের জন্য এই কয়েকশ ড্রেস কেনা কি কোনো সুস্থ মানুষের কাজ? আপনি কি ওকে মানুষ করছেন নাকি পুতুল সাজাচ্ছেন?”
শেরাজ অত্যন্ত নির্বিকার। সে সিমরানকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে আয়েশ করে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। সুমুর রণচণ্ডী মূর্তি দেখেও তার চোখেমুখে কোনো বিকার নেই, বরং এক ধরণের উদ্ধত প্রশান্তি খেলছে। সে খুব ধীরলয়ে শীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
“দেখো সুমু, তর্কে যাওয়ার আগে একটা কথা মাথায় গেঁথে নাও— সিমরান আমার মেয়ে। ও আমার কলিজার টুকরো। ও আমার কাছে যা খুশি চাইবে, আর আমি তা পূরণ করব। এটা আমার আর আমার মেয়ের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এই মাঝখানে কথা বলার তুমি কে?”
শেরাজের মুখ থেকে এই ‘তুমি কে’ শব্দদুটো বের হতেই আইয়ুবদের শপিং নিয়ে করা আড্ডা আর হাসাহাসি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সুমু যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারল না। সে দাঁতে দাঁত চেপে ধরা গলায় বলল,
“আমি কে? বাহ্! পাঁচ বছর বাদে স্মৃতি ফিরে আসতেই আমি তবে বাইরের লোক হয়ে গেলাম? আমি ওর মাম্মা, খান সাহেব।”
শেরাজ তার তীক্ষ্ণ চাউনি সুমুর দিকে নিবদ্ধ রেখে বলল,
“হ্যাঁ, তুমি ওর মাম্মা, আমি সেটা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমিও ওর পাপা। পাঁচটা বছর আমি ওদের পাশে থাকতে পারিনি, সেই শূন্যতা আমি আমার সাধ্যমতো মেটানোর চেষ্টা করছি। আমার ভালোবাসা প্রকাশের ধরণটা যদি তোমার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হয়, তবে তুমি চোখ বন্ধ করে থাকো। কিন্তু আমার আর সিমরানের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা কোরো না।”
সুমু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে বলল,
“ঠিক আছে! আপনার মেয়ে, আপনার টাকা, আপনার ইচ্ছা, যা খুশি করুন। আমিই বোকা যে আপনাদের ভালো-মন্দের কথা ভাবতে এসেছিলাম। মনে রাখবেন খান সাহেব, অতিরিক্ত আসকারা দিয়ে আপনি শুধু ওর ড্রেসের আলমারি পূর্ণ করছেন না, ওর জেদটাও আকাশচুম্বী করে তুলছেন। এর ফল কিন্তু একদিন ভালো হবে না।”
শেরাজ আর সুমুর এই বাকবিতণ্ডার আওয়াজ তপ্ত রোদের মাঝেও যেন পুরো বাড়িতে সজীবতা ছড়িয়ে দিল। তাদের এই খুনসুটিমাখা ঝগড়া শুনে ওপরতলা থেকে বড়রা আর বাকি সদস্যরা একে একে নিচে নেমে এলো। সবার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি। তারা জানে, এই দম্পতির ঝগড়া মানেই হলো ভালোবাসার এক নতুন বহিঃপ্রকাশ।
সুমু অভিমানী সুরে মুখভার করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেরানের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আমার এই শেরান বেটাই ভালো। ও অন্তত ওর এই খামখেয়ালি বাপের মতো অহেতুক জেদ ধরে না, আর না তো বোনের মতো এতো বায়না করে। একদম শান্ত, সুবোধ ছেলে আমার।”
শেরান তার ডাগর ডাগর চোখ মেলে মায়ের দিকে তাকাল। মায়ের অভিমানী মুখটা দেখে সে খুব কোমল স্বরে, আধো আধো করে বলল,
“মাম্মা, চিচ তো চোটো। ও তো কিচু বুজে না।”
সুমু শেরানকে কাছে টেনে নিয়ে কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“তুমিও তো ছোট বেটা। অথচ দেখো, তোমার কতো বুদ্ধি! আর তোমার এই সিস তো আর পাপার আশকারা পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে।”
সিমরান হঠাৎ সোফা থেকে সগৌরবে উঠে দাঁড়াল। সবার মনোযোগ যখন শেরান আর সুমুর দিকে, তখন সে পাশে আলাদা করে সরিয়ে রাখা ব্যাগগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে এক একটা ব্যাগ টেনে বাড়ির মুরুব্বিদের হাতে তুলে দিতে লাগল। সে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শামীম সাহেব, সাখাওয়াত সাহেব আর মুস্তাক সিকদারদের হাতে দামী দামী পাঞ্জাবি আর আতরের সেট তুলে দিয়ে বেশ গাম্ভীর্যের সাথে বলল,
“এগুনো তোমাদেল… আমাল তনফ থেতে।”
সবাই যেন তাজ্জব বনে গেল। এরপর সে নিশান, হাসফা, রুহি আর আহিয়াকে ডেকে ড্রেস আর নতুন জুতো বের করে দিয়ে বেশ গর্বিত ভঙ্গিতে বলতে লাগল,
“এগুলো আমাল বন্ধুদেল জন্য। তোমলা তিন্তু তানতে এথব পনবে।”
পুরো ড্রয়িংরুমে হাসির রোল পড়ে গেল। যে সিমরানকে নিয়ে এতক্ষণ সুমু অভিযোগের পাহাড় জমাচ্ছিল, সেই মেয়েটাই কি না বাড়ির সবাইকে উপহার দিয়ে চমকে দিল। শেরাজ সোফায় হেলান দিয়ে আয়েশ করে একটা তৃপ্তির হাসি দিল। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় বলল, ‘দেখলেন তো ম্যাডাম? আমার মেয়ে শুধু নিতে জানে না, দিতেও জানে!’
