Home প্রেয়সীর অনুরাগ প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩৪

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩৪

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩৪
Sadiya Jahan Simi

মির্জা বাড়িতে আজ মেহমান ভর্তি। মিমের বিয়ে উপলক্ষে মিমের ফুফুর এবং চাচার বাড়ীর সবাই হাজির হয়েছে। মিমের বাবার সাথে কারো তেমন সম্পর্ক নেই। একেবারে নষ্ট সেটাও বলা যায় না। মোটামুটি চলছে তাদের সভপো। ভাইঝির বিয়ে উপলক্ষে দীর্ঘ কয়েকবছর পর তাদের এখানে আসা। ফরাজী বাড়ির সকলেও ইতোমধ্যে চলে এসেছে। ড্রয়িং রুমে মানুষের আনাগোনা। কাজিন মহলের সবাই এখন অবস্থান করছে মিমের রুমেই। তাকে খাটের মাঝখানে বসিয়ে সবাই গোল হয়ে বসেছে।
রুমে সবাই মেয়েরা। জারা গালে হাত ঠেকিয়ে আফসোস করে বলে উঠলো,

” ইশ্ বিয়ে করলে অনেক মজা। কত কত খাবার। মেহেদী অনুষ্ঠানে কত আনন্দ। বিশেষ করে বউকে সবাই পাওা দেয় তখন। আদর করে অনেক। নতুন শাড়ি লেহেঙ্গা পায়। কত কত কসমেটিকস।”
জারার কথায় সকলে হেসে উঠলো। মিম মাথায় চাটি মেরে বলল,
” আফসোস হচ্ছে নাকি তোর?”
” হ্যাঁ হচ্ছে। এতো সব জিনিস পেলে তো আমি নাচতে নাচতে বিয়ে করব।“
” খুব বড় হয়েছিস দেখছি। তোর বড় যে আরো তিনজন আছে সেই খবর নেই।”
মিমের কথায় জারা মুখ কুঁচকে বলল,
” আছে তো। তাতে কি? সবার আগে আমি বিয়ে করব। জীবনেও কখন ফার্স্ট হতে পারিনা। এবার তোমার পরে বিয়ে করে সেকেন্ড হয়ে দেখিয়ে দিব।”
জারার কথা শুনে ঊষা আর মিম জোরে হেসে উঠলো। সাথে মিমের ফুফাতো বোন মারিয়া ও। রাফসাও মুচকি হাসছে। রাফসা কয়েক মাসের ছোট জারার থেকে। তবুও জারা রাফসাকে খেপাতে আপু ডাকে। এবং বিশেষ কারণ জারা নিজেকে ফরাজী বাড়ির ছোট সদস্য হিসেবে দাবি করে। জারা ওদের হাসি দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিল। রেগে বলল,
” আজব এখানে হাসার কি আছে! বুঝলাম না।”
ঊষা ভ্রু কুঁচকে বলল, ” রাগ করলা?”
জারা কিছু বলল না। মিম হাসতে হাসতে বলল, ” সরি তুই এবার ও সেকেন্ড হতে পারবি না। এই স্থানটা আমার।”
জারা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। বলল, ” মানে তুমি কিভাবে সেকেন্ড হবে!”

