Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৬

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৬

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৬
সানজিদা আক্তার মুন্নী

গুজরাটে পাটোয়ারী বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তৌসির, রুদ্র আর নুহমান। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি তাদের চোখেমুখে, তাও বুকের ভেতর এক অদম্য উত্তেজনা। সীমান্ত থেকে ওয়াসেমের পাঠানো বিশ্বস্ত লোকটির পাহারায় এতদূর নির্বিঘ্নেই পৌঁছাতে পেরেছে তারা। সদর দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা রাখে তিনজন। বাড়ির ভেতরটা বেশ শান্ত। সিতুজা আর ইব্রাহিম সাহেবও সেই সকালেই ফিরেছেন, নিজেদের কক্ষে এখন তারা বিশ্রামে মগ্ন।
এই নিস্তব্ধতা খানখান করে হঠাৎই ওপর থেকে ভেসে আসে ওয়াসেমের রুক্ষ, কর্কশ চিৎকার, “তৃষ্ণার বাচ্চা! এক কাপ চা আনতে এতক্ষণ লাগে তোর? এবার নিচে নামলে তোকে শুদ্ধ ওই চায়ে চুবিয়ে খাব আমি!”

পদভারে সিঁড়ি কাঁপিয়ে গজগজ করতে করতে নিচে নামতে থাকে ওয়াসেম। ওদিকে রান্নাঘর থেকে ভয়ে ত্রস্ত হরিণীর মতো কাঁপতে কাঁপতে চায়ের কাপ হাতে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোয় তৃষ্ণা। হঠাৎ পেছনের পায়ের শব্দে থমকে দাঁড়ায় তৃষ্ণা। চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই তার চোখের মণি স্থির হয়ে যায়। বিস্ময়ে নিশ্বাস আটকে আসে তৃষ্ণার। এ কাকে দেখছে সে? চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুদিকে দুটো ওয়াসেম! আজ সকালেই তৌসিরের সাথে মিলিয়ে নিজের চুল-দাড়ি ছেঁটেছে ওয়াসেম, আর এখন এই অচেনা আগন্তুকও অবিকল ওয়াসেমের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি! শুধু গায়ের রঙটা ওয়াসেমের চেয়ে খানিকটা বেশি ফর্সা। ঘোরলাগা বিস্ময়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে তৃষ্ণার হাতের চায়ের কাপ, পেয়ালায় ঠোক্কর খেয়ে টুংটাং শব্দ ওঠে।
তৃষ্ণাকে ওভাবে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জ্বলে ওঠে ওয়াসেম। ধমকে ওঠে ও, “তুই এখানে দাঁড়িয়ে হাঁ করে কী দেখছিস? যা ভেতরে যা!”

বাঘের গর্জনের সামনে মনে হয় ও এক নিরীহ খরগোশ! এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়ায় না তৃষ্ণা, চায়ের কাপ হাতে একপ্রকার দৌড়েই রান্নাঘরের আশ্রয়ে পালিয়ে যায় সে। স্ত্রীর প্রতি ওয়াসেমের এমন অমানবিক আচরণ দেখে ভেতরে ভেতরে ভীষণ রকম বিরক্ত হয় তৌসির। তার ভাবনায় আসে নাজহার কথা। সে যদি কখনো নাজহাকে এভাবে ধমক দিত, তবে নাজহা নির্ঘাত তার গলার নলি কেটে ফেলত! আর এই মেয়েটা কী ভয়াবহ রকম ভয়ই না পায় ওয়াসেমকে।

তবে সেই বিরক্তিকে আপাতত সরিয়ে রেখে সে তাকায় তার ভাইয়ের দিকে। দীর্ঘ বিরহের পর দুই ভাইয়ের তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি একে অপরের সাথে মিলিত হয়। তৌসিরের বুকের ভেতরটা হাতুড়ির মতো পেটাতে থাকে তার নিজের রক্ত, আপন ভাই, এতগুলো বছর পর আজ তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে! ওয়াসেমও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না, ছুটে এসে দাঁড়ায় তৌসিরের ঠিক মুখোমুখি। তৌসির মুগ্ধ, অপলক চোখে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে বোধ-হয় আয়নায় নিজেকেই দেখছে। ওদের দুজনের গলা চিরে বেরিয়ে আসে একটিমাত্র শব্দ, “ভাই!”
এক লাফে তৌসিরকে নিজের চওড়া বুকে আছড়ে ফেলে ওয়াসেম। তৌসিরও দুহাতে শক্ত করে জাপটে ধরে ভাইকে। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ বছরের না-বলা শূন্যতাগুলো এই আলিঙ্গনে পূর্ণতা পায় আজ। কিছুক্ষণ পর তৌসিরকে একটু ছাড়িয়ে দুহাতে তার গাল আর কান ছুঁয়ে দেয় ওয়াসেম, যেন স্পর্শ করে মেলাতে চায় নিজের অস্তিত্বের সাথে। তৌসিরও অতি আদরে ভাইয়ের মুখমণ্ডল স্পর্শ করে। দুজনের গলাতেই এক আনন্দের রেশ, হাসতে হাসতে প্রায় সমস্বরে বলে ওঠে তারা, “অবশেষে আমরা পারলাম! আমাদের সাক্ষাৎ তো হতেই হতো।”
তৌসিরের কাঁধে হাত রেখে উচ্ছ্বাসে ওয়াসেম বলে ওঠে, “আয়, বোস এখানে। আমি বাবাকে ডাকছি। ইয়াদও একটু পর এসে পড়বে।” এরপর রুদ্র আর নুহমানের দিকে এগিয়ে গিয়ে উষ্ণ কোলাকুলিতে তাদের আবদ্ধ করে বলে, “আয় তোরা, বোস।”

সবাইকে নিয়ে লিভিং রুমের সোফায় বসতে বসতেই তৃষ্ণার উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ে ওয়াসেম, “তৃষ্ণা! তাড়াতাড়ি আমার ভাইদের জন্য কিছু নিয়ে আয়!”
বাড়ির কাজের লোক দুজন ছুটিতে, তাই পুরো বাড়ির সব কাজ একা তৃষ্ণাকেই সামলাতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরই ট্রে-তে করে গ্লাসে শরবত আর বাটিতে পায়েশ নিয়ে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হয় সে। ওয়াসেম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেগুলো টি-টেবিলের ওপর গুছিয়ে রাখে। কাজ শেষে তৃষ্ণা মাথা নিচু করে নীরবে প্রস্থান করতেই রুদ্র আর নুহমানের দিকে তাকিয়ে চরম তাচ্ছিল্যের সুরে ওয়াসেম বলে ওঠে, “তোরা ওকে চিনবি না। এ হলো সেই মেয়ে, যাকে আমার বাপ-মা জোর করে আমার সাথে বিয়ে দিয়ে এনে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে রেখেছে।”
কথাটা আড়াল থেকে তৃষ্ণার কানেও পৌঁছায়। তবে তার মনে কোনো আক্ষেপ বা দুঃখের ছায়া পড়ে না শুধু ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে ওঠে। তার কাছে এসব আর নতুন কী! ওয়াসেম তো সুযোগ পেলেই এমন বিষাক্ত কথা শোনায়।
তবে ওয়াসেমের এই তাচ্ছিল্যভরা কথায় তৌসিরের শান্ত ভ্রু কুঁচকে যায় ও বিরক্তি নিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে ওঠে, “বউ হয় তোর! সম্মান দিতে শেখ। থাকতে মূল্য দে।”

ওয়াসেমের চোয়াল শক্ত করে, চোখের দৃষ্টিতে একরাশ বিরক্তি ফুটিয়ে বলে ওঠে, “ও আমার কিছু হয় না, ওকে আমি কাজের লোকই মনে করি। তুই এসব ফালতু কথা বাদ দে তো! আর কয়টায় মিশনে বের হবি, শুধু সেটা বল।”
ওয়াসেমের অস্থিরতার বিপরীতে তৌসিরকে বেশ শান্তই দেখায়। হাতের গ্লাসে থাকা ঠান্ডা শরবতে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায় সে। গ্লাসের গায়ে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু পানির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ধীর গলায় সে উত্তর দেয়, “আগে ঘাড়ত্যাড়াটা আসুক, ও এলে তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব। ও তো আবার কখন কী ভেবে বসে, যেকোনো সময় ত্যাড়া হয়ে যেতে পারে!”

