খান সাহেব পর্ব ৯
সুমাইয়া জাহান
ঘড়ির কাঁটায় সকাল দশটা ছুই-ছুই। ভোরের আলো ফুটেছে আরও অনেক আগে। জেগে উঠেছে দর্শনাবাসি। কোলাহল পূর্ণ দর্শনা টাউনে মানুষের আনাগোনা শোনা যাচ্ছে। স্টেশন থেকে ভেসে আসছে ট্রেনের শব্দ।
সিকদার বাড়িতে আজ আনোয়ার সিকদারের বড় মেয়ের গায়ে হলুদ। সকলে সকালের নাস্তা শেষ করে কাজে লেগে পড়েছে। বাড়ির বাহিরের মেইন গেটটাকে সুন্দর করে সাজাচ্ছে ডেকোরেশনের লোকরা। আনোয়ার সাহেব চেয়েছিলেন, বাড়ির ছাদে গায়ে হলুদের প্যান্ডেল করতে। কিন্তু বিয়ে বাড়িতে অনেক ছোট বাচ্চারা আছে বলে, গার্ডেনে সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
গার্ডেনের একপাশে খুব সুন্দর করে গায়ে হলুদের স্টেজ সাজানো হচ্ছে। স্টেজের সামনে অনেকটা জায়গা নাচ-গানের জন্য ফাঁকা রেখে, একটু দূরে-দূরে সকলের বসার জন্য চেয়ার পেতে দেওয়া হয়েছে। গার্ডেনের অন্য পাশে চেয়ার-টেবিল পাতানো হয়েছে, সকলকে একসাথে বসিয়ে খাওয়ানো হবে বলে। খাবার জায়গার প্যান্ডেলের থেকে একটু দূরে দুপুরে রান্নার প্রস্তুতি চলছে। আনোয়ার সাহেব ব্যস্ত আছেন, দুপুরে আর রাতে কি কি আইটেম হবে ওইটা দেখতে। রিসাত সাহেব, ইফতিয়াক সাহেব, শামীম সাহেব সকালের নাস্তা করে বাজারে চলে গেছেন, বিয়ের বাজার করতে। বাড়ির সকল মহিলারা বাটা-বাটি, কাটা-কাটিতে ব্যস্ত। হাসি বেগম বাড়ির ভেতরেই আছেন। যারা এখনো নাস্তা করেননি, তাদের নাস্তা দিচ্ছেন তিনি। সামিয়া, রাইশা, নাজমিন, তিশা, রাইফ, মাহি, ইফতিয়া ও রাইশার সব ফ্রেন্ডরা মাইশার সাথে বসে গল্প করছে। ইফতিয়া চড়ের দাগটা মেকাপের সাহায্যে ডেকে রেখেছে। ওর এতো সকাল-সকাল মেকাপ করা দেখে কেউ অবশ্য অবাক হয়নি। এমনিতেও সে অলওয়েজ নিজেকে মেকাপের সাহায্যে সাজিয়ে রাখে। নিজেকে বেশি ওভারস্মার্ট প্রমাণ করতে গিয়ে, ক্ষ্যাত প্রমাণ করে ফেলে মেয়েটা। কিন্তু প্রতিদিনের তুলনায় আজকে একটু বেশি মেকাপ করেছে সে। রাইশা জিঙ্গাসা করাতে বলেছে,
“আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই করেছি।”
ইফতিয়ার এমন ত্যাড়া কথা শুনে, কেউ আর ওকে কিছু জিঙ্গাসা করেনি।
সুমু সকালের নাস্তা করে রুমে চলে গেছে। কালরাতে না খেয়ে ঘুমানোর ফলে সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠেই খুব খিদে পেয়েছিল তার। রাতে ঘুমের ঔষধ না খেয়ে ঘুমালে হয়তো, মাঝরাতে উঠে চোরের মতো খেতে হতো তাকে। নিজের বাসায়ও সে রাত জেগে ফোন টিপবে আর মাঝেরাতে খিদে পাবে তার। তখন উঠে এটা ওটা খাবে।
রাতের ঘুমটাও বেশ ভালো হয়েছে সুমুর। এখন নিজের রুমে ফোন হাতে নিয়ে বসে আছে সে। ভেবেছিল মানুষটা সরি বলবে। কিন্তু না, সরি কেনো? সিম্পল একটা টেক্সটও করেনি সে। সুমু অনেকবার কাঙ্ক্ষিত রুমটার সামনে গিয়েছিল। কিন্তু রুমটা ভেতর থেকে বন্ধ। হয়তো এখনো ঘুমাচ্ছে সে। সুমু নিজেকেই নিজে বকলো। সে বলল,