” দেখা গেল আমাদের সকলের অগোচরে কেউ বিয়ে করে নিল বছর কয়েক আগেই। সে ফার্স্ট এন্ড আমি সেকেন্ড। সেটাও তো হতে পারে।”
বলেই রাফসার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চোখ টিপ দিল। ঊষাও ভ্রু নাচালো। রাফসা তব্দা খেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মনে মনে বুঝতে পারল এই দুজন কোন বিষয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাফসা মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকায়। জারা চোখ গোল গোল করে বলল,
” অ্যা মানে! কে করবে লুকিয়ে বিয়ে!”
ঊষা বলল , ” তুই ছোট মানুষ বুঝবি না। আচ্ছা মাইশা কোথায়? এসেছি পর থেকে একবার ও দেখলাম না।”
” শপিং মলে গিয়েছে একটু। গায়ে হলুদের শাড়িটা একটু গড়মিল হয়েছে। সেটাই চেঞ্জ করতে গিয়েছে।”
” একাই গিয়েছে?”
”না মাহিন গিয়েছে সাথে।”
”আমরা এসে গেছিইই।” দরজায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলো রোহান। ওর পেছনে কয়েকজন ছেলে। সবাই কাজিন মহলের। তারপরেই দেখা যায় মাইশা ঢুকছে রুমে। মাইশার পেছনে মাহিন। তার হাতে কয়েকটা শপিং ব্যাগ ধরা। মাহিন ব্যাংকগুলো সোফায় রেখে বিরক্ত হয়ে বলল,

” মেয়ে মানুষ ভাই তোরা। আধঘন্টা লাগবে বলে দুই ঘণ্টা লাগিয়েছে। আমার পা বোধহয় শেষ।”
মাইশা চোখ ছোট ছোট করে বলল, ” কেন তুই কিছু কিনিসনি? পাঞ্জাবি কিনতে গিয়ে যে একশো ঘন্টা লাগিয়েছিস তার বেলায়!”
” দিব এক থাপ্পর। তাহলে নিয়ে গেছিস কেন আমায়?”
দরজায় দাঁড়ানো সবাই ভেতরে ঢুকল। রোহান মাহিনের পিঠে চাপড় মেরে বলল,
” এই এইল্লা ন গরিস। গুঁড়ো মেয়েফুয়া। বুঝিত ন পারে।”
মাহিন ভ্রু কুঁচকালো। সে এতোক্ষণ খেয়াল করেনি কাউকে। বলল,
” তোমরা কখন এলে? আর এসেছোই বা কেন! আসার কথা ছিল তোমাদের আরো দুই দিন আগে। এখন নাটক করতে এসেছো?”
” আহ রাগ করিস না ভাই। দুই দিন আগে আসেনি। আজ এসেছি তো। আর রাফসা একটু অসুস্থ ছিল।”
রোহানের কথায় মাহিন রাফসার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। চেহারার মধ্যে কেমন বিষন্নতা ভাব লাগছে। মাহিন কয়েক পা সামনে এসে অবাক হয়ে বলল,
” তোর চোখ মুখের এই হাল কেন রাফসু? কেমন শুকিয়ে গেছে মুখটা। খাওয়া দাওয়া করিস না ঠিকমত!”
রাফসা আলতো হেসে বলল,

” তেমন কিছু না ভাইয়া। জ্বর হয়েছিল। তাই এমন লাগছে চোখ মুখ।”
” ওষুধ খেয়েছিস! কমেছে জ্বর?”
” হ্যাঁ কমেছে।”
তারপর মাহিন মিমের দিকে তাকিয়ে বলল, ” তোদের কি নাকি হবে? তাড়াতাড়ি রেডি হ।”
” কাঁচা হলুদ দিবে শরীরে। দুধ দিয়ে গোসল দিবে। আর ছাদ সাজাতে বলা হয়েছিল, সেটা হয়েছে!” মাইয়ার প্রশ্নে মাহিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
” হ্যাঁ হয়েছে। সব রেডি। তোরা কি করবি কর।”
তারপর উল্টো ঘুরে যেতে নিলে রোহান সামনে দাড়ায়। মাহিন ভ্রু কুঁচকে তাকায়। রোহান একটা হাসি দিল। মাহিন হেসে বলল,

