Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 17 (3)

Tell me who I am 2 part 17 (3)

Tell me who I am 2 part 17 (3)
আয়সা ইসলাম মনি

বংশপরম্পরায় যারা ‘আলালের ঘরের দুলাল’ হিসেবে পরিচিত, তাদের হাতে বাজারের থলি মানায় না। অথচ আজ আরিয়ান নিজে বাজার করে ফিরেছে। রান্নাবান্নার বিষয়ে তার জ্ঞান তাত্ত্বিকভাবে শূন্য বা বলা ভালো অষ্টরম্ভা। তবুও একরাশ শৌখিনতা নিয়ে সে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে রান্নার সরঞ্জামের দিকে নজর দিল।
এদিকে কক্ষের বিশাল এলইডি স্ক্রিনে নেটফ্লিক্সের কোনো এক রোমান্টিক-কমেডি মুভি চলছে। রোমানা বেশ আয়েশ করে আধশোয়া অবস্থায় পা দোলাচ্ছে। হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে ঘরের আলো জ্বলে উঠতেই তার চোখের মণি কিছুটা সংকুচিত হলো। আলোর উৎস ধরে তাকাতেই দেখল, বাড়ির কনিষ্ঠ সদস্য আয়াশ লাফাতে লাফাতে তার কক্ষে প্রবেশ করছে। আয়াশকে দেখলেই রোমানার ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে। সে ত্বরিত উঠে ওকে কোলে তুলে নিল।

নাকটা আলতো করে টেনে দিয়ে রোমানা বলল, “কি অবস্থা আমার কিউট লিটল দেবরজি? সারাদিন তোমার টিকিটারও দেখতে পাওয়া যায় না যে!”
“আমি খুব বিজি পারসন, রমু!” বলেই নিজের অবিন্যস্ত চুলগুলো হাত দিয়ে ব্যাকব্রাশ করল আয়াশ। ওর আত্মবিশ্বাস দেখে মনে হচ্ছে কোনো মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানির সিইও রিটায়ারমেন্টে এসেছে।
রোমানা হাসল, তবে কণ্ঠে কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে বলল, “বাবাহ, আবার ভাব নেওয়া হচ্ছে দেখি! দিনে দিনে বড়ো হচ্ছিস আর সাদা মুলাটার মতো দুষ্টু হচ্ছিস! শোন, ওই আরিয়ানের বাচ্চার থেকে শত হাত দূরে থাকবি, বুঝলি বাচ্চা?”

“বাচ্চা কাকে বলছ, রমু? জাস্ট ফর ইয়োর ইনফরমেশন, আমার অলরেডি চার-চারটে গার্লফ্রেন্ডস আছে!”
রোমানার চোয়াল মুহূর্তেই ঝুলে পড়ল। বর্তমান প্রজন্মের ক্যাসানোভা ভঙ্গি দেখে সে সত্যিই বাকরুদ্ধ। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “তুই না বলেছিলি বড়ো হয়ে আমাকে বিয়ে করবি? এখন এই চারটা গফ দিয়ে কি হালচাষ করিস, শ’য়তানের হাড্ডি?”
“হালচাষ কেন করব? ওদের দিয়ে তো আমি আমার স্কুলের হোমওয়ার্ক করাই। হুঁ হুঁ!” বলেই সে খিলখিল করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
আয়াশ এবার গম্ভীর হয়ে বলল, “আর তুমি আমাকে কোলে তুলেছ কেন, শুনি? এ্যাম আই আ কিড? নামাও আমাকে। আরেকটু বড়ো হই, তখন আমিই তোমাকে কোলে তুলে পুরো শহর ঘুরব। আর শোনো, তোমার দিকে এখন আর আমি নজর দিব না, আই অ্যাম আ রিফর্মড ম্যান নাউ!”
কথা বলতে বলতে টিশার্টের কলার উঁচু করল সে।
“হ্যাঁ, তোমার চারিত্রিক উন্নতির নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি,” বলতে বলতে রোমানা ওকে নিচে নামিয়ে দিল।
আয়াশ নিচে নেমে বুকে দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়াল।
“আমি শুধু ভাবি, আমি এইটুকু বয়সে চারটা প্রেম হ্যান্ডেল করছি, আর তুমি বুড়ো হয়েও একটা প্রেম করতে পারলে না! ছি রমু ছি!”

রোমানা এবার চোখ সরু করে তাকাল। ঝুঁকে ওর মাথায় একটা হালকা চাটি মেরে বলল, “তাই? তা ওই জিরাফটাকে বুঝি ঘাস কাটাতে বিয়ে করেছি?”
আয়াশ মাথার পেছনটা ডলতে ডলতে ফোঁড়ন কাটল, “ভাইয়া ঘাস-টাস কাটতে পারবে না, তার চেয়ে বরং তাকে দিয়ে গোবর ছাপ দেওয়ার কাজ করিও। যদিও গ’রুরা তো তাকে দেখলে কনফিউজড হয়ে যাবে—ভাববে তাদেরই কোনো কাজিন বুঝি তাদের বর্জ্য পরিষ্কার করছে! হাহাহা!”
ক্লাস সিক্সে পড়া এই ছেলেটার বুদ্ধির ধার আর রসবোধ দেখে রোমানা তাজ্জব হয়ে যায়। আরিয়ানের মতো মানুষকে নিয়ে এমন সার্কাসটিক জোকস আয়াশ ছাড়া আর কেউ ভাবতে পারে না।
তবে স্বামীর অপমান গায়ে মেখে রোমানা এবার মেকি রাগে ফেটে পড়ল।
“দাঁড়া তুই! আমার হাজব্যান্ডকে গ’রু বলা! তোর সাহস তো কম না, ফা’জি’ল ছেলে!”

বলেই সে তার শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে আয়াশকে ধরার জন্য উদ্যত হলো। আয়াশ বিপদ আঁচ করতে পেরে এক দৌড়ে দরজার দিকে যেতে যেতে ছুঁড়ে দিল, “টেনশন করো না রমু, আমি ফার্স্ট বউ হিসেবে তোমাকে রিজেক্ট করলেও লাস্ট বিয়েটা তোমাকেই করব, ওরে আমার শ্যাওড়া গাছের পেত্নী!”
রোমানাও হাসতে হাসতে আয়াশের পিছু নিল, কিন্তু কক্ষের চৌকাঠ পেরোনোর আগেই তার গতি থমকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আশমিনি। সেই চিরচেনা গম্ভীর অভিব্যক্তি, ঘাড়ের ওপর শক্ত করে বাঁধা কেশবিন্যাস আর চলনবলনে কর্তৃত্বপরায়ণ আভিজাত্য। রোমানা অপ্রস্তুত হয়ে ত্বরিত কোমরে গোঁজা শাড়ির আঁচলটা ছেড়ে দিল। মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে আপ্যায়ন করল, “ভিতরে এসো, কাকি!”
আশমিনি কক্ষে প্রবেশ করে সোফায় বসলেন। রোমানা হাতের আঙুলে নিজের দীর্ঘ কেশরাজি প্যাঁচিয়ে একটি আলগা খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

আরিয়ানের তীব্র আপত্তির কারণেই তাকে তার প্রিয় ‘ওলফ কাট’ বিসর্জন দিতে হয়েছে। আরিয়ানের ভাষায়, সেই ছোট আর অগোছালো লেয়ারের চুলে রোমানাকে নাকি তার বন্ধু জব্বারের মতো দেখায়! সেই মধুর উপহাসের জেদ ধরে গত দুই মাস হলো রোমানা চুল কাটা বন্ধ রেখেছে, এখন তা পিঠ ছুঁইছুঁই। ওলফ কাটে তাকে যতটা অতিরিক্ত স্টাইলিশ লাগত, এই দীর্ঘ কৃষ্ণকেশে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি মায়াবী আর আকর্ষণীয় লাগছে। রোমানার শারীরিক সুষমা আর এই স্নিগ্ধ রূপের কারণেই বোধহয় আরিয়ান তার ওপর এতটা অবসেশড।
আশমিনি হাতের ইশারায় পাশের জায়গাটা দেখিয়ে বললেন, “এখানে আমার পাশে এসে বসো, রোমানা।”
“আমি ঠিক আছি কাকি, তুমি বলো।”
“আমি একবার বললে সেটা দ্বিতীয়বার বলতে ভালোবাসি না। এসে বসো।”

রোমানা মাথা নাড়িয়ে পাশে বসা মাত্রই আশমিনি তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। “তোমাকে আমার কেন ভালো লাগে জানো? কারণ তুমি জীবনটাকে খুব একটা কমপ্লেক্স করো না। ফ্লো-এর সাথে চলতে জানো। আসলে এই নশ্বর জীবন নিয়ে এত ওভারথিংকিং করার তো কিছু নেই, যা হওয়ার তা এমনিতেও হবে।”
আশমিনির মতো একজন নির্লিপ্ত মানুষের মুখে এমন জীবনদর্শন শুনে রোমানা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “আজ হঠাৎ… মানে আগে তো কখনো এমন কিছু…”
“আগে বলিনি, আজ বলছি কারণ প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। তোমার কাকাইয়ের ট্রান্সফার হয়ে গেছে।”
“হ্যাঁ, সেটা তো আমিও শুনেছি। কিন্তু সরকারি চাকরিতে তো এটা খুব কমন ইস্যু, কাকি। এটা নিয়ে এত বিচলিত হওয়ার কী আছে?”