“তুই কি রে হ্যাঁ সুমু? কার থেকে কি আশা করেছিস? দ্য ওয়ার্ল্ড ফেমাস শেরাজ খান বাহাদুরখেল। ওমানের একমাত্র বিজনেস টপার, লখো মেয়েদের নাম্বার ওয়ান ক্রাশ, সে কিনা এই সামান্য তোকে সরি বলবে? অসম্ভব।”
মুখ দিয়ে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল সুমু। ফোনটা বিছানার ওপর রেখে রুম গোছাতে লাগল সে। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ল তার। পুরো ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল সে।
শেরাজ আর রাহিন ফরজের নামাজ আদায় করে প্রায় ভোর ছয়টার দিকে বাসায় ফিরেছে। এসেই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে দু’জন। সেই ঘটনার পর থেকে আইয়ুবরাও আর চোখের পাতা এক করেনি। অপেক্ষায় ছিল শেরাজদের ফিরে আসার। রাহিন ওদের বলেছে ঘুম থেকে উঠে সবটা জানাবে। আইয়ুবরা এখন অপেক্ষায় আছে রাহিনের ঘুম থেকে উঠার।
আইয়ুবরা বসে আছে নিজেদের ঘরে। সকলে চুপচাপ। হঠাৎ রিয়াদ বলল,
“ঘুম যা পাচ্ছে ভাই।”
আইয়ুব একটুখানি হেসে বলল,
“ওদের জন্য আমরা রাত জাগলাম, আর ওরা এখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।”
নিহাল হাত দিয়ে চোখ ডলে বলল,
“ঠিক বলছিস, আইয়ুব। এই রাহিনকে টেনে তোল।”
সারবাজ বলল,
“আরে না, ঘুমাতে দে। নয়তো সবটা বলার সময় বারবার ঘুমে ঢলে পড়বে।”
সেই মুহূর্তে রাহিন হালকা হাঁচি দিয়ে চোখ খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু ঘুমের রাজ্যে চলে গেল।
রিসান হাসতে-হাসতে বলল,
“দেখছিস! কি ঘুম ঘুমাচ্ছে?”
আইয়ুব হেসে বলল,
“ঘুম দেখে মনে হচ্ছে, রাতে না ঘুমিয়ে চুরি করতে বেরিয়েছিল।”
সবাই হেসে উঠল। রুমের মধ্যে পরিবেশটা ফানি হয়ে উঠল।
বেলা এগারোটায় ঘুম ভাঙলো রাহিনের। সে উঠে ফ্রেশ হয়ে পা ঝুলিয়ে বসে আছে বিছানার ওপর। তাকিয়ে আছে কৌতূহলপূর্ণ বন্ধুগুলোর মুখের দিকে। যারা এখন রাহিনের থেকে সবটা শোনার জন্য রাহিনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
রাহিন ওদের একরাশ আগ্রহের মধ্যে পানি ঢেলে দিয়ে বলল,
“আমার অনেক খিদে পেয়েছে গাইজ। আগে আমাকে ব্রেকফাস্টটা করতে দে।”
আইয়ুব বিরক্ত হলো খুব। সে রাগের সূরে বলল,
“তুই কি আমাদের সাথে ইয়ার্কি মারছিস রাহিন? বুঝতে পারছিস না আমরা কতোটা সিরিয়াস?”
“আরে ভাই, সত্যি আমার খুব খিদে পেয়েছে। পেটে খাবার না পরলে, আমার পক্ষে কিছু বলা পসিবল না।”
সারবাজ বলল,
“আইয়ুব ওকে খাবারটা খেয়ে নিতে দে। তবে এই রুমে খাবারটা আনার ব্যবস্থা কর।”
রাহিন বলল,
“তাই কর। আর শোন! আমার পিচ্চি বউটা যেন খাবারটা দিতে আসে। ওইটা একটু দেখিস।”
অমিত রাগেরসূরে বলল,
“শা*লা তুই কি শশুর বাড়ি এসেছিস? যে বউ এসে খাবার দিয়ে যাবে?”
