চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮২
ইশরাত জাহান জেরিন
ফারাজ ঘড়ির দিকে চাইল। দশটার মতো বাজে। বউয়ের কিছু খাওয়া হয়নি। এলাহী বাড়ি এখনো শোক সামলে উঠতে পারেনি। নিজেই নিচে যায়। বউ খিচুড়ি আর গরুর কালো ভুনার আবদার করেছে। যাওয়ার আগে পেছন ফিরে একবার বলে, “নিরুর বিড়ালটাকে সত্যি তুমিই মেরেছিলে?”
চিত্রা এবার মাথা নিচু করে বলল, “না।”
“তাহলে মিথ্যা কেন বললে?”
“আপনার মুখের রিয়াকশন দেখতে চেয়েছিলাম। আপনি কত চালাক, ঠিকই ধরে ফেললেন।”
ফারাজ কিছু বলল না। নিচে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একা হাতে সব সামলে খাবার তৈরি করে বউকে খাইয়ে দিলো সে। কথা বলতে বলতে আজকে বউটা হাঁপিয়ে গিয়েছে। চিত্রা খেয়ে মোহনার ঘরে যাবে বলে আবদার করতেই ফারাজ বলল, “চলো আমিও যাবো তোমার সাথে।”
রুম থেকে বের হতেই দেখল অভ্র আর আয়েশা নামছে। ফারাজ, অভ্রকে জিজ্ঞেস করল, “সব ঠিক হয়েছে?”
“বউ ছাড়া রাতে ঘুমাতে পারি না, এখন এই হলো জ্বালা। দুই-চার দিন দূরত্ব বজায়ও রাখতে পারব না।” ফারাজ হাসল। সকলে মোহনার ঘরে যেতেই চিত্রা রুমের জিনিস গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলল, “মোহনা আপা এত জলদি হেরে যাবে বুঝতে পারিনি।” বলতে না বলতেই সে কান্না করে দিলো। ফারাজ তাকে থামানোর চেষ্টা করল না। তবে হঠাৎ বারান্দার সামনে গেল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “একটা ছবি দেখাই, তারপর তুমি জবাব দিও চিত্রা।”
চিত্রা জবাব দিলো না। ফারাজ ফোন বের করে একটা ছবি খুঁজে বের করে বলল,”দেখোতো চিনতে পারো নাকি?”
চিত্রা ভালো করে দেখল। এটা আসলে সেই ব্যক্তির ছবি যে কিনা রোজকে গুলি করেছিল। “এটা তোমাদের সংস্থার লোক। এখন বলো সে রোজকে কেন গুলি করেছে?”
চিত্রা একটু অবাক হলো। আয়েশার দিকে তাকাতেই আয়েশা বলল, “আমিও তো জানি না। সিউর তো এই লোকই রোজকে গুলি করেছে?”
ফারাজ আয়েশার দিকে তাকিয়ে বলল, “না সিউর হয়ে তো কিছু বলছি না। এই একজনের মাধ্যমেই তোমাদের এত গল্প জানলাম।”
চিত্রা ফারাজের দিকে চেয়ে বলল, “বাবাকে বলব বিষয়টা দেখতে, আপনি চিন্তা করবেন না।”
“আপনার গায়ে কে তীড় চালানোর চেষ্টা করেছিল সেই খোঁজ নিয়েছেন?”
“খোঁজ নেওয়ার দরকার নেই। আমি জানি এটা কার কাজ।”
“কার?”
“আছে একজন। জার্মান মাফিয়া। অ্যাপোলো না। একবার ঝামেলা হয় তার সঙ্গে ডিল ক্যান্সেল করেছিলাম। সেই প্রতিশোধ নিতেই আমার ফ্যাক্টরীতে আগুন লাগায় সে। আর তীড়টাও তার আদেশে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। রুমে চলো, তোমার শরীর এমনিতেও ভালো না।”
চিত্রা মাথা নেড়ে সাই দেয়। রুমে যাওয়ার আগে ওপর থেকে দোতলার অন্দরমহলে বসে থাকা নেতিয়ে পড়া রুমানাকে দেখতে পায়। পাশেই জুনায়েদ ছিলেন। চিত্রা জুনায়েদের দিকে একবার ওপর থেকে তাকিয়ে ফারাজকে ধীর কণ্ঠে বললেন, “জুনায়েদ আর রুমানা একই দলের। ওরা অকালে ঝরে যাবে। মরা অলরেডি। তবে জুনায়েদ চাচার এনার্জি আছে বলতে হবে। বুড়ো বয়সেও এলাহী বাড়িতেই মেয়ে নিয়ে ঢুকেন।”
“ওমা তাই নাকি?”
