চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৫
ইশরাত জাহান জেরিন
রাত ১০টা ২৩। ঘড়ির কাঁটা বুঝি আজ ইচ্ছে করেই একটু ধীরে চলছে? ড্রয়িংরুমের মাঝখানে ছোট করে বিয়ের আসর সাজানো। আসর যেমনই হোক। বিয়ের আসর। যেই আসরে একই ব্যক্তির সাথে আগেও একবার বলা হয়েছিল। আজকে আবার বসা হবে। যেখানে আবার বসবে ফারাজ আর চিত্রা… নতুন করে, অথচ একই ভালোবাসার পুনর্জন্ম নিয়ে।
কাজী সাহেব এসে গেছেন। বয়সী মানুষ, গম্ভীর মুখে সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছেন। মাঝে মাঝে চশমা নামিয়ে তালিকা দেখছেন, আবার মাথা তুলে চারপাশে তাকাচ্ছেন। চিত্রা ঘরের ভেতরে এখনো। গায়ে লাল বেনারসিটা। চিত্রা তেমন সাজেনি। তবুও কি যে সুন্দর লাগছে তাকে। নিরু সুন্দর করে তার দু’হাতে মেহেদী দিয়ে দিয়েছিল। তাতে সুন্দর করে ফারাজ এলাহী লিখা।
ফারাজ পায়চারি করছে। একবার দরজার কাছে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। হাতঘড়ি দেখছে বারবার। তার সেই স্বভাবসুলভ দাপুটে ভাবটা আজ কেমন যেন গলে গেছে। জায়গা নিয়েছে অস্থিরতা। অভ্র সোফায় হেলান দিয়ে বসে, মুচকি হাসছে। “ভাই, তুমি কি বিয়েতে বসবা, না ম্যারাথন দৌড় দিবা?”
বজ্র পাশ থেকে যোগ করল, “দেখে তো মনে হচ্ছে পালিয়ে যাবে।”
ফারাজ এক ঝটকায় তাকাল, “আমি পালাব? আমি?”
তারপর একটু থেমে নিচু গলায় বলল, “ভাই, ওকে এত সুন্দর লাগছে… আমি ঠিকমতো বসতেই পারব কিনা সন্দেহ।” অভ্র আর বজ্র একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফেটে পড়ল হাসিতে। ঠিক তখনই চয়ন কায়সার প্রবেশ করলেন। তিনি ফারাজকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিলেন। “কি ব্যাপার? এত হাঁটাহাঁটি করছো কেন? বিয়ে করতে এসেছো, না পরীক্ষা দিতে?”
ফারাজ এবার থামল। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
“দুটোই প্রায়। আপনার মেয়ে তো ফাইনাল এক্সাম।”
অভ্র মুখ চেপে হাসছে। বজ্র সোজা হয়ে বসে আছে।
চয়ন কায়সার ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন, “ফাইনাল এক্সাম? আমার মেয়ে কিন্তু সহজ প্রশ্ন না। ফেল করলে কিন্তু”
ফারাজ এক পা এগিয়ে এলো। খুব শান্ত গলায় বলল,“ফেল করার অপশনই নেই। আমি তো প্রশ্নপত্র আগেই মুখস্থ করে ফেলেছি।”
“ওমা!” বজ্র চাপা স্বরে বলল।
চয়ন কায়সার এবার চোখ কুঁচকে, “বেশ আত্মবিশ্বাস! কিন্তু একটা কথা মনে রেখো বিয়ের পর কিন্তু আসল পরীক্ষা শুরু।”
ফারাজ মাথা নেড়ে বলল, “জানি। আমাকে বলতে হবে না। আমি অলরেডি পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্ট বের করা মানুষ। তবে যান, আজকে আপনাকেই পরীক্ষক হিসেবে মেনে নিলুম।”
অভ্র এবার সরাসরি হেসে উঠল, “এইটা ঠিক কথা!”
চয়ন কায়সার একটু গম্ভীর হলেন, “আমি কিন্তু সহজে নাম্বার দিই না।”
ফারাজ একদম স্থির গলায় বলল, “আপনি নাম্বার না দিলেও সমস্যা নেই… আপনার মেয়ে রাতে ফুল মার্কস দিয়ে দেয়। তাতেই এই বান্দা খুশি। বুঝেন তো আমার আবার চাহিদা নেই। আমি অল্পতে খুশি থাকার মানুষ। তো যৌতুক হিসেবে কি দিবেন? দেখুন ভেবেছিলাম এইবাড়ির বাথরুম আর রান্না ঘরে এবার এসি লাগাব। কিন্তু আপনি বেঁচে থাকতে আমি কি করে লাগাই বলুন তো? আপনি এসি কিনে এনে নিজ হাতে লাগিয়ে দিবেন। লাগাবেন তো আপনি। বলুন কবে লাগাবেন?যৌতুক হিসেবে কি খুব বেশি লাগাতে বলেছি। আপনার আসা করি লাগাতে কষ্ট হবে না। অশুরজি আমায় একটু লাগিয়ে দিলেই হবে। আমিই লাগাতাম, কিন্তু আপনি সিনিয়র মানুষ, অভিজ্ঞতা বেশি। তাই দায়িত্বটা আপনাকে দিলাম।”
“ইশরে তুমি বাবা মুখটা বন্ধ করো। তোমাকে সব লাগিয়ে দিব। তাও আর লাগানোর কথা বলো না। কানটা জ্বালাপালা হয়ে গেছে আমার।”
ঘর ভরা মানুষ। তাদের মাঝে কাজী সাহেব বসে আছেন গম্ভীর মুখে। ফারাজ বসেছে একটু সোজা হয়ে।
কাজী গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন, “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম… বিয়ের সব শর্ত ও দেনমোহর নির্ধারিত হয়েছে” তিনি পুরো কথাটা শেষ করার আগেই
“কবুল!” ফারাজ জোরে বলে ফেলল। এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা… তারপর পুরো ঘর ফেটে পড়ল হাসিতে। অভ্র হাঁটুতে চাপড় মেরে বলল, “এইটা কি এক্সপ্রেস বিয়ে নাকি!”
বজ্র মাথা নেড়ে,
“আরে ফারাজ, কাজী সাহেব তো এখনো প্রশ্নই শেষ করেন নাই!”
কাজী ভ্রু কুঁচকে ফারাজের দিকে তাকালেন, “আমি তো এখনো বলিই নাই”
ফারাজ গম্ভীর মুখ করে বলল, “আগে থেকে প্রস্তুত ছিলাম, হুজুর। প্রশ্ন শোনার দরকার নাই, উত্তর রেডি।”
চয়ন কায়সার পাশ থেকে ধমক দিয়ে বললেন,
“এই ছেলে, বিয়ে করছো নাকি নাটক করছো?”
ফারাজ তার দিকে তাকিয়ে একটু ঝুঁকে বলল, “নাটক না, বাস্তবতা। আপনার মেয়ে যেন অন্য কেউ নিয়ে না যায়, তাই আগে থেকেই কবুল দিয়ে সিট বুক করে রাখলাম। যদিও ওই দিন আগেই পার্মানেন্ট করা হয়ে গেছে।”
অভ্র এবার আর থামতে পারল না, জোরে হেসে উঠল।
কাজী এবার হালকা বিরক্ত হয়ে বললেন, “আচ্ছা, ঠিক আছে, আবার নিয়ম করে বলি… ফারাজ এলাহী, আপনি”
“কবুল।” আবার বলে ফেলল ফারাজ, একদম শান্ত গলায়।
কাজী এবার চশমা খুলে তাকালেন,
“আপনাকে বলার সুযোগই দিচ্ছেন না!”
ফারাজ হালকা হেসে, “জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দেরি করা ঠিক না, হুজুর।”
চয়ন কায়সার ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন, “এই আত্মবিশ্বাস বেশিদিন টিকবে না কিন্তু।”
ফারাজ একচুলও নড়ল না, “দেখা যাবে। তবে আপনার মেয়ে যেহেতু প্রশ্ন, আমি তো আগেই বলেছি আমি প্রস্তুত ছাত্র।”
বজ্র পাশ থেকে ফিসফিস করে, “ভাই, এই ছাত্রটা মনে হয় প্রশ্নপত্র চুরি করেই পাশ করবে।”
ফারাজ শুনে মুচকি হেসে বলল, “চুরি না… বৈধভাবে অধিকার করে নিয়েছি।”
অবশেষে কাজী ঠিকভাবে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করলেন। এবার নিয়ম মেনে আবার বললেন, “আপনি কি এই বিয়ে কবুল করছেন?”
ফারাজ এবার একটু থেমে, চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“কবুল, কবুল কবুল।”
লাল বেনারসিতে ঢাকা, মাথা নিচু। আয়েশা আর নদী ধরে এনে বসালো ফারাজের ঠিক পাশে। মুহূর্তের জন্য ফারাজ একদম চুপ হয়ে গেল। অভ্র কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে ফিসফিস করল, “এই প্রথম দেখছি, ভাই চুপ!”
বজ্র নিচু গলায়, “সিস্টেম হ্যাং হয়ে গেছে মনে হয়।”
ফারাজ কোনো উত্তর দিল না। শুধু একবার তাকাল চিত্রার দিকে… তারপর গলা খাঁকারি দিল, কিন্তু কিছু বলল না। কাজী সাহেব আবার শুরু করলেন,
“আচ্ছা, কনের পক্ষ থেকে”
ফারাজ হঠাৎ বলে উঠল, “কবুল, কবুল, কবুল।
চয়ন কায়সার কপালে হাত দিয়ে বললেন, “এই ছেলে, এবার তো মেয়ের কথা শুনতে দাও!”
কাজী একটু কড়া গলায়, “আপনি একটু চুপ থাকবেন? এখন কনেকে জিজ্ঞেস করা হবে।”
ফারাজ ঠোঁট কামড়ে চুপ করে বসে রইল।
কাজী নরম গলায় বললেন, “মা, তুমি কি এই বিয়েতে রাজি আছো?”
চিত্রা মাথা আরও একটু নিচু করল। গলা কাঁপছে সামান্য। পাশ থেকে নদী ফিসফিস করে বলল,
“ইশরে, বল, কবুল…”
চিত্রা খুব আস্তে বলল, “ক… কবুল।”
কাজী আবার বললেন, “জোরে বলো মা, সবাই যেন শুনতে পায়।”
চিত্রা এবার একটু সাহস নিয়ে,
“কবুল।”
ফারাজ পাশে বসে হালকা হাসল। খুব নিচু গলায় বলল,
“এইটাই তো চাই।”
অভ্র সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলল, “ভাই, লাইভ কমেন্ট্রি বন্ধ করুন!”
কাজী কাগজ এগিয়ে দিলেন, “এখন বিবাহদলিলে সাইন করতে হবে।” প্রথমে ফারাজ কলম হাতে নিল। কলমটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বলল, “এইটা দিয়ে সাইন করলে লাইফটাইম কন্ট্রাক্ট হয়ে যাবে তো?”
বজ্র সাথে সাথে, “না ভাই, এটা ট্রায়াল ভার্সন!”
চয়ন কায়সার ধমক দিলেন, “চুপ করে সাইন করো!”
ফারাজ সাইন করতে করতে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা… কিন্তু পরে রিটার্ন পলিসি নাই তো?”
