Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯২

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯২

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯২
নূরজাহান আক্তার আলো

বিভীষিকাময় দীর্ঘ এক রাতের অবসান ঘটিয়ে প্রকৃতিতে নতুন ভোরের সূচনা হলো। পুর্বাকাশ ছড়াল সূর্যের নরম আলো। কলরবে মেতে উঠল চড়ুই পাখির দল। তারা মনের সুখে ডালে-ডালে, নেচে-নেচে, উড়ে-ঘুরে বেড়াতে লাগল। আকাশে ভাসছে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘমালা। বইছে মৃদুমন্দ বাতাস। রাতের বৃষ্টিতে ভিজে আছে বাগানের মাটি। কোথাও কোথাও জমেছে বৃষ্টির জল। গাছের পাতাগুলোকে সজীব লাগছে। যেন তাদের সকল ক্লান্তি, গ্লানি ধুয়ে মুছে গেছে। পেয়েছে নতুন এক জীবন। ফজরের আজানের পর চৌধুরী বাড়ির সদস্যদের চোখে ঘুম নেমেছে। কামরান, হাসান, স্যান্ডি, আজম, অর্ক চৌধুরী নিবাসেই থেকে গেছে। ছেলেগুলো দেশে ফিরে একদন্ড বিশ্রাম নিতে পারে নি। পরিস্থিতি এমন যে খাওয়ার কথা বলতেও মাথায় আসে নি। এভাবে আরো কিছুক্ষণ সময় গড়ালো। রোদের তাপ বাড়ল। দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী শহরবাসী লেগে পড়েছে যার যার কর্মে। ঘড়ির কাঁটাও টিকটিক করে চলতে চলতে ঘন্টার ঘরে স্থির হলো। ঘড়িতে যখন সকাল সাড়ে সাত টা তখন হঠাৎ সিতারার ঘুম ভেঙে গেল। উনি ধীরে ধীরে চোখ মেলে দেখলেন ড্রয়িংরুমের মেঝেতে বসে আছেন। উনার কোলের উপর সায়ন ঘুমিয়ে আছে। সায়নের বাম পায়ের কাছে কখন এসে শুয়েছে রুবাব, শখ, স্বর্ণ আর ঐশ্বর্য। গতরাতে কেউই রুমে গিয়ে ঘুমায় নি সব কটা ড্রয়িংরুমে বসেছিল। বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত চোখে ঘুম নেমে এসেছে। ঘুমের চোটে যে যেখানে পেরেছে শরীর এলিয়ে দিয়েছে। সবার দিকে নজর ঘুরাতেই শুদ্ধর সঙ্গে এবার চোখাচোখি হলো। ছেলেটা আধশোয়া হয়ে সোফায় বসে আছে। হয়তো শাওয়ার নিয়েছে। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। উনাকে জাগতে দেখে শুদ্ধই আগে মুখ খুলল,

_’ এভাবে শুয়ে বসে থাকলে ঘাড়ব্যথা করবে। ওদেরকে উঠিয়ে যার যার রুমে পাঠিয়ে দাও।’
_’হুম।’
_’সকাল আটটায় ভাইয়ার মেডিসিন আছে।’
_’নাস্তা বানাতে দেরি লাগবে না। ঝটপট..! ‘
_’ আমি বাইরে থেকে নাস্তা আনিয়েছি।’
_’ওমা বাইরে থেকে কেন?’
_’তোমার শরীরটাও তো ভালো নেই, আজ নাহয় রেস্ট নাও।’
_’ হুম, তা তোমার বাবা কি রুমে?’
_’না, বাগানের দিকে গেল।’
_’ওহ।’
_’বাকিরা এখানে ঘুমালেও স্বর্ণকে রুমে পাঠাও নি কেন? ওর কি এখন এভাবে চললে হবে? নিজের সচেতনতা নিজের কাছে।’
_’কেন, কিছু হয়েছে?’
_’হয় নি তবে হতে কতক্ষণ? আমি নিচে এসে দেখি তোমার গুনধর
ছেলে স্বর্ণের পেটের উপর পা তুলে ঘুমিয়ে আছে। মুখে বলতে হবে না ঘুমের ভঙ্গি দেখেই স্পষ্ট উনি শীতলের বড় ভাই।’