রাহিন অমিতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“নিজের শশুর বাড়ি না হোক। বউয়ের শশুর বাড়ি তো এসেছি।”
রাহিনের কথায় বিরক্ত সকলে।
সারবাজ বলল,
“আইয়ুব তুই নিচে যা। সামিয়াকে খুঁজে রাহিনের জন্য খাবার নিয়ে আয়।”
রাহিন একটু ভেবে বলল,
“আর শোন! সামিয়া, নাজমিন দুজনকেই নিয়ে আসবি। ওরা যেহেতু এখন আমাদের টিমের মেম্বার, সেহেতু ওদেরও সবটা জানা উচিত। ব্যাপারটা এমন যে ওরা জানলে আমাদের সুবিধা হবে।”
কেউ বুঝতে পারল না যে, কি এমন হয়েছে— যার জন্য নাজমিন আর সামিয়াকে ডাকতে বলল রাহিন।
দশ মিনিটের মাথায় রুমে এসে হাজির হলো ওরা তিনজনে। সামিয়ার হাতে খাবারের প্লেট। খাবারটা টেবিলের ওপর রাখল সামিয়া। রাহিন ওয়াশরুম থেকে হাত ধুয়ে এসে খেতে বসল। সামিয়া আর নাজমিন দাঁড়িয়ে রইল একসাইডে।
খাওয়া শেষে করে প্লেটটা জায়গা মতো রেখে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে আসলো রাহিন। বিছানার ওপর পা ঝুলিয়ে বসে সবটা খুলে বলল সবাইকে।
সকলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল রাহিনের দিকে। কারো মুখে শব্দ নেই। নাজমিন আর সামিয়া অবাকের শেষ সিমানায়। শেরাজ খান মেয়েদের ক্রাশ হলেও, মেয়েরা ভয় পায় তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে— সেইখানে ইফতিয়া এমন একটা কাজ করল কোন সাহসে।
সামিয়া নিরবতা ভেঙ্গে বললো,
“মামার মান-সম্মান রাখল না— এমন একটা কাজ কীভাবে করতে পারল ও?”
নাজমিন বলল,
“এইজন্যই আজ এতো মেকাপ করেছে। চড়ের দাগ লুকানোর জন্য।”
রাহিন বলল,
“এতোকিছুর মধ্যেও একটা খুশির খবর আছে। শেরাজ কাল ওর সব ফিলিংসের কথা আমাকে জানিয়েছে।”
কথাটা শোনা মাত্রই সকলের মধ্যে খুশি জোয়ার বয়ে গেল।
দরজার আড়াল থেকে সবটায় শুনলো সুমু। শুধু রাহিনের শেষের কথাগুলো তার কান পযর্ন্ত গেল না। তার আগেই ওই জায়গা ত্যাগ করেছে সে।
সুমু সামিয়াকে খুঁজতে এসেছিল, নিজের প্রিয় কানের দুল জোড়া পাচ্ছিলো না বলে। কাল সন্ধ্যায় খান সাহেবের থেকে এমন কথা শুনে কাঁদতে-কাঁদতে রুমে এসেছিল সে। হাতের চুড়ি, কানের দুল সব খুলে ছুড়ে মেরেছিল। তারপর আর খুঁজে দেখেনি। ভেবেছিল তার বোন তুলে রেখেছে। সেই ভেবেই ড্রয়িংরুমে গিয়েছিল মাইশাদের কাছে, সামিয়াকে জিঙ্গাসা করবে বলে। কিন্তু মাইশা জানায়, সামিয়া আর নাজমিন রাহিন ভাইয়ার রুমে খাবার দিতে গেছে— কথাটা শোনা মাত্রই রাহিনের রুমের উদ্দেশ্যে চলে আসে সুমু। কিন্তু এখানে এসে এমন কিছু শুনবে আশা করেনি সে।
রুমের ভেতর থেকে আসা আর কোনো কথা তার কানে গেল না। দৌড়াতে- দৌড়াতে মাইশার রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিল সুমু। টেবিল থেকে পানির ক্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে পানিটা খেয়ে নিল সে। রাহিনের বলা কথাগুলো এখনো কানে বাজছে তার। পানির গ্লাস হাতে নিয়েই বিছানার ওপর পা ঝুলিয়ে বসল সে। পানির গ্লাসের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে বাঁকা হাসল সে। গ্লাসটা হাতে নিয়ে রুম ছাড়ল— স্টোর রুমে যাবার উদ্দেশ্যে।
