খান সাহেব পর্ব ৯৪
সুমাইয়া জাহান
ভোরের আলো ফুটতেই বাড়িটা এক বিশাল মেলায় পরিণত হলো। ডাইনিং রুমের বিশাল কাঠের টেবিলে আজ তিল ধারণের জায়গা নেই। সুমি বেগম, হাসি বেগম আর রুমা বেগম মিলে সকালের নাস্তার আয়োজন করেছেন।
টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছেন মুরুব্বিরা। বৃদ্ধা মাজেরা বেগম আর আশাবানু বসে নাতি-নাতনিদের খাওয়া দেখছেন। শামীম সাহেব আর সাখাওয়াত সাহেব গম্ভীর আলোচনায় ব্যস্ত, পাশে মুস্তাক সিকদার আর সাহাবাজও খান যোগ দিয়েছেন। মাঝখানে এক ঝাক তরুণ-তরুণী আর তাদের কিচিরমিচির। শেহেজাদ খান, ইফতিয়াক সাহেব আর আনোয়ার সাহেব চুপচাপ বসে খাচ্ছেন।
আইয়ুব বরাবরের মতোই দুষ্টুমিতে ডাইনিং টেবিলের মধ্যমণি। তার পাশে নাজমিন শান্তভাবে নিশানকে খাওয়াচ্ছে। আইয়ুব রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল,
“কিরে এস.কে, কালকের সেই স্পিড কি এখনো মাথায় ঘুরছে? নাকি ভাবিজির ভয়ে সব নেটওয়ার্ক জ্যাম হয়ে গেল?”
শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। সে আড়চোখে দেখল সুমুকে। সুমু, সামিয়া আর ফারিয়ার সাথে প্লেট গোছাচ্ছে, কিন্তু শেরাজের দিকে একবারও তাকাচ্ছে না। পাশেই সিমরান বসে আছে মুখ ফুলিয়ে। তার কাছে পাপা এখন ‘পুচা’, কারণ তার পাপা তাকে না জানিয়ে কার রেস করতে গিয়েছিল। দুজনকেই একবার পরখ করে শেরাজ গলা পরিষ্কার করে বলল,
“সবার মনোযোগ আকর্ষণ করছি। বিশেষ করে আমার লিটল প্রিন্সেস সিমরানের।”
সিমরান মুখ ফিরিয়ে নিল। সারবাজ টিটকারি দিয়ে বলল,
“পচে গেছিস ভাই! মেয়েও তোকে পাত্তা দিচ্ছে না।”
শেরাজ ছোট একটা মখমলের বাক্স বের করে সিমরানের সামনে ধরল। সিমরান উঁকি দিয়ে দেখল ভেতরে ঝকঝকে একটা ছোট্ট পুতুলের সেট। শেরাজ খুব নরম গলায় বলল,
“মাম্মা, আমি তো তোমার জন্য উপহার আনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোমার জন্য আরও একটা গিফট আছে।”
সবাই চুপ হয়ে গেল। শেরাজ সুমুর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,
“কাল আমরা সবাই মিলে সাজেক ভ্যালি যাচ্ছি। আমাদের সব নিউ কাপলদের হানিমুন ট্রিপ, আর আমাদের এই বিশাল গ্যাং-এর জন্য গেট-টুগেদার।”
কথাটা শোনামাত্রই ডাইনিং রুমে যেন খুশির বোমা ফাটল। সামিয়া খুশিতে রাহিনের হাত চেপে ধরল। রাহিন মুচকি হেসে বলল,
“এস.কে যখন প্ল্যান করেছে, তখন না বলার উপায় নেই।”
আরবাজ আর শাহরুখ উচ্চস্বরে শিস দিয়ে উঠল। শাহরুখ পাশ থেকে ফারিয়াকে ইশারা করল প্যাক-আপ করতে। নিহাল, সাইফ, অমিত, রিসান, শাহরুখ, রিয়াজ, রিয়াদ, ফাহিম—এরা তো একপায়ে খাড়া। সাইফ চেঁচিয়ে বলল,
“পাহাড়েও রেসিং হবে নাকি বস?”
আইয়ুব পাশ থেকে একটা চামচ ছুড়ে মারল সাইফের দিকে। অন্যদিকে নাতাশা-স্যান্ডি আর পিয়াস-ইফতিয়ার চোখেমুখে লজ্জার আভা। আদনান চৌধুরী আর রুহি খাতুন হাসিমুখে ফিরোজার দিকে তাকালেন। ফিরোজাও বেশ এক্সসাইটেড। ফারিন আর তিশা খুশিতে প্রায় চিৎকার করে উঠল। রিয়াজ আর রাইফের মধ্যে এখনই শুরু হয়ে গেছে কোন গাড়িতে কে যাবে সেই পরিকল্পনা।
মিনা বেগম আর রুমা বেগমরা রান্নার ঝামেলা ভুলে ভ্রমণের গল্পে মেতে উঠলেন। বৃদ্ধা মাজেরা বেগম বললেন,
“যাও দাদুভাইরা, ঘুরে এসো। পাহাড়ের হাওয়া গায়ে লাগলে মনটা ভালো হবে।”
শেরাজ দেখল সিমরান এবার একটু গলেছে। সে পুতুলের সেটটা নিয়ে শেরাজের কোলে উঠে বসল। শেরাজ সিমরানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এখনো কি আমি পচা?”
সুমু সবার অলক্ষ্যে শেরাজকে একটা চোখ টিপ দিল। তার মনের সব মেঘ যেন সাজেকের পাহাড়ের হাতছানিতে কেটে গেছে। সে ফিসফিস করে পাশে বসা ইনায়াকে বলল,
“এইটা কিন্তু তোমাদের জন্যও হানিমুন। ভালো করে প্রস্তুত হও।”
বিকেলের মিঠে রোদটা তখন শেখবাড়ির বিশাল বারান্দায় এসে লুটিয়ে পড়েছে। কিন্তু বাড়ির ভেতরের দৃশ্যটা একদম আলাদা—পুরো বাড়ি যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র, তবে এই যুদ্ধ আনন্দের আর প্রস্তুতির। আগামীকাল ভোরেই যাত্রা, তাই সবার মাঝেই এক অন্যরকম উন্মাদনা। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল লাক্সারি ট্যুরিস্ট বাসটার কাচ রোদে ঝিকমিক করছে, যেন ওটাও অধীর আগ্রহে এই বিশাল বহরকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
শেরাজ আর সুমুর রুমে তখন সুটকেস গোছানোর পালা চলছে। সুমু আলমারি থেকে একের পর এক শাড়ি আর বাচ্চাদের ভারী কাপড় নামাচ্ছে। শেরাজ খাটে হেলান দিয়ে ল্যাপটপে রুটের ম্যাপ দেখছিল। সুমু একটা নীল রঙের জর্জেট শাড়ি হাতে নিয়ে বলল,
“এই শাড়িটা নাকি এই কালোটা নেব? পাহাড়ে কোনটায় ভালো লাগবে?”
শেরাজ ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হেসে বলল,
“নীলটা নাও। মেঘের দেশে আমার নীলপরীটাকে নীল শাড়িতেই বেশি মানাবে।”
সুমু লজ্জা পেয়ে শাড়িটা ব্যাগে ভরতে ভরতে বলল,
“যথেষ্ট হয়েছে, এখন উঠে বাচ্চাদের ব্যাগটা একটু গুছিয়ে দিন তো।”
ওদিকে আইয়ুব আর নাজমিনের রুমে চলছে মহা হট্টগোল। আইয়ুব তার ট্র্যাকসুট খুঁজে পাচ্ছে না। সে চেঁচিয়ে বলল,
“ব্রাউন গার্ল, আমার সেই স্পেশাল সানগ্লাসটা কোথায়? ওটা ছাড়া তো আমার চলবে না।”
নাজমিন শান্তভাবে নিশানকে সামলাতে সামলাতে বলল,
“চুপ করুন তো! খুঁজতে পারব না এখন। বাহির থেকে কাল একটা কিনে নিয়েন। নিশানের ব্যাগ গোছাতে আমার জান বেরিয়ে যাচ্ছে, আর আপনির পড়ে আছেন চশমার চিন্তা।”
নাতাশা-স্যান্ডি আর পিয়াস-ইফতিয়াদের অবস্থা একদম আলাদা। তাদের রুমে কথা কম, কিন্তু প্রস্তুতিতে কোনো খামতি নেই। প্রথমবার হানিমুনে যাচ্ছে, তাই একেকজন তিন-চারটা করে ট্রলি ব্যাগ রেডি করছে।
নিচে রান্নাঘরে অনন্যা খাতুন, সুমি বেগম, হাসি বেগম আর রুমা বেগমরা এক মহাযজ্ঞে নেমেছেন। কাল সারা রাস্তা খাওয়ার জন্য শুকনো খাবার বানানো হচ্ছে। অনন্যা খাতুন নাতি-নাতনীদের চিন্তায় অস্থির। তিনি কাজ করতে করতে হাসি বেগমকে বললেন,
“বাচ্চাগুলো সাথে যাচ্ছে, বাইরের খাবার তো সবসময় সইবে না। এই নাড়ু আর পিঠাগুলোও ব্যাগে ভরে দেই।”
বৃদ্ধা মাজেরা বেগম বারান্দায় বসে লাঠিতে ভর দিয়ে সব দেখছেন আর মুচকি হাসছেন। সাখাওয়াত সাহেব আর শামীম সাহেব বাসের ড্রাইভারের সাথে কথা বলে সব চেক করে নিচ্ছেন।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগে সবাই একবার ড্রয়িংরুমে জড়ো হলো। রাহিন-সামিয়া, আরবাজ-ইশিতা, সারবাজ-ইনায়া আর নয়ন-মাইশা মিলে সব প্ল্যান করছে।
রাহিন একটা লিস্ট নিয়ে বসে বলল,
“শোনো সবাই, বাসের পেছনের দিকটা হবে ব্যাচেলরদের আর সামনে কাপলরা।”
আইয়ুব পাশ থেকে টিটকারি দিয়ে বলল,
“আর আমাদের নিউ দুই কাপলদের কি বাসের ছাদে বসিয়ে দেব?”