চয়ন কায়সার চোখ কুঁচকে, “একবার নিয়ে গেলে ফেরত নেওয়া হবে না।”
ফারাজ মাথা নাড়ল, “ঠিক আছে, আমি তো রিটার্ন করব না…আমার এত কিসের চিন্তা।”
অভ্র হেসে লুটোপুটি। এরপর কাগজটা চিত্রার সামনে আনা হলো। চিত্রা ধীরে কলমটা হাতে নিল। হাত কাঁপছে একটু। ফারাজ পাশে বসে খুব আস্তে বলল,
“জলদি বউ, রুমে গিয়ে মেয়ের নামও তো আবার ঠিক করতে হবে। অনেক কাজ বাকি।”
চিত্রা একবার তাকাল তার দিকে… তারপর শান্ত হয়ে সাইন করে দিল। কাজী কাগজ গুছিয়ে বললেন,
“সাক্ষীরাও সাইন করুন।” সবকিছু শেষ হলে কাজী ঘোষণা করলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।” ঘরজুড়ে “মাশাআল্লাহ” ধ্বনি ভেসে এলো।
ফারাজ একটু ঝুঁকে চিত্রার কানে খুব আস্তে বলল,
“আবারও অফিসিয়ালি আমার হয়ে গেলে।”
চিত্রা কিছু বলল না, শুধু মাথা নিচু করে হাসল।
পাশ থেকে অভ্র আবার খোঁচা দিল,
“ভাই, এখনো সময় আছে… পালাবা?”
ফারাজ সোজা হয়ে বসে বলল, “এখন পালানোর প্রশ্নই আসে না… এখন তো পুরো জীবনটাই বুকিং দিয়ে ফেলেছি।”
ডাইনিং টেবিল ভরা মানুষ। ভালোই রাত হয়েছে। বিয়ের পর আড্ডা দিতে গিয়ে খাওয়ার নিকুচি হয়েছিল। নানা রকম খাবারের গন্ধে পুরো ঘর জমে উঠেছে। ফারাজ একপাশে বসে, সামনে প্লেট… কিন্তু তার দৃষ্টি একদম পাশের চিত্রার দিকে। বজ্র খেয়াল করে ফিসফিস করল,
“ভাই, ভাত খাও নাকি ভাব খাও?”
অভ্র যোগ করল, “দেখে তো মনে হচ্ছে শুধু চোখ দিয়েই খেয়ে ফেলবে।”
ফারাজ এবার ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল, “তোদের সমস্যা কি?”
চয়ন কায়সার সামনে বসে চুপচাপ খাচ্ছিলেন। হঠাৎ বললেন, “সমস্যা তো আমাদের না, সমস্যা তোমার। বিয়ের পর থেকেই খাওয়া-দাওয়া ভুলে গেছো নাকি?”
ফারাজ প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “না, খাচ্ছি তো… কিন্তু কিছু জিনিস সামনে থাকলে অন্য কিছুর দিকে মন যায় না।” চিত্রা সাথে সাথে কাশতে লাগল। পাশে আয়েশা আর নিরু মুখ চেপে হাসছে।
চয়ন কায়সার কড়া গলায়, “এইসব ডায়লগ টেবিলে বসে বলার দরকার আছে?”
ফারাজ নির্লিপ্ত, “আমি তো সাধারণ কথাই বললাম।”
অভ্র নিচু গলায়, “এইটা যদি সাধারণ হয়, অসাধারণটা কেমন হয় ভাবছি!”
বজ্র হেসে ফেলল। এদিকে চিত্রা চুপচাপ ভাত মেখে খাচ্ছে। হঠাৎ ফারাজ তার প্লেটে একটা মাংসের টুকরো তুলে দিল। চিত্রা অবাক হয়ে তাকাল,
“কি করছেন?”
ফারাজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, “যা করার দায়িত্ব, সেটা করছি।”
চয়ন কায়সার সাথে সাথে, “ওর হাত-পা আছে, নিজে খেতে পারে।”
ফারাজ এবার হাসল,
“জানি। তবে বউ আমার, আমি সব তার পাতে তুলে দিবো। এটা দায়িত্ব আমার। আপনার কি? নিজের বউকে তো ইতালি রেখে এসে এখানে মোজে আছেন। ছি ছি শাশুড়ীমাটা আমার একা ওদেশে পড়ে আছে।”
চয়ন কায়সার চোখ কুঁচকে তাকালেন।
চিত্রা এবার আস্তে করে বলল, “আপনি একটু চুপ করবেন?”
