Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৯৩

খান সাহেব পর্ব ৯৩

খান সাহেব পর্ব ৯৩
সুমাইয়া জাহান

​মিনিট পনেরোর মধ্যেই শেরাজ শেখবাড়িতে পৌঁছাল। গাড়ি থেকে নেমে সে সোজা ভেতরে ঢুকল। বাগান পেরিয়ে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখল সিমরান আর শেরান মনমরা হয়ে এক কোণে বসে আছে। তাদের প্রিয় খেলনাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মেঝেতে, কিন্তু সেদিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ইনায়া আর নাতাশা দুজনেই দুজনের জন‍্যই খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তারা খাবে না বলছে। শেরাজকে দেখেই সিমরান আর শেরান একসাথেই চিৎকার করে উঠল, “পাপা!”

দুজন দৌড়ে এসে শেরাজের পা জড়িয়ে ধরল। শেরাজ হাঁটু গেড়ে বসে দুই সন্তানকে দুই বাহুতে জড়িয়ে নিল। তাদের কপালে, গালে চুমু খেল। শেরান ভাঙা গলায় বলল,
“পাপা, মাম্মা তোথায়? মাম্মা তি এতনো দুমাচ্ছে?”
​সিমরান বড় বড় চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“পাপা, তোমাল হাতে নক্ত তেনো? তুমি তি ব‍্যতা পেয়েত?”
​শেরাজ চমকে উঠল। সে দ্রুত ব্যান্ডেজ করা হাতটা আড়াল করে বাচ্চাদের হাসানোর চেষ্টা করল। সে খুব নরম গলায় বলল,
“কিছু না মাম্মা, ছোট একটা চোট লেগেছে। তোমাদের মাম্মা… সে অনেক লম্বা একটা ঘুম দিচ্ছে। ওর ঘুম ভেঙে গেলেই আমি ওকে তোমাদের কাছে নিয়ে আসব, প্রমিজ।”
​শেরাজ বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে ধরে এক অদ্ভুত শক্তি পাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল, সুমু কেন পাঁচ বছর সব সহ্য করেছিল। কেবল এই দুটো নিষ্পাপ মুখের হাসির জন্য। শেরাজ, ইনায়া আর সারবাজের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় ধন্যবাদ জানালো। ইশিতা এগিয়ে এসে বলল,
“সিমরান আর শেরান, আপনাদের ছাড়া খেতে চাইছেনা, ভাইয়া।”
​ইশিতার কথা শুনে শেরাজের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে দুই সন্তানের দিকে তাকাল—অবুঝ দুটি মুখ, যাদের চোখের কোণে এখনো কান্নার শুকিয়ে যাওয়া দাগ। যে সন্তানদের জন্য সুমু নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে, তারা আজ ক্ষুধার্ত মুখে পাপা আর মাম্মার জন্য অপেক্ষা করছে। ফিরোজা আলতো হেসে বলল,
“সিমরান একদম আমার মতো হয়েছে, লাভ। ও কিছুতেই তোমাকে ছাড়া খেতে চায়না।”

শেরাজ সিমরান আর শেরানের পিঠ চাপড়ে দিয়ে হাসল। সে ইনায়ার হাত থেকে খাবারের প্লেটটা নিজের হাতে নিল। তারপর পরম আদরে বাচ্চাদের সোফায় বসিয়ে নিজে তাদের সামনে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে খুব কোমল গলায় বলল,
“পাপার চ‍্যাম্পস! তোমরা যদি না খাও, তবে মাম্মার ঘুম কিন্তু ভাঙবে না। তোমাদের মাম্মা বলেছে, সিমরান আর শেরান যখন সবটুকু খাবার শেষ করবে, তখনই মাম্মা চোখ মেলবে। তোমরা কি চাও না মাম্মা জলদি তোমাদের কাছে আসুক?”
​শেরাজের কথা শুনে সিমরান আর শেরান একে অপরের দিকে তাকাল। ছোট শেরান তার আধো আধো গলায় বলল,
“তাহনে পাপা তুমি থাইয়ে দাও। পাপা থাইয়ে দিনে, আমলা থবতা থাবো।”

শেরাজ স্মিত হাসল। সে নিজের ব্যন্ডেজ করা হাতের কষ্টটুকু আড়াল করে অন্য হাতে খুব যত্ন করে লোকমা তুলে দিল তাদের মুখে। বাচ্চাদের খাওয়ানোর সময় শেরাজের বারবার মনে পড়ছিল বাংলোর সেই নিস্তব্ধ ঘরের কথা, যেখানে সুমু এখনো জ্বরের ঘোরে কাতরাচ্ছে। সে অনুভব করল, তার এক হাত আজ এই সন্তানদের ভবিষ্যৎ আগলাচ্ছে, আর অন্য হাতটা যেন অদৃশ্যে সুমুর হাত ধরে আছে।
​খাওয়া শেষ হতেই শেরাজ বাচ্চাদের কপালে লম্বা একটা চুমু খেল। বেশি সময় সে থাকতে পারল না। সুমুকে একা রেখে আসার ভয় তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। সে সিমরান আর শেরানের কানে ফিসফিস করে বলল,
“তোমরা লক্ষ্মী হয়ে থেকো। পাপা আর মাম্মা খুব তাড়াতাড়ি তোমাদের কাছে চলে আসবে।” সে উঠে দাঁড়িয়ে ইশিতা আর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “ওদের একটু খেয়াল রেখো। আমি কাল সকালে এসে ওদের নিয়ে যাব। সুমুকে ছাড়া ওরা বেশিক্ষণ সুস্থ থাকবে না, আর সুমুও ওদের ছাড়া বাঁচবে না।”
শাহরুখ আর রিয়াজ হাসতে হাসতে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। পরিবেশটাকে একটু হালকা করতে শাহরুখ হাততালি দিয়ে বলে উঠল, “আরে! আমাদের পিচ্চি ব্রিগেড দেখি এখনো মনমরা? সিমরান, শেরান… শোনো! এই যে আমি আর রিয়াজ চাচ্চু রেডি হয়ে আছি। তোমাদের দুজনকে পিঠে বসিয়ে আমরা ‘ঘোড়া ঘোড়া’ খেলব আর সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াব। কিন্তু শর্ত একটাই— ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে হবে।”

রিয়াজ নিচে বসে ইশারা করে ডাকল,
“চলো চ্যাম্পিয়নস!”

চাচাদের এই উৎসাহ দেখে সিমরান আর শেরানের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শেরাজ এবার সারবাজ আর শাহরুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে ইশারা করে দ্রুত পায়ে শেখবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। গাড়িতে ওঠার আগে সে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পেছনে শাহরুখ আর রিয়াজের পিঠে চড়ে সিমরান-শেরানের খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে আসছে। সেই হাসির রেশটুকু বুকে নিয়ে শেরাজ আবার বাংলোর দিকে গাড়ি ছোটাল। তার মনে হলো, বাচ্চাদের এই হাসিটুকু অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য তাকে এখন ফিরে গিয়ে সুমুর ক্ষতগুলোতে সবটুকু মায়া আর ভালোবাসা দিয়ে প্রলেপ দিতে হবে।