তার কথা শুনে হাসির রোল পড়ে গেল পুরো ঘরে। ফারিন, তিশা, রাইশা আর রাইফরা মিলে গিটার আর ব্লুটুথ স্পিকার রেডি করছে। রিয়াজ আর আশিক মিলে বাসে কতগুলো চিপসের প্যাকেট আর কোল্ড ড্রিংকস উঠবে তার হিসাব মেলাচ্ছে। শেরাজ ডাইনিং টেবিলের এক কোণে দাঁড়িয়ে শান্ত চোখে এই বিশাল পরিবারটাকে দেখছে। কালকের সেই রক্তাক্ত হাতের অপরাধবোধ যেন এই মানুষগুলোর হাসিতে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। সুমু এসে শেরাজের পাশে দাঁড়াল।
“সব রেডি?” সুমু নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
শেরাজ সুমুর হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল,
“সব রেডি! কাল ভোরের আলো ফোটার আগেই আমরা মেঘ ধরতে বেরিয়ে পড়ব।”
•
ভোরের আকাশটা তখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। হালকা কুয়াশার চাদরে মোড়া শেখবাড়ির সামনে বিশাল টুরিস্ট বাসটা স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইঞ্জিনের মৃদু ঘরঘর শব্দ জানান দিচ্ছে— যাত্রার সময় হয়ে এসেছে। গেটের সামনে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পুরো পরিবারটা দাঁড়িয়ে আছে। বড়রা কেউ যাচ্ছেন না, কিন্তু তাদের দোয়া আর ভালোবাসার চাদরে মুড়ে দিতে সবাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জেগে আছেন। বাড়ির মুরুব্বিরা একপাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
সাহাবাজ খান আর শেহেজাদ খান ড্রাইভারের সাথে শেষবার কথা বলে নিলেন রাস্তার সতর্কতা নিয়ে। সাখাওয়াত সাহেব আর শামীম সাহেব শেরাজ আর আইয়ুবের কাঁধে হাত রেখে খুব নিচু স্বরে বললেন,
“যাও বাবা, সাবধানে থেকো। পাহাড়ের রাস্তা তো, বেপরোয়া গতির নেশা কোরো না যেন। এই বিশাল বহরের দায়িত্ব কিন্তু তোমাদের ওপর।”
অনন্যা খাতুন আর সুমি বেগম আঁচলে চোখের জল মুছতে মুছতে সবার হাতে হাতে খাবারের প্যাকেট আর পানির বোতল তুলে দিচ্ছেন। হাসি বেগম বললেন,
“আল্লাহ আমার সোনা মানিকদের সহিহ-সালামতে ফিরে আসার তৌফিক দিক।”
একদিকে যখন বিদায়ের করুণ সুর, অন্যদিকে তরুণদের মাঝে সাজেক জয়ের আনন্দ। শেরাজ শান্তভাবে সব তদারকি করছিল। সে একে একে আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান, সারবাজ, আরবাজ, রিয়াজ, নয়ন, রিফাত, আশিক, পিয়াস, সজীবদের বাসে উঠতে ইশারা করল। কাপলদের মাঝে অন্যরকম আনন্দ। নয়ন-মাইশা, পিয়াস-ইফতিয়া আর অজান্তা-রিফাত বড়দের সালাম করে বাসে উঠল। সামিয়া-রাহিন, নাজমিন-আইয়ুব আর ফারিয়া-শাহরুখরা বাচ্চাদের হাত ধরে বাসের সিটে বসিয়ে দিল।
বাসের পেছনের দিকটা দখল করেছে রিয়াজ, ফিরোজা, তিশা, রাইফ, রাইশা, আশিক আর ফারিন। তারা এখনই গিটার আর গানের সিডি নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করেছে। সবাই বাসে ওঠার পর শেরাজ আর সুমু শেষবার নিচে নামল। শেরাজ তার মা অনন্যা খাতুনের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“মম, চিন্তা কোরো না। ইনশাআল্লাহ সবাইকে ঠিকভাবে নিয়ে ফিরে আসব।”
অনন্যা খাতুন ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বললেন,
“আমার বাচ্চা, সাবধানে যাবি। আর আমার নাতি-নাতনির খেয়াল রাখবি।”
সাহাবাজ খান শেরাজের পিঠে চাপড় মেরে বললেন,
“সবসময় মাথা ঠাণ্ডা রাখবি, বেটা। আর পৌঁছে গিয়ে কল করবি।”
সুমু এগিয়ে গেল হাসি বেগম আর শামীম সাহেবের কাছে। হাসি বেগম মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন। শামীম সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করলেন। তাদের সাথে সাথে আফিয়া খাতুন-শেহেজাদ খান, রুহি খাতুন-আদনান চৌধুরী, মিনা বেগম-আনোয়ার সাহেব, খুশি বেগম-ইফতিয়াক সাহেব, মুস্তাক সিকদার-সুমি বেগম আর রুমা বেগম-আনোয়ার সাহেব—সবাই তাদের সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের কাছে ডাকলেন। গাড়ি থেকে আবারও সকলে নেমে এলো। বড়রা সকলে তাদের সন্তানদের কাছে টেনে নিয়ে আদর করলেন।
ছোট্ট সিমরান আর শেরান সাহাবাজ খানকে জড়িয়ে ধরল, সাহাবাজ সাহেব নিচু হয়ে ওদের কপালে চুমু খেলেন। তিনি পকেট থেকে চকলেট বের করে বাচ্চাদের হাতে দিয়ে বললেন,
“তোমরা কিন্তু একদম দুষ্টুমি করবে না। পাহাড়ে গিয়ে পাপা আর মাম্মার কথা শুনবে।”
ওদিকে বৃদ্ধা মাজেরা বেগম আর আশাবানু চেয়ারে বসে প্রত্যেকটি বাচ্চাকে পরম মমতায় কাছে ডাকলেন। নিশান, হাসফা, আয়াস, রুহি, আহিয়া আর নাহিয়ানকে সামনে বসিয়ে তারা সুরা পড়ে ফুঁ দিয়ে দিলেন। সাহাবাজ খান শেরাজের কাঁধে হাত রেখে খুব নিচু স্বরে বললেন,
“বেটা আবারও বলছি, তুই এখন এই পুরো বহরের অভিভাবক। বন্ধুদের সামলে রাখবি, আর নিজেও শান্ত থাকবি।”
শেরাজ হাসিমুখে বলল,
“ড্যাড, তোমাদের ছেলে কি আর ছোট আছে? অত চিন্তা করছ কেন? দেখো, সবাইকে নিয়ে হাসিমুখে ফিরব।”
অনন্যা খাতুন শেরাজের গালে হাত বুলিয়ে বললেন,
“তুই বড় হয়েছিস জানি, কিন্তু মায়ের কাছে তুই আজও সেই ছোট্ট শেরাজ।”
একে একে সবাই বড়দের থেকে দোয়া নিয়ে আবারও বাসে উঠে পড়ল। বাসের জানালা দিয়ে হাত নাড়ল সবাই। সুমু জানালা দিয়ে ওর মা-বাবার দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল। বাসটা যখন ধীরগতিতে গেট পার হতে শুরু করল, তখন মুরুব্বিরা সবাই একজোট হয়ে দোয়া করতে লাগলেন। খুশি বেগম, মিনা বেগম আর রুহি খাতুনরা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে যতক্ষণ বাসটা দেখা যায়, ততক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
•
বাসটা যখন আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ ধরে এগোচ্ছিল, দুপুরের তপ্ত রোদ তখন জানালার কাচ চিরে ভেতরে এসে পড়ছে। হঠাৎ রাস্তার এক বাঁকে ঘন বটগাছের নিচে একটা পুরনো সাদা মাজার আর তার পাশে ছোট্ট একটা মসজিদ চোখে পড়ল। জায়গাটা নিস্তব্ধ, কিন্তু এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে সেখানে।
শেরাজ হঠাৎ আইয়ুবকে ইশারা করল বাস থামাতে। আইয়ুব অবাক হয়ে বলল,
“কিরে দোস্ত, এই নির্জন মাজারের সামনে গাড়ি থামাচ্ছিস কেন? সাজেক পৌঁছাতে তো দেরি হয়ে যাবে।”
শেরাজ কোনো উত্তর না দিয়ে সুমুর হাতটা শক্ত করে ধরে বাস থেকে নেমে এলো। বাকি বন্ধু আর নিউ কাপলরা উৎসুক হয়ে জানালার কাচ দিয়ে তাকিয়ে আছে—কেউ কেউ কৌতূহলী হয়ে নিচে নেমে এলো।
মাজারের পাশে শ্বেতপাথরের চত্বরে গিয়ে শেরাজ সুমুর দিকে ঘুরে দাঁড়াল। সুমু অবাক হয়ে বলল,
“এখানে কেন নিয়ে এলেন? আর সবার সামনে এভাবে হাত ধরে আছেন কেন?”
শেরাজ সুমুর দুহাত নিজের মুঠোয় নিয়ে খুব গম্ভীর গলায় বলল,
“সুমু, প্রথমবার আমি তোমাকে ফোর্সফুলী বিয়ে করেছিলাম, দ্বিতীয়বার আমি তোমাকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেছিলাম, তৃতীয়বার তুমি আমাকে ফোর্সফুলী বিয়ে করেছিলে। আমাদের পথাচলা খুব দীর্ঘ। এই পথচলা আরও দীর্ঘ হোক। এখন আমরা বাচ্চাদের বাবা-মা হয়েছি। কিন্তু আজ এই পবিত্র জায়গায় দাঁড়িয়ে, এই নির্জনতায় আমি তোমাকে আবারও নিজের করে নিতে চাই। আজ কোনো লোকদেখানো আয়োজন নেই, শুধু আমি আর তুমি। আমি চাই আজ তুমি আবারও কবুল বলো, আর আমাদের বিয়ের সাক্ষী হয়ে এই পাহাড় আর আকাশ থাকুক।”
সুমু বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল,
“কী বলছেন আপনি? এখন? এই অবস্থায়? সবাই হাসবে তো!”
