Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 17 (4)

Tell me who I am 2 part 17 (4)

Tell me who I am 2 part 17 (4)
আয়সা ইসলাম মনি

ঠিক যখন আদিম খড়গটি ফারহানের বুকের পঞ্জরাস্থি ভেদ করতে উদ্যত ছিল, তখনই এক প্রখর ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “আকা শুকা নারি, ইবো ইবো বিশ্রাম!” (আমি ক্লান্ত, আমি বিশ্রাম করতে চাই!)
শত্রুকে বিনাশ করতে হলে তার শেকড় অবধি জানা প্রয়োজন, আর আয়লা ঠিক তা-ই করেছে। বছরের পর বছর এই নৃগোষ্ঠীর ভাষার বৈশিষ্ট্য এবং অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল কাল্ট নিয়ে কাজ করার সুবাদে সে তাদের গোপন সংকেতগুলো আয়ত্ত করে নিয়েছে।

পুরো চত্বর এক লহমায় পাথরের মতো স্থবির হয়ে গেল। রাজার হাতের সেই ভারী খড়গটি ফারহানের বুকের ঠিক এক ইঞ্চি উপরে থেমে গেল। আদিবাসীদের মধ্যে ভয়ার্ত গুঞ্জন শুরু হলো, তারা নতজানু হয়ে তাদের দেবীকে সম্মান জানাল। কিন্তু বৃদ্ধা রানির দৃষ্টি ছিল বিষধর কালো কেউটের মতোই ধূর্ত ও সন্ধানী। সে এগিয়ে এসে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “নাকা রে জুম্মা, রানি তু কু-মা চেক কা নারি?” (কিন্তু রানি কি পবিত্র? তাকে কি পরীক্ষা করা হয়েছে?)
গোত্রীয় প্রথা অনুযায়ী সমস্বরে আদিবাসীরা জানাল, পরীক্ষা এখনো হয়নি।
কারান আর ফারহান রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে রইল। তারা এই অশুভ ভাষার এক বর্ণও বুঝল না, কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা তাদের মেরুদণ্ড দিয়ে হিমস্রোত বইয়ে দিল। তারা দেখল ফারহানকে ছেড়ে দিয়ে আদিবাসীরা আয়লার দিকে মনোনিবেশ করছে।
বৃদ্ধা রানি তার কোমর থেকে একটি সরু, ধা’রালো এবং মসৃণ বাঁশের দণ্ড বের করল।
আয়লার দু-পা যখন আদিবাসিগুলো দুদিকে টেনে ধরল, তখন প্রথমবারের মতো তার লৌহকঠিন সাহসের দেয়ালে ফাটল ধরল; শীতল ভয়ের কাঁপন তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। ওদিকে খাঁচার ভেতর কারান বুঝতে পারল কী বীভৎস গোপনীয়তার লঙ্ঘন হতে চলেছে। তার চোখ আক্রোশে আর যন্ত্রণায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলেও, সে মুহূর্তেই নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। কারান নারীত্বের প্রতি আজন্ম শ্রদ্ধাশীল; তাই সে দাঁতে দাঁত চেপে চোখ দুটো ঘৃণায় খিঁচে বন্ধ করে ফেলল।

বন্ধুর এই অবর্ণনীয় অপমান সহ্য করতে না পেরে ফারহানও তার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার সারা শরীর অব্যক্ত অসহায়ত্বে থরথর করে কাঁপছে। সে ভাবতেও পারেনি, তার জীবন বাঁচাতে আয়লাকে এই চূড়ান্ত শারীরিক ও মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
রানি সেই বাঁশের দণ্ডটি কোনো দয়া-মায়া ছাড়াই আয়লার স্প*র্শকা*তর অংশে সজোরে পুশ করে দিল। আয়লার গগনবিদারী আ’র্তনাদ পুরো দ্বীপের পশুপাখিকেও আতঙ্কিত করে তুলল। যন্ত্রণার তীব্রতায় আয়লার পেলভিক এরিয়া ধনুকের মতো বেঁকে গেল। তার দু-পা বেয়ে টাটকা লোহিত র*ক্ত গড়িয়ে গরম বালুতে মিশে বীভৎস আলপনা তৈরি করল। আয়লার শ্যাম উজ্জ্বল মুখমণ্ডল ব্যথায় নীল হয়ে আসলেও, সে চোখ বন্ধ করল না।
সেই র*ক্তমাখা দণ্ডটি বাইরে বের করে রানি যখন আদিবাসীদের উদ্দেশ্যে উঁচিয়ে ধরল, তখন পুরো জঙ্গল প্রকম্পিত করে উল্লাসধ্বনি উঠল, “রানি নাকা! রানি নাকা!” (রানি পবিত্র! রানি যোগ্য!)
আয়লা যন্ত্রণায় হাঁপাচ্ছিল, কিন্তু তার মস্তিষ্ক তখনও কৌশলগতভাবে সক্রিয়। সে আদিবাসীদের ভাষায় দৃঢ় স্বরে আদেশ দিল, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, “এই প’শুগুলোর (কারান-ফারহান) বলি হবে ঠিক দু-দিন পর, অমাবস্যার সেই অভিশপ্ত প্রহরে।”

আদিবাসীরা তাদের পবিত্র দেবকন্যার আদেশ শিরোধার্য করে নিল। কারান আর ফারহানের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়া হলেও তারা রয়ে গেল সেই লৌহকঠিন খাঁচায়। কারান ঝাপসা চোখে দেখল, বেদির ওপর র*ক্তভেজা অবস্থায় আয়লা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে। সে ইঙ্গিতে দুই দিনের সময়সীমার কথা প্রকাশ করল।
তার এই অসামান্য আত্মত্যাগই আজ তাদের নিশ্চিত মৃ*ত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু বিনিময়ে আয়লা যে শারীরিক ও মানসিক মূল্য চুকালো, তা কারানের পৌরুষে এক প্রচণ্ড কুঠারাঘাতের মতো বিঁধল।
কারান ভগ্ন স্বরে ফিসফিস করে বলল, “লাইফে আজকের মতো হেলপলেস আমি আগে কখনো ফিল করিনি, ফারহান।”
ফারহান তার বন্ধুর কণ্ঠে এমন হাহাকার আগে কখনো শোনেনি। সে অবাক হয়ে কারানের বিষণ্ন মুখের দিকে তাকাল। কারান শুকনো ঠোঁট কামড়ে ধরে অস্ফুটে যোগ করল, “আমাদের অপারেশনাল প্ল্যান এভাবে ফ্লপ করবে আমি ভাবিনি। যেখানে আয়লাকে প্রোটেক্ট করার দায়িত্ব ছিল আমার, সেখানে ও বারবার নিজের লাইফ রিস্কে ফেলে আমাদের সেভ করছে। এর থেকে ডে’থ অনেক বেটার ছিল। আই ফিল সো ইনকমপিটেন্ট।”
ফারহান কারানের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বলল, “ইউ আর ওভারথিংকিং, ব্রো। এখনো গেম শেষ হয়ে যায়নি। দেখলি না, আয়লা আমাদের জন্য দুই দিনের একটা উইন্ডো বের করে নিল! নিজেকে দুর্বল কেন ভাবছিস, ইয়ার? আমরা সবাই একসাথে ফিরব—দেখে নিস!”
কারান কোনো উত্তর দিল না, কেবল খাঁচার লোহার শিকগুলো দুই হাতে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