” কি ভাই কিছু বলবে! কাউকে খুঁজছ নাকি?”
রোহান সাথে সাথে মাথা নেড়ে বলল,
” আর ললনা ছলনা হডে? ন দেখি ইবেরে। খুঁজি দেছোনা ইতিরে। বারদি ঘুরের পোয়া লইয়েনে!”
” চাটগাঁইয়া ন হইয়্যু।”
মাহিন কথাটা বলেই ছুটে। তার পেছনে রোহান আর বাকিরাও। দরজায় দাঁড়ানো একজন যাওয়ার আগে রাফসার দিকে তাকালো। মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । সকলের গায়েই শাড়ি। রাফসা ঊষা এই বাড়িতে আসার পরেই মিম বলিয়ে সাদা থ্রি পিস পড়িয়েছে। এখন শুধু মাইশার বাকি। ছেলেটা আর দাঁড়াল না। নিচে যাওয়ার পথে ফোন বের করল পকেট থেকে। কারো নাম্বাররে ফোন দিল। কিছুক্ষণ বাদেই রিসিভ হলো ওপাশ থেকে। গমগমে স্বরে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে ছোট্ট করে ডেকে উঠলো।
” আভিয়ান।”

ছাদে গাঁদা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে ছোট্ট একটুখানি ভ্যানু। মাটির রং করা কলস। তা গাঁদা ফুল দিয়ে সাজানো। ডালায় গোলাপ এবং গাঁদা ফুল ছিঁড়ে ছিটিয়ে রেখেছে। তার উপরে গুটি কয়েক মেহেদী। এবং বিভিন্ন কালারের রং। মিমকে বসিয়ে ফোটোগ্রাফি করিয়েছে। সবাই মিলে রং মাখামাখিতে মেতে উঠেছে।

আজমল শিকদার গম্ভীর হয়ে বসে আছে। তিনি রীতিমতো বিরক্ত ছেলের প্রতি। এমনিতেই সামনে নির্বাচন। তার মধ্যে আভিয়ানের অবাধ্যতা। তিনি কিছুতেই মানতে পারছে না। তার ভাবনার মাঝেই কয়েকজন লোক আসে। তাদের দেখে আজমল শিকদার নড়েচড়ে বসল।
” প্রচার করছেন না কেন আজমল ভাই? আপনার ছেলেটাকে এবার বলুন মাঠে নামতে। আর কত দিন এসবের থেকে দূরে থাকবে?”
কাদেরের সাথে অপরজন সম্মতি জানালো, বলল।
” মাঠে নামলেও বা কি! ক্ষমতায় ফরাজী বাড়ির কর্তাই আসবে।”
এ কথায় বিরক্ত হলেন আজমল শিকদার। রাগে গজগজ করছেন তিনি। আভিয়ানকে নিয়ে তিনি খুব হতাশ। তার চেয়ে বেশি রাগ রাফসার উপর। ওর কারণেই ওনার ছেলে এমন ছন্নছাড়া হচ্ছে।
কাদের তাকালেন পাশে বসা লোকটার দিকে। সিগারেট ফুঁকতে ব্যস্ত সে। কিছু ভাবছে। চোখ মুখ স্বাভাবিকের তুলনায় শান্ত। কাদের হুট করেই প্রশ্ন করে উঠলেন।

” আব্বাস ফরাজী বাড়ির লোক হয়ে পেছনে ছুড়ি মারার কারণ কি?”
আব্বাস ফরাজী হেসে উঠলেন। দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে শান্ত গলায় বলল,
” ফ্যামিলি শেষ করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।”
কেউ আর কিছু বলল না। চুপচাপ ভাবতে শুরু করে কিভাবে ক্ষমতায় আসা যায়।
” ব্যবসায় বোধহয় এবারও লাল বাতি জ্বলছে। পুরো লস সব।”
আজমল শিকদার কিছু বললেন না। চুপচাপ করে গুটি সাজাতে লাগলেন তিনি। ব্যবসা চুলোয় যাক। ওনার দরকার এমপি পদ।