ফারাজ তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল,
“তুমি বললে।”
চয়ন কায়সার মাথা নাড়লেন, “বুঝলাম, আমার কথা না, আমার মেয়ের কথাই আইন।”
ফারাজ একদম সিরিয়াস মুখে বলল,
“আপনি ঠিকই ধরছেন।”
ফারাজ চয়ন কায়সারের গ্লাসে কোকাকালা ঢেলে দিতেই চয়ন কায়সার বলল, “আমি কোক খাই না।”
চিত্রা আসতে করে ফারাজকে বলল, “বাবার বিষয় উল্টো। কোক খেলে গ্যাসের জ্বালা বাড়ে।”
ফারাজ সে কথা শুনে গলা ফাটিয়ে বলল, “সোজা কথা বললেই তো হয় শশুরডেডির কোক খেলে যে পাদ আসে। এই এই থাক, আপনার খাওয়া দরকার নেই। এমনিতেও আপনার পাদে গন্ধ।”
চিত্রার ঘরটা সাজানো। বিছানায় লাল গোলাপের পাপড়ি। চিত্রার রুমে জমে উঠেছে মেয়েদের আড্ডা। সবাই গোল হয়ে বসে আছে। কেউ চিত্রার হাত ধরে খোঁচাচ্ছে, কেউ তার লজ্জা পাওয়া মুখ দেখে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। নদী হেসে বলল, “এই যে কনে, আজকে কিন্তু ঘুমানো যাবে না!” নদীর কোলে আবার ঘুমন্ত নুড়ি।
“হুম, আগে তো তোমার স্বামীর ইন্টারভিউ নিতে হবে!” আয়েশা হেসে বলল।
চিত্রা মাথা নিচু করে বসে আছে, লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে হেসে ফেলছে, আবার মুখ ঢেকে নিচ্ছে আঁচলে। কেন যে এমন লাগছে? তাও নিজের মানুষ গুলোর সামনেই।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ফারাজ। একবার দরজার দিকে তাকায়, আবার এদিক-ওদিক পায়চারি করে। মাঝে মাঝে হাত তুলে নখ কামড়াচ্ছে। বিরক্তিতে তার মুখটা গোমড়া হয়ে আছে। “এরা কি সারারাত এখানেই বসে থাকবে নাকি!” ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে আসে পরিচিত কণ্ঠ। বজ্র কায়সার, মুখে চাপা হাসি নিয়ে বলল, “কি গো ফারাজ বাবাজি, যুদ্ধের আগে এমন টেনশন কিসের?”
ফারাজ চোখ কুঁচকে তাকাল, “চুপ করে থাকো তো! ওদের বের হতে বল।”
বজ্র আরও মজা পেয়ে বলল, “ওরে বাবা! এত তাড়া কেন? ধৈর্য ধরো, এইটাই তো আসল পরীক্ষা!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অভ্র বলল, “ আজ আপনি ঢুকলে কিন্তু ফি দিতে হবে!”
ফারাজ বিরক্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে একটু ভেবে দরজার কাছে গিয়ে হালকা করে টোকা দিল। ভিতর থেকে কেউ বলল,
“কে?”
ফারাজ গম্ভীর গলায় বলল, “রুমানা চাচি ডাকছে।সবাইকে নিচে যেতে বলেছে। জরুরি।”
ভিতরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর শুরু হলো গুঞ্জন। “সত্যি নাকি?” “চলো দেখি!”
এক এক করে সবাই বের হতে শুরু করল। কেউ সন্দেহ নিয়ে তাকাচ্ছে, কেউ আবার তাড়াহুড়ো করে নামছে নিচে। সবাই বেরিয়ে গেলে চিত্রা অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। আর ঠিক তখনই দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে ফারাজ।
চিত্রা একটু চমকে উঠে বলে, “আপনি? সবাই তো…”
ফারাজ হেসে বলল, “সবাইকে তাড়িয়ে দিয়েছি। এবার একটু শান্তিতে বসা যায়?”
বাইরে করিডোরে তখন বজ্র আর অভ্র দাঁড়িয়ে, সব বুঝে ফেলে মুচকি হেসে বজ্র বলে উঠল,
“চালাকি কিন্তু খারাপ না, ফারাজ!”