স্টোর রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো সুমু। ফোনের ফ্লাশলাইট জ্বালিয়ে কিছু একটা খুঁজতে লাগল সে। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা পেয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল তার। হাতুরিটা হাতে নিয়ে কাচের গ্লাসটা ভেঙে গুড়োগুড়ো করে ফেলল। গুড়োগুলোকে খুব সাবধানের স্টোর রুমে থাকা একটা ছোট বোতলের মধ্যে ভরে নিল সে। হাতুড়িটাকে জায়গা মতো রেখে দিল। কাচের গুড়ো পড়ে থাকা যায়গাটা ভালো করে পরিষ্কার করে রাখল। বোতলটা ওড়নার নিচে লুকিয়ে স্টোর রুম ছেড়ে বেরিয়ে এলো সুমু।
বেলা বাজে একটা। শেরাজ ঘুম থেকে উঠে একবারে শাওয়ার নিয়েছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছিল সে। ওপরের দুইটা বোতাম খোলা রেখে দিল। সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজারে মারাত্বক হ্যান্ডসাম লাগছে তাকে। রোজকারের মতো একে একে ফিংগার রিং, ডান হাতে কালো ব্যাচ পড়ে নিল। বা হাতে আজ পড়েছে কালো ঘড়ি। চুলগুলো জেল আর স্প্রে দিয়ে সেট করে নিল। শেষে তার ফেভারিট “দি ম্যান” বডি স্প্রে’টা ব্যবহার করল। শার্টের হাতা ফোল্ড করতে-করতে টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে চলে গেল বেলকনিতে। ইনস্টাগ্রামে ঢুকে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় টেক্সট পাঠালো। সাথে সাথে টেক্সটা সিন হলো। অনলাইনেই ছিল তার প্রেয়সী। ঠোঁটে মৃদু হাসি রেখে চেয়ারে বসল।
বিশ মিনিটের মাথায় রুমে দরজায় এসে দাঁড়াল সুমু। ঠোঁটে তার একচিলতে হাসি। হাতে খাবার আর চায়ের কাপ। নক করতেই ভেতর থেকে রুমে ঢোকার পারমিশন পেল। রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো সুমু। কাল রাতের রাগটা এখন আর নেই সুমুর। এখন আছে শুধু একরাশ মুগ্ধতা আর এক আকাশ সমান ভালোবাসা।
হাতের ট্রে’টা নিয়ে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল সুমু। কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেল তার হৃদয়। অশান্ত হলো মন। সেই প্রথম দিনের মতোই ফিলিংস তার। নিজেকে কোনোমতে সামলে, খাবারটা টেবিলের ওপর রাখল সুমু। শেরাজের চোখ দুটো ফোনের স্ক্রিনে আটকে আছে। এখন পর্যন্ত চোখ তুলে তাকায়নি সে। সুমু ছোট্ট একটা ঢোক গিলে বলল,
“আপনার ব্রেকফাস্ট আর চা।”
কথাটা শুনলো শেরাজ। কিন্তু চোখ তুলে তাকাল না। হঠাৎ ইফতিয়ার চিৎকার ভেসে এলো দুজনের কানে। সুমু আর এক সেকেন্ডেরও দাঁড়াল না। হন্তদন্ত হয়ে ছুটল ড্রয়িংরুমের উদ্দেশ্যে।
শেরাজ ঠাঁয়ে বসে রইল। হঠাৎ বেলকনি থেকে তার নজর গেল বাগানের দিকে। সুমু হন্তদন্ত হয়ে বাগানে ছুটছে। গাঁদা ফুলের গাছ থেকে কিছু পাতা ছিঁড়ে, দুই হাতের তালুর সাহায্যে রস বের করে একটা বাটিতে ভরে নিল। তারপর ওড়নার নিচ থেকে একটা কৌটা বের করল সুমু।
শেরাজের ডাউট লাগল ব্যাপারটা। সে মনযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইল বাগানে থাকা প্রেয়সীর দিকে। সুমু কৌটা থেকে কিছু একটা ঝাঁকিয়ে দিল বাটিতে থাকা পাতার রসের মধ্যে । তারপর আবারও কৌটা’টাকে লুকিয়ে দৌড়ে চলে এলো বাড়ির ভেতরে।
শেরাজ আর বসে রইল না। উঠে রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