ঠিক এমন।ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন ইব্রাহিম সাহেব এবং সিতুজা। তাদের উপস্থিতি ঘরের উত্তপ্ত পরিবেশকে কিছুটা হলেও শান্ত করে তোলে। তাদের দেখে তৌসির তৎক্ষণাৎ সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সম্মান জানিয়ে বিনয়ের সাথে সালাম দেয়, “আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন আপনারা?”
ইব্রাহিম সাহেবের বলিরেখাযুক্ত চেহারায় এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি নিয়ে নম্রস্বরে বলেন, “ওয়ালাইকুম সালাম। এই তো আলহামদুলিল্লাহ, একরকম চলে যাচ্ছে। তোমরা কেমন আছো?”
প্রশ্নটা শুনে তৌসিরের বুকের গভীর থেকে এক যুগান্তরের দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। শরীরটাকে পুনরায় সোফায় এলিয়ে দিয়ে, শূন্য দৃষ্টিতে সে বলে, “ভালো নেই আংকেল। সেই তেইশ বছর আগেই তো আমার সমস্ত সুখ এক লহমায় কবরে চলে গেছে। নিজের ভাই, শেকড় জড়ানো জন্মভূমি, আপন রক্ত সব পেছনে ফেলে এসে কি আর ভালো থাকা যায়! বুকের ভেতর প্রতিশোধের যে লেলিহান আগুন জ্বলছে, তা প্রতিনিয়ত আমার কলিজা পর্যন্ত পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।”

জীবনের অভিজ্ঞতায় তিনি জানেন এই আগুনের উত্তাপ কতটা ভয়ংকর হতে পারে। ইব্রাহীম সাহেব গম্ভীরভাবে তিনি বলেন, “সে তো বুঝতে পারছি বাবা। কিন্তু প্রতিশোধ নেওয়াটা এত সহজ কোনো বিষয় নয় তৌসির। তিলে তিলে, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আমাদের সব প্ল্যান সাজাতে হবে। ওদের হাত অনেক ওপরে তখনও যেমন ছিল, এখনও ঠিক তেমনই আছে।”
“যতই বড় হাত হোক না কেন! আমাদের তিন ভাইয়ের ছয় হাত যখন একসাথে হয়েছে, তখন সেই হাত কাটতে খুব বেশি সময় লাগবে না।”
হঠাৎ দরজার দিক থেকে ভেসে আসা ভারী আর আত্মবিশ্বাসী একটি কণ্ঠস্বরে ঘরের উপস্থিত সবাই চমকে ওঠেন। সবার দৃষ্টি একসাথে ফেরে দরজার ফ্রেমের দিকে।

সেখানে স্থির দাঁড়িয়ে আছে ইয়াদ। ও পুরো অস্তিত্বে এক শিহরণ জাগানো রহস্যময়তা। পরনে কালো রঙের লম্বা স্যুট আর মানানসই কালো প্যান্ট। মাথায় পরিহিত টুপিটার কারণে মুখের অর্ধেক অংশ অন্ধকারে ঢাকা। সব মিলিয়ে তাকে চেনা পৃথিবীর বাইরের এক অদম্য, ভয়ংকর সুন্দর সত্তা বলে মনে হয়।
ইয়াদকে দেখামাত্রই ওয়াসেম আর তৌসির তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায়। ইয়াদ এগিয়ে এসে তাদের সামনে দাঁড়াতেই, তিন ভাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। দীর্ঘ তেইশ বছরের জমে থাকা আক্রোশ, না বলা কষ্ট আর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিনজনের সম্মিলিত কণ্ঠ বলে ওঠে, “অবশেষে নিয়তি সুযোগ করে দিল আমাদের।”
এ বলে ওদের ছেড়ে ইয়াদ এক বাটি পায়েশ হাতে নিয়ে সোফায় জাঁকিয়ে বসে আয়েশ করে পায়েশ উপভোগ করতে করতে বাটি হাতে চামচ নাড়তে নাড়তে বলে, “পায়েশটা কিন্তু দুর্দান্ত হয়েছে! আমাকে আরেক বাটি দাও তো। আসার সময় কিছুই খেয়ে আসিনি, পেটে একদম খিদে লেগেছে। সব কথা এখন থাক, আগে তৃপ্তি করে খেয়ে নিই।”
তৌসির বা উপস্থিত বাকিরা ইয়াদের কথায় খুব একটা অবাক হয় না। তারা জানে, ইয়াদ সাধারণ সমাজের আটপৌরে মানুষদের মতো নয় যখন-তখন উদ্ভট আর অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে পরিবেশ হালকা করা বা চমকে দেওয়া তার স্বভাব। ওয়াসেম ইয়াদের দিকে এক পলক তাকিয়ে গলা সামান্য উঁচিয়ে ডাকে, “তৃষ্ণা, ইয়াদের জন্য আরেক বাটি পায়েশ নিয়ে আয় তো।”

​ডাক শুনে ভেতর থেকে পায়েশের বাটি হাতে বেরিয়ে আসে তৃষ্ণা। কিন্তু বসার ঘরে পা রাখতেই সে পাথর হয়ে যায়। তার চোখের সামনে সোফায় বসা মানুষগুলোকে দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে। কিছুক্ষণ আগে যে লোকটা এলো, আর এখন যে বসে আছে কী আশ্চর্য মিল! ওয়াসেমের মতো অবিকল দেখতে আরও দুজন মানুষ বসে আছে ঘরে। তিনজনকে পাশাপাশি দেখলে মনে হয় একই মানুষের তিনটে প্রতিচ্ছবি। তফাৎ শুধু একটাই, ওয়াসেমের গায়ের রঙ ওদের দুজনের চেয়ে সামান্য চাপা।
​‘এসব কী হচ্ছে এখানে? এরা কারা?’ তৃষ্ণার মনের ভেতর হাজারো প্রশ্ন উঁকি দেয়। কিন্তু সে নিজের এই বিস্ময় সযত্নে চোখের পলকে লুকিয়ে নেয়। নিঃশব্দে পায়েশের বাটিটা ইয়াদের সামনের টেবিলে নামিয়ে রেখে চুপচাপ চলে যায় সে।