শেরাজ এক পা এগিয়ে এলো। সে জেদী স্বরে বলল,
“হাসুক! পৃথিবীর কে কী ভাবল তাতে এস.কে-র কোনোদিনও কিছু যায় আসেনি। আমি চাই স্রষ্টার সামনে দাঁড়িয়ে আবারও তোমার অঙ্গীকার নিতে। এই যে মাজারের খাদেম সাহেব বসে আছেন, উনি আমাদের আবার নিকাহ পড়াবেন।”
সুমু লজ্জা আর অস্বস্তিতে লাল হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু শেরাজের এই পাহাড়সম জোরাজুরির সামনে সে আজ অসহায়। শেরাজ যেন আজ এক অবুঝ কিশোরের মতো জেদ ধরেছে—সে সুমুকে নতুন করে জয় করবে।
বন্ধুরা সবাই ততক্ষণে চত্বরে এসে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইয়ুব শিস দিয়ে উঠল,
“সাবাস শেরাজা! তুই আসলেই প্রেমিক পুরুষ।”
রাহিন হাসতে হাসতে বলল,
“আজকের এই ডেটটা ইতিহাসে থাকবে—রোড ট্রিপে রিনিকাহ!”
খাদেম সাহেব মৃদু হেসে এগিয়ে এলেন। তিনি সুরা পড়ে মোনাজাত ধরলেন, তারপর শেরাজকে কবুল বলতে বললেন। শেরাজ খুব দৃঢ় স্বরে বলল, “কবুল!”
এবার সুমুর পালা। সুমুর ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। সেই প্রথমদিনের মতোই ভয় কাজ করছে তার মধ্যে। সে শেরাজের ওই প্রত্যাশা ভরা চোখের দিকে তাকাল—যে চোখে কেবল তার জন্যই পৃথিবী থেমে থাকে। সুমু খুব নিচু স্বরে বলল, “কবুল!”
চারপাশের সকলে ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ বলে উঠল। শেরাজ পকেট থেকে একটা নীল বুনো ফুল বের করল, যা সে আসার সময় কুড়িয়েছিল, তারপর সুমুর মাথায় হিজাবের ওপর সেটা পরম মমতায় গেঁথে দিয়ে ফিসফিস করে সুমুর কানে বলল,
“আজ থেকে তুমি শুধু আমার বউ নও, তুমি আমার আত্মার চতুর্থবার করা অঙ্গীকার। এবার আর পালানোর কোনো পথ নেই, সুইটহার্ট।”
সে সুমুর হাত দুটো নিজের হাতের তালুতে আগলে ধরে রাখা নয়, যেন আজন্মের জন্য বন্দি করে নিল। সুমুর ভেজা চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে শুরু করল,
“একজন পুরুষ ইচ্ছে করলে চারটি বিয়ে করতে পারে, সমাজ তাকে সেই অধিকার দিয়েছে। কিন্তু যে পুরুষ তার জীবনে আসা প্রথম নারীকে সত্যি ভালোবাসে, সে কেন জীবনে নতুন কাউকে আনবে? আমার জীবনে আসা একমাত্র নারীই আমার পুরো দুনিয়া। তাই, আমি আমার জীবনে আসা এই এক নারীকেই আজ চতুর্থবারের মতো বিয়ে করলাম।”
সে সুমুর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে তার অবয়বজুড়ে নিজের অধিকারের সীলমোহর এঁকে দিয়ে আবারও বলতে লাগল,
“প্রথমবার বিয়ে করেছিলাম! যখন সে আমার জীবনে নতুন সূর্যের মতো উদিত হলো— আমার ভালোবাসা হয়ে।
দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলাম! যখন সে আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন তার গর্ভে ধারণ করেছে। তখন আমি তাকে শুধু একজন নারী হিসেবে নয়, আমার সন্তানের জননী হিসেবে নতুন করে বরণ করেছিলাম।
তৃতীয়বার! যখন সে আমার দু-দুটি বাচ্চার মা। সেদিন আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, জীবন যতই বদলাক, আমি তাকে প্রতিদিন নতুন করে ভালোবাসবো, যেন প্রতিটি দিন আমাদের বিয়ের প্রথম দিনের মতো হয়। কারণ, আমার কাছে বিয়ে মানে শুধু কাগজের সই নয়। এটা এক পবিত্র প্রতিশ্রুতি, এক গভীর অনুভূতি আর ভালোবাসার এক আজীবন যাত্রা। আর এই দীর্ঘ যাত্রায় আমার সঙ্গী— কেবল সে, শুধুই সে।”
শেরাজ এবার সুমুর মুখটা দু’হাতে আগলে নিয়ে খুব তপ্ত স্বরে বলল,
“আর আজ এই চতুর্থবার! যখন সে শুধু আমার বউ বা আমার বাচ্চাদের মা নয়— বরং আমার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে যাওয়া এক নারী। আমার অস্তিত্বের সঙ্গী, আমার আত্মার শান্তি, আর আমার জান্নাতের দরজার চাবি।
আজকের এই বিয়েটা আমি আমাদের যৌবন শেষে বৃদ্ধ বয়সেও একসাথে থাকার প্রতিজ্ঞা হিসেবে করলাম। সময় যতই বদলাবে, বয়স যতই বাড়বে, আমার চোখে সে চিরকাল থাকবে সেই প্রথম প্রেমের মতো অমলিন। আমার এই চার নাম্বার বিয়ের আরও একটা শপথ— এই নশ্বর দুনিয়া থেকে জান্নাতের সিঁড়ি পর্যন্ত, আমার হাত শুধু তার হাতেই বন্দি থাকবে। আমাদের এই বন্ধন ছিন্ন করার সাধ্য কারো নেই।”
শেরাজের কথাগুলো শেষ হতেই সুমু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে কেঁদে উঠে শেরাজকে জড়িয়ে ধরল। উপস্থিত সকলের চোখেও তখন খুশি। আইয়ুব, রাহিন, সাইফরা যারা সারাক্ষণ হইহুল্লোড় করত, তারাও আজ শেরাজের এই পাগলামির মাঝে এক পবিত্র ভালোবাসার রূপ দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।
মাজারের এই গম্ভীর আর আবেগঘন পরিবেশটা কাটাতে আইয়ুবের বেশি সময় লাগল না। বাসটা আবার ছাড়তেই আইয়ুব মাঝপথে দাঁড়িয়ে একটা বিকট শিস দিয়ে উঠল। সাইফ আর নিহাল শেরাজের সিটের পাশে এসে দাঁড়াল। সাইফ ফোঁড়ন কেটে বলল,
“আচ্ছা এস.কে, চারটা বিয়ে তো একই মানুষকে করলি। এখন কি আমাদের চারবার করে ট্রিট দিবি? নাকি আগের এক বিয়ের ট্রিট-ই শেষ?”
শেরাজ সুমুকে নিজের বাহুডোরে আগলে রেখে একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল,
“সাজেক গিয়ে আজ রাতে বারবিকিউ পার্টি হবে, সব আমার পক্ষ থেকে।”
বাসের হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে সবচেয়ে বিপাকে পড়ল সিমরান আর শেরান। ওরা এতক্ষণ বড়দের কর্মকাণ্ড বড় বড় চোখে দেখছিল। সিমরান তার ছোট ব্যাগ থেকে একটা চিপসের প্যাকেট বের করতে করতে সুমুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মাম্মা, পাপা তেন তোমাতে আবাল বিয়ে তননো? তোমনা তি আগে বিয়ে তনোনি? তিন্তু তুমি আল পাপা’তো তিতুদিন আগেও বিয়ে তললে।”
সুমু লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল। সে কী উত্তর দেবে ভেবে পাওয়ার আগেই পাশে বসা শেরান গম্ভীর মুখে বলল,
“তোমলা তি আবালও বিয়ে তলবে?”
ওদের প্রশ্ন শুনে রাহিন আর রিয়াদ হাসতে হাসতে সিট থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। আইয়ুব হাসতে হাসতে হাসতে বলল,
“না বেটা! তোমার পাপা আর বিয়ে করবে না।”
ওদিকে বাসের পেছনে রিয়াজ, রাইফ আর আশিকরা গিটার বের করে ফেলেছে। তারা এখন গান শুরু করবে। সারবাজ মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ঘোষণা করল,
“শোনেন সবাই! আমাদের এস.কে আজকে চার নাম্বার বিয়া করেছে। সেই খুশিতে আমরা এখন একটা স্পেশাল গান গাইব। এই গানটা ডেডিকেটেড টু দ্য ওয়ান অ্যান্ড অনলি ‘লাভ কিং’!”
বলতে বলতেই গান শুরু হলো। পুরো বাস তখন গানের তালে দুলছে। নয়ন-মাইশা আর পিয়াস-ইফতিয়ারাও তাল মেলাচ্ছে। সুমু জানালার বাইরে তাকিয়ে মেঘের লুকোচুরি দেখছিল আর মনে মনে ভাবছিল—এই মানুষটা সত্যিই পাগল। এক জীবনে তাকে কতবার যে নতুন করে প্রেমে ফেলবে তার কোনো হিসাব নেই।
শেরাজ সুমুর কানে ফিসফিস করে বলল,
“বাচ্চাদের তখনের করা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে? নাকি আমি সাহায্য করব?”
সুমু শেরাজের হাতে একটা চিমটি কেটে বলল,
“চুপ করুন তো! আপনার এই সব পাগলামির জন্য আমি বাচ্চাদের কাছে মুখ দেখাতে পারি না।”
শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,
“শুনে মেরি জান!”