​শেরাজ যখন বাংলোয় ফিরল, চারপাশটা একদম থমথমে। গার্ডরা রোবটের মতো নিজের নিজের পজিশনে দাঁড়িয়ে আছে। শেরাজ দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ঢিপঢিপ করছে—সুমু জেগে ওঠেনি তো? ও কি একা ভয় পেয়েছিল?
​ধীরে দরজার নব ঘুরিয়ে সে ঘরের ভেতর পা রাখল। এসির হালকা শব্দ ছাড়া ঘরটা একদম নিঝুম। সুমু তখনো ঘুমাচ্ছে। চাদরটা গায়ের ওপর থেকে কিছুটা সরে গেছে, আর তার ফ্যাকাশে মুখটা বালিশে অর্ধেক ডুবে আছে। শেরাজ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে নিঃশব্দে বিছানার পাশে এসে বসল। সুমুর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে শেরাজের মনে হলো, এই মেয়েটা যতটা ধকল সয়েছে, এক জীবনে তা অনেকের পক্ষেই সম্ভব না। জ্বরের প্রকোপ বোধহয় কিছুটা কমেছে, কারণ সুমুর কপালে এখন আর আগের মতো তপ্ত আঁচ নেই।
​শেরাজ তার ব্যান্ডেজ করা হাতটা সুমুর কপালের কাছে নিয়ে গেল, কিন্তু স্পর্শ করল না। সে ভয় পাচ্ছিল, যদি তার স্পর্শে সুমুর এই গভীর প্রশান্তির ঘুমটা ভেঙে যায়। সে কেবল অপলক তাকিয়ে রইল সুমুর গলার সেই দাগটার দিকে, যা তার নিজেরই দেওয়া। গভীর অনুশোচনা আবারও তাকে জাপটে ধরল। সে সুমুর চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“সিমরান আর শেরান ভালো আছে, সুইটহার্ট। ওরা তোমাকেই খুঁজছে। তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো… আমি আর পারছি না তোমাকে এইভাবে নিঃপ্রাণ হয়ে পড়ে থাকতে দেখতে।”

শেরাজ ঘর থেকে বের হলো না। সে ঘরের এক কোণে রাখা সোফাটায় শরীরটা এলিয়ে দিল, কিন্তু তার চোখ স্থির হয়ে রইল সুমুর ওপর। সে ভাবল, মানুষ কত দ্রুত বদলে যায়। কাল রাতের সেই হিংস্র শেরাজ আর আজকের এই অসহায় শেরাজের মাঝে তফাৎ শুধু ওই বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটার প্রতি এক অসীম, অবর্ণনীয় ভালোবাসা।

সুমু ঘুমের ঘোরে একবার এপাশ-ওপাশ করল, ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেরাজ অমনি সোজা হয়ে বসল। কিন্তু না, সুমু আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। শেরাজ আবার হেলান দিয়ে বসে তার সন্তানদের মুখের কথাগুলো মনে করতে লাগল। সে বুঝতে পারল, সুমুর ত্যাগের মূল্য কোনোদিন শোধ করা যাবে না, কেবল আজীবন সেবা আর ভালোবাসা দিয়ে সেই ঋণের কিছুটা উপশম করা সম্ভব।
​সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। জানালার ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে গোধূলির ম্লান আলো এসে সুমুর ফ্যাকাশে মুখে পড়েছে। ঘুমের ঘোরটা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করল সুমুর। সে অনুভব করল তার শরীরটা এখনো ভারী হয়ে আছে, কিন্তু জ্বরের সেই দহনটা কিছুটা কমেছে। সে খুব কষ্টে চোখ মেলে তাকাল। আবছা অন্ধকারে সে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই তার দৃষ্টি স্থির হলো সোফায় বসে থাকা মানুষটির ওপর। শেরাজ তখনো সেখানে বসে ছিল, মাথাটা সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। সুমু খুব ক্ষীণ স্বরে ডাকল, “খান… সাহেব?”
​শেরাজ যেন এই ডাকটির জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সুমুর কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই সে তড়িৎবেগে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত পায়ে বিছানার পাশে এসে সুমুর কপালে হাত রাখল।
​“জেগেছো? এখন কেমন লাগছে?”
​সুমু উত্তর না দিয়ে শেরাজের ব্যান্ডেজ করা হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল। সে দেখল ব্যান্ডেজটা নতুন করে রক্তে ভেজা নয়, তবে শেরাজের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আপনি কোথায় গিয়েছিলেন? আপনাকে পাচ্ছিলাম না কেন?”

শেরাজ এক মুহূর্ত ইতস্তত করে বলল,
“আমি… আমি শেখবাড়িতে গিয়েছিলাম। সিমরান আর শেরানকে দেখতে।”
​বাচ্চাদের কথা শুনে সুমুর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে উঠে বসার চেষ্টা করতেই শেরাজ তাকে সাহায্য করল। সুমু ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ওরা কেমন আছে? ওরা কি কাঁদছিল? ওরা কি আমাকে খুঁজেছে?”
​শেরাজ সুমুর পিঠের পেছনে বালিশটা ঠিক করে দিয়ে ম্লান হেসে বলল,
“ওরা ভালো আছে। আমি ওদের বুঝিয়ে এসেছি। তুমি সুস্থ হলেই ওদের কাছে নিয়ে যাব।”
​সুমু শেরাজের বুকে মাথা ঠেকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেরাজ এবার আর তাকে সরিয়ে দিল না। সে সুমুর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত গলায় বলল,
“অনেক হয়েছে সুমু। এই অভিমান, এই লড়াই—সব এবার থামানো দরকার। আমি বুঝতে পারছি, তোমাকে দূরে ঠেলে দিতে গিয়ে আমি আসলে নিজেকেই শেষ করে দিচ্ছি। তুমি সুস্থ হও, আমরা আবারও সবকিছু গুছিয়ে নিব।”
​সুমু শেরাজের শার্টটা খামচে ধরে বলল,
“আপনি কি আমাকে ক্ষমা করেছেন?”

শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। সে কেবল সুমুর চোখের দিকে গভীর এক দৃষ্টিতে তাকাল, যেখানে ক্ষমা নয়—ছিল কেবল এক পৃথিবী সমান ভালোবাসা আর আত্মসমর্পণের গল্প। সে সুমুকে একা রেখে নিচে যেতে চাইল না। ইন্টারকমে কল দিয়ে কিচেনে বলে দিল খাবার ওপরে পাঠিয়ে দিতে। কিছুক্ষণ পর এক পরিচারিকা দরজায় নক করে খাবারের ট্রে দিয়ে গেল। শেরাজ নিজেই দরজা থেকে ট্রে-টা নিয়ে ঘরে ঢুকল।
​খাবারের ঘ্রাণে সুমুর পেটে যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকার ক্লান্তিটা এখন চাগাড় দিয়ে উঠেছে। শেরাজ বিছানার পাশের ছোট টেবিলটা টেনে সুমুর সামনে রাখল। চিকেন স্যুপ, একটু সবজি আর হাতে গড়া পাতলা রুটি। সে খুব ধীরস্থিরভাবে প্লেটটা গুছিয়ে নিল। যখনই রুটিটা ছোট ছোট করে ছিঁড়ে সুমুর মুখে তুলে দিতে যাচ্ছিল, সুমু একটু ইতস্তত করে বলল,
“আমি নিজে খেতে পারব, খান সাহেব। আপনার হাতে তো চোট আছে, কষ্ট হচ্ছে আপনার।”
​শেরাজ সুমুর দিকে একবার চোখ তুলে তাকাল। সে কোনো কথা না বলে সুমুর মুখে গ্রাস তুলে ধরল। সুমু আর না করতে পারল না। ​খাওয়াতে খাওয়াতে শেরাজ খুব নিচু স্বরে বলল,
“শুনলাম আমার বাচ্চাদের মাম্মা নাকি এখন পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরী ঘুমন্ত রাজকুমারী।”
সুমু আলতো হাসল। ​খাওয়ানো শেষ করে শেরাজ তাকে পানি খাইয়ে দিল। এরপর সে টেবিলটা একপাশে সরিয়ে রেখে সুমুর খুব কাছে এসে বসল। ঘরের ডিম লাইটের আলোয় শেরাজের মুখটা আজ বড্ড মায়াবী লাগছে। সে সুমুর একটা হাত নিজের গালে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“আমার ওপর তোমার অনেক ঘৃণা হওয়া উচিত ছিল, সুইটহার্ট। আমি তোমাকে যে কষ্ট দিয়েছি, তা কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে দেয় না। অথচ তুমি এখনো আমার হাতেই ভরসা খুঁজছ। কেন?”
​সুমু শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হেসে বলল,
“কারণ আমি জানি, এই হাতটা দিনশেষে আমাকে আগলে রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যাকুল হয়।”