​তৃষ্ণা চলে যাওয়ার পর পায়েশের বাটি হাতে তুলে নিয়ে ইয়াদ হঠাৎ ওয়াসেমের দিকে সরাসরি তাকায়। চোখেমুখে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে, “ইনি কি তোমার স্ত্রী?”
​ওয়াসেম উত্তর দেওয়ার জন্য মুখ খোলার আগেই পাশ থেকে সিতুজা বলে ওঠেন, “না, ও আমার মেয়ে। ওয়াসেমের সাথে ওর বিয়ে দিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু সে তো এই বিয়েকে মন থেকে মেনেই নেয়নি। তাই ও স্ত্রী নয়।”
​সিতুজার কথায় ঘরের আবহাওয়া কিছুটা ভারী হয়ে এলেও ইয়াদ বরাবরের মতোই নির্বিকার। সে সোজাসাপ্টা ভঙ্গিতে বলে ওঠে, “এত সুন্দরী আর এত চমৎকার আচরণের একটা মেয়েকে তো ভাই কোনোভাবেই ডিজার্ভ করে না! ওকে কি নতুন করে বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন? তাহলে আমার চাচাতো ভাই মেহেতা সর্দারের কথা ভাবতে পারেন। সে বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজছে। ওর সাথেই বিয়ে দিয়ে দিন, অন্তত আমি মাঝে মাঝে এসে এমন দারুণ হাতের রান্না খেতে পারব!”
​ইয়াদের এই আপাত রসিকতায় ওয়াসেমের ভেতরের রক্ত টগবগ করে ফোটতে থাকে। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, চোখের দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে এক চাপা ক্ষোভ। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেয়, কোনো উত্তর না দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে থাকে।

​ইব্রাহিম সাহেবও সম্মতিসূচক গলায় বলেন, “হ্যাঁ, আমরাও পাত্র খুঁজছি। যে মেয়েটার কোনো মর্যাদা দেয় না, তার কাছে অকারণে পড়ে থেকে কী লাভ? ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেব, মেয়েটা নিজের মতো করে নতুন জীবন শুরু করুক।”
​তৌসিরও সুযোগ পেয়ে ওয়াসেমকে খোঁচা দিয়ে বলে, “বিয়ে দিয়ে দেওয়াই ভালো। ওয়াসেমের জন্য আমরা ওর পছন্দমতো আধুনিক কোনো বউ খুঁজব। এত শান্তশিষ্ট আর ভালো একটা মেয়ে ওর জন্য পারফেক্ট নয়।”
​এতক্ষণ চুপ করে সব শুনলেও এবার ওয়াসেমের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। সে বিরক্তি গলায় বলে, “হ্যাঁ, দিয়ে দাও বিয়ে! আর আমার জন্য কাউকে খুঁজতে হবে না। আমি এসব সংসারের খেলায় নেই।”
​ওয়াসেমের কথায় ঘরে যখন এক গুমোট অস্বস্তি তৈরি হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই তৌসির একটা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করে বলে, “আমাকে একটা ফোন দাও তো কারও, আমার ফোনটা বন্ধ হয়ে গেছে। বিবিজানকে তো জানিয়ে দিয়েছি যে আমি পৌঁছে গেছি, কিন্তু আমার বউটা সেই যে বাপের বাড়িতে পড়ে আছে, ওর কোনো খোঁজই নেওয়া হয়নি। একটা ফোন করা দরকার।”

​ইয়াদ নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে তৌসিরের দিকে বাড়িয়ে দেয়। তৌসির ফোন হাতে নিয়ে দ্রুত নাজহার নাম্বার ডায়াল করে। দুবার রিং হওয়ার পরই ওপাশ থেকে নাজহা কল রিসিভ করে। তৌসির সাথে সাথে সবার মাঝখান থেকে উঠে কথা বলতে বলতে একটু আড়ালে চলে যায়। এদিকে কথা শেষ হওয়ায় ইব্রাহিম সাহেবও নিজের কাজে উঠে যান, আর সিতুজা পা বাড়ান রান্নাঘরের দিকে।
​ঘরের বড়রা চলে যেতেই পরিবেশটা আবার পাল্টে যায়। ইয়াদ এবার রুদ্র আর নুহমানের দিকে একটু ঝুঁকে এসে গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, “কী রে, তৌসির কি বউ-পাগল নাকি? ওর বউ তো ওর সাথে মহা গাদ্দারি করেছে, তাই না?”
​রুদ্র ইয়াদের কৌতূহল দেখে মুচকি হাসে। তারপর তৌসিরের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে চাপা গলায় বলে, “আরে ভাই, কী যে বলো না! ভাই তো নাজহা ভাবি বলতে একেবারে পাগল। তুমি তো জানোই না, ভাবি একবার ভাইকে জেলে পাঠিয়েছে, আরেকবার নিজের হাতে গুলিও করেছে! এতো কিছুর পরও, ওই ভাবির জন্যই ভাইয়ের বুকের ভেতর ভালোবাসার দমভরা সমুদ্র।”

হ্যাঁ তৌসির জানত ঐদিন যে নাজহা বিবিজান কে গুলি খাওয়াতে চেয়েছিল কিন্তু লেগেছিল তার। সে জেনেও চুপ ছিল নাজহা কে কিছু বলেনি কিছু করেনি। ইয়াদ নিজের কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে, বেশ জোর গলায় বলে ওঠে, “এমনটাই তো হওয়া উচিত! আমিও তো ভাই আমার বউকে নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। বউকে তো ভালোবাসতেই হয়, বউই তো ঘরের আসল শান্তি। কিন্তু আমাদের আশেপাশে এমন কিছু মানুষ আছে বুঝলি, যারা বউকে বিন্দুমাত্র সম্মান করে না, ভালোবাসাও দেয় না। এদের পরিণতিটা দেখিস, একদিন ঠিকই বউকে হারাবে আর তখন একা বসে ভেড়ার মতো কাঁদবে!”

ইয়াদের কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ বিষাক্ত তীরের মতো ছুটে যায় ওয়াসেমের দিকে। কথাগুলো যে তাকে উদ্দেশ্য করেই বলা, তা বুঝতে ওয়াসেমের এক মুহূর্তও লাগে না। রাগে তার সারা শরীর রীতিরকম জ্বলছে। দাঁতে দাঁত চেপে, গজগজ করতে করতে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে সোজা বাগানের দিকে। ভেবেছিল খোলা বাতাসে একটু স্বস্তি পাবে, কিন্তু এই বাগানে এসেও তার শান্তিতে শ্বাস নেওয়ার উপায় নেই।
বাগানের এক কোণে আসতেই তার কানে ভেসে আসে তৌসির এর কণ্ঠস্বর। তৌসির দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, কানে ফোন চেপে নাজহার সাথে কথা বলছে সে। ওয়াসেম থমকে দাঁড়ায়। তৌসির বেশ মরিয়া হয়েই নাজহাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, “তুমি কি একটু শান্ত হইয়া আমার কথাটা শুনবা? খামোখা এত রাগ ঝাড়ছো ক্যান? আমি কসম খেয়ে বলছি, ফোনে চার্জ আছিলো না, তাই তোমায় কল দিতে পারি নাই।”
কিন্তু ওপাশে থাকা নাজহা তো কোনো যুক্তিই শুনতে নারাজ। সে প্রায় চিৎকার করে ওঠে, “হ্যাঁ! একবার অন্তত ফোন দিয়ে কি বলা যেত না? ইচ্ছে থাকলে মানুষ ঠিকই উপায় বের করে। কিন্তু আপনার তো সেই ইচ্ছেটাই নেই, তাই বলবেন কী করে! থাকুন আপনি আপনার ওই কাজ আর অবহেলা নিয়ে, আমাকে আর কখনোই ফোন দিতে হবে না!”

