প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩৩ (২)
Sadiya Jahan Simi
মাঝে কেটে গিয়েছে পাঁচদিন। নিয়ম মাফিক চলছে সবার জীবন। ডিসেম্বর মাস বিদায় নিয়েছে দুই দিন আগে। নতুন বছরের নতুন জীবনের সূচনা। কেটে গেছে নতুন বছরের তিনটি দিন। ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটানোর সাথে সাথে প্রকৃতি এবং মানবজীবনে এসেছে এক নীরব রূপান্তর। ঋতুচক্রের নিয়মে পৌষের শীত এখন জাঁকিয়ে বসেছে। তবে শীত তূলনামূলক কম পড়ছে শহরে। হাড়কাঁপানো শীত ছুঁতে পারে না ব্যস্ততার শহর।এই আবহাওয়া পরিবর্তনের মাঝেও পৃথিবীর চিরন্তন নিয়ম মেনে মানুষের জীবনযাত্রা আপন গতিতে সচল রয়েছে।
কুয়াশার চাদরে ঢাকা প্রকৃতি
জানুয়ারির এই সময়ে প্রকৃতি এক মায়াবী এবং উদাসীন রূপ ধারণ করেছে। সকালের সূর্য কিছুটা দেরিতে কুয়াশার পুরু স্তর ভেদ করে পূর্ব আকাশে উঁকি দেয়। গাছপালা থেকে টুপটুপ করে শিশিরবিন্দু ঝরে পড়ে। দুপুরের দিকে যখন কুয়াশা কেটে যায়, তখন এক ফালি মিষ্টি রোদ চারপাশকে সোনালী রঙে রাঙিয়ে তোলে। বিকেল হতেই আবার হু হু করে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করে। গোধূলির আলো মিলিয়ে যাওয়ার আগেই চারপাশ দ্রুত অন্ধকারে ঢেকে যায় এবং রাত বাড়ার সাথে সাথে শীতের কিছুটা জাঁকিয়ে বসে।
জড়তা ভেঙে জীবনের জয়গান
প্রকৃতির এই রুক্ষতা ও তীব্র ঠান্ডা মানুষের জীবনকে কিছুটা শ্লথ করলেও থামিয়ে দিতে পারেনি।
ডিসেম্বরের ছুটির আমেজ কাটিয়ে জানুয়ারি মাসে নাগরিক জীবনে এক নতুন ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। কিন্তু ফরাজী বাড়ির ব্যস্ততা এবার ব্যতিক্রম। তারা এখন বিয়ের জন্য মেতে উঠেছে। আজকে ফরাজী বাড়ির সবাই মির্জা বাড়িতে যাবে। মিমের বিয়ে আগামীকাল।
বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে এক মানব। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে কপালে। চোখের পাতা ভারী। তার ঘুম দীর্ঘ হতে পারল না বেশিক্ষণ। তার আগেই বালিশের উপর রাখা ফোনটা ঝংকার করে বেজে উঠল। এতে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে তার। তবে পুরোপুরি ঘুম ভাঙল না তার। ফোনটা বাজতে বাজতে কেটে গেল। সে সাথে ঘুমে তলিয়ে গেল সে পুনরায়। কিন্তু তার মধ্যেই ফোনটা পুনরায় বেজে উঠল। সম্পূর্ণ ঘুম ভাঙ্গার আগেই ফোনটা শব্দ করা থামিয়ে দিল। বিরক্ততে চোখ খুলল সে। ফোনটা হাতে নিতে চেয়েও নিল না। কমফোর্টারটি সরিয়ে নিল পেটানো শরীরের উপর থেকে। ধীর পায়ে নেমে এলো বেড থেকে। সাদা তাওয়ালটা নিয়ে ফ্রেশ হতে চলল ওয়াশরুমে।
দীর্ঘ আধ ঘন্টা পর বেরিয়ে এলো সে। কোমড়ে তাওয়াল জড়ানো। চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে ঘাড় বেয়ে। আগুন্তককে ক্লান্তি দেখাচ্ছে বেশ। নিজের ফ্ল্যাটে উঠেছে সে গতকাল। মিররের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কালো শার্টটা শরীরে জড়িয়ে বোতাম লাগানোর মাঝেই বেডের উপর রাখা ফোনটা বেজে উঠলো। বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে যায় তার। উল্টো ফিরে গিয়ে ফোনটা হাতে নিল।
” আন ক্রেভিয়ান স্পিকিং।”
মিনিট দুয়েক বাদেই মানবের কপালের রগ কর্তন ফুলে উঠল। চোয়াল শক্ত করে কথাগুলো শুনছে ও প্রান্তের। কানে ধরা ফোনটা নিমিষেই আছাড় মারল সে। খন্ড দ্বিখণ্ডিত ফোনের অংশ এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ল। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চোখগুলো লাল হয়ে উঠেছে মুহূর্তেই। লম্বা চুলগুলো টেনে ধরে দুই হাতে। বিড়বিড় করে বলল,
” এতো গার্ড দিয়েও কিছু জানলাম না? কেন কেন! আমার ভালোবাসা অন্য কারো বউ হয়ে গিয়েছে কি করে? এতো আগলে আগলে কাকে রাখলাম! অন্য কারো নামে জড়িয়ে গেছে তিন বছর আগে? আর আমি কিছু জানতে পারলাম না!”