শেরাজ তাকে আর কিছু বলতে দিল না। সে সুমুর মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নিল। রাত বাড়ছে, বাইরের বাতাসের ঝাপটা পর্দার ফাঁক দিয়ে ভেতরে আসছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে যেন এখন এক নতুন ভোরের প্রস্তুতি চলছে।
​সকালের হালকা সোনাঝরা রোদ এসে বাংলোর জানালার ওপাশে থমকে দাঁড়িয়েছে। সুমু আয়নার সামনে বসে আলতো করে ঠোঁটে একটু লিপস্টিক পরে নিল। গলার নীলচে দাগগুলো আড়াল করতে ওড়নাটা একটু ভালো করে জড়িয়ে নিয়েছে। সেদিন রাতের ফলে শরীরটা ভেঙে পড়লেও, আজ মনে মনে এক অদ্ভুত শান্তি তার। কারণ, সে আবার তার সন্তানদের কাছে ফিরছে। তার ভাবনার মাঝেই, শেরাজ ড্রেসিং রুম থেকে বেরিয়ে এলো। তাকে দেখামাত্রই সুমুর হাতটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

শেরাজের পরনে ফিটিং করা কুচকুচে কালো শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো, যেখানে তার শক্ত পেশি আর শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চোখেমুখে সেই পুরনো ধারালো গাম্ভীর্য। তার চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে কপালের ওপর এসে পড়েছে।

শেরাজের এই ডার্ক হ্যান্ডসাম লুকটা সুমুর হৃদপিণ্ডকে নতুন করে অবাধ্য করে তুলল। সে অপলক তাকিয়ে রইল তার প্রিয় মানুষটার দিকে। শেরাজ ড্রেসিং টেবিলের আয়নার মাধ্যমে সুমুর দৃষ্টি অনুভব করল। সে ধীর পায়ে তার পেছনে এসে দাঁড়াল। সুমুর কাঁধে নিজের ব্যান্ডেজ করা হাতটা রেখে আয়নায় দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আজকাল বড্ড বেশি তাকিয়ে থাকো, সুইটহার্ট। তোমার চোখের এই তৃষ্ণা কিন্তু আমাকে অপরাধী করে তুলবে।”
​সুমু লজ্জা পেয়ে নজর নামিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু শেরাজ তার চিবুকটা এক আঙুলে উঁচিয়ে ধরে পুনরায় বলল,
“যাওয়ার আগে নিজেকে সামলে নাও। শেখবাড়িতে পা রাখলে আমি আবার সেই আদর্শ বাবা আর শান্ত ছেলে হয়ে যাব। কিন্তু এই বাংলোর এই দেয়ালগুলো সাক্ষী— আমি তোমার জন্য কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারি।”
​সে সুমুর কপালে দীর্ঘ এক চুমু খেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর ঘড়িটা হাতে পরতে পরতে খুব শীতল স্বরে বলল,
“চলো। বাচ্চারা অপেক্ষা করছে। আর হ্যাঁ, বোরকা পরে নাও। তোমার শরীরের ওই দাগগুলো আমার একান্ত সম্পত্তি, ওগুলো দেখার অধিকার আর কারোর নেই।”

শহর ছাড়িয়ে গাড়িটা যখন নির্জন হাইওয়ে দিয়ে ছুটছিল, সুমুর হুট করেই বাচ্চা মানুষের মতো জেদ চাপল। রাস্তার পাশে ছোট একটা আইসক্রিম পার্লার দেখে সে শেরাজকে গাড়ি থামাতে বাধ্য করল। শেরাজ প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকালেও, সুমুর হাসিমুখ দেখে আর না করতে পারল না। সুমু গাড়ি থেকে নেমে আগে আগে পার্লারের দিকে চলে গেল। শেরাজ গাড়ি থেকে নামতেই কোথা থেকে এক আধুনিক সাজের তরুণী এসে তার সামনে দাঁড়াল। মেয়েটির পরনে ওয়েস্টার্ন। শেরাজকে একা দেখে সে বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বলল,
“হেই হ্যান্ডসাম! সত্যি বলছি, তোমাকে আমার বেশ ভালো লেগেছে। যাবে নাকি আমার সঙ্গে?”

শেরাজ মেয়েটির দিকে না তাকিয়েই ধীরস্থির কণ্ঠে উত্তর দিল,
“আই রেসপেক্ট অ্যান্ড লাইক ওম্যান।”

মেয়েটি শেরাজের উত্তরের গভীরতা না বুঝেই আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলে উঠল,
“ওহ ডিয়ার, আই লাইক ইউ টু!”

শেরাজ এবার মৃদু হাসল। সে আলতো করে মাথা ঘুরিয়ে আইসক্রিম পার্লারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সুমুর দিকে তাকাল। বিকেলের বাতাসে সুমুর বোরকা আর হিজাব উড়ছে। শেরাজ সেই পবিত্র সৌন্দর্যের দিকে তৃপ্ত চোখে তাকিয়ে মেয়েটির উদ্দেশ্যে পুনরায় বলল,​
“বাট আই সেড ওম্যান।”

শেরাজের এই ছোট একটি বাক্য যেন তীরের মতো গিয়ে বিঁধল মেয়েটির গায়ে। সে বুঝতে পারল, শেরাজের কাছে ‘নারী’ মানে নগ্নতা বা সস্তা আধুনিকতা নয়, বরং পর্দার আড়ালে থাকা কোনো নারী। মেয়েটি চলে গেল। শেরাজও পার্লারে গিয়ে সুমুকে আইসক্রিম কিনে দিল।

এক হাতে ভ্যানিলা আইসক্রিম আর অন্য হাতে শেরাজের শক্ত হাতটা আঁকড়ে ধরে সুমু রাস্তার ধারের এক বিশাল খোলা মাঠের দিকে পা বাড়াল। মাঠভর্তি বুনো ঘাস আর নাম না জানা ছোট ছোট হলুদ-সাদা ফুল। ​হাঁটতে হাঁটতে শেরাজ হুট করে থমকে দাঁড়াল। নিচু হয়ে ঘাসফুল ছিঁড়ে আলতো করে গেঁথে দিল সুমুর চুলে। সুমু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাতেই শেরাজ ওর খুব কাছে সরে এলো। তার আঙুলগুলো সুমুর কপালে এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে খুব কোমল স্বরে বলল,
“এই বুনো ফুলগুলোতে তোমাকে দেখতে একদম অপ্সরার মতো লাগছে।”
​সুমু আলতো হাসল। সে ভাবল, যে মানুষটার হাত রক্ত মাখাতে পারে, সেই মানুষটার হাত এত মায়া দিয়ে ফুল পরাতেও জানে। তবে সেও ছাড়বার পাত্রী নয়। সে নিচু হয়ে একটা নীলচে বুনো ফুল তুলে নিল। তারপর পায়ের পাতায় ভর দিয়ে কিছুটা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে শেরাজের এক কানের ওপর ফুলটা গুঁজে দিল। শেরাজ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসল,
“কি করছ এটা? কেউ দেখলে হাসবে।”
​সুমু সেদিকে কান দিল না। শেরাজের এলোমেলো হয়ে থাকা চুলের ওপর নিজের আঙুল বুলিয়ে দিতে লাগল সে। শেরাজের কপালে পড়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো খুব যত্ন করে গুছিয়ে দিয়ে খুব আদুরে গলায় বলল,
“সবাই তো আপনার ভয়ংকর রূপটা দ‍্যাখে, কিন্তু আমি আপনার এই স্নিগ্ধ রূপটা নিজের কাছে বন্দি করে রাখতে চাই। এই অবাধ্য চুলগুলো যেমন আমার আঙুলের কথা শুনছে, আপনিও কি সারাজীবন এভাবেই আমার কথা শুনবেন, বুঝেছেন?”
​শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। শুধু সুমুর কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। সুমু থতমত খেয়ে বলল,
“কি করছেন? ছাড়ুন!”
শেরাজ মনোমুগ্ধ নয়নে সুমুর দিকে একপলকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“তুমি আমার অনেক স্বাধনার পর পাওয়া পূর্ণতার প্রাপ্তি। তুমি আমার ফুল শূণ্য বাগানে ফুটে থাকা একমাত্র সুগন্ধিযুক্ত কাঠগোলাপ। এই বাগানের একমাত্র ভোমর এবং মালি শুধুই আমি। তাই তুমি নামক ফুলকে ছোঁয়ার আর দেখার অধিকারটাও শুধু আমারই আছে।”
সুমু লজ্জায় মাথা নিচু করল। মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠল। সে নিচু হয়ে দুই হাত ভরে একগুচ্ছ বুনো ফুল ছিঁড়ে আনলো, তারপর শেরাজকে এক প্রকার জোর করেই ঘাসের ওপর বসিয়ে দিল। শেরাজ হাসছে—তার সেই ভুবনজয়ী হাসিতে যেন মুক্তো ঝরছে। সুমু খুব মনযোগ দিয়ে একটা একটা করে ফুল শেরাজের চুলের ভাঁজে গুঁজে দিতে লাগল। ​শেরাজ শান্ত হয়ে বসে সুমুর এই ছেলেমানুষি দেখছে। সুমুর ফুল গুঁজে দেওয়া শেষ হতেই সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,
“দেখুন তো, আপনাকে একদম বন-রাজার মতো লাগছে।”
​শেরাজও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে সুমুর হাত ধরে টেনে পাশে বসাল। তারপর খুব নিপুণ হাতে ঘাস আর লতানো বুনো ফুল দিয়ে দুটো সুন্দর গাজরা গেঁথে ফেলল। সুমু অবাক হয়ে দেখল, যে হাত দিয়ে শেরাজ পিস্তল চালায়, সেই আঙুলগুলো কত কোমলভাবে ফুলের সাথে সন্ধি করছে। ​শেরাজ হুট করে সুমুর পা নিজের হাঁটুর ওপর টেনে নিল। সুমু চমকে উঠল,
“এসব কি করছেন? সবাই দেখছে তো!”

শেরাজ কোনো কথা শুনল না। সে খুব যত্ন করে একটা ফুলের গাজরা সুমুর পায়ের রুপালি নূপুরের ঠিক ওপরে পরিয়ে দিয়ে পায়ের ওপর করে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“সবাইকে দেখার অনুমতি আমি দিইনি, সুইটহার্ট। এই সৌন্দর্য শুধু আমার চোখের জন্য।”

এরপর সে দ্বিতীয় গাজরাটা হাতে নিল। সুমুর হিজাবের ওপর সেটা মুকুটের মতো পরিয়ে দিয়ে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস সুমুর ঘাড়ে পড়ছে। শেরাজ ফিসফিস করে বলল,
“পায়ের গাজরাটা মনে করিয়ে দেবে তুমি আমার পৃথিবী, আর মাথার এই মুকুটটা বলছে তুমি আমার হৃদয়ের রানি।”
“একদিন দুনিয়ার সমস্ত সুখ আপনার পায়ে এনে দিয়ে আমি পালিয়ে যাব অনেক দূরে।”
সুমুর কথা শোনা মাত্রই শেরাজ তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে হালকা গলায় মৃদুস্বরে গেয়ে উঠল,
“ম্যায় আগার কিতাবোঁ সে চুরা কে লাউঁ কায়েদে,
হিসাবোঁ সে চুরা কে লাউঁ ফায়েদে,
না পুরি হো সকেগি উনসে মাগার তেরি কামি!
​ম্যায় আগার সিতারোঁ সে চুরা কে লাউঁ রোশনি,
হাওয়াওঁ সে চুরা কে লাউঁ রাগিনি,
না পুরি হো সকেগি উনসে মাগার তেরি কামি!
​ইয়ে দুনিয়া পরাই হ্যায়, বাস এক আপনা হ্যায় তু,
জো সাচ হো মেরা ও সওয়েরে কা সাপনা হ্যায় তু!”
সুমু চোখ বন্ধ করে গান অনুভব করল। শেরাজ হালকা গম্ভীর গলায় বলল,
“পালানোর সাহস আর কখনো কোরো না, সুইটহার্ট। এই ভালোবাসার বন্দীঘর শুধুমাত্র তোমার জন্যই তো বানিয়েছি।”
হঠাৎ পকেট থেকে ফোনটা আর্তনাদ করে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে শেরাজ দেখল, আইয়ুব কলিং… লেখা। সে বিড়বিড় করে বলল,
“উফ, এই আপদটাকে আজরাইল না নিয়ে আমার ঘাড়ে কেন চাপিয়েছে খোদা জানে!”
​ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে আইয়ুবের কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এলো,
“কিরে? তোরা কোথায় ভাই?”

শেরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনের স্পিকারটা অন করে খুব মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
“স্পেন্ডিং সাম কোয়ালিটি টাইম উইথ মাই বেটার হাফ আন্ডার দ্য ওপেন স্কাই।”
​ওপাশ থেকে আইয়ুব যেন রাগে ফেটে পড়ল,
“ওরে আমার রোমিও রে! তোদের বয়স কি দিন দিন বাড়ছে নাকি কমছে? এই বুড়ো বয়সে খোলা আকাশের নিচে বসে প্রেম করছিস? বাড়িতে আয় তাড়াতাড়ি।”
​শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“প্রাইভেট টাইমে ডিস্টার্ব করিস। কি সমস্যা তোর?”
“আরে ভাই, রোমান্স তো পরেও করতে পারবি। এখন শোন! অনেক রোমান্স হয়েছে, এবার তাড়াতাড়ি বাসায় আয়। আজ রাতে একটা কার রেসে যাব।”

শেরাজ থমকে গেল। ভ্রু কুঁচকে কর্কশ গলায় বলল,
“কার রেসে যাব মানে? তোর মাথাটা কি একদম গেছে?”

“হ্যাঁ গেছে! শুনলাম আজ রাতে নাকি দারুণ একটা কার রেস হবে!”

শেরাজ সটান জবাব দিল,
“আমি ওসবে যাব না।”

“দেখ এস.কে, প্লিজ না করিস না। চল ভাই, দারুন চিল হবে! আর এমন তো না যে তুই ড্রাইভিং জানিস না। তুই বাইক রেসারের সঙ্গে সঙ্গে একজন দুর্দান্ত কার রেসারও। হ্যাঁ, হয়তো বিয়ের পর শুধুমাত্র বাইক রেসিং ছাড়া আর কোনো রেসিং করিসনি। কিন্তু আজ চল ভাই। আমি শিওর, মাঠে তুই নামলে তোর সামনে কেউ টিকতে পারবে না।”
শেরাজ ​ধীরস্থির গলায় বলল,
“দেখ আইয়ুব, বিয়ের আগে প্রাণের মায়া ছিল না। মনে হতো ধুলো উড়িয়ে বাতাসের আগে চলে যাব। কিন্তু যখন বিয়ে করলাম, তখন প্রথমবার অনুভব করলাম যে আমারও বেঁচে থাকার একটা কারণ আছে। তবুও দু-একবার বিয়ের পর রেস করেছি, কারণ তখন পাশে শুধু বউ ছিল। এখন আমার সন্তানরা আছে… ওদের মুখের দিকে তাকালে এখন আর গতিতে শিহরণ জাগে না, বরং ওদের জন্য আরও বেশি করে বাঁচতে ইচ্ছা করে।”

শেরাজের কথাগুলো শুনে ফোনের ওপাশটা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। হয়তো আইয়ুবও মুহূর্তের জন্য শেরাজের এই বদলে যাওয়া সত্তাটাকে অনুভব করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আইয়ুব তো আইয়ুবই! সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। গলার স্বর কিছুটা নিচু করে বলল,
“এস.কে, আমি তোর ইমোশন বুঝি রে ভাই। কিন্তু আজ রাতটা একটু অন্যরকম। ব‍্যাপারটা আমাদের সম্মানের দিকে চলে গেছে।”