“হুম একবার তার রুম থেকে মেয়ে মানুষের শব্দ শুনেছিলাম। ওইদিন হাতে নাতে ধরার কথা ছিল, মাঝে জোহান এসে জামেলা করে দিলো।”
“হয়েছে এখন রুমে গিয়ে ঘুমাবে আর কথা নয়। আমার যদি আর কিছু জানার থাকে তাহলে আমি পরে জিজ্ঞেস করে নিবো।”
“আপনার যা মর্জি জামাইজান।”
ফারাজ চিত্রার হাত ধরে তাকে রুমে নিয়ে যায়। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বাতি বন্ধ করতে যাবে হঠাৎ ফারাজ চিত্রাকে প্রশ্ন করে, “সোহান তো মনে হয় বিরাট কিছু একটা করবে এবার।”
চিত্রা হেসে বলল, “আর করতে পারবে না।”
“কেন পারবে না?”
“কারণ তার হাত-পা ভেঙে ফেলা হয়েছে। প্রতিটি মানুষের একটা দূর্বল দিক থাকে। এখন সে যতই কঠোর হোক না কেন। পাথরও কিন্তু ভাঙা যায় বুঝলেন তো ফিজার আব্বু।”
ফারাজ হাসল। “নামটা তাহলে মনে আছে।”
“আপনি ছেলে চান নাকি মেয়ে?”
“আল্লাহ যেটা দিবে সেটাই নিবো। বাচ্চা ছেলে হোক কিংবা মেয়ে, আমার তাতে কিছু আসে যায় না। যাই হোক না কেন ওরা আমার সন্তান।” ফারাজ চিত্রার পেটে একটা চুমু দিয়ে বাতি নিভিয়ে দিলো। তাতেই চিত্রা বলল, “আপনি ঘুমাবেন না?”
“আমার ঘুমাতেই হবে?”
“হুম।”
ফারাজ তার পাশে শুয়ে পড়ল। চিত্রাকে বুকের ওপর নিয়ে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিলো, পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। সময় লাগল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই চিত্রা চোখ বন্ধ করে ফেলল। ফারাজ তখন নিজের কপালের ওপর হাত রেখে ভাবনায় চলে গেল। মনের অজান্তে মনকে বলে উঠল, “বিবিজান, তোমাকে আমি এই জন্যে ছোটলোক বউ বলিনা। তুমি কী ভেবেছো তুমি যেই সত্য আজ বললে সেই সত্য আমি জানি না? জানি জানি বউ, সবই জানি। সে তো অনেক আগেই জেনেছিলাম কখন জানো? যখন সুলেমান এলাহী মারা যায়। এক সুলেমান এলাহীর খুনীকে খুঁজতে গিয়ে সকলের সব ঘটনা বের হয়ে আসে। আমি ফারাজ তোমায় সকল রূপেই ভালোবাসি। তোমায় আমি বাড়ি থেকে ধাক্কা মেরে বের করে দিয়েছি ওটার জন্য সরি। আমি তো অনেক অপেক্ষা করলাম, তোমার মুখ থেকে সত্য শোনার জন্য। আমি তোমায় ফেলে না দিলে, তুমি কখনোই উঠে দাঁড়াতে না। জীবনে কখনো কখনো পড়ে যাওয়া উচিত নইলে জীবন অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। আমি বাধ্য না করলে একটা মিথ্যা পরিচয় থাকত আমাদের মাঝে, একটা মিথ্যা সম্পর্ক হতো আমাদের। আর মিথ্যা দ্বারা কখনো কিছু টিকে থাকে না। যা করেছি তোমার ভালোর জন্যই। তবে জানতাম তুমি কেবল খুন করেছো, তুমি নারী রহস্যময়। পার্থক্য এতটুকুই, আগে আমি খানিকটা জানতাম এখন পুরোটা জানিয়ে দিলে তুমি।”
ফারাজ এবার চোখ বন্ধ করল। কালো রাত বোধ-হয় এইবার ফুরানোর পালা।