তৌসির পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। গলার স্বর নরম করে বলে, “ও আমার সাউয়া বোঝো না ক্যা , আমি একটা জরুরি কামে আটকে ছিলাম। আর আমার এই সাউয়ার মোবাইলটাও তো সময়মতো কাজ করে না।”
তৌসিরের এই অসহায় আর্তনাদে নাজহা এবার কিছুটা শান্ত হয়। অভিমানী আর মৃদু স্বরে সে জিজ্ঞেস করে, “বাদ দিন এসব অজুহাত। এখন আপনি শুধু এটুকু বলুন, আপনি কি আমাকে মিস করছেন?”
তৌসির হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, “হ্যাঁ, করছি তো! বহুত মিস করছি।”
নাজহার কণ্ঠে এবার অনুরাগ নিয়ে বলে “তাহলে এতক্ষণ ধরে সেটা বললেন না কেন?”
তৌসির এবার কিছুটা চড়া গলায়, কপট বিরক্তি নিয়ে বলে, “সাউয়া করতামনি! ফোনটা রিসিভ করেই তো যেমনে চোটপাট আর চিৎকার শুরু করে দিছো, তাতে আমি মনের কথা মুখে বলমু কেম্নে ?”
তৌসিরের কথা শুনে নাজহা আবারো সেই একই প্রশ্ন করে বসে,, “মিস করছেন তো?”
“হ্যাঁ, করছি তো।”

তৌসিরের এই ছোট্ট উত্তর শুনে নাজহা এবার আদেশ করে বসে, “তাহলে এখন ফোনটা কেটে দিন।”
এ কথা শুনে তৌসির ভড়কে যায়, “অ্যাঁ! ফোন কাটবো কেন?”
নাজহার গলার স্বরে এবার স্পষ্ট অধিকারবোধ এনে বলে, “আপনি এখন ফোন কাটবেন। কেটে আবার নতুন করে আমায় কল দেবেন। আর কল রিসিভ হতেই বলবেন যে আপনি আমায় ভীষণ মিস করছেন, আপনার এখন শুধু আমার পাশে থাকতে মন চাইছে।”
ওর এই মিষ্টি আবদার শুনে তৌসির না হেসে পারে না। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে ও নরম স্বরে বলে, “আপনি যা হুকুম করবেন ম্যাডাম!”
কথা রেখেই তৌসির ফোনটা কেটে দেয়। কয়েক মুহূর্ত পর আবারো কল ডায়াল করে। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই তৌসির এক বুক আবেগ ঢেলে ভারী গলায় বলে ওঠে, “কৈতরী তো তোরে আমার ভীষণ মনে পড়তাছে রে। তোরে ছাড়া এখানে একটুও ভালো লাগতেছে না। বারবার শুধু তোর কাছে ছুটে যেতে মন চাইতেছে, তোরে আরাম দিতে মন চাইছে সারাক্ষণ।”

তৌসিরের মুখে এমন ঘোর লাগা কথা শুনে ওপাশে নাজহার মুখেও ফুটে ওঠে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। তবে সেই হাসি লুকিয়ে রেখে, কণ্ঠে কৃত্রিম রাগ ফুটিয়ে তুলে ও বলে, “উঁহু! একটু বেশিই বলে ফেলছেন কিন্তু!”
তৌসিরের কথাটা কানে আসতেই ওয়াসেম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ায় না। সে বেশ বুঝতে পারে, এবার ওদের একান্ত ব্যক্তিগত কথোপকথন শুরু হবে, যা সেখানে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে শোনাটা তার জন্য ঘোর অনুচিত। তাই নিঃশব্দে পা বাড়িয়ে সেখান থেকে সরে আসে সে। তবে জায়গাটা ছেড়ে এলেও তার বুকের গহিনে এক তোলপাড় শুরু হয় যায়। আনমনেই সে ভাবতে থাকে তার ভাইদের কথা। তারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে কতটা সুখে আছে! তাদের দাম্পত্যে কী নিখাদ ভালোবাসা, কত যত্ন! নিজেদের প্রিয়তমাকে তারা কেমন আদরে আর সম্মানে আগলে রাখে সবসময়। আর সে নিজে? নিজের কথা ভেবে ওয়াসেমের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে আত্মঘাতী ও তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। সে তো তার তৃষ্ণার সাথে পশুর মতো আচরণ করে! ভালোবাসার ছিটেফোঁটাও তো সে তাকে দিতে পারে না উল্টো সবার সামনে নিজের অধিকারের কথাটুকু স্বীকার করতেও তার বুক কাঁপে। কাউকে আজ পর্যন্ত জোর গলায় বলতে পারে না ‘ও আমার স্ত্রী!’
নিজের এই হীনমন্যতা আর উপেক্ষার কথা ভেবে ওয়াসেমের দমবন্ধ হয়ে আসছে। সে কি তবে আদ্যোপান্ত একজন কাপুরুষ? বিবেকের কাঠগড়ায় সে নিজেই নিজেকে দাঁড় করায় আজ। আর ভেতর থেকে এক নিদারুণ হাহাকারের সাথে নিঃশব্দ উত্তর আসে হ্যাঁ, হয়তো তাই।

“তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে শুধু
আমি মরীচিকার মতো
তবে তাই যদি হয়
করি নাকো ভয়
জানি আঁধার রাত
ঘনিয়ে হবে সূর্যোদয়
আমি ভেবে নিলাম
তুমি সেই লাল গোলাপ
যারে নিরন্তর পাহারা দেয়
এক কাঁটার বাগান…

গোধূলির ম্লান আলোয় ক্রমশ আবছা হয়ে আসছে চারপাশ। তালুকদার বাড়ির বিশাল ছাদের এক নির্জন কোণে বসে আছেন তালহা ভাই। দৃষ্টি তাঁর সন্ধ্যাকালীন দিগন্তে নিবদ্ধ, আর আঙুলগুলো আপন খেয়ালে মায়াজাল বুনছে গিটারের তারে। উনার দরাজ, উদাস কণ্ঠের ব্যাকুল সুরে ছাদের শান্ত বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে গানের প্রতিটি চরণ।
ঠিক উনার পেছনেই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে নাজহা। এই বাড়িতে পা রাখার পর থেকে সবার সাথে এখনও ঠিকমতো কথা বলে ওঠা হয়নি তার। হবেই বা কী করে? এক দিন আর এক রাতের ছোট্ট পরিসরে এত এত মানুষের সাথে কুশল বিনিময় করা কি চাট্টিখানি কথা! তালুকদার বাড়ির ব্যাপ্তি এক ছোটখাটো সাম্রাজ্যের মতো। বাবা আর চাচারা মিলিয়ে মোট পনেরো জন। নাজহার বাবা আর নোমান ছাড়া প্রায় সব চাচাই তিন-চারটি করে বিয়ে করেছেন, যার ফলে শুধু এই বাড়ির চাচাতো ভাইয়ের সংখ্যাই বাহান্ন জন! এই বাড়িতে ভাতিজাদের সংখ্যা সাতাশ, ভাগ্নেরা আছে প্রায় কুড়ি জন। এর ওপর রয়েছে পনেরো-ষোল জনের মতো একঝাঁক ছোট ছোট চাচাতো বোন। চারজন ফুফুর মধ্যে দুজন থাকেন সুদূর প্রবাসে। সব মিলিয়ে এক জমজমাট মেলা। এতসব মানুষের ভিড়ে, এত কোলাহলের মাঝে তালহা ভাইয়ের সাথে নাজহার দেখাই হয়নি এতক্ষণ।

“পাহাড় চূড়ায়
বেয়ে আকাশ তো ছুঁতে দেখিনি
স্রোতস্বিনীর হাওয়ায়
পাড়ি দাও সমুদ্দুর
আছড়ে পড়ে সে ঢেউ
আমার বুকে দুরন্ত বেগে
নাকি কাঁদিয়ে আমাকে সেই
চোখের জলে ভেজো?”