সন্ধ্যা নেমেছে। বাড়িতে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে প্রচুর। মেয়েরা পার্লারে গিয়েছে সাজতে সেই বিকেলে। এখনো আসেনি। বাড়ি থেকে ফোন দেওয়ার পর জানতে পারলো আরো ঘন্টা দুয়েক লাগতে পারে। ছেলেরা এদিক ওদিক দেখছে। সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। বিয়ের অনুষ্ঠান বাড়িতেই হবে। যথেষ্ট পরিমাণের জায়গা আছে তার জন্য। বাড়ির বিশাল উঠোন পেরিয়ে মির্জা বাড়ি। মিমের বাবা একজন ইতালির প্রবাসী। কোনো কমতি রাখেননি তিনি বাড়ি তৈরিতে।
কাজ করে ছেলেরা গোসল দিতে যাচ্ছে অনেকেই। রয়ে গেছে রোহান। আশে পাশে তাকিয়ে তার ললনা ছলনাকে খুঁজছে। এসেছে পর থেকে একবার ও দেখেনি। এই নিয়ে ভারী বিরক্ত রোহান। মন চাইছে ওই মেয়েকে খুঁজে মাথায় তুলে একটা আছাড় মারতে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বিড়বিড় করল।
” কোথায় আমার ললনা ছলনা? আমার দুইশো চল্লিশ নাম্বার ক্রাশ। তোমাকে ছাড়া এই অধম মরে যাচ্ছে।”
বলতে বলতে চোখ পড়ল গেইটে। উদ্যান ঢুকছে বাড়িতে। একেবারে রেডি হয়ে পাঞ্জাবি পড়েই এসেছে। বোধহয় আগে বাড়িতে গিয়েছিল। তারপর সেখান থেকেই আসছে। উদ্যান কে দেখে রোহান দৌড়ে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

” এই দাঁড়া চাচাতো জামাই কথা আছে।”
উদ্যান দাঁড়িয়ে গেল। ফোন দেখছিল সে। রাফসাকে এই নিয়ে নাহয় একশ বার ফোন দিয়েছে। কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না। এমনিতেই উদ্যান বিরক্ত খুব। তারপর রোহানের দুষ্টমিতে আরো বিরক্ত লাগছে। বলল
” কি কথা?
” ওইদিনের সায়েন্স সম্পূর্ণ বুঝিসনি। আবার বলছি শোন।”
রোহানের কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকালো উদ্যান। কোন দিনের কথা বলছে বুঝতে পারল না। উদ্যান কে আর ভাবনার সময় দিল না রোহান। তার আগেই নিজে নিজে বলতে শুরু করল।
” আমি তোর জেঠাতো সমন্ধি। রাফসার চাচাতো দেবর। অপরদিকে আমি তোদের চাচাতো জেঠাতো ভাই। এখন তোদের বাচ্চা হলে..
উদ্যান বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলল। বুঝতে পারল এই ছেলে এখন শুরু করলে আর থামবে না। মাথা কাঁচা চিবিয়ে খাবে। আর দাঁড়াল না উদ্যান। রোহানকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। রোহান তব্দা খেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। বুঝতে পেরে চেঁচিয়ে ডেকে উঠলো।

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩৩ (২)

” এই উদ্যান দাঁড়া। আমার কথা পুরো শেষ করতে দে।”
এতো ডাকাডাকির পরেও উদ্যান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়নি। রোহান গাল ফুলালো। নিজে নিজেই বলল,
” রাফসার ভাই লাগি। উদ্যানের ও ভাই লাগি। রাফসার দেবর লাগি, উদ্যানের সমন্ধি লাগি। এক দিকে মামা অপর দিকে কাকা।
তাহলে ওদের বাচ্চা হলে কি আমায় মামার ’মা’ কাকার ’কা’ মিলিয়ে মাকা ডাকবে? নাকি কামা ডাকবে?”
ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর বিরক্ত হয়ে বলল, ” দুর যাইগা হয়রান হয়ে গেছি। আবার পরে সায়েন্স এক্সপেরিমেন্ট করব।”
বলেই ধুপধাপ পা ফেলল।

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩৫