খান সাহেব পর্ব ৯৫ (২)
সুমাইয়া জাহান
সাজেকের সকালটা যেন কোনো স্বপ্নালু শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক ক্যানভাস। জানালার কাচের ওপাশে কুয়াশার শুভ্র সমুদ্র আর তার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেওয়া পাহাড়ের সবুজ চূড়া। ঘুম ভাঙতেই সুমু আলতো করে চোখ মেলল। পাশের জানালার পাশ দিয়ে চুঁইয়ে আসা ভোরের আলোয় সে দেখল তার জীবনের ধ্রুবতারাকে। শেরাজ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার বলিষ্ঠ উন্মুক্ত শরীরের ওপর সাদা ব্লাঙ্কেটটা কিছুটা অগোছালোভাবে জড়িয়ে আছে। প্রদীপের আলোয় কাল রাতে যাকে দুর্ধর্ষ ‘কিং’ মনে হয়েছিল, ভোরের এই নরম আলোয় তাকে কেবল নিজের একান্ত প্রিয় মানুষ বলেই মনে হচ্ছে।
সুমু কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শেরাজের কপালে এসে পড়া অবাধ্য এলোমেলো চুলগুলো দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে খুব সন্তর্পণে হাত বাড়িয়ে আঙুলের ডগা দিয়ে চুলগুলো আরও একটু এলোমেলো করে দিল। তারপর পরম মমতায় ঝুঁকে পড়ে শেরাজের তপ্ত কপালে নিজের ঠোঁটের এক দীর্ঘ উষ্ণ স্পর্শ এঁকে দিল। শেরাজ ঘুমের ঘোরে একটু নড়েচড়ে উঠলেও তার প্রশান্তির ঘুমে কোনো ব্যাঘাত ঘটল না।
সুমু আলতো করে বিছানা ছেড়ে উঠল। নিজের শরীরের ওপর পাশে পড়ে থাকা টাওয়েলটা জড়িয়ে নিল। পা টিপে টিপে সে এগিয়ে গেল রুমের সাথে লাগোয়া বিশাল কাচঘেরা বারান্দার কাছে। বারান্দার দরজাটা খুলতেই সাজেকের হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা এসে তার মুখে লাগল। সুমু নিজের কাঁধের ওপর ছড়িয়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলোকে আরও ছড়িয়ে দিল। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে আসা দমকা হাওয়ায় তার চুলগুলো উড়ছে, আর সে দুচোখ ভরে দেখছে মেঘেদের লুকোচুরি। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সাদা মেঘের দলগুলো যেন তুলোর মতো জমে আছে।
সুমু বারান্দার কাচের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। বাইরের এই আদিগন্ত প্রকৃতি আর পেছনের রুমে ফেলে আসা তার ভালোবাসার মানুষ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, জীবনটা বুঝি এর চেয়ে বেশি পূর্ণ আর হতে পারত না। সে গভীর এক নিঃশ্বাস নিল। বুনো পাহাড়ের ঘ্রাণ আর কুয়াশার সিক্ততা তার অস্তিত্বকে এক অপার্থিব শান্তিতে ভরিয়ে দিল।
হঠাৎ পেছন থেকে এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত তার কোমরে বলয় তৈরি করল। সুমু চমকাল না, কারণ এই স্পর্শের ঘ্রাণ তার হৃদপিণ্ডের স্পন্দনের মতোই চেনা। শেরাজ তার চওড়া বুকটা সুমুর পিঠের সাথে মিশিয়ে দিল। ঘুমের রেশ এখনো কাটেনি, কণ্ঠস্বরটা তারও অনেক বেশি গম্ভীর আর ভাঙা শোনাল। সে সুমুর ঘাড়ে মুখ গুঁজে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“সকালটা তো খুব স্বার্থপরের মতো শুরু করলে সুইটহার্ট! আমাকে একা ফেলে এই মেঘেদের সাথে মিতালী করাটা কি খুব জরুরি ছিল?”
সুমু পেছন ফিরে শেরাজের গলায় হাত জড়িয়ে ধরল। শেরাজের চুলগুলো এখনো অগোছালো, চোখে ঘুমের ঘোর। সুমু হেসে বলল,
“প্রথমে আমি তো আপনার ঘুমন্ত মুখটাই দেখছিলাম, খান সাহেব। তখন মনে হচ্ছিল, পুরো পৃথিবীর সব শান্তি বুঝি আপনার এই মুখে এসে জমে আছে। তাই ভাবলাম শান্তিটা একটু বাইরে থেকেও দেখে আসি।”
শেরাজ তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের দিকে টেনে নিল। তার চোখের চাউনি হঠাৎ বদলে গেল। সে জানালার ওপাশের গভীর উপত্যকার দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল,
“শান্তি খুব ক্ষণস্থায়ী, সুমু। বিশেষ করে এই মেঘেদের রাজ্যে। তারা যেমন হুট করে এসে সব ঢেকে দেয়, আবার হুট করে চলেও যায়।”
সুমু শেরাজের এই কথার গূঢ় অর্থ বুঝতে পারল না। সে শুধু শেরাজের বুকে মাথা রেখে বলল,
“যতক্ষণ আপনি আছেন, ততক্ষণ মেঘেদের আসা-যাওয়ায় আমার কিছু যায় আসে না।”
শেরাজ তার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজল। সে সুমুর কানে ফিসফিস করে বলল,
“সকাল সকাল শুধুমাত্র একটা টাওয়াল জড়িয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আমাকে পাগল করার প্ল্যান করেছ বুঝি?”
সুমু একটু লজ্জিত হয়ে হাসল, শেরাজের বুকের ওপর নিজের হাতটা রেখে বলল,
“আমি তো শুধু সাজেকের ভোর দেখছিলাম। আপনি কেন উঠে এলেন?”