আশমিনি জানালার বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ কণ্ঠে বললেন, “বিচলিত হচ্ছি কারণ এবার আমি আর আয়াশও তার সাথে চলে যাচ্ছি। পাকাপাকিভাবে।”
“কীহ! কেন?” রোমানার কণ্ঠে বিস্ময় আর বিষাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
হঠাৎ আশমিনি কথার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। সরাসরি রোমানার চোখের মণি বরাবর তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “তুমি তোমার শাশুড়ি মায়ের ব্যাপারে ঠিক কতটুকু জানো?”
হঠাৎ এই অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে রোমানা হকচকিয়ে গেল। “তেমন বিশেষ কিছু না। আরিয়ান বা বাবা কখনোই এ বিষয়ে খুব একটা ওপেন ছিলেন না, আমিও তাই অহেতুক কৌতূহল দেখাইনি।”
আশমিনির কণ্ঠস্বর এবার খাদে নেমে এলো, “কৌশি ভাবি নিখোঁজ হননি রোমানা, তাকে নিখোঁজ করা হয়েছে। ইট ওয়াজ আ প্ল্যানড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স।”
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল রোমানা। তার হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। কিন্তু আশমিনি অবিচল। তিনি ধীরলয়ে বললেন, “আমি জীবনের দীর্ঘ সময় এক বিশাল পাজেল মেলানোর চেষ্টা করেছি। আজ আমি প্রায় নিশ্চিত যে কৌশি ভাবি এখনো জীবিত আছেন।”
“মা… মা কোথায় কাকি? সে বেঁচে থাকলে কোথায় আছে?” রোমানার নিশ্বাস ঘন হয়ে আসছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।

“তার বর্তমান অবস্থান আমার জানা নেই, তবে তিনি এই পৃথিবীর আলো-বাতাসেই শ্বাস নিচ্ছেন।”
“কিন্তু আপনি এসব জানলেন কীভাবে? যেখানে সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছে…”
“একটা দলিলের সূত্র ধরে। কারান আর মিরার বিয়েটা নিয়ে আমার মনে দীর্ঘদিনের কিছু স্কেপটিক্যাল সন্দেহ ছিল। আমি সেটা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা রিসার্চ করি। সব তথ্যসূত্র আর ঘটনার পারম্পর্য এক বিন্দুতে মেলাতেই আমি এমন এক সত্যের মুখোমুখি হয়েছি, যা পুরো পরিবারের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।”
রোমানা এবার অত্যন্ত ধীরলয়ে আশমিনির পাশে বসল। তার বুকের ভেতর একটা অজানা আশঙ্কার ঢোল বাজছে। শুকনো মুখে কোনোমতে ঢোক গিলে সে সামনের দিকে তাকাল। আশমিনি তার দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ফিসফিসিয়ে বললেন, “এই অট্টালিকায় একটা দীর্ঘমেয়াদি গেম খেলা হচ্ছে রোমানা, যার মূল খেলোয়াড়…”
“কারান?”
“আসাদ চৌধুরি।”

উত্তরটা শোনার সাথে সাথেই রোমানার ঠোঁট বিস্ময়ে সামান্য ফাঁক হয়ে গেল। অথচ আশমিনি নিজের সেই চিরচেনা নিস্পৃহ ভাব বজায় রেখেই বলে চললেন, “যে মানুষটা নিজের সন্তান আর ভাইকে হাতের পুতুলের মতো আঙুলে নাচাতে পারে, সে যে তার ভাইপো কিংবা ভাইয়ের বউয়ের বড়ো কোনো ক্ষতি করবে না—তার কোনো গ্যারান্টি নেই। এই অশুভ ছায়া থেকে আয়াশকে দূরে রাখতেই আমি চলে যাচ্ছি। এটা এক প্রকার স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট বলতে পারো।”
রোমানা বিড়বিড় করে বলল, “আমি… আমি সত্যিই কিছুই বুঝতে পারছি না, কাকি। বাবা ঠিক কী করেছেন?”
আশমিনি উঠে দাঁড়িয়ে রোমানার কাঁধে হাত রাখলেন। “এত স্ট্রেস নিও না, মা। আশা করি তোমার বা মিরার কোনো ক্ষতি হবে না। তোমরা দুজন আমার কাছে নিজের কন্যাসন্তানের মতো, তাই ভয় কাজ করে তোমাদের নিয়ে। যদিও আমি জানি কারান আর আরিয়ান তোমাদের কতটা ভালোবাসে। নিজেদের খেয়াল রেখো। আর মিরাকে না হয় কোনো একদিন ভার্চুয়ালি বিদায় জানাবো। মেয়েটাকে এত কাছে পেয়েও যেন পাওয়া হলো না।”
কথাটা শেষ করে আশমিনি মমতাভরে রোমানাকে জড়িয়ে ধরলেন। রোমানা স্থবির হয়ে রইল, তার মস্তিষ্ক এখন কোনো তথ্যই প্রসেস করতে পারছে না। রোমানা বুদ্ধিমতী এবং যথেষ্ট প্র্যাকটিক্যাল হলেও কৌশিকা বা এই পরিবারের গোপন ইতিহাস নিয়ে সে কখনো ইন্টারফেয়ার করেনি। তাই এখন যা শুনছে, তা তার মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।

আশমিনির এই বিরল স্নেহস্পর্শ রোমানাকে আবেগপ্রবণ করে তুলল। এই কঠোর মানুষটার হৃদয়ে যে এমন এক নির্মল রূপ আছে, তা আজ প্রথম প্রকাশ পেল। এই বাড়ির অন্যদের মতো আশমিনি দ্বৈত সত্তা নিয়ে ঘোরেন না। সে কখনো বলবে না, ‘Tell me who I am’; কারণ তিনি ঠিক যেমন, তেমনই নিজেকে প্রকাশ করেন।
কিছুক্ষণ পর আশমিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। তারপর হঠাৎই আবহটা হালকা করতে পুরোনো স্মৃতির ঝাঁপি খুললেন। আরিয়ান আর রোমানার বিয়ের প্রথম দিককার কিছু নস্টালজিক মুহূর্তের কথা তুলে ধরলেন। রোমানা নিঃশব্দে শুনলেও তার মনের ভেতরে ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছিল। আশমিনি মুচকি হেসে তার মাথায় আশীর্বাদের হাত বুলিয়ে যখন দরজার দিকে পা বাড়ালেন, তখন রোমানা পেছন থেকে ডাকল, “কাকি!”
আশমিনি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। রোমানা অত্যন্ত চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করল, “মিরা একবার সন্দেহ প্রকাশ করেছিল যে বাবার কি আর কোনো ভাই-বোন আছে কিনা! কারণ ইসহাক কাকা আর বাবার বয়সের ব্যবধানটা বড্ড বেশি। তখন গুরুত্ব দেইনি, কিন্তু আজ এই প্রশ্নটা আমাকেও কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।”
আশমিনির ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসির রেখা ফুটে উঠল। “আমার মনে হয় এই মিস্ট্রির উত্তর খুব দ্রুত তোমার দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।”

বলেই তিনি প্রস্থান করলেন। রোমানা ধপ করে সোফায় বসে পড়ল।
সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “বাবা? আসাদ চৌধুরীই কি তবে সব অনিষ্টের মূল? কাকির মতামত অনুযায়ী, তিনি কারানকেও নিয়ন্ত্রণ করেন! কিন্তু কারানের মতো একজন ডমিনেটিং আর শক্তিশালী মানুষকে চালনা করা কি আদৌ সম্ভব? তবে কি কারান মূল খেলোয়াড় নয়? তাকেও কি সূক্ষ্ম সুতোয় পরিচালনা করা হচ্ছে?”
আবেগের বশবর্তী হয়ে রোমানা সোফায় একটা ঘুসি মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল। “অসম্ভব! কিন্তু… কিন্তু যদি এটাই চরম সত্য হয়? কারান আর মিরার বিয়ের নেপথ্যেও তো বাবারই মস্তিষ্ক ছিল। আচ্ছা, বাবা কি এমন কোনো গোপন ক্রাইম করেছেন যার নাটের গুরু তিনি নিজেই? আর মা… মা যদি বেঁচে থাকেন, তবে তিনি কোথায়? এক মিনিট! এমনটা নয় তো যে মা-কে বাবাই কোনো অন্ধকার কুঠুরিতে সরিয়ে রেখেছেন!”
রোমানার চিন্তার জগৎ এখন এক বিশাল গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে যে বড়ো কোনো সাইক্লোন আসতে চলেছে, তার পূর্বাভাস সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে।

রোমানা ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুতলয়ে পায়চারি করতে করতে বিড়বিড় করে শুধালো, “কিন্তু আরিয়ানের বর্ণনা অনুযায়ী বাবা তো মায়ের ওপর একরকম অবসেশড ছিলেন। তবে তিনি কেন নিজের হৃৎপিণ্ডের মতো প্রিয় মানুষটার ক্ষতি করবেন? ভালোবাসার এই টক্সিক রূপান্তর কি আদৌ সম্ভব? আমি কিছুতেই সমীকরণটা মেলাতে পারছি না। হে আল্লাহ, আমাকে কোন আনপ্রেডিক্টেবল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?”
এই গুমোট চিন্তার অরণ্যে হঠাৎ এক ভরাট কণ্ঠস্বরের বজ্রপাত হলো, “প্রিয়দর্শিনী!”
রোমানা চমকে ত্বরিত পেছনে ফিরল। সামনে যা দেখল, তাতে তার হৃৎস্পন্দন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। এটি কি সত্যিই তার সেই পরিচিত আরিয়ান? তারই স্বামী? ট্রাউজার আর ফর্মাল শার্টের ওপর একটি সাদা অ্যাপ্রোন জড়ানো, শার্টটির হাতা গুটিয়ে রাখা, হাতে একটি ধোঁয়া ওঠা খাবারের ট্রে। আরিয়ানের এই ক্লাসি এবং পরিপাটি রূপ দেখে রোমানা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ। এই মুহূর্তে আরিয়ানকে কোনো এক আন্তর্জাতিক রান্নার প্রতিযোগিতার বিজয়ী শেফের মতো লাগছে। এতটা আকর্ষণীয় কবে হলো এই আরিয়ান? রোমানা সব জটিল রহস্য ভুলে আপাতত এই দৃশ্যপটেই নিজের সংবিৎ হারাল।

তার হৃৎপিণ্ড এখন কোনো এক বন্য ঘোড়ার মতো ছুটছে। বুকের বাঁ পাশে এক হাত চেপে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে রোমানা বিড়বিড় করল, “আয়হায়! এ আমি কাকে দেখছি? আমার তো হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। সিরিয়াসলি এটা আমারই সেই সাদামাটা সাদা মূলাটা?”
আরিয়ান খাবারের ট্রে-টি নিখুঁত ভঙ্গিতে কনসোল টেবিলের ওপর রাখল। এরপর এক চিলতে আত্মবিশ্বাসী হাসি দিয়ে বলল, “বসুন সোফায়, প্রিয়দর্শিনী।”
রোমানা বিমোহিত মূর্তির মতো হা করে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান এবার তার চোখের সামনে দুই আঙুলে তুড়ি বাজাল। ভ্রূ নাচিয়ে হাতের ইশারায় জানতে চাইল, তার কি সিস্টেম হ্যাং হয়ে গেল নাকি!
এবার রোমানা নিজের চিবুক ধরে কোনোমতে মুখটা বন্ধ করল। এরপর ঝাড়ি দিয়ে বলল, “আমাকে এত সম্মান দিস না শালা, হুট করে এত রেসপেক্ট পেলে আমার আবার বদহজম হয়ে যাবে। তুই কে রে, ব্যাটা? আগে তোর অরিজিনাল আইডেন্টিটি বল!”

আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিজের বউয়ের এই মোহিত ভঙ্গিটা উপভোগ করল। না, এই মেয়ের সাথে বিশুদ্ধ প্রেমের সংলাপ বিনিময় করা আর মরুভূমিতে বৃষ্টি খোঁজা একই কথা। এর সাথে কামড়াকামড়ি আর সারকাসমই সবচেয়ে ভালো মানায়। আরিয়ান চোখ সরু করে বলল, “তুই শালি চুপচাপ সোফায় বস, একটা চটকানা মারলে আমাকে শুদ্ধ আমার পুরো গোষ্ঠী চিনে যাবি।”
রোমানা এবার বুকে হাত দুটো ভাঁজ করে দাঁড়াল। বেশ ভাব নিয়ে বলল, “এমনি এমনি কিন্তু মার্শাল আর্ট মাস্টার হইনি, সোনা!”
আরিয়ান হালকা হাসল। সে উত্তরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই রোমানার এক গগনবিদারী চিৎকার পুরো অন্দরমহল কাঁপিয়ে তুলল, “আআআআআ!”

পরক্ষণেই দেখা গেল, রোমানা এক লাফে আরিয়ানের কোলে উঠে গেছে! দুই হাত আষ্টেপৃষ্ঠে তার কাঁধে জড়িয়েছে। আরিয়ান কিছুটা বিভ্রান্ত, তার বউ নিজে থেকে তার কোলে ওঠায় সে কি এখন রোমান্টিক হবে, নাকি এই চিৎকারের পেছনের রহস্য খুঁজবে, তা নিয়েই আপাতত চিন্তিত সে। তবে আরিয়ানের ভেতরে এখন রোমান্টিকতারই আনাগোনা। সে আড় হেসে রোমানার মুখের দিকে প্রগাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
এদিকে আতঙ্কিত রোমানা চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “তাকিয়ে দেখছিস কি, হাদারাম? ওই আরশোলাটাকে মারো বা*ল! আমি এত জলদি ইহলোক ত্যাগ করতে চাই না।”

তার বাঘিনি বউ যে সামান্য একটা আরশোলা দেখে ভয়ে কাবু হয়ে তার কোলে আশ্রয় নিয়েছে, এটা ভেবেই আরিয়ানের হাসি এবার বাঁশরি হয়ে বাজছে। সে রোমানাকে একটু ধাক্কা দিয়ে আরও নিবিড়ভাবে বুকের কাছে টেনে নিল। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে বলল, “ওটা একটা সাধারণ আরশোলা, কোনো ফায়ার-ব্রিদিং ড্রাগন না যে তোমাকে আস্ত গিলে খাবে। যদিও তুমি চাইলে ওই খাওয়ার কাজটা আমিই পারফেক্টলি করে দিতে পারি।”
বলেই সে এক হাতে নিজের কলারটা একটু উঁচিয়ে নিল। এদিকে রোমানা রাগে অগ্নিশর্মা। সে কিনা ভয়ে অস্থির, আর এই গ’রুটা তাকে নিয়ে মজা করছে! রোমানা ত্বরিত আরিয়ানের কলার ধরে সজোরে নিজের দিকে এক টান দিল। মুহূর্তেই আরিয়ানের মুখটা তার অধরের একদম কাছাকাছি চলে এলো।
“ভালোয় ভালোয় বলছি এই সস্তা রোম্যান্স বাদ দিয়ে ওটা সরা, নাহলে তোর এমন জায়গায় এমন একখানা ঘুসি মারবো যে আমাকে সহ পুরো মহাবিশ্বের কাউকে দেখানোর মতো অবস্থায় থাকবি না!”
আরিয়ান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শয়তানি হাসি ঝুলিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল, “আলটিমেটলি লসটা কিন্তু তোমারই হবে, বেইবি!”

রোমানা অগ্নিদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন দৃষ্টি দিয়েই তাকে ভস্ম করে দেবে। আরিয়ান আরেকটু ঝুঁকে রোমানার একদম সান্নিধ্যে এসে ফিসফিসিয়ে বলল, “একটা প্যাশনেট কিস দাও সোনা, বদলে তোমার এই মহাবিপদে আমি একটু উপকার না হয় করলাম!”
রোমানার মেজাজ এবার সত্যি সত্যিই ৩৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার করে গেল। সে মনে মনে আরিয়ানের সেই ভালনারেবল পয়েন্টে মোক্ষম এক আ’ঘাত হানার জন্য শরীরের সব পেশি শক্ত করল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই আরিয়ান আচমকা রোমানাকে জড়িয়ে ধরে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। চিৎকার করে বলল, “হা*রা’মজা’দাটা আমার বউকে টার্গেট না করে এখন আমার দিকে কেন তেড়ে আসছে?”

তেলাপোকাটা এবার ডানা ঝাপটে রীতিমতো যুদ্ধংদেহি মেজাজে আরিয়ানের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। আরিয়ান ত্বরিত রোমানাকে পাঁজাকোলা করে এক লাফে টি-টেবিলের ওপর উঠে পড়ল। কাচের টেবিলটা তাদের সম্মিলিত ভারে মড়মড় করে শব্দ করে উঠল। আরিয়ান সেই আরশোলাটার দিকে তাকিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে শাসাতে লাগল, “ওই শালা! সমস্যা কী তোর? আমি কি তোর বউকে টান দিয়েছিলাম? নাকি তোর প্রোপার্টিতে ভাগ বসিয়েছি? যেভাবে আমার দিকে অ্যাটাক করছিস, মনে হচ্ছে আমি তোর কোনো জন্ম জন্মান্তরের ধারদেনা শোধ করিনি!”
রোমানা এতক্ষণ আরিয়ানের এই আচরণ দেখে মনে মনে হাসলেও এখন সে লোকটার আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারল। সুযোগ পেয়ে আরিয়ান তাকে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে, যা সাধারণ পরিস্থিতিতে আরিয়ানের জন্য কল্পনা করাও দুষ্কর । সুযোগের এমন নিখুঁত ব্যবহার দেখে রোমানা মনে মনে কিছুটা মুগ্ধ হলেও মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বলল, “দামড়া ব্যাটা! বেডে না উঠে টেবিলের ওপর কেন উঠলি? তোর মতো এই হিউজ গণ্ডারের ভার সইতে না পেরে যদি টেবিলটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তখন কি হবে ভেবেছিস?”