সুমু রাগী স্বরে বলল,
“কন জান? ম্যায় কিসি কি জান নেহি হুঁ।”
“ আচ্ছা ঠিক হ্যায় মেরা বাচ্চা!”
“বাচ্চা ভি নেহি হুঁ…”
“ওকে বেগম সাহেবা!”
“ইয়ার আপ খুদকো সমাজতে কেয়া হ্যায়?”
“আপকা শোহর!”
“হাদ্দ হ্যায় ইয়ার আপসে তো…”
“ও মোহাব্বত হি ক্যাসি… জিসমে হাদে পার না হোঁ!”
সুমু বুঝল বাচ্চাদের সামনে এই লোকটা চুপ করবে না, তাই সে নিজেই চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে বলল,
“ ইনস্টাগ্রামের রিলস দেখে দেখে আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তাই সবসময় ওসব রিলসের ভিডিওর মতো কথা বলেন, আর আপনার সাথে সাথে ভুল করে আমিও ওসব বলে ফেলি।”
শেরাজ হেসে উঠল। বাসটা যখন সাজেকের মেঘ ঘেরা পাহাড়ের চড়াই-উৎরাই পার করছে, তখন বাসের ভেতরে বইছে এক আনন্দের প্লাবন। বড়দের দোয়া আর ছোটদের অবুঝ ভালোবাসা নিয়ে ‘পুরো টিম’ এখন মেঘের দেশের দোরগোড়ায়।
বাসটা তখন সাজেকের খাড়া পাহাড়ী পথ বেয়ে মেঘের রাজ্যের দিকে উঠছে। জানালার বাইরে তুলোর মতো সাদা মেঘের আনাগোনা। শেরাজ সুমুর কাঁধে হাত রেখে জানালার বাইরের দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে ছিল। সুমুর চেহারায় বিকেলের রোদে অপার্থিব স্নিগ্ধতা ফুটে উঠেছে। শেরাজ মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে খুব নিচু গলায় বলল,
“মাঝে মাঝে ভাবি, আমি বোধহয় ছোটবেলায় অনেক পুণ্য করেছিলাম, সুইটহার্ট। নইলে তোমার মতো এত মায়াবী আর সুন্দর একটা বউ আমি আমার ভাগ্যে পেতাম না। আই অ্যাম রিয়েলি সো লাকি!”
শেরাজের কথা শুনে সুমু লাজুক হাসল। সিমরান আর শেরান কোলের মধ্যে থেকে তাদের মাম্মা আর পাপার দিকে চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে। শেরান এতক্ষণ খুব মন দিয়ে পাপার কথাগুলো শুনল। সে চট করে বলে উঠল,
“পাপা, তুমি এতা নাতি হবে তেন? আমিও নাতি হতে চাই!”
শেরাজ আর সুমু দুজনেই অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকাল। শেরাজ হেসে বলল,
“তুমিও লাকি হতে চাও? তা কীভাবে, মাই চ্যাম্প?”
শেরান আবদারের সুরে বলল,
“পাপা, তুমি যেহেতু মাম্মাতে পেয়ে অনেত নাতি হয়েত, তাহনে আমাতেও ঠিত মাম্মান মতো তিউত এততা বউ এনে দাও।”
এইটুকু ছেলের মুখে ‘বউ এনে দেওয়ার’ কথা শুনে পুরো বাসে হাসির বোমা ফাটল। আইয়ুব সিট থেকে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে বলল,
“বাপের চাইতেও বড় রোমিও দেখি ঘরেই তৈরি হচ্ছে। এই ছেলে তো বাপের থেকে কম যায়না।”
রাহিন হাসতে হাসতে বলল,
“শেরান বেটা, মাম্মার মতো বউ পেতে গেলে তো পাপার মতো এতগুলো ‘কবুল’ বলতে হবে। তুমি পারবে তো?”
শেরান কাঁচুমাচু মুখ করে বলল,
“আমি অনেত তবুল বলতে পালব। পাপা, পিনিজ এনে দাও।”
সুমু ছেলের গাল টেনে দিয়ে বলল,
“পাজি ছেলে! আগে বড় হও, পড়াশোনা করো।”
শেরান নাছোড়বান্দা, সে মুখ ফুলিয়ে রাখল। সুমু শেরাজের দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“সব আপনার দোষ। আপনার জন্য এসব শিখেছে। আরও করুন ছেলেমেয়ের সামনে এসব।”
শেরাজ ছেলের মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
“ঠিক আছে বেটা, তুমিও লাকি হবে। তবে এখন নয়, আরও অনেক পরে। যেদিন তুমি তবুল থেকে স্পষ্ট করে কবুল বলতে পারবে, সেদিন তোমার জন্য একটা বউ এনে দিব।”
সিমরান পাশ থেকে মেকি রাগ দেখিয়ে বলল,
“শেরান তুমি পুচা! আমি তিন্তু তোমাল বউতে এতদম চতনেট দেব না।”
বিকেলের পড়ন্ত রোদ যখন সাজেকের পাহাড়গুলোর গায়ে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে, ঠিক তখনই ধুলো উড়িয়ে বাসটা এসে থামল পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত অপূর্ব এক রিসোর্টের সামনে। বাস থেকে নামতেই এক ঝাপটা হিমেল হাওয়া আর তুলোর মতো মেঘ এসে সবাইকে স্বাগত জানাল। পাহাড়ের একদম কিনারে অবস্থিত কাঠ আর বাঁশের কারুকাজে তৈরি এই কটেজগুলো দেখতে ঠিক যেন ছবির মতো।
রিসোর্টের লবিতে দাঁড়িয়ে শেরাজ আর আইয়ুব রুমের চাবিগুলো বুঝে নিতে লাগল। শেরাজ আগে থেকেই সব নিখুঁতভাবে বুকিং দিয়ে রেখেছিল। সে চাবিগুলো হাতে নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করল,
“শোনো সবাই, সবার জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। দম্পতিদের জন্য একদম ভিউ সাইডের আলাদা রুম, যাতে জানালা খুললেই মেঘের দেখা পাওয়া যায়। আর আমাদের বিশাল ব্যাচেলর আর্মির জন্য একটু স্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্ট।”
একে একে চাবি বিলি শুরু হলো। শেরাজ-সুমু, রাহিন-সামিয়া, নাজমিন-আইয়ুব, ফারিয়া-শাহরুখ, সারবাজ-ইনায়া, আরবাজ-ইশিতা, নয়ন-মাইশা আর রিফাত-অজান্তা— সবাই তাদের নিজস্ব রুমের চাবি বুঝে নিল।
সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস ছিল নিউ কাপলদের মধ্যে। স্যান্ডি-নাতাশা আর ইফতিয়া-পিয়াস তাদের রুমের চাবি হাতে পেতেই লাজুক হাসিতে একে অপরের দিকে তাকাল। বিশেষ করে পিয়াস চাবিটা ইফতিয়ার হাতে দিয়ে কানে কানে বলল,
“এই মেঘের দেশে আমাদের গল্পের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।”
এবার শুরু হলো ব্যাচেলরদের নিয়ে হুল্লোড়। ছেলেদের জন্য তিনটা বড় রুম নেওয়া হয়েছে। নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম, রিসান, রিয়াজ, আশিক, রাইফ, সজীব, শাহরুখ—এরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে তিনটি বড় রুম দখল করল। মেয়েদের জন্য দুটো রুম নেওয়া হয়েছে। ফিরোজা, তিশা, রাইশা, আর ফারিন—এরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে দুটো সুন্দর রুমে উঠল। মেয়েরা রুমে ঢুকেই শুরু করে দিল ব্যাগ থেকে তাদের সাজগোজের সরঞ্জাম বের করার কাজ। পাহাড়ি ভিউতে কে আগে ছবি তুলবে তা নিয়ে তিশা আর রাইশার মধ্যে ঝগড়াও শুরু হয়ে গেল।
বাচ্চারা কেউ এই মুহুর্তে রুমে থাকতে রাজি নয়। সিমরান, শেরান, আহিয়া, নিশান, রুহি, হাসফা, আয়াস আর নাহিয়ান সবাই মিলে কটেজের লম্বা বারান্দায় দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল।
শেরাজ আর সুমু যখন তাদের রুমে ঢুকল, সুমু বিস্ময়ে থমকে গেল। পুরো রুমটা কাচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা, যেখান দিয়ে সাজেকের পাহাড়ী উপত্যকা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বিছানায় লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে একটা ছোট অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে। শেরাজ পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে জানালার দিকে ইশারা করে বলল,
“পছন্দ হয়েছে, সুইটহার্ট?”