সুমু স্তব্ধ হয়ে নিজের মেয়ের এই বিচক্ষণতা দেখছিল। তার সব রাগ যেন এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। শামীম সাহেব নাতনিকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“আমার নানুভাই সবার কথা ভাবে! এতো ছোট বয়সেই সবার জন্য এতো মায়া ওর মনে।”
বাকিরাও সিমরানের দেওয়া উপহার হাতে নিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসছেন। কিন্তু সিমরানের কর্মযজ্ঞ যে এখানেই শেষ নয়, সেটা বোঝা গেল তার পরবর্তী পদক্ষেপে। সে আবারও শেরাজের কোলে চড়ে বসল। শেরাজের শার্টের কলারটা নিজের ছোট ছোট আঙুলে ঠিক করে দিতে দিতে বেশ আয়েশের সাথে ঘোষণা করল,
“পাপা, এততু পলে আমি এথব ডেনেস পনে ভিডিও ছুট কলব। তুমি হবে আমাল পার্সোনান ত্যামেলাম্যান।”
মেয়ের প্রস্তাব শুনে শেরাজ মেয়ের নাকে নিজের নাক ঘষে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“অবশ্যই মাম্মা! তোমার পার্সোনাল ক্যামেরাম্যান তো রেডি। তুমি শুধু ড্রেস চেঞ্জ করে আসবে, আর আমি সব অ্যাঙ্গেল থেকে তোমার ভিডিও শুট করে দিব।”
সুমু এতক্ষণ ব্যাগ গোছাতে গোছাতে সবটা শুনছিল। এবার সে কোমর সোজা করে দাঁড়িয়ে কপালে জমে থাকা অবাধ্য চুলগুলো কানে গুঁজে দিল। তার চোখেমুখে এখন আর রাগ নেই, বরং একরাশ বিস্ময় আর ক্লান্তি মাখানো বিরক্তি। সে সিমরানের দিকে তাকিয়ে একটু ত্যাড়া গলায় বলল,
“তুমি কি একটুও ক্লান্ত হও না, মাম্মা? সারাটা সকাল রোদের মধ্যে টোটো করে ঘুরে এখন আবার ভিডিও শুটের শখ জেগেছে? এসব ভিডিও-টিডিও কাল হবে, আজ না। এখন সবাই ভীষণ ক্লান্ত। তোমার এই পার্সোনাল ক্যামেরাম্যান পাপা তো ক্লান্ত বটেই, তার ওপর ক্ষিধেয় মানুষের পেট এখন চড়ুই পাখির মতো কিচিরমিচির করছে। এখন কোনো শুট হবে না, আগে গোসল তারপর খাওয়া।”
সিমরান সুমুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে অবজ্ঞার ভঙ্গি করল। তারপর শেরাজের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“পাপা, আমলা ছুট কলবই।”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। তার সেই রহস্যময় চাউনি বলে দিচ্ছিল যে, সুমুর এই নিষেধাজ্ঞা খুব একটা কাজে আসবে না। সে সুমুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“শুনলেন তো ম্যাডাম? শাসন যখন অরণ্যে রোদন হয়ে যায়, তখন মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আমি একটুও ক্লান্ত নই। আমার প্রিন্সেসের হাসিমুখ দেখলে আমার সব ক্লান্তি চলে যায়।”
সুমু এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ড্রয়িংরুমের ব্যাগগুলো একপাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে বিড়বিড় করল,
“যা খুশি করুন।”
দুপুরের ভোজের পর শেখবাড়ির প্রতিটি কোণে আলস্য আর প্রশান্তি ভর করেছিল। সুমুর হাতের আফগানি বিরিয়ানির স্বাদ মুখে নিয়ে মুরুব্বিরা যখন ড্রয়িংরুমের গদিতে গা এলিয়ে একটু জিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা চিরে ফরমান জারি হলো।
সিমরান তার ঘর থেকে বের হয়ে এলো। পরনে এক ফ্রক, চোখেমুখে এক দুর্ধর্ষ সংকল্প। সে হাত নেড়ে সবাইকে জানিয়ে দিল— বিশ্রাম তো দূর কি বাত, এখন শুরু হবে তার বহুল প্রতীক্ষিত ‘ভিডিও সেশন’। শুটের জন্য সে বিভিন্ন রঙের ঠিক একুশটা ড্রেস নির্বাচন করেছে।
শেরাজ তখন সোফায় বসে ক্লান্ত চোখে ড্রয়িংরুমের সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু মেয়ের ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা তো তার নেই। সিমরান ওর কাছে গিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
“পাপা, ওঠো! আমাল বিছটা ডেনেস আর একতা কানো শানি নেডি। তুমি তিন্তু প্রমিত তনেছিনে।”
সুমু একপাশে দাঁড়িয়ে মেকি বিরক্তি নিয়ে বলল,
“এতো ড্রেস? তুমি এসব কি শুরু করেছ, মাম্মা? আজ বাড়ির দশা দেখেছ? চারপাশে কত কাজ চলছে।”