আয়লার জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু সে জানাল, সে খোলা আকাশের নিচেই অবস্থান করবে। কারান প্রথমে এতে দ্বিমত করলেও আয়লা তাকে বোঝাল, এখন তাদের তিনজনকে কানেক্টেড থাকতে হবে। বিচ্ছিন্ন হওয়া মানেই শত্রুর জন্য সুযোগ তৈরি করা।
পুরো রাত এক শ্বাসরুদ্ধকর পাহারার মধ্য দিয়ে কাটল। ভোরের আলো ফুটতেই এক আদিবাসী কিশোরী আয়লার কাছে এলো। মেয়েটির অবয়বে বন্য রুক্ষতা থাকলেও চোখের মণি দুটোতে অদ্ভুত মায়াবী দ্যুতি ছিল। সে আয়লার জন্য একটি মাটির পাত্রে খাবার নিয়ে এসেছে। আয়লা পাত্রটির দিকে তাকিয়ে ঘৃণাভরে হালকা হাসল। আদিবাসীদেরই ভাষায় বলল, “খাবারটা থেকে অফেনসিভ স্মেল আসছে। তোমরা কি তোমাদের ফিউচার রানিকে এই পচা খাবার খাওয়াবে?”
মেয়েটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তাদের সংস্কৃতিতে এই কাঁচা র*ক্তা*ক্ত শোকরের মাংসই হলো পরম উপাদেয়। মেয়েটির নীরবতা দেখে আয়লা তার দিকে ঝুঁকে বসল, এবং বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করল, “উইল ইউ গো ফর হা’ন্টিং উইথ মি?”

ছোট্ট মেয়েটির বয়স দশের বেশি হবে না। সে আয়লার এই অদ্ভুত প্রস্তাবে বেশ রোমাঞ্চিত হলো, এবং গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল। আয়লা মেয়েটির হাত ধরে সামনে এগোতেই কয়েকজন সশস্ত্র আদিবাসী যোদ্ধা তাদের পথ রোধ করে দাঁড়াল। আয়লা রাজকীয় কণ্ঠে হুংকার ছাড়ল, “আমি দেবকন্যা, শিকারে যাচ্ছি। কেউ ইন্টারফেয়ার করলে তার গ’র্দান যাবে!”
আয়লার আজ্ঞা শুনে যোদ্ধারা পিছিয়ে গেল। তবে পেছনে বৃদ্ধা রানির সূক্ষ্ম ইশারা পেয়ে মাথা নাড়লো। তারা সরাসরি পিছু না নিলেও শিকারি বিড়ালের মতো গাছের ডালে ডালে আয়লাকে অনুসরণ করতে লাগল। আয়লা বিষয়টি খেয়াল করলেও বিচলিত হলো না। কারণ তার মূল উদ্দেশ্যই ছিল আদিবাসীদের মধ্যে নিজের গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা।

আয়লা সেই কিশোরীকে সাথে নিয়ে নিকটস্থ জলাশয়ে গেল, এবং নিপুণ দক্ষতায় কিছু মাছ শিকার করল। কিশোরীটি তার জীবনে প্রথমবার এমন অদ্ভুত অথচ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে আয়লার প্রতি এক ধরনের আবেগীয় টান অনুভব করতে শুরু করল। আয়লা জানে, এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই তাদের চূড়ান্ত মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে।
শিকার শেষে ফিরে এসে আয়লা আগুনের কুণ্ডলীতে মাছগুলো দগ্ধ করতে শুরু করল। ঝলসানো মাছের সুঘ্রাণ যখন বনের স্যাঁতসেঁতে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল, তখন আদিবাসী কিশোরীটির চোখে অবর্ণনীয় বিস্ময় ফুটে উঠল। আয়লা শিকের একটি মাছ মেয়েটির হাতে দিতেই তার মলিন মুখমণ্ডল দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে একদৃষ্টে আয়লার অন্য হাতে থাকা মাছটির দিকে তাকিয়ে রইল। আয়লা তার নির্বাক আকুতি বুঝতে পেরে নিজের ভাগের মাছটিও তাকে দিয়ে দিল। কিশোরীটি যেন কোনো দুর্মূল্য রত্ন পেয়েছে! সে দ্রুত মাছ দুটি ছিনিয়ে নিয়ে বনের গহিনে মিলিয়ে গেল, পাছে কেউ তার স্বর্গীয় খাবারে ভাগ বসায়।

আয়লা আরও দুটি মাছ পুড়িয়ে শিক হাতে ধীর পায়ে কারানদের খাঁচার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কারান তখনও অটলভাবে দাঁড়িয়ে, তার দুচোখে শ্রান্তি আর অনিদ্রার ছাপ স্পষ্ট। পাশে ফারহান অবশ্য কিছুক্ষণের জন্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিল, তার ঠোঁটের কোণে সঞ্চিত লালার দাগ দেখে আয়লা নিজের হাসিকে সংবরণ করতে পারল না। তার হাসির শব্দে ফারহান সচকিত হয়ে লাফিয়ে উঠল, “কে রে?”
আয়লাকে দেখে সে দ্রুত নিজের আলুথালু অবস্থা সামলে নিয়ে বলল, “কেন ভয় দেখাচ্ছ, ভাই? এমনিতেই তো নার্ভাস সিস্টেম ব্রেকডাউনের পথে, তার ওপর তুমি হচ্ছো ম’রার উপর খাঁড়ার ঘা! দেখতেই পাচ্ছ, আমি আধপাগ’ল হয়ে বসে আছি, এখন কি বাকি অর্ধেকটা পূরণ করে ফুল পা’গল বানানোর খুব দরকার আছে?”
আয়লা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, “চলো, গরম গরম স্মোকড ফিশ এনেছি, পেটপুজো করে নাও।”
আয়লা খাঁচার ভেতর দুটি শিক বাড়িয়ে দিল। কারান কোনো বাক্যব্যয় না করে দ্রুত শিকটি গ্রহণ করল। তার পাকস্থলীর গ্যাসট্রিক জুস তখন ক্ষুধার তাড়নায় বিদ্রোহ করছে। আবরার কারান চৌধুরি, যে কিনা বিশ্ববিখ্যাত এক বিজনেস টাইকুন, যার ডাইনিং টেবিলে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ রন্ধনশিল্পীদের সমাগম ঘটে, সে আজ পরিস্থিতির নির্মম পরিহাসে এক টুকরো আধপোড়া মাছের জন্য ক্ষুধার্ত! দৃশ্যটি অন্যদের কাছে বিদ্রুপের মনে হলেও আয়লার হৃদয়ে তা গভীর সহমর্মিতার জন্ম দিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখের দৃষ্টি নামিয়ে নিল।

ওদিকে ফারহান নাক সিটকে বলল, “ইয়াক! ছি! তোমার ব্রেইন কি ফ্রোজেন হয়ে গেছে, আয়লা? দ্য গ্রেট হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার ফারহান খান এই আধপোড়া জংলি মাছ খাবে? ইটস সো গ্রস! নেভার!” সে অবজ্ঞায় সামনে থুতু ফেলল।
আয়লা এক মুহূর্ত তার দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তারপর কোনো কথা না বলে নিজের খাবারে মনোযোগ দিতে চলে গেল। এদিকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফারহানের পেটে ক্ষুধার মেটাবলিজম শুরু হলো, চোখে সে সর্ষে ফুল দেখছে। ইগোর লড়াইয়ে সে না পারছে চাইতে, না পারছে সইতে। সে একবার কারানের তৃপ্তিসহকারে খাওয়ার দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার আয়লার নির্লিপ্ত মুখমণ্ডলের দিকে। বন্ধুর এই করুণ অবস্থা দেখে কারান মুচকি হাসল। আয়লার দিকে না তাকিয়েই সে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল, “এই মিসকিনকে কিছু খাবার দিয়ে সওয়াব কামাও, আয়লা। বেচারা না খেয়ে ম’রলে আমার আবার ওর নিরীহ, মাসুম না হওয়া বউটাকে জবাবদিহি করতে হবে।”
ফারহান হা হয়ে তার বন্ধুর দিকে তাকাল। যে ছেলের ব্যাংক ব্যালেন্সে সাত সংখ্যার নিচে কথা হয় না, আজ বন্ধুর এক ‘মিসকিন’ শব্দে নিজেকে আক্ষরিক অর্থেই ভিখারি মনে হলো তার। তবে ক্ষুধার জ্বালা বড়ো বালাই! সে কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, “আসলে মাছটা দেখতে অতটাও খারাপ না… মানে অরগানিক ডায়েট হিসেবে ট্রাই করাই যায়।”
আয়লা হেসে ফারহানের হাতে মাছের শিকটি পুনরায় তুলে দিল। এবার আর কোনো ড্রামা নয়, ফারহান যেন এক যুগান্তরের উপবাসী—এমনভাবে নিমিষেই মাছটি সাবাড় করে দিল।

পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই দেখা গেল আয়লা সেই আদিবাসী কিশোরীটির সাথে চমৎকার বন্ডিং তৈরি করে ফেলেছে। এই সুসম্পর্কের ভিত্তি কেবল উদরপূর্তি নয়, বরং আয়লা মেয়েটিকে নাগরিক জীবনের ছোটোখাটো কিছু কারুকাজ শিখিয়ে তার শৈশবসুলভ কৌতূহলকে জয় করেছে। আয়লা একজন জাত ম্যানিপুলেটর; সে জানে মানুষের অবচেতন মনকে কীভাবে নিজের অনুকূলে ব্যবহার করতে হয়।
ওদিকে ইব্রাহিমের পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়। অত্যধিক মানসিক চাপে সে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা সংজ্ঞাহীন ছিল। তার একটি পা যেহেতু বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, তাই আদিবাসীদের নিয়ম অনুযায়ী সে এখন অপবিত্র। দেবকন্যার পবিত্রতা রক্ষার খাতিরে তাকে বেশ দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এদিকে ইব্রাহিম তার ধূর্ত মস্তিষ্কে বারবার পালানোর ছক কষছে, কিন্তু প্রতিটি সমরকৌশল শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে।

আয়লা বর্তমানে সেই কিশোরীটির সাথে কারানদের খাঁচার সামনেই কুতকুত খেলায় মগ্ন। কারান খাঁচার এক কোণে মাথা হেলিয়ে বসে আয়লার এই রহস্যময় কাণ্ডকারখানা পর্যবেক্ষণ করছে। সে বুঝতে পারছে, আয়লার এই আপাত গুরুত্বহীন খেলার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর মাস্টারপ্ল্যান লুকিয়ে আছে। কারান ডান পা ছড়িয়ে অন্য পা ভাঁজ করে বসেছে, তার বাম হাতের কনুই হাঁটুর ওপর রাখা। তবে মনে মনে সে দ্রুত এখান থেকে বের হওয়ার এক্সিট রুট খুঁজছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সে মিরাকে জানিয়ে এসেছিল যে সে জরুরি কাজে থাকবে, হয়ত যোগাযোগ সম্ভব হবে না। কিন্তু প্রিয়তমা স্ত্রীর সাহচর্য ছাড়া এই ৪৮ ঘণ্টা তার কাছে কয়েক আলোকবর্ষের সমান মনে হচ্ছে।
ফারহান পাশে বসে বোকার মতো আয়লার দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করল, “কারান, আই থিংক উই আর অন আওয়ার ওউন। আমার সিরিয়াসলি ডাউট হচ্ছে এই জংলিদের পাল্লায় পড়ে আয়লার স্ক্রু ঢিলা হয়ে গেছে কিনা! নাহলে এই ডে’থ ট্র্যাপের মধ্যে বসে কেউ কুতকুত খেলে, ব্রো?”
একটু পর বসার ভঙ্গি পালটে সে কারানের কানে ফিসফিস করে বলল, “একটা আইডিয়া আছে। ওর মাথায় শক্ত করে একটা বারি মারা যায়! পুরোনো মুভিগুলোতে যেমন দেখায়—মাথায় চোট পেলে হারানো মেমোরি আবার ব্যাক করতেও পারে!”

কারান দুই আঙুলে কপাল টিপে ধরে হিংস্র দৃষ্টিতে ফারহানের দিকে তাকাল। ফারহান তৎক্ষণাৎ এমন ভাব করল যেন সে মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করছে, এবং কারানকে সে চেনেও না। কিন্তু কারান ফারহানের পশ্চাৎদেশে এক মোক্ষম লাথি মেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “লজিক্যাল কথা বাদ দিয়ে যদি আর একটাও ফালতু শব্দ খরচ করিস, তবে আদিবাসীদের আগেই তোর ঘাড় আমি মচকাবো, শা’লা!”
ফারহান নিজের কণ্ঠমণিতে হাত দিয়ে ‘গড প্রমিজ’ করার ভঙ্গি করল যে সে এখন একদম সাইলেন্ট থাকবে, যদিও অন্য হাতে লাথি খাওয়া জায়গাটা ডলতে ভুলল না। কারান দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়লার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, “হোয়াটস দ্য প্ল্যান?”
আয়লা খেলা চালিয়ে যেতে যেতেই অত্যন্ত খামখেয়ালি সুরে জবাব দিল, “প্ল্যান তো আমার করার কথা না। গ্রেট বিজনেস ম্যাগনেট আবরার কারান চৌধুরীর সামনে আমি তো নস্যি! ইন ফ্যাক্ট, তোমারই তো উচিত আমাদের এখান থেকে লিড করা।”

আয়লার এই শ্লেষাত্মক কথায় কারান বিরক্ত হয়ে বলল, ​”খাঁচায় বন্দি থাকা বাঘ আর রাজপ্রাসাদের পোষা বিড়ালের মধ্যে কোনো তফাত থাকে না, আয়লা। পরিস্থিতি যখন প্রতিকূল হয়, তখন শিকারি মস্তিষ্কের চেয়ে জীবন বাঁচানোর আদিম প্রবৃত্তিটাই বড়ো হয়ে দাঁড়ায়। আমার হাতে যদি এই ডে’থ ট্র্যাপ থেকে বের হওয়ার সামান্যতম ব্লু-প্রিন্ট থাকত, তবে আমি এখানে নিষ্ক্রিয় বসে তোমার চালগুলোর শেষ দেখার অপেক্ষা করতাম না। সো, স্টপ দিস সাইকোলজিক্যাল গেম! তোমার এই রহস্যময় ভণিতার পর্দা সরিয়ে আসল চালটা এবার ক্লিয়ার করো।”
আয়লা কারানের যুক্তিতে মৃদু হাসল। আসলেই তো, কারান এই ভূখণ্ড এবং এই আদিম প্রথা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, তাই তার পক্ষে এখন নিষ্ক্রিয় থাকাটাই স্বাভাবিক। খেলতে খেলতেই আয়লা বোমা ফাটাল, “আমি এদের কাউকেই মা’র’বো না, কারান। আই হ্যাভ চেঞ্জড দ্য প্ল্যান।”

“মানে?” কারান আর ফারহান তড়িৎবেগে উঠে দাঁড়িয়ে খাঁচার শিকের সামনে চলে এলো। তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
আয়লা এক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে অরণ্যের অন্তহীন সবুজের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠে গভীর দার্শনিকতা ফুটে উঠল, “আমরা যখন পরম তৃপ্তিতে মাছ কিংবা পশুপাখি ভক্ষণ করি, তখন তো কোনো বিচারালয় আমাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করায় না। কেউ তো আমাদের ক্রি’মিনাল সাব্যস্ত করে না। তোমার কি মনে হয় কারান, সেই নির্বাক প্রাণীদের আমাদের বিরুদ্ধে কোনো এথিকাল অবজেকশন নেই? আমাদের কাছে সেই অবলা প্রাণীরা যেমন সেরেফ প্রোটিনের উৎস, এই বিচ্ছিন্ন নৃগোষ্ঠীর কাছেও বহিরাগত মানুষ কেবল এক রিচুয়াল ডিনার। এখানে কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই, আছে কেবল কয়েক হাজার বছরের টিকে থাকার লড়াই। পুরো বিষয়টা শুধুমাত্র এক গেম অফ পারসপেক্টিভ।”
কারান আর ফারহান পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গতরাতেই যে আয়লা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিল, যে কিনা এদের সমূলে বিনাশ করার নীল-নকশা এঁকেছিল, তার মুখে এই ক্ষমাশীল সংলাপ শুনে ফারহানের মনে হলো আয়লার নিউরো-সার্কিট বুঝি সত্যিই কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। পা’গল-টাগল হয়ে গেছে কিনা, তাও বা কে জানে!
আয়লা যোগ করল, “এই বাচ্চাটার সাথে মিশে আমি বুঝেছি, ওরা স্যা’ডি’স্ট বা খু’নি নয়, ওরা কেবল শিকারি। এই দ্বীপে কোনো চাষাবাদ নেই, নেই কোনো বিকল্প খাদ্যের উৎস। এখন আমরা যদি এদের সমূলে বিনাশ করি, তবে সেটা হবে একটা জেনোসাইড। তার চেয়ে বরং আমরা ফিরে গিয়ে এই আইল্যান্ডকে সরকারি হস্তক্ষেপে নিষিদ্ধ অঞ্চল ঘোষণা করব। তাতে মানুষও বাঁচবে, আর এই আদিম ইকোসিস্টেমও টিকে থাকবে।”
ফারহান উদ্‌বিগ্ন হয়ে বাধা দিল, “বাট হোয়াট অ্যাবাউট ইওর রিভেঞ্জ? যে প্রতিহিংসার জন্য জীবনের এতগুলো বছর তুমি ইনভেস্ট করলে…”

“সবকিছুর সলিউশন রিভেঞ্জ দিয়ে হয় না, ফারহান। কিছু বিষয় প্রকৃতির ওপরই ছেড়ে দিতে হয়। আমার বাবা-মায়ের হ*ত্যাকারী যদি কোনো সচেতন মানুষ হতো, তবে আমি তাদের মর্ত্যেই নরক দর্শন করাতাম। কিন্তু পশুর হিংস্রতাকে তো আর বিচার করা যায় না।”
ফারহান অস্ফুটে বলল, “দ্যাট মিনস, তুমি এদের কোনো পানিশমেন্ট ছাড়াই ছেড়ে দেবে?”
“সবই তো বললাম!”
কারান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “আই গেট ইট! তার মানে তুমি নিশ্চয়ই এই বাচ্চাটার মাধ্যমেই আমাদের এসকেপ প্ল্যান সাজিয়েছ!”
আয়লা হালকা হেসে খাঁচার শিকের ওপর এক মোক্ষম চাপড় মেরে আওড়ালো, “ব্রিলিয়ান্ট! এই শার্প ইন্টেলিজেন্সের জন্যই তো কারান চৌধুরি ওয়ান ইন আ বিলিয়ন!”
ফারহান অধৈর্য হয়ে শুধালো, “বাট হাউ? কীভাবে পালাবো?” আয়লার ওষ্ঠাধরে কেবল এক রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

আজ অমাবস্যার ঘোর কৃষ্ণপক্ষ। মধ্যরাতের ঠিক পরেই কারান আর ফারহানের র*ক্ত দিয়ে এই অরণ্যের কাল্ট সন্তুষ্ট করার কথা। আয়লা চেয়েছিল বলির পাঠা হোক ইব্রাহিম, কিন্তু আদিবাসীদের মতে অঙ্গহীন কোনো ব্যক্তি বলিদানের জন্য অপবিত্র।
সকাল থেকেই আয়লা সেই কিশোরীটিকে সঙ্গী করে পুরো দ্বীপের উদ্ভিজ্জ সম্পদ নিয়ে ব্যাপক রিসার্চ চালিয়েছে। সে জানত, এই বুনো উপজাতির উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ হলো বুনো ফলের রস বা এক বিশেষ ধরনের অ্যালকোহলিক ড্রিংক। আয়লা সেই উপাদেয় পানীয়তে মেশানোর জন্য একটা বিশেষ ঘুম পাড়ানি ফুল খুঁজে পেল।

উৎসবের কেন্দ্রস্থলে আদিবাসীদের ভিড়ে আয়লা এখন স্বয়ং দেবী হিসেবে বসে আছে। প্রথা অনুযায়ী প্রথমে তাকেই সেই ফলের রস পান করানো হলো। এরপর শুরু হলো পৈশাচিক উন্মাদনায় বুনো নৃত্য। আয়লা অত্যন্ত সাবধানে, ভিড়ের আড়ালে গিয়ে সেই পানীয়ের বিশালাকার পাত্রে ‘স্লিপিং ফ্লাওয়ার’-এর নির্যাস মিশিয়ে দিল। এরপর সে কপট হেসে আবার ফিরে এসে তাদের সাথে নাচে মগ্ন হলো।
দূর থেকে জীর্ণ অবস্থায় ইব্রাহিম এই পুরো কর্মকাণ্ডটি লক্ষ্য করছিল। এক পা হারানো ইব্রাহিমের অবস্থা এখন মৃ*তপ্রায়। সে শুকনো শোকরের মাংস চিবিয়ে বমি করেছে কয়েকবার, তার দুচোখে এখন কেবল চরম পৈশাচিক ঘৃণা স্পষ্ট।
সে হিংস্র নেকড়ের মতো গোঙাতে গোঙাতে বলল, “আয়লা দেমির! তুই কি ভেবেছিস আমি এখানে পচে ম’রব আর তোরা সারভাইভার হয়ে ফিরে যাবি? ইম্পসিবল! আমি একা জাহান্নামে যাব না, তোদের ইনভাইট করেই যাব। বাঁচলে আমি একাই বাঁচব, আর ম’রলে তোদের সবাইকে এই অগ্নিকুণ্ডে পু’ড়িয়ে নিয়ে ম’রব।”

বক্র হাসি হেসে ইব্রাহিম খাঁচার রড আঁকড়ে ধরে তার পরবর্তী মাস্টার মুভের অপেক্ষা করতে লাগল।
ওদিকে কিছুক্ষণ পরেই আদিবাসীদের সেই উন্মত্ত কোলাহল স্তিমিত হয়ে এলো। আয়লার সুপরিকল্পিতভাবে মেশানো সেই নিশাচর ফুলের তীব্র নিউরোটক্সিন তাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করে দিয়েছে। একের পর এক আদিবাসী ঢলে পড়তে লাগল। ঠিক এই মোক্ষম সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল আয়লা। সে দ্রুতপায়ে পেছনের দিকে ছুটে গেল, যেখানে লোহার খাঁচায় বন্দি আছে কারান আর ফারহান।
কিন্তু খাঁচার সামনে পৌঁছাতেই আয়লার কপালের শিরা ফুটে উঠল। সে আধুনিক যুগের লকিং সিস্টেমে বিশেষজ্ঞ হতে পারে, কিন্তু এই প্রাচীন ঢালাই লোহার খাঁচা খোলার কোনো দৃশ্যমান মেকানিজম তার নজরে পড়ছে না। আয়লা মরিয়া হয়ে খাঁচা ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল, কিন্তু সেই ভারী লোহা এক ইঞ্চিও নড়ল না।
“আয়লা, হারি আপ!” কারানের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা ধরা পড়ল, “ওই নিউরোটক্সিনের ইফেক্ট বড়োজোর চারঘণ্টা থাকবে। উই ডোন্ট হ্যাভ মাচ টাইম!”

কারানের কথায় আয়লার স্নায়বিক চাপ আরও বেড়ে গেল। সে পা’গলের ন্যায় খাঁচার চারপাশে খুঁজল, কিন্তু কোনো ছিদ্র বা কবজা খুঁজে পেল না। এক সময় তীব্র হতাশায় সে ঘাসের ওপর ধপ করে বসে পড়ল। তার শরীর ঘামে সিক্ত, আর্দ্র অরণ্যের ভ্যাপসা গরমে নিশ্বাস নেওয়াও দায় হয়ে পড়েছে।
খাঁচার ভেতর কারানও বুঝতে পারছিল পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু কারান সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়; তার মাথায় তখন শুধু মিরার মুখটা ভাসছে। সে মনে মনে ভাবল, “আই ক্যান নট ডা’ই লাইক দিস। মিরাকে এই ন’রকে একা রেখে আমি ম’র’তে পারি না!”
কারান তার পেশিবহুল সুঠাম দেহের সমস্ত শক্তি এক করে খাঁচার শিকগুলো বাঁকানোর চেষ্টা করল। তার গায়ের শক্তি প্রবাদপ্রতিম হলেও, খাঁচার সেই সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য অসম্ভব। তবুও সে দাঁতে দাঁত চেপে লোহা বাঁকানোর চেষ্টা চালিয়ে গেল। ওদিকে ফারহানও তার শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী কারানের সাথে যোগ দিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে হতাশায় নুয়ে পড়া আয়লার হাত স্পর্শ করল কেউ। আয়লা চমকে তাকিয়ে দেখল সেই ছোট্ট মায়াবী আদিবাসী মেয়েটি তার পাশে দাঁড়িয়ে। সে আয়লার হাতের তালুতে একটি অদ্ভুত গড়নের পাথুরে চাবি গুঁজে দিল। কিন্তু এত ধকল আর মানসিক ট্রমার পর আয়লার মস্তিষ্ক যেন ঠিকমতো সিগন্যাল দিচ্ছিল না।
সে বিড়বিড় করে বলল, “হোয়াট ইজ দিস? এখানে তো কোনো তালাই নেই, এই চাবি আমি কোথায় ইউজ করব?”
বালিকাটি আঙুল উঁচিয়ে খাঁচার উপরিভাগের একটি অন্ধকার কোণ নির্দেশ করল। আয়লা, কারান আর ফারহান—তিনজনেই উপরে তাকাল। খাঁচাটি প্রায় দশ ফুট লম্বা, তাই নিচে দাঁড়িয়ে উপরের সেই গোপন মেকানিজম অবধি পৌঁছানো আয়লার পক্ষে অসম্ভব। কারান লক্ষ্য করল, ছাদের ঠিক মাঝখানে একটি চক্রাকার ছিদ্র রয়েছে।
“কারান, ফারহানকে তোমার কাঁধে তোলো! কুইক!” আয়লা চিৎকার করে উঠল।
কারান আর সময় নষ্ট করল না। সে নিমেষের মধ্যে ফারহানকে কোলে তুলে নিজের কাঁধের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল। “জলদি খোল ফারহান, উই আর রানিং আউট অব টাইম!”

ফারহান কোনোমতে ভারসাম্য বজায় রেখে সেই লুকানো ছিদ্রটিতে চাবিটি প্রবেশ করাল। এক যান্ত্রিক শব্দে খাঁচার ছাদটি স্লাইড করে খুলে গেল। ফারহান দ্রুত হাতের জোরে খাঁচার ওপরে উঠে এলো, এবং কারানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। কারানও তার সুঠাম দেহের সমস্ত পেশি কাজে লাগিয়ে খাঁচার ওপর উঠে এলো। এরপর দুজনেই নিচে লাফিয়ে পড়ল।
মুক্তির এক দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করল তারা। ফারহান আয়লার দিকে তাকিয়ে বলল, “লেট’স মুভ আয়লা, অলরেডি দুই ঘণ্টা লস্ট হয়ে গেছে আমাদের!”
আয়লা মাথা নাড়াল। চলে যাওয়ার আগে সে এক হাঁটু গেড়ে সেই আদিবাসী মেয়েটির সামনে বসল। তার মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে কপালে একটি চুমু খেল। এরপর নিজের গলার সেই মহামূল্যবান স্বর্ণের চেইনটি খুলল, যা ছিল তার বাবা-মায়ের দেওয়া শেষ স্মৃতি। সে চেইনটিতে একবার চুমু খেয়ে মেয়েটির হাতের মুঠোয় গুঁজে দিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “ধন্যবাদ।”

বালিকাটি এবার প্রশস্ত হাসল। ভাষার প্রাচীর থাকলেও আয়লার আবেগ বুঝতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না। আয়লা দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ওকে গাইজ, লেট’স গো।”
যাওয়ার আগে কারান একবার পিছনে ইব্রাহিমের দিকে তাকালো, যাকে সে নিজের হাতে শেষ করার শপথ নিয়েছিল। অথচ ইব্রাহিমের ঠোঁটের কোণে পৈশাচিক বাঁকা হাসি লেপটে আছে। কারান সেই হাসির গূঢ় রহস্য বোঝার চেষ্টা করল না, কারণ এই মুহূর্তে বেঁচে ফেরাই একমাত্র লক্ষ্য।
আয়লা কারানের চোখের ক্রোধ আর দ্বিধা বুঝতে পেরে দৃঢ় স্বরে বলল, “ডোন্ট ওয়েস্ট ইওর টাইম অন হিম, কারান। তুমি ওকে যতটা পেনফুল পানিশমেন্ট দিতে চাইতে, তার চেয়েও বড়ো কোনো ডেসটিনি ওর জন্য ওয়েট করছে। লিভ দিস মা*দা*রফা*কা*র টু দ্য ফেইট! চলো, সময় নেই!”
ফারহান দাঁতে দাঁত চেপে সায় দিল, “রাইট! ওকে এই ক্যানিবালগুলোর হাতেই ছেড়ে দে। আমাদের না পেয়ে ট্রাইবালরা ওর ওপরই সব ফ্রাস্ট্রেশন ঝাড়বে।”

সে কারানের পিঠে একটা তাগাদা দিয়ে ধাক্কা দিল। তিনজন তখন ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ছায়ার মধ্য দিয়ে দ্রুত দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু ইব্রাহিম ছিল এক জঘন্য ধুরন্ধর সত্তা। সে আগেই আয়লার টক্সিন গেমের কিছুটা আন্দাজ করেছিল, তাই নিজের নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং প্রতিশোধের নেশায় সে আদিবাসীদের অস্ত্রশালা থেকে একটি বাঁশের ধারালো কঞ্চি লুকিয়ে রেখেছিল। ইব্রাহিম জানত তার আয়ু শেষ, তাই সে চেয়েছিল অন্তত একজনের মৃ*ত্যু নিশ্চিত করে যেতে। ইব্রাহিম তার ঠোঁট কুঁচকে কপট হাসি হেসে নিখুঁত প্রোজেক্টাইল মোশনে হাতের সেই কঞ্চিটা ছুঁড়ে মারল।
একটি তীক্ষ্ণ শিসের মতো শব্দ হলো। সেই কঞ্চিটি সোজা আয়লার ডান পায়ের কাফ মাসল ভেদ করে ওপাশে বেরিয়ে এলো। ফিনকি দিয়ে র*ক্ত ছুটে এসে ভিজিয়ে দিল শুকনো পাতাসমূহ। আয়লা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও নিজের দুহাতে নিজের মুখ চেপে ধরল, পাছে কোনো আর্তনাদ বেরিয়ে অবশ হয়ে পড়ে থাকা আদিবাসীদের জাগিয়ে না তোলে। যে মেয়েটি শত অ’ত্যাচারেও পাথর হয়ে ছিল, আজ সেই আয়রন লেডির চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগল।
কারান আর ফারহান হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য জমে গেল। দৃশ্যটা দেখে কারানের র*ক্ত মাথায় চড়ে গেল। দুই হাতের মুষ্টি শক্ত করে কারান দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল, “ইউ ডার্টি সান অব আ বি*চ!”
ইব্রাহিম তখন উন্মত্তের মতো হাসছে। ইব্রাহিমের প্রাণভোমরা ওখানেই ছিঁ*ড়ে ফেলার জন্য, কারান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আবার পিছনের দিকে ফিরতে উদ্যত হলো। কিন্তু আয়লা অমানবিক মনের জোরে কাঁপা গলায় বলল, “কারান, প্লিজ স্টপ! ডোন্ট বি সো ইমোশনাল। আমি ঠিক আছি। আমাদের বোট রেডি আছে, এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব ডিসঅ্যাপিয়ার হতে হবে।”

