Tell me who I am 2 part 17 (2)
আয়সা ইসলাম মনি
পারস্য উপসাগরের উত্তাল ঢেউ চিরে ইব্রাহিমের সেই দানবীয় কার্গো জাহাজটি তখন আন্তর্জাতিক জলসীমার দিকে ধাবমান। জেহের মাঝরাস্তায় একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আইইডি বি*স্ফোরণ ঘটিয়ে এসেছে, যাতে কারানদের অনুসরণ করার পথ রুদ্ধ হয় এবং তারা যেন সেই আগুনের কুণ্ডলীতেই ভস্মীভূত হয়। কিন্তু এই নির্বোধ জানে না যে, কারান চৌধুরি অনেক আগেই তার গাড়ির অন-বোর্ড কমপিউটার হ্যাক করে জিপিএস সিগন্যাল কবজা করে নিয়েছে। আর তাছাড়া কারানদের নির্মূল করা সাধারণ কোনো দস্যু দলের সাধ্যের অতীত। জেহের জাহাজে আরোহণ করেই ইব্রাহিমকে উদ্ভূত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠল, কিন্তু ইব্রাহিম তার স্বভাবজাত গাম্ভীর্য দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করল যে, সে যা ভাবছে সবই মিথ্যা।
কারান ও ফারহান জাহাজের পশ্চাৎভাগের নোঙরের বিশাল শিকল বেয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে ডেকে উঠে এলো। তাদের পরনে ব্ল্যাক ট্যাকটিক্যাল গিয়ার, চোখে ফোর্থ-জেনারেশন নাইট-ভিশন গগ্ল্স। তারা দুজনে নিঃশব্দে মেন ডেকের দিকে এগিয়ে চলল।
কারান তার সিগ সয়ার পিস্তলটি শক্ত করে ধরে ফারহানের দিকে ইশারা করল। ফারহান ট্যাবে জাহাজের সম্পূর্ণ সার্ভাইল্যান্স সিস্টেম হ্যাক করে ক্যামেরার ফুটেজগুলো লুপে ফেলে দিয়েছে। তারা যখন জাহাজের বিশাল হলঘরে প্রবেশ করল, তখন সেখানে শয়তানি উৎসব আর উৎকট উল্লাসের পরিবেশ। তারা হলঘরের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছাতেই চারদিকের ফ্লাডলাইটগুলো সশব্দে জ্বলে উঠল।
ইব্রাহিম তার হাতে থাকা ভ্যাপ এর ঘন ধোঁয়া নাসারন্ধ্র দিয়ে নির্গত করতে করতে অট্টহাসি দিয়ে উঠল, “ওয়েলকাম ওয়েলকাম, মিস্টার কারান চৌধুরি! আমি জানতাম তুমি ঠিকই এই নরকের প্রবেশদ্বার খুঁজে পাবে। কিন্তু এতটা আর্লি চলে আসবে, সেটা ভাবিনি। রিয়েলি ইমপ্রেসিভ!”
তার পাশেই জেহের এক কোণে বসে বিদ্রুপের হাসি হাসছে, তার ক্ষ’তবিক্ষ’ত পায়ে তাজা ব্যান্ডেজ জড়িয়ে রাখা।
কারানের প্রখর নেত্রপল্লব তখন ইব্রাহিমের দিকে নয়, বরং হলের এক নিভৃত কোণে নিষ্ঠুরভাবে শিকলবদ্ধ আয়লার ওপর নিবদ্ধ। আয়লার এই বিধ্বস্ত অবস্থা অবলোকন করে কারানের হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। আয়লার ন’গ্ন পায়ে ভারী লোহার বেড়ি, পরনে কেবল সেই প্রৌঢ় চিকিৎসকের র*ক্তমাখা পশমি কোটটি কোনোমতে জড়িয়ে রাখা। তার শ্যামবর্ণা ত্বকের বিভিন্ন স্থানে কালশিটে দাগ স্পষ্ট, কপাল দিয়ে গড়িয়ে পড়া র*ক্ত গালে শুকিয়ে জমাট বেঁধে আছে। আমিরা নূর পাশবিক উল্লাসে আয়লার কেশরাশি সজোরে মুষ্টিবদ্ধ করে, তার মাথাটি পেছনের দিকে টেনে ধরেছে। আয়লাকে দেখে এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে এক আহত সিংহী, যাকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে কেবল বশ্যতা স্বীকার করানোর জন্য।
ফারহানের চোয়াল ইস্পাতের ন্যায় শক্ত হয়ে এলো, তার হাত রিভলভারের ট্রিগারে কাঁপছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে অবদমিত আক্রোশে ফিসফিস করে উঠল, “আয়লার শরীরের প্রতিটি আঘাতের হিসেব আমি কড়ায়-গন্ডায় উসুল করব। তোদের মতো পিশাচদের অস্তিত্ব আজ এমনভাবে মুছে দেব যে নরকেও জায়গা পাবি না। ইউ ব্লা’ডি পি’স অফ শি*ট!”