অভ্রর চোখের পাতায় নিদ্রা ডানার মতো ভর দিয়ে নামতে চাইছে। আজকের দিনটি ছিল দীর্ঘ। আয়েশা অনেকক্ষণ আগেই শুয়ে পড়েছে। তবে অভ্রর চোখে ঘুম নেই। সে বারান্দায় বসেছিল এতক্ষণ। বারান্দার ফাঁক গলে দেখতে পাওয়া তারাগুলোকে সে গুনছিল এতক্ষণ যাবত। প্রতিটি নক্ষত্র আজ তার কাছে একেকটি অপ্রকাশিত সত্যের মতো দীপ্ত, আবার দূরবর্তী ছিল।
আজ আয়েশার মুখে সে যা শুনেছে, তা তার কাছে নতুন নয়। বহু আগে থেকেই সে সত্যের আভাস পেয়েছিল। তার ইচ্ছে ছিল একদিন দু’জন দু’জনার অবিকৃত সত্তা নিয়ে, সকল আড়াল সরিয়ে, মুখোমুখি দাঁড়াবে। শুধু নির্মম, মুক্ত সত্য নিয়ে। কিন্তু মানুষের ভাবনা কি সবসময় নিয়তির স্রোতে ভেসে গন্তব্যে পৌঁছায়? কিছু কথা সময়ের কাছে বন্দী থাকে, কিছু স্বীকারোক্তি সাহসের অভাবে বিলম্বিত হয়।
আয়েশা সত্য উচ্চারণে দেরি করেছে
হয়তো প্রয়োজনের চেয়ে কিছু বেশি। তবু অভ্রর অন্তরে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠেনি। কারণ সে বুঝেছে, ভালোবাসা যদি সত্যিই গভীর হয়, তবে সে দেরির হিসাব কষে না সে শুধু অপেক্ষা করতে জানে।
ভালোবাসা মানুষের ত্রুটি মাপার দাঁড়িপাল্লা নয়, বরং ভাঙাচোরা অংশগুলোকে জোড়া লাগানোর উত্তম মাধ্যম। পৃথিবীতে ক্ষমতা আছে, প্রতারণা আছে, ভুল আছে কিন্তু তাদের সকলের ঊর্ধ্বে যে শক্তি স্থির হয়ে থাকে, তা ভালোবাসা। কারণ ভালোবাসা প্রতিদান চায় না, প্রমাণ চায় না সে শুধু স্থিত থাকে, যেমন রাত্রির আকাশে নক্ষত্রেরা দূরে থেকেও অটল। অভ্র জানে, সত্য দেরিতে এলেও যদি তা ভালোবাসার ভিত নড়িয়ে দিতে না পারে, তবে সেই ভালোবাসাই জয়ী। হয়তো সব স্বপ্ন পূরণ হয় না, সব মুখোমুখি হওয়া সমান নির্মল হয় না তবু হৃদয়ের গভীরে যদি পরস্পরের জন্য অটুট স্থান থাকে, তবে দেরি, আক্ষেপ, অপূর্ণতা সবই একসময় গলে হয়ে আসে।
নিরু তখনও ঘুমায়নি। বহুদিন পর সে ফিরে এসেছে এই বাড়িতে। তার জন্মভিটায়। এই উঠান, এই দেয়াল, এই বাতাস সবকিছুর সঙ্গে মিশে আছে তার শৈশব, তার বেড়ে ওঠা, তার অগণিত স্মৃতি। জায়গাটা তার কাছে শুধু একটা বাড়ি নয়, গভীর ভালোবাসার আশ্রয়কেন্দ্র।
বাবার সঙ্গে দেখা হতেই জুনায়েদ এলাহী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না এতদিন পর তার মেয়েকে সামনে দেখছেন। তারপর হঠাৎ গলা কেঁপে উঠল। তিনি ভারী কণ্ঠে বললেন, “নিরু… আম্মা…” শব্দটা শোনামাত্র নিরুর বুক ভেঙে গেল। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সে। দৌড়ে গিয়ে বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন এতদিনের সব অভিমান, সব দূরত্ব সেই আলিঙ্গনের ভেতর গলে গেল। অনেকক্ষণ ধরে কথা হলো দুজনের, থেমে থেমে, কান্না মেশানো কণ্ঠে। নদীও এসে নিরুকে বুকে টেনে নিল। তার চোখেও জল। যেন এতদিনের অপেক্ষা শেষ হলো। রুমানা এত শোকের মধ্যেও নিরুকে দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। যাকে নিজের হাতে মানুষ করেছেন, তাকে ফিরে পেয়ে তিনি প্রায় পাগলের মতো নিরুকে জড়িয়ে ধরলেন, বারবার কপালে চুমু খেলেন। চোখ ভেজা কণ্ঠে ক্ষমা চাইতে লাগলেন। তিনি বললেন, “সেদিন যদি নিজেদের স্বার্থের কথা ভেবে সোহানের সঙ্গে তোর বিয়ার কথা না তুলতেন, তাহলে হয়তো তুই এতদিন আমাগো বুকের কাছেই থাকতি।
নিরু তখনও পুরোপুরি শান্ত হতে পারেনি। এতক্ষণ ধরে জমে থাকা আবেগ একসঙ্গে বেরিয়ে এসেছে। রাত হয়েছে। তবুও ঘুম আসছে না তার। ঘরটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এলো। বাইরে রাত আরও গভীর হয়েছে। দূরে কোথাও কুকুরের ডাকে নীরবতা ভেঙে আবার থেমে যাচ্ছে। নিরু চুপচাপ বসে আছে। ঠিক তখনই বজ্র দরজার পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ নীরবে তাকে দেখল। বজ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নিরুর পাশে বসল।
” এত কাঁদলে মাথা ধরবে কিন্তু।”
নিরু বলল, “ধরুক। অনেকদিনের জমানো ছিল।”
বজ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল, ” আজ তোমাকে দেখে তোমার বাবার চোখটা দেখেছ?”
নিরু নিচের দিকে তাকাল। ” দেখেছি… সেই জন্যই তো আরও খারাপ লাগছে। এতদিন… এত দূরে ছিলাম।
বজ্র মাথা নেড়ে বলল, “দূরে ছিলে, ঠিক। কিন্তু হারাওনি তো কাউকে।”
নিরু এবার তার দিকে তাকাল। ” তুমি এত নিশ্চিন্তভাবে কীভাবে বলো এসব? আমি হারায়নি? রোশান ভাই চলে গেল, মোহনা ভাবী, জোহান, সুলেমান চাচা সবই শেষ হয়ে গেল বজ্র।”
বজ্র মৃদু হাসল। “কাউকে আল্লাহ বেশি ভালোবেসেছেন বলে নিয়ে গেছেন আর কাউকে পাপের শাস্তি দিতে।”
নিরু ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ” সত্যি?”
” হুম।” কথাটা শুনে নিরু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আস্তে করে বলল, ” আজ যদি তুমি সঙ্গে না থাকতে…”
বজ্র মাঝখানেই থামিয়ে দিল। ” তাহলে কী হতো?”
নিরু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ” হয়তো সাহসই পেতাম না এই বাড়িতে ঢোকার।”
বজ্র একটু ঝুঁকে তার দিকে তাকাল। ” মিথ্যে বলছ।”
” কেন?”
” কারণ এই বাড়ি তোমার। এখানে ঢোকার জন্য তোমার কারও সাহস ধার নিতে হয় না।”
নিরুর চোখ আবার ভিজে উঠল, তবে এবার কান্নাটা শান্ত। বজ্র ধীরে হাত বাড়িয়ে তার মাথায় হাত রাখল। তারপর কপালে আলতো করে একটা চুমু দিল।
নরম গলায় বলল, “বলেছিলাম না, বিষাদ জলদি কেটে যাবে। এবার ঘুমাও।”
নিরু চোখ বন্ধ করল। অনেকদিন পর তার মনে হলো হয়তো সত্যিই সবকিছু একটু একটু করে ঠিক হয়ে যাবে। নিরু ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল। কান্নায় ভেজা চোখদুটো বন্ধ হয়ে এসেছে, শ্বাস-প্রশ্বাসও শান্ত হয়ে গেছে। মুখে এখন ক্লান্ত প্রশান্তি। বজ্র কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে তাকে দেখল। অন্ধকারে মৃদু আলোয় নিরুর মুখটা কেমন শান্ত লাগছে। আস্তে করে সে নিরুর কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিল, তারপর খুব সাবধানে উঠে দাঁড়াল যেন তার ঘুম না ভাঙে। দরজা ঠেলে সে বারান্দায় এলো।