আয়লার ধমকে কারান নিজেকে সামলে নিলেও তার শরীরের প্রতিটি শিরা ক্রোধে কাঁপছিল। সে দ্রুত আয়লার ক্ষ’তবিক্ষ’ত পায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। ফারহানকে ইশারা করে বলল, “ফারহান, আয়লার মুখটা শক্ত করে চেপে ধর।”
ফারহান দ্রুত আয়লার মুখ চেপে ধরল। কারান ফুসফুস ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে এক হ্যাঁচকায় কঞ্চিটা বের করে আনল। র*ক্তের ধারা ভলভল করে বেরিয়ে এলো, যার কয়েক ফোঁটা কারানের মুখেও ছিটকে লাগল। যন্ত্রণার তীব্রতায় আয়লা অবচেতনেই ফারহানের কাঁধ খামচে ধরল। তার নখের আঁচড়ে ফারহানের পেশি র*ক্তা*ক্ত হলেও উত্তেজনার আতিশয্যে সে কোনো ব্যথা অনুভব করল না।
কারান সেই র*ক্তমাখা কঞ্চিটি তুলে নিয়ে তার সমস্ত পেশিশক্তি এক করে ইব্রাহিমের দিকে ছুঁড়ে মারল। ইব্রাহিম তখনো উচ্চৈঃস্বরে হাসছিল, সেই হা করা মুখের ভেতর দিয়ে কঞ্চিটি সোজা তার গলার শ্বাসনালি ভেদ করে ঢুকে গেল। কণ্ঠনালি ছিঁ*ড়ে র*ক্ত বেরোলেও ইব্রাহিমের চোখে ছিল বিজয়ের ছটা। তবে হাসি থেমে গিয়ে সেখানে নরকীয় গোঙানি শুরু হলো। ম’রার আগেও ইব্রাহিম তার উদ্দেশ্য সফল করে গেল।
এরমধ্যেই দেখা গেল, কুয়াশার চাদর ভেদ করে বিচের দিক থেকে ধাবমান দুজন আদিবাসী যোদ্ধাকে। আয়লার ম্যাপ রিডিং অনুযায়ী তাদের দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত পাহারা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতির আকস্মিকতায় তারা পথ বদলে এখানে এসে পৌঁছেছে। খাঁচা শূন্য দেখে তারা আদিম হুংকার ছাড়ল। মুমূর্ষু ইব্রাহিম শেষবারের মতো হাত উঁচিয়ে ইশারায় কারানদের পলায়নের পথটা দেখিয়ে দিল।

এদিকে আয়লা শরীর এলিয়ে দিলেও থামেনি। ফারহান আর কারান তাকে আগলে নিয়ে এগোচ্ছে। ফারহানের পায়েও গু’লির ক্ষ’ত থাকায় সে পুরোপুরি ভার নিতে পারছিল না। কারান অস্থির হয়ে ডানে বামে তাকিয়ে বলল, “আয়লা, তুমি কি এভাবে চলতে পারবে? ইউ ওয়ান্ট মি টু ক্যারি ইউ?”
কারানের কণ্ঠে যদিও আড়ষ্টতা ছিল। আয়লা দেখল কারানের চোখে দ্বিধা আর ভালোবাসা পুরোটাই মিরার জন্য বরাদ্দ। আয়লা ম্লান হেসে আপনমনে আওড়ালো, “আমি চাইলে এই অ্যাডভান্টেজটা নিতেই পারি কারান, কারণ আমার সত্যিই আর কোনো এনার্জি নেই। কিন্তু আমি নেব না। আই নো হাউ মাচ ইউ লাভ মিরা। আমি তোমার সেই পিওর ইমোশনকে রেসপেক্ট করি।”
সে নিজের ক্ষ’তস্থানে হাত চেপে ধরে বলল, “আই অ্যাম ফাইন। লেটস মুভ ফাস্ট, ওরা পিছেই আছে।”
সে তীব্র জেদ নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল।

দ্বীপের উপকূলীয় কর্দমাক্ত তটরেখায় যখন তারা পৌঁছাল, সমুদ্র তখন উত্তাল। জোয়ারের জলে ভাসমান একটি ছোট ডিঙি বোট আগে থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছিল আয়লা। ফারহান আর কারানকে আগে নৌকায় উঠতে হলো, কারণ নৌকার দুই প্রান্তে সমান ভর বজায় না রাখলে সেটি মুহূর্তেই উলটে যাবে। ফারহান দ্রুত ইঞ্জিনের পাশে পজিশন নিল, আর কারান বোটের ডেক থেকে আয়লার দিকে বাড়িয়ে দিল তার অভয় দেওয়া হাতটা।
আয়লা তার ক্লান্ত, র*ক্তা’ক্ত হাতটা কারানের হাতের দিকে প্রসারিত করতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে অরণ্যের স্তব্ধতা বিদীর্ণ করে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাপিয়ে ধেয়ে এলো পাঁচটি ম’রণঘাতী তীর। চোখের পলকে পরপর পাঁচটি সর্পিল বি’ষাক্ত তীর আয়লার পিঠ চিরে হৃৎপিণ্ড ভেদ করে সামনের দিকে বেরিয়ে এলো। আয়লার লতাপাতার বন্য পোশাক নিমেষেই গাঢ় লাল রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠল। কারানের হাত ছোঁয়ার আগেই আয়লার দেহটি নিথর হয়ে লোনা বালুর ওপর আছড়ে পড়ল।

“আয়লা!” কারান আর ফারহানের সম্মিলিত চিৎকার রাতের শান্ত সমুদ্রের বুক চিরে দিল। তারা দুজন সব ঝুঁকি ভুলে গিয়ে বোট থেকে লাফিয়ে নেমে আয়লার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।
আয়লার বুকের ঠিক মাঝখান দিয়ে তীরের ফলার বের হয়ে আসা অংশগুলো দিয়ে টপটপ করে র*ক্ত ঝরছে। মৃ’ত্যুর হিমশীতল ছোঁয়া তার সারা শরীরে খেলে গেলেও তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বিষণ্ন হাসি। সে অতি কষ্টে বিড়বিড় করে বলল, “যা… যাও, কারান। হারি আপ, ওরা… ওরা খুব কাছে।”
কারানের ওষ্ঠাধর আর থুতনি কাঁপছিল। সে আয়লাকে পাঁজাকোলা করে তোলার জন্য নিচু হলো। আয়লা তার হাত দিয়ে কারানকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, “ন… না, কারান। প্লিজ, লাস্ট মোমেন্টে আমার জন্য তোমার এই ডিভাইন কাইন্ডনেস দেখিও না। আমার ডিমান্ড বেড়ে যাবে। আমি চাই না আমার জন্য তোমাদের লাইফ রিস্কে পড়ুক। তোমরা যাও। আই উইল বি ফাইন… সিরিয়াসলি।”
“জাস্ট শাট আপ!” কারান গর্জে উঠল। কোনো যুক্তির তোয়াক্কা না করে সে আয়লাকে কোলে তুলে নিল।
ওদিকে ফারহানের দু-চোখ তখন লোনা জলে ভরে উঠলো। সে আবার বোটে উঠে অস্থির কণ্ঠে বলল, “কারান, ওকে জলদি নিয়ে আয়! আমাদের ইমিডিয়েটলি কোনো ট্রমা সেন্টারে যেতে হবে। আয়লা, কিছুই হবে না তোমার, হ্যাভ ফেইথ! কিচ্ছু হবে না…”