আয়লা ঝাপসা ও র*ক্তাভ নেত্রে কারানকে দেখামাত্রই তার শুষ্ক ও র*ক্তাক্ত ওষ্ঠাধরের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে পরম নির্ভরতায় আওড়ালো, “আমি জানতাম তুমি আসবে, আমার মুনলাইট। এতটা বিলম্ব কেন করলে? আমি যে তোমার আগমনের প্রতীক্ষায় এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করে বসে আছি। এবার এই পিশাচগুলোকে বুঝিয়ে দাও, কারান চৌধুরি কেন অজেয়, কেন সে অনন্য।”
আয়লা ইচ্ছে করলেই লড়তে পারত, কিন্তু এই বিশাল সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে একা লড়াই করা মানেই ছিল নিশ্চিত মৃ*ত্যু। সে জানত, তাকে বেঁচে থাকতে হবে কারানের মাস্টার প্ল্যান সফল করার জন্য। তাই সে নিঃশব্দে সব অত্যাচার সয়ে গেছে কেবল এই ক্ষণটির জন্য।
আমিরা নূর আয়লার মাথা আরও সজোরে ঝাঁকিয়ে কারানের দিকে তাকিয়ে বিষাক্ত ভঙ্গিতে বলল, “ওহ কারান ডার্লিং, লুক অ্যাট দিস! তোমার এই প্রেশাস গোল্ড এখন পোষ্য কু*ত্তার মতো আমার পায়ে কাছে বন্দি। তবে তোমাকে যখন বিনাশ করব, সেটা ওর চেয়েও অনেক বেশি জঘন্য আর পৈশাচিক রোমান্টিক হবে, আই প্রমিজ!”
ইব্রাহিম তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে কারানের দিকে এগিয়ে এলো। “নিজেকে খুব চালাক ভেবেছিলে, তাই না?”
বলতে বলতে একদম কারানের মুখের সামনে চলে এলো। কণ্ঠস্বর আরও গাম্ভীর্যপূর্ণ করে পুনরায় বলল, “হার্ড ড্রাইভটা কোথায়?”
কারান কোনো বাচনিক উত্তর প্রদান করল না, তার সমস্ত সত্তা এবং ফোকাস কেবল আয়লার ওপর নিবদ্ধ। কারানের এই অগ্নিগর্ভ ও স্থির চাহনি দেখে ইব্রাহিম ক্রুদ্ধভাবে ফোঁস করে উঠল, “বলবে নাকি তোমার এই সুন্দরীর অন্তিম বিদায়ে আমি আমার সিগ সয়ার দিয়ে সই করব?”