রাগে দেয়ালে ঘুষি মারছে একের পর এক। শরীর কাঁপছে মানবের। ছেলে মানুষের নাকি কাঁদতে নেই। কিন্তু এই যে আগুন্তকটি কাঁদছে। ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে কাঁদছে। ভালোবাসতে চায়নি সে। কি করে মায়ায় পড়ে গেল? সে তো চেয়েছিল প্রতিশোধ নিতে। নিজের মায়ের প্রতিশোধ নিতেই কত আয়োজন তার। ঘটা করে আয়োজন করছে ফরাজী বাড়ির ধ্বংস। কিন্তু কে জানতো সে নিজেই ধ্বংস হয়ে যাবে! দিনের পর দিন তার সাথে থেকেও কিছু বুঝতে পারল না? কেনো কখনো মাথায় এমন কিছু আসেনি!
ডান হাত থেকে রক্ত পড়ছে অঝোরে। তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই তার। চোখের সামনে ধরল হাতটি। ঠোঁটে মৃদু হাসি। চোখ ঝাঁপসা। কেমন ভাঙ্গা কন্ঠে শুধায়,
” এই হাত দিয়েই তো আমি ওকে কতশত শান্তনা দিয়েছিলাম। এই হাত ছুঁয়েছে তার মুখ। এই হাত দিয়েই তার ছোট ছোট আবদারগুলো পূরণ করেছি। এই হাত দিয়েই তাকে নিয়ে ঘুরেছি। এই হাত ..
আর বলতে পারল না মানব। হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে ফ্লোরে। দুই হাত মুখে ঠেকিয়ে হাঁসফাঁস করে বলল,
” আমি ধ্বংস হতে চাইনি। আমি ধ্বংস করতে এসেছিলাম। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল! দাবার গুটিটাকে আমি নিজের কলিজা বানিয়ে নিলাম? ও আর আমার না?
