Home প্রেয়সীর অনুরাগ প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৬

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৬

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৬
Sadiya Jahan Simi

পূর্ব আকাশে সূর্য উঠেছে। আকাশে লাল আভার ছড়াছড়ি। পাখির কলতানে মুখর পরিবেশ। কুয়াশার চাদরে আশপাশটা বেশ খানিকটা অন্ধকার। গাছের সবুজ পাতাগুলো কুয়াশায় ভিজে গাড় সবুজ বর্ণ ধারণ করেছে। যদিওবা শীতের আগমনে গাছের পাতা ঝরে যাচ্ছে। ঘাসে ছোট ছোট শিশির বিন্দু জমে আছে।ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে শীত যেন একটু বেশিই পড়ছে। এই শীতের মাঝেও রাফসার ঘুম ভেঙ্গে গেল ভোরেই। এতো দিনের অভ্যাস অনুযায়ী ঘুম হলো না আর। প্রায় কয়েক বছর ধরেই ভোরে উঠা রাফসার ডেইলি রুটিন ছিল। মেডিকেলের পরীক্ষা দিয়েও শান্তি নেই। সারারাত এ পাশ ওপাশ করেই কেটেছে ওর। পরীক্ষা যতই ভালো হোক মনে মনে একটা টেনশন থেকেই যায়।

তবে ভিন্ন দিনের তুলনায় আজ ভোরের ঘুম কিছুটা দেরিতে ভেঙ্গেছে। পিটপিট করে রাফসা চোখ খুলতেই মাথার উপরে সিলিং ফ্যানটা চোখে পড়ে। শীতের আগমনে ফ্যানের চলার পথ বন্ধ হয়েছে প্রায় একমাস এর কাছাকাছি। রাফসার শীত তুলনামূলক একটু বেশিই লাগে। গরম কালেও কাঁথা মুড়ি দিয়ে মরার মতো ঘুমোনোর অভ্যাস ওর।
চোখের পলক ফেলে রাফসা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সিলিংয়ে। গতরাতে ঘুম ততো একটা ভালো হয়নি। আড়মোড়া হয়ে বিছানায় বসে বালিশের নিচ থেকে ফোন বের করে টাইম দেখেই চোখ কপালে উঠে গেল। ছয়টা বেজে গিয়েছে। ফজরের নামায পড়তে হবে। রাফসা হুড়মুড়িয়ে নেমে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ওযু করে বেরোয়। ফজরের সালাত আদায় করে আল্লাহর কাছে মেডিকেলে চান্স পাওয়ার জন্য দোয়া করে। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে সেজদায় পড়ে সবকিছুর জন্য শুকরিয়া আদায় করে। জায়নামাজ ভাঁজ করে আলমারিতে তুলে রাখল। অলসতা নিয়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পরল। মাথা ব্যথা যেন ইদানিং ডেইলি রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথা ব্যথা করে। তার কারণ রাতে ঘুম ফিলাপ না হওয়া। এপাশ ওপাশ করতে করতে বিরক্ত হয়ে উঠে বসে। কফি খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু শরীরে অলসতা ভর করে আছে যেন। বিছানা ছেড়ে ওড়নাটা গায়ে জরিয়ে নিল। শাল বা সোয়েটার কখনোই পড়ে না ও। ধীর কদম ফেলে এগিয়ে যায় ছাদের উদ্দেশ্য।