রাত গভীর। চারদিক প্রায় নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আকাশে আধো চাঁদ ঝুলে আছে। চাঁদ যদিও তার নিরুর মতো সুন্দর নয়। বজ্র পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল। লাইটার জ্বালাতেই ক্ষণিকের জন্য তার মুখটা আলোয় ভেসে উঠল। সে ধীরে একটা টান দিল। ধোঁয়াটা আকাশের দিকে ছেড়ে দিয়ে রেলিংয়ে হেলান দিল। মাথার ভেতর অনেক কথা ঘুরছে। কত কিছু হয়ে গেল ? সেদিনের কথা মনে পড়ছে তার। অনুলিপির কথা! অনুলিপি জানতে পেরে গিয়েছিল, ফারাজের ইতালিতে কারবার আছে। যেন-তেন নয়, অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কারবার। তখন ভেবেছিল ওদের বাড়ি খুনটা বোধ-হয় সেই করেছে অথচ বজ্রের এখনো মনে আছে যেই লোকটার লাশ শেষবার রুমানা পুকুরে ওজু করতে গিয়ে দেখেছিল আগের দিন রাতে বাড়ি ফিরতে গিয়ে সেই লোককে বজ্র আর জমেলা মিলেই ধরেছিল। তারপর খুন করে ভাসালো। আর অনুলিপি তাকে তো চিত্রার কথাতেই বজ্র বাঁচালো। এবার আসা যাক সিফাতের কথায়, তাকে মারার বিষয় নিয়ে।
চিত্রা তো তাকে সেই কবেই মেরে ফেলত অথচ মারেনি, কারণ পরিস্থিতি তেমন ছিল না। বাড়িতে একটার পর একটা শোক চলেই যাচ্ছিল। তারই পরিকল্পনা একটু ঘুরিয়ে দিতে হয়। আশায় ছিলাম ফারাজ ইতালি গেলে কাজ সারা হবে। কিন্তু এরই মাঝে রোশান মারা গেলে তাই হলো না। পরে যখন ফারাজ বলল ঢাকায় তার কাজ আছে তখন পরিকল্পনা বদলাতে হলো। সিফাত হচ্ছে সোহানের আরেক দূর্বল দিক। তাই তাকে আঘাত করা মানে সোহানকে আঘাত করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী বজ্র সোহানের কাছে ভালো সেজেছে, তাকে বলেছে চিত্রাকে দিবে। বজ্রর কথায় রাজি হয়ে তারই কথায় সিফাতকে পাঠায় সে। বাড়িতে ওইদিন ইচ্ছে করেই ফারাজের সারপ্রাইজের কথা বলেছিল বজ্র।
তাও আবার চিত্রার কথায়। এটা বাড়ির সবার সামনে বলার কারণ ছিল যাতে কেউ তার বাইরে যাওয়া নিয়ে সন্দেহ না করে। কিন্তু ফারাজ যে ঢাকায় যাওয়ার নাম করে চিত্রাকে ফলো করবে কে জানত? যাক যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। কাল অনুলিপি ফিরবে। সিফাতের মরা-পচা লাশটা এখনো সোহানের কাছে পৌঁছানো বাকি। হঠাৎ বজ্রের ফোনে একটা কল আসে। তার বাবা ফোন করেছে। তার বাবা বশির কায়সার। ছেলেকে বিরক্ত করাই একমাত্র উদ্দেশ্য তার। বজ্র ফোন ধরতেই সে তেতে উঠল, “কিরে বজ্র বউমাকে নিয়ে দেশে ফিরবি কবে? বলেছিলাম চিত্রাকে বিয়ে করতে। ওমন মেয়ে হারিকেন দিয়ে খুজলেও বিশ্বে আর পাবি?”