আমি সত্যি ভালবেসেছি। কখনো মায়ায় পড়ে গেলাম? ওকে ছাড়া আমি কি করে থাকবো! আমার সামনে ঘুরঘুর করবে । ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা আসবে। ওকে আম্মু ডাকবে। বেবিগুলো তো আমার হওয়ার কথা। আমাকে বাবা ডাকার কথা।”
সেভাবেই স্থির হয়ে রইল সে। নাকের পাটা ফুলে আছে। ডান হাতের রক্ত লেগে আছে পুরো মুখ মন্ডলে।
ঘুম থেকে সবেই উঠেছে রাফসা। সারারাত মুভি দেখে রাতের শেষ প্রহরে ঘুমিয়েছিল। কিছুক্ষণ আগেই হুমাইরা ফরাজী ডেকে গিয়েছে রাফসাকে। ঘুম ভাঙ্গতে না চাইলেও মায়ের ডাকাডাকিতে পিঠ ঠেকিয়ে রাখতে পারল না বিছানায়। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এলো রাফসা। মুখে বিন্দু বিন্দু পানির কোনা। নাকে ছোট্ট নোসপিনটা ঝলঝল করছে।
চুলগুলো আঁচড়ে ক্লিপ দিয়ে আটকে নিল। তারপর নিচে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে উদ্যানের ঘরে সামনে আসতেই পদযুগল থামে তার।দরজাটা খোলাই রয়েছে। কি মনে করে রাফসা টুক করে মাথাটা ঢুকিয়ে দিল ভেতরে। পুরো রুম অবলোকন করেও উদ্যান কে দেখতে না পেয়ে কপাল কুঁচকে যায় রাফসার। রুমের দরজা খোলা মানেই উদ্যান ঘরে থাকবে। সে না থাকলে দরজা বন্ধই থাকে। উদ্যান কে রাফসা দেখেছিল সেই পাঁচদিন আগে। সকাল সকাল হসপিটালে চলে যায় সে। তখন রাফসা ঘুমে তলিয়ে থাকে। রাতেও আসতে বেশ দেরি হয়। তাই তো রাফসা গতকাল রাতে ঘুমোয়নি। অর্ধেক রাত জেগে ছিল উদ্যানের জন্য। ভেবেছিল বাড়ি ফিরলে রুমের দরজা খোলার আওয়াজ শুনে বুঝবে। ঘুমানোর আগে একবার দেখে গিয়েছিল রাফসা। তখনো বাড়ি ফিরেনি উদ্যান। এক প্রকার বিরক্ত হয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল রাফসা।
আর দাঁড়াল না রাফসা। খিদায় বোধহয় পেট ফেটে যাবে।
নিচে আসতেই সবাইকে ডাইনিংয়ে দেখা যায়। ব্রেকফাস্ট করতেই বসেছে। আজ তাড়াতাড়ি উঠেছে বাড়ির প্রত্যেকে। রাফসা চেয়ার টেনে বসতেই হুমাইরা ফরাজী মেয়ের সামনে পরোটা আর চা দিল। ঊষা খেতে খেতে বলল,
” বড়লোক হয়ে গেছিস দেখছি। তোকে দেখা এখন আকাশছোঁয়া। সারাদিন কি করিস রুমে!”
রাফসা কিছু বলার আগেই রোহান মুখ খুলল, ” কি বলছিস এসব! রাফসা এখন ডাক্তারের ব..
সবার দৃষ্টি দেখে থতমত খেয়ে গেল রোহান। না বুঝে কি বলতে যাচ্ছিল। ততক্ষণাৎ কথা ঘুরিয়ে হেসে বলল,
” হে হে মানে বলছিলাম রাফসা এখন ভবিষ্যতের ডাক্তার। ওকে দেখা আকাশছোঁয়া না হলে কাকে দেখা আকাশছোঁয়া হবে! তাই না রাফসা?”
শেষের কথাটা রাফসাকে উদ্দেশ্য করে বলল। রাফসা ঠোঁট চেপে মাথা নাড়ল। জায়িন বলল,
” ডাক্তার হবে বিধায় রাফসা আকাশছোঁয়া! আচ্ছা হু ম্যায় আন্ধা হু। ডোন্ট মাইন্ড হিন্দি একটু কম পারি।
রোহান বলল, ” একটু না। একেবারেই পারিস না।”
” বলব আমি হিন্দি? শুনলে অবাক হয়ে যাবে।”
” বল।”
জায়িন নড়েচড়ে বসল। ভাব নিয়ে বলল,
” কেসি হো, আচ্ছা হুনা। নাস্তা খাতাহে। কি করতাহে। প্রেম করতাহে তুম! আমি নেহি করতাহে। শাদি করব মে।শুনো আমার জন্য না মেরার জন্য এক লাকড়ি দেখতা। মেনে শাদি করব।”
সকলে তব্দা খেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। জায়িনের কথায় সকলের যেন মাথা ঘুরছে। রাফসা মুখ চেপে হাসছে। জায়িন বলল,
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩৩
” ইউ হোয়াট হাসিং? আমি কি জোক বলিং?”
ঊষা অবাক হয়ে বলল, ” এটা আবার ভাষা?”
”ইয়ে হে বাংলিশ অর হিন্দিস ,ওয়েট ভাষার হিন্দি কেয়া হ্যা?”
জায়িনের কথায় কেউ স্থির থাকতে পারল না। মুহূর্তেই হেসে ফেলল । বড়রাও বাদ যায়নি।