শেরাজ ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে শীতল স্বরে প্রশ্ন করল,
“সম্মানের দিকে গেছে মানে? পরিষ্কার করে বল।”

আইয়ুব এক মুহূর্ত থামল, তারপর বলতে শুরু করল,
“শোন, সাইফ একটু আগে ফেসবুক স্ক্রল করার সময় একটা লাইভে জয়েন করেছিল। সেখানে এই শহরের কোনো একটা পুরনো রেসিং স্পট থেকে লাইভ চলছিল। যে ছেলেটা লাইভ করছিল, সে দম্ভ করে পুরো শহরের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে যে তাদের প্রধান রেসারের মতো নাকি আর কেউ নেই। ছেলেটা নাকি টানা পাঁচবারের বিজয়ী! সে সবার সামনে হাসি-ঠাট্টা করে বলছিল, এই শহরে নাকি সে ছেলেকে হারানোর মতো কোনো মর্দ জন্মায়নি।”

শেরাজের চোখের মণি সরু হয়ে এলো। আইয়ুব থামল না, সে আবারও বলল,
“সাইফ তো জানিসই, মাথা গরম! ও এসব শুনে নিজেকে সামলাতে না পেরে কমেন্ট করে বসে— ‘আরে তোমাদের এই রেসারের চেয়েও বড় রেসার আমাদের কাছে আছে। তার সাথে টক্কর দেওয়ার যোগ্যতা তোমাদের কারো নেই।’ ব্যাস! ওই লাইভের ছেলেটা সাথে সাথে সাইফকে ইনবক্স করে চ্যালঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। সরাসরি বলেছে— ‘যদি হিম্মত থাকে তবে আজ রাতে তোকে ট্র্যাকে নিয়ে যেতে।’ সাইফও জেদের বশে রাজি হয়ে গেছে। এখন তুই না গেলে আমাদের সবার মাথা হেঁট হয়ে যাবে রে ভাই।”

শেরাজ চুপ করে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। পুরনো দিনের সেই গতির রক্ত যেন আবার ধমনীতে লাফালাফি শুরু করেছে। যে সম্মানের লড়াইয়ে তার বন্ধুরা জড়িয়ে গেছে, সেখানে সে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে— এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। ​সে সুমুর দিকে তাকাল। সুমু একদৃষ্টে শেরাজের মুখের অভিব্যক্তি পড়ার চেষ্টা করছে। শেরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনের ওপাশে আইয়ুবকে খুব নিচু স্বরে বলল,
“আইয়ুবা, তোরা মাঝেমধ্যে আমার জীবনটাকে সিনেমা বানিয়ে দিস। সাইফকে বলিস, ওর চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহণ করলাম। আজ রাতে সেই দম্ভ করা রেসারকে বুঝিয়ে দেব—আসল রেস কাকে বলে।”
সুমু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ আবারও বলল,
“আই ডোন্ট কেয়ার হু ইজ বেটার দ্যান মি। ইটস অলওয়েজ মি ভার্সেস মি। ইউ আর নট রেসিং দ্য ওয়ার্ল্ড—ইউ আর রিফাইনিং ইয়োরসেলফ। নো জেলাসি। নো কম্পারিজন ট্র্যাপ। জাস্ট ইয়েস্টারডেস ভার্সন অফ ইউ ভার্সেস টুডেস ডিসিপ্লিন, গ্রোথ অ্যান্ড গ্রিট। দ্যাটস হাউ রিয়েল কনফিডেন্স মুভস: কোয়াইট, ফোকাসড, আ লিটল ডেঞ্জারাস—ইন আ গুড ওয়ে। কিপ চুজিং প্রগ্রেস ওভার নয়েজ। দ্যাট ইনার কম্পিটিশন ইজ দ্য ওয়ান দ্যাট অ্যাকচুয়ালি চেঞ্জেস লাইভস।”

আইয়ুব খুশিতে একটা চিৎকার দিয়ে উঠল,
“এই তো আমার ভাই! রাত ঠিক বারোটায় রেস শুরু হবে।”
​ফোনটা কেটে দিয়ে শেরাজ সুমুর দিকে ফিরল। সুমুর হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে খুব নরম গলায় বলল,
“মাঝেমধ্যে নিজের জন্য নয়, সুইটহার্ট, বন্ধুদের সম্মানের জন্য ফিরতে হয় সেই পুরনো অন্ধকার জগতে। আজকের রাতটা শুধু একটা রেস নয়, আজকের রাতটা হলো—আমি কেন এস.কে, সেটা প্রমাণ করার রাত।”

সুমু দেখল শেরাজের চোখে সেই পুরনো ভয়ংকর উজ্জ্বলতা ফিরে এসেছে। সে বুঝল, আজ রাতে গতির নেশা আর সম্মানের জেদ মিলে শেরাজকে আবার সেই বেপরোয়া ‘এস.কে’ বানিয়ে দেবে।

গোপালগঞ্জের উপকণ্ঠে নির্জন হাইওয়েটা আজ যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র। ঘড়িতে রাত বারোটা ছুঁইছুঁই। কুয়াশা আর সোডিয়াম বাতির হলদেটে আলো চারপাশে ছড়িয়ে আছে। রাস্তার দুপাশে কয়েকশ বাইক আর গাড়ির ভিড়। ইঞ্জিনের গর্জন আর মানুষের চিৎকারে চারপাশটা ভারী হয়ে উঠেছে।

রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে এই শহরের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন—যাকে সবাই ‘চ‍্যাম্প’ বলে ডাকে। যদিও আজ তার নামটা কারো মুখে উচ্চারিত হচ্ছে না, কিন্তু তার দলবলের দম্ভ আকাশচুম্বী। বর্তমান চ‍্যাম্পিয়ন টিমের লোকেরা পিস্টন হাতে গাড়ির বনেটে বাড়ি দিচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে,
“কোথায় তোমাদের সেই কিংবদন্তি? আজ আমাদের চ‍্যাম্পিয়নের তাপে সে তো ছাই হয়ে যাবে।”
​ঠিক তখনই অন্ধকারের বুক চিরে ধেয়ে এলো একজোড়া তীক্ষ্ণ হেডলাইট। টায়ারের তীক্ষ্ণ শব্দে রাস্তা কাঁপিয়ে এসে থামল শেরাজের ব্ল্যাক বিস্ট। গাড়ি থেকে ধীরপায়ে নেমে এলো শেরাজ। পরনে কালো লেদার জ্যাকেট, চোখের চাউনি বরাবরের মতো শীতল। তাকে ঘিরে একে একে গাড়ি থেকে নামল আইয়ুব, রিয়াদ, ফাহিম, সাইফ, রাহিন, অমিত, নিহাল, রিসান, সারবাজ, শাহরুখ, আরবাজ, রিয়াজ, পিয়াস, আর রিফাত।

শেরাজের এই আর্মি যখন লাইন দিয়ে দাঁড়াল, তখন অপর টিমের সমর্থকদের চিৎকার কিছুটা থিতিয়ে এলো। শেরাজকে মাঝখানে রেখে আইয়ুব এগিয়ে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়াল। অপর টিমের একজন বুক ফুলিয়ে এগিয়ে এসে টিটকারি মেরে বলল,
“এই যে ভাইয়েরা, মেলা দেখতে আসছেন নাকি? আপনাদের এই সাবেক হিরোকে দিয়ে হবে না। ট্র্যাকে নামলে তো ধোঁয়ার গন্ধে ওর দম আটকে যাবে। তার চেয়ে ভালো হয় বাড়ি ফিরে গিয়ে আম্মুর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ুন।”
​কথাটা শোনামাত্রই সাইফ আর রিয়াদ তেড়ে যেতে চাইল, কিন্তু শেরাজ হাত তুলে তাদের থামাল। ​আইয়ুব দাঁত বের করে একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
“আরে শান্ত হও বাচ্চারা। রাস্তার মোড়ে ছোটখাটো নেড়ি কুত্তা একটু ঘেউঘেউ করবেই। ওদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, ওরা তো আর কোনোদিন বাঘ দেখেনি।”
​অপর টিমের একজন সমর্থক চটে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
“কাকে কুত্তা বলছিস? আমাদের চ্যাম্পিয়ন টানা পাঁচবারের বিজয়ী! তোদের এই জং ধরা রেসার ওকে ছোঁয়ার যোগ্যতা রাখে না।”
​এবার নিহাল আর সারবাজ সামনে এগিয়ে এলো। নিহাল খুব শান্ত গলায় বলল,
“পাঁচবার জিতে খুব অহংকার হয়েছে, তাই না? আজ একবার হারবি, আর সেই হারটা সারাজীবন মনে রাখবি। আমাদের এস.কে যখন গিয়ার চেঞ্জ করবে, তখন তোদের চ্যাম্পিয়নের হার্টবিট বেড়ে যাবে। তাই কথা কম বল, আর ট্রাক রেডি কর।”