ফারহান ট্যাকটিক্যাল পজিশন গ্রহণ করে কারানের দিকে আড়চোখে দৃষ্টিপাত করল। সে জানে, কারান যখন এই মাত্রায় শান্ত থাকে, তখন তার মানে হলো এক প্রলয়ংকরী ধ্বংসের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে।
নূর আয়লাকে সজোরে ঝটকা মেরে শীতল মেঝেতে ছুঁড়ে দিয়ে পার্শ্ববর্তী এক গার্ডকে ইশারা করতেই, সে একটি ইলেক্ট্রনিক সিগারেট প্রজ্বলিত করে নূরের হাতে দিল। নূর সেই তামাকের বিষাক্ত ধোঁয়া ফুসফুসে টেনে নিতে নিতে অত্যন্ত লাস্যময়ী ভঙ্গিতে কারানের দিকে এগিয়ে এলো। কারানের দিকে নূরের এই কুরুচিপূর্ণ ও লোলুপ চাহনি দেখে আয়লার চক্ষুদ্বয় ক্রোধে র’ক্তিম হয়ে উঠল। কারানের মধ্যেও অস্বস্তি জাগলেও সে নিজেকে হিমশীতল গাম্ভীর্যে স্থিতধী রাখল।
নূর একদম কারানের সান্নিধ্যে চলে এলো, গ্রীবাদেশ সামান্য কাত করে কারানকে একটা এক্সপেন্সিভ আর্টের মতো পরখ করতে লাগল। সিগারেটের ঘন ও ধূসর ধোঁয়া সে সরাসরি তার মুখের দিকে প্রক্ষেপণ করল। কারান সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ধোঁয়ার মধ্য দিয়েই নূরের চোখের মণি বরাবর তপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কারানের এই অবদমিত আগ্নেয়গিরির ন্যায় রাগ দেখে নূর সম্ভবত আরও মানসিক তৃপ্তি পাচ্ছিল। এক রসালো ও বিকৃত হাসি দিয়ে নূর বলতে শুরু করল, “আই হ্যাভ সিন মেনি মেন ইন মাই লাইফ, কারান। কিন্তু কারান চৌধুরি বোধ হয় এক পিসই—লিমিটেড এডিশন! সো হট, সো ড্যাশিং, আ টোটাল সে’ক্সি ম্যান। বাংলাদেশের মাটিতে এত প্রিমিয়াম আর এক্সপেন্সিভ জিনিস জন্মে জানলে আমি অনেক আগেই সেখানে হামলে পড়তাম।”
এই বলে নূর তার তর্জনী তুলে কারানের সুগঠিত গাল স্পর্শ করতে উদ্যত হলো, কিন্তু তার আগেই কারান অত্যন্ত অবজ্ঞার সাথে গ্রীবাদেশ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। কারানের এই শীতল প্রত্যাখ্যান নূরকে আরও বেশি সম্মোহিত করল। নূর তার কুটিল ঠোঁট বাঁকিয়ে রহস্যময় হাসি দিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকালো; সেখানে আয়লার তাজা র*ক্ত লেগে আছে। সে সেই র*ক্ত সুনিপুণভাবে আঙুলে তুলে নিজের নখে নেলপলিশের ন্যায় লেপন করতে লাগল। এরপর সেখানে একটি ফুঁ দিয়ে অত্যন্ত নির্লজ্জের মতো বলল, ”সুযোগ পেলে কি কোনো ড্রাইভার তার গাড়ি পার্ক না করে ফিরে যায়?”
”ড্রাইভার ফিরে যায় না ঠিকই, কিন্তু গাড়িটা যদি আমার মতো হাই-পারফরম্যান্স আর লাক্সারি হয়, তবে সে রাস্তার ধারের কোনো সস্তা পাবলিক গ্যারেজে পার্ক করার রিস্ক নেয় না। প্রবলেমটা হলো তোমার ওই গ্যারেজের লক বড্ড লুজ। আমার ক্লাস হ্যান্ডেল করার মতো সিকিউরিটি বা স্ট্যান্ডার্ড তোমার নেই। সো, কিপ ড্রিমিং!”
কথাগুলো কারান নূরের চোখের দিকে না তাকিয়েই উচ্চারণ করল। কারানের মুখে নিজের চরিত্র নিয়ে এমন সস্তা ও জঘন্য অপমান শুনে রাগে নূরের ফরসা মুখমণ্ডল র’ক্তিম বর্ণ ধারণ করল। সে দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করতে থাকল। হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটি হুট করেই কারানের মুখ লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল। কারান অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় মাথা সরিয়ে নিলেও সিগারেটের অগ্রভাগ তার গ্রীবাদেশের স্পর্শকাতর চামড়ায় লেগে পোড়া কালচে দাগ সৃষ্টি করল। কিন্তু এই অসহ্য যন্ত্রণাতেও কারানের চোয়ালের পেশিও এক চুল নড়ল না।
ওদিকে কারানের প্রতি নূরের এই অসভ্যতা দেখে আয়লা এবার আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে সামনে ছোটার জন্য উন্মত্তের ন্যায় ছটফট করতে লাগল। কিন্তু চরণে পরিহিত লৌহশৃঙ্খলের বাঁধনে তার সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। আয়লা আক্রোশে চিৎকার করে উঠল, “ওই শালি চো*দমা*রানি, তুই আমার সাথে লাগতে আয়! একবার জাস্ট এই শিকলটা খুলে দে, তোর শরীর থেকে মাংস ছিঁড়ে আমি সমুদ্রের শার্কদের ডিনার করাবো, মা*দারফা*কিং বা*স্টার্ড!”