শেরাজ তার ভেজা চুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে ধীর স্বরে বলল,
“এই মায়াবী দৃশ্যের সামনে ঘুমিয়ে থাকার সাধ্য কোনো পুরুষের নেই, সুইটহার্ট। সাজেকের পাহাড়ের চেয়েও বড় এক সম্মোহন যে এই ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, তা আমি বিছানায় শুয়েও টের পাচ্ছিলাম।”
সুমু আদুরে গলায় বলল,
“খান সাহেব কি তবে আজ বাকিসব কাজ বাদ দিয়ে শুধু এই পাগল হওয়া নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন?”
শেরাজ এক হাত সুমুর কোমরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অন্য হাত দিয়ে তার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। সে সুমুর চোখের মণি বরাবর তাকিয়ে বলল,
“যদি তাই থাকি, তবে কি খুব বেশি অপরাধ হয়ে যাবে? এই মেঘ, এই নির্জনতা আর তোমার এই পাগল করা রূপ—সবই তো চাইছে, আমি যেন শুধু তোমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকি।।”
দরজার ওপার থেকে সিমরানের মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এলো,
“পাপা! পাপা! দোলজা থোনো!”
মেয়ের গলার স্বর শুনে সুমু এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নিজের এই অগোছালো অবস্থা আর পরনের টাওয়াল দেখে সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে ফিসফিস করে শেরাজকে বলল,
“খান সাহেব, মেয়ে চলে এসেছে! আমি ওয়াশরুমে যাচ্ছি চেঞ্জ করতে, আপনি ওকে সামলান।”
বলেই সে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। শেরাজ হালকা হেসে বিছানা থেকে টি-শার্ট তুলে দ্রুত গায়ে জড়িয়ে নিল। পরনে এখন কালো শর্ট প্যান্ট। দরজা খুলতেই সিমরান হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তার চোখেমুখে রাজ্যের উত্তেজনা। সে শেরাজের হাত ধরে টানতে টানতে বলল,
“পাপা! পাপা! চনো না, বাইলে অনেত চুন্দর ফ্লাওয়াল, আমি তোমাল তাতে ভিডিও মেত তলব।”
শেরাজ মেয়ের আবদার ফেলতে পারে না। সে সিমরানের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“ঠিক আছে মাম্মাম, চলো!”
শেরাজ সিমরানকে নিয়ে নিচে নেমে এলো। কটেজের পাশেই একটু দূরেই ছোট একটি ফুলের বাগান। চারদিকে হলুদ আর কমলা রঙের ছোট ছোট বুনো ফুলের মেলা। শেরাজ তার ফোনটা বের করে ভিডিও অন করল। ভিডিওতে দেখা গেল, সিমরান একটি ব্লু ফেইরী ড্রেস পরে আছে। তার ফ্রকের হাত দুটো যেন প্রজাপতির ডানা, যা হালকা বাতাসে কাঁপছে। তার মাথায় মুক্তোর একটি সুন্দর হেয়ারব্যান্ড।
সিমরান প্রথমে ফুলের বাগানের ভেতর দিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে এলো। কখনো সে থমকে দাঁড়িয়ে এক হাত কোমরে রেখে পোজ দিল, আবার কখনো সে দৌড়ে ক্যামেরার কাছে এলো। এক পর্যায়ে সে নিচু হয়ে একটি হলুদ ফুল তুলে নাকের কাছে নিল। ভিডিওর সেই শেষ দৃশ্যের মতো সে উল্টো ফিরে চলে গেল, আর তার নীল ফ্রকের ঘেরটা বাতাসের ঢেউয়ের মতো দুলতে লাগল।
শেরাজ মুগ্ধ হয়ে মেয়ের এই প্রতিটি মুহূর্ত লেন্সবন্দি করল। বাকি বাচ্চারা কিচিরমিচির করতে করতে বাগানে আসতেই সিমরান ওদের দিকে দৌড়ে গেল। নিশান, নাহিয়ান আর হাসফাদের সাথে তার খেলার কলতানে পুরো বাগানটা মুহূর্তেই মুখরিত হয়ে উঠল। শেরাজ দূর থেকে মেয়ের সেই নির্মল আনন্দ দেখল। সে ধীরে ধীরে জটলা থেকে সরে এসে পাহাড়ের একদম শেষ প্রান্তের খাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
সাজেকের এই বিশাল পাহাড় আর নীল দিগন্ত এখন শেরাজের কাছে খুব ছোট মনে হচ্ছে। চারপাশের কোলাহল থেকে দূরে এই নির্জনতায় এক নিদারুণ বিষণ্নতা তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। সে পকেট থেকে ফোনটা আবারও বের করল। হাতটা সামান্য কাঁপছে তার। ফোনের গ্যালারি থেকে প্রাইভেট ফোল্ডারটা খুলে সে একটা পুরনো ছবির ওপর আঙুল রাখল।
ছবিটা স্ক্রিনে ফুটে উঠতেই শেরাজের শ্বাস যেন ভারী হয়ে এলো। ছবিতে তিনজন যুবক— শেরাজ, আরিয়ান আর রায়য়ান। তারা একে অপরের কাঁধে হাত দিয়ে হাসছে। আরিয়ান আর রায়য়ানের হাসিমুখগুলো দেখে মনেই হচ্ছে না যে তারা নেই। শেরাজ ছবির ওপর হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“তোরা আমাকে কখনও ক্ষমা করিস না।”
শেরাজের চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠল। সে যেন আরিয়ান আর রায়য়ানকে মারার সাথে সাথে নিজের ভেতরের এক অংশকেও চিরদিনের জন্য কবর দিয়েছে। সে আকাশের দিকে মুখ তুলে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নীল আকাশে মেঘেরা ভেসে যাচ্ছে, কিন্তু তার মনের কালো মেঘগুলো সরার কোনো নাম নেই। সে বিড়বিড় করে আবারও বলল,
“পরপারে দেখা হলে কি তোরা আমাকে আবার বন্ধু বলে ডাকবি?”