গানের রেশ আবারও ঘুরে আসে প্রথম অন্তরায়। নাজহা মুগ্ধ হয়ে শুনছে। সুরের মোহমায়া কিছুটা কাটতেই সে ধীর পায়ে এগিয়ে যায়, নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়ায় তালহা ভাইয়ের ঠিক পাশটিতে।
নাজহার এই নিঃশব্দ উপস্থিতি কিন্তু তালহা ভাইয়ের নজর এড়ায় না। সে যে এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে, তা তিনি খুব ভালো করেই টের পেয়েছেন। গানের শেষ চরণটি হাওয়ায় মিলিয়ে যেতেই গিটারটা সযত্নে পাশে নামিয়ে রাখেন তালহা ভাই। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নাজহার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে তোলেন। স্নেহমাখা স্বরে প্রশ্ন করেন, “কেমন আছিস?”
ছাদের রেলিং ঘেঁষে রাখা একটা পুরোনো চেয়ারে পা রেখে গার্ড ওয়ালের ওপর উঠে বসে নাজহা। তালহা ভাইয়ের পাশেই বসে সে, তবে মাঝখানে বেশ খানিকটা সযত্ন দূরত্ব বজায় রাখে। এই এক বিঘত দূরত্বটুকু তাদের মাঝের হাজার মাইলের অলিখিত এক নিয়মের দেয়াল।
​বসেই একপলক আড়চোখে তাকায় সে তালহা ভাইয়ের দিকে। উনার চিরচেনা শ্যামবর্ণ মুখশ্রীতে তারপর নিজ দৃষ্টিটা দ্রুত সরিয়ে নিয়ে সন্ধ্যার আকাশের বিশাল শূন্যতায় মেলে দেয় নাজহা। বুকের ভেতরের চাপা দীর্ঘশ্বাসটা গলার কাছে আটকে রেখেই শান্ত স্বরে বলে, “আপনি বলেছিলেন না, সে আমায় ভালো রাখবে? তাই খুব ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”

​তালহা ভাইয়ের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক চিলতে বিষণ্ণ তৃপ্ত হাসি। দৃষ্টি সামনের অন্ধকারে নিবদ্ধ রেখেই তিনি বলেন, “এই তো, আছি কোনোমতে যেমন থাকার মতো। সংসার জীবন কেমন যাচ্ছে?”
​নাজহার চোখেমুখে এক তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। সে বলে, “খুব ভালো। জানেন তালহা ভাই, সে আমায় আমার মতোই ভালোবাসে। আমার মাঝেই তার সব সুখ।”
​কথাগুলো শুনে তালহা ভাই ভেতর থেকে খুশি হন। উনার বুকের ওপর চেপে বসা কোনো এক অদৃশ্য পাথর কিছুটা হালকা হয়। মনে মনে ভাবেন, যাক, পাগলটা অন্তত বাস্তবতা বুঝতে শিখেছে। বাতাসে মিশে থাকা নীরবতা ভেঙে মৃদু স্বরে তিনি বলেন, “বলেছিলাম না, আবেগে ভেসে থাকিস না, বাস্তবতা বুঝবি। দেখবি, আমি তখন আর তোর মনের দুনিয়ায় থাকব না।”
​নাজহার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটা নিমিষেই মলিন হয়ে যায়। ভেতরে জমিয়ে রাখা এক আকাশ অভিমান নিয়ে সে তালহা ভাইয়ের দিকে সরাসরি তাকায়। গলার স্বর কিছুটা গাঢ় করে বলে, “কে বলল আপনাকে যে, আপনি আমার মনের দুনিয়ায় নেই? আমার মন থেকে কেউ কি আপনাকে বের করে দিতে পারে? এই অধিকারটুকু তো আমি নিজেকেও দিইনি!”

​তালহা ভাই এবার হালকা হাসেন। সে হাসিতে এক ধরনের পরিপক্বতা আর প্রশ্রয় মিশে আছে। “বাস্তবতা যখন বুঝেছিস, এটাও বুঝবি। ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে। কোনো সমস্যা নেই।”
​তালহা ভাইয়ের এমন কথায় নাজহার বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। সে আর কোনো ভনিতা না করে সোজাসাপ্টা এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করে বসে, “আচ্ছা, আপনার আমাকে মনে পড়ে তালহা ভাই?”
​খুব শান্ত, অবিচল কণ্ঠে উত্তর আসে, “পড়ে।”
​”কতবার?”
​”চোখের পাপড়ি নড়ে যতবার।”

​উত্তরটা শুনে নাজহার বুকের ভেতরটা ভীষণ ভারী হয়ে আসে। একটা তীব্র কষ্ট গলা টিপে ধরতে চায় ওর। এই মানুষটা তাকে এত ভালোবাসে, অথচ নিয়তি তাদের কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে! নিজেকে সামলে নিয়ে সে ঠোঁটে জোর করা হাসি টেনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “জীবন কতই অদ্ভুত, তাই না? জানেন, কিছু কিছু পরিস্থিতিতে পড়লে মন চায় চিৎকার করে বলি, জন্ম নেওয়াটাই হয়তো মস্ত বড় ভুল!”
​নাজহার কথা শুনে তালহা ভাই এক ফিকে, উদাস গলায় বলেন, “না জন্মালে কী করে বুঝতিস, জন্মে এত বিষ?”
​এই অমোঘ সত্যের সামনে নাজহা আর কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। ওর চারপাশটা স্তব্ধ হয়ে যায়। নির্বাক হয়ে বসে থাকে সে বেশ কিছুক্ষণ। হঠাৎ চারপাশের আবছা আলোয় তালহা ভাইয়ের ভগ্ন স্বাস্থ্যের দিকে নজর পড়ে তার। বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সে বলে ওঠে, “আপনি কি ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করেন না নাকি? এমন শুকিয়ে গেছেন কেন? চোখমুখ একদম পানসে হয়ে গেছে!”

​নাজহার এই আকুল করা প্রশ্নের জবাবে তালহা ভাইয়ের কণ্ঠে কোনো উত্তাপ ছড়ায় না, নেই কোনো অভিযোগের সুর। নিরাসক্ত গলায় তিনি বলেন, “ওরা আমাকে অ্যান্টিডোট দেয় না রে নাজহা। আমি মনে হয় আর বাঁচব না।”
কথাটা শোনামাত্রই নাজহার মনে হয়, ওর বুকের খাঁচায় কেউ একতাল জমাট বাঁধা বরফ সজোরে চেপে ধরেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তার, ধমনিতে বয়ে চলা রক্ত যেন মুহূর্তে জমে যায়। তালহা ভাইকে স্লো পয়জন দেওয়া হয়েছে। আর এই রোমহর্ষক, অমানবিক কাজটা অন্য কেউ নয়, করছেন খোদ নওমি, ঠিক নাজহার বিয়ের দিন! একটা মানুষের মন কতটা পচে গেলে, কতটা অন্ধকারে নিমজ্জিত হলে এমন নিখুঁত পৈশাচিক ছক কষতে পারে?
উদ্দেশ্য তাদের একটাই নাজহাকে যেকোনো মূল্যে এই বিয়েতে রাজি করানো এবং তাকে আজীবন নিজেদের অনামা সুতোয় বাঁধা হাতের পুতুল বানিয়ে রাখা। ছকটা এতটাই ভয়ংকর! যে যতদিন নাজহা তাদের প্রতিটা কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে, ঠিক ততদিনই তারা তালহা ভাইকে ওই বিষের অ্যান্টিডোট মেপে মেপে দেবে। নাজহার বাপ চাচার তো নিজেদের হীন স্বার্থসিদ্ধি আর লোভের বশবর্তী হয়ে এরা এতটাই অন্ধ যে, এমন দশ-বারোটা নাজহা বা তালহাকেও জ্যান্ত কবর দিতে তাদের চোখের পাতা একবারও কাঁপে না। হোক না সে নিজেরই সন্তান তাতে তাদের কিছুই যায় আসে না!