আরিয়ান এক ভ্রূ উঁচিয়ে এক চিলতে নেশালো হাসি হাসল। রোমানার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে খুব আদুরে গলায় বলল, “আমাকে নিয়ে তোমার এত ডিপ কনসার্ন দেখে আমি তো ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছি, সুইটি!”
রোমানা অকস্মাৎ আরিয়ানের গালে আলতো করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল।
“তোকে নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করার থেকে বা’ল ছেঁড়াও ভালো।”
থাপ্পড় খেলেও আরিয়ান অবিচল। সে রোমানার অধরে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে অদ্ভুত স্বরে বলল, “তুমি ছিঁড়তে না পারলেও সমস্যা নেই, আমি তো আছি ছেঁড়ার জন্য।”
রোমানা ভ্রূ কুঁচকে আওড়ালো, “কী?”
“ওই যে বললে—বা…ল!”

মনে মনে রোমানা তাকে হাজারটা জঘন্য গালি দিলেও এই মুহূর্তে চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করল। আরিয়ান যে হারা’মির হা’রামি, যদি এখন রাগের মাথায় তাকে কোল থেকে ফেলে দেয়, তবে তার কোমর যে ফ্র্যাকচার হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে আরিয়ানের রোমান্টিক মুখচ্ছবির দিকে না তাকিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “চ্যা’টের কথা বাদ দিয়ে আগে ওটাকে সরাও! নাহলে আজ রাতে তুমিও বারান্দায় ঘুমাবে, আর ওই আরশোলাটাও তোমার সাথে বারান্দায় থাকবে!”
আরিয়ান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে রোমানাকে কোল থেকে নামিয়ে দিল। “ঠিক আছে, ম*রেই যদি যাই, তবে মনে রেখো, আমি তোমাকে ভালোবেসে একটা শহিদি মৃ*ত্যু বরণ করতে যাচ্ছি! ইয়াহুউউ!”
টেবিল থেকে নেমে সে নিজের চটিটা হাতে তুলে নিল। পূর্ণ শক্তিতে চটিটা লক্ষ্য করে ছুঁড়তেই তেলাপোকাটা কৌশলে ডজ দিয়ে উড়ে গিয়ে সোজা রোমানার মাথার ওপর ল্যান্ড করল। রোমানা মুহূর্তেই একটি জীবন্ত মূর্তির ন্যায় জমে গেল। তার শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে অতিকষ্টে ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “আরিয়ান… সত্যি করে বলো, ওটা কি আমার মাথায়?”

আরিয়ান হাতের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে এক পৈশাচিক হাসি হাসল। রোমানার সেই পাংশুটে মুখ আর পাথরের মতো জমে যাওয়া অবয়ব দেখে সে যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ বিনোদন খুঁজে পেয়েছে। অত্যন্ত সর্তকতার ভান করে সে ফিসফিসিয়ে বলল, “একদম নড়বে না, রোমানা! আচ্ছা, একটা কথা বলো তো, ওটা কি তোমার কোনো হারানো আত্মীয়? নয়তো এই সাত বিলিয়ন মানুষের দুনিয়ায় ও শুধু তোমাকেই কেন এতটা প্রায়োরিটি দেয়?”
রোমানা তখন প্রায় কান্নার পর্যায়ে, ভয়ে তার কণ্ঠনালি রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম। সে করুণ স্বরে আওড়ালো, “ইয়ার্কি মেরো না, আরিয়ান! ওটাকে প্লিজ সরাও, জান!”
‘জান’ সম্বোধনটা শুনে আরিয়ানের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য গর্বে ফুলে উঠল, তবে তার ভেতরের শয়তানটা তখনো তৃপ্ত হয়নি। সে বুকে হাত ভাঁজ করে বেশ কায়দা করে দাঁড়িয়ে বলল, “জান? এক কাজ করি জান, ওটাকে সরানোর আগে একটা মেমোরেবল সেলফি তুলি। ক্যাপশন দেব, ‘মাই টু বিউটিফুল কুইনস ইন ওয়ান ফ্রেম।’ উফ্‌, জাস্ট লুক অ্যাট হার উইংস! তোমার এই নতুন হেয়ারস্টাইলের সাথে দারুণ মানিয়েছে!”
রোমানার ভয় এবার প্রচণ্ড ক্রোধে রূপান্তরিত হলো। সে হিসহিস করে গালিগালাজ শুরু করল, “হা’রা’মজা’দা, কু*ত্তা’রবাচ্চা, জা’নো’য়ার, মা*দা’রফা*কা*র! আমি যদি আজ এই ট্রমা থেকে বাঁচি, তবে কাল সকালেই তোর নামে ডিভোর্স পেপার রেডি করব!”

“আরে দাঁড়াও! ওটা দেখি তোমার কানের লতির কাছে গিয়ে কিছু একটা ফিসফিস করছে। মনে হয় ডিনারে কী রান্না করেছ সেটা জানতে চাচ্ছে। বেচারি আন-ইনভাইটেড গেস্ট, একটু খাতির করো!”
ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে এক নাটকীয় মোড় ঘটল। তেলাপোকাটি হঠাৎ উড়াল দিয়ে সজোরে আরিয়ানের প্যান্টের ভেতর ঢুকে পড়ল। আরিয়ানের সেই বীরত্বপূর্ণ অ্যাটিটিউড সেকেন্ডের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে এখন রীতিমতো কাঁপছে। ওদিকে রোমানা এবার প্রতিশোধের আনন্দে হাসতে হাসতে টেবিলের ওপরই ধপাস করে বসে পড়ল। প্রায় কয়েক মিনিট অট্টহাসির পর সে টিটকারি দিয়ে বলল, “এবার বল কার আত্মীয়? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ওটা তোকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে, এমনকি তোদের দুজনের ফেশিয়াল স্ট্রাকচারেও মিল পাচ্ছি!”
রোমানার এই বাঁধভাঙা হাসি দেখে নিজের অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যেও আরিয়ান অপলক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। বউয়ের এই সতেজ হাসি যেন তার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছে। তবুও অভিনয়ের মান ধরে রাখতে সে কাষ্ঠহাসি দিয়ে বলল, “চেনবে মানে? আমি কি ওর সাথে কিন্ডারগার্টেনে পড়েছি নাকি?”

এরপর একটু ভাব নিয়ে চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আর তাছাড়া আমি এসব উটকো আরশোলার ভয়-টয় পাই না, আমি জাস্ট ওর পারসোনাল প্রাইভেসিকে সম্মান করি। হয়ত হতচ্ছাড়া লজ্জা পেয়ে আমার প্যান্টে ঢুকেছে, ‘রাইট টু প্রাইভেসি’ বলে একটা কথা তো আছে, বেইবি!”
“সাবধানে থাকিস, তোর নিজের প্রাইভেসি যেন আবার ও খে’য়ে না দেয়!” রোমানা এবার পেটে হাত দিয়ে খিলখিল করে হাসতে থাকলো।

“একটা জিনিস লক্ষ করেছ, রোমানা? এই আরশোলাটা একদম তোমার কার্বন কপি। আমি কিছু বলতে গেলেই ও ডানা ঝাপটিয়ে মারামারি করতে আসে!”
এরপর বেল্ট খুলতে খুলতে বাথরুমের দিকে ঝড়ের বেগে দৌড়াতে দৌড়াতে সে বলল, “আমি এই অনুপ্রবেশকারীকে বের করে আসছি! আর শোনো আমার লক্ষ্মী বউ, ভুলেও বাথরুমের দরজাটা বাইরে থেকে লক করো না প্লিজ! যদি ও আমাকে ভেতরে কিডন্যাপ করে নেয়, তবে তুমি তোমার চান্দের টুকরা স্বামীটাকে চিরতরে হারাবে বলে দিলাম!”

আরিয়ান দ্রুত বাথরুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল। রোমানা হাসতে হাসতে প্রায় টেবিল থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম।
বেশ কিছুক্ষণ পর নিজের উ’ত্তে’জনা নিয়ন্ত্রণ করে সে সামনের কনসোল টেবিলটার দিকে এগিয়ে গেল। ট্রে-টা থেকে এক অপূর্ব মৌতাত ছড়ানো ঘ্রাণ নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করছে। রোমানার ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি ফুটল। সে নিজের অবাধ্য ছোট চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে একটু ঝুঁকে খাবারের সুবাস নিল। এরপর অত্যন্ত কৌতূহল নিয়ে একটা ফিশ কাটলেট মুখে দিল।
মুহূর্তেই তার চোখ বড়ো হয়ে গেল। এই স্বাদ তো রীতিমতো প্রফেশনাল শেফদের টেক্কা দেওয়ার মতো! তার এই অকাল কুষ্মাণ্ড স্বামী যে এতটা চমৎকার রান্না করতে পারে, তা তার কল্পনার অতীত ছিল। সে যখন একের পর এক কাটলেট সাবাড় করতে ব্যস্ত, তখনই লক্ষ্য করল আরিয়ান দরজায় হেলান দিয়ে দুই হাত পকেটে গুঁজে অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আজকের আরিয়ানের অবয়বে এক ধরণের অদ্ভুত গাম্ভীর্য আর ম্যাচিউরিটি খেলা করছে।

রোমানা লজ্জা পেলেও সেটাকে কৌশলে আড়াল করে জিজ্ঞেস করল, “এই হাই-লেভেল রান্না করা কবে শিখলে?”
“যেদিন থেকে তোমাকে সম্পূর্ণ এবং নিঃশর্তভাবে ভালোবাসতে শিখেছি।”
“আজকাল বেশ রোমান্টিক কথা বলো, দৃষ্টিতেও কেমন এক রহস্যময় পারফেকশন, এই হঠাৎ পরিবর্তনের কারণটা জানতে পারি?”
আরিয়ান ধীরপায়ে এগিয়ে এসে তার খুব কাছে দাঁড়াল। অত্যন্ত নেশালো আর নিবিড় কণ্ঠে বলল, “কারণটা সেরেফ তুমি, আমার প্রিয়া!”
রোমানার চোখের কোণ অজান্তেই ভিজে উঠল। এই লোকটাকে সে চরম ঘৃণা করতে চায়, কিন্তু অবচেতন মন তাকে আরও বেশি ভালোবাসার জালে জড়িয়ে ফেলে। এক অদ্ভুত দোদুল্যমান অনুভূতিতে রোমানা স্তব্ধ হয়ে রইল।

আগুনের লেলিহান শিখায় তটরেখার বালু তখন তপ্ত কাচের ন্যায় উত্তপ্ত। ধোঁয়ার ধূসর কুণ্ডলী ভেদ করে দেখা গেল কারান, ফারহান আর আয়লা র*ক্তা*ক্ত অবস্থায় বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। তাদের পোশাকের ছিন্নভিন্ন অবশিষ্টাংশ পুড়ছে, উন্মুক্ত ত্বকের অনেক জায়গা থেকে ছাল উঠে র*ক্ত আর বালু মিশে গেছে। কিছুটা ব্যবধানে ইব্রাহিম আর জেহেরও নিথর, তবে তাদের নাসারন্ধ্রে তখনো জীবনের ক্ষীণ স্পন্দন বহমান।
কারান ধীরে ধীরে চোখের পল্লব উন্মোচন করল। তার মস্তিষ্ক ঝিমঝিম করছে, কানের ভেতর একটানা তীক্ষ্ণ একটা শব্দ বেজেই চলেছে। কিন্তু সে বেঁচে আছে। হেলিকপ্টারটি আছড়ে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে কারান অত্যন্ত দ্রুততায় ফারহান আর আয়লাকে নিয়ে কেভলার আবৃত একটি ভারী কারগো বক্সের আড়ালে পজিশন নিয়েছিল। সেই মজবুত ধাতব কাঠামোটিই তাদের জন্য শিল্ড হিসেবে কাজ করেছে।
কারান টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। তার বাম কাঁধের হাড় বোধহয় ডিসলোকেট হয়েছে। ওদিকে ফারহানও গোঙাতে গোঙাতে উঠে বসল। ঠিক তখনই দেখা গেল, জেহের আর ইব্রাহিমও বালু ঝেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে, তাদের অবয়ব এখন পশুর চেয়েও অধম।

জেহেরের লোলুপ দৃষ্টি হঠাৎ দূরে পড়ে থাকা অর্ধচেতন আয়লার ওপর নিবদ্ধ হলো। আয়লার র*ক্তমাখা কোটটির বু*কের অংশ ছিঁড়ে গিয়ে তার ধবল ত্বক উন্মোচিত হয়েছে। সেই বিধ্বস্ত শ্রী দেখে জেহেরের অবদমিত পাশবিক লা’লসা পুনরায় ফণা তুলে দাঁড়াল। সে টলটলায়মান পায়ে আয়লার দিকে এগোতে এগোতে এক বীভৎস হাসি দিয়ে বিড়বিড় করল, “ম’রা’র আগে এই লাস্যময়ী শরীরটার স্বাদ না নিলেই নয়!”
আয়লার ওপর জেহেরের এই লোলুপ দৃষ্টি কারানের ধমনিতে বি’ষাক্ত লাভার স্রোত বইয়ে দিল। মুহূর্তেই সে হুংকার দিয়ে জেহেরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কারান জেহেরের চুলের মুঠি ধরে তার মুখমণ্ডল তপ্ত বালুর সাথে সজোরে আ’ঘাত করতে থাকল। জেহেরের আর্তনাদে দ্বীপের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হলেও কারান থামল না। পাশেই পড়ে থাকা একটি ভারি আগ্নেয় পাথর তুলে সে জেহেরের দুই হাতের কবজি বরাবর সজোরে মা’রতে থাকল। কারান এতটা নৃ*শংসভাবে মা’রল যে জেহেরের হাত দুটো পুরোপুরি থেঁতলে গিয়ে এখন কেবল মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছে।
কারান পা দিয়ে জেহেরের গলাটা প্যাঁচিয়ে ধরে শ্বাসরোধ করার উপক্রম করে শীতল কণ্ঠে বলল, “তোর এই নোংরা চোখ দুটোর শাস্তি আমি এখনই দেব না, তোকে আমি তিলে তিলে টর্চার করে মারব, ইউ মা*দা*রফা*কিং পিস অফ গার্বেজ!”

রাগের মাথায় কারান এবার জেহেরের চোখ বরাবর একের পর এক শক্তিশালী ঘুসি মারতে থাকল। জেহেরের অক্ষিগোলক ভেতরে ঢুকে গেছে। কারানের প্রতিশোধের নেশা তবুও মেটেনি। সে পাথরের একটি সুচালো অংশ জেহেরের এক চোখের ভেতর সজোরে ঢুকিয়ে দিল। র*ক্তের পিচ্ছিল ধারা গাল বেয়ে পড়তেই জেহেরের আকাশ কাঁপানো চিৎকার রাতের অন্ধকারকে আরও বিভীষিকাময় করে তুলল।
ওদিকে ফারহান আর ইব্রাহিম এক ম*রণপণ যুদ্ধে লিপ্ত। ফারহান তার আ’হত পা নিয়েই ইব্রাহিমের চোয়াল বরাবর একের পর এক ‘আপার-কাট’ আর ‘হুক’ চালিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ এক অদ্ভুত সুইশ শব্দ শোনা গেল।
ফারহানের ঘাড়ে একটি বি’ষাক্ত তীরের অগ্রভাগ এসে বিঁধল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার পুরো স্নায়ুতন্ত্র অবশ হয়ে এলো। সে অস্ফুট স্বরে কেবল বলতে পারল, “কারান…”
পরক্ষণেই সে বালুর ওপর আছড়ে পড়ল। কারান কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনুভব করল তার ঘাড়েও একটি সূক্ষ্ম তীর বিঁধেছে। মুহূর্তের মধ্যে এক গভীর অন্ধকার তার চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

বি’ষাক্ত তীরের সেই আচ্ছন্নতা কাটিয়ে কারান যখন পুনরায় চেতনার জগতে প্রত্যাবর্তন করল, সে নিজেকে এক ভৌতিক পরিবেশে আবিষ্কার করল। সে এবং ফারহান একটি বিশাল লৌহকঠিন খাঁচায় বন্দী, তাদের হাত-পা শক্ত লতা দিয়ে নিপুণভাবে আবদ্ধ।
খাঁচার বাইরে শত শত আদিবাসী দাঁড়িয়ে, যাদের গায়ের রং অস্বাভাবিক লালচে, মুখে কয়লা আর কালির বিচিত্র রেখাচিত্র। তারা আগুনের লেলিহান শিখার চারপাশে নৃত্য করছে, এবং উচ্চৈঃস্বরে কোনো এক আর্কাইক ভাষায় মন্ত্র জপছে।

তবে কারানের স্নায়ুর ওপর সবচেয়ে বড়ো আ’ঘাতটি এলো যখন সে সামনে তাকাল। বলিদানের সুউচ্চ বেদিতে আয়লাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার পরনের সেই র*ক্তা*ক্ত কোট এখন অপসারিত; তার বদলে তাকে লতা-পাতা এবং বন্য ঘাস দিয়ে তৈরি এক রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত করা হয়েছে। মাথায় শোভা পাচ্ছে বুনো ফুলের মুকুট। আদিবাসীরা আয়লার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে ভক্তিভরে প্রণাম জানাচ্ছে। তাদের মাইথোলজি অনুযায়ী, আয়লা তাদের হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো এক দেবকন্যা বা আধ্যাত্মিক গুরুর বংশধর।
ফারহান দাঁতে দাঁত চেপে কারানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে উঠল, “হোলি শি*ট! কারান, আমরা কি কোনো টাইম পোর্টাল দিয়ে প্রস্তর যুগে চলে আসলাম নাকি?”
কারান কোনো উত্তর দিল না, সে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে। একটু পর ফারহান পরিস্থিতি বুঝতে পেরে কান্নার ভঙ্গিতে বিড়বিড় করল, “আয়লাকে তো এরা পুরো ফরেস্ট কুইন বানিয়ে দিয়েছে! আর আমাদের কি এখন ব্রেকফাস্ট হিসেবে সার্ভ করবে নাকি, ব্রো?”

একটু পরই আদিবাসীদের হাতে বিশাল বিশাল সব ধারালো পাথুরে ছু*রি দেখে ফারহান পুরো প্যানিকড হয়ে গেল। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “দেখ ভাই, আমি এত জলদি ওদের খাবার হতে চাই না। আমার খাবার কুইনকে এই অ’স’ভ্য দুনিয়ায় এতিম রেখে ম’রাটা মোটেও এথিক্যাল হবে না। প্লিজ বাঁচা, ভাই! তুই তো তাও বিয়ের আর বউয়ের—দুটোরই সাধ নিয়েছিস, অথচ আমার কপালটা দেখ!”
“একটা লা’থি মারলে মুখের সব ননসেন্স বুলি এখানেই বন্ধ হয়ে যাবে, শালা!” কারান কিড়মিড় করে ফারহানের দিকে তাকাল। জীবন-মৃ*ত্যুর এই সন্ধিক্ষণে ফারহানের অহেতুক রসিকতা তার ধৈর্যের সীমা লঙ্ঘন করছে।
ফারহান তবুও নির্ল*জ্জের মতো মুখ টিপে হেসে বলল, “তুই বোধহয় ভুলে গেছিস মামা, যে তোর পা দুটো এখন নুডুলসের মতো প্যাঁচানো। এই গোল্ডেন চান্স আমি মিস করতে চাই না। এতদিন যে ‘বউ বউ’ করে আমার কান ঝালাপালা করেছিস, এখন সব সুদে-আসলে মিটাবো।”

“একটা মাইক্রোফোন এনে দেব? আরেকটু জোরে চিল্লা, যেন ওরা এখুনি এসে তোকে বারবিকিউ বানাতে পারে!”
“আরে ধুর, ওরা কি আমাদের ল্যাংগুয়েজ বুঝবে নাকি! ওরা তো শুধু জানে ঝিঙ্গালালা জাগো হুহু!” এই বলে সে হাসিতে ফেটে পড়ল। ফারহানের এই অতিপ্রাকৃত হাস্যরস দেখে কারানও নিজের অজান্তেই এক চিলতে হাসল।
তখুনি সে আয়লার দিকে তাকাল। আয়লার জ্ঞান ফিরেছে মাত্রই; তার মুখে কীসের যেন ভেষজ নির্যাস ছিটানো হয়েছে। আয়লা চোখ খুলতেই চারপাশের পরিবেশ দেখে ছিটকে উঠল। শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা থাকলেও সে লক্ষ্য করল, তার ক্ষ*তস্থানগুলোয় আদিবাসীরা ওষুধি লতাপাতা দিয়ে প্রলেপ লাগিয়ে রেখেছে। আয়লার হৃৎস্পন্দন এখন দ্রুততর হচ্ছে।

কারণ এই আদিবাসীরাই তার জীবনের সেই নিখোঁজ পাজেলের অংশ। এদের কারণেই সে তার মা-বাবাকে হারিয়েছে, এবং তার শৈশব হয়েছে বিষাদময়।
আয়লা নিজের মনের সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে ভাবল, “না আয়লা, এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। তোকে এই পরিস্থিতির মাস্টার হতে হবে। জাস্ট কিপ ইট কুল।”
আয়লা অতিশয় নিবিষ্ট নয়নে অরণ্যের পারিপার্শ্বিকতা পর্যবেক্ষণ করল। তার স্মৃতির মণিকোঠায় বারো বছর বয়সের সেই বি’ভীষিকাময় মুহূর্তগুলো একে একে ভেসে উঠতে লাগল। হ্যাঁ, এই তো সেই অভিশপ্ত ভূমি, যেখানে একদা তার শৈশব তারুণ্যের স্নিগ্ধতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
আয়লার ঠোঁট জোড়া বিড়বিড় করে উঠল, “অবশেষে… অবশেষে তুমি সেই গন্তব্যে পৌঁছালে আয়লা দেমির। এবার এদের অস্তিত্বের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলতে হবে।”

প্রতিহিংসার দাবানল তার শিরায় শিরায় বইছে, রাগে শরীরটা তিরতির করে কাঁপছে। তার অবদমিত আক্রোশ আগ্নেয়গিরির লাভার মতো উগড়ে দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবতার কশাঘাত তাকে থামিয়ে দিল। এই বিশাল নৃগোষ্ঠীর বিপরীতে তার এই জীর্ণ ও দুর্বল শরীর নিয়ে লড়াই করা আত্মঘা’তী ছাড়া আর কিছুই নয়। আয়লার দৃষ্টি পড়ল সামনে থাকা কারান আর ফারহানের দিকে। তাদের থেকে কিছুটা দূরত্বে, লতা ও পাটের দড়িতে বিধ্বস্ত অবস্থায় ঝোলানো হয়েছে ইব্রাহিমকে।
কারান হাতের বাঁধনটা আলগা করার বিফল চেষ্টা করে চোখের ইশারায় আয়লাকে জিজ্ঞেস করল, পালাবে কীভাবে? সে জানে, আয়লা এই অঞ্চলের এথনোগ্রাফি এবং এই আদিবাসীদের নিয়ে দীর্ঘকাল রিসার্চ করেছে। আয়লা শীতল কণ্ঠে বলল, “ওরা বাংলা বোঝে না, কারান। সো, উই ক্যান টক ফ্রিলি।”
কারান অস্থির হয়ে নিচু স্বরে বলল, “এখন কী করতে হবে সেটা বলো। হাউ ডু উই গেট আউট অফ দিস মেস?”
“আই ডোন্ট নো,” আয়লা দাঁতে দাঁত চেপে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “আমি শুধু জানি, এদের সবাইকে আমি জ্যান্ত কব’র দেব।”

কারান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত করার চেষ্টা করল, “রিল্যাক্স! জাস্ট বি লজিক্যাল। তুমি একা কেন, আমরা তিনজন মিলেও এদের হারানো ইম্পসিবল। এই রেইনফরেস্টের প্রতিটি ইঞ্চিতে ওদের ডমিন্যান্স। তুমি কয়টাকে মা’র’বে?”
আয়লা ক্রোধে কিছু একটা চিৎকার করে বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই আদিবাসীদের সেই ছন্দহীন রিচুয়াল নাচ আচমকা থেমে গেল। আগুনের কুণ্ডলী থেকে বের হওয়া ধোঁয়ায় পরিবেশটা আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। ফারহান ভয়ে নীল হয়ে বিড়বিড় করতে লাগল, “হা’লা’রপোগুলো আবার বাঙ্গু ভাষা বোঝে নাকি? কোনো গুগল ট্রান্সলেটর ফিট করা নেই তো পেটে?”

সে এবার একটু জোরেই আদিবাসীদের উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করল, “লুক ব্রাদার্স, আমাকে খে’য়ে আপনাদের ডিনারটা কিন্তু স্পয়েল হয়ে যাবে। আমার বডিতে কার্বোহাইড্রেট কম, আর টেস্ট একদম তিতা—লাইক চিরতা! মশাও একবার আমার র*ক্ত টেস্ট করে সেকেন্ড টাইম ফিরে তাকায় না। তার চেয়ে ওই ইব্রাহিম মা’দা’রিকে ট্রাই করেন। হি ইজ দ্য দুবাই কিং! প্রিমিয়াম কোয়ালিটি মিট, ফ্লেবারটাও ভালো লাগবে আশা করি। একদম তাজা খাসি যাকে বলে! মানবিকতার জায়গা থেকে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনাদের আগেই ফ্রি পরামর্শ দিয়ে দিলাম।”
ফারহানের ঠোঁটের এই বিরামহীন নড়াচড়া দেখে আদিবাসীরা শিকারি পশুর মতো ওর দিকে তাকাল। ফারহান তৎক্ষণাৎ একটা ফ্যাকাশে হাসি দিয়ে বলল, “থাক, থাক! ধন্যবাদ দেওয়ার একদম প্রয়োজন নেই।”
পাশে তাকাতেই ফারহানের কলিজা শুকিয়ে গেল। কারান তার দিকে হিংস্র চোখে তাকিয়ে আছে। আর সামনে তাকাতেই দেখল, আয়লা যেন এক ক্ষুধার্ত বাঘিনি, যে তাকেই আগে চি*বিয়ে খাবে। এদিকে ইব্রাহিম যখন বুঝল ফারহান তাকে মেনু কার্ড বানাচ্ছে, সে আর্তনাদ করে উঠল। তার চিৎকারে বিরক্ত হয়ে এক আদিবাসী কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই তার কোমরের কোমরবন্ধ থেকে বের করা ধারালো পাথর-খোদাই করা ছু*রি দিয়ে ইব্রাহিমের ঊরুর একপাশ কে*টে ফেলল।