অনেকদিন পর শুদ্ধকে এভাবে কথা বলতে দেখে সিতারা মৃদু হাসলেন।
চোখ ঘুরিয়ে সব কটার দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলেন। সায়নের মাথায় হাত বুলিয়ে ছেলের কপাল বরাবর চুমু খেলেন। উনার চোখের পানি সায়নের মুখের উপর পড়তেই সায়ন চোখ মেলে তাকাল। ঘুমঘুম কন্ঠে কিছু একটা বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু সিতারা ঠেলেঠুলে সব কটাকে ডেকে যার যার রুমে পাঠিয়ে দিলেন। এভাবে শুলে ঘাড় ব্যথা করবে। কারোই ঠিকঠাকভাবে ঘুম পুরো হয় নি দেখে কেউ কথা বাড়ল না, হেলেদুলে যে যার বরাদ্দকৃত রুমে চলে গেল। সিতারা উঠে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। একটু পরে সিমিন, সিতারা এসে কাজে হাত লাগালেন। এদিকে সবাই চলে গেলেও সায়ন চুপ করে বসে আছে। সে একা উঠতে পারে না। ধরে ধরে হাঁটাতে হয়। পায়ে খুব একটা শক্তি পায় না। সকালবেলা খালি পেটে গা গুলিয়ে উঠতেই স্বর্ণ রুমের দিকে দৌড় দিলো। পেছন থেকে শুদ্ধ সাবধানে যাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিলো।
আশেপাশে কাউকে না দেখে সায়ন এবার শুদ্ধর দিকে তাকাল। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

_’রুমে যাব।’
_’ সিঁড়ি দিয়ে উঠে হাতের বাম পাশের রুম।’
_’ নিয়ে চল।’
_’পারব না।’
_’ ভারি বেয়াদব হয়েছিস তো?’
_’ধন্যবাদ।’
শুদ্ধকে ত্যাড়ামি করতে দেখে সায়ন ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে রইল। বুঝল কোনো কারণে রেগে আছে তার উপর। তাই গলার স্বর নরম করে বলল,
_’বড় ভাইকে সাহায্য করলে জীবনে সফলতা আসে।’
_’ আমার জীবনে সফলতা, বিফলতা, কঠোরতা, মাধুরতা সব আছে আর লাগবে না।’
সায়ন নিজেও জানে শুদ্ধর সাথে তর্কে পারবে না তাই অন্য চাল খাটাল।
বেশ মায়া মায়া সুরে বলল,

_’ছোটোবেলায় তুই আমার আইসক্রিম খেয়ে নিতি তবুও কখনো তোকে কিছু বলি নি।’
_’তাহলে আজ বলছো কেন?’
_’বলছি,,বলছি কারণ সেদিনের আইসক্রিমের বিনিময়ে আজকে কিছু চাই।’
_’ সরি, খুচরো টাকা নাই, পাশের বাড়ি দেখুন।’
টাকার কথা শুনে সায়ন হাতের কাছে থাকা কুশনটা ছুড়ে মারল। শুদ্ধও
সেটা চমৎকারভাবে ক্যাচ করে ফেলল। তখন সায়ন ওর কনিষ্ঠ আঙুল উঁচিয়ে দেখাল অর্থাৎ ওয়াশরুমে যাবে। তবুও উঠল না শুদ্ধ। ত্যাড়ামি করে বসেই রইল। তখন সায়ন অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানাল শুদ্ধর কথায় রাজি। এবার শুদ্ধ এগিয়ে এসে সায়নকে দাঁড় করিয়ে পেছনে ঘুরে দাঁড়াল। তখন সায়ন বলল,

_’ আমি কি বাচ্ছা নাকি? ব্যথা পাবি।’
_’ভাইয়ের কাছে ভাইকে ভারী লাগে নাকি? কই জানতাম না তো?’
একথা শুনে সায়ন হাসল। তার চোখজোড়ায় খুশিরা নৃত্য করে উঠল।
লাফ মেরে শুদ্ধর পিঠে উঠতে গিয়ে ব্যথাতুর শব্দ করে উঠল। ভাইকে ছটফট করতে দেখে শুদ্ধ বিরক্ত নিয়ে একবার তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। সায়ন তাকেও পিঠে করে কত ঘুরিয়েছে। বড় হয়েও সে কতবার পিঠে উঠেছে। এমনও হয়েছে শুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে সায়ন কোথা থেকে দৌড়ে এসে পিঠে উঠেছে। শুদ্ধ কখনো তাল সামলাতে পেরেছে কখনো বা দুজন হুরমুর করে পড়েছে। আহা,কি সুন্দর ছিল সেসব দিন।
আগের কথাগুলোই ভাবছিল সায়ন হঠাৎ মাঝসিঁড়িতে শুদ্ধ তাকে ছেড়ে
গেলে চিৎকার করে উঠল। ভয়ে শুদ্ধর গলা জাপটে ধরে একমনে গালি দিতে লাগল। সায়নের চেঁচানো শুনে সিতারা, সিমিন, সিরাত ছুটে এসে ওদের কান্ডে হেসে ফেললেন। মিছিমিছি শুদ্ধকে বকলেন। শুদ্ধ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না, ভাইকে নিয়ে রুমে চলে গেল। ওদের যেতে দেখে উনারাও কাজে লেগে পড়লেন। কতদিন পর আবারও খুনশুটির দেখা মিলল। মনে প্রাণে দোয়া করতে লাগলেন এই খুনশুটি যেন অটুট থাকে। তারপর শুদ্ধ সায়নকে রুমে পৌঁছে দিয়ে পা বাড়াতে যাবে তখন সায়ন ডেকে উঠল,