ছাদের দরজায় এসে দাঁড়াতেই একটা দমকা হাওয়া ছুঁয়ে গেল রাফসার কায়া। শীতের ঠান্ডা হাওয়ায় গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। চারপাশটা বেশ পরিস্কার হয়েছে। কুয়াশা কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। রাফসা এগিয়ে যায় সামনে। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দূর আকাশের পানে তাকিয়ে প্রকৃতির স্বাদ নিতে লম্বা কয়েকটা শ্বাস নিল।
টুয়েন্টি ওয়ান, টুয়েন্টি টু, টুয়েন্টি থ্রি, টুয়েন্টি ফোর, টুয়েন্টি ফাইভ…
রাফসা চমকে উঠলো হঠাৎ। নাম্বার কাউন করছে কে। ভয়েসটা ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। খুব ধীর গতিতে ক্ষীণ আওয়াজ শুনে রাফসা ছাদের অন্য প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়। গাছের জন্য এদিকটা স্পষ্ট দেখা যায় না।
সেখানে যেতেই চোখ পড়ল অনাকাঙ্ক্ষিত একটি দৃশ্যে। পুশ আপ করছে উদ্যান।কমপ্রেশন টি-শার্ট জড়ানো শরীরে।যা শরীরের সাথে একদম লেপ্টে আছে এবং প্রতিটি পেশির ভাঁজ ফুটিয়ে তুলছে স্পষ্ট। চুলগুলো খানিকটা এলোমেলো হয়ে সামনে পড়ে আছে।

ফোরটি ফাইভ,ফোরটি সিক্স, ফোরটি এইট..
রাফসা অবাক হলো। এই লোকের তো থামাথামির কোনো নামই নেই। বিরক্ত হয়ে বলল, ”কি কচু করছেন এসব! আজাইরা খেয়ে দেয়ে কাজ নেই আপনার!”
রাফসার কথায় মাঝপথে পুশ -আপ করা থামিয়ে দিল উদ্যান। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দুহাতে চুলগুলো ঠেলে পেছনে ফেলে। রাফসার চোখে চোখ রেখে গম্ভীর গলায় বলল, ”এটা আপনার কাছে কচুর কাজ মনে হচ্ছে মিসেস রাওদ! শরীরকে ঠিক রাখতে এক্সারসাইজ করা কতটা প্রয়োজন, জানেন না আপনি?”
”না। উল্টো পাল্টা হাত পা ছুড়ে নাচানাচি করলেই এক্সারসাইজ হয়ে যায়। এতো ঢং করতে হয় না।”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে তাকালো এহেন কথায়। ঘাড়ে হাত ঘষে শান্ত স্বরে বলে উঠলো,

”গাধা।”
”গাধার জামাই।” মুখ ফসকে বলে ফেলল রাফসা। তা বুঝতেই পেরে মুখে হাত চেপে ধরে অনবরত মাথা নাড়ায়। উদ্যান বাঁকা হেসে আফসোস করে বলে,
”ঠিক বলেছেন মিস। আমার বউ একটা গাধা! লোকে তো আমায় পাগল বলবে, এমন একটা গাধাকে বিয়ে করার জন্য। আফসোস!”
উদ্যান বাঁকা কথায় রাফসা চুপ করে থাকে গেল। মুখ বাঁকিয়ে বললো,
”এক কাজ করেন বড় ভাই। আফসোস করে তো আর লাভ নেই। ডিভোর্স দিয়ে দিন।”
উদ্যানের ঠোঁটের কোণে লেখে থাকা হাসিটা মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যায়। চোখে ভর করে রাফসার প্রতি রাগ। চিবুক শক্ত হয়ে আসে। কাটকাট কন্ঠে বলে, ”ফাজলামো করিস আবার! থাপড়ে গাল ফাটিয়ে দেবো বেয়াদব।”
”কে বেয়াদব!”