ফারাজ চিত্রার পাশে এসে বসল। সারাদিনের সেই দাপুটে মানুষটা এখন যেন একটু থেমেছে। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল হঠাৎ । ফারাজ আস্তে বলল,
“এত চুপ কেন?”
চিত্রা মাথা না তুলেই,
“কিছু না…”
ফারাজ হেসে বলল,
“সারাদিন তো দেখলাম, সবাইকে সামলাচ্ছো… এখন এসে চুপ?”
চিত্রা একটু তাকাল তার দিকে, তারপর আবার নিচু করে ফেলল চোখ,
“সবাই সামনে ছিল… এখন তো শুধু আপনি…”
ফারাজ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তার দিকে। বলল, “শুধু আমি থাকলে ভয় লাগে?”
চিত্রা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না… কিন্তু কেমন যেন লাগে।”
ফারাজ একটু কাছে এগিয়ে এলো,
“কেমন?”
চিত্রা এবার ধীরে বলল,
“নতুন… অচেনা… আবার নিজের নিজের মনে হয় আসলে আপনাকে কখনো পুরোনো লাগেনি৷ একেকবার একেকভাবে চিনেছি।”
ফারাজ হাসল। গায়ে তার সাদা একটা পাঞ্জাবি। হাতে হাতঘড়ি। সাদায় তাকে পবিত্র লাগছে। “ভালোই তো। আমিও ঠিক এইটাই ফিল করছি।”
হঠাৎ ফারাজ খুব সাবধানে চিত্রার হাতটা নিজের হাতে নিল। “একটা কথা বলি?”
চিত্রা তাকাল,
“হুম?”
ফারাজ তার হাতের ওপর আলতো চাপ দিয়ে বলল, “আমাদের ছোট্ট বাবুটার কথা ভাবছিলাম…” সে নিজের অন্য হাতটা পেটের ওপর রাখল।
“আমিও…” সে আস্তে বলল।
ফারাজ একটু ঝুঁকে,
“নাম ঠিক করবো?”
চিত্রা হালকা হাসল,
“এখনই?”
“হ্যাঁ, এখনই। পরে আবার কেউ এসে আইডিয়া দিয়ে দেবে!”
চিত্রা একটু ভেবে বলল,
“মেয়ে হলে?”
ফারাজ একদম না ভেবে বলল,
“ফিজা, ফিজা এলাহী।”
চিত্রা অবাক হয়ে তাকাল,
“এত তাড়াতাড়ি ঠিক করে ফেললেন? ওহ মনে পড়েছে আগেই তো ঠিক করে রেখেছিলেন।”
ফারাজ কাঁধ ঝাঁকাল, “ হুম। অনেকদিন ধরেই মাথায় আছে।”
চিত্রা মুচকি হাসল, “খারাপ না… সুন্দর।”
ফারাজ এবার বলল,
“আর ছেলে হলে?”
চিত্রা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“ফায়াজ কেমন?”
ফারাজ মাথা নেড়ে, “মন্দ না… তবে একটু ভেবে দেখি। আমার ছেলের নাম একটু দাপুটে হওয়া লাগবে!”
চিত্রা হেসে ফেলল,
“আপনার মতো?”
ফারাজ মুচকি হেসে বলল,
“একটু কম হলেই চলবে।”
দুজনেই হালকা হাসল।
কিছুক্ষণ পর ফারাজ বলল,
“চলো, বাইরে যাই?”
“কোথায়?”
“বারান্দায়… চাঁদ উঠেছে মনে হয়।”
চিত্রা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। দুজনে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে নিস্তব্ধ রাত। আকাশে গোল চাঁদ উঠেছে। চিত্রা রেলিংয়ে হাত রাখল। কিছুক্ষণ চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। ফারাজ তার পাশে এসে দাঁড়াল। খুব স্বাভাবিকভাবে নিজের কাঁধটা একটু এগিয়ে দিল।
এক মুহূর্ত দ্বিধা… তারপর চিত্রা ধীরে মাথা রেখে দিল ফারাজের কাঁধে। ফারাজ একটুও নড়ল না।
চিত্রা আস্তে বলল, “আজকে সবকিছু এত দ্রুত হয়ে গেল…”
ফারাজ নিচু গলায়,
“হুম… কিন্তু খারাপ লাগছে?”