ইব্রাহিমের গগনবিদারী চিৎকারে বনের পাখিরা ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল। ফিনকি দিয়ে বের হওয়া ধমনীর র*ক্তে নিচের ঘাসগুলো মুহূর্তেই কর্দমাক্ত হয়ে উঠল। সেই মাংসের পিণ্ডটা নিয়ে ওরা একটা পাথরের বেদিতে রাখল, এবং আদিম উল্লাসে কাঁচা অবস্থাতেই ছিঁ*ড়ে খে*তে লাগল। এই পৈ’শাচিক দৃশ্য দেখে কারান, ফারহান এবং আয়লা, তিনজনেরই মেরুদণ্ড দিয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, এখানে বিন্দুমাত্র ভুল মানেই তাদের পরিণতি হবে বীভৎস।

ইব্রাহিমের পাশেই জেহের অচেতন হয়ে পড়ে আছে। কারানের মারের চোটে তার শরীরের এনজাইমগুলো বোধহয় কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে, নড়ার ক্ষমতাটুকুও নেই। ইব্রাহিম ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। তার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো এখন বাঁচার তাগিদে পা*গলের মতো কাজ করছে। সে মনে মনে ভাবল, “উঁহুঁ! শারীরিক শক্তি দিয়ে এদের সাথে পারা যাবে না। আই নিড এ মাস্টারপ্ল্যান। বাট… হাউ টু এসকেপ?”
একটু পরই আদিবাসী সর্দার যখন তার র*ক্তমাখা, সেরিমনিয়াল ড্যাগার নিয়ে ইব্রাহিমের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন সে বুঝতে পারল, এই বুনো উপজাতির পরবর্তী বলির পাঠা সে নিজেই।
কিন্তু ইব্রাহিমের ধূর্ত মস্তিষ্ক এই চরম বিপদেও স্থবির হয়নি। তার শিকারি দৃষ্টি আটকে গেল সর্দারের হাতের তলোয়ারের উলটো পিঠে, এবং অদূরে স্থাপিত এক বিশালাকার শিলা-মূর্তির ওপর। সেই প্রাচীন মূর্তির কপালে খোদাই করা একটি অদ্ভুত বৃত্তাকার চিহ্ন, যার কেন্দ্রে একটি কুণ্ডলী পাকানো সাপের প্রতিকৃতি রয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল জেহেরের পিঠেও এমন একটা জন্মদাগ আছে।

সর্দার ইব্রাহিমের বাঁধন খুলে দিল। কারণ এই সুরক্ষিত খাঁচা এবং সশস্ত্র বেষ্টনী ভেদ করে পালানো অসম্ভব। সর্দার যখন তার বুকের মাঝখানে ছু*রিটি বসাতে উদ্যত, ইব্রাহিম বিদ্যুদ্বেগে সরে গিয়ে জেহেরের দিকে ইশারা করল। সে এক পৈশাচিক চিৎকারে আদিবাসীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে জেহেরের শার্টের পেছনের অংশটা এক ঝটকায় ছিঁ*ড়ে ফেলল। উন্মুক্ত হলো জেহেরের সেই কুণ্ডলী পাকানো সাপের মতো গাঢ় জন্মদাগ।
ইব্রাহিম আদিবাসীদের সর্দারের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে হাত দিয়ে বারবার জেহেরের সেই চিহ্নের দিকে নির্দেশ করতে থাকল। তার দেহভঙ্গি এমন ছিল যে মনে হচ্ছিল জেহেরই সেই শয়’তানের বাহক।

আদিবাসীদের মধ্যে রুদ্ধশ্বাস গুঞ্জন শুরু হলো। সর্দার নিচু হয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দাগটি পরীক্ষা করল। তার চোখদুটো বিস্ময়ে বি*স্ফোরিত হয়ে উঠল। তাদের প্রাচীন মিথোলজি অনুযায়ী, এই বিশেষ চিহ্নধারী ব্যক্তিই হলো সব অমঙ্গলের উৎস, যাকে তাদের পবিত্র দেবীর সামনে বলি দিলে পুরো গোত্র মুক্তি পাবে।
ইব্রাহিম বুঝতে পারল তার এই শয়*তানি বুদ্ধি কাজে লেগেছে। সে আদিবাসীদের অনুকরণে অত্যন্ত ঘৃণাভরে জেহেরের দিকে থুতু ছিটিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে গেল। আদিবাসীরা ইব্রাহিমকে ছেড়ে দিয়ে একদল ক্ষুধার্ত হায়নার মতো জেহেরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
জেহেরের তখন পুরোপুরি জ্ঞান ফিরেছে। সে অবিশ্বাসে দেখল, যে ইব্রাহিমের জন্য সে জীবন বাজি রেখেছিল, সেই ইব্রাহিমই তাকে যমের দুয়ারে ঠেলে দিল। তার কানে তখন কারানের সেই সতর্কবাণী প্রলয়োল্লাসে বাজতে লাগল, ‘তুই ইব্রাহিমের কাছে একটা ইউজ-অ্যান্ড-থ্রো টিস্যু পেপার ছাড়া আর কিছুই না।’
জেহের উন্মাদ হয়ে চিৎকার করতে লাগল, “তোর জন্য আমি কী না করেছি, ইউ ফা*কিং বা*স্টা*র্ড! নোওও! কেউ বাঁচাও আমাকে! কারান, ফারহান… প্লিজ হেলপ মি! আমি তোমাদের স্লেভ হয়ে থাকব সারাজীবন, জাস্ট সেভ মি! আয়লা, তুমি কিছু করো! না না, আমি ম’রতে চাই না… কেউ তো বাঁচাও…”

জেহেরের গগনবিদারী আর্তনাদ বনের নিস্তব্ধতা চিরে দিচ্ছিল। সে যত বেশি ছটফট করছিল, আদিবাসীরা তত বেশি হিং’স্রভাবে তাকে চেপে ধরছিল। ইব্রাহিম তার দিকে তাকিয়ে পৈ’শাচিক হাসি হাসল। সে ঠোঁট নেড়ে নিঃশব্দে বলল, “গুডবাই, শালাজি! তোর এই দাগটা আজ আমার জ্যান্ত ফিরে যাওয়ার পাসপোর্ট হয়ে গেল।”
খাঁচার ভেতর থেকে কারান এই পুরো দৃশ্যটি দেখে ঘৃণাভরে শুধু ঠোঁট বাঁকাল।
ফারহান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “হোয়াট এ পিস অফ শি*ট! কত্ত বড়ো জা*নোয়ার দেখেছিস? হি ইজ এ লিটারেল সাইকোপ্যাথ। আমাদের এখান থেকে মুভ করতে হবে কারান, বিফোর দ্যাট বা*স্টা*র্ড সেলস আস আউট টু!”
আয়লা শান্তভাবে তাকিয়ে আছে। কারানের সাথে তার একবার চোখাচোখি হতেই দুজনেই নিঃশব্দে ঢোক গিলল। সামনে যা ঘটছে, তা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়।

নরভুকদের ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো তাদের রানি—এক কুৎসিত, জরাগ্রস্ত বৃদ্ধা, যার শরীরে আদিম উলকি আর গলায় মানুষের হাড়ের মালা জড়ানো। সে জেহেরের চোয়াল দুটো এক ঝটকায় ফাঁক করল, এবং তার তীক্ষ্ণ পাথুরে ছু*রি দিয়ে জেহেরের জিহ্বাটি গোড়া থেকে উপড়ে নিল। জেহেরের আর্তনাদ তার কণ্ঠনালিতেই থমকে গেল, কেবল অস্ফুট গোঙানি বের হতে থাকল। সেই বৃদ্ধা র*ক্তচোষা বাদুড়ের মতো কাঁচা জিহ্বাটি মন্ত্রোচ্চারণের ভঙ্গিতে সবার সামনে গিলে ফেলল। তার চেহারায় ফুটে উঠলো পরম তৃপ্তি।
বিভীষিকা সেখানেই শেষ হলো না। সে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় জেহেরের অক্ষিগোলক দুটো কোটর থেকে খুব*লে বের করে আদিবাসী শিশুদের দিকে ছুঁড়ে দিল। বাচ্চাগুলো সেই র*ক্তা*ক্ত অক্ষিগোলক নিয়ে কাড়াকাড়ি করে খা’ও’য়া শুরু করল।