”তুই ছাড়া আর কাউকে আপাতত নেই এখানে। কাল রাতেও কি বলেছিস মনে আছে!”
রাফসা দু’পাশে মাথা নাড়ায়। অর্থাৎ মনে নেই ওর। উদ্যান শক্ত কন্ঠে বলল,
”তুই একটা ডিজাস্টিং জামাই, এটা বলিসনি! তোর কত বড় সাহস তুই করে বলিস আমায়!”
রাফসা মুখ বাঁকিয়ে বললো, ”ভালো হয়েছে।”
”বেয়াদব। আদব কায়দা সব গুলে খেয়েছিস!”
রাফসা বিরক্ত চোখে তাকালো। কি শুরু করেছে এই লোক।
”আপাপতত এক কাপ কফি হলে চলবে। আদাব কায়দার টেস্ট খারাপ। চটপট করে আমার জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে আনুন।”
ভ্রু কুঁচকে যায় রাফসার কথায়। কি সুন্দর করে আদেশ দিচ্ছে। দুই কদম পা ফেলে উদ্যান এগিয়ে এলো। রাফসার পানে হালকা ঝুঁকে শাণিত গলায় বলল, ”কি দিবেন তাহলে?”
উদ্যানের হঠাৎ কাজে ভরকে গেল রাফসা। দুই পা পিছিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিঙ্গেস করে,

”কি চাই!”
”চাই তো অনেক কিছুই। কিন্তু এখন না। আমারটা আমি পরে আদায় করে নেবো মিসেস রাওদ।”
মুচকি হেসে উল্টো ঘুরে ছাদ থেকে নেমে
যায় উদ্যান। রাফসা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
উদ্যানের গমন পথে তাকিয়ে বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে। বিড়বিড় করে বলল, ” বিরক্তিকর একটা লোক। দুচোখে দেখতে ইচ্ছে করে না এটাকে।”
দশ মিনিট পরেই উদ্যান দুই কাপ কফি নিয়ে হাজির হয়। রাফসা থমথমে ভাব নিয়ে দাঁড়ায়। রাফসার মুখের এক্সপ্রেশন দেখে উদ্যান ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো, ”কি হয়েছে! মুখের হাল বেহাল কেন?”
রাফসা কফিতে চুমুক দিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে বলে, ”আমার মুখ আমি যেমন ইচ্ছে করে রাখব।তাতে আপনার কি! আর এটা কফি বানিয়েছেন? কি জঘন্য খেতে।”
রাফসার এহেন তুচ্ছতাচ্ছিল্য কথায় স্তব্ধ হয়ে যায় উদ্যান। ব্যবহার এমন করছে কেন। কফি স্বাদ ঠিকঠাক আছে। তবুও রাফসার এমন লাগছে কেন। উদ্যান ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে এসে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল, ”কি হয়েছে! এমন করছিস কেন? খারাপ লাগছে!”

রাফসা মুখ ঘুরিয়ে নিল। রাফসার ব্যবহারে উদ্যান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ও বুঝতে পারছে রাফসা কেন এমন করছে। হতাশার শ্বাস ফেলে ভারিক্কি কন্ঠে বলল, এসব কবে জেনেছিস?”
রাফসা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “যেদিন হয়েছে সেদিন।”
রাফসার জবাবে স্তম্ভিত হয়ে পড়ল উদ্যানে। যেদিন হয়েছে মানে কি। ব্যাকুল হয়ে বলল, “মানে! যেদিন হয়েছে এটার মানে কি?‌কবের কথা বলছিস তুই!”
“এপ্রিলের আট তারিখ।” দায়সারাভাবে উওর দিল রাফসা। কথার মাঝে মাঝে কফিতে চুমুক দিচ্ছে। উদ্যান চোখের পড়তে ঠোঁট বাঁকালো। কফি নাকি জঘন্য হয়েছে। আবার কি সুন্দর করে খাচ্ছে দেখো।
“তুই জেনে সাইন করেছিলি!”
“কোনো সন্দেহ আছে?”
উদ্যান তা শুনে অবাক হয়ে তাকালো। তারমানে কি রাফসা প্রথম থেকেই সব জানে। আর জেনেই রেজিস্ট্রি পেপাররে সাইন‌ করেছে।