আয়লার তখন চেতনা লুপ্তপ্রায়। তার সারা বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু এখন কারানের এই শক্তিশালী বাহুডোর। সে যার প্রেমে আজীবন দগ্ধ হয়েছে, আজ তার বুকেই শেষ আশ্রয় পেয়েছে, এর চেয়ে বড়ো পরমানন্দ আর কী হতে পারে? কারানের পোশাক ততক্ষণে আয়লার উষ্ণ র*ক্তে ভিজে সপসপে।
​কারান যখন তাকে নিয়ে নৌকায় উঠতে যাবে, ঠিক তখনই সেই আদিবাসী যোদ্ধাদের আরও দুটি সাধারণ তীর সপাৎ করে কারানের পিঠের পেশিতে বিঁধে গেল। যন্ত্রণার একটা তীব্র স্রোত মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল তার, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো চাপা গোঙানি। মুহূর্তেই তার শার্টের পেছনের অংশটা গাঢ় লাল র*ক্তে ভিজতে শুরু করল; তীরের ক্ষ’তমুখ চুইয়ে গরম র*ক্ত গড়িয়ে নামছে কোমরের দিকে।
​কারান যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও আয়লার ওপর থেকে হাত আলগা করল না। দাঁতে দাঁত চেপে, নিজের সর্বোচ্চ সহ্যক্ষমতা দিয়ে র*ক্তক্ষরণ আর অসহ্য জ্বালাকে উপেক্ষা করে সে আয়লাকে নিয়ে বোটে উঠে বসল। নৌকার কাঠের পাটাতনে কারানের পিঠ থেকে চুঁইয়ে পড়া কয়েক ফোঁটা তাজা র*ক্ত টুপটুপ করে পড়ে লালচে দাগ ফেলে দিল।
আদিবাসীরা যখন তৃতীয়বারের মতো বি’ষাক্ত তীর দিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে যাবে, ঠিক তখনই অরণ্যের আড়াল থেকে দুটি সূক্ষ্ম বি’ষাক্ত তূণ এসে তাদের ঘাড়ে বিঁধল। তারা সেকেন্ডের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোট্ট বালিকাটি তখনো তার ব্লো-গান হাতে স্থির দাঁড়িয়ে ছিল।

বোট এখন মাঝসমুদ্রে। আয়লার নিশ্বাস ছোট হয়ে আসছে, রেসপিরেটরি ফেইলিউর শুরু হয়েছে তার। সে কারানের দিকে অশ্রুভরা চোখে তাকিয়ে র*ক্তমাখা হাতটা বাড়িয়ে তার গাল একবার ছুঁতে চাইল, কিন্তু মাঝপথেই কারানের লয়্যালটির কারণে হাতটা মুঠো হয়ে থেমে গেল।
সে কাঁপা গলায় বলল, “আমাকে ছেড়ে যাও, আমার চাঁদ… আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। ওদিকের ওই আলোটার দিকে তাকাও… আমার মা-বাবা আমাকে ডাকছে যে…”
কারান নির্বাক। তার মতো একজন আলফা মেল আজ নিজেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থ মানুষ মনে করছে। সে ইব্রাহিম আর জেহেরের হাত থেকে আয়লাকে রক্ষা করার শপথ নিয়েছিল, সে জয়ীও হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতির নিষ্ঠুর নিয়তির কাছে আজ সে শোচনীয়ভাবে পরাজিত।

আয়লার শ্বাস নিতে চরম কষ্ট হচ্ছিল, তার ফুসফুস তখন র*ক্তে ভরে উঠছে। ফারহান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আয়লার মুখমণ্ডল নিজের দুই হাতে ধরে আকুতি জানাল, “যেও না আয়লা, প্লিজ যেও না! আমি একা হয়ে যাব। তোমার মতো একজন সোলমেট ফ্রেন্ড পাওয়া ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওনা। প্লিজ ডোন্ট লিভ আস লাইক দিস!”
আয়লা এখন আর চোখের পাতা মেলতে পারছে না; এক অজেয় অন্ধকার তার চেতনাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। তীরগুলো যদি কেবল সাধারণ লৌহশলাকা হতো, তবে হয়ত তার প্রাণশক্তির কাছে নতি স্বীকার করত। কিন্তু সেগুলোতে মাখানো ছিল আদিবাসীদের সেই কুখ্যাত কারারি বি’ষের নির্যাস। বি’ষের প্রভাবে তার দেহের কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম ভেঙে পড়ছে, র*ক্তকণিকাগুলো জমাট বাঁধতে শুরু করেছে; শ্যামল উজ্জ্বল ত্বক ক্রমশ নীলাভ বর্ণ ধারণ করছে। মৃ*ত্যুর এই সায়ানোসিস নীলিমায় তার দেহের আশি শতাংশ ইতোমধ্যেই লীন হয়ে গেছে। তবুও আয়লা লড়ছে!
আয়লা ভেজা, ঝাপসা চোখে ফারহানের দিকে তাকাল। অতি কষ্টে শ্বাস নিয়ে ভাঙা স্বরে বলল, “তারান্নুম মেয়েটা অ…অনেক ইনোসেন্ট, ফারহান। জাস্ট প্রমিজ মি, ওকে ক…খনো হার্ট করবে না। ওকে সারাজীবন আগলে রেখো… লাভ হার ফরএভার, ফারহান।”

ফারহান কথা বলতে পারছিল না, শুধু পা’গলের মতো মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। আয়লার বাড়িয়ে দেওয়া সেই হিমশীতল বাম হাতটি ফারহান নিজের কাঁপাকাঁপা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এলেও সে শপথ করল, তার জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত সে শুধু তার কুইনকেই ভালোবেসে যাবে। তার চোখের জল টপটপ করে আয়লার হাতের তালুতে পড়ছে। অথচ আয়লা আজ এতটাই দুর্বল যে সেই জলটুকু মুছে দেওয়ার শক্তিও ওর নেই। ততক্ষণে বি’ষের নীলস্রোত আয়লার পঁচানব্বই শতাংশ সত্তাকে দখল করে নিয়েছে। ওদিকে কারান পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে আয়লার দিকে তাকিয়ে আছে।
কারানের সেই অবিচল গাম্ভীর্যের দিকে তাকিয়ে আয়লা তার জীবনের শেষ চরম আকাঙ্ক্ষাটুকু আওড়ালো, “আ…মাকে একবার জ…ড়িয়ে ধরবে?”