সিমরানের হাসির আওয়াজ আবারও তার কানে এলো। শেরাজ দ্রুত হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে ফেলল। সে জানে, এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় দুর্বল হওয়ার কোনো সুযোগ তার নেই। সে আবার তার সেই গম্ভীর চেহারার বর্মটা পরে নিল। ফোনটা লক করে পকেটে রাখতে রাখতে সে আবার সেই সাধারণ কিন্তু অজেয় শেরাজ খান হয়ে উঠল।
রোদ তখন পাহাড়ের গায়ে সোনা ছড়াতে শুরু করেছে। কটেজের বিশাল কাঠের বারান্দায় দীর্ঘ এক টেবিল পাতা হয়েছে। পাহাড়ের ভিউ সামনে রেখে সবাই সেখানে ব্রেকফাস্টের জন্য সমবেত হয়েছে। সকালের হিমেল হাওয়ায় ধোঁয়া ওঠা খাবারের ঘ্রাণ পরিবেশটাকে এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে।
আজকের ব্রেকফাস্টের মেনুটা করা হয়েছে মূলত বাচ্চাদের কথা মাথায় রেখে। আইয়ুব আর রাহিন মিলে আগেই ফরমাস দিয়েছিল, তাই টেবিলে সাজানো হয়েছে, ক্রিস্পি ফ্রাইড প্রন, গার্লিক বাটার লবস্টার আর ছোট ছোট স্কুইড রিং। বাচ্চারা তো লবস্টার দেখে রীতিমতো হুল্লোড় শুরু করে দিয়েছে। আরও রাখা হয়েছে, বাঁশের চোঙায় রান্না করা ‘ব্যাম্বু চিকেন’, পাহাড়ি জুম চালের গরম ভাত আর ধোঁয়া ওঠা লাল আটার রুটি, সাথে আছে পাহাড়ি মধু আর তাজা পেঁপে।
সিমরান এক টুকরো প্রন মুখে দিয়ে আইয়ুবকে বলল,
“আইয়ুব আন্তেল, আততের ব্রেকফাততা এতদম অতাম!”
আইয়ুব ক্যামেরা পাশে রেখে হাসিমুখে উত্তর দিল,
“সবই তোমাদের জন্য মাম্মাম, খেয়ে নাও!”
পুরো টেবিলে খাবারের উৎসব আর হাসাহাসি চলছে, শেরাজ টেবিলের এক মাথায় নিজের চিরচেনা গাম্ভীর্য নিয়ে বসে আছে। পাহাড়ের কিনারে দাঁড়িয়ে কাটানো সেই বিষণ্ণ মুহূর্ত সে কোনো এক জাদুবলে নিজের ভেতরে লুকিয়ে ফেলেছে।
শেরাজ বরাবরই পরিমিত আহারে অভ্যস্ত। সবার প্লেটে যখন লবস্টার আর চিকেনের পাহাড়, শেরাজ তখন নিজের জন্য বেছে নিয়েছে খুব হালকা কিছু। তার সামনে রাখা, এক কাপ কফি, দুটো সেদ্ধ ডিমের সাদা অংশ আর সামান্য কিছু পাহাড়ি ফল। সে খুব ধীরলয়ে কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর বাচ্চাদের আনন্দ দেখছে। সুমু তৈরি হয়ে নিচে এসে শেরাজের পাশে বসল। শেরাজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে সে একটু দুষ্টুমি করে চাপাস্বরে বলল,
“খান সাহেব, সারারাত অত খাটুনির পর সকালের ব্রেকফাস্টটা কি একটু বেশিই হালকা হয়ে গেল না?”
শেরাজ কফির কাপ নামিয়ে সুমুর দিকে তাকাল। সুমুর চোখের ইশারা দেখে শেরাজের ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল,
“আমার খিদেটা তো আসলে এইসব খাবারে মেটে না সুইটহার্ট, সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। আর শরীর ঠিক রাখতে গেলে এই হালকা ব্রেকফাস্টটুকুই যথেষ্ট, বুঝেছেন বস!”
সুমু আলতো করে শেরাজের হাতটা টেবিলের নিচে চেপে ধরল। সে জানে, এই মানুষটা পাহাড়ের মতো কঠিন হলেও ভেতরে ঠিক কতটা আগ্নেয়গিরি চেপে রাখে।
ওদিকে নিহাল আর সজীবদের প্লেটে খাবারের অভাব নেই। সজীব একটা লবস্টারের পা চিবোতে চিবোতে আশিককে বলল,
“দেখলে সবাই? বউ না থাকলে খাবারটা অন্তত মন ভরে খাওয়া যায়। এতে অন্তত খেতে খেতে পাশে বসা কোনো রমণীর দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়না।”
পুরো বারান্দা হাসির রোলে মেতে উঠল। এরই মাঝে সুমুর ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। বেশ কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলে যখন সে ফিরে এলো, তখন তার মুখটা বেশ গম্ভীর।
সুমুকে ওভাবে ফিরে আসতে দেখে হাসাহাসি থেমে গেল। শেরাজ কফির কাপ হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সুমু সবার দিকে তাকিয়ে খুব ভারাক্রান্ত গলায় বলল,
“সবাই একটু শোনো! আমাদের এই ট্রিপটা হয়তো এখানেই শেষ করতে হবে। আমাদের কাল-ই ফিরতে হবে।”
মুহূর্তেই বারান্দায় শ্মশানের নীরবতা নেমে এলো। আইয়ুব ক্যামেরা নামিয়ে ফেলল, বাচ্চাদের লবস্টার খাওয়া থেমে গেল। আরবাজ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী বলছেন, ভাবিজি? হুট করে কাল-ই কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
সুমু মাথা নিচু করে রইল কিছুক্ষণ। শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে সুমুর কাঁধে হাত রেখে কিছুটা উদ্বেগের সাথে বলল,
“কী হয়েছে, সুমু? খুলে বলো!”