সিমরান চারপাশে তাকাল। বিয়ের ডেকোরেশন চলছে পুরোদমে। বড় ড্রয়িংরুম আর আঙিনা জুড়ে সাদা আর সোনালী কাপড়ের ঝালর লাগানো হচ্ছে। ডেকোরেশনের লোকগুলো গাঁদা আর রজনীগন্ধার স্তূপ নিয়ে ছোটাছুটি করছে। চারদিকে একটা উৎসবমুখর হট্টগোল। কিন্তু সিমরানের কাছে এই ডেকোরেশনটাই যেন তার নতুন ‘সেট’। সে শেরাজকে এক প্রকার টেনে নিয়ে গেল গাঁদা ফুলের স্তূপের সামনে।
শেরাজ, সারবাজকে ক্যামেরা বের করতে বলে অসহায় হাসিমুখে আইয়ুবকে বলল,
“দেখলি তো আইয়ুবা? ডন হওয়ার চেয়ে ভিডিওগ্রাফার হওয়া অনেক বেশি পরিশ্রমের কাজ।”
এদিকে বাড়ির পুরুষদের মধ্যে একটা বড় অংশ এখন অনুপস্থিত। পিয়াস, রিয়াজ আর স্যান্ডি—এই তিনজন রওনা দিয়েছে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। শেরাজের বাবা-মা আর ওমান থেকে আসা বাকি বিশেষ অতিথিদের আনতে।
সারবাজ সবটা সেট করল। সে তার প্রফেশনাল ক্যামেরা আর ট্রাইপড বের করে লাইটিং অ্যাডজাস্ট করতে করতে বেশ গম্ভীর মুখে বলল,
“এস.কে, এখন আমার ডিরেকশন ছাড়া কিন্তু পারফেক্ট শট আসবে না।”
ইনায়া আর ইশিতা পরম মমতায় সিমরানকে প্রথম লুকের জন্য তৈরি করে নিয়ে এলো। সিমরানকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো এক রূপকথার রাজ্য থেকে ডানা কাটা এক ছোট পরী মর্ত্যে নেমে এসেছে। ইনায়া সুমুর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল,
“সুমু, তোমার মেয়ে ড্রেস পরে যে কায়দায় আয়নার সামনে পোজ দিচ্ছিল, তাতে মনে হচ্ছে ফ্যাশন ওয়ার্ল্ডে ওর রাজত্ব কেউ ঠেকাতে পারবে না।”
আইয়ুব আর নিহাল ঘাসের ওপর গোল হয়ে বসেছে বাচ্চাদের নিয়ে। নিশান, রুহি, হাসফা আর আহিয়া—সবাই ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে আছে তাদের বড় সিস-এর এই ‘মডেলিং’ সেশনের দিকে। শেরান বরাবরের মতো শান্ত হয়ে মায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
ডেকোরেশনের মাঝেই সিমরান তার ‘কস্টিউম চেঞ্জ’ আর ‘র্যাম্প ওয়াক’ শুরু করল। সুমু দূর থেকে দেখছিল—শেরাজ ঘামছে, ক্লান্তিতে তার চোখ বুঝে আসছে, তবুও মেয়ের প্রতিটি পোজ সে পরম ধৈর্য নিয়ে ফ্রেমবন্দি করছে। সুমুর মনে হলো, এই মানুষটা বাইরের জগতের কাছে যতই কঠিন বা রুক্ষ হোক না কেন, তার এই ছোট রাজকুমারীর কাছে সে স্রেফ এক অনুগত ভৃত্য।
সুমু নিঃশব্দে রান্নাঘরে গিয়ে সবার জন্য ঠাণ্ডা লেবুর শরবত বানাতে লাগল। বিকেলের রোদটা তখন বেশ মিইয়ে এসেছে, আকাশের নীলিমায় লালিমা আভা মেখে এক স্নিগ্ধ গোধূলির আগমন ঘটছে।
সুমু শরবতের ট্রে নিয়ে আবারও গার্ডেনে এলো, কিন্তু একুশটা ড্রেসের মধ্যে যখন দশ নম্বর ড্রেসের সময় আবারও সিমরানের চুলে হেয়ার ড্রায়ার আর স্প্রে চালানোর তোড়জোড় শুরু হলো, তখন সুমু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তড়িৎবেগে এগিয়ে এসে মাঝপথে বাধা দিয়ে কর্কশ গলায় বলল,
“থামুন আপনারা! আপনাদের সবার কি বুদ্ধি-সুদ্ধি লোপ পেয়েছে? আপনারা সবাই কি পাগল হয়ে গেছেন? এইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে, এক এক সময় এক এক ধরণের লুকে, এক এক হেয়ারস্টাইলে শ্যুটিং করছে—এসব কী হচ্ছে? এভাবে বারবার চুলে হিট দিলে আর টেনে টেনে স্টাইল করলে ওর চুলগুলো তো সব ঝরে শেষ হয়ে যাবে। শাট ইট ডাউন রাইট নাউ!”
পুরো গার্ডেনে যেন এক মুহূর্তের জন্য শ্মশান নীরবতা নেমে এলো। কিন্তু সেই নীরবতা ভাঙল আইয়ুবের অট্টহাসিতে। সে ঘাসের ওপর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ওহ ভাবিজি! আপনি তো দেখি একদম ‘ভিলেন’ হয়ে উঠলেন। আরে, সিমরান আমাদের কুইন, আর কুইনের হেয়ারস্টাইল কি আপনার ওই ঘরোয়া খোপার মতো হবে নাকি?”
নাজমিন পাশ থেকে ফোড়ন কাটল,
“ঠিকই তো! সুমুপু তুমিও না একদম সেকেলে। ওর চুল যদি একটু আধটু পরে তো আমার সালোঁ থেকে ট্রিটমেন্ট করিয়ে দেব, এখন বাধা দিও না তো।”
ইশিতা হেসে বলল,
“সুমু, তুমি কি ওর গ্ল্যামার দেখে হিংসে করছ? ছোট বাচ্চা বলে কি ওর স্টাইল থাকবে না?”