এই যে নাজহার এতদিন তৌসিরের সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকা, তাকে ভালোবাসার নিখুঁত অভিনয় করে বিশ্বাসের মায়াজালে জড়ানো এর মানে এই নয় যে তৌসিরের প্রতি তার বিন্দুমাত্র মায়া জন্মায়নি। সে নিজের ভাগ্যকে মেনেই নিয়েছে যে, বাকি জীবনটা তাকে এই তৌসিরের সাথেই, তার ছাদের নিচেই কাটাতে হবে। কিন্তু তার এই মেনে নেওয়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক ভয়ংকর আত্মত্যাগও আছে। তার একমাত্র লক্ষ্য এখন তৌসিরের মাধ্যমেই তালহা ভাইকে মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনা।
তৌসিরের নিজস্ব ওষুধের কারখানা আছে, আর এসব নিষিদ্ধ রাসায়নিক আর ড্রাগস নিয়ে তার আছে অগাধ জ্ঞান। তাই দিনের পর দিন নানা ছলনায়, মিষ্টি কথার মায়াবী জালে ভুলিয়ে তৌসিরের কাছ থেকেই এই দুর্লভ অ্যান্টিডোটের নাম আর হদিস জেনে নেয় নাজহা। তারপর আসে এক ভয়ংকর রাত। রাতের নিস্তব্ধতা চিরে যখন সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন একবুক ভয় আর কাঁপা পা নিয়ে শিকদার বাড়ির অন্ধকার গুদামে পা রাখে সে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, লুকিয়ে রাখা এক্সট্রা স্টক থেকে অনেক কষ্টে চুরি করে আনে ছোট্ট এই আ্যান্টিডিউট এর শিশিটা। জিনিসটা ভীষণ রেয়ার, সাধারণ ওষুধের দোকানে এর দেখা মেলে না। তৌসিররা এটা গোপনে, লোকচক্ষুর আড়ালে সম্পূর্ণ অবৈধভাবেই তৈরি করে।

নাজহা তার ওড়নার নিচ থেকে ঘামে ভেজা, কাঁপা কাঁপা হাতে ওষুধের বাক্সটা বের করে তার হাতের আঙ্গুল পর্যন্ত থরথর করছে। তালহা ভাইয়ের দিকে হাতটা এগিয়ে দিতে গিয়ে তার বুকটা ডুকরে ওঠে, গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে কান্না। তালহা ভাইয়ের দিকে এখন আর সরাসরি তাকানো যায় না চোখের নিচে গাঢ় কালির প্রলেপ, গালের হাড় উঁচু হয়ে আছে, ফ্যাকাশে চামড়ায় মনে হয় জীবনের কোনো স্পন্দন নেই। বিষের ধীর ও নিষ্ঠুর প্রভাবে তরতাজা, প্রাণবন্ত মানুষটা ঝড়ে নিভু নিভু প্রদীপের মতো কাঁপছেন। নাজহার গলা বুজে আসে কান্নায়, অতিকষ্টে ঢোক গিলে ভেতরের কান্নাটাকে দমিয়ে রেখে সে বলে,

“আল্লাহর পর এই পৃথিবীতে আপনার আর কেউ নেই, আমি ছাড়া। তাই আমাকেই আপনার শেষ ঢাল হতে হবে। নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, নিজের কুমারীত্ব, নিজের সমস্ত আত্মসম্মান আর পরিচিতি বিসর্জন দিয়ে শুধু আপনার জন্য এই ওষুধ নিয়ে এসেছি আমি। আমি চাই না আপনি আমার হন, কিন্তু আমি চাই আপনি বেঁচে থাকুন। এই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই হোক না কেন, শুধু সুস্থভাবে শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকুন।”
একটুখানি দম নেয় সে। তারপর টলটল করতে থাকা চোখ জোড়া শক্ত করে, চোয়াল শক্ত রেখে ও আবার বলে,
“তৌসিরকে আমি সব খুলে বলব। আমার বিশ্বাস, উনি আমাকে ঠিকই বুঝবেন। উনাকে দিয়েই আমি আপনার পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে দেব। আপনি অনেক দূরে, দেশের বাইরে চলে যাবেন। এই জানোয়ারদের বিষাক্ত শ্বাস আর নোংরা ছায়া থেকে অনেক, অনেক দূরে। আর আমিও আমিও আমার নিয়তি মেনে নিয়ে, নিজের সংসার আর একঘেয়ে জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ব।”

কথাগুলো শুনে তালহা ভাইয়ের ধুকপুক করতে থাকা দুর্বল বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে, কলিজাটা কেউ মনে হচ্ছে ধারালো ছুরি দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। এই স্বার্থপর পৃথিবীতে নাজহা আজও তার কথা এত গভীরভাবে ভাবে! এই ওষুধ জোগাড় করে আনা তো আর মুখের কথা নয়, এর পেছনে তার নাজহার কত নির্ঘুম রাত, কত শিহরণ জাগানো ভয় আর কত বড় স্যাক্রিফাইস লুকিয়ে আছে! তালহা ভাই শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ম্লান হাসেন। তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে ওষুধের বাক্সটা নিজের হাতে তুলে নেন। শরীর ভীষণ দুর্বল, আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে অবিরত। বিষণ্ণ, ধরা গলায় শূন্যতা নিয়ে তিনি বলেন,
“আমার না আজ ভীষণ কষ্ট হচ্ছে রে, নাজহা! বুকের ভেতরটা দাউদাউ করে পুড়ে যাচ্ছে। আমাদের এমন নিষ্ঠুর পরিণতি না হলেও তো পারত! আমার সবচেয়ে আপন যে তুই, সেই তুই-টাও আজ আমার চোখের সামনে চিরকালের জন্য পর হয়ে গেলি!”
নাজহার চোখের কোণে ততক্ষণে বাঁধভাঙা পানি জমে ওঠে, টপটপ করে গাল বেয়ে পড়তে থাকে। কী নিদারুণ এক অসহায়ত্ব তাকে চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করেছে! তার নিজের পরিবার, যাদের সে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করত, তারাই তাকে যখন যেভাবে খুশি দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহার করে। না দিল তালহা ভাইয়ের সাথে একটু শান্তিতে থাকতে, না দিবে এখন তৌসিরের সাথে সবকিছু ভুলে একটা নতুন জীবন শুরু করতে।
দু’হাতে সজোরে চোখের পানি মুছে নেয় নাজহা। ভেতরের সমস্ত জমে থাকা যন্ত্রণা, আক্ষেপ আর ক্ষোভ উগরে দিয়ে ভারী, গলায় সে বলে ওঠে,