হঠাৎ সুমু খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে ভয়ের মেঘগুলো এক নিমিষে কেটে গেল। সুমু শেরাজের হাতটা জড়িয়ে ধরে খুশিতে টলমল চোখে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে না, না! আসলে একটা ধামাকা নিউজ আছে। কলটা পাবলিকেশন থেকে এসেছিল। আমার এতোদিনের পরিশ্রম, আমার জীবনের প্রথম লেখা ভালোবাসার গল্প—যেটা আমি আজ থেকে কয়েক বছর আগে শুরু করেছিলাম—সেটা অফিশিয়ালি পাবলিক হতে চলেছে!”
পুরো আড্ডায় যেন আবার প্রাণ ফিরে এলো। নিহাল টেবিল চাপড়ে চিৎকার করে উঠল,
“ইয়েস! আমাদের সুমু ভাবিজি এখন তবে রাইটার! পাবলিকেশন থেকে কল আসা মানে তো বিশাল ব্যাপার!”
সুমু আবেগী গলায় বলতে লাগল,
“বিশ্বাস করো, আমি নিজেও জানতাম না এই ট্রিপের মাঝেই এতো বড় খবরটা পাব। আমি জাস্ট একটা ড্রাফট পাঠিয়েছিলাম, ওরা আমাকে জানিয়েছিল আমার পাণ্ডুলিপিটা ওদের খুব পছন্দ হয়েছে এবং ওরা দ্রুতই বইটা মার্কেটে আনতে চায়। তখন আমিও রাজি হয়েছিলাম এবং ওদের সাথে বাকি ফর্মালিটিজ নিয়ে কথা বলেছিলাম। এরপরে ওরা কাজ শুরু করে, অ্যান্ড ফাইনালি ওদের কাজটা সম্পূর্ণ হয়েছে।”
আইয়ুব সাথে সাথে ক্যামেরা তাক করে বলল,
“দাঁড়ান ভাবিজি! এই খুশিতে তো একটা গ্রুপ ফটো নিতেই হয়। আমাদের ট্রুপের প্রথম লেখককে নিয়ে আজ সাজেক মাতবে।”
শেরাজ মুগ্ধ হয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানত সুমু লেখে, কিন্তু সেই লেখা যে সুমু এভাবে বইয়ের মলাটে বন্দি করবে, তা সে ভাবেনি। সে সুমুর কানে ফিসফিস করে বলল,
“অভিনন্দন সাম্রাজ্ঞী! আজ রাতে তবে ডাবল সেলিব্রেশন হবে। তোমার এই অর্জনে আমি গর্বিত।”
সিমরান আর হাফসারা কিছুই না বুঝে শুধু হাততালি দিচ্ছে। সিমরান ওর মাম্মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“মাম্মা, তান মানে তুমি এথন বইয়েল ভেতলে থাতবে? আমিও তোমাল তাতে থাতব তিন্তু।”
সুমু মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে হাসিমুখে বলল,
“হ্যাঁ মাম্মা, তুমিও থাকবে, তোমার পাপা আর আমাদের এই পুরো পাগলের গ্যাংটা আমার ওই গল্পের পাতায় পাতায় থাকবে।”
আইয়ুব তার ক্যামেরাটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে বেশ কায়দা করে সুমুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সব তো বুঝলাম ভাবিজি, কিন্তু এবার আসল কথাটা বলেন। গল্পের নামটা কী রেখেছেন? নিশ্চয়ই খুব রোমান্টিক কিছু!”
সুমু একপলক শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ তখনো তার কফির কাপে শেষ চুমুকটা দিচ্ছিল। সুমু আলতো করে শেরাজের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীর গলায় বলল,
“বইটার নাম— ‘খান সাহেব’।”
নামটা শোনার সাথে সাথে পুরো টেবিলে একটা সেকেন্ডের জন্য পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। তারপরই নিহাল আর রাহিন সমস্বরে বলে উঠল,
“কী? খান সাহেব!”
সুমু হেসে দিয়ে সবার অবাক হওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল,
“হ্যাঁ, আপনারা হয়তো জানেন না, এই লেখাটা সম্পর্কে আমার খান সাহেব অলরেডি সব জানে। মূলত তাকে ঘিরেই আমার এই শব্দবুনন। আর আমার এর আগে একটা ই-বুক বের হয়েছিল, ওটার নামও ছিল— ‘খান সাহেব: এ লাভ কলড সুমুরাজ’।”
সজীব এক হাত কপালে ঠেকিয়ে মজা করে বলল,
“হায় হায়! তার মানে আমরাও কি ওই বইয়ের কোনো চরিত্রে আছি, সুমু? নাকি পুরো বইজুড়ে শুধু খান সাহেবের ওই গাম্ভীর্য আর রোমান্সই থাকবে?”