ফাহিম আর অমিত পাশ থেকে শিস দিয়ে উঠল। শাহরুখ আর আরবাজ দুজনেই শেরাজের দুই পাশে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে অপর টিমের সমর্থকদের দিকে এমনভাবে তাকাল যে ওরা দুপা পিছিয়ে গেল।
​শেরাজ এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি। সে ধীরপায়ে নিজের গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে ফোন বের করে খুব নিচু কিন্তু ধারালো স্বরে বলল,
“আগুনের তেজ শুধু দূর থেকেই দেখতে হয়। কাছে গেলে ছাই হতে বেশিক্ষণ লাগে না। তোমাদের চ্যাম্পিয়নকে বলো—এবারের জিতটা তার ভাগ‍্যে নেই।”
​শেরাজের এই কথাগুলো যেন অপর টিমের সমর্থকদের বুকে তীরের মতো বিঁধল। পুরো স্পটটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আইয়ুব শেরাজের কাঁধে হাত রেখে চিৎকার করে বলল,
“আজ রাতটা হবে ইতিহাসের সাক্ষী! লেটস স্টার্ট দ্য ইঞ্জিন!”
অপর টিমের লোকেরা রাগে গজগজ করলেও শেরাজের এই বিশাল বাহিনীর সামনে আর টু শব্দ করার সাহস পেল না। সবাই পজিশন নিতে শুরু করল। হাইওয়ের সেই দীর্ঘ কালো রাস্তাটা এখন শুধু দুই রেসারের গতির লড়াইয়ের অপেক্ষায়। ​ইঞ্জিনের গর্জন তখন পুরো হাইওয়েতে রণধ্বনি তুলছে। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক সুন্দরী তরুণী লাল নিশানটা উঁচিয়ে ধরল। দুই পাশে দুটো গাড়ি—একদিকে অপর টিমের লাল ‘ফেরারি’, অন্যদিকে শেরাজের কুচকুচে কালো ‘বুগাটি’।
​শেরাজ স্টীয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরল। তার হাতের শিরাগুলো টানটান হয়ে আছে। হেলমেটের ভেতর থেকে তার চোখ দুটো তখন শিকারি চিতার মতো জ্বলছে। পাশে বসা আইয়ুব একবার শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এস.কে, ফিনিশিং পয়েন্টে আমরা তোর বিজয় মিছিলে থাকব। জাস্ট রিমেম্বার, ইউ আর দ্য কিং।”
​লাল নিশানটা নিচে নামার সাথে সাথেই কান ফাটানো শব্দে চাকা দুটো রাস্তার পিচ কামড়ে ধরে ধুলো উড়িয়ে ছুটল। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে দুটো গাড়িই একশ কিলোমিটার গতি পার করল। অপর টিমের গাড়িটা শুরুতেই একটু এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। তার ড্রাইভিং স্টাইল খুব উগ্র। সে বারবার শেরাজের পথ আটকানোর জন্য গাড়িটা এঁকেবেঁকে চালাচ্ছে। তাদের টিমের সমর্থকরা উল্লাসে ফেটে পড়ছে।

শেরাজ একদম স্থির। তার মন এখন শুধু ইঞ্জিনের তাল আর গতির সাথে সন্ধি করেছে। সে জানে, রেসিং শুধু গতির খেলা নয়, এটা ধৈর্য আর সঠিক মুহূর্তের খেলা। হাইওয়ের প্রথম বাঁকটা আসতেই শেরাজ গিয়ার চেঞ্জ করে অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিল। টায়ারের তীব্র আর্তনাদ তুলে শেরাজ ইন-কাট করে অপর টিমের গাড়ির খুব কাছে চলে এলো। ​আইয়ুব চেঁচিয়ে বলল,
“মার ডাল রে, শেরাজা! এটাই মোক্ষম সময়।”

রাস্তার সামনে একটা ভয়ঙ্কর বাঁক—যাকে রেসাররা বলে ‘ডেথ কর্নার’। অপর টিমের গাড়িটা ওখানে কিছুটা গতি কমিয়ে নিল নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু শেরাজ? সে গতির কাঁটা আরও বাড়িয়ে দিল। শেরাজের গাড়িটা এক লহমায় রাস্তার একদম কিনার দিয়ে ঘষটে বেরিয়ে গেল। এক চুল এদিক-ওদিক হলেই গাড়ি খাদে পড়ে যেত, কিন্তু শেরাজের কন্ট্রোল ছিল অতিপ্রাকৃত। তার গাড়িটা অপর টিমের গাড়ির ঠিক সামনে। গাড়ির ভেতরের ছেলেটা দিশেহারা হয়ে বারবার হর্ন দিচ্ছে আর পাশ কাটানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু শেরাজ যেন রাস্তার পুরো দখলে নিয়ে নিয়েছে। আয়নায় ছেলেটার অস্থিরতা দেখে শেরাজের ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত ঠাণ্ডা হাসিটা ফুটে উঠল। সামনেই ​ফিনিশিং লাইন দেখা যাচ্ছে। দূরে নিহাল, রিয়াদ আর অমিতরা মশাল জ্বালিয়ে অপেক্ষা করছে। শেরাজ শেষ মুহূর্তের জন্য নাইট্রো বুস্ট অন করল। গাড়িটা যেন মাটির বুক ছেড়ে বাতাসের ওপর দিয়ে উড়তে শুরু করল।
প্রতিপক্ষের​ লোকেরা বিস্ময়ে দেখল, তাদের পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন শেরাজের গাড়ির ধোঁয়া ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। চাকা আর পিচের ঘর্ষণে আগুনের ফুলকি ছুটছে। ঠিক তখনই বজ্রবিদ্যুৎ গতিতে শেরাজ ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করল। ​গাড়িটা এক বিশাল বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে ব্রেক কষল সে। পুরো হাইওয়েতে সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হলো। শেরাজের বন্ধুরা—সারবাজ, আরবাজ আর শাহরুখরা চিৎকার করে দৌড়ে এলো গাড়ির দিকে।
​শেরাজ গাড়ি থেকে নামতেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল প্রতিপক্ষের পুরো টিম। তাদের দম্ভ এখন হাইওয়ের ধুলোর সাথে মিশে গেছে। শেরাজ হেলমেটটা খুলে আইয়ুবের দিকে বাড়িয়ে দিল। তারপর সেই চ্যালেঞ্জার ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল,
“আগুন নিয়ে খেলা করলে হাত পোড়ে, আর এস.কে-র সাথে রেস করলে কপাল পোড়ে। তোমার চ্যাম্পিয়নকে বোলো—এই শহরটা ওর হতে পারে, লেকিন রেস হামেশা মেরি থি, অউর মেরি হি রাহেগী।”

আইয়ুব শেরাজকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠল,
“সিংহাসন ছেড়েছি রে ভাই, কিন্তু বাদশাহ আভি ভি বাদশাহ হি হ্যায়।”
​বিজয়োল্লাসের সেই মুহূর্তটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। প্রতিপক্ষ টিমের ছেলেগুলো নিজেদের পরাজয় মেনে নিতে পারল না। তাদের দম্ভে আঘাত লেগেছে, আর সেই জ্বালা এখন বিষাক্ত ব্যবহারের রূপ নিল।