“আমি শুধু চাই আমার ভালোবাসার পুরুষটা ভালো থাকুক। হ্যাঁ, আমি হয়তো হবো সবার চোখে একটা দুশ্চরিত্রা নারী, আমি চরিত্রহীন, আমি সুযোগসন্ধানী দু-মুখো সাপ! আমি মহা ছলনাময়ী, আমি জঘন্য খারাপ। কিন্তু আজ এই খারাপের চূড়ান্ত সীমায় দাঁড়িয়ে, কলঙ্কের সবটুকু কালিমা নিজের গায়ে মেখেও আমি চিৎকার করে বলছি আমার ভালোবাসার মানুষটার বেঁচে থাকার জন্য আমি সব করতে পারি সব!”
কথাগুলো বলতে বলতেই নাজহার দু’চোখ ছাপিয়ে পানি ধারা নেমে আসে। সযত্নে ওড়নার পাড়ে অবাধ্য অশ্রু মুছতে মুছতে একরাশ আকুতি নিয়ে সে বলে ওঠে, “আপনি ভালো থাকুন। জগতের সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে, সব নিয়ম ভেঙে হলেও আমি চাইব, আপনি ভালো থাকুন। আমাকে তো আর নিজের করে আপন করে নিলেন না, অন্তত আমার এই শেষ ইচ্ছেটাকে আপন করে নেবেন। হয়তো ভাবছেন আমি আপনার সামনে স্রেফ নাটক করছি! তৌসিরের সাথে সুখের সংসার গড়ে আপনাকে একেবারে ভুলে গিয়ে বেশ ভালোই আছি! কিন্তু সত্যিটা হলো, আমি একটুও ভালো নেই। শুধু আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিদিন আমি মানিয়ে নেওয়ার এক নিপুণ ছলনা করে চলেছি। আর এই শ্বাসরুদ্ধকর ছলনা আমাকে সারাজীবনই করে যেতে হবে।”

তালহা ভাই উনার দুর্বল, কম্পিত হাতখানি স্নেহে আর বুকভাঙ্গা কষ্টে নাজহার মাথায় রাখেন। ভেতরে জমে থাকা একবুক হাহাকার নিয়ে ভাঙা, অস্পষ্ট গলায় বলেন, “আমার জন্য আর এত কিছু করিস না রে। তুই সুখে থাক। তৌসির ভাই খুব ভালো মানুষ, তুই ওর সাথেই ভালো থাকবি।”
নাজহা কান্নায় ভেজা ঠোঁটে এক চিলতে ম্লান, করুণ হাসি ফুটিয়ে নিয়ে বলে, “আমি জানি আমার স্বামী আমার দিকে থেকে ভীষণ ভালো মানুষ। আমার মতো করে তিনি আমায় ভালোবাসেন, আর আমিও আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি তাকে মন থেকে মেনে নেওয়ার। কিন্তু এই যে আমার পুরোটা চিত্তজুড়ে শুধুই আপনার অধিকার, আমি এই অবাধ্য অন্তরকে কী বোঝাব তালহা ভাই? আচ্ছা, আমি এত খারাপ কীভাবে হলাম? ওষুধের জন্য আমি এত নিচে কী করে নামলাম? এত নিকৃষ্ট কেন হলাম আমি? আমাদের পরিবারের মানুষগুলো এত স্বার্থপর কেন বলুন তো? ওরা কি পারত না আপনাকে আর আমাকে একটা সুন্দর, স্বাভাবিক জীবন দিতে? তা না করে, শুধু আমাকে দিয়ে তৌসিরের ক্ষতি করাবে বলে ওরা দিনের পর দিন আপনাকে স্লো-পয়জন দিয়ে গেল! আমি কী করব তখন? আমি তৌসিরকে বাঁচাব, নাকি আপনাকে? তাই বাধ্য হয়ে আমি দুজনকেই বেছে নিয়েছি। আমি ওদের কোনো কথাই শুনিনি। তৌসিরের সাথে স্বাভাবিক সংসার শুরু করেছি, আর ছলেবলে এই ওষুধটা জোগাড় করেছি।”

একটু থেমে নিজেকে সামলে নিয়ে নাজহা আবার বলতে থাকে, “টানা ২৮ দিন শুধু রাতে খাবেন এটা, তাহলেই আপনার শরীরের ভেতরের সব বিষের রেশ কেটে যাবে। আর হ্যাঁ, এটা খুব সাবধানে লুকিয়ে রাখবেন। নিজের নিচের ঠোঁটে সবসময় একটু হালকা বেগুনি রঙের লিপস্টিক মাখিয়ে রাখবেন, ঠিক যেমনটা বিষের প্রভাবে হয়ে থাকে। যাতে আব্বা আর ফুফু ভাবে বিষ এখনো আপনার শরীরেই আছে আর তার কাজ করছে।”
এটুকু বলেই নাজহা একটা বেগুনি রঙের লিপস্টিক তালহা ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “নিন।”
তালহা ভাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন, নির্বাক বিস্ময় আর অসহায়ত্ব নিয়ে জিনিসটা হাতে নেন তিনি। নাজহা নিজের মাথায় রাখা তালহা ভাইয়ের হাতটা দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরে। উনার বিষণ্ণ চোখের দিকে স্থির, অনড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “আপনি আমার কসম খান যে, আপনি ওষুধটা ঠিকমতো নিয়ম করে খাবেন! আমি ঠিক যেমনটা বলেছি, আপনি তেমনটাই করবেন! বলুন, ‘আমি আমার নাজহার কসম খেয়ে বলছি, ও যা বলল আমি ঠিক তাই করব’।”

তালহা ভাইয়ের গলা কান্নায় বুজে আসে। বুকে চেপে বসা এক পাহাড় সমান যন্ত্রণা আর অসহায়ত্ব নিয়ে তিনি ধরা গলায় উচ্চারণ করেন, “আমি আমার নাজহার কসম খেলাম, ও যা বলল আমি ঠিক তাই করব।”
নাজহা ধীরেসুস্থে নিজের হাত সরিয়ে নেয়, তালহা ভাইও শূন্যতায় হাত নামিয়ে নেন। একটা ভারী, ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, “এখন তো আমাকে বাঁচানোর পথ পেলি। এবার অন্তত আমাকে ভুলে গিয়ে নিজের সংসারটায় মন দে।”
নাজহা মুখে এক তিক্ত, বেদনাহত হাসির রেখা নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “যেদিন এই হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন একেবারে থেমে যাবে, সেদিন থেকে নাহয় ভুলে যাব!”
তালহা ভাই শান্ত স্বরে বলেন, “আমাকে ভুলে যা। তৌসির ভাইয়ের সাথে সুখে আছিস, আরও সুখী হবি।”
​উত্তরে নাজহা বলে, “হ্যাঁ, সুখে আছি। বড্ড বেশি সুখে আছি! আপনাকে ভুলতেও পারব না, আবার নিজের করেও পাব না। ভাবতে পারছেন, কত ভয়ংকর সুখ আমার!

” বোকা বোকা কথা বাদ দে! নিজেকে বুঝা! ”
নাজহা ফিকে আসে, ” নিজেকে বুঝাই কিন্তু কি বুঝাই নিজেও জানিনা!
এ বলে একটু থেমে প্রশ্ন করে, ” তালহা ভাই, জীবন এমন কেন? আমি কেন মন মতো কিছুই পেলাম না?”
​তালহা ভাই একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, “আকাঙ্ক্ষা মাত্রই কি সব প্রাপ্তি সম্ভব? নিয়তি তো আর আপন ছন্দে রচিত কোনো কাব্য নয়, যা চাইলেই নিজের মতো করে লেখা যায়।”
​নাজহা ম্লান হাসে “এই যে আপনার এই কথাগুলো, এগুলোও আমার ভালোবাসার কারণ। শুনছেন তালহা ভাই? আমি আজও আপনাকে ভালোবাসি আর সারাজীবন বাসব। আমি পাপ করছি, কিন্তু নিজেকে বোঝাতে আমি ব্যর্থ। তৌসিরের প্রতি মন গলে ঠিকই, কিন্তু আপনাকে ভোলার সাধ্য আমার নেই। আব্বা আর ফুফু যদি আপনাকে বিষ না খাওয়াতো, তবে মরে গেলেও আমি তৌসিরের নামে কবুল পড়তাম না।”