সবচেয়ে অবাক করা কাণ্ড ঘটল যখন বাচ্চারাও বিদ্রোহ শুরু করল। হাসফা কোমরে হাত দিয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আন্নি, তুমি বড্ড পতা! সিমনান তো পলি হয়েছে।”
নিশান যেন আরও এক কাঠি সরেশ, সে সুমুর দিকে একটা খেলনা পিস্তল তাক করে বলল,
“ডিসুম ডিসুম! পচা আন্নিকে জেলেও ভলে দাও, আন্নি আমাদেল শ্যুটিং নষ্ট তলচে।”
শেরাজ এতক্ষণ সবটা দেখে মুচকি হাসছিল। সে সুমুর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“শুনলেন তো ম্যাডাম? এ বাড়িতে আপনার রাজত্ব এখন বিপন্ন। মাইনরিটি হয়েও আপনি মেজরিটি শাসন করতে চাচ্ছেন? সিমরানের চুল নিয়ে আপনি ভাববেন না, ওর পাপা যখন সাথে আছে, তখন ওর কিছু হবেনা।”
সুমু আকাশ থেকে পড়ল। সে অসহায়ভাবে সবার মুখের দিকে তাকাল। নিজের স্বামী, বন্ধু, এমনকি ছোট ছোট বাচ্চারাও আজ তার বিরুদ্ধে একজোট! সে গম্ভীরমুখে বলল,
“ঠিক আছে! যা খুশি করুন আপনারা। কাল যখন দেখবেন মেয়ের মাথায় টাক পড়েছে, তখন আমাকে বলতে আসবেন না।”
সুমু গজগজ করতে করতে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। তার যাওয়ার পথে পেছন থেকে সিমরানের সেই আধো আধো গলা ভেসে এলো,
“পাপা, মাম্মা দেনাচ?”
গার্ডেনজুড়ে আবার হাসির রোল পড়ল। সারবাজ হাক ছাড়ল,
“লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন! লুক নাম্বার ইলেভেন রেডি!”
ভিডিওর শেষ শটটি তখন ক্যামেরাবন্দি হলো। শুট শেষে শেরাজ হাঁটুগেড়ে বসে দু’হাত প্রসারিত করল। সিমরান তার একুশ নম্বর রাজকীয় পোশাকটা হাতে সামান্য উঁচিয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। সে দৌড়ে এসে শেরাজের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। শেরাজ ওকে কোলে তুলে গেয়ে উঠল,
“আশিয়ানা মেরা, সাথ তেরে হ্যায় না
ঢুঁন্ড…তে তেরি গলি মুঝকো ঘর মিলা…
আবোদানা মেরা হাথ তেরে হ্যায় না
ঢুঁন্ড…তে তেরা খুদা মুঝকো রব মিলা।
তু জো মিলা তো হো গয়া ম্যায় কাবিল
তু জো মিলা তো হো গয়া সব হাসিল হাঁ…
মুশকিল সহি আসাঁ হুই মঞ্জিল
কিউকি তু ধাড়কান ম্যায় দিল।”
বাবা-মেয়ের এই আলিঙ্গনেই যেন পৃথিবীর সমস্ত পাওয়া আর না-পাওয়ার হিসেব মিলে গেল। দূর থেকে দেখল এই পূর্ণতা। হঠাৎ বাড়ির সদর দরজার সামনে চাকার ঘর্ষণে ধুলো উড়িয়ে দুটো কালো রঙের ল্যান্ড ক্রুজার এসে থামল। মুহূর্তের জন্য সবার কোলাহল থেমে গেল। সবার উৎসুক দৃষ্টি এখন ফটকের দিকে। গাড়ি থেকে একে একে নামল স্যান্ডি, রিয়াজ আর পিয়াস—যাদের কাঁধে ছিল মেহমানদের এয়ারপোর্ট থেকে আনার গুরুভার।
কিন্তু গাড়ির পেছনের দরজাগুলো খুলতেই যেন সময় স্তব্ধ হয়ে গেল। ধীরপায়ে গাড়ি থেকে নামলেন অনন্যা খাতুন ও সাহাবাজ খান, তাদের পেছনে আফিয়া খাতুন ও শেহেজাদ খান এবং শেরাজের অতি প্রিয় মামা-মামনি আদনান চৌধুরী ও রুহি খাতুন।
শেরাজ এতক্ষণ সিমরানকে নিয়ে মেতে ছিল, কিন্তু তাদের দেখামাত্র তার শরীরের প্রতিটি পেশি যেন জমে বরফ হয়ে গেল। হাতের ক্যামেরাটা অজান্তেই কিছুটা ঝুলে পড়ল। দীর্ঘ পাঁচটি বছর—তিল তিল করে জমা হওয়া এক হাজার আটশ পঁচিশটি দিন আর রাতের দীর্ঘশ্বাস আজ এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। পাঁচ বছর আগে যে ছেলেটিকে সবাই মৃত জানত, যাকে ফিরে পাওয়ার আশা ছিল না, সেই শেরাজ আজ সশরীরে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে।
অনন্যা খাতুন গাড়ি থেকে নেমেই পাথরের মতো স্থাণু হয়ে গেলেন। তার ব্যাগটা হাত থেকে খসে ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়ল, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। ঝাপসা চোখে তিনি দেখছেন তার নয়নের মণিকে। সাহাবাজ খান, যিনি সব সময় পাহাড়ের মতো অটল থাকেন, তার চিবুকটাও আজ কান্নায় কেঁপে উঠল। অনন্যা খাতুন অস্ফুট স্বরে বললেন,
“শেরাজ… আমার বাচ্চা!”