শেরাজ শান্তভাবে তার গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন প্রতিপক্ষের একজন ছেলে কুৎসিতভাবে হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো। সে শেরাজের গাড়ির বনেটে একটা লাথি মেরে থুতু ফেলে কর্কশ গলায় চিৎকার করে বলল,
“হেই ব্রো! জিতেছো তো কি হয়েছে? রাস্তার ফাঁকফোকর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে জেতা যায়, কিন্তু দম থাকে না।”

কথাটা শেষ হওয়ামাত্রই শেরাজের চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। কিন্তু সে নড়ার আগেই আইয়ুব বাঘের মতো গর্জে উঠে সামনে এগিয়ে গেল। সে ছেলেটার কলার চেপে ধরে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“তোকে কি মরণে ডাকছে? এস.কে’কে নিয়ে কথা বললে, জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব!”
শুরু হলো মারামারি। এমন বিপদের মুখে মানুষ যেখানে পালানোর কথা, সেখানে আধুনিক যুগের এক নতুন নেশা ভর করেছে সবার মাথায়— ‘সোশ্যাল মিডিয়া লাইভ’। ​রাস্তার চারপাশ থেকে ডজনখানেক স্মার্টফোনের ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠল। রেসিং স্পটের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারে ফোনের স্ক্রিনগুলো জোনাকির মতো জ্বলছে। কেউ বাইকের ওপর দাঁড়িয়ে, কেউ বা ডিভাইডারের আড়ালে লুকিয়ে ফোনের ক্যামেরা তাক করে আছে রণক্ষেত্রের দিকে।
​ভিড়ের মধ্য থেকে একজন উত্তেজিত গলায় ফোনের ক্যামেরার সামনে চেঁচিয়ে বলছে,
“হ্যালো গাইজ! আপনারা এখন সরাসরি দেখছেন গোপালগঞ্জ হাইওয়ে থেকে বছরের সবচেয়ে বড় কার রেসের পরবর্তী দাঙ্গা! কিংবদন্তি এস.কে-র টিমের সাথে পাঁচ বছরের চ্যাম্পিয়নের টিমের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে। চারদিকে শুধু রক্ত আর ভাঙা কাচ। সিচুয়েশন ইজ টোটালি আউট অফ কন্ট্রোল!”
প্রতিপক্ষের অন্য ছেলেরা লাঠিসোঁটা আর চেইন বের করে এগিয়ে এলো। তাদের একজন সাইফকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“ছাড় ওর কলার! তোদের মতো বস্তির রেসারদের আমরা গোনায় ধরি না। রেস জিতছিস তো কি হইছে, তোদের লাশ আজকে এই হাইওয়েতে পড়ে থাকবে।”
​রিয়াদ আর ফাহিম আর তিলমাত্র দেরি করল না। রিয়াদ তার হাতের জ্যাকেটটা খুলে ছুড়ে মেরে একজনের নাকে সজোরে ঘুসি বসিয়ে দিল। ​শেরাজ এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু যখন দেখল একজন পেছন থেকে রাহিনের মাথায় একটা লোহার রড দিয়ে আঘাত করতে যাচ্ছে, তখন সে আর স্থির থাকতে পারল না। চোখের পলকে সেখানে পৌঁছে ছেলেটার হাতটা মাঝপথেই ধরে ফেলল। মট করে একটা শব্দ হলো—ছেলেটার কবজি ভেঙে গেছে।
​শেরাজ তার সেই ভয়ংকর ডার্ক মেজাজে ফিরে এলো। সে ছেলেটার ঘাড় ধরে সজোরে গাড়ির কাচের ওপর আছাড় মারল। কাচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শেরাজ খুব নিচু আর ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
“বলেছিলাম না, এস.কে-র সাথে রেস করলে কপাল পোড়ে? এখন দেখ তোদের হাড় কয়টা আস্ত থাকে।”
আরেকজন ছেলে এগিয়ে আসতেই শেরাজ তাকে প্রতিরোধ করে বলল,
“তোর কি হাড়ের সাথে সাথে প্রাণের মায়াও চলে গেছে?”

শেরাজের মারের ধরণ পেশাদার খুনিদের মতো। সে কোনো অহেতুক আস্ফালন করছিল না, তার প্রতিটি আঘাত ছিল নিখুঁত এবং মারাত্মক। সে একটা ছেলেটার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে শীতল স্বরে বলল,
“আজকের পর যদি তোদের অহেতুক কারো সাথে ঝামেলা করতে দেখি, তবে তোদের বডিগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। মনে থাকবে?”

ছেলেটা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়াল। শেরাজ ওকে ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল। আইয়ুব বুক ভরে শ্বাস নিয়ে হেসে উঠল,
“শালাদের রেস রেস খেলা ছুটিয়ে দিয়েছি! কিরে এস.কে, শরীর গরম হয়েছে তো?”
​শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। সে রুমাল দিয়ে হাতের রক্ত মুছে জ্যাকেটটা ঠিক করল। তার মাথায় তখন শুধু সুমুর সেই মুখটা ঘুরছে। সে বিড়বিড় করে বলল,
“দেরি হয়ে গেল। সুমু হয়তো এখনো জেগে আছে।”

লাইভ ভিডিওর কমেন্ট বক্সে যখন শেরাজদের ওপর অতর্কিত হামলার দৃশ্যগুলো ভাইরাল হচ্ছিল, ঠিক তখনই শেখবাড়ির শান্ত পরিবেশে প্রলয় শুরু হয়ে গেল। সুমু ফোনে লাইভটা দেখামাত্রই তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। ​সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না, বোরকাটা কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে নিচে নেমে এলো। বাড়ির সবাই তখন ঘুমে আচ্ছন্ন, কিন্তু পার্কিং এরিয়ায় শাহরুখ আর সজীব গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সুমুকে ওভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে তারা চমকে উঠল।
​“ভাইয়া, আমাকে এখনই স্পটে নিয়ে চলুন!” সুমু হাপাতে হাপাতে বলল।
​শাহরুখ আর সজীব কথা না বাড়িয়ে সুমুকে নিয়ে গাড়িতে উঠল। গাড়ি যখন হাইওয়েতে পৌঁছাল, দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল শত শত মানুষের ভিড় আর পুলিশের সাইরেনের শব্দ। ​গাড়ি থামতেই সুমু দরজা খুলে পাগলের মতো ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে চিৎকার করে উঠল, “খান সাহেব!”

সেই চিৎকারে পুরো হাইওয়ে যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। শেরাজ গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে পুলিশের সাথে ঝামেলার ব‍্যাপারটা নিয়ে কথা বলছিল। সুমু কণ্ঠস্বর তার কানে পৌঁছানোমাত্রই সে থমকে গেল, ধীরপায়ে ঘুরে তাকাল।
​সুমু দৌড়ে গিয়ে শেরাজের সামনে দাঁড়াল। তার দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। শেরাজের রক্তমাখা হাত দুটো দেখে সুমু শিউরে উঠে সেগুলো নিজের মুঠোয় নিল।
​“এই কি আপনার সেই পবিত্র হাত? এই কি আপনার ফিরে আসার অঙ্গীকার?” সুমুর কণ্ঠস্বর আতঙ্কে কাঁপছে।
​শেরাজ কোনো কথা বলতে পারল না। সে শুধু দেখল সুমুর পায়ের নুপুরের ওপর সেই বিকেলের ঘাসফুলগুলো এখনো লেগে আছে, অথচ তার নিজের হাত এখন মানুষের রক্তে রাঙানো। ​চারপাশে তখনো মোবাইলের লাইভ চলছে। মানুষ অবাক হয়ে দেখছে, এতক্ষণ রণমূর্তি ধারণ করা এস.কে-র সামনে এক নারী এসে দাঁড়িয়েছে, আর তাকে দেখামাত্রই বাঘের মতো হিংস্র লোকটা মুহূর্তেই ভিজে বেড়াল হয়ে গেছে।