সুমু শেরাজের বুকে মাথা রেখে শান্তভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সারা পথের ক্লান্তি যেন এই এক চিলতে পাহাড়ি শান্তিতে নিমিষেই ধুয়ে গেল। সে নিচু স্বরে বলল,
“আপনার পাগলামিগুলো মাঝে মাঝে সত্যি খুব ভালো লাগে।”
শেরাজ সুমুর কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“এটা তো কেবল শুরু। জলদি ফ্রেশ হয়ে নাও, সবাই বাইরে অপেক্ষা করছে। পাহাড়ের এই সূর্যাস্তটা মিস করা যাবে না।”
সাজেকের বিকেলটা যেন কোনো এক নিপুণ শিল্পীর আঁকা জলরঙের ছবি। আকাশটা আবির রাঙা হয়ে উঠেছে, আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সাদা মেঘেরা একে অপরের সাথে লুকোচুরি খেলছে। কটেজে চেক-ইন করার পর সবাই দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়ল হ্যালিপ্যাডের দিকে— যেখান থেকে সূর্যাস্তটা সবচেয়ে সুন্দর দেখায়।
বিশাল এক কাফেলা যখন হ্যালিপ্যাডে পৌঁছাল, তখন চারপাশের পর্যটকরাও একবার থমকে তাকাল। এতগুলো মানুষ, এতগুলো দম্পতি আর একঝাঁক বাচ্চার কলকাকলিতে নির্জন পাহাড় যেন প্রাণ ফিরে পেল। সারবাজ তার প্রফেশনাল ক্যামেরাটা বের করে ঘাড়ে ঝুলিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
“অ্যাটেনশন প্লিজ! সবাই জোড়ায় জোড়ায় পজিশন নাও।”
সবাই একে একে কাপল ছবি তুলল। নাজমিন এরই মাঝে আইয়ুবকে ধমক দিল,
“আগে নিশানকে ধরুন, ও তো মেঘের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে খাদের কাছে চলে যাচ্ছে।”
বউয়ের হুকুমে আইয়ুব দৌড়ে গিয়ে বাচ্চাদের নিজেদের কাছে নিয়ে এলো। অপরদিকে, পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে রাহিন আর সামিয়া একান্তে কিছু কথা বলছিল। সামিয়া ওর গায়ের শালটা টেনে নিতেই রাহিন পরম মমতায় সামিয়ার কাঁধ জড়িয়ে ধরল।
অন্যদিকে নিউ কাপলদের অবস্থা ছিল দেখার মতো। পিয়াস আর ইফতিয়া হাত ধরাধরি করে সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে ছিল। পিয়াস হঠাৎ পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে ইফতিয়ার হাতে দিল। ইফতিয়া আলতো হেসে পিয়াসের দিকে মনোমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। এতো তাড়াতাড়ি হয়তো ভালোবাসা হবেনা, তবে পিয়াসের চেষ্টা দেখে ইফতিয়া স্বস্তি পেল।
নয়ন আর মাইশা সেলফি তুলতে ব্যস্ত, আর অজান্তা-রিফাত পাহাড়ের ঢালে বসে গল্প করছে। স্যান্ডিও নাতাশাকে নিয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে আলাদা সময় কাটাচ্ছে। সারবাজ, ইনায়ার পার্সোনাল ফটোগ্রাফার হিসাবে বউয়ের ছবি তুলতে ব্যস্ত। শাহরুখ আর ফারিয়াও নিজেদের মধ্যে আলাদা হয়ে গেছে। ইশিতা আর আরবাজ পাহাড়ের কিনারে গিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছে।
সবার থেকে কিছুটা দূরে এক শান্ত জায়গায় শেরাজ আর সুমু দাঁড়িয়ে আছে। শেরাজ সুমুর পেছনে এসে কোমর জড়িয়ে ধরে উপত্যকার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“জানো সুইটহার্ট, পাহাড়ের এই বিশালতা আর মেঘের এই অস্থিরতা—দুটোই আমার তোমার প্রতি ভালোবাসার মতো। একটা স্থির, অন্যটা পাগলামিতে ভরা।”
সুমু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেরাজের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। সে নরম সুরে বলল,
“মাঝে মাঝে ভয় লাগে। এত সুখ সইবে তো?”
শেরাজ সুমুকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ওর চোখের গভীরে তাকিয়ে বলল,
“যতক্ষণ আমি আছি, কোনো ভয়কে তোমার ছায়া মাড়াতে দেব না। এই মেঘেরা সাক্ষী, আমি তোমাকে আজীবনের জন্য আগলে রাখব।”
বাচ্চারা তখন হ্যালিপ্যাডের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। সিমরান আর রুহি মিলে একটা ছোট পাথর নিয়ে সেটাকে ‘পাহাড়ি হিরে’ বানিয়ে খেলা করছে। শেরান আর নিশান মিলে বাজি ধরেছে কে আগে দৌড়াতে নিশানা পাড় করতে পারে।
ওদিকে ব্যাচেলর আর্মি—সজীব, নিহাল, সাইফ, রিয়াদ আর রিয়াজরা মিলে শুরু করে দিল গানের আসর। আশিক আর রাইফ গিটারের তারে টুংটাং আওয়াজ তুলছে। ফারিন, ফিরোজা, তিশা আর রাইশারা মিলে ক্যান্ডিড ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় মেতেছে।
সূর্যটা যখন ধীরে ধীরে মিজোরামের পাহাড়ের ওপাশে ডুবে যাচ্ছিল, চারপাশটা অপার্থিব কমলা আলোয় ভরে উঠল। সারবাজ সেই মুহূর্তে ক্লিক করে সবার এক একটা গ্রুপ ছবি তুলে নিল। আঁধার নামতেই পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট কটেজের আলোগুলো জোনাকির মতো জ্বলে উঠল। পাহাড়ের শীতল বাতাস আরও তীক্ষ্ণ হতে শুরু করল। শেরাজ ঘোষণা করল,
“অনেক হলো ছবি তোলা, এবার পেটে দানাপানি দরকার। কটেজের রুফটপে বারবিকিউ সেট করা হয়েছে। সবাই দ্রুত চলো!”
আইয়ুব যাওয়ার আগে লাস্ট একটা শট নিল। সারবাজও আরও কিছু ছবি তুলে নিল। কটেজের বিশাল রুফটপে বারবিকিউর কয়লাগুলো লাল হয়ে জ্বলছে, আর তার চটচট শব্দ পাহাড়ি শীতল বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে। চারদিকে পাহাড়ের ঢালে জোনাকির মতো জ্বলে ওঠা আলো আর মাথার ওপর মেঘেদের আনাগোনা। আগুনের কুণ্ডলীকে ঘিরে গোল হয়ে বসেছে সবাই। আইয়ুব এপ্রন পরে শেফ সেজেছে, সাথে সহকারী হিসেবে আছে নিহাল, সাইফ আর অমিত। আইয়ুব চিকেন লেগ পিসে মশলা মাখাতে মাখাতে চিৎকার করে বলল,
“নিহাল, কয়লা আরও দে!।”
শেরাজ একপাশে একটা আরামকেদারায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করছে। তার পাশে সুমু শাল জড়িয়ে বসে গভীর চোখে আগুনের লেলিহান শিখা দেখছে। রাহিন আর সামিয়া এক কোণে বসে হাসাহাসি করছে, আর নাজমিন আইয়ুবের রান্নার তদারকি করছে। সারবাজ-ইনায়া, আরবাজ-ইশিতা আর ফারিয়া-শাহরুখরা গল্পের আসর বসিয়েছে।
সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হলো দুই নতুন দম্পতিদের নিয়ে। পিয়াস আর ইফতিয়া আগুনের পাশেই বসেছে, পিয়াস বারবার ইফতিয়ার হাতের ওপর হাত রেখে ওকে ওম দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে স্যান্ডি আর নাতাশা একটু দূরে পাহাড়ের রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তাদের নীরব রোমান্স দেখে রিয়াদ আর ফাহিম শিস দিয়ে উঠল। অজান্তা আর রিফাত তখন নিজেদের নিয়ে আলাদাভাবে ব্যস্ত। নয়ন আর মাইশা মোবাইল হাতে সবার ক্যান্ডিড মোমেন্ট ক্যাপচার করছে।
এক কোণে বাচ্চাদের আসর জমেছে। ছোট্ট সিমরান আজকেও সবার মধ্যমণি। আয়াস আর নাহিয়ান দুজনেই সিমরানের সাথে বন্ধুত্ব করার জন্য মরিয়া। আয়াস তার পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে সিমরানকে দিয়ে বলল,
“সিমরান, এটা নাও। আমরা কি এখন ফ্রেন্ড হতে পারি?”
পাশ থেকে নাহিয়ান একটা ছোট লাল পাথর সিমরানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“না! আমার এই ম্যাজিক স্টোন নাও। আমরা কি বেস্ট ফ্রেন্ড হতে পারি?”
সিমরান ভ্রু কুঁচকে দুজনকে দেখে বলল,
“তোমলা দুজনেই পুচা। প্রথম দিন থেথেই আমাতে জ্বানাচ্ছ। এমন তনতে থাতলে, আমি তোমাদেল দুজনতেই মেলে বানিচাপা দিয়ে দিব।”
অন্যদিকে আশিক আর ফারিনের ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। আশিক ফারিনের প্লেট থেকে একটা কাবাব তুলে নিয়ে বলল,
“দিন দিন তো মুটকি হচ্ছিস। এত খাই খাই কেন তোর?”
ফারিন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আমার প্লেটে হাত দিবে না একদম। আমার যত ইচ্ছা খাব, তাতে তোমার কি?”
আশিক ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ভালো কথা বললাম সহ্য হলো না। একবারও ভেবেছিস, তুই মুটকি হয়ে গেলে তোর জন্য বর খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা? মুটকি মেয়েদের কেউ বিয়ে করতে চায়না, জানিস না?”