_’ভাই!’
কতদিন পর সুমধুর ডাক শুনে শুদ্ধর পা জোড়া থেমে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তখন সায়ন মাথা নিচু করে বলল,
_’ভালো থাকার অভিনয়ে বরাবরই তুই সেরা। কিন্তু আমি তো পারি না। আমি বোনের কাছে যাব।’
_’সুস্থ হও।’
_’ আমি সুস্থ আছি, চল ভাই। কেন বুঝতে পাচ্ছিস না আমি শান্তি পাচ্ছি না। বাড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে কানে ভেসে আসছে আমার শীতলের ডাক, খিলখিল হাসির শব্দ, কত খুনশুটিপূর্ণ মুহূর্ত। শুদ্ধ..ভাই আমার, নিয়ে চল না, প্লিজ।’
_’সুস্থ হও, ঘাড়ে করে হাতি টেনে নিয়ে যেতে পারব না। এমনিতেই প্রচুর ধকল যাচ্ছে, শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। তাছাড়া আজ খুব ভিড় হবে।’
_’হোক, আমি আজই যাব।’
_’আচ্ছা দেখি পারমিশন পাই কি না।’
_’হুম। আজই কিন্তু! ‘
একথা শুনে শুদ্ধ চলে গেল। তখন স্বর্ণ ওয়াশরুম থেকে বের হতেই চার
চোখের মিলন ঘটল। কেউ চোখ সরাল না। নড়ল না। কেবল তাকিয়েই রইল। সায়ন প্রিয় মুখখানার দিকে তাকিয়ে হাত দুদিকে বাড়াতেই স্বর্ণ ছুটে গিয়ে আছড়ে পড়ল তার বুকে। কিছুটা পিছিয়ে গেল সায়ন। তাল সামলাতে না পেরে স্বর্ণকে নিয়েই শুয়ে পড়ল। প্রচন্ড ব্যথা পেলেও চুপ করে রইল। তখন স্বর্ণ বুভুক্ষুের মতো শ্বাস টানতে থাকল। এইতো তার প্রিয় ঘ্রাণ। প্রিয় মানুষ। এটার জন্যই এতদিন পাগল পাগল লাগছিল!
সে সায়নের টি-শাটের কলার খামচে ধরে বুকের ভেতর ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না দেখে ব্যর্থ হয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সায়ন তাকে শক্ত করে নিজের বাহুডোর আগলে নিলো। মুখে রা নেই কারো। ওভাবে রইল কিছুক্ষণ। বেশ কয়েক মিনিট পর সায়ন স্বর্ণের মাথায় আদর এঁকে বেশ আদুরে সুরে ডাকল,

_’জান!’
_'(……)’
_’কথা বলবি না? অন্তর আত্মা শুকিয়ে আছে আমার, একটু কথা বল।’
_'(…..)’
_’ খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি? আচ্ছা, সরি। সরির সঙ্গে আই লাভ ইউ এর টক, মিষ্টি ভর্তা। ভর্তা না তোর পছন্দ?’
_'(……)’
_’ভালোবাসি তো। ভীষণ ভালোবাসি। পাগলের মতো ভালোবাসি।’
একথা বলে স্বর্ণের মুখ উঁচু করে ধরে কপালের মাঝখানে আদর দিলো। স্বর্ণের চোখের পানি বাঁধ মানল না এবার শব্দ করেই কাঁদতে লাগল।স্বর্ণকোমলকে কাঁদতে দেখে সায়নও কেমন ছটফটিয়ে উঠল। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
_’ জান, জান রে, এভাবে কাঁদিস না। তোকে কাঁদতে দেখলে আমার অসহায় লাগে। আমার পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে। থাম, থাম না বাল।’
_'(…….)’
স্বর্ণকে চুপ থাকতে দেখে সায়ন হঠাৎ ইয়াক! ইয়াক! করে বমি করার মতো ভঙ্গি করল। স্বর্ণ উতলা হয়ে ধরতে গেল সায়ন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
_’ তেমন কিছু না। একদম ঠিক আছি। আসলে বাবা হবো তো, তাই ঘন ঘন বমি পাচ্ছে আর কি!’
একথা বলে দাঁত বের করে হাসল সে। স্বর্ণ ওর বুকের কিল বসিয়ে হেসে ফেলল। এত পাজি! তখন সায়ন তার হাতটা ধীরে ধীরে স্বর্ণের পেট ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল,
_’ আমার বাবাকে অতিষ্ঠ করে তোলা এই আমিটাও বাবা হয়ে গেলাম?
কি আশ্চর্য! কি আশ্চর্য!’

_’ ঐশ্বর্য? এ্যাই..কাঁপছো কেন তুমি? কি হয়েছে? দেখি, তাকাও আমার দিকে?’
আচমকা রুবাবের কথা শুনে না ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ঐশ্বর্য। হাসার চেষ্টা করল। অথচ এখনো থরথর করে কাঁপছে সে। হঠাৎ কাঁপতে দেখে রুবাব দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। সদ্য শাওয়ার নেওয়া ঠান্ডা হাতটি রাখল তার কপালে, বুঝল জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। এটা গতরাতে বৃষ্টিতে ভেজার ফল।
রুবাব দ্রুত তাকে বিছানায় শুইয়ে পুনরায় ছুটল ওয়ারুমের দিকে। পানি এনে রুমাল ভিজিয়ে জলপট্টি দিতে থাকল। তোয়ালে ভিজিয়ে হাত-পা মুছে দিলো। তার চোখে-মুখে ব্যাকুলতা! ঐশ্বর্য ছলছল চোখে ঠোঁটের
কোণে হাসি এঁটে তার দিকেই তাকিয়ে রইল। এতদিন বাইরে থাকলেও মন পড়ে থাকত এই পুরুষটার কাছে। দীর্ঘশ্বাসের মাঝে বুঝে নিতো এই মানুষটাও তাকে ছাড়া ভালো নেই, কিন্তু কিছু করারও নেই। মাঝে মাঝে দূরত্ব ভালোবাসা বাড়ায়। বোঝায় ভালোবাসার গভীরতা। আর যে তার জীবনের সকল অপূর্নতাটুকু সাদরে গ্রহন করেছে, জীবনে ঠাঁই দিয়েছে, তাকে পাগলের মতো ভালোবেসেছে, তাকে উন্মাদের মতো ভালোবাসা না যায়, তাহলে কিভাবে হবে? এতে বেইমানি হয়ে যাবে না? যাবে তো। ঠিক কারণে সে এই পুরুষটাকে ভালোবাসে, ভীষণ ভালোবাসে। এদিকে হঠাৎ জ্বর কখন এলো? এলেও তাকে বলল না কেন? এই নিয়েও বকল রুবাব, আবার খেয়াল না করায় নিজের ওপরেও ভীষণ রাগ হলো তার। কিছু খাইয়ে ওষুধ খাওয়াতে ভেবে উঠতে গেলে ঐশ্বর্য একহাত আঁকড়ে ধরল। থেমে গেল রুবাব। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে ঐশ্বর্য মাথা নাড়াল, অর্থাৎ যেও না, প্লিজ। তারপর রুবাবের বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,