আয়লার এই হিতাহিতজ্ঞানশূন্য ছটফটানি দেখে নূর বুঝতে পারল যে আয়লা কারানকে ঠিক কতটা পজেসিভলি ভালোবাসে। এবার নূরের কুৎসিত হাসিটি আরও প্রশস্ত হলো। আয়লাকে মানসিক যন্ত্রণায় দগ্ধ করার হীন উদ্দেশ্যে সে এবার কারানের গলার ওই দগ্ধ অংশটির দিকে নেশাতুর নেত্রে তাকালো। সে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচিয়ে সেখানে ওষ্ঠাধর স্পর্শ করতে যাবে, তার ঠিক এক মিলিমিটার আগেই কারান এত সজোরে এক চপেটাঘাত করল যে নূর ছিটকে গিয়ে জাহাজের মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। নিকটস্থ একটি লৌহনির্মিত ভালভে লেগে তার চিবুকের এক পাশ কেটে ফিনকি দিয়ে র*ক্ত বেরিয়ে এলো। নূর যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে এপাশ-ওপাশ গড়াগড়ি খেতে লাগল।
কারান এবার বজ্রকণ্ঠে বলল, “তোমার ভাগ্য ভালো যে তুমি একজন নারী হয়ে জন্মেছ।”
কারানের সেই প্রচণ্ড চপেটাঘাতে নূর যখন মেঝেতে পর্যুদস্ত, সেই ক্ষণিক বিশৃঙ্খলাকে আয়লা এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করল। কিছুক্ষণ আগে নূর যখন আয়লার চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাচ্ছিল, তখন আয়লা অত্যন্ত নিপুণ চুরির কৌশলে নূরের কোমর থেকে একটি ক্ষুদ্র চাবির গোছা সরিয়ে নিয়েছিল, যা কারানের তীক্ষ্ণ নজরেও এড়ায়নি। আয়লা যে কেবল সাহসী নয়, বরং একজন হাই-ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভ, তার প্রমাণ সে আবারও দিল।
আয়লা তার র*ক্তমাখা আঙুলের কম্পন রোধ করে লকিং মেকানিজমের ছিদ্রে চাবিটি প্রবেশ করাল। এক মৃদু মেকানিক্যাল ক্লিক শব্দে পনেরো কেজি ওজনের সেই ভারি শৃঙ্খল তার পা থেকে খসে পড়ল। এক আহত বাঘিনির ন্যায় হুংকার দিয়ে আয়লা দৌড়ে এসে নূরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। নূরও আত্মরক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা করল; সে আয়লার চুলের মুঠি ধরে সজোরে টান দিতেই আয়লা এক হ্যাঁচকা ঝটকায় নূরের কবজিটি উলটো দিকে মোচড় দিয়ে মট করে ভেঙে ফেলল।
“আমার চাঁদের দিকে নজর দিয়েছিস তুই, হা*রামজাদি? তোর ভাগ্য ভালো তুই আমার সামনে আছিস, মিরার সামনে নয়। নাহলে কারানকে টাচ করতে যাওয়ার অপরাধে সে তোর কলিজা ছিঁ’ড়ে মমি বানিয়ে রাখত। বাট ইটস ওকে, এখন তোমাকে আমি আয়লার স্পেশাল টর্চার গেম দেখাবো, সোনামণি!”