দুজনের ঝগড়া শুনে সজীব ধমক দিয়ে বলল,
“চুপ করবি তোরা? একটু শান্তি দে।”
একটু দূরে চুপচাপ বসে আছে রিয়াজ। তার দৃষ্টি আড়ালে বারবার গিয়ে থমকে যাচ্ছে ফিরোজার ওপর। ফিরোজা যখন হাসিমুখে তিশা আর রাইশার সাথে কথা বলছে, রিয়াজের চোখে তখন এক না বলা আকুলতা। শেরাজ দূর থেকে ছোট ভাইয়ের এই পরিবর্তনটা খেয়াল করে মুচকি হাসল। এরই মধ্যে শাহরুখ, রাইফ আর তিশারা মিলে গিটার বের করে গানের প্রস্তুতি নিল।
হঠাৎ গিটারের তারে টান পড়ল। সবাই মিলে সমস্বরে গাইতে শুরু করল। আগুনের তাপে সবার মুখগুলো লালচে হয়ে আছে। শেরাজ সুমুর হাতটা আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। সুমু শেরাজের কাঁধে মাথা রেখে বিড়বিড় করে বলল,
“এই রাতটা যদি কোনোদিন শেষ না হতো।”
শেরাজ সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমাদের রাত তো কেবল শুরু হলো, সুইটহার্ট। এই পাহাড়, এই মেঘ—সবই তো তোমার আর আমার ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে থাকবে আজীবন।”
•
ভোরের সাজেক যেন এক নির্জনতা। ঘড়িতে তখন ৪টা বেজে ৪৫ মিনিট। বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আর কুয়াশার চাদরে ঢাকা অন্ধকার। কিন্তু কটেজের প্রতিটি রুমে তখন জাগরণের তোড়জোড়। কারণ, সবাই জানে সাজেকের আসল জাদু লুকিয়ে আছে এই ভোরের সূর্যোদয় আর মেঘের সমুদ্রের মাঝে।
শেরাজ সুমুর কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে ঘুম ভাঙাল, কিন্তু সুমু ঘুমের ঘোরে শেরাজের বুকে মুখ লুকাল। শেরাজ ফিসফিস করে বলল,
“উঠো সুইটহার্ট, মেঘেরা আমাদের ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছে। এই দৃশ্য মিস করলে সারাজীবন আফসোস করবে।”
সুমু আলতো হেসে উঠে বসল। বেড থেকে নেমে জানালার পর্দা সরাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। কাচের ওপাশে কোনো আকাশ নেই, পাহাড় নেই—পুরো পৃথিবীটা যেন এক বিশাল তুলোর সাগরে তলিয়ে গেছে।
সবার আগে সারবাজ তার বিশাল ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে এলো। তার পেছনে ঘুমচোখে ইনায়া। একটু পরেই আইয়ুব আর নাজমিন বের হয়ে এলো। আইয়ুব সামনে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“এটা কী দেখছি? আমি কি স্বপ্নের দেশে চলে এলাম নাকি।”
একে একে সবাই রিসোর্টের বিশাল বারান্দায় জড়ো হলো। রাহিন-সামিয়া, ফারিয়া-শাহরুখ, নয়ন-মাইশা, রিফাত-অজান্তা আর আরবাজ-ইশিতারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে এই অপার্থিব দৃশ্য দেখছে। পাহাড়ের চূড়াগুলো এখন একেকটা দ্বীপের মতো ভেসে আছে মেঘের সাগরে।
নিউ কাপলদের জন্য এই ভোরটা ছিল আজন্মের এক প্রাপ্তি। পিয়াস আর ইফতিয়া এক কোণে দাঁড়িয়ে ভোরের প্রথম আলোয় নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখছে। স্যান্ডি আর নাতাশা একদম নিশ্চুপ। হঠাৎ স্যান্ডি নাতাশার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“এই মেঘের মতোই আমাদের ভালোবাসাটাও সারা জীবন এমন পবিত্র থাকুক।”
বাচ্চারা তো রীতিমতো পাগল হয়ে গেছে। সিমরান হাত বাড়িয়ে মেঘ ধরার চেষ্টা করছে। শেরান পাশ থেকে জ্ঞানীর মতো বলল,
“সিমনান, মেঘ ধনা দায় না। ওগুনো তো ধোঁয়া!”
ঠিক সেই মুহূর্তে নাহিয়ান আর আয়াস আবার সিমরানের কাছে এসে হাজির। নাহিয়ান বলল,
“সিমরান, দেখো আমি মেঘের ওপর দাঁড়িয়ে আছি!”
আয়াসও দমে যাওয়ার পাত্র নয়, সে বলল,
“সিমরান, আমি তোমাকে মেঘ এনে দিব!”
সিমরান দুই ছেলের পাগলামি দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। শেরান কোমরে হাত রেখে বলল,
“সিমনান তোমাদেল মতো বোতা না।”
একটু দূরে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রিয়াজ, শাহরুখ আর ফিরোজা। ভোরের হিমেল হাওয়ায় ফিরোজা একটু কাঁপছে। রিয়াজ কোনো কথা না বলে নিজের গায়ের শালটা খুলে ফিরোজার কাঁধে জড়িয়ে দিল। ফিরোজা অবাক হয়ে তাকাতেই রিয়াজ চোখ সরিয়ে নিল। শাহরুখ ওদের দুজনের কাণ্ড দেখে আলতো হেসে সজীবদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে জানে রিয়াজের ফিরোজার প্রতি একটা অদ্ভুত টান আছে। হয়তো ছোট থেকেই একসাথে থাকতে থাকতে এই অদ্ভুত টানের জন্ম হয়েছে।
আশিক আর ফারিন আজও ঝগড়া করতে চেয়েছিল, কিন্তু মেঘের এই সৌন্দর্য দেখে আশিক চুপ করে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“আজ তোকে দেখতে খারাপ লাগছে বলব না, সত্যি বলতে এই মেঘের সাথে তোকে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে।”
সবার অলক্ষ্যে শেরাজ সুমুকে নিয়ে কটেজের একদম পেছনের একটা নিরিবিলি স্পটে চলে এলো। সেখানে মেঘেরা একদম পায়ের নিচে এসে লুটোপুটি খাচ্ছে। শেরাজ সুমুকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। সুমু দুহাত প্রসারিত করে মেঘ ছুঁতে চাইল। সে আবিষ্ট হয়ে বলল,
“মনে হচ্ছে আমরা পৃথিবীর বাইরে অন্য কোথাও চলে এসেছি। এখানে কোনো রক্ত নেই, কোনো রেসিং নেই, কোনো ডার্কনেস নেই। আছে শুধু এই শুভ্র শান্তি।”
শেরাজ সুমুর ঘাড়ে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
“এই শান্তিটুকুর জন্যই তো তোমাকে এখানে আনা। দুনিয়ার সব অন্ধকার থেকে আড়াল করে আমি তোমাকে এই মেঘের দুর্গে সারাজীবন লুকিয়ে রাখব।”
সুমু মিষ্টি করে হাসল। শেরাজ রেলিংয়ে হেলান দিয়ে নিচের গভীর খাদের দিকে তাকাল। সুমু ওর একদম পাশে এসে দাঁড়াল। পাহাড়ের শীতল বাতাস সুমুর অবিন্যস্ত চুলগুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছে। হুট করেই সুমু একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসল, যে প্রশ্নে কোনো যুক্তি নেই। সে শেরাজের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আমি যদি আপনাকে এখন এই পাহাড় থেকে সজোরে একটা ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দেই? তাহলে আপনি আমার সম্পর্কে কী ভাববেন? নিশ্চয়ই বিশ্বাসঘাতক?”
শেরাজ চমকালো না। তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত প্রশান্তির হাসিটা ফুটে উঠল। সে সুমুর এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে খুব ধীরস্থির স্বরে বলল,
“তাহলে আমি বুঝে নেব, তুমি আমাকে ইচ্ছে করে ফেলোনি, সুইটহার্ট। হয়তো তুমি নিজে হোঁচট খেয়েছিলে, আর আমাকে শক্ত করে ধরতে গিয়েছিলে। আমিই হয়তো সেই তাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে গিয়েছি। তবুও আমি বিশ্বাস করব না, যে তুমি আমাকে ধাক্কা দিয়েছ।”
সুমু দমল না। সে যেন আজ শেরাজের বিশ্বাসের শেষ সীমানাটা মেপে দেখতে চায়। সে আরও কিছুটা রুক্ষ স্বরে বলল,
“ধরুন আপনি পড়লেন না। কোনোভাবে পাহাড়ের একটা পাথর বা গাছ ধরে ঝুলে রইলেন। আমি আপনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর আমি নিজে আপনার সেই হাতটা পাথর থেকে ছাড়িয়ে দিলাম। তখন? তখন তো আপনি নিশ্চিত জানবেন যে আমিই আপনাকে মেরে ফেলতে চেয়েছি?”
শেরাজ এবার এক পলক পাহাড়ের গভীর খাদের দিকে তাকাল, তারপর সুমুর বিষণ্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে খুব মৃদু গলায় বলল,
“না সুইটহার্ট, তবুও আমি তা ভাবব না। আমি তখন শেষবারের মতো চোখ বন্ধ করার আগে এই ভেবে শান্তিতে মরব যে—তুমি আমাকে বাঁচানোর জন্যই হাত বাড়িয়েছিলে, কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুরতায় আমাদের হাতটা ফসকে গেছে। আমি বিশ্বাস করব, তুমি আমায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আগলে রাখতে চেয়েছিলে, কিন্তু আমাদের হাতের বাঁধনটা আলগা হয়ে গিয়েছিল।”
শেরাজের এই নিঃশর্ত বিশ্বাস আর অন্ধ ভালোবাসার কথা শুনে সুমুর ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শেরাজকে। শেরাজও তাকে নিজের দুহাতের বলয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। সুমু খুব আদুরে আর নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি আমাকে অনেক ভালোবাসেন, তাই না?”
শেরাজ গলায় পাল্টা প্রশ্ন করল,
“কেন? কোনো সন্দেহ আছে?”
সুমু একটু ঠোঁট উল্টে অভিমানী গলায় বলল,
“আপনার এই ঘুরিয়ে প্রশ্ন করার স্বভাবটা কি কোনোদিনও যাবে না? সরাসরি উত্তর দিতে পারেন না?”
শেরাজ সুমুর দিকে তার সেই তীক্ষ্ণ আর সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকাল—যে চাউনিতে সুমু বরাবরই খেই হারিয়ে ফেলে। শেরাজ সুমুর নাকটা আলতো করে টেনে দিয়ে বলল,
“তুমিও কিন্তু সেই একইভাবে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলে, সুইটহার্ট।”
সুমু হার মানার পাত্রী নয়। সে শেরাজের শার্টের কলারটা ছোট বাচ্চার মতো খামচে ধরে জেদ মেশানো গলায় বলল,
“উফ! অত প্যাঁচাবেন না তো। সোজা করে বলুন না, ভালোবাসেন আমাকে?”