সুমু আড়চোখে শেরাজের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। শেরাজ এবার সুমুর হাতটা একটু শক্ত করে চেপে ধরে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই গল্পের লেখক যেমন সুমু, তেমনি এর উৎসও ও। ও যখন ই-বুকটা লিখছিল, আমিই ছিলাম ওর প্রথম পাঠক। নামটা একটু অদ্ভুত লাগলেও, এই ‘খান সাহেব’ শব্দটার পেছনে সুমুর যে আবেগ মিশে আছে, তা হয়তো আমার চেয়ে ভালো আর কেউ বুঝবে না।”
ইফতিয়া আবেগী গলায় বলল,
“সুমু, তোর আর জিজুর এই কেমিস্ট্রিটা সত্যিই একটা উপন্যাসের মতোই সুন্দর। নামের ভেতরেই একটা রাজকীয় ভাব আছে— ‘সুমুরাজ’! নামটা জাস্ট ফাটাফাটি হয়েছে!”
পিয়াস আর স্যান্ডি মিলে নতুন লেখিকাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য স্পেশাল কফি অর্ডার করল। বাচ্চারা কিছুই না বুঝে ‘খান সাহেব’ ‘খান সাহেব’ বলে চিৎকার করে নাচতে শুরু করল। সিমরান তো মহাখুশি, সে বাবার কোলে উঠে বলল,
“পাপা, তাল মানে তুমি এথন বইয়েল হিনো!”
সুমু চেয়ার ছেড়ে আলতো করে উঠে দাঁড়াল। সবাই চুপ হয়ে গেল সুমুর কথা শোনার জন্য।
সুমু দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে খুব ধীর আর আবেগী গলায় বলতে শুরু করল,
“আপনারা হয়তো ভাবছেন এটা কেবল একটা বইয়ের নাম। কিন্তু আমার কাছে এই ‘খান সাহেব’ শব্দটা একটা আস্ত জীবন। এই গল্পটা যখন আমি প্রথম লিখতে শুরু করি, তখন আমি কেবল শব্দ দিয়ে একটা চরিত্র বানাচ্ছিলাম না, বরং আমি আমার জীবনের সেই মানুষটাকে ফ্রেমবন্দি করছিলাম, যাকে আমি ভালোবাসি।”
সে এক পলক শেরাজের দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করল,
“খান সাহেবকে আপনারা সবাই দেখেন এক কঠিন, গাম্ভীর্যপূর্ণ মানুষ হিসেবে। কিন্তু আমার এই বইয়ের পাতায় পাতায় আছে সেই শেরাজ, যে মাঝরাতে আমার কান্নার শব্দ শুনলে হাজার মাইল দূর থেকেও স্থির থাকতে পারে না। ‘এ লাভ কলড সুমুরাজ’ এটা কেবল আমাদের নামের সংমিশ্রণ নয়, এটা আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী।”
সুমুর গলার স্বর কিছুটা বুজে এলো। সে একটু থেমে আবার বলল,
“এই বইয়ের প্রতিটি পরিচ্ছেদ লেখা হয়েছে অনেক রাতের চোখের জল আর অনেক ভোরের দীর্ঘশ্বাস দিয়ে। আমি চেয়েছি এই দুনিয়া জানুক, এক বুক অন্ধকার আর রক্ত মাখা অতীত নিয়েও একটা মানুষ কীভাবে একটা পুরো পরিবারকে বটবৃক্ষের মতো আগলে রাখতে পারে। আমার খান সাহেব হয়তো সবার কাছে একজন দুর্ধর্ষ মানুষ, কিন্তু আমার গল্পের পাতায় সে কেবল একজন নিঃস্বার্থ প্রেমিক।”
পুরো আড্ডায় তখন পিনপতন নীরবতা। সুমুর এই কথাগুলো সবার হৃদয়ে এক অদ্ভুত ভারী ভাব এনে দিল। শেরাজ স্তব্ধ হয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে ছিল। সে জানত না, সুমু তাকে নিয়ে এভাবে ভাবে। সে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে সুমুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল এবং খুব আলতো করে সুমুর কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় বলল,
“আমি কখনো ভাবিনি সুমু, আমার মতো একজন রুক্ষ মানুষকে তুমি এভাবে সুন্দর করে মানুষের সামনে তুলে ধরবে। আমার অন্ধকার দিকগুলোকে তুমি ভালোবাসার আলো দিয়ে ঢেকে দিয়েছো, তোমার জন্যই আমি নতুন করে বাঁচতে শিখেছি।”
আইয়ুব আবেগী গলায় বলল,
“ভাবিজি, আপনার এই কথাগুলো শুনে আজ আমাদেরও বুকটা ভরে গেল। আমরা বন্ধু হিসেবে ওকে চিনি ঠিকই, কিন্তু আপনার চোখে দেখা ‘খান সাহেব’ যে এতখানি গভীর, সেটা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল।”
নাজমিন আর ইশিতা এগিয়ে এসে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। সিমরান আর বাকি বাচ্চারা বুঝতে পারছিল না বড়রা কেন হঠাৎ এতো গম্ভীর হয়ে গেছে, তারা শুধু তাদের মাম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
সাজেকের মেঘেদের সাথে আড়ি জমিয়ে এবার শেষবারের মতো অজানা উদ্দেশ্যে চারপাশ ঘুরে দেখতে বের হওয়ার পালা। কটেজের সামনে সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই চারজনের জন্য। কিন্তু তারা যখন সামনে এলো, পুরো পরিবেশটা মুহূর্তের জন্য পিনপতন নীরবতায় ডুবে গেল। শেরাজ, সুমু, শেরান আর সিমরান—চারজন হুবহু লুকে বের হয়ে এলো। তাদের পোশাক আর চলনবলনে কোনো পাহাড়ী পর্যটকের ছাপ নেই, বরং মনে হচ্ছে কোনো আন্তর্জাতিক বিজনেস ডিল সেরে সফরের জন্য তারা প্রস্তুত।