এই বলেই বীভৎস ও বক্র হাসি দিয়ে নূরের চুলের মুঠি ধরে সে মেঝের সেই তীক্ষ্ণ লৌহদণ্ডের ওপর তার মাথা সজোরে আঘাত করতে থাকল। ধাতব দণ্ডের সাথে করোটির সংঘর্ষে বিশ্রী শব্দের সৃষ্টি হলো; নূরের আকাশফাঁটা আর্তনাদ মুহূর্তেই অবরুদ্ধ গোঙানিতে রূপ নিল। আয়লা থামল না; তার ধমনিতে তখন প্রতিশোধের লেলিহান শিখা। সে নূরের সেই জ্বলন্ত ইলেকট্রনিক সিগারেটটি তুলে নিয়ে নূরের চোখের মণি বরাবর সজোরে চেপে ধরল। উত্তপ্ত ফিলামেন্টের দহনে নূর গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল।
মরিয়া হয়ে নূরও তার শেষ শক্তি সঞ্চয় করে উঠে দাঁড়াল, এবং আয়লার গালে এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত করার কারণে আয়লা নীচে ছিটকে পড়লো। এরপর নূর তার পায়ের পয়েন্টেড স্টিলেটো হিলের তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ আয়লার বুকের ক্লিভেজের ওপর সজোরে চেপে ধরল। হিলের চাপে আয়লার বুকের ত্বক বিদীর্ণ হয়ে লোহিত র*ক্ত ধারা উপচে পড়ল। আয়লা ব্যথায় ককিয়ে উঠলেও হার মানল না; সে নিজের দুই হাত দিয়ে হিলের শক্ত অংশটি আঁকড়ে ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল। নূরের ভারসাম্য চ্যুত হতেই সে সশব্দে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। আয়লা আশেপাশে দ্রুত দৃষ্টিপাত করে একটি ভাঙা ডেক-চেয়ার দেখতে পেল। সেটির একটি তীক্ষ্ণ কাঠের পায়া উপড়ে নিয়ে সে বিদ্যুৎবেগে নূরের গ্রীবাদেশের কণ্ঠনালির প্রধান ধমনি বিদীর্ণ করে দিল। আমিরা নূরের পৈশাচিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল বীভৎস র*ক্তস্রোতে।
কিন্তু আয়লার অ্যাড্রেনালিন প্রবাহ তখনো শান্ত হয়নি। সে বারবার সেই পায়াটি দিয়ে নূরের মুখমণ্ডল এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে আ’ঘাত করতে থাকল, যতক্ষণ না তার চিত্তের দহন প্রশমিত হলো। আয়লার পরিহিত সাদা কোটটি এবং তার অবয়ব তখন নূরের ছিটকে আসা র*ক্তে কর্দমাক্ত।
আয়লা এক হাঁটু গেঁথে বসে নূরের সেই বীভৎস ও বিকৃত দেহটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার চোখের মণি হিরোশিমার আগুনের মতো জ্বলছে। সে নূরের নিথর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে অত্যন্ত হিমশীতল স্বরে বলল, ”এখানে চারদিকে এতগুলো পুরুষ না থাকলে তোকে মা’রার যে বীভৎস আর বিকৃত ফ্যান্টাসি আমার মস্তিষ্কে খেলা করছিল, সেটা আমি অন্যভাবে পূর্ণ করতাম। তোকে হুট করে মে’রে ফেলে তো দয়া করলাম রে, মা*গি! আমার ইচ্ছে ছিল তোর শরীরের চামড়াগুলো জীবন্ত অবস্থায় ইঞ্চি ইঞ্চি করে ছিলে নোনা জলে চুবিয়ে রাখি। ওই যে স্ত*ন আর যৌ*না*ঙ্গ নিয়ে তোর এত দেমাক ছিল, ওগুলো একটা একটা করে কেটে তোর চোখের সামনেই সমুদ্রের হাঙরদের খাওয়াতাম। তোকে এই ম’রণ-যন্ত্রণার স্বাদ তিল তিল করে দিতাম, যেন তুই প্রতি সেকেন্ডে আজরাইলের কাছে নিজের জান ভিক্ষা চাইতিস। নাহলে এত সহজ আর পিসফুল মৃ*ত্যু তো আমি আমার পরম বন্ধুকেও উপহার দিতাম না!”