তার দৃষ্টিতে ছিল সহস্র বছরের অব্যক্ত তৃষ্ণা।
কারানের চোয়াল শক্ত হয়ে রইল। মিরার প্রতি তার লয়্যালটি আর আদর্শের দেওয়াল এতটাই অটুট যে এই অন্তিম মুহূর্তেও সে নিজের নীতি থেকে বিচ্যুত হলো না। সে অত্যন্ত মৃদু স্বরে বলল, “আই’ম সরি।”
আয়লা কষ্ট পেল না, বরং তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে জানত কারান এমনই আপোশহীন ও দৃঢ়। এই ডিগনিটির জন্যই তো সে এই মানুষটার প্রেমে পড়েছিল। চোখ বন্ধ করার ঠিক আগে সে তার জীবনের ধ্রুবসত্যটা উচ্চারণ করল, “আমি তোমাকে অ…নেক ভালোবাসি… আ…মার চাঁদ!”
“এই না! আয়লা না, প্লিজ যেও না! লিসেন টু মি, জাস্ট ওপেন ইয়োর আইজ! আমরা তোমাকে বাঁচাবো…আমরা হসপিটালে যাচ্ছি, অলমোস্ট পৌঁছে গেছি! আয়লা, তুই তো জানিস তোকে ছাড়া আমি কতটা লোনলি ফিল করি! প্লিজ দোস্ত, যাস না… আই লাভ ইউ সো মাচ!” ফারহান আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না; সে আয়লার নিথর, হিমশীতল দেহের ওপর আছড়ে পড়ল। তার বলিষ্ঠ দুহাত আয়লার নিস্পন্দ কাঁধ দুটোকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরল, যেন সে প্রবল ঝাঁকুনিতে আয়লাকে এই মৃ*ত্যুর ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে পারে। তার মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই দিনগুলোর কথা, যখন নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে একদম একা হয়ে পড়েছিল। তখন এই আয়লাই ছিল তার একমাত্র ধ্রুবতারা, যে তাকে শিখিয়েছিল কীভাবে নিজের ভিতরের ক্রোধকে বশ করতে হয়।

“না আয়লা, তুই এভাবে এবরূপ্টলি চলে যেতে পারিস না! প্লিজ! এই আয়লা! তুই তো জানিস আমি কতটা ইমপালসিভ, কতটা মাথা গরম করি! কে আমাকে শান্ত করবে এখন? কার কাঁধে মাথা রেখে আমি আমার ডার্ক সিক্রেটগুলো কনফেস করব? আমার জানের দোস্ত… তুই ছাড়া আমার মন খারাপের দিনে কে আমাকে ফালতু জোকস শুনিয়ে হাসাবে? কে আমাকে লাইফের ক্রুয়েল ফিলোসফিগুলো ডিকোড করে বোঝাবে? তুই তো বলেছিলি আমরা একসাথে রিটায়ার করব, একটা গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন হবে, একদিনে দুটো বিয়ে হবে.. তুই কি সব প্রমিজ ব্রেক করে দিবি? প্লিজ দোস্ত, যাস না!”
ফারহান উন্মত্তের মতো চিৎকার করে চলেছে, কিন্তু আয়লার দিক থেকে আর কোনো সাড়া নেই। আয়লার মুখটা তখন পুরোপুরি নীল হয়ে গেছে, কিন্তু ঠোঁটের সেই ম্লান হাসিটা যেন এখনো লেপ্টে আছে।
ফারহানের কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছিল, তার কাছে প্রতিটি শব্দ এখন গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা এক একটা পাথরের মতো ভারি মনে হলো। তার ঘন ঘন উত্তপ্ত নিশ্বাস আয়লার সেই হিমশীতল, নিথর মুখমণ্ডলে আছড়ে পড়ছিল। ফারহানের হৃৎস্পন্দনের তীব্র দ্রুতগতি এতই প্রবল ছিল যে, পাশে থাকা কারানও বোধহয় সেই অস্থির শব্দের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছিল।

ফারহান পা’গলের মতো বিড়বিড় করতে লাগল, “তোর মনে আছে, সেবার যখন আমার ফ্যামিলি আমাকে একা ফেলে চলে গিয়েছিল, তুই ছিলি একমাত্র পারসন যে আমার হাত ছাড়িসনি। আমার তো বাবা-মা থেকেও নেই রে… আচ্ছা, আমরা তো একে অপরের রিফ্লেকশন ছিলাম, তাই না? তুই চলে গেলে আমি কার আয়নায় মুখ দেখব? কার সাথে লড়াই করব? এই আয়লা, ওঠ না! এতটা হার্টলেস হোস না! এমন নিষ্ঠুর শাস্তি দিস না আমাকে। আয়লা?”
কারান শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে সেই নীলাভ স্থির মুখটির দিকে। সে বুঝতে পারছে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত আ’র্তনাদ মিলেও আর এই ফেরারি পাখিকে ফেরাতে পারবে না। কারানের মতো ইমোশনলেস ব্যক্তিত্বও আজ ধসে পড়ল। তার চোখের এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল আয়লার ফ্যাকাশে গালে। মিরা আর কৌশিকার পর এই প্রথম অন্য কোনো নারীর জন্য কারানের চোখ আর্দ্র হলো। যে মেয়েটা কোনোদিন কারানের কাছে কিছু চায়নি, আজ তার শেষ ইচ্ছাটাও অপূর্ণ রেখেই সে বিদায় নিল। আয়লা চলে গিয়েও এক অনন্য আভিজাত্য রেখে গেল। তার মতো স্মার্ট, বুদ্ধিমতী আর সফিস্টিকেটেড মেয়ে এই পৃথিবীতে সত্যিই বিরল। সে কারানের জীবনে একটা সংক্ষিপ্ত কালবৈশাখির মতো এসেছিল, অথচ তার প্রস্তরসম হৃদয়েও রেখে গেল অবিনাশী এক ক্ষত।

ফারহানের আহাজারি তখনো থামেনি, “আয়লা, প্লিজ বন্ধু ফিরে আয়! এই ফারহান তোকে হারাতে চায় না। তুই তো বলেছিলি আমরা সারভাইভার। কিন্তু তুই একা সারভাইভ করে আমাকে কেন এই একাকিত্বের ট্র্যাপে ফেলে গেলি? আই হেইট ইউ, আয়লা! আই হেইট ইউ! আমি তোকে ক্ষমা করব না যদি তুই ফিরে না আসিস… প্লিজ দোস্ত, জাস্ট ওয়ান লাস্ট টাইম কথা বল! তুই না হাসলে আমার দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে যাবে রে… আয়লা… কথা বল, প্লিজ!”
ফারহান আয়লার নি’থর দেহটা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে যাচ্ছিল। ওর মনে পড়ছিল, কত রাতে মিশনের পর ওরা দুজনে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেদের একাকিত্ব নিয়ে গল্প করত। আজ আয়লা সেই একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে গেল, কিন্তু ফারহানকে ফেলে রেখে গেল এক অনন্ত শূন্যতায়। আয়লা ছিল তার সেফটি নেট, আজ সেই নেটটা ছিঁড়ে সে এক গভীর অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
কাওসার আহমেদ চৌধুরীর সেই চিরচেনা সুরটা যেন আজ এই বিষণ্ন মাঝসমুদ্রে এক কঠিন ফিলোসফিক্যাল রিয়েলিটি হয়ে ধরা দিল:

Tell me who I am 2 part 17 (3)

‘শেষ হোক এই খেলা, এবারের মতন
মিনতি করি আমাকে হাসিমুখে বিদায় জানাও…
আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না
ফেরারি পাখিরা কুলায় ফেরে না…’
সমুদ্রের মাঝখানে ইঞ্জিনের একঘেয়ে শব্দের মাঝে কেবল ফারহানের কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। নীল হয়ে যাওয়া সেই নিথর দেহের ওপর ভোরের ম্লান আলো এসে পড়ল। আয়লা চলে গেল, কিন্তু রেখে গেল এক অসমাপ্ত উপাখ্যান আর দুটি ভেঙে পড়া আত্মা। সে যেন একটা ধূমকেতুর মতো এলো, পৃথিবীকে আলোকিত করল, এবং তারপর চিরকালের জন্য মহাকাশের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

Tell me who I am 2 part 18