শেরাজের পরনে কুচকুচে কালো ব্লেজার, নিচে কালো শার্ট যার ওপরের দুটো বোতাম খোলা আর কালো প্যান্ট। চোখে ডার্ক সানগ্লাস। সুমুও শেরাজের সাথে তাল মিলিয়ে পরেছে নিখুঁতভাবে ফিট করা কালো স্যুট। তার লম্বা খোলা চুল আর চোখে থাকা ডার্ক সানগ্লাসের কারণে তাকে একদম ক্ষমতাশালী ‘বিজনেস কুইন’-এর মতো দেখাচ্ছে। ছোট শেরানকে দেখে সবাই চমকে গেল। বাবার হুবহু ছোট সংস্করণ। তার পরনেও কালো স্যুট-প্যান্ট আর চোখে কালো সানগ্লাস। সে বাবার মতোই এক হাত পকেটে রেখে গম্ভীরভাবে হাঁটছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমক ছিল সিমরান। সে যেন ক্ষুদে এক দাপুটে নেত্রী। তার পরনেও কুচকুচে কালো ব্লেজার, কালো সানগ্লাস। তার হাঁটার স্টাইল আর চোয়ালের কঠোরতা দেখে যে কেউ তাকে ‘ক্ষুদে ফিমেল শেরাজ’ বলে ভুল করবে। আজ চারজনের সাজে কোনো ভিন্নতা নেই। ড্রেস থেকে শুরু করে জুতো—সবই হুবহু একই ধরনের পরেছে তারা।
আইয়ুব লেন্সটা চোখের কাছ থেকে সরিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে বিড়বিড় করে বলল,
“মাফিয়াদের সাম্রাজ্যে চলে এলাম নাকি?”
বাকিরা সবাই যে যার জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে রইল। নিহাল পাশ থেকে টিপ্পনী কেটে বলল,
“ভাই, আমরা তো ঘুরতে এসেছি, তোরা কি সাজেক ভ্যালি কিনে নেওয়ার জন্য পেপার সাইন করতে যাচ্ছিস নাকি?”
শেরাজ কারো কথার উত্তর দিল না, শুধু চশমাটা একবার ঠিক করে সুমুর দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল ‘চলো’।
সাজেকের আকাশে যখন সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে শুরু করল, তখন কটেজের আঙিনায় পার্টির আয়োজন করা হলো। সুমুর বই বের হওয়ার আনন্দ এবং ‘খান সাহেব’ উপন্যাসের এই বিশেষ মুহূর্তকে উদযাপন করতে শেরাজ কোনো কমতি রাখেনি। আশপাশের কটেজগুলোর পর্যটকদেরও এই খুশিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
আমন্ত্রিত অতিথিরা যখন গল্পে ব্যস্ত, তখনই সুমুরা চারজন পার্টিতে উপস্থিত হলো। বিকালে ‘অল ব্ল্যাক’ বিজনেস টাইকুন লুকে তারা যেভাবে চমক দিয়েছিল, সন্ধ্যায় সেই একই পোশাকে তাদের উপস্থিতি সবার শ্বাস থামিয়ে দিল।
পার্টিতে আসা অন্য কটেজের লোকেরা সুমুদের এই লুক দেখে একদম থমকে গেল। কেউ একজন আইয়ুবকে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ভাই, এরা কি কোনো ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানির মালিক? নাকি কোনো মাফিয়া গ্যাং? এদের লুক তো আমাদের সাধারণ পর্যটকদের মতো নয়!”
আইয়ুব হাসিমুখে উত্তর দিল,
“ওরা কেবল মাফিয়া বা টাইকুন নয়, ওরা ভালোবাসার এক জীবন্ত উপন্যাসের চরিত্র।”
শেরাজ মঞ্চের মতো সাজানো একটি জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল এবং সুমুর হাত ধরে তাকে সবার সামনে নিয়ে এসে বলল,
“আজকের এই আয়োজন কেবল আমার স্ত্রীর প্রথম বইয়ের জন্য নয়, বরং তার সেই কলমের জন্য, যা এক পাথরের হৃদয়েও ফুল ফোটাতে পেরেছে। আজ থেকে আপনারা তাকে কেবল সুমু নয়, ‘খান সাহেব’ উপন্যাসের রচয়িতা হিসেবে চিনবেন।”
পুরো আঙিনা করতালিতে ফেটে পড়ল। সুমু আবেগে আপ্লুত হয়ে শেরাজের বাহুলগ্নে আশ্রয় নিল। সিমরান তখন তার পাপার স্টাইল নকল করে নিজের পকেটে হাত দিয়ে গম্ভীরভাবে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
টেবিলের ওপর রাখা হয়েছে এক বিশাল তিন তলা বিশিষ্ট ‘ডার্ক চকলেট ফরেস্ট কেক’। কেকটির ওপর সোনালী হরফে চমৎকার করে লেখা— “খান সাহেব”।
শেরাজ আর সুমু যখন কেকের সামনে এসে দাঁড়াল, চারপাশের অতিথিরা আবারও করতালি দিয়ে তাদের অভিনন্দন জানাল। শেরাজ আলতো করে সুমুর হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। কাল রাতেও তারা কেক কেটেছিল, কিন্তু সেটা ছিল কেবল একান্ত ব্যক্তিগত। আর এখনকার এই উদযাপন সবার সামনে সুমুর পরিচয়ের এক নতুন অধ্যায়। শেরাজ সুমুর কানে ফিসফিস করে বলল,
“এই ছুরিটা কেবল কেক কাটছে না সুমু, এটা আমাদের জীবনের সব বাধা কেটে সাফল্যের নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।”
দুজনে মিলে যখন কেকটা কাটল, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে আইয়ুব তার ফোনের সাথে কানেক্ট করা স্পিকারে গান প্লে করল। কেকের প্রথম টুকরোটি শেরাজ সুমুর মুখে তুলে দিল। সুমু সেটা খেয়ে শেরাজকেও কেক খাইয়ে দিল। এরপর শেরান আর সিমরানকে কাছে টেনে নেওয়া হলো। সিমরান তার পাপার মতো গম্ভীর ভাবটা ধরে রাখলেও এক টুকরো কেক মুখে দিয়ে সে আর খুশি সামলাতে পারল না। সে তার আধো আধো গলায় বলল,
“মাম্মা, তেততা অনেত ইয়াম্মি!”