শেরাজ ধীরপায়ে এগিয়ে এলো। তার হাঁটার ভঙ্গি আজ কিছুটা মন্থর, যেন প্রতিটি কদম দিয়ে সে তার মা-বাবার কাছে করা দীর্ঘ ঋণের প্রায়শ্চিত্ত করছে। সে একদম সামনে এসে দাঁড়াতেই অনন্যা খাতুন কাঁপাকাঁপা হাত বাড়িয়ে ছেলের গালে স্পর্শ করলেন। চর্মচক্ষু দিয়ে দেখা এই দৃশ্যটি কি বাস্তব, নাকি ওমানের মরুভূমির কোনো মরীচিকা—তা পরখ করে দেখতে চাইলেন তিনি।
পিছন থেকে আফিয়া খাতুন আর রুহি খাতুনও চোখ মুছতে লাগলেন। আইয়ুব, নিহাল আর রাহিনরাও একপাশে সরে দাঁড়িয়ে এই পুনর্মিলন দেখছে। সুমু দূরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে—সেই জানে, এই মিলনটুকু দেখার জন্য সে কতটা লড়াই করেছে।
শেরাজ তার মা ও বাবাকে সালাম করল। সাহাবাজ খান পরম মমতায় ছেলের কাঁধে হাত রেখে তাকে টেনে নিলেন নিজের আলিঙ্গনে। অনন্যা খাতুনও ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন। শেরাজ তার মায়ের দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখের ওপর চেপে ধরল। অনন্যা খাতুন ভাঙা গলায় বললেন,
“আমার বেটা, আমার কলিজার টুকরো!”
শেহেজান খান শেরাজের কাঁধে হাত রাখলেন। প্রত্যেকে একে একে শেরাজকে বুকে টেনে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে রিয়াজ গাড়ি থেকে সুমুর অতি আদরের বিড়াল কিটিকে বের করে আনলো। ওমান থেকে এই দীর্ঘ ভ্রমণে কিটি একটু গুটিসুটি মেরে থাকলেও, সুমুর গলার আওয়াজ আর পরিচিত ঘ্রাণ পেতেই সে খাঁচার ভেতরে ছটফট শুরু করল। সুমু দৌড়ে গিয়ে কিটিকে কোলে তুলে নিল। কিটি তার নরম লোম দিয়ে সুমুর চিবুক ঘষতে শুরু করল, যেন সেও তার প্রিয় সঙ্গিনীকে ফিরে পাওয়ার অভিযোগ জানাচ্ছে।
সিমরান, শেরান আর রুহি—এই তিন ক্ষুদে সদস্য কিটিকে দেখামাত্রই সবকিছু ভুলে এক দৌড়ে সুমুর সামনে এসে জড়ো হলো। কিটির দুধ-সাদা লোম আর নীল চোখ দেখে তারা হেসে উঠল। সিমরান খুশি হয়ে হাততালি দিয়ে বলল,
“পাপা দেথো! আমাল তিতি এথে গেতে। আমাল তিতি তততো তিউত।!”
রুহিও কিটির নরম লেজে হাত বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
“আমলা তোমাতে অনেত মিত তনেচি, তিতি।”
শান্ত শেরান কিটির সামনে ঝুঁকে বসে তার ছোট আঙুল দিয়ে বিড়ালের নাকে আলতো করে ছুঁয়ে দিল। কিটি খুব আয়েশ করে একটা ‘মিঁউ’ শব্দ করতেই বাচ্চাদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল। সুমু কিটিকে ঘাসের ওপর ছেড়ে দিতেই সে লেজ ফুলিয়ে সিমরানের চারপাশে ঘুরতে লাগল।
সিমরান ওর নতুন ড্রেসের একটা ওড়না মাটিতে বিছিয়ে দিয়ে কিটিকে ডাকল,
“তিতি, তুমি আমাল তাথে ভিডিও ছুট তলবে।”
এই দৃশ্য দেখে অনন্যা খাতুন আর রুহি খাতুনদের চোখের জল হাসিতে রূপ নিল। সুমু কিটিকে বাচ্চাদের সাথে মেতে থাকতে দেখে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ তখনো মায়ের হাত ধরে আছে।
ওমান থেকে আসা মেহমানদের বরণ করে নিতে হাসি বেগম আর শামীম সাহেবের সাথে বাড়ির বাকি সকল সদস্যরা এগিয়ে গেলেন। সাখাওয়াত সাহেব ধীরপায়ে সাহাবাজ খানের সামনে এসে দাঁড়ালেন। দুই পরিবারের প্রধান পুরুষ একে অপরের হাত ধরলেন। পাশ থেকে শামীম সাহেব প্রশান্ত হাসিতে বললেন,
“ভাইজান, আপনার ছেলের এই শ্বশুরবাড়িতে আপনাদের পদধূলি আজ আমাদের ধন্য করল। আমরা সবসময় শুধু আপনাদের কথা শুনেছি, আজ আপনাদের সামনে পেয়ে মনে হচ্ছে আমাদের পরিবারটা এক বিশাল বটগাছের মতো পূর্ণতা পেল।”
হাসি বেগমও পিছিয়ে রইলেন না। তিনি অনন্যা খাতুনের দুই হাত পরম যত্নে চেপে ধরে বললেন,
“বোন আমার, কত চোখের অশ্রু আর দোয়ার ফসল যে আজ আমাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে, তা কেবল আল্লাহ জানেন। আমাদের সুমুকে আপনারা যেভাবে আগলে রেখেছিলেন, সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার নেই। আজ থেকে এই বাড়ি আপনাদেরও বাড়ি। আপনাদের কিন্তু এতো সহজে ছাড়ব না।”
অনন্যা খাতুন আবেগে আপ্লুত হয়ে হাসি বেগমকে জড়িয়ে ধরলেন। দুই মায়ের নীরব চোখের জল যেন একে অপরের না বলা দুঃখগুলোকে এক নিমেষে ধুয়ে দিল।
ঠিক সেই সময় লাঠি হাতে ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন বাড়ির সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মাজেরা বেগম। তার বয়সের ভারে ন্যুব্জ পিঠ আর বলিরেখা পড়া মুখে এক পবিত্র হাসি। তাকে দেখে সাহাবাজ খান ও অনন্যা খাতুন বিনম্র শ্রদ্ধায় সালাম জানালেন। মাজেরা বেগম কাঁপাকাঁপা হাতে সাহাবাজ খানের মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন,