চিত্রা মাথা নাড়িয়ে,
“না… বরং মনে হচ্ছে, ঠিক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি।”
ফারাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমিও।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। ফারাজ খুব আস্তে বলল,
“একটা কথা প্রমিজ করো…”
“কি?”
“যাই হোক… যত ঝামেলাই আসুক… আমরা একে অপরের পাশ থেকে সরব না।”
চিত্রা চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল,
“প্রমিজ।” ফারাজ তার মাথার ওপর আলতো করে হাত রাখল। চিত্রা তার চোখের দিকে তাকাতেই হঠাৎ সে বলল, “আমি আক্রান্ত। তোমার নেশায়। তোমার চোখের, তোমার ঠোঁটের, তোমার এই নিঃশ্বাসের নেশাতেও। আমার মদের নেশা তো সেই কবেই কেটে গিয়েছিল, কিন্তু প্রিয়তমা তোমার এই চোখের নেশা?
সে তো আমার মাথা ছাড়ছে না।”
“কিছু নেশা ছাড়া মানুষের জীবন অর্থহীন।”
“ জানো তুমি আমার শেষ ভুল…..
“আর আপনি আমার সবচেয়ে সুন্দর অপরাধ…”
ফারাজ হেসে বলল, “তাহলে আমরা দুজনেই দোষী?”
চিত্রা মাথা একটু কাত করে বলল,
“হ্যাঁ… কিন্তু এই দোষের কোনো ক্ষমা চাই না আমি।
এই দোষটা গায়ে লেপ্টে থাকুক কলঙ্কের অলঙ্কার হয়ে।
তবে যদি এই ভালোবাসা পাপ হয়?”
ফারাজ বিন্দুমাত্র না ভেবে উত্তর দিল, “তাহলে আমি প্রতিদিন এই পাপ করব… একই মানুষকে বারংবার ভালোবেসে বারবার।”
চিত্রা আস্তে মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় তার চোখ ভিজে উঠছে অনুভূতিতে।
সে খুব নরম গলায় বলল, “পাপ আর পবিত্রতার মাঝখানে যদি আপনি থাকেন… তাহলে আমি পবিত্রতাকে আর খুঁজব না।”
ফারাজ একটু থেমে তার কপালে হাত রাখল, “আর যদি কেউ বলে আমরা ভুল?”
চিত্রা মৃদু হাসল, “তাহলে আমরা সেই ভুলটাকেই ভালোবাসব।”
ফারাজ খুব আস্তে বলল, “জানো… কিছু সম্পর্ক মানুষ তৈরি করে না… ওগুলো শুধু ঘটে যায়। পাপ-পবিত্রতার হিসাব না মেনেই।”
চিত্রা তার বুকে মাথা রেখে বলল,
“আমাদেরটাও বোধহয় তেমনই…”
ফারাজ তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল,
“হ্যাঁ… এটা কোনো সাধুতা না… কোনো অপরাধও না…”
সে একটু থামল, তারপর চাঁদের দিকে তাকিয়ে শেষ করল, “এটা শুধু পাপ-পবিত্রতার সব সংজ্ঞার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ভালোবাসা।”
চিত্রা চোখ বন্ধ করে শান্ত গলায় বলল, “আর এই ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে সুন্দর শাস্তি…”
ফারাজ আলতো করে হাসল,
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৪
“আমারও…”
চাঁদের আলো দুজনের ওপর পড়ে আছে। ফারাজ চাদের আলোয় নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল চিত্রার কপালে। চিত্রা শিহরণে চোখ বন্ধ করে ফেলল। পরক্ষণেই ফারাজ তাকে জড়িয়ে ধরল। দু’জনে আর শব্দ করল না। কেবল চাঁদের আলোয় অনুভব করল একে ওপরের বুকের মধ্যে চলা ধুকপুকানি।

আপু পরের পাঠ প্লিজ তাড়াতাড়ি 🙏🙏🙏
next part plz
next part pls