Tell me who I am 2 part 22
আয়সা ইসলাম মনি
১৯৮৫ সাল। সেপ্টেম্বরের মিঠে রোদ তখন ঢাকা ক্লাবের পেছনের বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাস ছুঁয়ে যাচ্ছে। মাঠের একপাশে নিখুঁত লাইনে দাঁড়িয়ে আছে মার্সিডিজ-বেঞ্জ, ফোর্ড কর্টিনা, আর টয়োটা করোনার মতো সেই আমলের বিলাসবহুল গাড়িগুলো।
উপস্থিত তরুণীদের কারো পরনে ফিনফিনে জর্জেটের শাড়ি, চুলে নিখুঁত ফোলা বব কাট কিংবা মাথার ওপর উঁচু করে বাঁধা খোঁপা। আবার তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা চপল কিশোরীদের কেউ কেউ পড়েছে ফ্রিল দেওয়া ফ্রক, চুলে সযত্নে বাঁধা সাটিনের চওড়া বো। অন্যদিকে ছেলেদের পরনে চওড়া কলারের শার্ট, নিচে বেল-বটম প্যান্ট।
ভিড়ের গুঞ্জন ছাপিয়ে হঠাৎ করেই একদল তরুণীর সম্মিলিত চিৎকার ভেসে এল, “আশু! আশু! ওই যে, আশু নামছে!”
সাদা রঙের ক্ল্যাসিক মার্সিডিজ-বেঞ্জ ডব্লিউ-১১৪ গাড়িটার হুড খোলা। ভেতরে স্টিয়ারিং ধরে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে আশু। চোখে ডার্ক শেডের এভিয়েটর চশমা, পরনে ফিটেড ক্যাজুয়াল শার্টের হাতা নিখুঁতভাবে কনুই পর্যন্ত গুটানো। চুলের দু-একটা অবাধ্য গোছা কপালে এসে পড়েছে। তাকে দেখতে অবিকল আশির দশকের কোনো ড্যাশিং হিরোর মতো লাগছে।
“দেখিস বন্ধু, এবারের ট্রফিটাও এসি-ই ছিনিয়ে নেবে,” মাঠের একটা কোণ থেকে এক তরুণ তার সঙ্গীকে বলল।
তার বন্ধু পকেটে হাত গুঁজে ঘাড় বাঁকিয়ে সায় দিল, “নেবেই তো! আমাদের এসি-র মার্সিডিজের সাথে টেক্কা দেওয়ার মতো বাপের ব্যাটা এই রোডে আর কে আছে? ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে যখন একবার টান দেবে না, মনে হবে রাস্তা ছেড়ে গাড়িটা উড়তেছে। পুরাই নেক্সট লেভেল জিনিস, ভাই!”
অভিজাত তরুণীদের মধ্যেও তখন ফিসফাস চলছে, তাদের হৃৎস্পন্দনের গতি তো তুঙ্গে। এক তরুণী তার বান্ধবীর হাত শক্ত করে চেপে ধরে চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “লুক অ্যাট হিম! আশুকে আজ যা ড্যাশিং লাগছে না! গাড়ির কথা বাদ দিলেও, ও যেভাবে গিয়ার শিফট করে, ওখানেই তো অর্ধেক মেয়ে কুপোকাত!”
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিতা নামের মেয়েটি ঠোঁটের কোণে প্রলুব্ধকর হাসি ফুটিয়ে চুলে হাত বুলালো। সে কাঁধ নাচিয়ে বলল, “আই উড সে, দে জাস্ট ফেইন্ট! বাট আপাতত লেটস ফোকাস অন হিজ রেসিং। ওকে নিয়ে ফোকাস করার এবং ফেইন্ট হওয়ার জন্য পুরো লাইফ পড়ে আছে। সো, কাম অন!” বলেই সে আবার সবার সাথে তাল মিলিয়ে দুই হাত তুলে চিৎকার জুড়ে দিল, “আশু! আশু!”
মাঠের ঠিক বিপরীত পাশে, কিছুটা নির্জনতায় দাঁড়িয়ে একটা কাগজের ঠোঙা থেকে চানাচুর মুখে দিচ্ছিল রেমি। পরনে সাধারণ একটা হালকা নীল সুতি শার্ট আর ট্রাউজার্স। খাঁটি বাঙালি শ্যামলা বরণের চেহারায় একটা স্নিগ্ধ, শান্ত ভাব মিশে আছে। চারপাশের এই উন্মাদনা আর মেয়েদের আকুলতা দেখে রেমি মনে মনে একটু হাসল। ঠোঙাটা হালকা ঝাঁকিয়ে সে বিড়বিড় করল, “অ্যাসিডের বাচ্চাকে কতবার বললাম যে এবার অন্তত অন্য কাউকে একটু সুযোগ দে! কিন্তু এই বান্দা তো ট্রফি ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। যাক, আমি বরং চানাচুরটাই চিবাই। বন্ধু আমার এমনিতেও জিতবে, অমনিতেও জিতবে!”
ঠিক এই সময়েই র্যালির ফ্ল্যাগ অফ-এর ঘোষণা এল। মাঠজুড়ে সবার ইঞ্জিনের আওয়াজ কয়েক গুণ বেড়ে গেল। আশু পেশাদার ভঙ্গিতে মার্সিডিজের গিয়ারে হাত রাখল। ক্লাচ ছেড়ে এক্সিলারেটরে চাপ দিতেই গাড়িটা প্রচণ্ড আওয়াজ তুলে ঢাকার চওড়া, ফাঁকা পিচঢালা রাস্তার বুক চিরে ছুটে চলল।
ফিনিশিং লাইনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য রেমিরা দ্রুত একটা খোলা জিপে চেপে বসল। চারদিকে তখন করোতালি আর চিয়ার্স করার আওয়াজ। জিপটা যখন মাত্র গতি বাড়াতে শুরু করেছে, ঠিক তখন রেমির পাশে এসে দাঁড়াল হাসান নামের একটা ছেলে।
হাসান রেমির দিকে তাকিয়ে ফুঁসে উঠে বলল, “কাজটা কিন্তু মোটেও ঠিক হচ্ছে না, রেমি। তোর বন্ধুকে এবার একটু সাবধান হতে বলিস।”
রেমি ভাবলেশহীন চোখে সামনের রাস্তার দিকেই তাকিয়ে রইল। রেমির এই উদাসীনতা হাসানের ক্ষোভকে যেন আরও উসকে দিল। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আমরা সবাই ভালো করেই জানি আসল সত্যিটা কী। এসি-র বাপ এই ক্লাবের চেয়ারম্যান, আর ওনার সাথে সরকারের বড় বড় মিনিস্টারদের ওঠাবসা। হাত অনেক লম্বা! লবিং আর পারশিয়ালিটি হচ্ছে বলেই ও প্রতিবার ট্রফিটা পায়, নাহলে একটা মানুষ কীভাবে প্রতিবার ফার্স্ট হয়? ইটস টোটালি আনফেয়ার!”
তার এই উগ্র মন্তব্যের জবাবে রেমি এতটুকু উত্তেজিত হলো না। সে ধীরস্থিরভাবে চানাচুরের শেষ দানাটা মুখে ফেলল, তারপর ঠোঙাটা মুচড়ে পকেটে পুরল। হাসানের চোখের দিকে তাকিয়ে সে উত্তর দিল, “ক্ষমতা আর লবিং দিয়ে হয়ত মাঠের সামনের সারিতে গাড়ি দাঁড় করানো যায়, কিন্তু প্রতি সেকেন্ডে গিয়ার বদলে গাড়িকে বাতাসের গতিতে ছোটানো যায় না। ওটার জন্য বাপের হাত লাগে না, নিজের হাতের কবজির জোর আর কলিজা লাগে। আমার বন্ধু জিতেছে কারণ স্টিয়ারিংয়ের ওপর ওর নিয়ন্ত্রণ তোর ধারণার চেয়েও নিখুঁত। অহেতুক কাদা না ছিটিয়ে, বরং চোখ খুলে ওর ড্রাইভটা দেখ, কিছু শিখতে পারবি। তাছাড়াও তুই বরং নিজের ভাইয়ের দিকেও তাকা। সিনিয়র হয়েও সে অলরেডি ওর কাছে দু-দুবার হেরেছে। এবার হারলে হ্যাটট্রিক হবে। কিন্তু টেনশন নিস না, আমার বন্ধু এবারও জিতবে।”
হাসান এবার চরম বিরক্তিতে কটমট করে রেমির অতি-শান্ত চেহারার দিকে তাকাল। জিপের হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরে মনে মনে ফুঁসে উঠে সে বিড়বিড় করল, “এসি ওরফে আসাদ চৌধুরীর এই অহংকারের খেলাটা খুব জলদিই খতম হবে, দেখিস তুই।”
ওদিকে রেস তখন একদম অন্তিম লগ্নে। আসাদ স্বভাবসুলভ দক্ষতায় বাকি সব প্রতিযোগীকে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে। ফিনিশিং লাইনের লাল-সাদা ব্যানারটা দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আসাদের ঠোঁটের কোণে তখন আত্মবিশ্বাসের বাঁকা হাসি লেপ্টে আছে। সে যখন ভাবছে এবারের ট্রফিটাও তার শোকেসের শোভা বাড়াতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই পিছনে একটা অচেনা ইঞ্জিনের আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো।
আসাদ ভ্রূ কুঁচকে আয়নায় তাকাল। পেছন থেকে প্রায় বিদ্যুৎ গতিতে ধেয়ে আসছে একটা কুচকুচে কালো, অসম্ভব দামি ‘আলফা রোমিও স্পাইডার’। ১৯৮৫ সালের দিকে ঢাকা শহরে এমন স্পোর্টস কার চোখে দেখাও ছিল পরম সৌভাগ্য।
গাড়িটার কনভার্টিবল টপ খোলা। আলফা রোমিওটা মুহূর্তের মধ্যে তার মার্সিডিজের একদম সমান্তরালে চলে এল। তীব্র গতিতে মোড় নেওয়ার সময় দুই গাড়ির টায়ার তখন উত্তপ্ত পিচের বুকে ঘষা খেয়ে স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি করল। আসাদের সুগঠিত চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে চেপে ধরে সে বিড়বিড় করল, “হু দ্য হেল ইজ হি? দাঁড়াও বাছা, তোমার গাড়ি সারাজীবনের জন্য আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা আমি করছি!”
আসাদ ক্ষোভ নিয়ে ডানপাশের গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে যে বসে আছে তার দিকে তাকাল। চলন্ত গাড়ির তীব্র বাতাসে চুল যেন উড়ে না যায়, সেজন্য মাথার ওপর একটা দামি সিল্কের স্কার্ফ নিখুঁত ব্যান্ডানার মতো করে বাঁধা সেই ব্যক্তির। চোখে একটা বড়ো ওভারসাইজড ফ্রেমের সানগ্লাস, আর মুখের নিচের অংশ ঢাকা একটা ধবধবে সাদা ব্যান্ডানায়। তার পরনে ছিল ইউরোপীয় ওল্ড-মানি ঘরানার একটা সাদা লিনেন শার্ট, যার কলার দুটো খাড়া করা।
মেয়েটি এক পলক আসাদের দিকে তাকাল। মুখের রুমালটার আড়ালেও যেন তার ঠোঁটের কোণের তাচ্ছিল্য স্পষ্ট টের পাওয়া গেল।
এই চাহনি মুহূর্তেই আসাদের পুরুষালি ইগোতে গিয়ে লাগল। সে চরম বিস্ময় নিয়ে বলে উঠল, “হোয়াট? আ ফিমেল রেসার? তাও আবার বাংলাদেশে? এত মডার্ন কবে হলো এ দেশ? কিন্তু একে তো কোনোভাবেই জিততে দেওয়া যায় না। কাম অন আশু, শো হার হু দ্য রিয়েল কিং ইজ!”
সে দাঁতে দাঁত চেপে মার্সিডিজের এক্সিলারেটর একদম মেঝে পর্যন্ত দেবে দিল। স্পিডোমিটারের কাঁটা সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি পৌঁছাল। কিন্তু ওপাশের রহস্যময়ী মেয়েটি পেশাদার হাতে গিয়ার শিফট করল। মার্সিডিজকে এক ইঞ্চি জায়গাও না দিয়ে, ঠিক ফিনিশিং লাইনের মাত্র কয়েক মিলিমিটার আগে নিখুঁত একটা স্লাইড নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল কালো গাড়িটা।
সাদা-কালো চেকার্ড ফ্ল্যাগ বাতাসে নেমে এল। আসাদ চৌধুরি হেরে গেছে!
মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঢাকা ক্লাবের মাঠজুড়ে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। উপস্থিত শত শত মানুষের চোখ চড়কগাছ। ঢাকার অপরাজেয়, ড্যাশিং রেসার আসাদ চৌধুরি আজ দ্বিতীয় হয়েছে!
আসাদ রাগে, ক্ষোভে আর অপমানে গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল। সজোরে নিজের মার্সিডিজের বনেটের ওপর একটা চাপড় মারল সে। ওর ফরসা মুখটা রাগে আর ক্লান্তিতে একদম টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, কপালে জমেছে ঘামের বিন্দু।
রেমি ততক্ষণে জিপ থেকে নেমে দ্রুত ভিড় ঠেলে আসাদের কাছে চলে এসেছে। সে পকেট থেকে রুমাল বের করে আসাদের দিকে বাড়িয়ে দিল আর অন্য হাতে একটা কাচের বোতলের ঠান্ডা জল ধরিয়ে দিল। আসাদ বোতলটা নিলেও তার বুকের খাঁচা তখনো রাগে ওঠানামা করছে।
রেমি ভরসাযোগ্য ভঙ্গিতে আসাদের কাঁধে একটা হাত রাখল। “আরে ব্যাপার না বন্ধু, সেকেন্ডই তো হয়েছিস। হেরে তো আর যাসনি পুরোপুরি। তাছাড়া জীবনে কখনো কখনো হারতেও হয়, নাহলে জেতার আসল মজাটাই টের পাওয়া যায় না। তুই-ই না আজ সকালে বলছিলি, জিততে জিততে জীবনটা বড্ড একঘেয়ে আর বোরিং হয়ে গেছে তোর?”
আসাদ বোতলের ছিপিটা এক ঝটকায় খুলে তপ্ত মুখের ওপর ঢকঢক করে জল ঢেলে দিল। কিছুটা জল ওর চিবুক আর গলার উন্মুক্ত অংশ বেয়ে শার্টের কলার ভিজিয়ে দিল। এরপর শূন্য বোতলটা এক ঝটকায় ঘাসের ওপর ছুঁড়ে ফেলে রেমির দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকাল।
ওর কপালটা ক্ষোভে কুঁচকে উঠল, “তাই বলে একটা মেয়ের কাছে হারব? মাই ড্যাম ফুট! মন চাচ্ছে ওর ওই ইতালিয়ান মেশিনটা এখুনি ব্লো-আপ করে দিই, রেমি।”
রেমি এতক্ষণ বেশ শান্ত ছিল, কিন্তু আসাদের মুখে ‘মেয়ে’ শব্দটা শুনে ওর ভ্রূ জোড়া চট করে ওপরে উঠে গেল। সে হাতের পাঞ্জাটা কপালে ঠেকিয়ে রোদের আলো আড়াল করে বলল, “কী বলিস? মেয়ে? মেয়েরাও এমন ঝড়ের গতিতে রেসিং গাড়ি ছোটায় নাকি? অবিশ্বাস্য!”
ঠিক তখনই আলফা রোমিওর গাড়ির নিচু ক্রোম-প্লেটেড দরজাটা খুলে গেল। স্পোর্টস কারের নিচু আসন থেকে তরুণী যখন মাঠের নরম ঘাসে পা রাখল, উপস্থিত পুরো ক্লাব চত্বরের পুরুষদের চোখ যেন স্থির হয়ে গেল। মেয়েটি প্রথমে আয়েশি ভঙ্গিতে তার চোখের ওভারসাইজড সানগ্লাসটা নামাল। দুপুরের সেই তীব্র আলোয় ঠিকরে বেরোলো একজোড়া গাঢ় স্ফটিকের মতো নীল চোখ। মাথার স্কার্ফটা আলগা করে কাঁধের ওপর ছেড়ে দিতেই তার রেশমের মতো মসৃণ, হালকা বাদামি রঙের চুলের গোছা বাতাসে আলতো দোলা খেল।
সবশেষে তরুণীটি যখন তার মুখের সাদা রুমালটা পুরোপুরি সরিয়ে নিল, মনে হলো ঢাকার এই মলিন আকাশে এক নিমেষে এক হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে উঠেছে! নিখুঁত ইউরোপীয় ছাঁচের ফরসা মুখাবয়ব, গ্রিক মূর্তির মতো ধারালো নাক আর পাতলা ওষ্ঠাধর। এই ইথারীয় রূপের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার সাধ্য যেন মরণশীল কোনো পুরুষেরও ছিল না। এমনকি যে মেয়েরা এতক্ষণ ‘আশু আশু’ বলে গলা ফাটানো চিৎকারে চারদিক মাতিয়ে রাখছিল, তারাও নিজেদের ঈর্ষা ভুলে ফিসফিস শুরু করে দিল, “মাই গড! ও কি হলিউডের কোনো নতুন সিনেমার হিরোইন নাকি?”
রেমি দূর থেকে দৃশ্যটা দেখল, তারপর রসিকতার সুরে বিড়বিড় করল, “দোস্ত, পরিস্থিতি যা দেখছি, আজ ঢাকার অর্ধেক পোলাপাইন ক্রাশ খেয়ে সোজা পিজি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হবে!”
কিন্তু আসাদের কানে তখন কোনো শব্দই পৌঁছাচ্ছিল না। সে একদম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরের সমস্ত পুরুষালি রাগ, পরাজয়ের ক্ষোভ—সব যেন ওই নীল চোখের জাদুতে কর্পূরের মতো উবে গেল। সে পলকহীন চোখে চেয়ে রইল সেই অপার্থিব অবয়বের দিকে।
তরুণীটি আসাদের এই হতভম্ব, বোকা বনে যাওয়া পুরুষালি চাহনি দেখে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রলুব্ধকর হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর মূল মঞ্চের ট্রফির দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় নিজের তর্জনীতে চাবির রিংটা নিয়ে স্টাইলিশ কায়দায় ঘোরাতে ঘোরাতে আসাদকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ওর গা থেকে ভেসে আসা ফরাসি পারফিউমের মাদকতাময় সুবাস ঢাকার বাতাসকে ম ম করে তুলল।
আসাদ একবার ঢোক গিলল, তারপর নিজের অজান্তেই দ্রুত পেছন ফিরে তাকাল। ততক্ষণে লাউডস্পিকারে ভারী গলায় উইনারের নাম অ্যানাউন্স করা হচ্ছে, “অ্যান্ড দ্য অল-টাইম রেকর্ড ইজ ব্রোকেন! লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান, প্লিজ ওয়েলকাম আমাদের এবারের চ্যাম্পিয়ান—আনতারা কৌশিকা!”
কৌশিকা মার্জিত ভঙ্গিতে হেসে মঞ্চে আরোহণ করল, এবং তার হাতে চকচকে রুপালি ট্রফিটা তুলে দেওয়া হলো। ট্রফিটা হাতে নিয়ে সে রাজকীয় ভাব নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এল। সে সরাসরি এগিয়ে এল আসাদের দিকে, ঠিক ওর মুখের সামনে এসে দাঁড়াল। মেয়েটি এক হাত কোমরে রেখে, কিছুটা বাঁকা চোখে আসাদকে উপর-নিচ নিপুণভাবে পরখ করে নিল।
এদিকে আসাদ তখনো পুরোপুরি বাকরুদ্ধ। আসাদকে পরখ করা শেষ হলে, কৌশিকা তার নীল চোখের মণি জোড়া সামান্য নাচিয়ে, একদম আমেরিকান টোনে স্মার্টলি বলল, “গেট রেডি টু লুজ ফ্রম নাউ অন, মিস্টার আআ… হোয়াটএভার! বাট আই মাস্ট সে, আই রিয়েলি এনজয়েড রেসিং উইথ ইউ।”
আসাদকে আবারও গভীর গোলকধাঁধায় স্তব্ধ করে দিয়ে মেয়েটি তার পাশ কেটে চলে গেল। আসাদের মনে হলো, তার বুকের ভেতরের অলিন্দ-নিলয়গুলো বুঝি এই তীব্র ধুকপুকানিতে পাঁজরের হাড় ভেঙে বেরিয়ে আসবে। ওদিকে মঞ্চ থেকে দ্বিতীয় স্থানাধিকারী হিসেবে আসাদ চৌধুরীর নাম বারবার ঘোষণা করা হচ্ছিল, অথচ সেদিকে ওর কোনো মনই ছিল না।
তার সম্মোহনগ্রস্ত ঠোঁটের কোণ থেকে নিচু স্বরে অজান্তেই বেরিয়ে এল, “কে এই নীলপদ্মা?”
বিকেলের ম্লান আলো তখন আসাদের বাড়ির ড্রয়িংরুমের ভারী পর্দা ভেদ করে ভেতরে এসে পড়েছে। সেই তখন থেকেই আসাদের মাথায় ঠান্ডা জল ঢেলে চলেছে আব্দুর রহমান। আসাদের মাথাটা আজ প্রধানত দুটি কারণে ফুটন্ত কেটলির মতো গরম হয়ে আছে। প্রথমত, সে হেরেছে তাও একজন মেয়ের কাছে; আর দ্বিতীয়ত, চরম অপমানের মাঝেও সে কেন যেন সেই মেয়ের নীল চোখের অতল মায়ায় ক্রাশ খেয়ে বসে আছে।
জল ঢালতে ঢালতে আব্দুর রহমান বলল, “মাথায় আর পানি ঢাললে তোর এবার নির্ঘাত সর্দি-জ্বর লেগে যাবে, অ্যাসিড। পরে যদি খালাম্মা জানতে পারেন, তবে আমার পিঠের চামড়া আস্ত রাখবেন না।”
আসাদ চোখ বন্ধ করে কপালটা দুই আঙুলে টিপতে টিপতে ফুঁসে উঠল, “তোকে আমি নীলক্ষেতের সবচেয়ে বড়ো হোটেল থেকে চিংড়ির মালাইকারি আর রুই মাছের দোপিঁয়াজা খাওয়াব রেমি, তবুও তুই আমার ভেতরের আগুনটা ঠান্ডা কর। নাহলে ওই নীলপদ্মাকে আমার সামনে এনে দে, ওর অহংকার ভেঙে আমি রসমালাইয়ের মতো চিবিয়ে মুখে পুরি!”
আব্দুর রহমান ওর কথা শুনে মুখ টিপে হাসলেও নিজের সুহৃদসুলভ সেবা বন্ধ করল না। তোয়ালে দিয়ে আসাদের ভেজা চুলগুলো আলতো করে মুছে সে যখন সোফাটায় বসল, আসাদ হুট করেই রেমির কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। সোফার চওড়া হাতলের ওপর পা দুটো তুলে দিয়ে সে অনবরত অস্থির ভঙ্গিতে নাড়াতে লাগল।
তার কপালে তখনো চিন্তার ভাঁজ, “একটা মেয়ের কাছে আমি আসাদ চৌধুরি হেরে গেলাম? তাও আবার যাওয়ার আগে ভরা মজলিশে আমাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে গেল? ইশশ, ভাবলেই আমার মাথায় রক্ত চড়ে যাচ্ছে রে। তুই বোস রেমি, আমি বাথরুমে গিয়ে বরফ-শীতল জলে একটা দীর্ঘ শাওয়ার নিয়ে আসি।”
আব্দুর রহমান ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে স্বগতোক্তি করল, “বন্ধুর ইগোতে ভারী আঘাত করেছ তুমি, হে রহস্যময়ী ফুলকলী! দেখি আমার এই জেদি বন্ধু এবার কী চাল চালে।”
এই বলে সে ক্যাবিনেটের ওপর রাখা ফিলিপস টিভির রিমোটটা তুলে অন করল। বিটিভির পর্দায় তখন সান্ধ্যকালীন খবরের স্পেশাল বুলেটিন চলছে। গম্ভীর কণ্ঠে সংবাদ পাঠক জানালেন—বিখ্যাত হেলথ মিনিস্টার আবদুল্লাহ ইবনে জাবির দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন এবং তাকে নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তুমুল উন্মাদনা চলছে। খবরে আরও যুক্ত করা হলো যে, ওনার সহধর্মিণী সুদূর ইতালির মাটিতে দীর্ঘদিন ক্যানসারের সাথে লড়াই করে অবশেষে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
খবরটা শুনে রেমির মনটা ক্ষণিকের জন্য বিষণ্নতায় ভারী হয়ে উঠল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চ্যানেল বদলে আবার সেই দুপুরের কার র্যালির রেকর্ডিং ফুটেজটা দেখতে থাকল, যেখানে কালো আলফা রোমিওটা বাতাসের গতিতে ছুটে চলেছে।
আপাতত ঢাকার এই বিশাল ফ্ল্যাটে আসাদ আর তার ছোট ভাই ইসহাক দুজনে থাকে। আব্দুর রহমানকে আসাদ বহুবার অনুরোধ করেছে এই বাড়িতে এসে তাদের সাথে স্থায়ীভাবে থাকতে। দুজনের বিশ্ববিদ্যালয় এক, এমনকি একই বর্ষের ছাত্র; একসাথে যাতায়াত করতেও দারুণ সুবিধা হবে। কিন্তু আব্দুর রহমান অত্যন্ত আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ও ব্যক্তিত্ববান মানুষ। সে তার বন্ধুকে খুব বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলেছিল যে, লজিংয়ে থাকতে তার কোনো অসুবিধা হয় না। উলটো ওখানকার মধ্যবিত্ত পরিবারটি তাকে খুব স্নেহ করে এবং তাদের একমাত্র ছেলেকে পড়িয়ে সে যে সামান্য সম্মানী পায়, তাতেই তার ছাত্রজীবন বেশ কেটে যায়। আসাদও তাকে কখনো জোর করে টাকার অফার করেনি, কারণ সে জানত আব্দুর রহমানের প্রবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে আঘাত লাগলে এই অটুট বন্ধুত্বে ফাটল ধরতে পারে।
তারা দুজনেই বর্তমানে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আব্দুর রহমান মূলত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র, আর আসাদের বিষয় হলো আইন। দুই বন্ধুর ভেতরের আত্মিক টানটা কতটা গভীর, তা সাধারণ মানুষের পরিমাপ করার সাধ্য নেই। তবে আসাদের ওপর রেমির যত্নটা একটু অতিরিক্তই। বিশেষ করে আসাদ তো আব্দুর রহমানকে ছাড়া এক মুহূর্তও চলতে পারে না। বন্ধুর প্রতি ভালোবাসার দায়িত্ব তো আছেই, তার ওপর আসাদের মা আম্বিয়া জমাদ্দার নিজে রেমির হাত দুটো ধরে অনুরোধ করেছিলেন যেন ঢাকার এই পঙ্কিল শহরে সে আসাদের খেয়াল রাখে। আম্বিয়াকে রেমি নিজের মায়ের মতোই শ্রদ্ধা ও ভক্তি করে, ওনার হাতে খাবারও খেয়েছে। তাই যবে থেকে তারা উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পা রেখেছে, তবে থেকেই আসাদের ছায়াসঙ্গী সে।
কয়েকদিন পর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের লাল ইটের চত্বরে নতুন ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদের ওরিয়েন্টেশনের পর র্যাগিংয়ের আসর বসেছে।
”সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে যাও, এক এক করে! কোনো চালাকি নয়। এই যে মেয়ে, তোমার নাম কী শুনি?”
চওড়া কলারের শার্ট পরা সিনিয়র ছাত্র শাওন টেবিলের ওপর পা দুলিয়ে এক নবাগত তরুণীকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বলল। মেয়েটির চুলে দুটো বেণি করা, পরনে অতি সাধারণ এক সুতি সালোয়ার-কামিজ। সে ভয়ে চোখ দুটো নিচের দিকে নামিয়ে, কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে জড়তা নিয়ে বলল, “তি… তি… তিতা…”
শাওন ভ্রূ কুঁচকে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলে উঠল, “কী রে? তখন থেকে তি তি করছে কেন? ইটস সাউন্ডস লাইক আ হেন! তুমি কি মুরগি নাকি যে তি তি করছ?”
তার পাশেই টেবিলের ওপর আয়েশি ভঙ্গিতে বসে থাকা আব্দুর রহমান এবার চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠল, “আরে শাওন, ও তি তি বলেনি, তিতা বলেছে। তা মেয়ে, নিমের তিতা নাকি নিশিন্দার তিতা? যাই বলিস ভাই, নামটা কিন্তু বেশ ইউনিক, একদম অন্যরকম!”
টেবিলের ঠিক মাঝখানে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে বসে আছে আসাদ। এদিকে আব্দুর রহমানের রসবোধ আর রসিকতা শুনে শাওন হাহাহা করে হেসে উঠল, যার সাথে সুর মেলালো আশেপাশের বাকি সিনিয়র ছেলেরাও।
মেয়েটি এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, “তিতাস! তিতাস নাম আমার।”
”ওওও তিতাস! তা তিতাস হও আর পেছন মারা বাঁশ, আপাতত সোজা হয়ে লাইনে দাঁড়াও,” শাওন হাত উঁচিয়ে সামনের দিকে ইশারা করল। তারপর ভিড়ের মাঝখান থেকে এক কৃশাঙ্গ ফ্রেশার ছেলেকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি! ওই যে ধুতি-প্যান্ট পরা হিরো, তুমি এবার আমাদের সামনে চমৎকার একটা বিল্লু ড্যান্স করে দেখাও তো! ওই যে বিখ্যাত কাওয়ালি গানটা আছে না—
ও লাল মেরি পাত রাখিয়ো ভালা ঝুলে লালন,
সিন্ধড়ি দা সেবন দা সখী শাহবাজ কালান্দার
দমাদম মাস্ত কালান্দার, আলি দমদম দে অন্দর!
গানটা গাও আর কোমর দুলিয়ে নাচ শুরু করো, যাও বাচ্চা!”
শাওনের সেই হুকুমের পর আব্দুর রহমান মৃদু হেসে ওর পিঠে একটা হালকা চাপড় মেরে সায় দিল। যদিও রেমির এই নীতিবহির্ভূত র্যাগিং সংস্কৃতির মধ্যে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু অনেকটা বাধ্য হয়েই তাকে এই বিচারকের আসনে বসতে হয়েছে। কারণ আর কিছুই নয়, তার পরম বন্ধুই যে এই পুরো গ্যাংটার অলিখিত অধিনায়ক।
একে একে নতুন শিক্ষার্থীদের বিচিত্র সব দণ্ড দেওয়া হতে লাগল। কাউকে মেঝের ওপর ব্যাঙের মতো লাফিয়ে যেতে বলা হলো, কাউকে কান ধরে ওঠ-বোস করার নির্দেশ দেওয়া হলো, আবার কাউকে দেওয়া হলো একটা দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে পুরো কার্জন হলের চত্বর মেপে আসার এক অসম্ভব গুরুভার!
নবীন ছাত্রীদের ক্ষেত্রেও কোনো রেয়াত মিলল না। আসাদের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে রিতা নামের এক সিনিয়র মেয়ে বহুক্ষণ ধরে আসাদকে আড়চোখে দেখছিল। তার জমকালো সাটিনের শার্ট আর চুলে করা আধুনিক ব্যাক-কম্বিং বব কাট দেখেই স্পষ্ট বোঝা যায়, সে তৎকালীন ঢাকার কোনো এক অতি-ধনকুবেরের একমাত্র আদুরে কন্যা। সে হঠাৎ বেশ একটু অধিকার খাটানোর ভঙ্গিতে আসাদের কাঁধে হাত রাখল। তারপর লাইনে দাঁড়ানো এক ভয়ার্ত ছাত্রীকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “সো গার্লস, তুমি… হ্যাঁ তুমি! কী যেন নাম বললে, কাক না কাকুলি কিছু একটা হবে, এনিওয়ে! তুমি এবার এই বড়ো ঘরটায় কুড়ি বার চক্কর কেটে আসবে। আর প্রতিবার ঘোরার সময় জোরে জোরে বলবে, ‘রিতা আমাদের বস’। কী বলবে?”
কাকুলি নামের মেয়েটি ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় পুনরাবৃত্তি করল, “রিতা আমাদের বস।”
”এই তো সাবাস! আর কী শাস্তি দেওয়া যায় একে বলো তো, আশু ডার্লিং?” রিতা কাঁধে রাখা হাতটায় মৃদু চাপ দিয়ে আসাদের দিকে ঝুঁকে এল।
আসাদ এক ঝটকায় নিজের কাঁধ থেকে রিতার হাতটা সরিয়ে দিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “একটু দূরে গিয়ে কথা বলো, রিতা। নাহলে তোমার গায়ের গন্ধ নিয়ে যদি আমি কোনো রূঢ় মন্তব্য করি, সেটা বোধহয় তোমার মোটেও ভালো লাগবে না।”
রিতা আচমকা এই চরম অপমানে থতোমতো খেয়ে দু-কদম পিছিয়ে গেল। সে অবিন্যস্ত ভঙ্গিতে নিজের কব্জিটা নাকের কাছে এনে সুবাস নেওয়ার চেষ্টা করল। কই, কোনো গন্ধ তো নেই! সে এবার মুখ-চোখ কুঁচকে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলল, “হোয়াট ডু ইউ মিন বাই গন্ধ, আশু? প্যারিস থেকে আনা বিশ হাজার টাকার দামি শ্যানেল পারফিউমকে তুমি গন্ধ বলছ?”
”পারফিউমকে তো বলিনি, তোমাকে বলেছি,” আসাদ চোখের সানগ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে অত্যন্ত নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলল, “গায়ে-পড়া সস্তা মেয়েগুলোকে আমার বরাবরই দুর্গন্ধময় মনে হয়। আমি তো তাও তোমাকে একটু ভদ্রতা দেখিয়ে শুধু ‘গন্ধ’ বলেছি।”
অপমানে রিতার ফরসা মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘরের অন্য কোণে চলে গেল। আসাদ চরিত্রগতভাবেই এমন, কাউকে কখনো নিজের বৃত্তের ভেতরে পা রাখতে দেয় না।
ঠিক এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই, করিডোরের বড়ো জানালার ওপারে হঠাৎ একটি পরিচিত অবয়ব আসাদের নজরে এল। এক পলক দেখেই তার হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে তড়িৎ গতিতে সামনের টেবিলের ওপর থেকে নেমে দাঁড়াল। মাথাটা সামান্য এদিক-ওদিক হেলিয়ে জানালার কাচের আড়াল থেকে ওপাশের মানুষটিকে আর একবার নিখুঁতভাবে দেখতে চাইল সে।
হ্যাঁ, ওটা কৌশিকাই! সে করিডোর ধরে দরজার দিকেই এগিয়ে আসছে। সে একা নয়, গম্ভীর ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে আসছে লম্বা-চওড়া বডিগার্ড টাইপের দুজন বিদেশি সুঠাম দেহের মানুষের সাথে। সম্ভবত তারা তার পারিবারিক নিরাপত্তা কর্মী।
আজ কৌশিকার পরনে ছিল একটা নিখুঁত নেভি-ব্লু রঙের ডাবল ব্রেস্টেড ব্লেজার, তার নিচে হাই-নেক সাদা কটন টপ এবং স্ট্রেইট-ফিট ট্রাউজার্স। পায়ে চামড়ার ইতালিয়ান লোফার জুতো। হালকা ব্রাউন চুলগুলো পিঠের ওপর উন্মুক্ত।
তাকে দেখামাত্রই আসাদের ঠোঁটের কোণে অনিয়ন্ত্রিত হাসির রেখা ফুটে উঠল। মেয়েটা কেন এতখানি অপার্থিব সুন্দর! কেন তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়ার কোনো সাধ্য এই পৃথিবীর আলোর নেই? আসাদ অবশ হয়ে একবার ঢোক গিলল। কিন্তু ঠিক তার পরের মুহূর্তেই তার পুরুষালি অহংকারে সেই দিনের দুপুরের রেসলাইনের পরাজয়ের দগদগে ক্ষতটা মনে পড়ে গেল। সে কপাল কুঁচকে, নিজের কপালে শক্ত করে বাঁধা রুমালটা এক টানে খুলে হাতে নিল। তারপর দুই আঙুলের দ্বারা তুড়ি মেরে দরজার দিকে ইশারা করে কিছুটা চড়া গলায় ডাকল, “ওই বিদেশিনি!”
তার এই অতর্কিত ও গম্ভীর ডাক শুনে ঘরের ভেতরের পুরো আড্ডাটা এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই চরম বিস্ময়ে দরজার দিকে তাকাল। কৌশিকাও গার্ডদের সাথে কথা বলা থামিয়ে মুখ ফেরাল। দুজনের চারটে চোখ যখন আবার মুখোমুখি হলো, তারা দুজনেই কয়েকমিলিসেকেন্ডের জন্য একে অপরের চোখের গভীরে স্তব্ধ হয়ে রইল। ঘরের বাকি ছেলেরা কৌশিকাকে এই প্রথম এত কাছ থেকে দেখে হা করে তাকিয়ে রইল। তবে ব্যতিক্রম শুধু একজন—আব্দুর রহমান। সে কৌশিকার ওই মায়াবী চোখের দিকে তাকানো তো দূরের কথা, সংযত ভঙ্গিতে নিজের চোখ জোড়া নিচের মেঝের দিকেই নামিয়ে রাখল।
আসাদ কয়েক সেকেন্ড পর নিজের ভেতরের মোহগ্রস্ততা কাটিয়ে উঠে কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে বলল, “এদিকে এসো!”
কৌশিকা শান্ত চোখে আসাদের দিকে তাকাল। তারপর বাইরের সেই দুই গার্ডকে হাত উঁচিয়ে কিছু একটা ইশারা করতেই তারা মাথা ঝুঁকিয়ে করিডোরের শেষ প্রান্তে চলে গেল। কৌশিকা ছন্দোময় পায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। আসাদের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে নিজের দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে বাঁধল।
আসাদ তাকে জুতো থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করে নিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “ফার্স্ট ইয়ার?”
কৌশিকা কোনো মৌখিক উত্তর দিল না, কেবল তার চিবুকটা সামান্য ওপরে তুলে নীরব রইল। এই নীরবতায় আসাদের ইগোতে আবারও আঘাত লাগল। সে নিজের কণ্ঠস্বর আরও কিছুটা কঠোর করে আদেশের সুরে বলল, “গো অ্যান্ড জয়েন দ্য লাইন।”
কৌশিকা তার ভ্রূ জোড়া সামান্য কুঁচকে প্রশ্ন করল, “আর ইউ গাইজ র্যাগিং?”
আসাদ ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফিরিয়ে এনে এক কদম এগিয়ে বলল, “বাহ! বেশ বুদ্ধিমতী মেয়ে তো দেখছি!”
আসাদ আরও দুই কদম এগিয়ে এসে সরাসরি কৌশিকার মুখোমুখি দাঁড়াল। সুগঠিত ও দীর্ঘ একুশের আসাদ লম্বায় ছ-ফিট ছাড়িয়ে গেছে, এদিকে কৌশিকাও প্রায় পাঁচ ফিট ছয় ইঞ্চির এক দীর্ঘাঙ্গী অবয়ব। আসাদ তার এভিয়েটর চশমাটা এক আঙুলে সামান্য নাচিয়ে, বেশ একটা দম্ভের ভাব নিয়ে বলল, “এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের রীতিনীতি আর ভদ্রতা শেখানো হচ্ছে বিদেশিনি, তোমাকেও শেখানো হবে। সে তুমি যতই রূপবতীইইই… যাই হোক, যাও, লাইনে গিয়ে দাঁড়াও।”
আসাদকে এভাবে কৌশিকার এত কাছাকাছি এবং মগ্ন হতে দেখে রিতা ঈর্ষায় ও অপমানে ভেতরে ভেতরে জ্বলতে লাগল। সে নাটকীয় ভঙ্গিতে পা ঠুকে হুট করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এই আশায় যে, আসাদ অন্তত তাকে আটকানোর জন্য হলেও একবার নোটিশ করবে। কিন্তু আসাদ তো দূরে থাক, ঘরের বাকি ছেলেদের কেউ তার চলে যাওয়ার দিকে ফিরেও তাকাল না; সবার চোখ তখন কৌশিকার ওই স্ফটিকের মতো নীল চোখের জাদুতে অবশ হয়ে আছে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আব্দুর রহমান এবার টেবিল থেকে নেমে এগিয়ে এল। সে আসাদের চওড়া কাঁধে একটা হাত রেখে শান্ত গলায় বলল, “ছাড় না মেয়েটাকে। ও হয়ত বিদেশ থেকে এখানে উচ্চশিক্ষা নিতে এসেছে। প্রথম দিনেই জুনিয়রদের সামনে দেশের সংস্কৃতি নিয়ে ভুল বার্তা দেওয়ার কি দরকার? তাছাড়া মেয়েটা একদম নতুন, ক্যাম্পাসটা একটু চেনা হোক ওর, নিয়মকানুনের পাঠ পরে দিলেও চলবে।”
আসাদ রেমির দিকে না ফিরেই ভ্রূ কুঁচকে বলল, “লাইনে যারা দাঁড়িয়ে আছে, ওরাও তো নতুন। ওরা যদি নিয়মের মধ্যে আসতে পারে, তবে ও কেন বাদ যাবে?”
কৌশিকা তার হাতঘড়িটার দিকে এক পলক চেয়ে বলল, “আই অ্যাম ইন দ্য সেকেন্ড ইয়ার।”
কথাটা বলেই সে করিডোর বেয়ে চলে গেল। তার এই অপ্রত্যাশিত উত্তর, নিখুঁত আত্মবিশ্বাস আর ঔদ্ধত্য দেখে আসাদ যেন আবারও এক ধাক্কায় তার রূপের গোলকধাঁধায় আছাড় খেল। তার বাম ভ্রূটা আপনাতেই কিঞ্চিৎ ওপরে উঠে গেল।
সন্ধ্যা নামার পর পড়ার ঘরে আসাদ মনোযোগ দিয়ে একটা ভারী ডেস্কটপ কম্পিউটারে কাজ করছিল। ওদিকে আব্দুর রহমান তখন আসাদের ছোট ভাই ইসহাকের সাথে নানারকম খুনসুটি আর হাসাহাসিতে ব্যস্ত। আসাদকে সেই কখন থেকে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ডাকা হচ্ছে, কিন্তু কাজের অজুহাতে সে টেবিল ছেড়ে উঠছেই না।
ধৈর্যের বাঁধ ভাঙায় আব্দুর রহমান এবার এগিয়ে এসে আসাদের মনিটরের মেইন সুইচটা অফ করে দিল। সে কোমরে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে বলল, “যা কাজ করার, আগে পেটপুজো করে তারপর করবি। দ্রুত উঠে হাত-মুখ ধুয়ে আয়।”
আসাদ কিবোর্ড থেকে হাত সরিয়ে কপাল কুঁচকে বলল, “আরে ভাই, এই আইনি ড্রাফটটা তৈরি করা খুব জরুরি। সর তো, পরে খেয়ে নেব।”
“বললাম না আগে খেয়ে নিবি, তারপর কাজ! নাহলে তোর এই কম্পিউটারের তার আজ আমি আর অন হতেই দেব না,” রেমি বেশ কড়া গলায় ধমক দিল, “এমনিতেও তো কাজের কাজ কিছু পারিস না, একটু পরে ঠিকই তো ‘রেমি রেমি’ করে চিৎকার করবি যে, ভাই এই অ্যাসাইনমেন্টটা একটু গুছিয়ে দে! তোকে কে আইন নিয়ে পড়তে বলেছিল রে, গা জ্বালানো অ্যাসিড?”
আসাদ এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটা দুষ্টুমিভরা হাসি হাসল। “তুই এক কাজ কর না, আমাকে বিয়েই করে নে! মানে সত্যিকারের বউরাও তো স্বামীর এত যত্ন নেয় না, আর এত চিৎকার-চেঁচামেচি করে বকেও না।”
রেমি তৎক্ষণাৎ নাক সিটকে, মুখ বিকৃত করে বলল, “ছিঃ! তোকে বিয়ে? আমার রুচি ও পছন্দ এতটাও নিচে নামেনি, বুঝলি?”
“ওই! কী বললি তুই?” আসাদ চোখ পাকিয়ে তাকাল।
“ঠিকই বলেছি,” রেমি পকেট থেকে কয়েকটা খোসাছাড়ানো চিনা বাদাম মুখে ফেলে চিবাতে চিবাতে হাসিমুখে বলল, “এবার খালাম্মাকে একটা লম্বা চিঠি লিখব যে, তোমার ছেলে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া তো করেই না, এমনকি সময়মতো গোসলও করতে চায় না। গা থেকে এমন দুর্গন্ধ আসে বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো মেয়ে ওর ধারেকাছে ঘেঁষে না, আর সেই দুঃখেই ওর বিয়েটাও হচ্ছে না।”
“খালাম্মার চামচা! দাঁড়া তুই, দেখাচ্ছি মজা!” আসাদ চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগেই আব্দুর রহমান বাদাম চিবাতে চিবাতে হাহাহা করে হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আসাদ আর আব্দুর রহমানের বন্ধুত্বের রসায়নটা এতটাই নিবিড় ছিল যে, যে কেউ দেখলে রসিকতা করে এদের জামাই-বউয়ের সুমধুর ঝগড়া বলত। কারণ এই দাপুটে আসাদ বাইরের দুনিয়ায় যতই প্রভাবশালী লিডার হোক না কেন, ঘরের ভেতরে সে নিজের কোনো কাজই ঠিকঠাক করতে পারত না। প্রতিটি ছোটোখাটো বিষয়ে তার এই শান্ত বন্ধুটির সাহায্য লাগত, এমনকি নিজের দাড়ি কাটার আফটারশেভ লোশনটা খুঁজে পেতেও।
অনুরূপ একটা ঘটনা ঘটেছিল গত সপ্তাহে। আসাদের একটা পছন্দের খাদি শার্টের ওপরের বোতামটা হুট করে ছিঁড়ে গিয়েছিল। সে শার্টটা হাতে নিয়ে বড্ড করুণ মুখে রেমির ঘরে গিয়ে বলেছিল, “বন্ধু, আমার এই প্রিয় শার্টটা বোধহয় এবার বাতিলই করে দিতে হবে।”
রেমি বই থেকে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করেছিল, “কেন রে? কী হলো আবার?”
“আরে দেখ, এর মাঝখানের প্রধান বোতামটাই ছিঁড়ে গেছে।”
“তো সুচ-সুতো দিয়ে লাগিয়ে নে না! ওহ, ভুলেই তো গিয়েছিলাম, আমার বন্ধুটি তো রূপে রূপবতী হলেও গুণে আকাম্মাবতী। চল, আমিই লাগিয়ে দিচ্ছি। কই, শার্টটা নিয়ে আয়।”
আসাদ তখন শার্টটা হাতে নিয়ে এক চিলতে দুষ্টুমি বুদ্ধি এঁটে বলেছিল, “এক কাজ করি রেমি, আমি শার্টটা গায়ে দেই। তারপর তুই নায়িকা সাবানার মতো আমার বুকের কাছে দাঁড়িয়ে, আমার গায়ে থাকা অবস্থাতেই বোতামটা সেলাই করে দিবি। কেমন?”
রেমি সুঁইয়ে সুতো পরাতে পরাতে চোখ বাঁকা করে বলেছিল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, তারপর তুমি হিরোর মতো আবেগে গদগদ হয়ে আমার কপালে একটা চুমু খাবে, তাই তো?”
“ওটা তো তোকে আমি এখনই দিতে পারি!” বলেই আসাদ এক ঝটকায় রেমির ঘাড়টা টেনে ধরে ওর মাথার ঠিক মাঝখানে সশব্দে একটা গভীর চুমু খেয়ে বসল।
“ছিঃ ছিঃ! এই গিদোড়টা আমাকে একেবারে অপবিত্র করে দিল রে!” রেমি চরম বিরক্তি ও ন্যক্কার ভঙ্গি করে নিজের মাথাটা হাত দিয়ে ডলতে লাগল, “আজ রাতে আমাকে অন্তত পাঁচবার কসকো সাবান দিয়ে গোসল করতে হবে।”
তার এই করুণ ও বিকৃত মুখভঙ্গি দেখে আসাদ সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে হাসতে হাসতে প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়ল, আর রেমি সত্যিই গজগজ করতে করতে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল।
দিন সাতেক পর! বিকেলের তপ্ত রোদমাখা পিচঢালা রাস্তায় আসাদ তার সিক্সটি-ফাইভ সিসির হোন্ডা বাইকটি স্টার্ট দিয়ে সবেমাত্র গতি বাড়িয়েছিল, এমন সময় তার পথ আগলে দাঁড়াল একটা পরিচিত জিপ। আসাদ ভ্রূ কুঁচকে, পরম বিস্ময়ে ব্রেক কষে বাইক থামাল। মাঝরাস্তায় টায়ারের কালো দাগ বসে গেল।
সে বাইকের হ্যান্ডেল ধরে অবিন্যস্ত চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “কী রে ভাই? এভাবে কেউ চলন্ত বাইকের পথ আটকায়? আরেকটু হলেই তো সোজা ওপরে চলে যেতাম!”
জিপের দরজা খুলে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এল আব্দুর রহমান। তার হাতে আসাদের ফেলে যাওয়া হেলমেট। সে গম্ভীর মুখে এগিয়ে এসে বলল, “ওপরে তুই এমনিতেও যেতিস, যদি এই হেলমেটটা মাথায় না চড়িয়ে এমন ঝড়ের গতিতে বাইক ছোটাস।”
আসাদ এক গাল হেসে রেমির হাত থেকে হেলমেটটা ছিনিয়ে নিয়ে রসিকতার সুরে বলল, “ওহ হো, তাই তো! আমি মরলে তো আবার তুই অকালে বিধবা হয়ে যাবি! দে দে, হেলমেটটা এবার দে।”
“শালা! এবার আর তোকে সহজে ছাড়ছি না,” রেমি হাতটা সরিয়ে নিয়ে ছদ্ম-ক্রোধ দেখাল।
আসাদ শব্দ করে হেসে হেলমেটটা মাথায় গলিয়ে বেল্টটা আটকাতে আটকাতে বলল, “বিশ্বাস কর রেমি, তুই যদি মেয়ে হতিস না, তবে তোকে আমি গুন্ডা দিয়ে কিডন্যাপ করিয়ে সোজা কাজী অফিসে নিয়ে বিয়ে করে ফেলতাম।”
রেমি চরম বিরক্তিতে চোখ কপালে তুলে বলল, “তোর এসব আজগুবি কথার জন্য ঢাকার মানুষ একদিন আমার পুরুষত্ব নিয়ে সন্দেহ করবে! নাহ, তোর সাথে আর বেশি মেশা যাবে না, তাহলে কপালে আমার আর সুশীল বউ জুটবে না।”
“আরে ব্যাটা, তুই টেনশনই নিস না! তোকে আমি আমার অনাগত বাচ্চার একমাত্র লিগ্যাল শ্বশুর বানাব, একদম পাকা কথা,” আসাদ বাইকের এক্সিলারেটরে হালকা মোচড় দিয়ে চোখ মারল।
রেমি এবার আসাদের চওড়া কাঁধে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, “আগে নিজে একটা বিয়ে তো কর, আসন্ন বাচ্চার নাজায়েজ বাপ!”
“হু, এবার পেছনে এসে বোস তো। তোকে নিয়ে আজ বুড়িগঙ্গার পাড়ে একটা লম্বা লং ড্রাইভে যাব। আমি এতদিনে একটা ব্যাপার বুঝলাম রেমি, তোর এই অতিরিক্ত কেয়ারিংয়ের জন্যই ঢাকার কোনো রূপসি মেয়ে আমার আর মনে ধরছে না!”
রেমি আর আপত্তি না করে আসাদের পেছনে চেপে বসল। বাইকটি তখন ফাঁকা রাস্তায় তীব্র গতিতে ছুটতে শুরু করেছে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের মধ্যে দিয়ে রেমি বলল, “তো তুই কী বলতে চাস শুনি? আমার সাথে বন্ধুত্ব ভাঙলে তোর কপালে ডানাকাটা পরী জুটবে? ঢাকার মেয়েদের সুরুচি এতটাও খারাপ না! আমি পরম বন্ধু বলেই তোকে আজীবন সহ্য করে গেলাম!”
আসাদ আয়নায় রেমির মুখের দিকে তাকিয়ে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। সে বাইকের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এক কাজ কর না ভাই, তুই বরং কোনো কবিরাজি ওষুধ খেয়ে মেয়ে হয়ে যা! আমি তোকে একদম রাজকন্যার মতো করে ঘরে রাখব, দেখিস।”
“এই অ্যাসিডের বাচ্চা অ্যাসিড, তুই এখনই বাইক থামা! শালা ইতর কোথাকার!”
সেদিন কার্জন হলের সেই উত্তপ্ত ও বিশৃঙ্খল র্যাগিংয়ের আসরে যতগুলো ছেলেকে দেখেছিল, তাদের সবার মাঝে কৌশিকার চোখ শুধু একজনকেই আলাদাভাবে নোটিশ করেছিল, সে হলো আব্দুর রহমান। তার শান্ত, মার্জিত চাহনি আর বাকিদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রুচিবোধ কৌশিকাকে আলাদা কৌতূহলে ফেলেছিল।
কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় ঢাকা একটা কাঠের বেঞ্চে বসে একাগ্র চিত্তে নিজের ডায়েরিতে কী যেন লিখছিল আব্দুর রহমান। ঠিক তখনই তার পেছন থেকে একটা সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আপনি কি কোনো রাইটার?”
আব্দুর রহমান কিছুটা চমকে উঠে লেখা থামাল। সে পেছনে ফিরে তাকাতেই তার চোখের চশমাটা আলগা হয়ে এল। সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং কৌশিকা! সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একবার নিজের ডায়েরির দিকে আর একবার আশেপাশের শূন্য চত্বরের দিকে তাকাল। সে ব্যতীত কেউ-ই নেই আপাতত! তারপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিনয়ী হাসি ফুটিয়ে বলল, “নাহ… তেমন কিছু নই। মাঝেমধ্যে নিজের মনের খেয়ালে একটু-আধটু লেখালেখি করি আর কি।”
কৌশিকা এক কদম এগিয়ে এসে তার ডায়েরির খোলা পাতার দিকে নির্দেশ করে বলল, “কোনো উপন্যাস লিখছেন বুঝি? ইজ ইট পসিবল টু রিড? আমি আসলে খুব বেশিই নোভেল পড়তে পছন্দ করি। ইটস মাই প্যাশন।”
“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। কোনো অসুবিধা নেই,” রেমি সৌজন্য দেখিয়ে ডায়েরিটা কৌশিকার বাড়িয়ে দেওয়া ফরসা হাতের ওপর তুলে দিল।
কৌশিকা যখন মনোযোগ দিয়ে পাতাগুলো ওল্টাচ্ছিল, রেমি তখন কিছুটা আড়ষ্ট ভঙ্গিতে অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে রাখল। এই প্রথম কোনো আধুনিক তরুণী এভাবে নিজ থেকে এসে তার লেখা উপন্যাস পড়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে! সে কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি তবে এত সুন্দর বাংলা বলতেও জানেন?”
কৌশিকা ডায়েরি থেকে চোখ না তুলেই এক চিলতে চমৎকার হাসি উপহার দিল, “বাঙালি মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছি মিস্টার, বাংলা বলতে পারব না কেন? আমার বাবা তো এই দেশেরই হেলথ মিনিস্টার আব্দুল্লাহ ইবনে জাবির!”
তার মুখে এই প্রভাবশালী নামটি শুনে রেমির চোখ জোড়া এবার বিস্ময়ে বড়ো বড়ো হয়ে গেল, “কী বলেন, মিস! ওনার কন্যা আপনি? হায়হায়! এত বড়ো মাপের একজন ব্যক্তিত্বের মানুষকে আমরা সেদিন র্যাগ দিতে যাচ্ছিলাম? কপাল ভালো, নাহলে তো নির্ঘাত বড়োসড়ো আইনি কেস খেয়ে যেতাম!”
কৌশিকা শব্দ করে আলতো হাসল। তবে তার নীল চোখের মণি দুটো তখনো রেমির লেখার ওপর নিবদ্ধ। সে গম্ভীর গলায় বলল, “আপনার লেখার হাত কিন্তু অসম্ভব সুন্দর। বিশেষ করে প্লটটা ভীষণ ম্যাচিউরড। আপনার ডায়েরির এই লাইনটা আমার মনকে খুব গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে…”
সে আঙুল দিয়ে একটি নির্দিষ্ট লাইনের ওপর হাত রেখে পড়তে লাগল, “অ্যাট দ্য এন্ড অব দ্য ডে, এভরি হিউম্যান বিইং ইজ সেলফিশ। আর যারা এই স্বার্থপরতার গণ্ডির বাইরে গিয়ে সবাইকে অহেতুক আপন করতে চায়, এই নিষ্ঠুর দুনিয়া তাদেরকে বড্ড সস্তা ভাবে। কারণ তারা সবার মাঝেই নিজের কমফোর্ট জোন খুঁজে বেড়ায়, যার আসলে কোনো বাস্তব ভ্যালু নেই।”
আব্দুর রহমান তার নিজের লেখা লাইনটি কৌশিকার মুখে শুনে একটা তৃপ্তির মুচকি হাসি হাসল।
কৌশিকা ডায়েরিটা বন্ধ করে রেমির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, “আপনি অনেক বাস্তবিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখেন, যা এই আমলের সাধারণ রোমান্টিক গল্পের চেয়ে অনেক আলাদা। এটা বেশ ভালো। আপনি কি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারও লেখেন?”
“হ্যাঁ, কিছুটা চেষ্টা করি আর কি।”
“তা এই যে গভীর লাইনগুলো আপনি লিখেছেন… এগুলো কি নিজের কোনো বিশেষ প্রেমিকার উদ্দেশ্যে লেখা, নাকি কাল্পনিক?”
“কোনটা?” আব্দুর রহমান কৌতূহলী হয়ে সামান্য এগিয়ে এল।
কৌশিকা রেমির উৎসুক দৃষ্টির জবাবে ডায়েরির পেছনের পাতার একটি পরিচ্ছেদ নির্দেশ করে গম্ভীর কণ্ঠে আবৃত্তি করতে লাগল, “তোমাকে ভালোবাসার সৌভাগ্য ঘটিয়াছিল বটে, কিন্তু তোমাকে পাইবার ভাগ্য এই ললাটে লিখা ছিল না। আজ এই নিভৃত দুপুরে অনুধাবন করিলাম, নিয়তি মানুষকে কতখানি নিষ্ঠুর খেলায় অবতীর্ণ করাইতে পারে। আমি নিয়ত ভাবিয়াছিলাম তুমি কেবল আমারই হইবে, এই নশ্বর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়াইয়া রাখিব। কিন্তু কঠোর বাস্তবতা এই যে, তুমি ছিলে কেবল আমার নিশীথ স্বপ্নের মায়া, আমার ওষ্ঠাধরের ক্ষণিক হাসির গুপ্ত কারণ, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম এক অলব্ধ উপহার; অথচ সেই মহামূল্যবান উপহারটিকে করতলগত করিবার অধিকার আল্লাহ আমাকে দেন নাই।
ভালোবাসার ন্যায় এক অমূল্য অনুভূতির সন্ধান আমি পাইয়াছি সত্য, কিন্তু সেই অনুভূতির মধুর সমাপ্তি এই জীবনে ঘটিয়া উঠিল না। হয়ত পরমেশ্বরের ইচ্ছাই এমন ছিল যে তুমি আমার হইবে না, অথচ তোমাকে ভালোবাসিবার অমোঘ সৌভাগ্যটুকু কেবল আমারই ভাগ্যলিপিতে খোদাই করিয়া দিলেন। তুমি আমার বলয়ে থাকো কিংবা সুদূরে, আমার অন্তরের অন্তস্তলে তুমি অবিনশ্বর হইয়া রহিবে। কারণ ভালোবাসা তো কেবল অধিকার বা প্রাপ্তির নামান্তর নহে; ভালোবাসা মানে হইল কোনো এক আত্মাকে নিঃস্বার্থভাবে চিরকালের তরে হৃদয়ে ধারণ করা। হয়ত এই সংসারে আমি কোনোদিন তোমার আপনজন বলিয়া গণ্য হইব না, কিন্তু আমার চিত্তে তুমি চিরস্থায়ী আসন পাতিয়াছ। তোমাকে ভালোবাসার এই অতল অনুভূতিটুকুই আমার জীবনের মহত্তম সঞ্চয়, আর এই অক্ষয় স্মৃতি সম্বল করিয়াই আমি বাঁচিয়া থাকিব আজীবন!”