ড্রয়িংরুমে মানুষে ভর্তি। ইফতিয়ার কান্নার আওয়াজে সকলে হাজির হয়েছে। ইফতিয়া ড্রয়িংরুমের সোফার ওপর বসে অনবরত কেঁদে যাচ্ছে। খুশি বেগম মেয়ের পাশে বসে হাউমাউ করে কাঁদছে। সুমু গাঁদা ফুলের রস দিয়ে ইফতিয়ার দুইহাতের তালুর রক্ত পড়া বন্ধ করছে। রস দেওয়ার সাথে-সাথে ইফতিয়া গগন ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। খুশি বেগম সুমুকে ঝাড়ি মেরে বললেন,
“এই, তুই ওটা কি দিচ্ছিস? সরা ওটা। আমার মেয়ের কতো কষ্ট হচ্ছে দেখছিস না।”
মিনা বেগম বললেন,
“খুশি আপা! ওটা গাঁদা ফুলের রস। ওটা দিলে একটু জ্বলবে, কিন্তু রক্ত পড়া বন্ধ হবে।”
সুমু দুইহাতে খুব ভালো করে রসটা লাগিয়ে দিল।
আনোয়ার সাহেব এসে বললেন,
“ডাক্তার আর কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পড়বে।”
ডাক্তার এলো ত্রিশ মিনিটের মাথায়। তিনি এসে ইফতিয়ার হাত ভালো করে চেকআপ করলেন। হাতের ভেতরে কাঁচের গুড়ি ঢুকে আছে ইফতিয়ার। দুটো হাতের তালুই ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে। ডাক্তার খুব ভালো করে হাত চেক করে কাচের টুকরো বের করলেন। হাতে মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে চলে গেলেন তিনি।
আনোয়ার সাহেব বললেন,
“শ্যাম্পুর ভিতর কাচের টুকরো কিভাবে আসলো? ব্যাপারটা খুব অস্বাভাবিক।”
উপস্থিত সকলে খুব আশ্চর্য হয়ে আছে। এটা কিভাবে সম্ভব হলো, কেউ বুঝতে পারছেনা।
খুশি বেগম বললেন,
“ওই শ্যাম্পু আমার ইফতিয়া আগেও ব্যবহার করেছে। আমি আপনাকে বলছি ভাইজান। কেউ ইচ্ছে করে আমার মেয়ের ক্ষতি করার জন্য এমনটা করেছে।”
আনোয়ার সাহের বোনের কথায় বিরক্ত হলেন। তিনি বিরক্তির সুরে বললেন,
“আহ্! খুশি; এইসব কি ধরনের কথা? এইখানে সকলে তোমার মেয়ের আপন। কেউ কেনো ইফতিয়ার কোনো ক্ষতি করতে যাবে?”
“কিন্তু ভাইজান…”
“আহ্! থামো তুমি। যা হবার হয়ে গেছে। এই ব্যাপারটা বাদ দাও। ইফতিয়াকে রুমে দিয়ে আসো। ও একটু রেস্ট নিক। আর সকলে যার যার কাজে যাও। বিয়ে বাড়ি আনন্দ করো সকলে।”
করিডরে দুইহাত পকেটে ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শেরাজ। ড্রয়িংরুমে এতোক্ষণে ঘটে যাওয়া পুরো কাহিনী দেখল সে। সেই সাথে তার নজরে এলো প্রেয়সীর ঠোঁটের তৃপ্তির হাসি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে কতোটা খুশি। চোখে-মুখে খুশির ঝলক ফুটে উঠেছে তার। ব্যাপারটা সবার নজর এড়িয়ে গেলেও, এড়িয়ে যায়নি শেরাজের চোখ থেকে। এই কাজের মাস্টারমাইন্ড কে শেরাজের আর বুঝতে বাকি নেই। আর কাজটা কেনো করেছে, সেটাও বুঝে গেল মুহুর্তের মধ্যেই। পাতার রসের কাহিনীটাও বুঝে গেল শেরাজ।
সে আর দাঁড়িয়ে রইল না। রুমের মধ্যে ঢুকে দরজা লাগাতে যাবে, তখনি হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল তার সবগুলো ফ্রেন্ড। শেরাজ দরজা থেকে সরে গিয়ে ডিভানের ওপর বসল। তার সবগুলো ফ্রেন্ড রুমে ঢুকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শেরাজের দিকে। সকলকে তাকিয়ে থাকতে দেখেও, শেরাজের মধ্যে কোনো হেলদোল হলো না। সে নিশ্চিন্তে বসে ফোনে স্ক্রল করছে।
রাহিন শেরাজের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“ইফতিয়ার সাথে এমনটা তুই করেছিস এস.কে?”