“বেঁচে থাকো, বাবা। যে রত্ন তোমরা এই ঘরে দিয়েছ, তার আলোয় আমাদের অন্ধকার ঘুচেছে। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সবাইকে নিয়ে আমাদের পরিবারকে এমন ঐক্যেই রাখুক। সবাই ভালো থাকো।”
রুমা বেগম আর সাখাওয়াত সাহেবও হাস্যোজ্জ্বল মুখে অভ্যর্থনায় যোগ দিলেন। সাখাওয়াত সাহেব বেশ দরাজ গলায় আদনান চৌধুরী আর শেহেজাদ খানদের উদ্দেশ্যে বললেন,
“ভাইসব, সফরের ক্লান্তি সব ভুলে যান। আজ শেখবাড়িতে কোনো মেহমানদারি নেই, আজ শুধু আপনজনের মিলনমেলা। সুমু আজ নিজের হাতে আপনাদের জন্য সব আয়োজন করেছে, আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।”
মুস্তাক সিকদার আর সুমি বেগমও অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আফিয়া খাতুন আর রুহি খাতুনদের ভেতরে আসার অনুরোধ জানালেন। সুমি বেগম খুব আদুরে স্বরে বললেন,
“আসুন আপা, ভেতরে চলুন। আজ পিয়াস আর স্যান্ডির খুশিতে আপনাদের আসাটা সোনায় সোহাগা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
সবাই একে একে বাড়ির ভেতরে গেলেন। সাহাবাজ খান আর শেহেজাদ খান নাতি-নাতিনদের নিয়ে সকলের সাথে ভেতরে চলে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে শেরাজ আর সুমু একসাথে এসে অনন্যা খাতুনের সামনে দাঁড়াল। শেরাজ তার মায়ের কাঁধে হাত রেখে খুব শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“মম, মৌ মামনিরা কোথায়? আজও কি আমার ওপর ঘৃণা জমিয়ে রেখেছেন? যদিও আমি চাইও না তারা আমাকে মাফ করুক। এমনকি তোমরা আমাকে মাফ করো, সেটাও আমি চাইনা।”
শেরাজের প্রশ্নে অনন্যা খাতুনের চোখেমুখে প্রশান্তির আভা ফুটে উঠল। তিনি শেরাজের হাতটা নিজের হাতের ওপর রেখে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসলেন। তারপর বললেন,
“ওরা এখন কোরিয়াতে স্থায়ী হয়েছে। আর বেটা, মায়েরা কখনও সন্তানদের ওপর রেগে থাকতে পারে না। তুই ওসব অতীত ভুলে যা।”
শেরাজ মাথা নেড়ে বলল,
“কোরিয়াতে? হঠাৎ করে?”
অনন্যা খাতুন মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ বেটা! রোজার বিয়ে হয়ে গেছে সেখানে। পাত্র বেশ প্রভাবশালী, কোরিয়ার এক স্বনামধন্য ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে। শুনেছিলাম, রোজা বিয়ে করতে রাজি ছিল না, কিন্তু পরিবারের কথা ভেবে পরবর্তীতে রাজি হয়।”
শেরাজ খানিকটা বিস্মিত হলেও খুশি হলো। সে জানত রোজার জীবনের গতিপথটা একসময় অনিশ্চিত ছিল, কিন্তু আজ সে সুদূর প্রবাসে সুখী—এই খবরটা তার মনকে হালকা করে দিল। সে ম্লান হেসে বলল,
“ভালোই হলো, মম। যে যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক।”
শেরাজ ক্লান্তিতে সোফাতেই একটু গড়িয়ে নিল। গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে তার বেশি সময় লাগল না। কিন্তু সুমুর মাথায় তখন দুষ্টুমি বুদ্ধি ঘুরপাক খাচ্ছে। সে পা টিপে টিপে নিজের মেকআপ বক্সটা নিয়ে এলো।
শেরাজ ঘুমন্ত অবস্থায় যেন এক শান্ত আগ্নেয়গিরি। সুমু খুব সাবধানে শেরাজের মুখে মেকআপ করতে শুরু করল। শেরাজের চোখের পাতায় আইশ্যাডো ব্রাশটা ছোঁয়াতেই সে একটু নড়ে উঠল। সুমুর বুকটা ঢিপ করে উঠল, কিন্তু শেরাজ চোখ খুলল না। সুমু এবার মুচকি হেসে যেই ওর ঠোঁটের কোণে হালকা একটু লিপস্টিক ছোঁয়াতে যাবে, ঠিক তখনই একটা শক্ত হাত খপ করে সুমুর কবজি চেপে ধরল।
শেরাজ চোখ না খুলেই গম্ভীর গলায় বলল,
“বড্ড সাহস বেড়ে গেছে তোমার, তাই না? আমাকে নিয়ে পুতুল খেলা করছ?”
শেরাজ চোখ মেলল। তার শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ চাহনি সুমুকে একটু দমানোর চেষ্টা করলেও সুমু দমল না। সে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
“আহ্ ছাড়ুন তো! একটু সাজাতে দিন। আপনাকে যা সুন্দর লাগছে না। একদম প্রিন্সেস ডায়না।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে সুমুকে নিজের দিকে হ্যাঁচকা টানে আরও কাছে নিয়ে এলো। তার চোখমুখে সেই চেনা ডার্ক মেজাজ ফিরে এসেছে,
“একেবারেই না। আমার এই রুক্ষ চেহারাটাই তোমার পছন্দ ছিল, তাহলে এখন জোকার বানাতে চাইছ কেন?”