আয়লা নূরের লা*শের ওপর একবার ঘৃণাভরে থুতু নিক্ষেপ করে উঠে দাঁড়াল।
ওদিকে ফারহান আর কারান তখন ঘাতক বাহিনীর দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফারহান তার বেরেটা থেকে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করতে করতে চিৎকার করল, “কারান, তুই ইব্রাহিমকে ইন্টারসেপ্ট কর! এই জা’র’জগুলোকে জাহান্নামে পাঠানোর টিকিট আমি কাটছি!”
ঠিক তখনই একটি নাইন-এমএম বুলেট ফারহানের বাম ঊরুর হাড়ের পাশ দিয়ে মাংসপেশি ভেদ করে বেরিয়ে গেল। ফারহান আর্তনাদ করে হাঁটু গেঁথে বসে পড়লেও তার ট্রিগার চাপা থামল না। সে দাঁতে দাঁত চেপে অবদমিত আক্রোশে বলে উঠল, “কত্ত বড়ো কলিজা তোর ব্যাটা! ওটা সার্জিক্যালি কেটে বের না করে দেখলে তো আমার পেটের ভাত হজম হবে না, শালা ডি*কহে*ড।”
ফারহানের ব্ল্যাক প্যান্থারের ন্যায় হিংস্র চাহনি দেখে সেই গার্ডটি ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। হাত থেকে বন্দুকটি মেঝেতে পড়ে যেতেই লোকটা জীবনের ভিক্ষা চেয়ে চাইনিজ ভাষায় বিড়বিড় করতে থাকল। ফারহান র*ক্তমাখা হাত দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে এগোতে এগোতে বলল, “এমনিতেই তোর উপর মেজাজ চরম লেভেলে গরম, তুই আবার এই চিংচ্যাং ফু বলা শুরু করছোস! তোর এই চাইনিজ ল্যাংগুয়েজ আমার মাথার ৪০ ফুট উপর দিয়ে ফ্লাই করে চলে যাচ্ছে। আহো ভাতিজা আহো, তোমারে ওয়ান টু তে খালাস করে দিমু!”
এই বলেই ফারহান তার ওপর ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। পেছন থেকে তার হাত দুটি একত্রে মুচড়ে ধরে পিঠের সাথে চেপে ধরলো। এরপর তার গলায় নিজের বলিষ্ঠ বাহু প্যাঁচিয়ে এক ঝটকায় ঘাড় মচকে দিতেই লোকটা নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ল। ফারহান তার মুদ্রা দোষ অনুযায়ী হাতের উলটো পিঠ দিয়ে নাকের ডগা মুছল, যদিও সেখানে কিছুই লেগে নেই।
কারান তখন বাকি ভাড়াটে সেনাদের এক এক করে যমপুরীতে পাঠাচ্ছে। কারান আর ফারহানের জ্যাকেটের অভ্যন্তরে উচ্চমানের কেভলার বুলেট প্রুফ ভেস্ট থাকায় শত্রুর অধিকাংশ গুলি তাদের স্পর্শ করতে পারছে না।
ইব্রাহিম আর জেহের যখন দেখল তাদের এই দুর্ভেদ্য ভাসমান দুর্গ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে, তারা বুঝল এখানে অবস্থান করা মানেই নিশ্চিত মৃ*ত্যু। তারা অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে হলের সিক্রেট লিফট ব্যবহার করে জাহাজের উপরিভাগের হেলিপ্যাডের দিকে ধাবিত হলো। ফারহান দূর থেকে লক্ষ্য করল তারা পলায়নপর। সে তীব্র যন্ত্রণা সত্ত্বেও ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে কারানের দিকে সংকেত দিল।
“কারান! ওই বা*স্টার্ডরা হেলিকপ্টারে টেক-অফ করছে!”
ফারহান শরীরের সমস্ত সুপ্ত শক্তি সঞ্চয় করে দৌড়ে গিয়ে হেলিকপ্টারের ল্যান্ডিং গিয়ারের লৌহ কাঠামোটি মর’ণপণ শক্তিতে আঁকড়ে ধরল। হেলিকপটারটি তখন প্রপেলার ঘুরিয়ে শূন্যে ডানা মেলছে, সাথে ঝুলে আছে এক অদম্য যোদ্ধা।
কারান ও আয়লা ক্ষণিকের জন্য স্থির হয়ে একে অপরের চোখের মণি বরাবর দৃষ্টি বিনিময় করল। কারান তার ট্যাকটিক্যাল কমিউনিকেটর সক্রিয় করে এমেকাকে চূড়ান্ত নির্দেশ প্রদান করল, “এমেকা, জাহাজের কমান্ড এখন তোমার হাতে! বন্দিনী মেয়েগুলোকে জলদি অ্যান্টিডোট দাও, আর ওদের সেফলি ট্র্যান্সফার করো। আমি, ফারহান আর আয়লা ওই জা’নো’য়ারদের ফাইনাল এক্সিট নিশ্চিত করেই ফিরছি!”