শেরাজ ফোনের দিকে চোখ রেখেই বলল,
“হয়তো।”
আইয়ুব বলল,
“কিন্তু, কখন তুই এইটা করলি? তুই তো ঘুম থেকেই উঠেছিস একটু আগে। আর তাছাড়া তুই তো এমন টাইপ ছেলে না যে, অনুমতি ছাড়া কারো রুমে যাবি— তাও কিনা মেয়েদের রুমে।”
শেরাজ ভাবলেশহীনভাবে উত্তর দিল,
“তাহলে হয়তো আমি না।”
শেরাজের এমন ঘাড়ত্যাড়ামি উত্তর কারো ভালো লাগল না।
রাহিন বলল,
“তুই কাল আমাকে জিঙ্গাসা করেছিলি যে, ইফতিয়ার হাতদুটো না থাকলে, আমি খুব কষ্ট পাবো কিনা। তাহলে এখন তুই বল এস.কে— এই কাজ কে করেছে? প্লিজ, লুকাসনা ভাই, বল কে করেছে? কাজটা যে করেছে, সে একদম ঠিক কাজ করেছে।”
শেরাজ বলল,
“এই কাজ যে করেছে। সে এই কাজটা না করলে, অবশ্যই ওই অসভ্য মেয়েটার হাতদুটো রাখতাম না আমি।”
আইয়ুব বলল,
“তাহলে তুই জানিস শেরাজ, এই কাজ কে করেছে?”
“আইয়ুব, আমি আমার জীবনে সঠিক মানুষটাকেই সিলেক্ট করেছি।”
সকলে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। কারো আর বুঝতে বাকি রইল না এই কথার মানে।
নিহাল বলল,
“বাহ্! যেমন দেবা তার তেমন দেবী।”
সকলে হেসে ফেলল নিহালের কথায়।
আইয়ুব বলল,
“ভাই তোরা দুজন এক হবি? মানে একজন সিংহ তো আরেকজন সিংহীনি। জমে যাবে মামা।”
শেরাজ মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,
“একজন শেরের সাথে একজন শেরনিকেই মানায়।”
সাইফ বলল,
“কিন্তু তুই বুঝলি কি করে, এই কাজটা সুমু করেছে?”
রিসান বলল,
“শা*লা ও ওমানের নাম্বার ওয়ান বিজনেসম্যান। তুই হয়তো ভুলে গেছিস, ও আর কেউ না— ও শেরাজ খান। জহুরির চোখ ওর। ওর জন্য এই সামান্য জিনিসটা বোঝা কোনো ব্যাপার না।”
রাহিন বলল,
“সেসব তো বুঝলাম। কিন্তু, সুমু কি করে জানতে পারল কাল রাতের ঘটনা?”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“জানতে পারল কিভাবে মানে? তোরা বলিসনি ওকে?”
আইয়ুব বলল,
“না। শুধু সামিয়া আর নাজমিন জানে।”
অমিত বলল,
“কিভাবে জেনেছে সেটা বড় কথা না। কাজটা সুমু দারুন করেছে। আই এপ্রিসিয়েট হার।”
এভাবেই চলল তাদের আড্ডা। আর একে অপরের পিছে লাগা।
সন্ধ্যারাত। পুরো সিকদার বাড়ি অসাধারন সুন্দর করে লাইটিং করা হয়েছে। চারপাশে মরিচ বাতির আলোয় আলোকিত। পার্লারের মেয়েরা এসে বাড়ির মেয়েদের সাজিয়ে দিয়ে গেছে। সুমু কিছুতেই শাড়ি পরতে চাইছিল না। মাইশা অনেক রিকোয়েস্ট করে, ওকে শাড়ি পড়িয়েছে। কিন্তু পার্লারের মেয়েদের দিয়ে সাজেনি সুমু। ঠোঁটে একদম হালকা গোলাপি লিপস্টিক আর কিছু সিম্পল অর্নামেন্টস পড়েছে শুধু। কোমর পযর্ন্ত চুলগুলো খোলা রেখেছে— এতেই অপূর্ব লাগছে তাকে।
গায়ে হলুদের জন্য আর্টিফিশিয়াল অর্নামেন্টস কেনা হয়েছে সবার জন্য। সুমু সেগুলো পড়েনি। বাড়ির সকল মেয়েদের সাজ এক— শুধু সুমুর আর মাইশার ভিন্ন।
মাইশা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ঘুরে-ঘুরে দেখছে। কথায় বলে মেয়েদের বিয়ের ছোঁয়া লাগলে সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। মাইশাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কথাটায় কোনো ভুল নেই। অপরুপ সুন্দর লাগছে তাকে। ফর্সা শরীরের ওপর হলুদ শাড়ির সাথে অর্নামেন্টসগুলো ফুটে উঠেছে তার।
এদিকে, বাড়ির সকল ছেলেরা আজ একই রকমের কালো পাঞ্জাবী পড়েছে। আর মহিলারা সকলে হলুদ কালারের শাড়ি পড়েছে।
শেরাজ এখনো রেডি হয়নি। সে বসে-বসে ফোনে স্ক্রল করছে। শেরাজের এমন কান্ড দেখে আইয়ুবরা সকলে হতভম্ব।
সারবাজ এগিয়ে এসে বলল,
“তুই এখনো রেডি হসনি কেনো?”