এই বীভৎস দৃশ্য দেখে ফারহানের পাকস্থলী উলটে এলো। তার গ্যাগ রিফ্লেক্স এতটাই তীব্র হলো যে সে বমি চেপে রাখতে পারছিল না। সে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, “কারান, দিস ইজ পিওর ম্যাডনেস! ওরা আমাদের জ্যান্ত গ্রিল করে ফেলবে। ডু সামথিং ব্রো, বিফোর উই আর অন দ্য মেনু!”
আয়লা কঠোর স্বরে বলল, “শাট আপ, ফারহান! উচিত ছিল তোমাকেও চ্যাং-দোলা করে বাঁদরের মতো ঝুলিয়ে রাখা!”
আয়লার ধমকে ফারহান অসহায়ের মতো তাকাল। আয়লা দাঁতে দাঁত চেপে সতর্ক করল, “ডোন্ট আটার এ সিংগেল ওয়ার্ড। জাস্ট বি এ স্ট্যাচু লাইক কারান।”
কিন্তু পরবর্তী কয়েক মিনিটে সেখানে যা ঘটল, তা কারান বা ফারহানের মতো যোদ্ধাদেরও হাড়হিম করে দিল। র*ক্তে কর্দমাক্ত জেহেরকে বলির বেদিতে চিত করে শোয়ানো হলো। জেহেরের হাত-পা চারদিকে টানটান করে লতা দিয়ে পাথরের সাথে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। সে যন্ত্রণায় ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছিল, কিন্তু জিহ্বা না থাকায় তার আর্তনাদ বের হচ্ছিল না।

হঠাৎ আদিবাসীদের সেই নরভুক রাজা এক বিশালাকার মরচে ধরা পাথুরে খড়্‌গ নিয়ে এগিয়ে এলো। সে এক হ্যাঁচকা টানে জেহেরের প্যান্ট ছিন্নভিন্ন করে দিল। এরপর যা ঘটল, তা বর্ণনাতীত—রাজা সেই ভোঁতা খড়্‌গ দিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে জেহেরের পু*রু*ষা*ঙ্গটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করল। একে একে টিস্যু আর ধমনি ছিঁড়ে যেতে থাকলো। কা*টা স্থান থেকে ফিনকি দিয়ে আসা তপ্ত লোহিত র*ক্ত রাজার মুখমণ্ডলে ছিটে গেলেও তার ওষ্ঠাধরে ছিল পৈ’শাচিক তৃপ্তি।

জেহেরের শরীরটা তখন ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো ছটফট করছিল। বিচ্ছিন্ন সেই যৌ*না*ঙ্গটিকে রাজা একটি পাত্রে রাখা লবণ, বন্য মরিচ আর এক গাঢ় সবুজ রঙের বিষাক্ত ভেষজ তরলে ডুবিয়ে নিল। এরপর সবার সামনে সেটি কাঁচাই চিবিয়ে খেতে শুরু করল। কাঁচা মাংস আর লিগামেন্ট চিবানোর সেই হাড়কাঁপানো শব্দে ফারহান আর নিজেকে সামলাতে পারল না, খাঁচার এক কোণে সশব্দে বমি করে দিল।
কারান, যে তার পেশাগত জীবনে অসংখ্য মৃ*ত্যু আর বীভৎসতা দেখে অভ্যস্ত, সেও এই আদিম পাশবিকতা সহ্য করতে পারল না। ঘৃণা আর বিতৃষ্ণায় সে মুখ ফিরিয়ে নিল, তার চোয়ালের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু আয়লা? সে তখনও এক নিঃস্পৃহ দর্শকের মতো তাকিয়ে আছে। সে জানে, এই মুহূর্তে এক ফোঁটা ঘৃণা বা ভয়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটলে আদিবাসীরা তাকে দেবীর আসন থেকে নামিয়ে পশুর স্তরে নিয়ে যাবে। সে নিজের নখ হাতের তালুতে এত জোরে বিদ্ধ করল যে সেখান থেকেও র*ক্ত চুঁইয়ে পড়ল, অথচ তার চোখের পলকও নড়ল না।
ওদিকে নিজের চোখের সামনে শ্যালকের এই অমানুষিক পরিণতি দেখে এবং সেই কাঁচা মাংস ভক্ষণের শব্দ শুনে ইব্রাহিমের মস্তিষ্ক চাপ নিতে পারল না। তার স্নায়ুতন্ত্র মুহূর্তেই অসাড় হয়ে গেল, এবং সে চোখ উলটে সশব্দে ধপ করে মেঝেতে পড়ে জ্ঞান হারাল।

পুরো চত্বর তখন জেহেরের শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়া র*ক্তের গন্ধে ভারী। রাজা তখন জেহেরের উদরের মাংস কা’টার জন্য ছু’রি শান দিতে দিতে, তার অনুচরদের দিকে ইশারা করল।
মুহূর্তের মধ্যে চারজন হিলহিলে গড়নের আদিবাসী তাদের ধারালো পাথুরে ছু’রি নিয়ে জেহেরের দুই ঊরুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা জেহেরের প্যান্টের অবশিষ্টাংশ ছিঁড়ে ফেলে তার ঊরুর ফিমার হাড় বরাবর মাংসের দীর্ঘ ফালি কাটতে শুরু করল। জেহেরের গলার শিরাগুলো ফুলে ফেটে যাওয়ার উপক্রম। জিহ্বা নেই বলে সে কেবল নিজের দাঁত দিয়ে নিজের মাড়ি কামড়ে ধরে অবরুদ্ধ গোঙানি ছাড়ছে।
একজন আদিবাসী জেহেরের হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত চামড়াটা জ্যান্ত অবস্থায় উপড়ে নিল। চামড়া ছাড়ানোর সেই শব্দে ফারহানের মনে হলো তার নিজের শরীরের ত্বকও যেন কেউ টেনে ছিঁড়ছে। এরপর তারা সেই উন্মুক্ত লাল মাংসের ওপর ছিটিয়ে দিল সেই সবুজ বিষাক্ত লিকুইড। জেহেরের পায়ের পেশিগুলো তখন জ্বালাপোড়ায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল।

রাজা এবার তার বড়ো খড়গটি দিয়ে জেহেরের পেটের ঠিক নিচের অংশে এক গভীর পোঁচ দিল। মুহূর্তেই জেহেরের নাড়িভুঁড়ি আর অন্ত্রের কিছু অংশ জ্যান্ত অবস্থাতেই বাইরে বেরিয়ে এলো। রাজা কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেই গরম অন্ত্রের অংশ টেনে ছিঁড়ে নিয়ে নিজের গলায় মাফলারের মতো প্যাঁচিয়ে এক নারকীয় উল্লাস করল। আদিবাসী বাচ্চারা তখন জেহেরের শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়া র*ক্তের ধারায় নিজেদের হাত ধুয়ে সেই র*ক্ত মুখে মাখছে আর ঢগঢগ করে গিলছে।
জেহেরের হৃৎপিণ্ড তখনো শেষবারের মতো পাম্প করার চেষ্টা করছে, যার ফলে প্রতিবার ধড়ফড়ানির সাথে সাথে তার উন্মুক্ত পেট দিয়ে র*ক্তের ফোয়ারা ছুটছে।

কারান দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে বুঝতে পারছে, ইব্রাহিম জ্ঞান হারিয়ে এক অর্থে বেঁচে গেছে; কারণ এই গথিক হরর দেখার পর কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের পক্ষে স্বাভাবিক থাকা অসম্ভব। কিছুক্ষণ পর জেহেরের শরীর বলতে কেবল র*ক্তমাখা কঙ্কালটাই অবশিষ্ট রইল, বাকিটা উদরস্থ হয়েছে সেই নরভুকদের।
এবার এক আদিবাসী ফারহানের দিকে এগিয়ে এলো। ফারহান ভেতরে ভেতরে ভয়ে নীল হয়ে গেলেও মুখে কৃত্রিম কাঠিন্য বজায় রাখল। ওদিকে কারান তার সমস্ত শক্তি দিয়ে লতার বাঁধন থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। তার কবজি ইতোমধ্যে ঘর্ষণে কালো হয়ে গেছে, র*ক্তে ভিজে গেছে দড়ি।
ফারহান মনে মনে আল্লাহর নাম জপতে জপতে ভাবল, “ইয়া আল্লাহ, আমার অবলা হবু বউটাকে বিয়ের আগেই বিধবা বানিও না। ২২ বাচ্চার ড্যাডি হয়ে নিজের ফুটবল আর ক্রিকেট টিম বানানোর ড্রিমটা বোধ হয় আজ এই জঙ্গলেই এন্ড হয়ে যাবে।”

Tell me who I am 2 part 17 (2)

রাজা তার সেই বীভৎস র*ক্তমাখা খড়গটি নিয়ে ফারহানের উন্মুক্ত বুক বরাবর তাক করল। ফারহান তখন অন্তিম মুহূর্তের কামনায় চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল। তার কপালে জমে থাকা ঘাম আর র*ক্ত মিশে একাকার। পাশের খাঁচায় কারান তখন এক উন্মত্ত পশুর মতো গর্জন করছে। তার শরীরের প্রতিটি টিস্যু লতার বাঁধনে নীল হয়ে ফুলে উঠেছে, বাঁধনগুলো মাংসের গভীরে বসে গিয়ে হাড় স্পর্শ করছে, কিন্তু বন্ধুর আসন্ন মৃ*ত্যু তাকে পুরোপুরি উন্মাদ করে তুলেছে।

Tell me who I am 2 part 17 (4)