শেরাজ হাসল। সে সুমুর হাত দুটো নিজের হাতের তালুতে পুরে নিল। তারপর প্রতিটি আঙুলের ডগায় পরম মমতায় চুমু খেয়ে গভীর স্বরে বলল,
“হুম, বাসি তো! অনেক ভালোবাসি।”
সুমু এক মুহূর্ত চুপ থাকল। তারপর কিছুটা ইতস্তত করে নিচু স্বরে প্রশ্ন করল,
“কিন্তু… আমার মতো একটা সাধারণ মেয়েকে আপনি এতোটা ভালো কীভাবে বাসলেন?”
শেরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকাল। তার দুচোখে যেন সুদূর অতীতে চলে গেল। সে মৃদু হেসে বলল,
“প্রথমেই তো ভালোবাসিনি। প্রথমে তো আমি তোমার প্রেমে পড়েছিলাম।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বলল,
“প্রেমে পড়েছিলেন? প্রথমেই ভালোবাসেননি কেন?”
শেরাজ সুমুর অবিন্যস্ত চুলের ভাঁজে আঙুল চালাতে চালাতে গভীর স্বরে বলতে শুরু করল,
“কারণ প্রথম দেখাতেই কখনো ভালোবাসা হয় না, সুমু। প্রথম দেখাতে ভালো লাগা তৈরি হয়, আর সেই ভালো লাগাটা যখন রক্তে মিশে যায়, তখনই অণুতে অণুতে ভালোবাসার জন্ম হয়। তুমি লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট বোঝো?”
সুমু মাথা নেড়ে সরলভাবে বলল,
“হুম! প্রথম দেখাতেই ভালোবাসা।”
শেরাজ আলতো করে মাথা নেড়ে দ্বিমত জানিয়ে বলল,
“না সুইটহার্ট, ওটা ভুল ধারণা। প্রথম দেখাতেই ভালোবাসা হয় না, ওটা হয় ‘মুগ্ধতা’। তবে যাদের ভালো লাগাটা অনেক বেশি গভীর হয়—যেমন ওই মানুষটাকে ছাড়া আর কাউকে ভালো লাগে না, তার প্রতি মন বারবার টানে আর অন্য কারো দিকে ফেরে না, যেখানেই যায় সবার ভিড়ে শুধু ওই মানুষটাকেই দেখতে পায়—তারাই ধীরে ধীরে প্রেমে পড়ে আর শেষমেশ ভালোবেসে ফেলে।”
সুমু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে আপনি আমার ঠিক কী দেখে প্রেমে পড়েছিলেন?”
শেরাজ কোনো দ্বিধা ছাড়াই সহজভাবে উত্তর দিল,
“সৌন্দর্য!”
সুমুর উজ্জ্বল মুখটা এক নিমিষে ম্লান হয়ে গেল। সে একটু অবজ্ঞার সুরে বলল,
“তার মানে আপনিও দুনিয়ার অন্য সব পুরুষদের মতো শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েছিলেন?”
শেরাজ এবার সুমুর চিবুকটা এক আঙুলে উঁচিয়ে ধরল। সে অত্যন্ত ধীর লয়ে বলতে শুরু করল,
“দুনিয়ার সব পুরুষই সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে, সুইটহার্ট। তবে সেই সৌন্দর্য তারা আলাদা আলাদা জিনিসে খুঁজে পায়। কেউ চেহারার সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে, কেউ মায়াবী হাসির, কেউ অতল চোখের, কেউ সুন্দর ব্যবহারের, কেউ রেশমি চুলের, কেউ নির্মল মনের, আবার কেউ কেবল কণ্ঠস্বরের। এভাবেই আলাদা আলাদা বিশেষত্বের মোহে মানুষ প্রেমে পড়ে।”
সুমু মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনল। সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে আপনি আমার কোন বিশেষত্বের প্রেমে পড়েছিলেন?”
শেরাজ সুমুর খুব কাছে মুখ নিয়ে এলো। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস সুমুর ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে। সে অত্যন্ত আবেগী কণ্ঠে বলল,
“আমি সম্পূর্ণ ‘তুমি’টার প্রেমে পড়েছিলাম! ভালো লাগা হয়তো যেকোনো একটা দিক থেকে শুরু হয়, কিন্তু যখন সেটা সত্যিকারের ভালোবাসা হয়ে যায়, তখন ভালোবাসার মানুষটার সবকিছুই ভালো লাগে। তার অকারণে রাগ, তার অবুঝ জেদ, তার তুচ্ছ বিষণ্ণতা, এমনকি সকালে ঘুম থেকে ওঠা তার ওই অবিন্যস্ত চুলগুলোও তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দর মনে হয়। যে যাকে সত্যি ভালোবাসে, সে তার প্রিয় মানুষটার প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খুঁত আর বিষয়ের প্রেমে পড়ে। আমার কাছে তোমার অস্তিত্বের প্রতিটি অংশই এক একটা কাব্য, আর আমি সেই কাব্যের প্রতিটি লাইনের প্রেমে আজীবন অন্ধ হয়ে থাকতে চাই।”
সুমুর আর কিছু বলার মতো শক্তি রইল না। সে শুধু দেখল শেরাজের চোখের সেই অটল বিশ্বাস আর ভালোবাসা। এই মানুষটা তাকে কতটা নিবিড়ভাবে নিজের ভেতরে ধারণ করলে এমন কথা বলতে পারে! সুমু ধীর পায়ে শেরাজের চওড়া বুকের ওপর নিজেকে সঁপে দিল। সে শেরাজের বুকের ওপর কান পেতে তার হৃদপিণ্ডের ধীর অথচ বলিষ্ঠ স্পন্দন শুনছিল। প্রতিটি ধুকপুক শব্দ যেন এক একটা না বলা গল্পের প্রতিধ্বনি। শেরাজের কথাগুলো সুমুর মনের সবটুকু সংশয় এক লহমায় ধুয়ে মুছে দিয়েছে। সে কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার মুখ তুলে তাকাল। শেরাজের আঙুলগুলো তখনো সুমুর চুলে আলতো করে বিলি কাটছে। সুমু খুব আলতো স্বরে বলল,
“মাঝে মাঝে ভয় হয় জানেন? মনে হয় এই সবটুকু সুখ যদি হঠাৎ কোনো স্বপ্নের মতো ভেঙে যায়? আপনি তো জানেন, পাঁচটা বছর আমি কতটা শূন্যতার মাঝে কাটিয়েছি। মনে হতো আমার পৃথিবীটা বুঝি কোনো এক অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে গেছে।”
শেরাজ তার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে তাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল,
“স্বপ্ন ভাঙার ভয় তাদের থাকে, যাদের ভালোবাসা শুধু কল্পনায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমাদের এই বন্ধন তো অনেক কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়েও টিকে আছে। শূন্যতা তো আমারও ছিল। স্মৃতি হারিয়ে আমি হয়তো তোমার নামটা ভুলে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমার রুহ্ ঠিকই তোমাকে চিনে নিয়েছিল। নইলে হাজার চেষ্টার পরেও অন্য কোনো নারী কেন আমার হৃদয়ের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারল না?”
সে সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তারপর আবারও বলল,
“ভালোবাসা তো কাচের মতো ভঙ্গুর নয়, সুইটহার্ট। ভালোবাসা হলো স্বর্ণের মতো—যা পুড়লে আরও খাঁটি হয়। পাঁচ বছরের সেই বিরহ আমাদের ভালোবাসাকে পুড়িয়ে কুন্দনের মতো উজ্জ্বল করে দিয়েছে। এখন আর হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই, এখন শুধু আগলে রাখার সময়।”
সুমু আজ আবারও নতুন করে শেরাজের প্রেমে পড়ল। সাজেক ভ্যালির নিস্তব্ধতা আর মেঘের চাদর তখনো চারপাশকে কুয়াশায় ঢেকে রেখেছে। শেরাজ আর সুমু দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে প্রকৃতির এই অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করতে শুরু করল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘাড়ের ওপর ক্যামেরা ঝুলিয়ে, এক গাল হাসি নিয়ে উদয় হলো আইয়ুব। সে এসেই বলল,
“শেরাজা, শোন! আমরা টিমের সব ছেলেরা মিলে একটা ধামাকা ভিডিও বানানোর প্ল্যান করেছি। এই ব্যাকগ্রাউন্ড, এই মেঘ—এমন শট আর পাব না।”
সে ক্যামেরার লেন্স ঠিক করতে করতে শেরাজকে ডিরেকশন দিতে শুরু করল,
“শোন, ক্যামেরাটা আমি এই অ্যাঙ্গেল থেকে ধরব, তুই ওদিক থেকে হেঁটে আসবি। ড্রোন শটটাও মাথায় আছে। বুঝলি তো?”
শেরাজ বেশ গুরুত্বের সাথেই আইয়ুবের কথা শুনছিল এবং পাল্টা কিছু টেকনিক্যাল পরামর্শ দিচ্ছিল। কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুমুর কাছে এই মুহূর্তে আইয়ুবের এই ‘ভিডিও শ্যুট’ মোটেও সুখকর মনে হলো না। সে কিছুটা বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে শেরাজের দিকে তাকাল। কিন্তু শেরাজ তখন আইয়ুবের সাথে আলোচনায় মগ্ন।
সুমু এবার শেরাজের হাতে একটা খোঁচা মারল। শেরাজ ফিরে তাকাতেই সুমু নিজের ঠোঁটের ওপর তর্জনী রেখে ইশারায় তাকে চুপ করতে বলল। সুমু চাইল শেরাজ যেন আইয়ুবকে বিদায় করে দিয়ে আবার তার দিকে মনোযোগ দেয়। কিন্তু শেরাজ যেন আজ এক অন্যরকম মুডে আছে। সে সুমুর ইশারা বুঝল ঠিকই, তবে সেটাকে নিজের মতো করে কাজে লাগাল। সে হঠাৎ গম্ভীর মুখে আইয়ুবকে হাত দিয়ে পেছনের পাহাড়ের একদিকের ইশারা করে বলল, “আইয়ুব, দেখ তো ওই পাহাড়ের চূড়ায় ওটা কী? ওই শটটা কি নেওয়া যায়?”