আইয়ুব নিচু স্বরে বলল,
“ভাবিজি… আপনি এখানে?”
​সুমু কারো কথা শুনল না। সে শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“চলুন এখান থেকে। আমি আমার সন্তানদের বাবার এই রূপ দেখতে চাই না।”
​শেরাজ টলমল পায়ে সুমুর পেছনে পেছনে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। নিজেদের হার্টথ্রব শেরাজ খানকে একটা নারীর সাথে চলে যেতে দেখে উপস্থিত অধিকাংশ মেয়েদের মন ভেঙে গেল। হাইওয়ের প্রতিটা মানুষ দেখল —যে মানুষটা হাজারো মানুষের মারকুটে মেজাজকে ভয় পায় না, সে তার প্রিয়তমার এক ফোঁটা চোখের জলের কাছে কতটা অসহায়।
​আইয়ুবরা সবাই গাড়িতে উঠে বসল। শেরাজ পুলিশদের সাথে প্রয়োজনীয় কথা শেষ করে গাড়িতে উঠে সুমুর পাশের সিটটা দখল করল। সুমু তার দিকে একবারও তাকাল না, সে পাথরের মতো শক্ত হয়ে জানালার বাইরে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল। তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে এখন তীব্র অভিমান আর ক্ষোভ। শেরাজ তার এই পাথুরে নীরবতা সইতে পারল না। সে নিজের ক্লান্ত শরীরটা সিটে এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল, তারপর ড্রাইভিং সিটে থাকা আইয়ুবকে খুব গম্ভীর আর ভারাক্রান্ত গলায় আদেশ দিল,
“আইয়ুব, লাইটটা অফ করে দে!”
​আইয়ুব কোনো কথা না বাড়িয়ে লাইট বন্ধ করে দিল। মুহূর্তেই গাড়ির ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। আর সেই অন্ধকারের সুযোগেই শেরাজ যেন নিজের ভেতরের সবটুকু হাহাকার উগরে দিল। সে এক হ্যাঁচকা টানে সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল।
​সুমু প্রথমে বাধা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু শেরাজ যখন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে মুখটা ওর বুকের গভীর নিভৃতে গুঁজে দিল, তখন সুমুর সব কাঠিন্য মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। শেরাজের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস তার বোরকা ভেদ করে হৃদপিণ্ডে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। সুমু অনুভব করল, এই মানুষটা বাইরে যতটাই বজ্রকঠিন হোক না কেন, এই মুহূর্তে সে কেবল এক আশ্রয়হীন শিশুর মতো তার কাছে একটুখানি শান্তির জন্য হাহাকার করছে। শেরাজ কোনো কথা বলল না, শুধু সুমুর বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে নিজের সব ক্লান্তি আর পাপবোধকে ধুয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করল।
সুমুদের গাড়ি হাইওয়ে ছাড়তেই অপর টিমের রেসার বেরিয়ে এলো। সে অপলক সুমুদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“সুমু! সিয়িং ইউ আফটার আ লং টাইম, বেইবী। ইউ হ্যাভ বিকাম মাচ মোর বিউটিফুল দ্যান বিফোর। নারীর সৌন্দর্য বিধাতার এক অনন্য উপহার। সুন্দরী হওয়া অবশ্যই ভাগ্যের ব্যাপার, তবে সেই রূপ তখনই সার্থক যখন তা সম্মানের চাদরে ঢাকা থাকে। নারী সুন্দরী হওয়া ভালো। তবে এতটাও সুন্দরী হওয়া ভালো নয়, যতটা সুন্দর হলে ওই সৌন্দর্য-ই নারীর জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়।”


রাতের নিস্তব্ধতা তখন শেখবাড়ির প্রতিটি কোণে জেঁকে বসেছে। সুমু রুমে এসেই গায়ের বোরকাটা একপাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে গটগট করে ওয়াশরুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর সে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। শেরান আর সিমরান আজও ইনায়ার কাছে ঘুমানোর বায়না ধরেছিল, তাই ঘরটা আজও ফাঁকা।

সুমু লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে বিছানার একদম এক কোণে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ল। শেরাজ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ নিঃশব্দে সুমুর প্রতিটি গতিবিধি লক্ষ্য করছিল। সে নিজেও ফ্রেশ হয়ে এসে খুব সন্তর্পণে বিছানায় উঠল। তারপর সুমুর কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই পেছন থেকে ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল।

সুমু সাথে সাথে নিজেকে ছাড়াতে চাইল। সে ফিসফিস করে রাগী গলায় বলল,
“একদম ছোঁবেন না আমাকে! যান, গিয়ে মারামারি করুন। তারপর পুলিশ আপনাকে ধরুক।”

শেরাজ ওকে ছাড়ল না, বরং হাতের বাঁধন আরও কয়েক গুণ শক্ত করে সুমুর ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল,
“দিল কে জাজবাত লফজোন মে বায়ান নাহি হোতে,
জো রিশতে রূহ সে জুদে হো, উনহে আসান নাহি হোতে!
তেরে বিনা জিন্দাগি এক সুনা সা রাস্তা লাগতি হ্যায়,
অর তেরে সাথ হার মানজিল আসান লাগতি হ্যায়!”
সুমু আবারও নড়েচড়ে উঠে বলল,
“বলছি না, ছাড়ুন? আমি ভালোবাসিনা আপনাকে!”
​শেরাজ এবার এক চিলতে বাঁকা হাসল, যা অন্ধকারের কারণে সুমু দেখতে পেল না। সে সুমুর কানের লতিতে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“বাসতে হবে না। আমি বাসি তো। আমি একাই তোমাকে যেটুকু বাসি, তাতেই আমাদের সাত জন্ম কেটে যাবে। তুমি শুধু এভাবেই আমার পাশে থেকো, ব্যাস।”

সুমুর চোখে জল টলমল করে উঠল। সে জেদ ধরে বলল,
“আমি থাকব না আপনার সঙ্গে।”

শেরাজ ওর চুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে খুব শান্ত গলায় প্রশ্ন করল,
“তাহলে কার সঙ্গে থাকবে? কোথায় যাবে শুনি?”
​“জানি না!” সুমু ডুকরে কেঁদে উঠল।

শেরাজ তাকে এক ঝটকায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। অন্ধকারেও তার চোখ দুটো যেন জ্বলছে। সে সুমুর চোখের অশ্রু নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে পরম মমতায় মুছে দিয়ে বলল,
“আচ্ছা যেও, খুব দূরেই চলে যেও। তবে একটা শর্ত আছে।”
​সুমু ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিজ্ঞেস করল,
“কী শর্ত?”
​শেরাজ সুমুর ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে তপ্তস্বরে বলল,
“আমি তোমাকে ছেড়ে দেবার পর যেও। আর আমি যে তোমাকে এই জনমে কোনোদিন ছাড়ছি না, সেটা তো তুমি আমার চেয়েও ভালো জানো। তাই পালানোর স্বপ্নটা তোলা থাক।”
“এখন ভালোবাসা দেখাতে আসবেন না। ছাড়ুন আমাকে!”
শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“সুমু কি জিদ পে শেরাজ হামেশা হার জাতা হ্যায়,
উস্কে নাখরে দিখ কার ভি ও মুসকুরা জাতা হ্যায়!
দুনিয়া কে লিয়ে খান সাহেব সখত মিজাজ হ্যায়,
পার সুমু কে লিয়ে তো এক পেয়ারা বাচ্চা বান জাতা হ্যায়!”

খান সাহেব পর্ব ৯২ (২)

​সুমু আর কথা বলার ভাষা খুঁজে পেল না। শেরাজের এমন রাফ-অ্যান্ড-টাফ রোমান্টিকতার সামনে তার সব অভিমান যেন মুহূর্তেই বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ল। সে মুখ লুকিয়ে শেরাজের চওড়া বুকে নিজেকে সঁপে দিল।

খান সাহেব পর্ব ৯৪