অন্য কটেজ থেকে আসা পর্যটকরা অবাক হয়ে দেখছে এই পরিবারটিকে। কেক কাটার পর অতিথিদের মাঝে পাহাড়ি পিঠা আর বারবিকিউ পরিবেশন করা হলো। শেরাজ ধীরপায়ে আড্ডার আড়াল থেকে বের হয়ে কটেজের বাইরের সেই অন্ধকার পাহাড়ী পথের দিকে এগিয়ে গেল। সুমু দূর থেকে তার দীর্ঘদেহের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে, এই মানুষটা মাঝে মাঝে নিজের গহীনে হারিয়ে যেতে ভালোবাসে।
বাইরের পাহাড়ে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর হিমেল হাওয়ার দাপট। শেরাজ পকেট থেকে ছোট একটা কাচের জার বের করল। সে জানে সুমু জোনাকি খুব পছন্দ করে। অন্ধকারের ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে একে একে উজ্জ্বল জোনাকিগুলোকে সে পরম মমতায় জারের ভেতর বন্দি করতে শুরু করল।
জোনাকিতে ভরা জারটা হাতে নিয়ে শেরাজ যখন কটেজের মূল দরজায় ফিরে এলো, তখনই তার তীক্ষ্ণ নজর পড়ল নিচে। সেখানে সুমুর খুলে রাখা জুতোজোড়া পড়ে আছে। কিন্তু তার ঠিক পাশেই খুব ঘনিষ্ঠ করে রাখা একজোড়া পুরুষের জুতো। শেরাজের কপাল কুঁচকে গেল। সে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়াল। লোকটার সাহস দেখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সুমুর ব্যক্তিগত জায়গাটুকুতে অন্য কোনো পুরুষের পরোক্ষ স্পর্শও তার সহ্য হয় না।
শেরাজ কোনো কথা বলল না, কোনো চিৎকার করল না। সে কেবল নিজের ভারী বুট পরা পা দিয়ে ঘৃণাভরে ওই আগন্তুকের জুতোজোড়া এক ধাক্কায় ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল। ময়লা ফেলার মতো করে সেগুলোকে এক কোণায় ছিটকে ফেলে দিল সে। তারপর খুব শান্ত ভঙ্গিতে ঠিক সুমুর জুতোর পাশটিতে নিজের জুতোজোড়া খুলে রাখল—যেন এক নীরব ঘোষণা দিল যে, এই জায়গাটুকুতেও কেবল শেরাজ খানেরই অধিকার।
জুতোজোড়া গুছিয়ে রেখে শেরাজ সোজা হয়ে দাঁড়াল। জোনাকির সেই জারটা তার হাতে তখনো জ্বলজ্বল করছে। শেরাজ ভেতরে ঢুকে এলো। ভেতরে উৎসবের কোলাহল তখনো চলছে, কিন্তু শেরাজের সমস্ত মনোযোগ গিয়ে স্থির হলো সুমুর ওপর। সুমু একপাশে দাঁড়িয়ে সবার সাথে কথা বলছে, কিন্তু তার চোখ দুটো দরজার দিকেই ছিল—যেন সে তার অস্তিত্বের অন্য অংশটির ফেরার অপেক্ষা করছিল।
শেরাজ ধীর পায়ে সুমুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার এক হাত তখনো কোটের পকেটে, আর অন্য হাতে ধরা সেই কাচের জার। জারের ভেতরে জোনাকিগুলো অস্থির হয়ে উড়ছে, যেন এক মুঠো জীবন্ত নক্ষত্র কেউ বন্দি করে এনেছে। শেরাজ কোনো কথা না বলে জারটা সুমুর দিকে বাড়িয়ে দিল।
জোনাকির মিটিমিটি আলোয় সুমুর মুখটা মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বিস্ময়ে দুহাত দিয়ে জারটা চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে এমন এক অকৃত্রিম হাসি ফুটে উঠল, যা দেখে শেরাজ তার বাইরের সব বিরক্তি আর সেই জুতোর স্মৃতি মুহূর্তেই ভুলে গেল। সুমু আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে শেরাজের হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেল বিশাল কাচঘেরা জানালার কাছে। বাইরে সাজেকের অন্ধকার পাহাড় তখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। সুমু জারের ঢাকনাটা আলতো করে খুলে দিল। একঝাঁক জোনাকি মুহূর্তেই জার থেকে বেরিয়ে জানালার ওপাশে মুক্ত আকাশে ডানা মেলল। অন্ধকারের বুকে ছোট ছোট আলোর বিন্দুগুলো উড়তে উড়তে পাহাড়ের খাজে হারিয়ে যাচ্ছিল। সুমু জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে বিড়বিড় করে বলল,
“এদের বন্দি রাখতে ভালো লাগে না খান, সাহেব। এরা তো অন্ধকারের যাত্রী, আকাশেই এদের সৌন্দর্য।”
শেরাজ পেছন থেকে সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। সুমুর চুলে মুখ গুঁজে সে ফিসফিস করে বলল,
“ঠিক যেমন তুমি আমাকে মুক্তি দিয়েছ, সুইটহার্ট। এক বুক অন্ধকার নিয়ে আমি পথ চলছিলাম, আর তুমি জোনাকির মতো এসে আমার জীবনটা আলোয় ভরিয়ে দিয়েছ।”
খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই ড্যান্স ফ্লোরে এলো। আগুনের কুণ্ডলীকে ঘিরে যখন সবাই নাচের মুদ্রায় বিভোর হলো। হঠাৎ আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে থাকা এক মুখোশধারী ঘাতক অত্যন্ত সুকৌশলে ভিড়ের মাঝে মিশে গেল। তার টার্গেট একটাই— শেরাজ খান।
শেরাজ তখন বন্ধুদের সাথে কথা বলছিল, তার পিঠ ঘাতকের দিকে। মুখোশধারী লোকটা তার জ্যাকেটের ভেতর থেকে বের করল একটা ধারালো ছুরি। ঝলসানো আগুনের আলো সেই ছুরির ফলায় প্রতিফলিত হতেই লোকটা ক্ষিপ্র গতিতে শেরাজের পিঠে আঘাত হানতে এগিয়ে গেল। শেরাজ ঘোরার আগেই সেখানে যেন কোনো কালবৈশাখী আছড়ে পড়ল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক জোড়া হাত ঘাতকের কবজি চেপে ধরল। শেরাজ পেছনে তাকিয়ে সুমুকে দেখল। সুমুর চোখের মায়াবী ভাব এখন উধাও, সেখানে যেন এখন আগুন জ্বলছে।
সুমু এক ঝটকায় লোকটার হাতটা পেছনে ঘুরিয়ে দিল। ঘাতক আর্তনাদ করার সুযোগটুকুও পেল না। সুমু কোনো দয়া না দেখিয়ে লোকটার নিজের হাতে থাকা ছুরিটাই লোকটার হাত দিয়ে তার বুকের বাম পাশে, ঠিক কলিজা বরাবর সজোরে গেঁথে দিল। রক্তের উষ্ণ ধারা সুমুর ফর্সা হাতে ছিটকে লাগল, কিন্তু তার চোখের পলক পর্যন্ত পড়ল না।
আশেপাশের লোকজন নাচে-গানে এতই মত্ত যে, অন্ধকারের এই কোণায় ঘটা এই ‘ক্লিন ফিনিশ’ কেউ টেরই পেল না। শেরাজ নিজের স্ত্রীকে এই বিধ্বংসী রূপে দেখে সে অবাক হলো না, বরং তার চোখে ফুটে উঠল এক পৈশাচিক গর্ব। কিন্তু সে জানে, এখানে বাচ্চারা আছে, সাধারণ মানুষ আছে—তাই সে এক মুহূর্ত দেরি না করে পকেট থেকে ফোন বের করল। চোখের পলকে আইয়ুবকে একটা মেসেজ পাঠাল,
“কিল দ্য লাইটস। নাও। গেট এভরিওয়ান অ্যান্ড দ্য কিডস আউটসাইড দ্য কটেজ ইমিডিয়েটলি। পার্টি ইজ ওভার।”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো কটেজের বাইরের সব আলোগুলো হুট করে নিভে গেল। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আইয়ুব আর তার বাকি বন্ধুরা শেরাজের ইশারা বুঝে হইহুল্লোড়ের ভান করে বাচ্চাদের আর অতিথিদের সরিয়ে নিয়ে গেল।
অন্ধকারের নিস্তব্ধতায় এখন কেবল শোনা যাচ্ছে সুমুর ভারী নিঃশ্বাস। শেরাজ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সুমুর রক্তমাখা হাতটা ধরল। সে শান্ত গলায় বলল,
“বইয়ের পাতায় তুমি যেমন আমায় আগলে রেখেছিলে, আজ বাস্তবেও প্রমাণ করলে— তুমি কেবল তোমার খান সাহেবের স্ত্রী নও, তুমি এক ডাইনামাইট। এবার বাকিটুকু আমি সামলাচ্ছি।”
সুমু ঘাতকের মৃতপ্রায় দেহের দিকে একবার তিল পরিমাণ দয়াহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে শীতল গলায় বলল,
“পাঁচ বছর জেল খেটেছি, দরকার পড়লে আরও পঞ্চাশ বছর খাটব! কিন্তু তবুও আমার খান সাহেবের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগতে দেব না। যারা আমার সাজানো সংসার ভাঙতে আসবে, তাদের কলিজা আমি এভাবেই ছিঁড়ে নেব।”
শেরাজ নিঃশব্দে সুমুকে পর্যবেক্ষণ করল। সে আবারও সুমুর রক্তমাখা হাতটা আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব শান্তভাবে সুমুকে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে মুখ রাখল। তার তপ্ত নিঃশ্বাসে সুমুর শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠল। শেরাজ খুব নিচু আর শান্ত স্বরে বলল,
“এবার শান্ত হও, সুইটহার্ট। তোমার এই হাত কলম ধরার জন্য, কারো রক্তে ভেজানোর নেওয়ার জন্য নয়।”
খান সাহেব পর্ব ৯৫
শেরাজের স্পর্শে সুমুর টানটান হয়ে থাকা শরীরটা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এলো। শেরাজ ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে ওকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। সুমু যে তার জন্য কতটা বেপরোয়া হতে পারে, সেটা আজ আবারও সে নিজের চোখে দেখল। সে পকেট থেকে রুমাল বের করে সুমুর হাতের রক্তটুকু মুছে দিয়ে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, ‘ভোর হলেই সাজেক ছাড়বে তারা’।