​”বাদ দে এসব,এখন তুই তৌসির ভাইয়ের সাথে সংসারটা মন দিয়ে কর। আমাকে নিয়েও আর টেনশন নেই, ইনশাআল্লাহ আমি সুস্থ হয়ে যাব।”
​নাজহা সম্মতি জানিয়ে বলে, “করবই তো। আমার নিয়তি তো উনার সাথেই বাঁধা। এখান থেকে গিয়ে সব সত্যি আমি তৌসিরকে বলে দিব। এরপর উনি মারলেও ভালো, কাটলেও ভালো।”
​”হ্যাঁ, বলে দিস। তৌসির ভাই নিশ্চয়ই বুঝবেন, উনি বুঝদার মানুষ।”
​”তার মতো মানুষ হয় না, তালহা ভাই।” একটু থেমে নাজহা পুনরায় বলে, “তবে তার থেকেও আপনি প্রিয় ছিলেন, প্রিয় থাকবেন। আপনি আমার প্রথম ভালোবাসা, আপনার তুলনা হয় না। আপনার মতো পুরুষ আর হয় না তালহা ভাই।”
​তালহা ভাই শুষ্ক হাসেন। এই মেয়েটা আসলে কী চায়, তা হয়তো সে নিজেও ভালো করে বলতে পারবে না। ​ঠিক তখনই তৌসিরের ভিডিও কল আসে। নাজহা দ্রুত চোখের পানি মুছে কলটা রিসিভ করে সালাম দেয়।
​ওপাশ থেকে তৌসির জিজ্ঞেস করে, “কী করো?”

​নাজহা ফোন ঘুরিয়ে তালহা ভাইকে এবং ছাদের চারপাশ দেখিয়ে সাবলীলভাবে বলে, “ছাদে এসেছিলাম। এসে দেখি তালহা ভাই গান গাচ্ছেন, তাই উনার পাশে বসে গল্প করছিলাম। আপনি কী করছেন?”
​নাজহার অকপট সত্য কথায় তৌসিরের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। এই মুহূর্তে হঠাৎ ভিডিও কল দেওয়ার পেছনে একটি বিশেষ কারণ আছে। কিছুক্ষণ আগেই তার হোয়াটসঅ্যাপে একটি অচেনা নম্বর থেকে একটি ছবি এসেছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, নাজহা তার প্রেমিক তালহার পাশে বসে আছে। কেউ একজন পেছন থেকে ছবিটি তুলে পাঠিয়েছে এবং নিচে লিখেছে, ‘তোমার বউ তার প্রেমিকের সাথে।’ অথচ নাজহা নিজ থেকেই তৌসিরকে সবটা সত্যি বলে দিচ্ছে। ​তৌসির স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আচ্ছা কৈতরী, পরে কথা কই। কামে আছি।”
​নাজহা কল কেটে দেয়। তালহা ভাই কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “তৌসির ভাই কিছু মনে করবে না? তুই যে কল ধরলি, সত্যিটা বললি?”

​নাজহা একবার পেছনে তাকায়, তারপর বলে, “সত্যিটা না বললে এখন উনি অনেক কিছুই মনে করতেন। আপনি যখন আমার মাথা থেকে হাত সরান, তখনই নওমি ফুফু এসেছিলেন। আমি টের পেয়েছি যে তিনি পেছন থেকে ছবি তুলে নিয়েছেন। আমি জানি উনারা এখন চাইছেন তৌসিরের কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে এনে লুসিয়ানের সাথে বিয়ে দিতে। এসব ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির জন্যই উনারা এগুলো করছেন। তাই আমি নিজ থেকেই সত্যিটা বললাম।”
​একটু থেমে নাজহা আবার বলতে থাকে, “আর তৌসিরকে যদি আমি বলিও যে আমি আমার ভালোবাসার পুরুষের সাথে ছিলাম, উনি কিছু বলবেন না। কারণ উনি জানেন যে আমি একজনকে ভালোবাসি। আমি আগেই উনাকে বলেছি, তবে সেই মানুষটি যে কে, তা উনি জানেন না। আমি আগামীকালই শিকদার বাড়িতে চলে যাব। এখানে আসার একমাত্র কারণ ছিল আপনার অ্যান্টিডোটটা দিয়ে যাওয়া। ভালো থাকবেন, আমার না পাওয়া চাঁদ।”
​কথাগুলো শেষ করে নাজহা ধীর পায়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে আসে। যাওয়ার সময় ফিরে তাকায় ফের পিছনে আর প্রশ্ন করে, ” আচ্ছা আমার সাথে কথা বলার সময় আপনার হাত এত কাপে কেন? সবসময় এমন হতো আজও হলো!

তালহা ভাই মৃদু হাসেন, ” অন্তরে থাকা সবকিছু বোঝাতে পারি না বলেই উপরওয়ালা হয়তো চিহ্ন স্বরুপ আমায় দীর্ঘশ্বাস আর কাপতে থাকা হাত দিয়েছেন.!”
নাজহা আর একটি শব্দও উচ্চারণ করে না, একরাশ নিস্তব্ধতা সঙ্গী করে ধীরপায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। চোখের কোণ বেয়ে শ্রাবণের ধারার মতো অঝোরে ঝরে পড়ছে নোনা পানি। পড়ুক, এভাবেই বাঁধভাঙা পানির মতো বইতে থাকুক ওর সব না-বলা কষ্ট।

ওদিকে তালহা ভাই হাতের মুঠোয় ধরা ঔষধের বাক্স আর লিপস্টিকটার দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। এক তীব্র অপরাধবোধে বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে হাহাকার করে ওঠে উনা। নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে ওঠেন মনশ্চক্ষুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাজহার উদ্দেশে, “শুধু এই মৃতপ্রায় মানুষটাকে বাঁচাতে আজ তুই এতটা নিচে নেমে গেলি? আমার তো আর বাঁচার কোনো সাধ নেই রে, একটুও ইচ্ছে নেই। কিন্তু তোর এই অবর্ণনীয় কষ্ট আমি কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেব না। আমি বাঁচব, তোর এই আত্মত্যাগের মর্যাদাটুকু রাখতে হলেও আমি বাঁচব।” এটা বলে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জিনিস দুটো অতি সাবধানে নিজের বুকপকেটে আগলে রাখেন তিনি।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৫

নাজহা ছাদের দরজা পেরিয়ে ঠিক যেই মুহূর্তে নিচে পা বাড়াতে যাবে, তখনই চারপাশের মৌনতা চুরমার করে দিয়ে ‘ঠাস’ করে এক বিকট বোমের মতো শব্দ আছড়ে পড়ে। শব্দটা কোনো অদৃশ্য চাবুকের মতো সজোরে আঘাত হানে ওর কলিজায়। ছ্যাঁত করে ওঠে বুকের ভেতরটা, তড়িঘড়ি করে পেছনে ফিরে তাকায় নাজহা। দেখে, ছাদের রেলিংয়ের এপাশে তালহা ভাইয়ের সাধের গিটারটা হয়ে পড়ে আছে, অথচ সেখানে তালহা ভাই নেই! এক মুহূর্তেই নাজহার অন্তরাত্মাখানি শূন্যতায় কেঁপে ওঠে। এক অজানা আতঙ্কে রক্ত হিম হয়ে আসে ওর, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে সে। বিস্ফারিত চোখে কয়েক সেকেন্ড সেই শূন্য রেলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে নাজহা, তারপর ওর বুক চিরে বেরিয়ে আসে এক তীব্র, গগনবিদারী আর্তনাদ,
“তালহা ভাই……………….

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৭

10 COMMENTS

  1. পরের পর্ব তারাতাড়ি দিন প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ

  2. Apu tumi bolechile aj akta porbo dibe kintu dilena keno? Ar koto opekkha korbo?sob porbo complete 😤💔

Comments are closed.