এত চমৎকার সুমিষ্ট আর স্পষ্ট আবৃত্তি শুনে আব্দুর রহমান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে চশমার ফ্রেমটা নাকের ওপর ঠিক করল। সে হালকা মাথা নাড়িয়ে এক গাল হেসে বলল, “আরে, না না! এসব প্রেম-পিরিতির ঝামেলা থেকে আমি শত হাত দূরে থাকি। আমার ওই একটা বন্ধু আছে, সেই আমার চব্বিশ ঘণ্টার শান্তি হরণের জন্য যথেষ্ট। ওসব সামলাতেই আমার দিন পার হয়ে যায়।”
কৌশিকা বোধ হয় বুঝতে পারল আব্দুর রহমান এখানে কার কথা ইঙ্গিত করেছে। তবে সে চট করে নিজের ভাব লুকাতে অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে বেঞ্চের ওপর বসল। চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “আমরা কিন্তু চাইলে একে অপরকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করতে পারি। আফটার অল, আমরা একই শিক্ষাবর্ষের স্টুডেন্ট, সো উই আর ক্লাসমেটস।”
“বাহ! আমার মানবতার ফেরিওয়ালা বন্ধুটি দেখছি আজকাল তার সমস্ত মানবতা কেবল মেয়েদের ক্ষেত্রেই বিলিয়ে বেড়াচ্ছে! তাও আবার এমন রূপসি মেয়েদের ক্ষেত্রে!”
রেমি ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, আসাদ পকেটে দুই হাত গুঁজে, চোখে সেই এভিয়েটর চশমা ঝুলিয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হেঁটে আসছে।
“তাতে আপনার বুঝি খুব সমস্যা হচ্ছে, মিস্টার?” কৌশিকা ডায়েরিটা রেমির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আসাদের ওপর স্থির করল।
আসাদ এগিয়ে এসে কৌশিকার পাশে এক পা বেঞ্চের ওপর তুলে দিয়ে, একটু ঝুঁকে এসে ঠোঁটের কোণে চতুর হাসি ফুটিয়ে বলল, “খুব সমস্যা হচ্ছে, ম্যাম। কারণ আমার এই অদ্বিতীয় বন্ধুটি আমাকে ছেড়ে এখন তোমাকে বেশি সময় দিচ্ছে, আর এই ভাগাভাগিটা আমার ঠিক সহ্য হচ্ছে না।”
কৌশিকা তার ব্লেজারের কলারটা সামান্য ঠিক করে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। “ইউ আর অ্যাড্রেসিং মি অ্যাজ ‘তুমি’! হোয়াই? আই ডোন্ট থিংক আই গেভ ইউ দ্যাট পারমিশন।”
“পারমিশন?” আসাদ সানগ্লাসটা নাকের ডগায় নামিয়ে ভ্রূ নাচিয়ে বলল, “পারমিশন জিনিসটা আবার কী? আমি আবার কারও পারমিশন-টারমিশনের তোয়াক্কা করি না, ম্যাম। তবে তুমি এত সুন্দর ও খাঁটি বাংলা বলতে পারো দেখে বেশ ভালো লাগল।”
“কেন? আমাকে দেখে কি কোনো ব্রিটিশ বা ইংরেজদের বংশধর মনে হয় আপনার?”
“টু বি অনেস্ট, আসলেও মনে হয়।”
“আমি ওইসব ছেলেদের প্রচণ্ড অপছন্দ করি, যারা যেচে এসে মেয়েদের সাথে কথা বলতে চায়। ইটস সো অ্যানোয়িং!” কৌশিকা বিরক্তি প্রকাশ করে মুখ ফিরিয়ে নিল।
“আচ্ছা? তার মানে কি আপনি মনে মনে আমাকে পছন্দ করতে চাচ্ছেন? আর সেই খাতিরেই কি আমাকে এই ফ্রি অ্যাডভাইসগুলো দিচ্ছেন, মিস আনতারা কৌশিকা?”
“ওহ, ড্যাম ইট!” কৌশিকা চরম বিরক্তিতে নিজের হ্যান্ড ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে, শরীর বাঁকিয়ে দ্রুত পায়ে করিডোর বেয়ে চলে গেল।
আসাদ প্রশান্তির হাসি ঝুলিয়ে পিছন থেকে রেমির কাঁধের ওপর থুতনি ঠেকিয়ে কৌশিকার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। রেমি অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলল, “তুই মেয়েটাকে বারবার ক্ষ্যাপাচ্ছিস কেন বল তো? ও তো তোকে কিছু বলেনি।”
“কেবল ওকেই তো ক্ষ্যাপাতে ইচ্ছে করে, রেমি,” আসাদ সরে দাঁড়িয়ে তার চশমাটা শার্টের কলারে গুঁজে দিয়ে বলল, “ওর ওই কিউট কিউট মুখের সুইট সুইট রাগটা যখন দেখতে পাই, তখন ভেতরের সব ক্লান্তি এক নিমেষে দূর হয়ে যায়।”
আব্দুর রহমান এবার ডায়েরিটা বগলে চেপে ধরে আসাদের চোখের দিকে খুব খুঁটিয়ে তাকাল। “অথচ আমি কিন্তু এখানে অন্য কিছুর গন্ধ পাচ্ছি, বন্ধু।”
আসাদ ভ্রূ কুঁচকে রেমির গালটা হালকা টেনে দিয়ে বলল, “তুই আবার কীসের গন্ধ পাচ্ছিস, আমার নাজায়েজ বউ?”
“আবার ওই বউ শব্দটা মুখে আনলি?” রেমি চোখ পাকাল।
“আরে মুখ ফসকে সত্যি কথা বেরিয়ে গেছে রে ভাই, বউ নয়, বন্ধু বন্ধু! এবার বল, কী দেখলি তুই?”
“এই যেমন তুই বাইরে যেটা প্রকাশ করতে চাচ্ছিস না, অথচ তোর চোখ দুটোতে পরিষ্কার দেখাচ্ছে। সোজা বাংলায় বলতে গেলে, তোদের মাঝে খুব জলদিই গভীর একটা প্রেম প্রেম ব্যাপার হতে চলেছে।”
রেমি কথাটি বলা মাত্রই আসাদ চরম নাটকীয় ভঙ্গিতে মুখ বিকৃত করে মাটিতে থুতু ফেলার অভিনয় করল। সে দুই হাত দিয়ে বাতাস ওড়ানোর ভঙ্গি করে বলল, “ওয়াক থু! তোর এই অলক্ষুনে কথা শোনার পর আমার এখনই ডেটল দিয়ে কুলি করা ফরজ হয়ে গেছে! আর এক সেকেন্ড দাঁড়ালে মনে হয় পেটের সব খাবার এক্সপ্রেস গতিতে বাইরে চলে আসবে। ইয়া আল্লাহ, ওর পাপিষ্ঠ মুখটার ভেতর যেন ডাস্টবিনে বড়ো হওয়া এক ঝাঁক মাছি এসে দল বেঁধে হিশু করে দিয়ে যায়! আর বোনাস হিসেবে দু-চারটা মাছি যেন ওর নিশ্বাসের গন্ধে বেহুঁশ হয়ে মুখেই পড়ে থাকে!”
Tell me who I am 2 part 21 (3)
এই বলেই আসাদ আর এক সেকেন্ড না দাঁড়িয়ে নিজের গাম্ভীর্য আড়াল করতে হন্তদন্ত হয়ে সামনের দিকে হেঁটে চলে গেল। আর আব্দুর রহমান তার বন্ধুর এই কৃত্রিম রাগের আড়ালের আসল সত্যটা বুঝতে পেরে পেছনের বেঞ্চে বসে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।