কারান আর আয়লা এক রুদ্ধশ্বাস অলৌকিক লাফ দিয়ে হেলিকপ্টারের ঝুলন্ত দড়ির সিঁড়িটি আঁকড়ে ধরল। হেলিকপটারটি তখন পারস্য উপসাগরের উত্তাল ও কৃষ্ণবর্ণের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ঝড়ের বেগে উচ্চতা বৃদ্ধি করছে। হেলিকপটারটি শূন্যে উড্ডয়নরত অবস্থাতেই কারান ও আয়লা অমানুষিক শারীরিক কসরতে সিঁড়ি বেয়ে অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ল। ককপিটের ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে জেহের তখন উন্মাদের মতো পাইলটের আসনে বসে কন্ট্রোল স্টিক সামলাচ্ছে।
হেলিকপ্টারের সেই অত্যন্ত সংকীর্ণ মূল কাঠামোতে শুরু হলো এক বীভৎস ও ম’রণপণ মল্লযুদ্ধ। ইব্রাহিম কারানের উদর লক্ষ্য করে সজোরে এক পদাঘাত করতেই কারান তার পা ধরে বিপরীতে মুচড়ে দিল, এবং ইব্রাহিমের মাথাটি হেলিকপ্টারের প্লেক্সিগ্লাস জানালার ওপর সজোরে আছড়ে ফেলল। ওদিকে আয়লা তার সম্পূর্ণ মাসল মেমোরি ব্যবহার করে জেহেরের গ্রীবাদেশের ভ্যাজাস নার্ভে সজোরে আঘাত হেনে তাকে চালকের আসন থেকে বিচ্যুত করার প্রাণপণ চেষ্টা চালাল। জেহের তার কনুই দিয়ে আয়লার ইতোমধ্যে আহত ও র*ক্তাক্ত মাথায় পুনরায় আঘা’ত হানল, কিন্তু আয়লা তখন অপরাজেয়। ঠিক সেই মুহূর্তে ফারহান ল্যান্ডিং গিয়ার থেকে ঝুলে থাকা অবস্থাতেই অত্যন্ত ঝুঁকির সাথে ভেতরে প্রবেশ করল, এবং পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে জেহেরের ঊরুতে বুলেট বিদ্ধ করল।
Tell me who I am 2 part 17
জেহের ব্যথায় নারকীয় চিৎকার করে হেলিকপ্টারের নিয়ন্ত্রণ দণ্ডটি সজোরে একপাশে টেনে ধরল। মল্লযুদ্ধের এই বিশৃঙ্খল পর্যায়ে ইব্রাহিমের লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে হেলিকপ্টারের প্রধান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাটি ক্ষতিগ্রস্ত হলো। হেলিকপটারটি ভারসাম্য হারিয়ে এক ঘূর্ণায়মান লাটিমের মতো মাঝ আকাশে বনবন করে ঘুরতে শুরু করল। ইঞ্জিনের টারবাইন থেকে তখন আগুনের শিখা আর কালো ধোঁয়া নির্গত হতে শুরু করেছে। মৃ*ত্যু অবধারিত জেনেও ইব্রাহিম আর কারান তখন একে অপরের কণ্ঠনালি টিপে ধরে অন্তিম সংঘর্ষে লিপ্ত।
হঠাৎ এক প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণ টানে হেলিকপটারটি দিগভ্রান্ত হয়ে সমুদ্রের বক্ষে জেগে থাকা একটা রুক্ষ ও পাথুরে দ্বীপের বালুকাবেলায় সজোরে আছড়ে পড়ল। আগুনের গোল্লা আর ধ্বংসাবশেষ নিয়ে হেলিকপটারটি চুরমার হয়ে গেল।