“হারিকেন দিয়ে খুঁজলে তো তুমিও পাবে না বাবা। আপডেট হও, হারিকেন বদলে দূরবীক্ষণ যন্ত্র কিনো।”
“ওই হলো, শুরু হয়ে গেছিস।”
“তো ফোন কেটে শেষ করে দেই।”
“চুপ আহাম্মক। জলদি বউকে নিয়ে দেশে আয়। তোদের সবাইকে ছাড়া ঘর খালি খালি লাগে।”
বজ্র বাবার সঙ্গে কথা বলে ফোন রেখে দিলো। এই যে তার বাবা। ক’দিন আগেও বাংলাদেশে এসে পরিত্যক্ত কায়সার বাড়িতে পুনরায় বসবাস করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ওইসময় ডাকাত দল অনেক বিরক্ত করত। শেষে দাদা তার ছেলে দুটোকেও নিয়ে বিদেশ চলে যায়। বাড়ি দখল করে ডাকাতেরা৷ পরে ডাকাত চলে যাওয়ার পর বাড়ি মৃত বাড়ির মতো পরে থাকে। এখন চাইলেই কী সব ছেড়ে সেখানে থাকা সম্ভব? দাদার আমলের ডাকাত খুঁজে তাদের শাস্তি দেওয়া সম্ভব? যাক হুটহাট বাবার মাথায় ভূত চাপে। এখন ঠিক আছে। এটাই অনেক। বজ্র আর দেরি করল না। এসে নিরুর পাশে শুয়ে পড়ল। কপালে চুমু দিয়ে বলল, “আমার নিরুপমা।”
সোহান মাকে কবর দেওয়ার পর আর কবরস্থান থেকে ফেরেনি। সদ্য চাপা দেওয়া কাঁচা মাটির সেই ঢিবির পাশে নীরবে বসে আছে। চারপাশে লোকজন ধীরে ধীরে সরে গেছে, শোকের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে, কিন্তু তার ভেতরের শোকের শুরু যেন তখনই। মা কি করে তাকে এভাবে একা করে চলে যেতে পারলেন? কত স্বপ্ন ছিল তাঁর, ছেলের বউ দেখবেন, ঘরে নাতি-নাতনির কোলাহল শুনবেন, সন্ধ্যাবেলায় তাদের নিয়ে গল্প করবেন। সেই ছোট ছোট, সহজ স্বপ্নগুলোও আর পূরণ হলো না। সোহানের মনে হলো, তবে কি সে ব্যর্থ? ছেলে হয়ে কি কিছুই দিতে পারল না মাকে? জীবনের শেষ ক’টা দিন কাজের ব্যস্ততা, দায়িত্বের চাপ, সময়ের অজুহাতে সে মায়ের পাশে ঠিকমতো বসেনি। দু’কাপ চা হাতে নিয়ে নির্ভার গল্প করার সময়টুকুও হয়তো বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। আজ সেই সময়গুলোই বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধছে। যদি জানত, মা এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন তাহলে কি এক মুহূর্তও দূরে থাকত? হয়তো না। হয়তো সমস্ত কাজ, সমস্ত ব্যস্ততা ছুঁড়ে ফেলে মায়ের পাশে বসে থাকত তার হাত ধরে, তার কণ্ঠস্বর শুনে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে। কাঁচা কবরের মাটি তখনো ভেজা। সোহান হাত বাড়িয়ে সেই মাটিতে আলতো স্পর্শ রাখল। হঠাৎ পেছন থেকে পায়ের শব্দ ভেসে এলো। শুকনো পাতার উপর নরম চাপে কারও হাঁটার শব্দ। সোহান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল না। তার ভেতরের ভাঙন এত গভীর যে বাইরের উপস্থিতি টের পেলেও সাড়া দেওয়ার শক্তি নেই। ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল সুমন। চোখ দুটো লাল, কান্নায় ফুলে আছে। হাতে ভাঁজ করা একটি সাদা খাম। কিছুটা কুঁচকে গেছে।
সুমন নরম গলায় বলল,
” ভাই…”
সোহান নিঃশব্দ। সুমন কাঁপা হাতে খামটা বাড়িয়ে দিল।
” মা মরার আগের দিন রাতে আমাকে রুমে ডেকেছিল। বলল, একটা চিঠি লিখে দিতে। নিজে তো আর ঠিকমতো লিখতে পারত না… তাই আমি লিখে দিয়েছি।”
সোহানের দৃষ্টি এবার ধীরে ধীরে সুমনের হাতে থাকা খামের দিকে গেল। গলা শুকিয়ে এলো।
” কিসের চিঠি?”
” পড়লেই বুঝবেন, ভাই। আপনার জন্য লিখেছে।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। কবরের কাঁচা মাটির উপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে গেল। সোহানের ঠোঁট কেঁপে উঠল।
“আমি মূর্খ মানুষ… এত পড়তে পারি নাকি? তুই পড়ে শোনা।”
সুমন চুপচাপ বসে পড়ল তার পাশে, কবরের সমানেই। খামটা খুলতে গিয়ে তার হাত কাঁপছিল। কাগজটা বের করতেই দেখা গেল সুমনের হাতের লেখা। পড়া শুরু করার আগে সুমন একবার সোহানের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা জানত।”
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮১
“কী জানত?”
“তার নিষ্পাপ ছেলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটা হিংস্র জানোয়ারের কথা।” সোহান জবাব দিলো না। দুঃখের এত ভালোবাসা তার প্রতি, আহা।