“তাহলে রুমে চলো জান। বউয়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিন বছর হচ্ছে,আর কত একলা থাকবো!”
চোখ মুখ কুঁচকে তাকায় রাফসা। উপরে উপরে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে গম্ভীর গলায় বলল, “মুখ ভেঙ্গে দেবো অসভ্য পুরুষ।”
“তাহলে বল, কি করে জেনেছিস!”
রাফসা উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। আকাশে দিকে তাকিয়ে সেইদিনের কথা মনে করে।
__ অতীত ___
উদ্যানের সুইজারল্যান্ড যাওয়ার ছয় মাস তখন। সবকিছুতে বাড়াবাড়ি করা রাফসা একেবারে চুপ হয়ে গেছে। কোলাহলে ভারী বিরক্ত হতো। বিকেলের দিকে চুপটি করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল সেদিন। ভালো না লাগাতে ছাদের উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। ছাদে গিয়ে গাছের পরিচর্যা করলে মনটা বোধহয় হালকা হবে। এই ভেবে রাফসা ছাদে উঠে। ছাদে উঠতেই কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কথা ভেসে আসে।

“কি বলছো তুমি উদ্যান ভাইয়া? এটা কি করে সম্ভব। রাফসা এখনো ছোট। আঠারো বছর পূর্ন না হলে বিয়ে হবে কি করে।”
রাফসা কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দরজায় হাত রেখে নিজেকে সামলে ধরে। কিসের বিয়ের কথা বলছে। আর উদ্যান কেন এসব বলছে। তখনি আবার রিশান বলে উঠলো।
“ভাইয়া রাফসার বিষয়টা জানি। কিন্তু তোমার ব্যবহারে রাফসা পরে বিয়েটা মানবে! তোমাকে যদি স্বামী হিসেবে না মানে তখন? এমনিতেই মেয়েটা অনেক চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে।‌সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। রাফসা পরে তোমায় ভালো নাও বাসলো। তখন কি হবে।”

ওপাশ থেকে বোধহয় উদ্যান কিছু বলছে। রাফসা মুখে হাত দিয়ে কান্নার শব্দ আটকানোর চেষ্টা করে। এতো অপমান করে এখন কেন‌ সেই পুরুষ বিয়ে করতে চাইছে। এখানে কি অন্য কোনো কাহিনী আছে।‌
“ভাইয়া আমি সব বুঝেছি। কিন্তু রাফসা যদি তোমায় আর না চায়! ওর অজানায় আমি এতো বড় একটা কাজ কি করে করব। আমি পরিস্থিতি বুঝতে পারছি। কিন্তু এটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই? “
……
“তোমার উপর আমার ভরসা আছে। কিন্তু বাড়ির সবাই পড়ে বিষয়টা জানতে পারলে কি হবে!”
……
“কি বলছো! তুমি বলেছো? কি বলেছে!”
…….
“ওকে ফাইন। মেইন গার্ডিয়ান যখন জানে এবং রাজি। এতে আমার আর কি করার আছে। তুমি চিন্তা করো না।‌আমি সন্ধ্যায় গিয়ে ওর থেকে সাইন নিয়ে তোমার কাছে কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দেবো। সব কাগজপত্র আঙ্কেল দিয়েছে আমায় সকালে। এখন শুধু রাফসা আর তোমার সাইন করা বাকি। তাহলেই রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ হবে। তোমরা আইনিভাবে স্বামী স্ত্রী হবে।”

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৫ (২)

রাফসার মাথা ঘুরছে এসব শুনে। উদ্যানের এতো অপমান লাঞ্ছনার পেছনে তাহলে অন্য কিছু আছে।রিশানের পায়ের শব্দ শুনে দ্রুত নেমে আসে রাফসা।
সন্ধ্যার পর যখন রিশান রুমে আসে তখনই রাফসা সব বুঝতে পারে। রাফসা চাইলেই পেপারে সাইন করতে না পারে। ও বুঝেছে বিকালের পর থেকে অনেক কিছু। তার বিশেষ কারণ ছাদ থেকে নেমেই উদ্যানের রুমে গিয়েছিল। সেখানেই অনেক ধারণা পেয়েছে।‌ তাই তো ভাইয়ের কথায় রাফসা বিনা বাক্যে সাইন করে দেয়।

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৬ (২)