শেরাজ সারবাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি কি মেয়ে মানুষ, যে সন্ধ্যা থেকে রেডি হতে শুরু করব? অনুষ্ঠান এখনো শুরু হয়নি। অনুষ্ঠান শুরু হবার আগেই আমি রেডি হয়ে যাব।”
আইয়ুব বলল,
“কি রে তুই পাঞ্জাবী পড়বিনা?”
শেরাজ কোনো উত্তর দিলো না। সে ফোনে স্ক্রল করতে লাগল।
সারবাজ বলল,
“কেনো পড়বেনা? অবশ্যই পড়বে। এই শেরাজ সকলে ম্যাচিং-ম্যাচিং পাঞ্জাবী পড়ব আজ। অনেক ভিডিও ক্লিপ নিব।”
রিহান বলল,
“যা না ভাই। রেডি হয়ে আয়।”
শেরাজ বলল,
“চা-টা খেয়ে। তারপর রেডি হবো।”
আইয়ুব বলল,
“চা? এখন তুই চা পাবি কোথায়?”
“আসছে।”
তখনই দরজায় নক পড়ল। পারমিশন পেয়ে ভেতরে ঢুকলো সুমু। সকলে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। শেরাজের হৃদয় থমকে গেল। এমন কিছু প্রত্যাশা করেনি সে। এই মেয়ে সত্যি তাকে খুন করার প্ল্যান করেছে।
শাড়িতে একদম বউ বউ লাগছে সুমুকে। অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে শেরাজ। চোখের পলক পড়ছেনা তার। আইয়ুব শেরাজের তাকিয়ে থাকা দেখে গলা খাঁকিয়ে উঠল। এতে ধ্যান ভাঙালো শেরাজের। সে চোখ বলল,
“চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে, রুম থেকে যাও।”
সুমু চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল।
আইয়ুব বলল,
“ইশ! আজ এমন কেউ নেই বলে, আমাকে পার্সোনালি চা দিতে আসে না।”
আইয়ুবের কথা শুনে সকলে একসাথে হেসে উঠল।
শেরাজ বিরক্তির চোখে তাকাল আইয়ুবের দিকে। তারপর রাহিনের উদ্দেশ্যে বলল,
“এই রাহিন, নাজমিনকে বলিস তো আইয়ুবকে প্রতিদিন নিজের হাতে পার্সোনালি চা দিয়ে যেতে।”
শেরাজের কথায় সকলে আইয়ুবের দিকে তাকাল। আইয়ুব আমতা-আমতা করে বলল,
“ও..ওই ঝগড়াটে মেয়েটা কেনো আমাকে কেনো পার্সোনালি চা দিতে আসবে? আর ও দিলেই বা আমি খাব কেনো?”
শেরাজ বলল,
খান সাহেব পর্ব ৮
“তার উত্তর তোর কথার ধরনেই বোঝা যাচ্ছে।”
আইয়ুবের চুরি করে ধরা পড়ার মতো অবস্থা। সে থতমত খেয়ে বলল,
“তোর কি সবদিকেই নজর থাকে এস.কে? কোনো কিছুই তোর থেকে লুকানো যায় না।”
শেরাজ হেসে ফেলল। সে চা-টা শেষ করে পাঞ্জাবী নিয়ে চলে গেল চেঞ্জ করতে।