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার আড়াল থেকে ছোট ছোট পায়ে সিমরান ঘরে ঢুকল। তার হাতেও লিপস্টিক। সে দৌড়ে এসে সুমুর পাশে বসে পড়ল। সুমুকে সাহায্য করার জন্য সে আধো আধো গলায় বলল,
“মাম্মা, আমি হেন্প তরি? পাপাতে এতদম পিনচেস বানিয়ে দেব।”
মেয়ের কথা শুনে শেরাজের সব রাগ মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। সে আর বাধা দিতে পারল না। মা আর মেয়ে মিলে শেরাজকে সাজিয়ে দিল। শেরাজ শুধু অসহায়ভাবে তাকিয়ে রইল।
সাজানো শেষ হতেই সুমু চট করে ফোন বের করে শেরাজের কিছু কিউট ছবি তুলে নিল। শেরাজ মুখ গম্ভীর করে থাকলেও ক্যামেরায় তাকে অদ্ভুত সুন্দর আর মিষ্টি দেখাচ্ছিল।
সবশেষে সিমরান শেরাজের আপাদমস্তক নিখুঁতভাবে দেখে গম্ভীর মুখে বলল,
“মাম্মা, পাপান তাজ তো পুনো তমপিনিট হয়নি। পাপাতে শানি পনাও।”
মেয়ের কথা শুনে সুমু হাসিতে ফেটে পড়ল। শেরাজ এবার কপালে হাত দিয়ে নিজের কপাল চাপড়ে বলল,
“এসব দেখার আগে আমার কেন আবার ঘুম এলো না। এখন কি শাড়িও পরতে হবে?”
সুমু হাসতে হাসতে শেরাজের গাল টিপে দিয়ে বলল,
“কেন নয়? আমার ডার্ক রোমান্স বয় আজ একটু ডার্ক কুইন হয়ে যাক।”
শেরাজ এক মুহূর্তও আর দ্বিধা করল না। নিজের সেই গম্ভীর ভাবমূর্তি একপাশে সরিয়ে রেখে শেরাজ মেয়ের গাল দুটো টিপে দিয়ে হেসে ফেলল। সে সুমুর কথা পাত্তা না দিয়ে সিমরানের দিকে তাকিয়ে খুব কোমল স্বরে বলল,
“ঠিক আছে মাম্মা, তুমি যখন বলেছ, তখন তোমার পাপা শাড়ি পরবে। আমার প্রিন্সেসের কথা কি আমি ফেলতে পারি?”
শেরাজের মুখে এই সম্মতি শুনে সিমরান আনন্দে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল। কিন্তু বাজ পড়ল সুমুর মাথায়। সে হাতে থাকা মেকআপ ব্রাশটা ধপ করে টেবিলের ওপর রেখে রাগে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে অগ্নিদৃষ্টিতে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাহ! খুব তো মেয়ের জন্য সোহাগ উথলে পড়ছে? মেয়ের কথা এক তুড়িতেই কবুল হয়ে গেল? মেয়ে একবার আবদার করতেই আপনিও গদগদ হয়ে রাজি হয়ে গেলেন? আর আমি যখন আপনাকে একটু মেকআপ দিয়ে সাজাতে গেলাম, তখন তো আমাকে প্রায় মেরেই ফেলছিলেন। হাত চেপে ধরেছেন, রাগ দেখিয়েছেন, বড় বড় চোখ করে তাকিয়েছেন… কেন, আমি কি আপনার কেউ না? আমার বেলায় যত নিয়ম আর মেয়ের বেলায় সব মাফ?”
শেরাজ বুঝতে পারছে পরিস্থিতি এখন আউট অফ কন্ট্রোল। সে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করে বলল,
“আচ্ছা বাবা, শান্ত হও! এই দেখো, আমি পরব না শাড়ি। ঠিক আছে? খুশি তো এবার?”
শেরাজের এই কথা শুনে সিমরানের মাথায় একটা ছোটখাটো বোমা ফাটল। সিমরান এতক্ষণ বড় আশা করে ছিল তার পাপাকে শাড়ি পরাবে। পাপার ‘না’ শুনে তার ছোট্ট ঠোঁট দুটো ফুলে উঠল। সে রাগে গাল ফুলিয়ে শেরাজের কোল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে তার ছোট্ট হাতের আঙুল উঁচিয়ে আধো আধো কিন্তু কড়া সুরে বলল,
“তু…তুমি থানি পনবে না? যাও… তোমাল থাতে আনি! আমি তোমাল থাতে ততা বনব না।”
বলেই সিমরান গটগট করে হেঁটে বিছানার এক কোণে গিয়ে একদম উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল। ওদিকে সুমুও কম যায় না। সে-ও বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে আলমারি গোছানোর নাম করে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
শেরাজ এখন মাঝসমুদ্রে পড়ে যাওয়া এক নাবিক। সে একবার বউয়ের দিকে তাকাচ্ছে, তো একবার মেয়ের দিকে। সে অসহায় গলায় বলল,
“এ তো মহাবিপদ! একদিকে সমুদ্র তো অন্যদিকে পাহাড়। একজন বলছে পরো, অন্যজন বলছে পরলে খবর আছে। আমি এখন যাই কোথায়?”