আইয়ুব সরল বিশ্বাসে ক্যামেরাসহ পেছন ফিরে সেদিকে তাকাতেই শেরাজ বিদ্যুৎবেগে সুযোগটা নিল। সে নিজের বলিষ্ঠ দেহ দিয়ে সুমুকে বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে ফেলল। সুমু কিছু বুঝে ওঠার আগেই শেরাজ তার দুহাত দিয়ে সুমুর ঘাড় শক্ত করে আগলে ধরল এবং পরম আবেশে সুমুর অধরে নিজের অধর মেশালো।
আইয়ুব কয়েক সেকেন্ড পর ‘কিছুই তো নেই’ বলতে বলতে যখনই আবার সামনের দিকে ঘুরল, চোখের সামনের দৃশ্যটা দেখে সে রীতিমতো থম মেরে গেল। সে শুধু শেরাজের পেছন সাইডটা দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানে সামনে কি চলছে। তার হাতের ক্যামেরাটা প্রায় পড়ে যাওয়ার অবস্থা! সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে জনসম্মুখে শেরাজ এমন কিছু করে বসবে।
শেরাজ বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে একহাত সুমুর ঘাড় থেকে সরিয়ে আইয়ুবের দিকে বাড়িয়ে দিল এবং বিনা বাক্যব্যয়ে আইয়ুবকে আবার পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দিল, যেন সে বলতে চাইল—‘এখনো আমার কাজ শেষ হয়নি, আরও কিছুক্ষণ ওদিকেই তাকিয়ে থাক’। আইয়ুবকে ঘুরিয়ে দিয়ে শেরাজ আবারও নিজের হাত সুমুর ঘাড়ে ফিরিয়ে নিল।
আইয়ুব পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই হেসে ফেলল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“শালা শেরাজ! তুই সত্যিই একজন জাত রেসার। কখন যে কোন গিয়ারে স্পিড তুলতে হয়, সেটা তোর চেয়ে ভালো কেউ জানে না।”
বাতাসে তখন শুধু আইয়ুবের মৃদু হাসির শব্দ আর শেরাজ-সুমুর হৃদস্পন্দনের এক অদ্ভুত সুর বাজছে। সাজেকের মেঘেরা যেন সাক্ষী রইল—ভালোবাসা যখন গভীর হয়, তখন পৃথিবীর সব নিয়ম আর মানুষের উপস্থিতি তুচ্ছ হয়ে যায়। সুমু শেরাজের বুকের ভেতর লজ্জায় প্রায় কুঁকড়ে গেছে। সে শেরাজের পাঞ্জাবিটা খামচে ধরে নিচু স্বরে রাগ দেখিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“পাগল হয়েছেন? পাবলিক প্লেসে এসব কি শুরু করছেন? আইয়ুব ভাইয়াও দেখে ফেলল।”
শেরাজ বিন্দুমাত্র লজ্জিত হলো না। সে সুমুর ঘাড় থেকে হাত সরিয়ে সুমুর কপালে কপাল ঠেকিয়ে গভীর স্বরে বলল,
“আইয়ুব দেখেছে তো কী হয়েছে? আমি কি পরনারীকে ছুঁয়েছি? তুমি আমার বউ, আমার দুনিয়ার জান্নাত। এই মেঘের রাজ্যে আমাদের এই মুহূর্তগুলো তো পৃথিবীর কোনো নিয়ম দিয়ে মাপা যাবে না।”
সুমু আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। লজ্জায় তার গাল দুটো আপেলের মতো লাল হয়ে উঠেছে। সে শেরাজের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে উল্টো দিকে হাঁটা ধরল। যাওয়ার সময় শুধু চাপা স্বরে বলে গেল,
“আপনার সাথে আর কথাই বলব না।”
আইয়ুব এতক্ষণ মুখ চেপে হাসছিল। সুমু যেতেই সে শেরাজের পাশে এসে দাঁড়াল। শেরাজের কাঁধে একটা থাপ্পড় মেরে ফিসফিস করে বলল,
“দোস্ত, মানতেই হবে—তোর সাহস আর স্পিড দুটোই ট্র্যাকের মতো পাহাড়ের চূড়াতেও সেম। কিন্তু ভাবিজি তো একদম রেগে ফায়ার।”
শেরাজ পকেটে হাত দিয়ে একটা উদাসীন হাসি দিল, যেন যা ঘটেছে তাতে তার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। সে আইয়ুবের সাথে ভিডিওর পরবর্তী শট নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।
সুমু হনহন করে কিছুটা দূরে চলে এসেছে। তার রাগ যেন কমছেই না। হঠাৎ তার পাশ কাটিয়ে এক লোক দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেল। লোকটার পরনে কুচকুচে কালো জ্যাকেট, আর হাঁটার ধরণটা কেমন জানি পরিচিত কিন্তু রহস্যময়। লোকটা পাশ কাটিয়ে যেতেই সুমু কেমন জানি কুঁকড়ে গেল। একটা হিমশীতল স্রোত তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘাড় কাত করে লোকটার চলে যাওয়া দেখল। মনের ভেতর একটা অদ্ভুত অস্বস্তি। সে পুরোপুরি পেছন ঘুরে লোকটার দিকে তাকাতে যাবে, ঠিক তখনই সে অনুভব করল তার ঠিক পেছনে ডান পাশ থেকে বা’পাশে এসে কেউ একজন দাঁড়িয়েছে।
সে ঘুরে তাকাতেই দেখল শেরাজ। কিন্তু শেরাজের অবয়ব এখন আর সেই রোমান্টিক প্রেমিকের মতো নেই। তার চোয়াল শক্ত, চোখে এক অদ্ভুত শিকারি চাউনি। সুমুর নজর গেল শেরাজের ডান হাতের দিকে—সেখানে একটা ব্ল্যাক মেটালিক গান। শেরাজ খুব শান্ত ভঙ্গিতে বন্দুকটা হাতে নিয়ে সেটার নলের দিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে।
সুমু শেরাজের হাতে গান দেখে শিউরে উঠল। তার বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে জানে শেরাজের এই রূপটা কতটা ভয়ংকর হতে পারে। সে কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেল না। দ্রুত সামনের দিকে ঘুরে তাকিয়ে আবার হাঁটা ধরল, যেন সে কিছুই দেখেনি।
শেরাজ পেছনে একবার সেই রহস্যময় লোকটার চলে যাওয়ার পথের দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর চোখের পলকে গানটা তার প্যান্টের পেছনে কোমরের বেল্টে গুঁজে ফেলল। তার চেহারায় মুহূর্তেই আবার সেই স্বাভাবিক, শান্ত ভাবটা ফিরে এলো। সে গুনগুন করে গান ধরল,
“গলির আঁকে বাঁকে,
রাতের ডিস্কো থেকে,
তোমাকেই মন শুধু
খোঁজে রে, খোঁজে রে, খোঁজে!”
সে দ্রুত পা চালিয়ে সুমুর একদম গা ঘেঁষে পিছু পিছু আসতে লাগল। সে সুমুর খুব কাছে এসে নিচু স্বরে বলল,
“এত জোরে হাঁটছ কেন সুইটহার্ট?”
সুমু কোনো কথা বলল না, শুধু তার হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। সে জানে, এই মানুষটা যতটা ভালোবাসতে জানে, তার চেয়েও বেশি জানে আগলে রাখতে—আর সেই আগলে রাখার ধরণটা সবসময় সাধারণ হয় না। আর কিছুক্ষণ আছে সুমু এই লোকটাকে দেখছিল বলেই, এই মানুষটা গান বের করেছিল। তার ভাবনার মাঝে হঠাৎ শেরাজ বলে উঠল,
“এমন চোখ রেখে কী লাভ ডালিং, যে চোখ আমি ছাড়া অন্য পরপুরুষকে দেখতে বাধ্য করে? এমন পা রেখে কী হবে, যে পা আমি ছাড়া অন্য পরপুরুষকে দেখে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে? এমন ঘাড় রেখে কি হবে, যে ঘাড় আমি ছাড়া অন্য পরপুরুষকে দেখে ঘুরে যেতে বাধ্য করে?”
“তাহলে এই অপরাধে এখন আমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলুন, তারপর ঘরের শো-পিস বানিয়ে সাজিয়ে রেখে দিন। শান্তি পাবেন!”
কথাটা শেষ হতে না হতেই শেরাজ আচমকা সুমুর হাত ধরে এক হেঁচকা টানে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। এক হাতে সুমুর হাতটি পেছনে কোমরের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল, অন্য হাতে তার ঘাড় আঁকড়ে ধরে নিচু স্বরে বলল,
“এবারের মতো মাফ করে দিলাম। কিন্তু মনে রেখো, এসবের পুনরাবৃত্তি হলে নিজ দায়িত্বে তোমাকে সোজা জাহান্নামে নিয়ে যাব। সেখানে গিয়ে মধুচন্দ্রিমা সেরে আরও দুটো বাচ্চা কোলে ধরিয়ে তবেই ফিরব।”
সুমু সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিল। রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
“হোয়াট দ্য ফা*ক! সবসময় শুধু বাজে কথা। আপনার মাথায় কি সারাক্ষণ এসবই ঘোরে?”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আরে বস, রাগ করছ কেন? সত্যিতেই তো বললাম!”
“আপনি আমার গল্পের হিরো, কিন্তু সবসময় এমন ভিলেনদের মতো আচরণ করেন কেন?”
“হিরো না, সুইটহার্ট! ভিলেন-ই ঠিক আছি আমি। আর সবসময় ভিলেন-ই থাকতে চাই।”
খান সাহেব পর্ব ৯৩
সুমু আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে হনহনিয়ে চলে গেল। শেরাজ সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল এবং পেছন থেকে গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
“চুপি চুপি একটাই,
স্বপ্ন দেখতে চাই,
তোমাকেই ফ্যান্টাসি,
কোরে রে, কোরে রে, কোরে!”