_’স্ট্যাচু! নড়বে না, এভাবেই থাকো।’
_’এভাবে থাকলে জ্বর কমবে? কিছু খেয়ে মেডিসিন খেতে হবে।’
_’ খাব না মেডিসিন।’
_’তাহলে কি খাবে?’
_’ভালোবাসা খাব।’
_’ভালোবাসা খাওয়া যায়?’
_’খুব যায়।’
_’খেয়েছো কখন?’
_’খেয়েছি।’
_’ যে খাইয়েছে কে, সে?’
_’আমার একান্ত ব্যক্তিগত প্রেম বিক্রেতা।’
ঐশ্বর্যের কথা শুনে না চাইতেও হেসে ফেলল রুবাব। মেয়েটাকে বুকের সাথে চেপে ধরে তার তপ্ত ওষ্ঠে চুমু এঁকে দিলো। ঐশ্বর্য কপাল দেখিয়ে দিলে কপালেও আদর আঁকল। এরপর একে একে কপাল, গাল, থুতনি দেখালে রুবাব মিটিমিটি হাসতে হাসতেই তার মিষ্টি আবদার মিটালো।
সে বরাবরই বিশ্বাস করে যে, প্রতিটা মেয়ের জীবনে সুন্দর মানুষ থাকার চেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ থাকা জরুরি। যার কাছে বুঝদার, বুদ্ধিমতীর পরীক্ষা দিতে হবে না, মেপে-বুঝে কথা বলতে হবে না, যখন তখন আহ্লাদ করা যাবে, রাগ-অভিমান করা যাবে, ইচ্ছে মতো দুঃখ জমা রাখা যাবে। এমন একটা মানুষ দরকার, খুব দরকার। কেননা সর্বদা ম্যাচিউরিটি দেখানো রক্তে- মাংসে গড়া মানুষদের জীবনেও বিশেষ কিছু কষ্ট থাকে, ব্যর্থতা থাকে, অপূর্নতা থাকে, সেসব চাপা দেওয়ার জন্য দরকার বিশ্বস্ত মানুষ, বিশ্বস্ত একটি বুক। যার বুকে মাথা রেখে পৃথিবীর সবকিছুকে তার তুচ্ছ, অপ্রয়োজনীয় মনে হবে। যার বুকে প্রশান্তি পাওয়া যাবে। যার কথায় অস্থিরতা কমবে, যার মুখ দেখলে চোখ জুড়াবে, মন জুড়াবে, আর যার এইটুকু আছে তার অর্থের অভাব থাকলেও সে গরীর না, সে সুখী। সুখ সবার জন্য না। সুখের বাজার বরাবরই চড়া। এজন্য বোধহয় সুখ সবার কপালে সহে না।

উন্নয়ন কেন্দ্রের একটি রুমে পুঁতির কাজ শেখানো হচ্ছে। প্রশিক্ষক হাতে ধরে শিখিয়ে দিচ্ছে কিভাবে কী কী করতে হবে। শীতল মন দিয়ে সেসব দেখে নিজে করার চেষ্টা করছে। এখানে তার মতো যারা আছে সবাইকে ভিন্ন ভিন্ন কাজ শেখানে হয়। শুয়ে বসে না থেকে এসব কাজ করে ব্যস্ত রাখা হয়। তখনই তাকে জরুরিভাবে ডাকা হলো। দ্রুত যেতে বলা হলো সাক্ষাৎ কক্ষে। কিন্তু আজ কারো আসার কথা না, আবার কিছু হলো না তো? একথা ভেবে দাঁড়াল না একছুটে বেরিয়ে গেল। আজকে শুক্রবার বিধায় সাক্ষাৎ কক্ষে ভিড়টা একটু বেশি। কক্ষটির মাঝখানে বড় লোহার জাল দিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত। এর একপাশে কয়েদিরা দাঁড়ায়, অন্যপাশে দর্শনার্থীরা। মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা থাকে যাতে সরাসরি স্পর্শ করা না যায়। অন্যরাও তাদের প্রিয় জনদের সাথে দেখা করতে এসেছে, কথা বলছে বিধায় কক্ষটি শোরগোলপূর্ণ। শীতল উঁকিঝুঁকি মেরে লাফ মেরে শুদ্ধকে খুঁজল। কিন্তু না পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯১

তাহলে কি শুদ্ধ আসে নি? কই বাড়ির কাউকে দেখছে না কেন? উৎসুক হয়ে পায়ের গোড়ালি উঁচু করে আরেকবার খুঁজতেই তার দৃষ্টি আঁটকাল
ভিড়ের মাঝে একদম কর্ণারে। বিষ্ময়ে চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেল। না চাইতেও টইটম্বুর চোখের জলে ঝাপসা হয়ে এলো সামনে দাঁড়ানোর মানুষটার মুখ। ঠোঁটে ফুটল মিষ্টি হাসি। মানুষটাকে দেখামাত্রই সেদিকে ছুটে গিয়ে ধরার চেষ্টা করল। কান্নারত কন্ঠে চঞ্চল হয়ে চেঁচিয়েই বলতে লাগল,
-‘ভা….ভাইয়া! ভাইয়া এসেছো? এই যে এইদিকে আমি…দেখতে পাচ্ছো আমাকে?’

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯৩

15 COMMENTS

  1. Love u apu.. Tomar ei novel ta amar “অসম্ভব প্রিয় ” thank u very much… 🫶🏻 next part এর অপেক্ষায় রইলাম

Comments are closed.