ঘরের পরিবেশটা গুমোট হয়ে রইল। মা-মেয়ে কেউ কারোর দিকে তাকাচ্ছে না, মাঝখানে পড়ে শেরাজের অবস্থা এখন খড়কুটোর মতো। সে প্রথমে সিমরানের পাশে গিয়ে বসল। খুব মোলায়েম সুরে বলল,
“মাম্মা, রাগ করে না। এই দেখো পাপা কান ধরছে। শাড়ি পরলে তো আমায় পচা দেখাবে, তখন কি তুমি পাপাকে ভালোবাসবে?”
সিমরান জবাব দিল না। সে হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরে আরও জোরে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। শেরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুমুর দিকে এগোল। সুমু আলমারির কাপড় গোছানোর ভান করে অকারণেই খুব ব্যস্ততা দেখাচ্ছে। শেরাজ পেছন থেকে সুমুর কাঁধে হাত রাখতেই সে ঝাড়া দিয়ে হাতটা সরিয়ে দিল। কোনো কথা না বলে সে অন্য ড্রয়ার খুলতে শুরু করল।
শেরাজ এবার সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“বুঝলাম মেয়েটা ছোট, কিন্তু তুমিও কি ওর সাথে পাল্লা দিয়ে বাচ্চাদের মতো করছ, সুইটহার্ট? তাকাও আমার দিকে।”
সুমু যেন পাথরের মূর্তি। সে শেরাজের অস্তিত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করে পাশের ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। শেরাজ দ্রুত গিয়ে ওর পথ আটকে দাঁড়াল। কিন্তু সুমু একদম নির্বিকার। সে নিচ দিয়ে মাথা নিচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গিয়েও আবার দাঁড়িয়ে পড়ল।
শেরাজ ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুহাত কোমরে রাখল। তার সেই ধারালো মেজাজ এখন এক গভীর হতাশায় রূপ নিয়েছে। সে মেকআপ মাখা মুখে আর অবিন্যস্ত চুলে নিজের কপাল চাপড়ে বিড়বিড় করে বলল,
“উফ! কি এক আজব বিপদ। শাড়ি পরলেও বিপদ, না পরলেও মরণ। দুজনেই সমান জেদি।”
সে আবার সিমরানের কাছে গিয়ে ওর গালটা একটু ছুঁতে চাইল, কিন্তু সিমরান পা ছুঁড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“নাআআ! তোমাল থাতে তথা বনব না, পাপা।”
শেরাজ আবারও সুমুর কাছে গেল। সিমরান আরও মুখ ফুলিয়ে রাখল। তার ওইটুকু মুখে রাজ্যের গম্ভীরতা। সে তার বড় বড় চোখের পলক ফেলে একবার পাপার মেকআপ করা মাখা মুখটা দেখল, আর একবার অভিমানী মাম্মাকে দেখে তার ছোট্ট হাতটা বুকের ওপর আড়াআড়ি করে রেখে একদম রাগী গলায় বলল,
“পাপা, মাম্মার নাগ তোমাল তাছে বনো?”
কথাটা শুনে শেরাজ যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে বড় বড় চোখ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। সুমুও ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে রইল। সিমরান আবারও বলতে শুরু করল,
“আমি বনেতি শানি পনতে, তুমি বননে, ‘নো’। মাম্মা এততু নাগ তননো, আর তুমি অমনি মাম্মান পেতনে পেতনে দুনছ? মাম্মার নাগ তোমাল তাছে বনো, আমার তথা তুমি থুনো না।”
শেরাজ এবার অট্টহাসি হাসতে গিয়েও থেমে গেল। পরিস্থিতি যে এতটা জটিল হবে সে ভাবেনি। সে বুঝতে পারল, পাঁচ বছরের মেয়েটা এখন ঈর্ষায় জ্বলছে। তার কাছে মনে হচ্ছে পাপা তাকে গুরুত্ব না দিয়ে মাম্মাকে বেশি তোয়াজ করছে।
শেরাজ দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। সে মুখটা করুণ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওরে মাম্মা রে! এ তো দেখি বড় বিপদে পড়লাম। মাম্মা, তোমার রাগও বড়, তোমার মাম্মার রাগও বড়। আমি একলা মানুষ কার রাগ আগে ভাঙাবো?”
সিমরান এবার বিছানা থেকে নেমে পাপার সামনে এসে দাঁড়াল। শেরাজের অবস্থা এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। সে একবার মেয়ের দিকে তাকাচ্ছে, তো একবার বউয়ের দিকে। ভাবল বোধহয় পরিস্থিতি একটু নরম হয়েছে, কিন্তু তার সেই আশায় গুড়েবালি। সিমরান তার সামনে থেকে সরে গিয়ে সুমুর হাত শক্ত করে ধরল। সুমুও মেয়ের হাত শক্ত করে ধরল। সিমরান তার ছোট্ট মাথাটা উঁচিয়ে শেরাজের দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। সে তার মাম্মার হাত ধরে টান দিয়ে বলল,
“মাম্মা চনো! পাপা থুব পুচা হয়ে গেতে। আমনা অন্য নুমে দিয়ে দুমাব, পাপান তাথে তেউ খেনবো না।”
সুমু একবারও শেরাজের চোখের দিকে তাকাল না। সে গম্ভীর গলায় বলল,
“একদম ঠিক বলেছ, মাম্মা। যার কাছে আমাদের কথার কোনো দাম নেই, তার রুমে থেকে লাভ কী? চলো আমরা পাশের রুমে যাই।”
খান সাহেব পর্ব ৯০
শেরাজ অবাক হয়ে দেখল, তার চোখের সামনে দিয়ে তার বউ আর তার ছোট্ট রাজকন্যা হাত ধরাধরি করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় সিমরান দরজার কাছে গিয়ে একবার থামল। তারপর জিভ বের করে একটা ভেংচি কেটে বলল,
“পাপা তুমি পুচা! এতা এতা থাতো এবান।”
